Saturday, April 8, 2017

তিস্তা নদীর পানি ও রাজনীতি !


বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী দিল্লী গেছেন, আলোচিত হচ্ছে চুক্তি, দাবী বিষয়ে। সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে তিস্তা নদীর পানির হিস্যা নিয়ে। বাংলাদেশের দাবী তিস্তার পানি প্রবাহ যাতে ঠিক থাকে, শুস্ক মৌসুমে পানি যাতে আসে সেই নিয়ে দেন দরবার হচ্ছে দীর্ঘ দিন যাবত, নানান সমীক্ষা, নানান উপাত্ত নিয়ে দু পক্ষের মধ্যে অনেক দরকষকষি শেষে ভারত শেষ পর্যন্ত চুক্তি হচ্ছে না বলেই ঘোষিত হয়েছে।

এই নিয়ে নানান মহলে বেশ আলোচিত হচ্ছে, প্রশ্ন  উঠছে কেন বাংলাদেশকে পানি দেওয়া হবে না, ভারত শুধু নেবেই আমাদের কিছু দেবে না। এমন নানান গরম করা খবর। মূলত রাজনীতির কারণে তিস্তা চুক্তি হচ্ছে না এমন ধারণাই বুঝাতে সক্ষম হয়েছে দিল্লী। মমতা ব্যানার্জির কারণে এমন হচ্ছে বলেই দিল্লী তাদের সততা প্রকাশের চেষ্টা করছেন। বাস্তবিক দিকটা কি এমনই ? আসুন দেখি তিস্তা কি এখন বাংলাদেশ পানি বয়ে আনতে সক্ষম ।

“প্রকৃত পক্ষের নদীটির বাংলা নাম তিস্তা যা ‘ত্রিস্রোত’ বা তিন প্রবাহ থেকে এসেছে। হিন্দু পুরাণ আনুসারে এটি দেবী পার্বতীর স্তন থেকে উৎপান্ন হয়েছে। সিকিম হিমালয়ের ৭২০০ মিটার উচ্চতায় চিতামু হ্রদ থেকেই তিস্তার উৎপত্তি। দার্জিলিং এ শিভক গোলা থেকে গিরিসঙ্কট এর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশের নিলফামারি জেলার কালীগঞ্জ সীমান্ত এলাকা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।

সিকিম থেকে উৎপান্ন এই নদী ৪১৪ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য নিয়ে তিস্তার বিস্তৃতি এর মধ্যে সিকিম ১৫১ পশ্চিমবঙ্গ ১৪২ ও ১২১ কিলো মিটার বাংলাদেশের উত্তরে জেলা গাইবান্ধা, কুড়িঁগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী ও রংপুরের ভিতর দিয়ে প্রবাহিত, ৩৫টি উপজেলা ৫৪২৭ টি গ্রাম আর সাড়ে পাঁচ কোটি মানুষের বসাবাসের স্থলে কৃষির সরাসরি ভূমিকা রয়েছে রয়েছে এই তিস্তা নদীর।  

১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের ম্েযধ তিস্তা নদীর পানি বন্টনের ব্যপারে সিদ্ধান্ত হয় যে, বাংলাদেশ ৩৬ শতাংশ ভারত ৩৯ শতাংশ পানি পাবে বাকী পানি সংরক্ষিত হিসেবে রাখা হবে। কিন্তু সঠিক কোন দিক নির্দেশনা না থাকায় মন্ত্রী পর্যায় থেকে আর বেশি দুর গড়ায়নি। ২০০৭ সালে তিস্তার পানি নিয়ে এক যৌথবৈঠক হয়, তাতে দুদেশ সমান সমান ভিত্তিতে ৮০ শতাংশ পানি হিস্যা আর বাকি ২০ শতাংশ সংরক্ষিত রেখে চুক্তির কাছাকাছি গিয়ে শেষ পর্যন্ত আর চুক্তিটা হয়নি ভারতের বিরোধীতার কারণে।  

