Thursday, June 28, 2012

গনতন্ত্রে মানষকন্যা সু চি নাকি এর ভেতরে অন্য কেউ।


এক দিকে রাখাইন প্রদেশে হিংসার আগুনে স্বদেশ জ্বলছে আর আরেক দিকে শান্তির জন্য পাওয়া নোবেল প্রেইজ নিচ্ছেন তথাকথিত গণতন্ত্রী নেত্রী অউন সান সূ চি। নোবেল প্রাইজ নেওয়ার জন্য গণতন্ত্রে প্রচারক ইউরোপী কয়েকটি দেশে তিনি ঘুরছেন আরো ঘুরবেন। সু চি তার নোবেল পুরস্কার নেয়ার প্রক্কালে বলেছেন যে, তার দেশে আজ শন্তি বইছেনা। তাই তার শন্তিু পুরস্কার গ্রহণ করতে আনন্দ লাগছেনা।  তার জীবনের অনেক ঘটনা প্রকাশিত হয়েছে একটি ছাড়া । ১৯৬৪ সালে সু চি নয়া দিল্লীর লেডি শ্রীরাম কলেজ থেকে রাজনীতিতে বি এ ডিগ্রি লাভ করেন। সেই সময় সু চির মা দিল্লীতে ভারত ও নেপালে বার্মার রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। এর পর স ুচি পড়াশোনার জন্য অক্সফোর্ডে চলে জান। সেখানে পড়াশোনা বিষয় ছিল দর্শন, রাজনীতি ও অথনীতি। অক্সফোর্ডে পড়ার সময় এক সহপাঠি পাকিস্তানি যার নাম তারিক হায়দার এর সাথে প্রেমে জড়িয়ে পরে, তাদের প্রেমের স্থায়ীত্ব ছিল কয়েক বছর, কিন্তু তার মা এবং আত্মীয় স্বজন বন্ধু বান্ধব এই প্রেমকে গ্রহণ করতে পারেনি। পারিবারিক চাপে সূ চি ইংল্যান্ড ছেড়ে আমেরিকায় পারি জমান সেখানে তার পরিচয় হয় তার প্রায়ত স্বামী মাইকেল আরিশ এর সঙ্গে। এবং প্রণয় এবং আবশেষে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।
যারা সু চি কে গনতন্ত্রে মানষকন্যা হিশোবে দেখতে চান কিংবা দেখছেন তাদের জন্য হয়তো সূখময় কোন সংবাদের ফেরি হবেন না এটা নিশ্চিত। সূ চি বার্মার গণতন্ত্রকে এনজিও আলোকে দেখতে চান এবং তাকে সেই রূপেই দেখানো হয়েছে তাই তার প্রধান কাজ হলো সাহায্য জড়ো করা। র্বামার মানুষের গনতন্ত্রিক অধিকার, মৌলিক অধিকার ফিরিয়ে দেয়া, আর্থসামাজিক উন্নয়নে কৌশল প্রণয়ন জাতিগত দাঙ্গা, রোহিঙ্গা সমস্যা এই সব মূখ্য নয়। তার মূল কাজ হলো নিবাচনের জন্য টাকা জোগার করা, নির্বাচনে জয়ী হলে এই দানের প্রতিদানের ওয়াদা করা। সূ চি কে বিভিন্ন দেশের সাংবাদিকরা নানান প্রশ্ন করেছেন তার মধ্যে  অন্যতম প্রশ্ন হচ্ছে এমন “আজ আপনার দশেরে একটি প্রদশেরে হাজার হাজার লোক গৃহহারা। আপনি কনে তাদরে পাশে নইে?  সু চি তার জবাবে বলেছিলেন দেশে শাষণ ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনাটা জুরুরী, রাখাইনদের সমস্যা জরুরী এখনই সমাধান করা সম্ভব না। তার কথা শুনে বাংলাদেশের মানুষরা ক্ষেপতে পারেন কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে রাখাইন জাতির এহেন র্দূভোগ তার কাছে বেদনার বিষয় নয় কারণ রাখাইনরা তো ভোটার নয়, ভোটের রাজনীতিতে রাখাইনরা উপেক্ষিত।  

Tuesday, June 19, 2012

রোহিঙ্গা : রাষ্ট্রবিহীন মানুষ


ছোট ছোট নৌকায় সমুদ্র পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশের দিকে আসতে থাকা স্রোতের মতো মানুষগুলোই রোহিঙ্গা। কিন্তু আসলেই রোহিঙ্গা কারা, কী তাদের পরিচয়? মিয়ানমারে তাদের সংকট কী? এই সংকট কি সাময়িক, নাকি বাংলাদেশের জন্য ভবিষ্যতের বড় কোনো ঝুঁকি? বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শরণার্থীদের কাহিনী জানা থাকলেও মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের গল্প অনেকটাই অজানা আমাদের।     রোহিঙ্গা কারা?
নবম-দশম শতাব্দীতে আরাকান রাজ্য 'রোহান' কিংবা 'রোহাঙ' নামে পরিচিত ছিল, সেই অঞ্চলের অধিবাসী হিসেবেই 'রোহিঙ্গা' শব্দের উদ্ভব। ঠিক কবে থেকে এই শব্দ ব্যবহৃত হয়ে আসছে, তা জানা যায় না। মিয়ানমার সরকার 'রোহিঙ্গা' বলে কোনো শব্দের অস্তিত্ব স্বীকার করে না। রোহিঙ্গারা পূর্বতন বর্মা, অধুনা মিয়ানমারের পশ্চিম অঞ্চলের মুসলমান সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। সংখ্যায় প্রায় ২০ লাখ রোহিঙ্গার অধিকাংশ বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের পাশে উত্তর রাখাইন রাজ্য নামে নামকরণ করা পূর্ববর্তী আরাকান রাজ্যের তিনটি টাউনশিপে বাস করে। মিয়ানমারের সামরিক জান্তা ও উগ্র রাখাইনদের সাম্প্রদায়িক আক্রমণ ও এথনিক ক্লিনজিংয়ের শিকার হয়ে প্রায় ১০ লাখের মতো রোহিঙ্গা মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত হয়ে বাংলাদেশ, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছে।
 
বাংলা-আরাকান সম্পর্ক
ইতিহাসের পাতা থেকে

১৪০৪ সালে বর্মার প্যাগান শাসকরা আরাকান দখল করে নিলে আরাকান রাজা মিন-স-মুন (মতান্তরে রাজা নারামেইখলা) পূর্বদিকে পালিয়ে বাংলায় চলে আসেন। বাংলার গৌড় সালতানাত তখন দিলি্লর মোগল সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল। মিন-স-মুন আশ্রয় নেওয়ার পরে দীর্ঘদিন গৌড় সুলতানের অধীনে রাজকর্মচারী হিসেবে কাজ করেন।
১৪২৯ সালে সুলতান নাদির শাহ মিন-স-মুনকে তাঁর হারানো রাজ্য ফিরিয়ে দিতে উদ্যোগী হন। সালতানাতের অস্ত্র ও সেনা সহায়তায় মিন-স-মুন পরের বছর তাঁর রাজ্য পুনরুদ্ধারে সক্ষম হন। এর ফলে ১৪৩০ থেকে ১৫৩১ সাল পর্যন্ত ১০০ বছর আরাকান রাজা গৌড় সালতানাতের পরোক্ষ শাসনাধীন ছিলেন। এ সময় এই অঞ্চলে মুসলমানদের আনাগোনা বৃদ্ধি পায়। এ সময়কার আরাকান রাজারা যদিও ধর্মে বৌদ্ধ ছিলেন, কিন্তু সালতানাতের প্রতি আনুগত্য প্রকাশে তাঁরা মুসলিম পদবি ধারণ করতেন। এ সময়কার আরাকানি মুদ্রায় কলেমা ও পার্সিয়ান লিপি চালু ছিল। এ সময় মিন-স-মুনের ভাই আলী খান এবং ছেলে কলিমা শাহ নামে পদবি নিয়ে বা-সো-প্রু যথাক্রমে রামু ও চট্টগ্রামের আশপাশের আরো কিছু অঞ্চল পর্যন্ত আরাকান রাজ্য বিস্তৃত করেন। এই রাজবংশের দ্বাদশ রাজা যুবক শাহ পদবিধারী রাজা মিন-বিনের শাসনকালে ১৫৩১ থেকে ১৫৫৩ সাল পর্যন্ত আরাকান রাজ্য সমৃদ্ধির চূড়ান্ত রূপ লাভ করে। তিনি বাংলার সালতানাত থেকে নিজেকে স্বাধীন হিসেবে ঘোষণা করেন। রাজা মিন-বিন পর্তুগিজদের তাঁর সেনাবাহিনী গড়ে তোলার জন্য নিয়োগ দেন এবং পর্তুগিজ সহযোগিতায় একটি শক্তিশালী নৌবাহিনী গড়ে তোলেন।
এ সময় বাংলার শাসকরা মোগল শাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা ঘোষণা করলে মোগল সম্রাট হুমায়ুন বাংলা আক্রমণ করেন। বাংলার এই অস্থিরতার সুযোগে আরাকান রাজা মিন-বিন পূর্ব বাংলার এক বিশাল অংশ দখল করে নেন। পরবর্তী ১২০ বছর এই এলাকা আরাকান রাজার অধীনে ছিল। মিন-বিন পূর্ব বাংলার দখল করা অংশগুলো স্থানীয় রাজাদের মাধ্যমে শাসন করতেন। চট্টগ্রামে আরাকান রাজের গভর্নরের দপ্তরে এই রাজারা খাজনা প্রদান করতেন। এ সময় এ অঞ্চলের মানুষদের মধ্যে নানা রকম সামাজিক সম্পর্কের সূত্রপাত হয় এবং চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষাসহ বাংলা ভাষার কিছু অপভ্রংশ ছোট আকারে হলেও আরাকানে পাওয়া যায়। মজার ব্যাপার হলো, আরাকান স্বাধীনতা অর্জনের পর ও ১৭৮৪ সালে ব্রিটিশ শাসন আসার আগ পর্যন্ত দীর্ঘ ৩৫০ বছর এই অঞ্চলের রাজসভায় মুসলিম রীতিনীতি ও সংস্কৃতি চালু ছিল। তবে অনেক রোহিঙ্গানেতা দাবি করেন, অষ্টম ও নবম শতাব্দীতে তাঁদের পূর্বপুরুষরা আরাকানে বসতি গেড়েছিলেন। তাঁরা মনে করেন, সপ্তম শতকে আসা পার্সিয়ান বণিকদের মাধ্যমে এখানে রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠীর উদ্ভব হয় এবং পরবর্তী সময় ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা মুসলমানরাও ধীরে ধীরে এখানে রোহিঙ্গা হিসেবে পরিচিত ও আত্তীকৃত হয়ে পড়েন। তাঁদের এই দাবিকেও উড়িয়ে দেওয়া যায় না সহজে। 'আরাকান' শব্দটি আরবি অথবা পার্সি ভাষার কোনো শব্দের অপভ্রংশ হিসেবেই মনে করা হয়। তবে গৌড়ের সুলতানদের পরোক্ষ শাসন শুরু হওয়ারও প্রায় ১০০ বছর আগে আরব ভূবিদ রাশিদ উদ্দিন ১৩১০ সালেই এই এলাকাকে 'রাহান' নামে চিহ্নিত করেছেন। কিন্তু অনেক পরে, ১৫৮৬ সালের দিকে, ব্রিটিশ পর্যটক রালফ ফ্লিচ এই এলাকাকে বর্ণনা করেছেন 'রোকন' নামে। স্পষ্টতই বোঝা যায়, এই এলাকায় একসময় মুসলমানদের শক্ত রাজনৈতিক প্রভাব ছিল। আরাকান বা অধুনা উত্তর রাখাইন প্রদেশের ভূমিপুত্র হিসেবে দাবিদার বর্তমান রাখাইনদের তুলনায় মুসলমানরা এই অঞ্চলে খুব বেশি দেরিতে আসেননি। যত দূর জানা যায়, ৯৫৭ সালের দিকে মোঙ্গলদের সময় এই অঞ্চলে রাখাইনরা বসতি স্থাপন করে।
 
