দিমিত্রি এস্কোভ একজন রাশিয়ান কোটিপতি। গণমাধ্যম ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তবে ৩২ বছরের এই মানুষটি আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছেন একটি অসাধারণ ধারণাকে বাস্তবে রূপদানের কর্মপ্রচেষ্টার জন্য। সেই প্রচেষ্টার অংশীদার অন্তত মনে করেন সব মরণশীল মানুষই। দিমিত্রির মূল চেষ্টাটি হলো মানুষকে অমরত্ব দান করা।
সে কাজের শুরুটা হয়েছিল ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। ‘ইনিশিয়েটিভ ২০৪৫’ নামের একটি প্রজেক্ট চালু করেন দিমিত্রি। তিনি তাঁর প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক। সে প্রজেক্টকে সফল করতে তৈরি করেন ‘গ্লোবাল ফিউচার ২০৪৫ কংগ্রেস’। কংগ্রেসের প্রথম সাধারণ সভাটি বসে ২০১২ সালে রাশিয়ার মস্কোতে। দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সভাটি হয় ওই বছরের ১৫ ও ১৬ জুন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে। সেখানে উপস্থিত হন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের নামকরা বিজ্ঞানী, রাজনীতিবিদ, মানবাধিকার কর্মী, ব্যবসায়ী ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব। তিনি তাঁর উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘মূল্যবোধের অবক্ষয়, যুদ্ধ, ব্যাধি ইত্যাদিতে সংকটের মুখে আছে পৃথিবী। এসব থেকে উত্তরণের পথ বের করতে না পারলে খুব তাড়াতাড়িই ধ্বংস হয়ে যাবে মানুষ। এ জন্য চালু করা হয়েছে ‘ইনিশিয়েটিভ ২০৪৫’। যা আধুনিক মানুষের একটি সমৃদ্ধ বিবর্তনের সূচনা করবে।’
দিমিত্রি এস্কোভের লক্ষ্য, মানুষকে অমর করে তোলা। শারীরিকভাবে অমর করতে না পারলেও হলোগ্রাফিক অবয়বের মাধ্যমে তা সম্ভব করে তুলতে চান তিনি। এই অবয়বের অন্য একটি নাম দিয়েছেন তারা ‘অ্যাভাটার’। তাঁদের অ্যাভাটারের মানে হলো-শরীর না থাকলেও অন্য কোনো বেশে উপস্থিত হওয়া বা অন্যের শরীরে স্থাপিত হওয়া। তবে হলোগ্রাফিক শরীরটি কাজ করতে পারবে তার শরীরে যে মানুষের মস্তিষ্ক স্থাপন করা হবে তার মতোই। পুরো কর্মপ্রক্রিয়াকে চারটি স্তরে ভাগ করে ৩০ জন বিজ্ঞানী এখন কাজ করে চলেছেন।
প্রথমে তাঁরা ২০১৫ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে তৈরি করবেন একটি রোবট দেহ। এটি হলো প্রথম প্রজন্মের অ্যানড্রয়েড রোবট। সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেক বেশি ক্ষমতাবান-বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে কাজ করতে পারবে, ক্লান্তিহীন গাড়ি চালাতে সক্ষম, যেকোনো উদ্ধার অভিযানে সাহায্য করতে সক্ষম, এমনকি অক্সিজেনও কম নেবে শরীরে। এমনকি কোনো দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেটিরও সমাধান করতে পারবে। রোবটটি চালিত হবে ‘ব্রেন কম্পিউটার ইন্টারফেস’-এর নামের এক ধরনের রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে। এটাই হলো অ্যাভাটারের প্রথম স্তর। তাদের ভাষায় ‘অ্যাভাটার এ’।
পরের স্তরে আছে ‘অ্যাভাটার বি’। এটি তৈরি করা হবে ২০২০-২৫ সালের মধ্যে। মৃত বা শারীরিকভাবে অক্ষম মানুষের সচল মস্তিষ্কও স্থাপন করা সম্ভব হবে, তার জন্যই তৈরি নকল শরীর। দেহ কাঠামোটি তৈরিতে ব্যবহার করা হবে খুবই উচ্চমানের হাইড্রো বায়ো-ইলেকট্রনিক ডিভাইস। তবে সমস্যা একটাই-কোনোভাবে মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া চলবে না। কারণ এটি পুনঃস্থাপন কষ্টসাধ্য।
তৃতীয় স্তরের নাম দেওয়া হয়েছে ‘রি-ব্রেন’ বা ‘মস্তিষ্কের পুনঃস্থাপন’। এই স্তরে রোবটের শরীরে স্থাপন করা হবে নকল মস্তিষ্ক। কৃত্রিমভাবে তৈরি এই মস্তিষ্ক সে মানুষটির ব্যক্তিত্ব, অভ্যাস, মূল্যবোধসহ অন্যান্য ক্ষমতা পুনঃস্থাপন করা হবে। এটি তৈরি করতে চান তাঁরা ২০৩০ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে। এই মস্তিষ্কের মাধ্যমে মানুষের চিন্তা ও কাজের ক্ষমতাকে হাজার গুণে বাড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হবে বলে আশাবাদী তাঁরা। আর সাধারণ মানুষ ইচ্ছা করলে এই মস্তিষ্কের মাধ্যমে নিজেকে একের বেশি বিষয়ে মনোনিবেশ করাতে পারবেন। সেটিও হবে অনেক গুণে বেশি কার্যক্ষম।
ইনিশিয়েটিভ ২০৪৫ সালের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো চতুর্থ স্তর। এটি তৈরি করা হবে ২০৪০-৪৫ সালের মধ্যে। এটাকেই ভবিষ্যতের মানবসভ্যতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় হিসেবে বিবেচনা করছেন তাঁরা। এই স্তরে তাঁরা মানুষকে হলোগ্রাফিক শরীর দিতে চান। যে শরীরের মূল চালিকাশক্তি-সে ব্যক্তির চিন্তা, কাজের ক্ষমতা, মূল্যবোধ ও ব্যক্তিত্ব। আর দিমিত্রি চান তাঁর নতুন মানুষটি হবেন দার্শনিক ভাবনা, মূল্যবোধ, সাংস্কৃতিক বিকাশ ও সৎ গুণাবলির অধিকারী। তাঁর এই মানুষ তৈরি করবেন নতুন চিন্তার অধিকারী হয়ে একটি মানবিক সমাজ, সুন্দর বিশ্ব।
No comments:
Post a Comment