ভারত তিস্তার ৩০০ কিলো প্রবাহের মধ্যেই ১০ টি বাঁধ দিয়েছে, সর্বশেষ ভারতের জলপাঁইগুড়ির ‘গজলডোবা’ নামক স্থানে বাধঁ দিয়ে বাংলাদেশে পানি প্রবাহ একেবারেই বন্ধ করার উপক্রম হয়েছে। আমাদের ডালিয়া পয়েন্টে যে পানি আসে তাতে নদীর পথ হিসেবে আর বলা যায় না। এই তথ্য দুই পক্ষের কাছেই আছে অথচ রাজনৈতিক খেলা হিসেবে তিস্তা একটি বিশাল ব্যপার হয়ে গেছে।

ভারত যেহেতু ১০ টি বাঁধ দিয়ে তিস্তার পানিকে আটকিয়ে দিয়েছে, সেহেতু এখন বাঁধ ভেঙ্গে ফেললেও তিস্তার আর যৌবন ফিরে আসবে না, প্রযুক্তি আর সভ্যতার কথা বলে তিস্তাকে মেরে ফেলা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের মানুষই শুস্ক মৌসুমে পানি পায় না, সেখানে আমরা কি করে পানি পাবো ? ১০ টি বাঁধ নির্মানে সিকিম এখন বৃহত বিদ্যুৎ উৎপাদক রাজ্য অথচ জীব, জীবনের প্রাচুর্য ভরা এই অঞ্চল পানি শূণ্যতার কারণে জীবন জীবিকা আজ হুমকির মূখে।

অথচ রাজনৈতিক ফয়দা নেওয়ার জন্য এই মরা নদী নিয়ে নানান ভাবে মানুষকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। এই থেকে মানুষকে বুঝা উচিৎ তিস্তার প্রকৃত চিত্র, পশ্চিমবঙ্গ ও ইচ্ছা করলে তার স্বাভাবিক বহমানের পানি পাবে না, সেটা সিকিমই আটকিয়ে রেখেছে তাই আমাদের পাওয়ার প্রশ্নই উঠে না। এই সত্যটাকে আমাদের সরকার আমাদের জানাচ্ছে না, ভারত তার রাজনৈতিক দরকষাকষিতে তিস্তাকে এখন বাঁচিয়ে রেখেছে নিজেদের স্বার্থে।

আলমগীর আলম
০১৬১১০১০০১১

Saturday, March 4, 2017

সহিংসতার দেশ মিয়ানমার


প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশটির সাথে বাংলাদেশের রয়েছে ২৭১ কিলোমিটার সীমান্ত। তবে নিকটতম প্রতিবেশী হওয়া সত্ত্বেও মিয়ানমারের সাথে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠতা অঞ্চলের অন্যান্য দেশের তুলনায় কিছুটা কম। এর বড় কারণ মিয়ানমার সার্কভুক্ত দেশ নয়। এ ছাড়া মিয়ানমারের কয়েক দশকের অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও পশ্চিমা বিশ্বের নিষেধাজ্ঞাও একটি কারণ। মিয়ানমার সম্পর্কে আমাদের দেশের মানুষের ধারণাও খুব স্পষ্ট নয়। অং সান সু চির গণতান্ত্রিক আন্দোলন আর রোহিঙ্গা নির্যতন এ দুটি বিষয় ছাড়া সাধারণত মিয়ানমার প্রসঙ্গ আসে না আমাদের গণমাধ্যমে। দেশটির আর্থসামাজিক চিত্র নিয়ে এবারের মূল রচনা