স্বাধীন বর্মায় বৈষম্যের শিকার
পূর্ব পাকিস্তানে যোগ দিতে চেয়েছিল তারা

১৭৮৪ সালে ব্রিটিশরা আরাকান দখল করে নিলে আবারও বাংলা ও ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে বর্মার যোগাযোগ বেড়ে যায়। এ সময় বর্মার বনজ সম্পদ আহরণ ও অন্যান্য কাজে ব্রিটিশরা ব্যাপকসংখ্যক ভারতীয়কে মিয়ানমারে নিয়ে যায়। ভাগ্যান্বষণে অনেক ভারতীয়, বিশেষ করে বাঙালিরাও সেখানে ভিড় করে। স্থানীয় রাখাইনদের তুলনায় তারা ব্রিটিশদের কাছে বেশি গুরুত্ব লাভ করে এবং সরকারি পদে আসীন হয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের গোড়ার দিকে, ১৯৪২ সালে, জাপানিরা ব্রিটিশদের কাছ থেকে মিয়ানমার দখল করে নেয়। স্থানীয় রাখাইনরা এ সময় জাপানিদের পক্ষ নিয়ে ব্রিটিশদের কাছ থেকে সুযোগ-সুবিধাপ্রাপ্ত জনগণকে আক্রমণ করে। তাদের আক্রমণের শিকার হয় মূলত রোহিঙ্গা মুসলমানরা। ১৯৪২ সালের ২৮ মার্চ রাখাইন অধ্যুষিত মিমবিয়া ও ম্রোহাং টাউনশিপে প্রায় পাঁচ হাজার রোহিঙ্গাকে হত্যা করে রাখাইনরা। পাল্টা প্রতিশোধ হিসেবে উত্তর রাখাইন অঞ্চলে প্রায় ২০ হাজার রাখাইনকে হত্যা করে রোহিঙ্গারা। সংঘাত তীব্র হলে জাপানিদের সহায়তায় রাখাইনরা রোহিঙ্গাদের কোণঠাসা করে ফেলে।
১৯৪৫ সাল পর্যন্ত মিয়ানমার জাপানিদের দখলে থাকে। এই তিন বছরে কমপক্ষে ২০ হাজার রোহিঙ্গা মিয়ানমার ছেড়ে তৎকালীন বাংলায় চলে আসে। সেই যাত্রা এখনো থামেনি। ১৯৪৫ সালে ব্রিটিশরা আবারও মিয়ানমার দখল করে নেয়। এই দখলে তাদের সহায়তায় এগিয়ে আসে রোহিঙ্গারা। ব্রিটিশরা এ সময় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে সহায়তার বিনিময়ে উত্তর রাখাইনে মুসলমানদের জন্য আলাদা একটি রাজ্য গঠন করে দেবে তারা। কিন্তু আরো অনেক প্রতিশ্রুতির মতোই ব্রিটিশরাজ এই প্রতিশ্রুতিও রাখেনি।
১৯৪৭ সালে ভারত উপমহাদেশ ভাগের সময় রোহিঙ্গাদের একটি বড় অংশ আরাকান রাজ্যকে পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে নিয়ে আসার চেষ্টা করে। এ নিয়ে জিন্নাহর সঙ্গে যোগাযোগ করেন রোহিঙ্গানেতারা। রোহিঙ্গারা একটি বড় সশস্ত্র গ্রুপও তৈরি করে এবং মংদু ও বুথিধাং এলাকাকে পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে উদ্যোগ নেয়। অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন, রোহিঙ্গাদের এই উদ্যোগ ছিল আত্মঘাতী এবং মিয়ানমারে বৈষম্যের শিকার হওয়ার পেছনে এটি একটি বড় কারণ। মিয়ানমারের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা সেই সময়কার রোহিঙ্গা উদ্যোগকে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে চিহ্নিত করে এসেছে। বাংলাদেশে যেভাবে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সরাসরি সহায়তা করার কারণে বিহারি উদ্বাস্তু জনগোষ্ঠী সাধারণ মানুষের ঘৃণার শিকার হয়েছে, রোহিঙ্গারা সরাসরি সহায়তা না করলেও মিয়ানমারে একই ভাবে বিরূপ জনমতের শিকার। ১৯৬২ সালে মিয়ানমারে সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করার পর ধীরে ধীরে রোহিঙ্গাদের প্রতি রাষ্ট্রীয় বৈষম্য বৃদ্ধি পেতে থাকে। ১৯৭০ সালের পর থেকে সেনাবাহিনীতে রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠী থেকে নিয়োগ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর আগে থেকে সরকারি চাকরিতে থাকা রোহিঙ্গারা ব্যাপক বৈষম্যের শিকার হয়।
 
১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন
রোহিঙ্গারা হয়ে পড়ে রাষ্ট্রহারা

১৫ অক্টোবর ১৯৮২ সালে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা নাগরিকত্ব আইন প্রকাশ করে। এই আইনে মিয়ানমারে তিন ধরনের নাগরিকত্বে বিধান রাখা হয়_পূর্ণাঙ্গ, সহযোগী এবং অভিবাসী। এই নতুন আইনে বলা হয়, ১৮২৩ সালে মিয়ানমারে ব্রিটিশ শাসন শুরু হওয়ার পূর্ববর্তী সময়ে মিয়ানমারে বাস করা ১৩৫টি গোত্রভুক্ত মানুষই মিয়ানমারের পূর্ণাঙ্গ নাগরিক হিসেবে গণ্য হবে। রোহিঙ্গাদের গোত্র হিসেবে অস্বীকার করে সামরিক সরকার। তারা দাবি করে 'রোহিঙ্গা' বলে কোনো গোত্র তাদের দেশে নেই, এই জনগোষ্ঠী আদতে পূর্ব বাংলা থেকে যাওয়া অবৈধ জনগোষ্ঠী, যারা ব্রিটিশ সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় পরবর্তী মিয়ানমারে আশ্রয় নিয়েছে। নতুন আইন অনুযায়ী তারা মিয়ানমারের নাগরিক হতে পারবে না। মিয়ানমারের সামরিক সরকার ভারতীয় উপমহাদেশের সঙ্গে আরাকান রাজ্যের দীর্ঘ কয়েক শতাব্দীর সামাজিক ও রাজনৈতিক যোগাযোগকে অস্বীকার করে। আইনে 'সহযোগী নাগরিক' হিসেবে শুধু তাদের নাগরিকত্ব দেওয়া হয়, যারা ১৯৪৮ সালের নাগরিকত্ব অ্যাক্টে ইতিমধ্যেই আবেদন করেছে। এ ছাড়া 'অভিবাসী নাগরিক' (মিয়ানমারের বাইরে জন্ম নিয়েছে এমন মানুষদের নাগরিকত্ব) হিসেবে কয়েকটি শর্তের কথা উল্লেখ করা হয়, যেগুলো 'যথাযোগ্যভাবে প্রমাণসাপেক্ষ' বলে বলা হয়, যারা মিয়ানমারের স্বাধীনতার আগে (৪ জানুয়ারি ১৯৪৮) এ দেশে প্রবেশ করেছে, মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় ভাষায় দক্ষ এবং যাদের সন্তান মিয়ানমারে জন্মগ্রহণ করেছে, তারাই এই ধারায় নাগরিকত্ব পেতে পারে। যুগ যুগ ধরে আরাকানে থাকা রোহিঙ্গাদের পক্ষে ১৯৪৮ সালের আগে প্রবেশ করা সংক্রান্ত কোনো দালিলিক প্রমাণ উপস্থাপন করা ছিল অসম্ভব। এ ছাড়া বৃহত্তর চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলা প্রধানত নিরক্ষর এই জনগোষ্ঠীর পক্ষে মিয়ানমারের রাষ্ট্রভাষায় 'দক্ষতা' প্রমাণ হয়ে পড়ে দুরূহ; কারণ রাষ্ট্রীয়ভাবে উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন যে 'কেন্দ্রীয় কমিটি' এই নাগরিকত্ব প্রদানের দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিল, তারা প্রায় প্রকাশ্যেই রোহিঙ্গাদের প্রতি বিরূপ মনোভাব দেখায়। সুতরাং রোহিঙ্গারা আর নাগরিকত্ব পায় না। তারা হয়ে পড়ে উদ্বাস্তু, কয়েক পুরুষ ধরে বাস করা নিজেদের ভিটেমাটিতে তারা হয়ে পড়ে কয়েদি। বিশ্বের বুকে জন্ম নেয় রাষ্ট্রবিহীন সবচেয়ে বড় জনগোষ্ঠী।
তেরঙা কার্ডে ঠাঁই হয়নি তাদের
১৯৮৯ সাল থেকে মিয়ানমার তিন ধরনের নাগরিক কার্ডের প্রচলন করে। পূর্ণাঙ্গ নাগরিকদের জন্য গোলাপি, সহযোগী নাগরিকদের জন্য নীল এবং অভিযোজিত নাগরিকদের জন্য সবুজ রঙের কার্ড দেওয়া হয়। চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য, পড়াশোনা-চিকিৎসাসেবাসহ সব ধরনের কাজকর্মে এই কার্ডের ব্যবহার শুরু হয়। কিন্তু রোহিঙ্গাদের কোনো ধরনের কার্ড দেওয়া হয় না। এর ফলে রোহিঙ্গাদের পক্ষে মিয়ানমারে টিকে থাকা দুরূহ হয়ে পড়ে। ১৯৯৪ সাল থেকে রোহিঙ্গা শিশুদের জন্মনিবন্ধন বন্ধ করে দেয় মিয়ানমার সরকার। পরে জাতিসংঘের উদ্বাস্তু বিষয়ক হাইকমিশনের চাপে রোহিঙ্গাদের তালিকাভুক্ত করার উদ্যোগ শুরু হয় ১৯৯৫ সালে। এ সময় রোহিঙ্গাদের দেওয়া হয় সাদা কার্ড, যেখানে জন্মস্থান এবং তারিখ লেখা হয় না। এর ফলে এই কার্ড মিয়ানমারের নাগরিকত্ব প্রমাণ করে না এবং রোহিঙ্গাদের কোনো কাজেও আসে না। কয়েক বছর পর এই কার্ডও বন্ধ করে দেয় সরকার। রোহিঙ্গাদের নাম শুধু তালিকাভুক্ত করে রাখা হয় নাসাকা বাহিনীর খাতায়।
 
নিজ গ্রামের উন্মুক্ত কারাগারে
মিয়ানমার জান্তা রোহিঙ্গাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করে না। আর তাই 'বহিরাগত' হিসেবে চিহ্নিত এসব রোহিঙ্গাকে রাখা হয়েছে কারাগারে। না, আট লাখ রোহিঙ্গাকে বন্দি করার মতো বড় কারাগার মিয়ানমার তৈরি করতে পারেনি, তাই রোহিঙ্গারা নিজ গ্রামেই বন্দি। মিয়ানমারের অন্য কোনো অঞ্চলে যাওয়ার কথা তো দূরূহ, পাশের গ্রামে যাওয়ারও কোনো অনুমতি নেই তাদের। নিজ গ্রামের বাইরে যেতে হলে তাদের সীমান্তরক্ষী বাহিনী নাসাকার কাছ থেকে ট্রাভেল পাস নিতে হয়। এই ট্রাভেল পাস নিয়েই তারা গ্রামের বাইরে যেতে পারে। কিন্তু ট্রাভেল পাস পাওয়া কঠিন বিষয়। এ জন্য নাসাকাকে দিতে হয় বড় অঙ্কের ঘুষ। তার পরও রক্ষা নেই। যদি ট্রাভেল পাসে উলি্লখিত নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিজ গ্রামে ফিরতে ব্যর্থ হয় কোনো রোহিঙ্গা, তা হলে তার নাম কাটা যায় ওই গ্রামের তালিকাভুক্তি থেকে। সে তখন নিজ গ্রাম নামের কারাগারেও অবৈধ হয়ে পড়ে। তাদের ঠাঁই হয় জান্তা সরকারের জেলখানায়।
বিয়েতে বাধা, সন্তান ধারণে নিয়ন্ত্রণ!
১৯৯০ সালে আরাকান রাজ্যে স্থানীয় আইন জারি করা হয়। আইনটিতে উত্তর আরাকানে বাস করা মুসলিম জনগোষ্ঠীর বিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এই আইন অনুযায়ী এই অঞ্চলে বাস করা রোহিঙ্গাদের বিয়ের আগে সরকারি অনুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়। এই অনুমোদনের দায়িত্বে রয়েছে সীমান্তরক্ষী বাহিনী নাসাকা। সাধারণত বিয়ের অনুমোদন পাওয়া খুবই কঠিন। সরকারি ফির পাশপাশি এ জন্য বিপুল পরিমাণ ঘুষ দিতে হয় নাসাকার লোকজনকে। তার পরও বিয়ের অনুমতি পেতে অধিকাংশ সময় বছরের পর বছর চলে যায়। এই অনুমোদন পাওয়া খুব কষ্টকর এবং প্রায় ক্ষেত্রেই অসম্ভব। তাই রোহিঙ্গাদের পক্ষে বৈধভাবে বিয়ে করার হার খুবই কম। রোহিঙ্গারা নিজ গোষ্ঠীর বাইরে বিয়ে করতে পারে না। যদিও মিয়ানমারে এ রকম কোনো রাষ্ট্রীয় আইন নেই, তবু রোহিঙ্গারা নিজেদের বাইরে স্থানীয় কারো সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়লে বিভিন্ন আইনের ফাঁকে ফেলে ১০ বছর পর্যন্ত জেল দেওয়ার নজির আছে।
২০০৫ সালে নাসাকা বাহিনী পুনর্গঠন করা হয়। এ সময় দীর্ঘদিন বিয়ে সংক্রান্ত আবেদন গ্রহণ করা বন্ধ করে দেয় নাসাকা। পরের বছর যখন আবার আবেদন গ্রহণ চালু হয়, তখন নিয়মকে করা হয় আরো কঠোর। তখন থেকে আবেদনের সঙ্গে নবদম্পতিকে মুচলেকা দিয়ে বলতে হয় যে এই দম্পতি দুইয়ের অধিক সন্তান নেবে না।
তবে দীর্ঘদিন ধরে বৈধভাবে বিয়ে করতে বাধার সম্মুখীন হওয়ায় রোহিঙ্গাদের পারিবারিক জীবন হয়ে পড়েছে অমানবিক। বিয়ের জন্য তথাকথিত অনুমোদন পাওয়ার আগেই যেসব রোহিঙ্গা মুসলিম ধর্মমতে বিয়ে করছে, তারা সন্তান নিতে পারছে না। কেউ সন্তান ধারণ করলে তাকে গোপনে গর্ভপাত করাতে হচ্ছে। তার পরও যেসব শিশুর জন্ম হচ্ছে, তাদের অন্য কোনো বৈধ দম্পতির সন্তান হিসেবে তালিকাভুক্ত করতে হচ্ছে। এমন ভুরি ভুরি নজিরও আছে, যেখানে রোহিঙ্গা দম্পতি নিজেদের সন্তানকে তাদের বাবা-মায়ের সন্তান হিসেবে তালিকাভুক্ত করাতে বাধ্য হয়েছে। অনেকেই সন্তান ধারণ করলে বাংলাদেশে চলে গেছে এবং সেখানেই বাংলাদেশে বসবাসকারী উদ্বাস্তু রোহিঙ্গাদের কাছে সন্তানকে রেখে আবার ফিরে এসেছে। চলতি সপ্তাহেও একটি পরিত্যক্ত নৌকা থেকে এ রকম এক নবজাতককে উদ্ধার করেছে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী।
 
চিকিৎসা ও শিক্ষায় সীমিত অধিকার
রোহিঙ্গাদের জন্য মিয়ানমারের নাগরিক অধিকার অনেক দূরের ব্যাপার। সরকারি চাকরি তাদের জন্য নিষিদ্ধ। উত্তর আরাকানের সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে রোহিঙ্গাদের জন্য নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্যসেবা চালু আছে। কিন্তু এসব স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রাখাইন এবং বার্মিজ নাগরিকরা স্থানীয় রাখাইন ভাষায় কথা বলার কারণে রোহিঙ্গারা সেখানে গিয়ে পূর্ণ চিকিৎসা নিতে পারে না। সরকারি বড় হাসপাতালে তাদের প্রবেশ পদ্ধতিগতভাবে নিষিদ্ধ। আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলো পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের জন্য কোনো স্বাস্থ্যসেবার উদ্যোগ নিতে পারে না। এমনকি রোহিঙ্গা মহিলাদের জরুরি ধাত্রীবিদ্যা শেখানোর উদ্যোগ নিয়েও মিয়ানমার সরকারের কাছে বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে সেবা সংস্থাগুলো।
চলাচলে নিয়ন্ত্রণ আরোপের কারণে রোহিঙ্গাদের চিকিৎসা ও শিক্ষার ক্ষেত্রে মারাত্মক বিরূপ প্রভাব পড়েছে। এমনকি অতি গুরুতর অসুস্থ রোগীকেও গ্রামের বাইরে নিয়ে যেতে হলে আগে ট্রাভেল পাসের জন্য অনুমতি নিতে হয়। এ কারণে অনেক রোহিঙ্গা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে চিকিৎসা নিতে বাংলাদেশে চলে আসে। এদের অধিকাংশই আর ফিরে যায় না।
শিক্ষার ক্ষেত্রেও রোহিঙ্গারা বৈষম্যের শিকার। ধীরে ধীরে তাদের অধিকার সংকুচিত করে ফেলেছে মিয়ানমার সরকার। রোহিঙ্গাদের মধ্যে অশিক্ষার হার ৮০ শতাংশ, যা মিয়ানমারের সাধারণ অশিক্ষার হারের দ্বিগুণ। উত্তর আরাকানের রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে এমনিতেই মাধ্যমিক স্কুলের সংখ্যা খুব কম; কিন্তু গ্রামের বাইরের সেই স্কুলগুলোতে পড়তে গেলেও ট্রাভেল পাস নিতে হয় রোহিঙ্গা শিক্ষার্থীদের। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পড়ার অনুমোদন বন্ধ করা হয় ২০০১ সালে। তখন থেকে শুধু দূরশিক্ষণ পদ্ধতিতে ঘরে বসে রোহিঙ্গারা উচ্চশিক্ষা পেতে পারত এবং পরীক্ষা দিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে পারত। ২০০৫ সাল থেকে এই নিয়মও বন্ধ করে দেয় মিয়ানমার জান্তা।
 
অপারেশন নাগামিন
বাংলাদেশে প্রথম উদ্বাস্তু ঢেউ-১৯৭৮

১৯৭৪ সালে জান্তা সরকার চালু করে ইমার্জেন্সি ইমিগ্রেশন অ্যাক্ট। এই অ্যাক্টে বলা হয়_ভারত, চীন ও বাংলাদেশ থেকে যাওয়া অবৈধ অভিবাসীদের নিয়ন্ত্রণ করাই আইনের উদ্দেশ্য। প্রত্যেক নাগরিকের জন্য নাগরিক কার্ড বহন করা বাধ্যতামূলক করা হয়। কিন্তু এ সময় কোনো রোহিঙ্গাকে নাগরিক কার্ড দেওয়া হয় না, তাদের দেওয়া হয় 'অভিবাসী কার্ড'; যে কার্ড প্রমাণ করে যে তারা মিয়ানমারের নাগরিক নয়। প্রথমদিকে এ রকম কার্ডে কোনো সমস্যা বোঝা না গেলেও, আসল সমস্যা শুরু হয় কয়েক বছর পর। ১৯৭৭ সালে সামরিক সরকার শুরু করে 'অপারেশন নাগামিন' বা 'ড্রাগন রাজ'। এই অপারেশনে অবৈধ অভিবাসীদের চিহ্নিত করার নামে রোহিঙ্গাদের ওপর ব্যাপক নির্যাতন চালায় মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও স্থানীয় রাখাইনরা। ১৯৭৮ সালের মে মাসের মধ্যে কমপক্ষে দুই লাখ রোহিঙ্গা মিয়ানমার ছেড়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়।

বাংলাদেশে উদ্বাস্তুদের দ্বিতীয় জোয়ার : ১৯৯১-৯২

আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, বাকি সব নাগরিক অধিকার সংকুচিত করে ফেললেও ১৯৯০ সালের নির্বাচনে রোহিঙ্গাদের ভোটাধিকার দেওয়া হয়। অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন, দীর্ঘদিন গণতান্ত্রিক অধিকার না থাকা মিয়ানমারে ভোট বিষয়ে সরকারের অভিজ্ঞতার অভাবই হয়তো রোহিঙ্গাদেরও ভোটার করার ভুল করে বসে সরকার। ব্রিটিশ শাসনকালে রোহিঙ্গাদের ভোটাধিকার ছিল, তাই জান্তা সরকার বিষয়টিকে আলাদাভাবে দেখেনি।
এই নির্বাচনে রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকায় অং সাং সু চির নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্র্যাসি (এনএলডি) বিজয়ী হয়। মিয়ানমারের এই নির্বাচনে এনএলডি ৪৮৫টি আসনের মধ্যে ৩৯২টি আসন পেলেও জান্তা সরকার সুচির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসে। এতে করে মিয়ানমারজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে অসন্তোষ আর বিক্ষোভ। ২১টি এথনিক গ্রুপ মিলে তৈরি হয় 'ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স অব বর্মা' যা ড্যাব নামে পরিচিতি পায়। ড্যাব ঘোষণা করে, সামরিক সরকারের হাত থেকে গণতন্ত্র ছিনিয়ে আনতে তারা সশস্ত্র যুদ্ধ শুরু করবে। রোহিঙ্গাদের দুটি সংগঠন অল বর্মা মুসলিম ইউনিয়ন এবং আরাকান রোহিঙ্গা ইসলামিক ফ্রন্টও যৌথ বিবৃতিতে জানায়, তারাও সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধে শামিল হবে।
সামরিক একনায়করা যা করে, এ ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। জনরোষকে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় পর্যবসিত করতে আক্রমণ শুরু হয় রোহিঙ্গাদের ওপর। উস্কে দেওয়া হয় স্থানীয় রাখাইনদের। একই সঙ্গে চলে সামরিক অভিযান। নির্যাতন মাত্রা ছাড়া করে রোহিঙ্গাদের আরেকবার ঠেলে দেওয়া হয় বাংলাদেশের দিকে। বড় আকারের রোহিঙ্গা শরণার্থী আগমনের দ্বিতীয় পর্যায় ঘটে এ সময়। ১৯৯১ সালের জুন মাসে বাংলাদেশ সরকার জানায়, পূর্ববর্তী ছয় মাসে অন্তত দুই লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এ সময় থাইল্যান্ড এবং বিশেষ করে মালয়েশিয়াতেও ব্যাপকসংখ্যক রোহিঙ্গার অনুপ্রবেশ ঘটে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় মালয়েশিয়া এবং বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তা কামনা করে। আন্তর্জাতিক চাপে পড়ে মিয়ানমার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে রাজি হয়। ১৯৯২ সালের ২৮ এপ্রিল মিয়ানমার এবং বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার মাধ্যমে প্রায় ৫০ হাজার রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠাতে সক্ষম হয় বাংলাদেশ। ১৯৯৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে সব বহিরাগত উদ্বাস্তুকে ফেরত নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও মিয়ানমারের অসহযোগিতায় সেটি শেষপর্যন্ত সম্ভব হয়নি। ফেরত যাওয়া রোহিঙ্গাদের একটি বড় অংশও আবার বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে।
 সতর্ক থাক বাংলাদেশ!
দায় আন্তর্জাতিক মানবগোষ্ঠীর

রোহিঙ্গা যে আমাদের জন্য মিয়ানমারের চাপিয়ে দেওয়া একটি বড় বিপদ, সে বিষয়ে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ এখনো সচেতন নয়। অধিকাংশ লোকই একে দেখছে একটি মানবিক বিপর্যয় ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হিসেবে। কিন্তু রোহিঙ্গা সমস্যা কোনো সাময়িক বিপর্যয় নয়, দীর্ঘ কয়েক যুগের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় চলে আসা এথনিক ক্লিনজিং। মিয়ানমার সরকার চায় এই প্রায় ২০ লাখ রোহিঙ্গার দায় সব সময়ের জন্য বাংলাদেশের কাঁধে চাপিয়ে দিতে। মিয়ানমারের সরকারি কর্মকর্তারা প্রায়ই প্রকাশ্যে এই রোহিঙ্গাদের অবৈধ অনুপ্রবেশকারী বাংলাদেশি হিসেবে আখ্যায়িত করে বক্তব্য দিয়ে থাকেন। এ সময় বাংলাদেশকে সতর্ক হতে হবে। শুধু ভাষা, ধর্ম কিংবা নৃতাত্তি্বক গঠনে সাদৃশ্য থাকার কারণেই মিয়ানমারের ২০ লাখ লোকের দায় বাংলাদেশ নিতে পারে না। সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকার সীমান্ত প্রহরা শিথিল না করার একটি সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছে। সরকারের উচিত হবে না বিশ্বের কোনো চাপের কাছে নতি স্বীকার করে এই অবস্থান থেকে সরে আসা। রোহিঙ্গা সমস্যার সঙ্গে বাংলাদেশ কোনোভাবেই যুক্ত হতে পারে না। ইতিমধ্যে যে বিপুল পরিমাণ রোহিঙ্গা এ দেশে অনুপ্রবেশ করেছে তাদেরও ফেরত দানের ব্যাপারে বাংলাদেশকে বড় আকারে উদ্যোগ নিতে হবে। মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে যদি এদের ফেরত দেওয়া না যায়, তাহলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এ নিয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানো প্রয়োজন। মিয়ানমার এখন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কোনো বদ্ধ দেশ নয়। গণতন্ত্রের পথে দেশটি এক পা-দুই পা করে অগ্রসর হচ্ছে। নিজেদের সভ্যদেশ হিসেবে প্রমাণ করতে হলে মিয়ানমারের উচিত দ্রুত রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান করা। একটি দেশের মধ্যে শতাব্দীর পর শতাব্দী বাস করে আসা বড় একটি জনগোষ্ঠী নাগরিকত্ববিহীন থাকতে পারে না। পৃথিবীর সব মানুষেরই একটি দেশ পাওয়া জন্মগত অধিকার, মিয়ানমারের সেনাশাসকরা গায়ের জোরে সেই অধিকার অস্বীকার করবেন, সেটি চলতে পারে না। রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব যদি দেওয়া না যায়, তা হলে আগামী দিনের ইতিহাসে একালের বিশ্ব নেতৃত্বকে প্রশ্নের মুখেই পড়তে হবে।

         

Sunday, June 10, 2012

কৌশলগত অংশীদারিত্ব চুক্তির প্রতিক্রিয়া


যুক্তরাষ্ট্রের সেক্রেটারি অব স্টেট হিলারি ক্লিনটন Foreign Policy পত্রিকায় এক মন্তব্যে বলেছেন, 'ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সম্পর্ক নিশ্চিত' ('The US is making a strategic bet on India�s future')। তিনি আরও বলেন, 'এখনো কিছু সমস্যা রয়েছে যা দূর করতে হবে; কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক স্থাপনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, কেননা আমরা বিশ্বাস করি, বিশ্বের রঙ্গমঞ্চে ভারতের আরও সক্রিয় ভূমিকা বিশ্বে শান্তি ও নিরাপত্তা বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে।' তার কথায়, 'ওবামা প্রশাসনের দূরদৃষ্টি (Vision) হলো- ভারতের নেতৃত্বে এবং ভারতকে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিকভাবে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াকে ঐক্যবদ্ধকরণ এবং রাজনৈতিকভাবে আরও স্থিতিশীলকরণ (�Obama administration�s vision for a more economically integrated and politically stable South and Central Asia with India as a linchpin�)। কিছুদিন আগ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ এশিয়াকে দেখেছে ভারত ও পাকিস্তানকে ব্র্যাকেট করে। বর্তমানে ভারতের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং চীনের অভাবনীয় উত্থান বুশ প্রশাসনকে প্রণোদনা জুগিয়েছে ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সিভিল এবং পারমাণবিক ক্ষেত্রে সহযোগিতা প্রতিষ্ঠার। ২০১০ সালে ওবামার ভারত সফরকালে তা আরও শক্তিশালী হয়। এমনকি ওবামা জাতিসংঘে একটি স্থায়ী আসনে ভারতকে নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে যান। এভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতর হয়ে উঠেছে। US-India গ্রুপের মাধ্যমে উভয়ের মধ্যে নিয়মিত আলোচনার সূত্রপাত হয়েছে। তা ছাড়াও ভারতকে Asia Pacific আঞ্চলিক কার্যক্রমের সঙ্গেও সংশ্লিষ্ট করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ভারত বোয়িং C-17 গ্লোবমাস্টারও লাভ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে। এসব ঘটছে চীন যেভাবে দৈত্যের মতো লম্বা লম্বা পা ফেলে এগিয়ে আসছে সে প্রেক্ষাপটে। বর্তমানে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে চীনের অবস্থান বিশ্বে শীর্ষস্থানীয়। অর্থনীতি শক্তিশালী হলে সামরিক পেশিও স্ফীত হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্র তা ভালো করে জানে। তাই আগেভাগে চীনকে সংযত রাখতে (Contain) যুক্তরাষ্ট্র, এমন সব ব্যবস্থা গ্রহণ করছে যেন চীন বিশ্বের একমাত্র পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রকে স্থানচ্যুত করে তেমন অবস্থানে অত সহজে যেতে না পারে।

ভারতের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের এ আস্থার মূলে কাজ করছে দক্ষিণ এশিয়া, মধ্য এশিয়া ও এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রায় কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থিত ভারত। ভারত মস্ত বড়ও। দক্ষিণ এশিয়ার কেন্দ্রে অবস্থিত ভারতের জনসংখ্যাও বিরাট। প্রায় ১১০ কোটির মতো। দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থার (SAARC) অন্য সাত সদস্য দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় তিনগুণ। বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা এবং মালদ্বীপের মোট জনসংখ্যা প্রায় ২২ কোটি। পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে বসবাস করেন প্রায় ১৯ কোটি জনগণ। ভারত জনসংখ্যার নিরিখেই শুধু যে বিরাট তা নয়, সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার মোট উৎপাদনের (GDP) প্রায় ৮০ ভাগ ভারতের। বিশ্বব্যাংকের মতে, দক্ষিণ এশিয়া হলো বিশ্বের সবচেয়ে অসংহত (least integrated) অঞ্চল। ফলে এ অঞ্চলকে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে কাজে লাগানোও সহজ। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, এ অঞ্চলে আন্তঃদেশীয় বাণিজ্যের পরিমাণ GDP-এর শতকরা ২ ভাগের মতো, অথচ একটু পূর্বে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এ পরিমাণ শতকরা ২০ ভাগ।
যুক্তরাষ্ট্র মস্তবড় বটে এবং এর অস্ত্রসজ্জাও সুনিপুণ। কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক যে তত্ত্বটি 'String of Pearls (মুক্তার মালা) নামে খ্যাত সে সম্পর্কে তেমন ভেবেছে বলে মনে হয় না। বলছি এ জন্য যে, ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অংশীদারিত্বের প্রধান দুর্বলতা হলো সংকটকালে চীন ছোট ছোট রাষ্ট্রের মুক্তার মালায় ভারতকে পরিবেষ্টিত করে ফেলতে পারে। ইচ্ছা করলে চীন তার অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সামরিক সহায়তার মাধ্যমে ভারত মহাসাগরের উপকণ্ঠে অবস্থিত মিয়ানমার, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কায় নৌঘাঁটি গড়ে তুলতে পারে। চীন ওই পথে অগ্রসর হচ্ছে তার কিছু নমুনাও দেখা যায়। ২০১১ সালে মালদ্বীপে অনুষ্ঠিত সার্ক (SAARC) শীর্ষ সম্মেলনের আগে চীন মালদ্বীপে দূতাবাস নির্মাণের ব্যবস্থা করে। তা ছাড়া এ শীর্ষ সম্মেলনে চীন সার্কের অন্যতম Dialogue Partner-এর মর্যাদা পাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে এবং আসিয়ানের ASEAN+। এর মতো SAARC+ পর্যায়ের মর্যাদা পেতে ইচ্ছা প্রকাশ করে। এরই মধ্যে চীন শ্রীলঙ্কার জন্য এক সমুদ্র বন্দর তৈরি করেছে। বাংলাদেশেও চীন এক সমুদ্র বন্দর নির্মাণের আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এমনকি ভূমি পরিবেষ্টিত নেপালের সঙ্গেও অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে আগ্রহী চীন। এ লক্ষ্যে চীনের প্রধানমন্ত্রী ওয়েন জিয়াবাও (Wen Jiabau) ২০১১ সালে নেপাল সফর করে। উত্তর-পশ্চিমে পাকিস্তানের সঙ্গে চীনের সুসম্পর্ক বিদ্যমান রয়েছে। অবশ্য মাত্র ক'দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সেক্রেটারি অব স্টেট হিলারি ক্লিনটন ৫ জুন বাংলাদেশ সফর করে গেলেন এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে যৌথ অংশীদারিত্বের একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ে বছরে একবার সংলাপ হবে যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের কর্মকর্তাদের সঙ্গে। এর প্রাতিষ্ঠানিক রূপটা তৈরি হলো। বাংলাদেশের পূর্বে অবস্থিত মিয়ানমারে গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে যে পরিবর্তনের সুবাতাস বইছে যুক্তরাষ্ট্র অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে তা লক্ষ্য করছে এবং এও লক্ষ্য করছে নতুন মিয়ানমারে চীনের প্রভাব কতটুকু বিদ্যমান থাকবে। বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অংশীদারিত্বের চুক্তিটি অনেকের চোখে নির্দোষ (Innocusous) মনে হতে পারে। আমার মনে হয়েছে, ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের যে কৌশলগত চুক্তি বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের তেমনি চুক্তির অগ্রদূত এটি। এরপর TIFA (Trade and Investment Framework Agreement)-এর Precusor স্বরূপ। 'সমুদ্র বিজয়ের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে উষ্ণ সংবর্ধনা দেওয়া হলো। কিন্তু কেউ দেখলেন না যে, বাংলাদেশের একটি ইউনিয়ন সেন্টমার্টিনকে বাংলাদেশের ভূখণ্ডের বাইরে রাখা হয়েছে ওই রায়ে। বাংলাদেশের নৌবাহিনীর একটি আস্তানা এটি। এ আস্তানাকে শক্তিশালী করার অজুহাতে TIFA অথবা TICFA চুক্তি স্বাক্ষর হলে যুক্তরাষ্ট্রের Marine-দের ঘাঁটিতে পরিণত হতে পারে এটি। এমনই একটি কথা এ অঞ্চলে খুব জনপ্রিয় বিশেষ করে পাকিস্তানে। যুক্তরাষ্ট্র যার বন্ধু, তার ধ্বংসের জন্য অন্য কোনো শত্রুর প্রয়োজন হয় না। আফগানিস্তান থেকে এত শক্তিসামর্থ্য নিয়েও যুক্তরাষ্ট্রকে ফিরে যেতে হচ্ছে ২০১৪ সাল নাগাদ খালি হাতে। উত্তর-পশ্চিমে ব্যর্থ হয়ে উত্তর-পূর্বে যেন ব্যর্থ হতে না হয় তার জন্য যুক্তরাষ্ট্র সব অলিগলি বন্ধ করেই নামছে এ উদ্যোগে। অথচ ভারত মহাসাগরকে চীনমুক্ত রাখতে বদ্ধপরিকর। তার ব্যবসা-বাণিজ্য তথা আমদানি-রপ্তানির জন্য ভারত মহাসাগরে চীনের আধিপত্য জরুরি। চীন এ সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন। সচেতন দক্ষিণ এশিয়ার ছোট ছোট রাষ্ট্রগুলোও। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের কৌশলগত অংশীদারিত্ব ভারতকে তার ছোট ছোট প্রতিবেশী সম্পর্কে আরও আগ্রাসী, আরও উগ্র করে তুলতে পারে_ এ আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন কেউ কেউ। শ্রীলঙ্কার গবেষক Shelton Kodikara লিখেছেন : A perception of threat from India is currently common to all its neighbours and it is one of the dilemmas of South Asian Politics that while India perceives its neighbours as being integral to its own security the neighbours perceive India itself as the entity against which security is necessary.

তার কথায়, ভারতভীতি রয়েছে তার প্রত্যেক প্রতিবেশীর মনে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম উভয় সংকট হলো ভারত তার প্রত্যেক প্রতিবেশীকে মনে করে তার নিজস্ব নিরাপত্তার জন্য অবিচ্ছেদ্য অংশ রূপে। কিন্তু তার প্রতিবেশীরা ভারতকে মনে করে এমন এক জনপদ যা তাদের নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ।

দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের কোনো প্রতিবেশী ভারতের আগ্রাসী থাবা থেকে নিরাপদ নয়। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে ছোট্ট লুক্সেমবার্গ যেমন নিরাপদ, নিকটবর্তী আসিয়ানে (ASEAN) ছোট্ট সিঙ্গাপুর যেমন নিরাপদ তেমনি নিরাপদ নয় শ্রীলঙ্কা ও নেপাল। পাকিস্তান তো জন্মলগ্ন থেকেই ভারতের সঙ্গে লড়াই করে টিকে রয়েছে। বাংলাদেশ এবং ভারতের মধ্যে যেসব চুক্তি হয়েছিল ১৯৭৪ সালে তার অনেকগুলোই বাস্তবায়িত হয়নি আজ পর্যন্ত। গঙ্গার মতো আন্তর্জাতিক নদীর ওপর ফারাক্কায় বাঁধ দিয়ে প্রমত্তা পদ্মাকে একটি ছোট্ট খালে পরিণত করা হয়েছে। তিস্তা নদীর পানিবণ্টন চুক্তি এখনো হয়নি। ফারাক্কা যেমন বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে মরুকরণের সূচনা করেছে, টিপাইমুখ বাঁধ তৈরি হলে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সুরমা এবং কুশিয়ারা নদীকে খালে পরিণত করবে এবং মেঘনা পর্যন্ত ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ১৯৯৩ সালে গঠিত Alliance for a Secular and Democratic South Asia যুক্তরাষ্ট্রের MIT বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত সংস্থার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে ভারতের River Linking Project বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ এশিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অপ্রতিরোধ্য ক্ষতিসাধিত হবে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের কৌশলগত অংশীদারিত্বের ফলে ভারত চীনের বিরুদ্ধে কতটুকু প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারবে তা ভবিষ্যতে দেখা যাবে। কিন্তু এ কৌশলগত অংশীদারিত্বের ফলে ছোট ছোট প্রতিবেশীর প্রতি ভারতের মোড়লি বৃদ্ধি পাবে শতগুণ। যুক্তরাষ্ট্র এসব দেশের সমস্যাকে ভারতের চোখ দিয়ে (Through Indian Prism) দেখে থাকে, কিন্তু দুই-এর সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হলে ভারতের প্রতিবেশীরা ভারতের আজ্ঞাবহ হতে বাধ্য হবে। এমনকি সুযোগ পেলে কোনো কোনোটি চীনের সঙ্গে হাত মিলিয়ে আত্দরক্ষা করবে। তাই বলি, এ প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র শুধু ভারতের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারিত্বের মধ্যে না গিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার আটটি রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বের হাত বাড়ালে ভালো করবে। কেননা, কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে যেমন শ্রীলঙ্কা, তেমনি বাংলাদেশ এবং নেপাল ও পাকিস্তান। এক্ষেত্রে বন্ধুত্ব বলতে বুঝিয়েছি সমস্বার্থের ভিত্তিতে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা। এর বিকল্প নেই। ভারতকে দক্ষিণ এশিয়া বা মধ্য এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সংহতির Linchpin করা সম্ভব দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা এবং দীর্ঘদিনব্যাপী সব প্রতিবেশীর সঙ্গে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পরেই। SAARC-এর নেতৃস্থানীয় হিসেবে দক্ষিণ এশিয়ার সার্বিক অগ্রগতির পথ প্রশস্ত হওয়ার পরেই যুক্তরাষ্ট্র যদি শুধু বৃহত্তর ভারতের সঙ্গেই কৌশলগত অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠার উদ্যোগে ব্যস্ত থাকে তাহলে ভারতের চারপাশে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের মালা শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, ভারতেরও গলার কাঁটা হয়ে উঠতে পারে- যদি ভারত তার প্রতিবেশীদের সঙ্গে সমতাভিত্তিক সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে সক্ষম না হয়। বিশেষ করে সার্কের অভ্যন্তরে নদীর ব্যবস্থাপনায় অথবা সন্ত্রাস দমনে ভারত তার দ্বিপক্ষীয় নীতি পরিত্যাগ করে সবাই মিলে সমস্যা সমাধানে আগ্রহী না হলে।

Wednesday, June 6, 2012

সংসদের অবমাননা আসলে কে করেছেন?


ডেপুটি স্পিকার কর্নেল (অব.) শওকত আলী অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদকে নিয়ে সংসদে আলোচনা ঠিক হয়নি বলে অভিমত দিয়েছেন। তবে সেটা বলা হয়েছে সংসদের বাইরে। সংসদে ৩ জুন যারা আলোচনা করেছেন তারা এ ধরনের মন্তব্য করার আগে একটু কি খতিয়ে দেখতে পারতেন না যে তিনি কী বলেছেন? এ কাজ কি যোগাযোগের আধুুনিক তথ্যপ্রযুক্তি যাদের হাতে তাদের জন্য কঠিন কিছু ছিল? উগ্র আবেগের বশে কিংবা ক্ষোভের বশবর্তী হয়ে তারা যা বলেছেন তাতেই তো সংসদকে খাটো করা হয়েছে

ক্ষমতাসীনদের আচরণ ও উচ্চারণে কার্যকর গণতন্ত্র-পরমতসহিষ্ণুতার প্রচণ্ড অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে, এ অভিমতের বিষয়ে বোধকরি অনেকেই সহমত পোষণ করবেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে ৪১ বছর হয়ে গেল। এ সময়ের পর্যালোচনায় গেলে দেখা যাবে, আমরা গণতন্ত্র পেয়েছি অনেক সংগ্রাম ও ত্যাগের বিনিময়ে; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে যা পেয়েছি তা হচ্ছে নির্বাচন। বলা যায়, ভোটের অধিকার পেয়েছি। বারবার এর প্রয়োগ হচ্ছে। আমরা এই নির্বাচনকেই মনে করছি গণতন্ত্র_ নির্বাচিত সরকার থাকা মানেই গণতন্ত্র থাকা। এ ভূমিকা এ কারণে দেওয়া যে এ বিষয়টি স্পষ্ট না থাকলে পরবর্তী যে সংকট_ গণতন্ত্রের যে সংকট সেটা ঠিকভাবে বোঝা যাবে না। স্বাধীন দেশের একেবারে যাত্রা থেকেই যারা ক্ষমতায় ছিলেন বা রয়েছেন, পরমতের প্রতি তাদের সহিষ্ণু মনোভাবের বড়ই অভাব দেখছি। যার জন্য স্বাধীনতা অর্জনের চার বছর যেতে না যেতেই বঙ্গবন্ধুকে সারাজীবনের লালিত স্বপ্ন ও সংগ্রামের অর্জন সংসদীয় গণতন্ত্র ভেঙে একদলীয় শাসন ব্যবস্থায় যেতে হয়েছে। সেই একদলীয় ব্যবস্থা থেকে আবার আমাদের উত্তরণ ঘটেছে বহুদলীয় ব্যবস্থায়। তবে এটা গণতান্ত্রিকভাবে ঘটেনি, বরং হয়েছে সঙ্গিনের খোঁচায়। তাতে একদলীয় ব্যবস্থা বিদায় নিয়েছে, কিন্তু এক ব্যক্তির শাসন_ রাষ্ট্রপতির শাসনে পরিবর্তন হয়নি।
এই যে এত বড় পরিবর্তন, যা অভিহিত হয় ঐতিহাসিক হিসেবে, তার পেছনে কতটা রাজনীতি-সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি, সব মিলিয়ে আমাদের কী ভুল ছিল, কতটা ভুল ছিল, ভুল হয়ে থাকলে কেন হয়েছিল, শুদ্ধ হওয়ার প্রক্রিয়া সঠিক ছিল কি-না_ এসব মূল্যায়িত হওয়া তো দূরের কথা, এমনকি তা নিয়ে মুক্তমনে আলোচনাও হয়নি। আমি বলতে চাইছি, মত ও পথের ভিন্নতা এবং তার মিথস্ক্রিয়া, যা দিয়ে গণতন্ত্র নির্মিত হয়_ সেটা বাংলাদেশে কখনও হয়নি। গণতন্ত্র কেবলই একটি শাসনব্যবস্থা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মূল্যবোধ এবং নীতি ও নৈতিকতা। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার নিজস্ব সংস্কৃতি রয়েছে, কিন্তু সেই সংস্কৃতির বিষয়ে এভাবে আমরা কখনও চর্চা করিনি। দিনে দিনে রাজনীতিতে তাই পরমতসহিষ্ণুতার বদলে অসহিষ্ণুতা প্রকট। ভিন্নমতকে যে কোনো প্রকারে পরাস্ত করার প্রবণতা দেখা দিয়েছে এবং যা শেষ পর্যন্ত সাংস্কৃতিক রূপ নিয়েছে। আমরা এত অধৈর্য হয়ে পড়েছি যে সংবাদপত্র কিংবা বেতার-টেলিভিশনের যে স্বাধীনতার কথা মুখে বলছি, তার মানে কী তা বুঝতে পারছি না কিংবা সে চেষ্টাও করছি না। সংবাদপত্র-টেলিভিশনের মতো গণমাধ্যমে যা কিছু ভিন্নমত প্রকাশ করা হচ্ছে তার প্রতিও আমরা রুষ্ট হয়ে পড়ছি।
সংসদীয় ব্যবস্থায় গণতন্ত্রের বিমূর্ত, ব্যক্তিকৃত যে রূপ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী_ তিনি পর্যন্ত অসহিষ্ণু হয়ে পড়েছেন। ইতিপূর্বে তিনি দু'একবার বক্তৃতায় টেলিভিশন টক শো যারা করেন তাদের কঠোর সমালোচনা করেছেন এই বলে যে, তারা গভীর রাতে ছোট বাক্সে নিজেদের পাণ্ডিত্য দেখান, কিন্তু কোথাও জনগণের মতামত যাচাই করার ক্ষমতা রাখেন না। কোনো এলাকায় ভোটে দাঁড়ালে তাদের জামানত থাকবে না। তিনি এমনকি কোথাও কোথাও তাদের এক-এগারোর সমর্থক হিসেবেও চিহ্নিত করেছেন। কী অবাক ব্যাপার। দেশের ১৬ কোটি মানুষ তো ভোটে দাঁড়াবে না। তাদের সবাই নির্বাচনে দাঁড়ানোর কথা ভাবেও না। তার মানে কি এই যে, তারা গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক পদ্ধতি, সরকার, বিরোধী দল, রাজনীতি_ এসব নিয়ে কথা বলতে পারবে না? আর ভোটে জয়ী হওয়াই কি সব? পৃথিবীর যত বড় বিজ্ঞানী কিংবা কবি-সাহিত্যিক-সাংবাদিক, তারা ক'জন ভোটে দাঁড়িয়েছেন? বিজ্ঞানীদের যে আবিষ্কার, যা মানবজাতিকে আলোকিত করে চলেছে সেসব কি ভোটে দেওয়ার প্রশ্ন আসে? পৃথিবী যে সূর্যের চারদিকে ঘোরে সেটা যদি বাংলাদেশ বা অন্যত্র জনতার ভোটে ফেল করে তাহলে কি মিথ্যা হয়ে যাবে? আমি বলতে চাইছি, সত্য কখনও সংখ্যালঘিষ্ঠ বা সংখ্যাগরিষ্ঠের ওপর নির্ভর করে না। জ্ঞানচর্চার সঙ্গে ভোটের কোনো সম্পর্ক নেই।
প্রধানমন্ত্রী চার-পাঁচ দিন আগেও যারা টক শো করেন তাদের আরেক হাত নিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এরা সরকারের অর্জনের কথা বলে না। কেবল সমালোচনা করে। মিথ্যা প্রচার করে। তিনি এবং তার সরকার গ্রামের দরিদ্রদের জন্য, বঞ্চিত মানুষের জন্য কাজ করে চলেছেন। তাদের কিছু দেওয়ার চেষ্টা করছেন। এই 'টক শো'ওয়ালারা কিছু পায় না, তাই যত রাগ। এ জন্যই সরকারের বিরুদ্ধাচরণ করে। আবার কিন্তু সেই ধৈর্য পরীক্ষার প্রশ্ন এসে যায়। টক শোতে যারা যান তারা সাধারণত তাদের দায়িত্ববোধ থেকে কথা বলেন। একটা রেওয়াজ আমরা দেখেছি_ এ ধরনের অনুষ্ঠানের অতিথি হিসেবে একজন সরকারি দল এবং একজন বিরোধী দলের নেতা বা বুদ্ধিজীবী থাকবেন। আজকাল সে রেওয়াজ মানা যাচ্ছে না। কারণ সরকারি দলের লোকজন টেলিভিশনে টক শোতে আসতে তেমন আগ্রহ দেখান না। আমার কথা হলো, সরকার দুটি কাজ করতে পারে। এক. এ পর্যন্ত টক শোতে আলোচনায় কী কী মিথ্যাচার হয়েছে তা উল্লেখ করে তার সত্যায়িত বিবরণ গণমাধ্যমে প্রকাশ করা। দুই. সরকারি দলের নেতারা টেলিভিশন টক শোতে আরও বেশি করে আসবেন এবং নিজেদের কথা বলবেন। প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখি, আমার পরিচালনায় উপস্থিত দু'জন অতিথি চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলেছেন, তারা কোনোদিন সরকারি কোনো বিশেষ সুবিধা নেননি। এটা তারা চাননি এবং চাইবেনও না। সরকার এ ধরনের বিশেষ কী কী সুবিধা, অনুকম্পা, টক শোর অতিথিদের দিয়েছে এবং পরে যা প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে ক্ষেপেছে, তার কোনো বিবরণ দিতে পারবে কি?
এতসব কথা এসে গেল কেবল একটি কথা বলার উপক্রমণিকা হিসেবে। ৩ জুন জাতীয় সংসদে অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের একটি বক্তব্যের ওপর একটি ঝড় বয়ে গেছে। ভয়ানকভাবে ক্ষিপ্ত একজন সাবেক মন্ত্রী, একাধিক সিনিয়র সংসদ সদস্য এবং তখন সংসদের স্পিকারের দায়িত্ব পালনরত আলী আশরাফ এ বক্তব্যকে কেন্দ্র করে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তারা বলতে চেয়েছেন, টিআইবির আলোচনায় বক্তব্যের মাধ্যমে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ ভোটারদের অবমাননা করেছেন।
গড়পড়তা সংসদ সদস্যদের চোর-ডাকাত বলা নিশ্চয়ই ঠিক নয়। কিন্তু ভোটে জিতে কোনো কোনো সাংসদ কি চুরি-ডাকাতি করতে পারেন না? এটা ঘটলে তাদের চোর বলা হলে কি ভোটারদের অপমান করা হবে? কোনো কোনো সংসদ সদস্য সেখানেই থেমে থাকেননি। তারা এ বক্তব্যকে গণতন্ত্র ও সংসদের ওপর আঘাত হিসেবে অভিহিত করেছেন। তারা এমনও বলেছেন, যেসব বুদ্ধিজীবী সরকারের সমালোচনা করেন তাদের আয়ের উৎস কী তা খতিয়ে দেখুন। এক-এগারোতে তারা কী করেছেন, তা আমাদের জানা আছে। একজন শিক্ষক এত দামি গাড়িতে কী করে চড়েন? নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় থাকলে তাদের মাথা খারাপ হয়ে যায়। অনির্বাচিত সরকার থাকলে তারা পদ পান। স্পিকারের দায়িত্ব পালনকারী আলী আশরাফ সংসদের এ বক্তব্যকে যথার্থ মনে করেন। তিনি বলেন, গণতন্ত্রের আকাশে কালো মেঘ দেখা যাচ্ছে। সংসদ অবমাননার মাধ্যমে দেশের জনগণ ও সংবিধানের অবমাননা করা হচ্ছে। এতে সাংসদদের বিশেষ অধিকার ক্ষুণ্ন হয়েছে। সে জন্য আবদুল্লাহ আবু সায়ীদকে বিশেষ অধিকার কমিটির মাধ্যমে নোটিশ করে আমরা এ সংসদে তলব করতে পারি। একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। তাকে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে হবে। সংসদের অবমাননা করার অধিকার কারও নেই।
পাঠক, যদি অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ ঢালাওভাবে সাংসদদের চোর-ডাকাত বলতেন তাহলে নিশ্চয়ই তার বিরোধিতা করতাম। আলোকিত মানুষ সৃষ্টিতে অবদান রাখার জন্য নিশ্চয়ই তাকে শ্রদ্ধা করি। কিন্তু শ্রদ্ধা করি বলেই কারও চরিত্রহনন কিংবা চৌদ্দপুরুষ উদ্ধার করে গালাগাল করতে পারেন না। কিন্তু এ ক্ষেত্রে বাস্তবে ঘটনাটা কী?
সমকাল ও প্রথম আলোতে সংসদে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের বক্তব্য নিয়ে যেদিন আলোচনা হয়েছে সেদিনই এ দুটি পত্রিকার প্রতিবেদকরা তার সঙ্গে কথা বলেছেন। তিনি তাদের জানান, দুর্নীতি কী তা বোঝাতে গিয়ে টিআইবির আলোচনায় বলেছেন, চোর যে চুরি করে, ডাকাত যে ডাকাতি করে সেটা কি দুর্নীতি? আমার ধারণা, এটা দুর্নীতি নয়। কারণ তাদের কোনো নীতিই নেই। সুতরাং দুর্নীতি সেই মানুষটি করে যার নীতি আছে। একটা উদাহরণ দিই। যদি একজন মন্ত্রী এই বলে শপথ নেন যে তিনি শত্রু-মিত্র ভেদাভেদ না করে সবার প্রতি সমান বিচার করবেন কিন্তু পরে সেটি না করেন, সেটা হবে দুর্নীতি।
তিনি বলেন, আলোচনায় সাংসদ শব্দ পর্যন্ত উচ্চারণ করেননি।
এরপর সংসদ কী বলবে? ডেপুটি স্পিকার কর্নেল (অব.) শওকত আলী অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদকে নিয়ে সংসদে আলোচনা ঠিক হয়নি বলে অভিমত দিয়েছেন। তবে সেটা বলা হয়েছে সংসদের বাইরে। সংসদে ৩ জুন যারা আলোচনা করেছেন তারা এ ধরনের মন্তব্য করার আগে একটু কি খতিয়ে দেখতে পারতেন না যে তিনি কী বলেছেন? এ কাজ কি যোগাযোগের আধুুনিক তথ্যপ্রযুক্তি যাদের হাতে তাদের জন্য কঠিন কিছু ছিল? উগ্র আবেগের বশে কিংবা ক্ষোভের বশবর্তী হয়ে তারা যা বলেছেন তাতেই তো সংসদকে খাটো করা হয়েছে।

Tuesday, June 5, 2012

বাংলাদেশকে ঘিরে বিশ্ব সংস্থা ও মিডিয়ায় একের পর এক রিপোর্ট


বাংলাদেশের বর্তমান মহাজোট সরকাররের কর্মকা- ও ভুমিকা নিয়ে বিশ্বের প্রভাবশালী মানবাধিকার সংস্থাসমূহ ও শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমগুলোতে একের পর এক রিপোর্ট প্রকাশিত হচ্ছে। এর ফলে বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের ভাবমর্যাদা বিপুলভাবে ক্ষুণœ হলেও তার পরিশোধনে সরকারের কোন মাথাব্যথা নেই বলে অভিযোগ উঠেছে পর্যবেক্ষক মহলে।
বাংলাদেশের মানবাধিকার, বিচারব্যবস্থা, আইন-শৃঙ্খলা, রাজনৈতিক পরিস্থিতি প্রভৃতি বিষয়ে সাম্প্রতিক সময়ে এসব রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়াও প্রভাবশালী দেশের পার্লামেন্ট ও ফোরামেও সরকারের বিভিন্ন কার্যকলাপের কঠোর সমালোচনা করা হয়েছে। তবে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগের কোন কোনটি অস্বীকার করা হয়েছে। গত সপ্তাহে সর্বাধিক আলোচিত রিপোর্ট ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বাংলাদেশ সম্পর্কিত ‘মানবাধিকার রিপোর্ট, এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের রিপোর্ট, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এর বিবৃতি, বৃটিশ পার্লামেন্টের বক্তব্য, প্রভাবশালী পত্রিকা ইকোনমিস্ট ও দি হিন্দুর প্রতিবেদন, বিবিসি ও আল-জাজিরার রিপোর্ট প্রভৃতি। গত ২৪ মে প্রকাশিত হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বাংলাদেশ সম্পর্কিত ‘মানবাধিকার রিপোর্ট। এতে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির তীব্র সমালোচনা করে যুক্তরাষ্ট্র। এতে বলা হয়েছে, নিখোঁজ, নিরাপত্তা হেফাজতে মৃত্যু, খেয়ালখুশিমতো গ্রেফতার ও আটক রাখার জন্য দায়ী নিরাপত্তা বাহিনী। তারা মানবাধিকারের বড় সমস্যা। বিচার বিভাগকে অতিমাত্রায় রাজনীতিকরণ করা হয়েছে।

এতে সমস্যা বেড়েছে। বিরোধী দলের সদস্যদের ন্যায় বিচার পাওয়ার পথকে সঙ্কুচিত করা হয়েছে। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে সীমিত করেছে সরকার। নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা সাংবাদিকদের হয়রানি করছে। ২০১১ সালের ওপর করা এই রিপোর্টে বাংলাদেশ চ্যাপ্টারে বলা হয়েছে, সরকার সমাবেশ করার স্বাধীনতাকে খর্ব করেছে। এছাড়া রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপূর্ণ সহিংসতা সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সরকারি পর্যায়ে দুর্নীতি মারাত্মক এক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে মোটা দাগে বক্তব্য দেয়া হয়েছে রিপোর্টে। সরকারি কার্যক্রমের অনিয়ম-দুর্নীতি বিষয়ে বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে দুর্নীতিবিরোধী আইন ও বিধিবিধান থাকলেও সরকার তার যথাযথ প্রয়োগ করে না। সরকারি কর্মকর্তাদের অনেকেই দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। এখানে দুর্নীতি করলেও শান্তি হয় না। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)কে ‘দন্তহীন বাঘ আখ্যা দিয়েছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, ‘২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার আগে শাসক দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির যেসব মামলা হয়েছিল কোন আইন কানুনের তোয়াক্কা না করে নির্বাহী আদেশের বলে তা প্রত্যাহার করা হয়েছে। অথচ খালেদা জিয়া কিংবা বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা খুব কম মামলাই প্রত্যাহার করা হয়েছে।

এসময়ের আরেকটি চাঞ্চল্যকর রিপোর্ট প্রকাশ করে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। তারা অভিযোগ করে, বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধের বিচারে গঠিত আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল পুরোপুরি আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করছে না। এ্যামনেস্টি ২০১১ সালের বিশ্বের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে তাদের বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে গত ২৪ মে। সেখানে বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে গঠিত ট্রাইব্যুনাল নিয়ে একটি অধ্যায় রয়েছে। এতে বলা হয়েছে, শুরুতে এই বিচার প্রক্রিয়ায় অনেক ত্রুটি ছিল, তার কিছু কিছু সংশোধন করা হলেও এখনও অনেক সমস্যা রয়ে গেছে এবং এই ট্রাইব্যুনাল পুরোপুরি আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করতে পারছে না।  প্রতিবেদনটির ‘বাংলাদেশ অধ্যায় নিয়ে এ্যামনেস্টির বাংলাদেশ গবেষক আববাস ফয়েজ বলেন, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এখনো আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত হতে পারেনি বলেই তারা মনে করেন। তারা আরো বলেন, ট্রাইব্যুনালে আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করতে হলে এজন্যে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশাপাশি যাদের বিচার করা হচ্ছে, তাদের মানবাধিকার ও ন্যায় বিচারের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে। যাদের বিচার চলছে তারা যাতে আত্মপক্ষ সমর্থন করতে পারেন বা তারা যেন নির্যাতনের শিকার না হন, সেটি নিশ্চিত করাও জরুরি। ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তকে সে দেশের অন্য কোন আদালতে চ্যালেঞ্জ করা যাবে না, এটি মানবাধিকারের জন্য একটি বড় সমস্যা বলে তিনি অভিহিত করেন। এতে বিচার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় রাখার এবং অভিযুক্তদের জামিন পাওয়ার অধিকারের বিষয়টিও তোলা হয়। আরো উল্লেখ করা হয়, এখানে এমন কিছু বিষয় রয়েছে যা আসলে ঠিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের সাথে খাপ খায় না। বলা হয়, ‘আমরা কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি যে এসব ক্ষেত্রে আমরা মোটেই সন্তুষ্ট নই। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিচার প্রক্রিয়া এ্যামনেস্টি সতর্কতার সাথে পর্যবেক্ষণ করছে বলেও জানানো হয়।

এর আগে গত ২৭ এপ্রিল মানবাধিকার সংস্থা এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এক বিবৃতিতে বলে, তারা বাংলাদেশে মানুষ ‘গুম হওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে পর্যবেক্ষণ করছে। তারা সিলেটের দুজন ছাত্রদল নেতা, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রশিবিরের দুজন নেতা, ট্রেড ইউনিয়ন নেতা আমিনুল ইসলাম এবং বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করে। তাদের অনুসন্ধান শেষে দেয়া বিবৃতিতে বলা হয়, ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছে, গুম হওয়া ব্যক্তিদের অধিকাংশের ক্ষেত্রেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাদা পোশাকধারী সদস্যরা তুলে নিয়ে গেছে। তাদের পায়ে বুট পরা থাকায় ধারণা করা হয় তারা সবাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য। আর তাদের চুলও ছোট করে ছাঁটা। ইলিয়াস আলীর গুম হওয়ার পর পুলিশকে তদন্ত করতে বলার পর আবার একে ‘নাটক বলে মন্তব্য করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কড়া সমালোচনা করে এ্যামনেস্টি।

প্রায় একই সময়ে যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী পত্রিকা দি ইকোনমিস্ট প্রকাশ করে তাদের একটি মন্তব্য প্রতিবেদনে। এতে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের কঠোর সমালোচনা করা হয়। এতে সরাসরি বলা হয়, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে বিপজ্জনক পথে নিয়ে যাচ্ছেন। গত ২৫ মে পত্রিকাটির অনলাইন সংস্করণে রাজনৈতিক উত্তেজনা, দুর্নীতি, খুন, অপহরণ ইত্যাদি বিষয় তুলে দুটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। একটির শিরোনাম ছিল ‘বাংলাদেশস টক্সিক পলিটিকস : ইট ইজ আপ টু ইন্ডিয়া টু ট্রাই টু স্টপ শেখ হাসিনা রুইনিং বাংলাদেশ। অপরটির শিরোনাম ছিল ‘পলিটিকস ইন বাংলাদেশ : দ্য প্রাইম মিনিস্টার সেটস দ্য কান্ট্রি অন এ ডেঞ্জারাস পাথ। এই প্রতিবেদনে গুরুত্ব দিয়ে বলা হয়, ‘পরবর্তী নির্বাচন কার তত্ত¦াবধানে হবে এবং তা আসলেই নিরপেক্ষ হবে কি না তা নিয়ে পরস্পর বিরোধী অবস্থান দেখা যাচ্ছে। এটা ইতোমধ্যে এত তীব্র হয়ে উঠেছে যে, অনেক পর্যবেক্ষক প্রতিদ্বনিদ্বতামূলক কোনো নির্বাচন আদৌ হবে কি না তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। বাংলাদেশীরা ইতোমধ্যে খাদ্য ও জ্বালানির মূল্য, মারাত্মক লোডশেডিং এবং নতুন নতুন সড়ক নির্মাণের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন। ইকোনমিস্ট আরো বলে, সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশে বেশ  কয়েকটি রহস্যজনক হত্যাকান্ড ঘটেছে। এক সৌদী কূটনীতিক গুলীতে নিহত হয়েছেন, এক ট্রেড ইউনিয়ন কর্মী নির্যাতিত ও খুন হয়েছেন, দুর্নীতির অনুসন্ধান করার পর এক সাংবাদিক দম্পতিকে হত্যা করা হয়েছে। সেনাবাহিনীর ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ কঠোর করতে জানুয়ারিতে অভ্যূত্থানের গুজব ছড়ানো হয়। আরো বলা হয়, বাংলাদেশের অন্যতম সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব গ্রামীণ ব্যাংকের মুহাম্মদ ইউনূসকে হেনস্তা করা হয়েছে। শেখ হাসিনা তাকে রাজনৈতিক হুমকি মনে করেন। সরকার গ্রামীণ ব্যাংককে কব্জা করতে চাচ্ছে বলেও উল্লেখ করা হয়। সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলা হয়, দুর্নীতি এতো ব্যাপক যে, তা দাতাদেরও উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জাপান তার উপ-প্রধানমন্ত্রীকে পাঠিয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি ব্যক্ত করেছে। সাম্প্রতিক এক দুর্নীতির ঘটনায় রেলমন্ত্রীর সহকারীর গাড়ি থেকে বস্তাভর্তি টাকা পাওয়ার পরে তিনি পদত্যাগ করেছিলেন। কিন্তু অল্প পরেই তাকে মন্ত্রিসভায় পুনর্বহাল করা হয়। ইকোনমিস্ট আরো উল্লেখ করে, ‘১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধ আধুনিক ইতিহাসের মধ্যকার রক্ত¯œাত যুদ্ধগুলোর অন্যতম। কিন্তু অভিযুক্তদের বিচার করতে গঠিত ট্রাইব্যুনালের সম্ভাব্য রায়ের উদ্দেশ্য এখন প্রতীয়মান হচ্ছে, বিএনপি ও তার ইসলামী মিত্রদের হেয় প্রতিপন্ন করা।

বাংলাদেশের স্পর্শকাতর বিষয়গুলো নিয়ে বৃটেনের পার্লামেন্টেও আলোচনা হয়েছে গত ২১ মে। সেখানকার একটি সংবাদপত্র জানায়, বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ইলিয়াস আলীসহ সব গুমের স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছে বৃটেন। বৃটেন পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ হাউজ অব লর্ডসে লেবার পার্টির সদস্য লর্ড হ্যারিসের এক প্রশ্নের জবাবে দেশটির স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র এবং কমনওয়েলথ মন্ত্রী লর্ড হাওয়েল এ কথা বলেন। লর্ড হাওয়েল বলেন, ‘দেশটির জনগণের দারিদ্র্য নিরসন ও জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আগামী সংসদ নির্বাচন নিশ্চিত করতে এবং তা যথাসময়ে অনুষ্ঠানের ব্যাপারে রাজনীতিকে স্থিতিশীল করতে বাংলাদেশের চেষ্টাকে আমরা সমর্থন দিয়ে আসছি। তাই আমাদের কর্মকর্তারা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর অফিস ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন। এই বৈঠকে যেকোনো মূল্যে ইলিয়াস আলীসহ গুম হওয়া সব মানুষকে খুঁজে বের করতে সরকারকে আহবান জানানো হয়। বৃটেন বিশ্বাস করে বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক অন্ধকারাচ্ছন্ন অবস্থা অচিরেই কেটে যাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। এছাড়া গত ফেব্রুয়ারিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রধান বাংলাদেশ সফরকালে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে সরকারকে তাদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন বলেও জানান তিনি।

এদিকে বাংলাদেশের বিরোধী রাজনৈতিক নেতা এবং কর্মীদের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা অবিলম্বে নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি জানায় যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। ২৭ এপ্রিল এই সংস্থার বিবৃতি প্রচার করে বিবিসি। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এই বিবৃতিতে বলে, বাংলাদেশে বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীদের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা বাড়ছে এবং এ ধরণের সর্বশেষ ঘটনায় গত ১৭ এপ্রিল থেকে নিখোঁজ রয়েছেন বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী। বিবৃতিতে বাংলাদেশের একজন গার্মেন্টস শ্রমিক নেতা আমিনুল ইসলামকে অপহরণ এবং কয়েকদিন পর তাকে হত্যার ঘটনাও উল্লেখ করা হয়। বলা হয়, বাংলাদেশের মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র কেবল চলতি বছরেই এভাবে ২২ জন মানুষ নিখোঁজ হয়েছেন বলে তাদের এক রিপোর্টে জানিয়েছিল। অন্যদিকে অধিকার নামের আরেকটি মানবাধিকার সংস্থার হিসেবে ২০১০ সাল থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ৫০ জন মানুষ নিখোঁজ হয়েছেন। বিবিসি গত সপ্তাহে বাংলাদেশে গুম-নিখোঁজের ওপর একটি সচিত্র প্রতিবেদনও সম্প্রচার করে।

এছাড়া প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক টিভি চ্যানেল আল জাজিরা ‘বাংলাদেশ রাজনৈতিক গুমের মহামারীতে আক্রান্ত শীর্ষক এক প্রতিবেদন প্রচার করে। এতে বলা হয়, বিগত এক বছরে বাংলাদেশে প্রায় ১০০ মানুষ নিখোঁজ হয়েছেন। তাদের বেশিরভাগই রাজনৈতিক নেতাকর্মী। এর আগে ১০ আগস্ট ২০১১ এবং এ বছর ১৫ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সম্পর্কে দুটি প্রতিবেদন আল জাজিরা টিভিতে প্রচারিত হয়। শেষ প্রতিবেদনের একাংশে বলা হয়, ‘বাংলাদেশের সাবেক রাজনীতিবিদ গোলাম আযম ৪০ বছরেরও বেশি সময় আগে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধে বিচারের মুখোমুখি। ৮৯ বছর বয়সী গোলাম আযম হাঁটতে পারেন না, দেখতে পান না, এমনকি শুনতেও পান না। তা সত্তে¦ও ১০ জন সশস্ত্র পুলিশ কর্মকর্তা সার্বক্ষণিক তাঁকে পাহারা দিচ্ছেন।

এদিকে ভারতের প্রভাবশালী দৈনিক ‘দ্য হিন্দুর অনলাইন সংস্করণে ‘ডিসঅ্যাপেয়ারেন্সেস, কিলিংস ট্রিগার কনসার্ন ইন বাংলাদেশ শীর্ষক রিপোর্টে সম্প্রতি বলা হয়, গুমের ঘটনা ও রহস্যময় হত্যার ঘটনা সম্প্রতি বাংলাদেশে ব্যাপক আকারে বেড়ে গেছে। এর ফলে বাংলাদেশে আতঙ্ক ও রাজনীতিতে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। এ রিপোর্টে আরো বলা হয়, ক্রমবর্ধমান গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডে এরই মধ্যে উচ্চ আদালত গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। মানবাধিকার গ্রুপগুলো দাবি করছে, ২০১০ সালের জানুয়ারি থেকে শতাধিক মানুষ নিখোঁজ হয়েছেন। তাদের মধ্যে ২১ জনকে মৃত উদ্ধার করা হয়েছে। তবে গত সপ্তাহে ঢাকায় গাড়িচালকসহ সাবেক এমপি ও বিরোধী দল বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক এম ইলিয়াস আলীর রহস্যময় নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় আতঙ্ক ও রাজনৈতিক উত্তেজনা বেড়ে গেছে। রিপোর্টে আরও বলা হয়, ২০১০ সালের জুলাই মাসে বিএনপির আরেক নেতা চৌধুরী আলম কোথায় আছেন সে ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে পুলিশ কর্মকর্তা ও র‌্যাবকে নিন্দেশ দিয়েছিল হাইকোর্ট। বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন আদালত।

Sunday, June 3, 2012

আবারও মার্কিন সপ্তম নৌবহর!


সংবাদটি ছাপা হয়েছে ভারতীয় পত্রিকা টাইমস অব ইন্ডিয়ার অনলাইন সংস্করণে গত ৩১ মে।  তাতে বলা হয়েছে, চট্টগ্রামে ঘাঁটি গাড়ছে সপ্তম নৌবহর। যদিও তা অস্বীকার করেছে বাংলাদেশ। পত্রিকাটি উদ্ধৃতি দিয়েছে ভারতের টিভি চ্যানেল টাইমস নাউ-এর। সংবাদটিতে বলা হয়েছে, হিলারি ক্লিনটনের বাংলাদেশ সফরকালে এ ব্যাপারে বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনা হয়েছিল। দক্ষিণ চীন সাগরে চীনা নৌবাহিনীর উপস্থিতি বেড়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্র বঙ্গোপসাগরে ঘাঁটি গাড়তে চাইছে। এর মধ্য দিয়ে জাপান থেকে শুরু করে ভারত মহাসাগরের দিয়াগো গার্সিয়া পর্যন্ত এশিয়ার প্রায় পুরোটাতেই যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে চাইছে। এর আগে একটি জাতীয় দৈনিকে আরও একটি খবর প্রকাশিত হয়েছিল। তাতে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র ‘আকসা’ বা ‘অ্যাকুইজিশন ও ক্রস সার্ভিসেস অ্যাগ্রিমেন্ট’ দিয়ে আলোচনা শুরু করেছে। দুটো সংবাদই বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনের বাংলাদেশ সফরের সময় যে কৌশলগত সংলাপের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তার পরপরই যখন এ ধরনের সংবাদ ছাপা হয়, তখন এর গুরুত্ব বাড়ে বৈকি! এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন শেষ পর্যায়ে বঙ্গোপসাগরে সপ্তম নৌবহরের একটি জাহাজ প্রবেশের চেষ্টা করেছিল। উদ্দেশ্য ছিল ভারতের ওপর ‘চাপ’ প্রয়োগ করে পাকিস্তানের সঙ্গে একটি সমঝোতায় যাওয়া। তাতে অবশ্য মার্কিন প্রশাসন সফল হয়নি। 
বাংলাদেশ তথা দক্ষিণ এশিয়ার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ বেড়েছে নানা কারণে। প্রথমত, ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের নৌবাহিনীর প্রভাব বৃদ্ধি, যা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে আঘাত করতে পারে। সে কারণে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে নিয়ে চীনের বিরুদ্ধে একটি অ্যালায়েন্স গড়ে তোলা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, ২০১৪ সালে আফগানিস্তান থেকে সকল মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহার করা হলে সেখানে যে ‘শূন্যতা’র সৃষ্টি হবে, সেই ‘শূন্যতা’ পূরণের জন্য দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সমন্বয়ে একটি ‘শান্তিরক্ষী’ বাহিনী গঠন করা, যারা ২০১৪ সালে মার্কিন সৈন্যদের পরিবর্তে আফগানিস্তানে শান্তিরক্ষায় নিয়োজিত হবে। তৃতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র মনে করে ইসলামিক কট্টরপন্থীরা দক্ষিণ এশিয়ায়, বিশেষ করে বাংলাদেশে নতুন করে একটি ঘাঁটি গড়তে পারে। সে কারণে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে নিয়ে একটি সন্ত্রাসবিরোধী মোর্চা গঠন করা প্রয়োজন। চতুর্থত, এ অঞ্চলে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারে বিপুল জ্বালানি সম্পদ রয়েছে (গভীর সমুদ্রে)। মার্কিনি আইওসির এ ব্যাপারে আগ্রহ রয়েছে যথেষ্ট। বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের জন্য এ কারণেই যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে অবস্থান করে খুব সহজেই মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগ করা যায় এবং বাংলাদেশের নিকট-প্রতিবেশী চীনের রাজনৈতিক উত্থান-পতনে প্রভাব খাটানো সম্ভব। হিলারি ক্লিনটনের বাংলাদেশ সফরের পরপরই বাংলাদেশকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের একটি গ্র্যান্ড স্ট্র্যাটেজি রচিত হয়েছে। ‘আকসা’ চুক্তি এ লক্ষ্যেই স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে।
হিলারির সফরের গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল একটি যৌথ অংশীদারিত্ব সংলাপ চুক্তি স্বাক্ষর। এই সংলাপের আওতায় বছরে একবার বাংলাদেশ ও মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের কর্তাব্যক্তিরা মিলিত হবেন। চুক্তিতে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই, সহিংস চরমপন্থা এবং মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান ও জলদস্যুতার মতো আন্তঃদেশীয় অপরাধ রোধ ও নিরাপত্তা সহযোগিতার কথা বলা হয়েছে। এ ধরনের ব্যাখ্যা নানাভাবে বিশ্লেষণ হতে পারে। ‘সন্ত্রাসবাদ রোধে সহযোগিতার’ আলোকে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক কোন পর্যায়ে উন্নীত হয় সেটাই দেখার বিষয় এখন। আরও একটা কথা। তরুণদের এক সমাবেশে হিলারি ক্লিনটন যখন বাংলাদেশের স্ট্র্যাটেজিক গুরুত্বের কথা বলেন, তখন আমাদের প্রখ্যাত মার্কিন স্ট্র্যাটেজিস্ট রবার্ট কাপলানের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। কাপলান লিখেছেন, দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতির উদ্দেশ্য একটাই-আর তা হচ্ছে চীনের প্রভাবকে সঙ্কুচিত করা। বাংলাদেশের অবস্থান তাই খুব স্বাভাবিক কারণেই মার্কিন নীতিনির্ধারকদের আকৃষ্ট করবে। মার্কিন স্ট্র্যাটেজিতে ভারতের গুরুত্ব বেড়েছে। এটাই হচ্ছে মোদ্দা কথা। চীন যাতে শক্তিশালী হয়ে উঠতে না পারে, সে জন্য ভারতকে চীনের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা। চীন ইতোমধ্যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া তথা ভারত মহাসাগরে অন্যতম নৌ-শক্তিরূপে আবির্ভূত হয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে আঘাত করছে। চীন এ অঞ্চলে ঝঃত্রহম ড়ভ চবধত্ষং বা ‘মুক্তার মালা’র মতো বিভিন্ন সামুদ্রিক বন্দরে তার অবস্থান শক্তিশালী করে একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। চীনের ঝঃত্রহম ড়ভ চবধত্ষং-এর যে নেটওয়ার্ক, তাতে পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত গাওদার সমুদ্রবন্দর একটি বড় ভূমিকা পালন করছে। দক্ষিণ চীন সাগর থেকে মালাক্কা প্রণালী হয়ে ভারত মহাসাগর পার হয়ে অ্যারাবিয়ান গালফ পর্যন্ত যে সমুদ্রপথ, এ পথের নিয়ন্ত্রণ নিতে চায় চীন। চীন যে তেল আমদানি করে তার ৮০ ভাগ এই মালাক্কা প্রণালী হয়ে চীনে যায়। তাই সঙ্গত কারণেই চীনের জন্য তার ভারত মহাসাগরে উপস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গাওদারে চীনা নৌবাহিনীর একটি ছোট্ট ইউনিটও থাকবে, যা কিনা ভারত মহাসাগরের সকল নৌ মুভমেন্ট মনিটর করবে। যুক্তরাষ্ট্রের  সঙ্গে ইরানের সম্পর্কের অবনতির পরিপ্রেক্ষিতে গাওদার বন্দরের  কৌশলগত গুরুত্ব আরও বেড়েছে। স্ট্রেইট অব হরমুজ থেকে গাওদারের দূরত্ব মাত্র ১৮০ নটিক্যাল মাইল। আর ইরান সীমান্ত রয়েছে মাত্র ৭২ কিলোমিটার দূরে। চীন প্রায় এক বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে গাওদার সমুদ্রবন্দর উন্নয়নে। চীন তার দক্ষিণাঞ্চলের ইউনান প্রদেশে মধ্য এশিয়ার গ্যাস এই গাওদার বন্দর দিয়েই পাইপলাইনের মাধ্যমে নিয়ে যেতে চায়। চীন শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটায় একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করছে। তামিল টাইগারদের সঙ্গে যুদ্ধে চীন শ্রীলঙ্কা সরকারকে সমর্থন করেছিল। মিয়ানমারে রয়েছে চীনের নৌবাহিনীর একটি রাডার স্টেশন। সিটওয়েসহ আরও বেশ ক’টি বন্দরে রয়েছে চীনা উপস্থিতি। ভারত মহাসাগরভুক্ত অঞ্চলে চীন যে বিশাল প্রতিরক্ষা গড়ে তুলছে, তা মূলত তার জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখেই করা হয়েছে। চীনের এই জাতীয় স্বার্থকে আঘাত করা ও চীনের নৌবাহিনীর ভূমিকাকে খর্ব করার উদ্দেশ্য নিয়েই যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে সঙ্গে নিয়ে এই অঞ্চলে একটি মোর্চা গড়ে তুলছে, যাতে বাংলাদেশকে অন্যতম একটি পার্টনার হিসেবে দেখতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে স্ট্র্যাটেজি সেই স্ট্র্যাটেজিকে সামনে রেখেই এখন যুক্তরাষ্ট্র ‘আকসা’ চুক্তি করতে আগ্রহী হয়েছে। ‘আকসা’ চুক্তি সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায়নি। যতদূর জানা গেছে, এ ধরনের চুক্তি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। প্রস্তাাবিত ‘আকসা’ চুক্তি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে ‘গাইডেড মিসাইল’সহ বেশ কয়েক ধরনের আধুনিক অস্ত্র সরবরাহ করবে। এসব অস্ত্র ব্যবহারের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য সহযোগিতা দেওয়ার কথাও রয়েছে। এ ছাড়া থাকবে যৌথ মহড়া ও সংলাপের ব্যবস্থা। প্রস্তাবিত ‘আকসা’ চুক্তি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনী জ্বালানি সংগ্রহ, যাত্রাবিরতি, সাময়িক অবস্থানসহ এ ধরনের বিভিন্ন সুবিধার জন্য বাংলাদেশে ‘পোর্ট অব কল’ সুবিধা পাবে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর বাংলাদেশে উপস্থিতিরও সুযোগ সৃষ্টি হবে। তথ্য ঘেঁটে দেখা গেছে, প্রস্তাবিত এই চুক্তিটির একসময় নাম ছিল ‘ন্যাটো মিউচুয়্যাল সাপোর্ট অ্যাক্ট’। যুক্তরাষ্ট্র এবং ন্যাটো বাহিনীর মধ্যে সহযোগিতা ও সরবরাহ বিনিময় সহজ করার জন্য এটি করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ওই অ্যাক্টে পরিবর্তন আনা হয় যাতে করে ন্যাটোর সদস্য নয় এমন দেশগুলোর সঙ্গে এ ধরনের একটি চুক্তি করা যায়। চুক্তিটির নামেও পরিবর্তন আনা হয়। চুক্তিটি এখন ‘আকসা’ চুক্তি নামে পরিচিত।
‘আকসা’ চুক্তি বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করবে না। বরং বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতির যে পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে, বাংলাদেশ সেই পরিকল্পনার যদি অংশ হয়, তা হলে বাংলাদেশ বহির্বিশ্বে ইমেজ সঙ্কটের মুখে পড়বে। একইসঙ্গে চীনের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হতেও বাধ্য। আমরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গ্র্যান্ড স্ট্র্যাটেজির অংশ হতে পারি না। এ ক্ষেত্রে আমাদের প্রাপ্তিও খুব কম। শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফর ও তথাকথিত প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে আমরা আমাদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করতে পারব না। তাই প্রস্তাবিত চুক্তিটি স্বাক্ষরের আগে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের পরামর্শ ও বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া জরুরি। চুক্তিটি নিয়ে সংসদে আলোচনা করারও প্রয়োজন রয়েছে। এ ধরনের একটি চুক্তি বাংলাদেশে সন্ত্রাসীদের উসকে দিতে পারে। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডও বেড়ে যেতে পারে, যা কোনোমতেই কাম্য নয়। সংসদকে অবহিত না করে এ ধরনের একটি চুক্তি যদি করা হয়, তাহলে সেই চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই।
‘আকসা’র রেশ শেষ হতে না হতেই এখন প্রকাশিত হল চট্টগ্রামে সপ্তম নৌঘাঁটি স্থাপনের খবরটি। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারের বক্তব্য কিছুটা পাওয়া গেলেও তা স্পষ্ট নয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লিওন প্যানেট্টা পরোক্ষভাবে এটা স্বীকার করে নিয়েছেন। গত ২ জুন সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত ‘সাংগ্রিলা ডায়ালগে’ প্যানেট্টা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে রণতরীর সংখ্যা বাড়াবে। ২০১৩ সালে এই রণতরীর সংখ্যা ৬-এ দাঁড়াবে। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে ভারতীয় পত্রিকায় যে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে, তার পেছনে কিছুটা হলেও সত্যতা রয়েছে। খুব সঙ্গত কারণেই তাই যে প্রশ্নটি আসবে তা হচ্ছে, বঙ্গোপসাগরে যেকোনো মার্কিন রণতরী মোতায়েন বাংলাদেশের জন্য কোনো মঙ্গল ডেকে আনবে কি না। এর জবাব না-বাচক। অর্থাত্ এতে করে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ রক্ষিত হবে না। বরং চীনের সঙ্গে আমাদের যে ঐতিহাসিক সম্পর্ক, তাতে অবিশ্বাস জন্ম হতে পারে। চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কে আসতে পারে স্থবিরতা। অথচ আমাদের জাতীয় স্বার্থের জন্য চীনের সাহায্য ও সহযোগিতার প্রয়োজন রয়েছে। সরকার এ ধরনের মোতায়েনের খবর অস্বীকার করলেও সাধারণ মানুষের মনে সন্দেহ রয়ে গেছে। এখন আগামী দিনগুলোই প্রমাণ করবে প্রকাশিত সংবাদটির পেছনে সত্যতা কতটুকু আছে।






Saturday, June 2, 2012

সপ্তম নৌবহর চট্টগ্রাম বন্দরে পাঠাতে চায় যুক্তরাষ্ট্র!

বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের পক্ষে মার্কিন সপ্তম নৌবহর পাঠানোর হুমকি দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। পরে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের পাল্টা হুমকিতে নৌবহর পাঠায়নি মার্কিন কর্তৃপক্ষ। সেই সপ্তম নৌবহর আবার আলোচনায় এসেছে। গতকাল শুক্রবার ভারতের বেসরকারি টাইমস নাউ টেলিভিশনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র চট্টগ্রাম বন্দরে সপ্তম নৌবহর পাঠাতে চায়।

তবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা গতকাল প্রথম আলোকে জানান, বিষয়টি সত্যি নয়। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন তাঁর সাম্প্রতিক ঢাকা সফরের সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক ও সৌজন্য সাক্ষাৎকালে সপ্তম নৌবহরের প্রসঙ্গ তোলেননি।

টাইমস নাউ টেলিভিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র কৌশলগত স্বার্থে চট্টগ্রাম বন্দরে সপ্তম নৌবহরের ঘাঁটি গড়তে চায়। কারণ, দক্ষিণ চীন সাগরের ঘাঁটিগুলোতে চীনের শক্তি দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র উদ্বিগ্ন। ভারত মহাসাগরের দিয়েগো গার্সিয়ায় মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে। তার পরও এশিয়ায় সার্বিক উপস্থিতি বাড়াতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। চট্টগ্রামে মার্কিন সপ্তম নৌবহর মোতায়েন করা গেলে যুক্তরাষ্ট্র চীনের দিকে নজর রাখতে পারবে এবং আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের পর এটিই হবে মার্কিন কৌশলগত সুবিধাজনক অবস্থান।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর অবশ্য হিলারির ঢাকা সফরের সময় কোনো ধরনের সামরিক সহযোগিতার বিষয়ে আলোচনার কথা অস্বীকার করেছে। এ ব্যাপারে টাইমস নাউ টেলিভিশনের পক্ষ থেকে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র ভিক্টোরিয়া ন্যুলান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এই প্রশ্ন পেন্টাগনের কাছে করা যেতে পারে। কিন্তু হিলারির সফরের সময় এমন কোনো আলোচনা হয়েছে বলে তিনি মনে করেন না।

মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের সদর দপ্তর পেন্টাগনের প্রতিবেদনে দক্ষিণ চীন সাগরসহ এশিয়াজুড়ে চীনের শক্তি বাড়ছে ভেবে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। টাইমস নাউ টেলিভিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকার বিষয়টি নিয়ে কথা বলছে না। তবে কট্টরপন্থীদের বিরূপ প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কায় সরকার অভ্যন্তরীণভাবে সপ্তম নৌবহর মোতায়েনের বিষয়টি নাকচ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

টাইমস নাউ টেলিভিশনের বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করলে একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘সপ্তম নৌবহর চট্টগ্রামে মোতায়েনের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে অনুরোধ করেছে—এমন কোনো বিষয় আমার জানা নেই।’
এদিকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রগুলো জানিয়েছে, বাংলাদেশের সঙ্গে প্রস্তাবিত অ্যাকুইজিশন ও ক্রস-সার্ভিসিং এগ্রিমেন্ট (আকসা) চুক্তি সইয়ের ব্যাপারে আবার আগ্রহী হয়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্র। ২০০৬ সালে দেওয়া প্রস্তাবটি নিয়ে গত বছর থেকে আগ্রহ দেখিয়ে আসছে মার্কিন প্রশাসন। এ বিষয়ে কথা বলতে হিলারির ঢাকা সফরের এক সপ্তাহ পর একটি উচ্চপর্যায়ের মার্কিন সামরিক প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফর করে।

পররাষ্ট্রবিষয়ক একটি বিশেষ সূত্র জানায়, প্রস্তাবিত আকসা চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর জন্য জ্বালানি, সমরাস্ত্রসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের জোগান দেবে যুক্তরাষ্ট্র। আর সামরিক এ সরঞ্জাম সরবরাহের জন্য মার্কিন সেনারা বাংলাদেশে আসবে। আকসা চুক্তি বিরোধিতাকারীদের মতে, এ চুক্তি সই হলে একটি দেশে মার্কিন সেনা সমাবেশ অনিবার্য হয়ে ওঠে।