চিরকালীন রাজনৈতিক অস্থিরতা
দীর্ঘ দিন ব্রিটিশ উপনিবেশ থাকার পর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশদের কাছ থেকে মিয়ানমার দখল করে জাপান। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি জাপানের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে মিয়ানমার (তৎকালীন বার্মা)। স্বাধীনতার পর থেকে দেশটি একের পর এক রাজনৈতিক ও জাতিগত অস্থিতিশীলতার মোকাবেলা করছে। নানা ঘটনা-দুর্ঘটনায় বারবার দেশটিতে হানা দিয়েছে বিশৃঙ্খলা। বিভিন্ন আকারের একের পর এক গৃহযুদ্ধ মিয়ানমারের অর্থনীতিসহ সব উন্নয়নকে ব্যাহত করেছে। স্বাধীনতা অর্জনের মাত্র তিন মাসের মাথায় সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু করে কমিউনিস্টরা। ঘটনার সূত্রপাত আরো আগে। স্বাধীনতা অর্জনের ছয় মাস আগে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের হাতে খুন হন স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা অং সান (বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের নেত্রী অং সান সু চির পিতা)। সে সময় তিনি ছিলেন ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য গঠিত ছায়াসরকারের প্রধান। সচিবালয়ে বৈঠককালে ছয় মন্ত্রীসহ তাকে হত্যা করে ব্রিটিশ শাসিত বার্মার শাসকের অনুগত বাহিনী। এ ঘটনার রেশ থেকে বের হতে পারেনি স্বাধীন মিয়ানমার।
বিভিন্ন অস্থিরতার মধ্যে ১৯৬২ সালে জেনারেল নে উইনের নেতৃত্বে সামরিক অভ্যুত্থান হয় দেশটিতে। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী গড়ে ওঠা বিক্ষোভ কঠোরহস্তে দমন করা হয়। এক দিনেই রেঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয়ে নিহত হয় ১৫ ছাত্র। এরপর প্রতিটি বিক্ষোভ অত্যন্ত নির্মমতার সাথে দমন করেছে সেনাবাহিনী। ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত সেনাকর্মকর্তাদের হাতে বিভিন্ন পদ্ধতিতে শাসিত হয় দেশ। একপর্যায়ে তারা চাকরি থেকে পদত্যাগ করে রাজনীতিক সেজে একদলীয় শাসনব্যবস্থা কায়েম করে। সেনাশাসকদের অধীনে ক্রমেই দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ হতে থাকে। আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে মিয়ানমার। অনিয়ম আর অব্যবস্থাপনার ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সঙ্কটের কারণে ক্ষোভ জমতে থাকে জনমনে। একপর্যায়ে যা রূপ নেয় বিক্ষোভে। ১৯৮৫ সাল থেকে শুরু হওয়া সরকারবিরোধী বিক্ষোভ চূড়ান্ত রূপ লাভ করে ’৮৮ সালে। সরকার আগের মতোই কঠোরহস্তে বিক্ষোভ দমন করতে সশস্ত্রবাহিনীকে মাঠে নামায়। সেই বিক্ষোভ ইতিহাসে ‘৮৮৮৮’ বিক্ষোভ নামে পরিচিত। এ সময়ই সক্রিয় রাজনীতিতে আসেন অং সান সু চি। প্রচণ্ড অস্থিরতার মুখে জেনারেল স মুংয়ের নেতৃত্বে আবার ক্ষমতা দখল করে সেনাবাহিনী। মুং সরকারের সময় দেশটির নাম বার্মা থেকে মিয়ানমার করা হয়। রাজধানী রেঙ্গুনের নাম পাল্টে রাখা হয় ইয়াঙ্গুন।
এই সরকার মার্শল ল’ জারি করে ‘রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা পুনর্বহাল কমিটির (এসএলওআরসি)’ মাধ্যমে দেশ শাসন করে। মুং নিজেকে কমিটির প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেন। তবে ১৯৯০ সালে দীর্ঘ ৩০ বছর পর এই সরকারের অধীনেই জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বহু বছর পর ভোটাধিকারের সুযোগ পেয়ে জনগন পুরোপুরি বয়কট করে সেনাসরকারকে। পার্লামেন্টের শতকরা ৮০ ভাগ আসন পেয়ে জয়লাভ করে অং সান সু চির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসি (এনএলডি)। কিন্তু ক্ষমতা হস্তান্তর করতে রাজি হয় না জান্তা সরকার। নেতাকর্মীদের ওপর শুরু হয় দমনপীড়ন। রাষ্ট্রীয় শান্তি ও উন্নয়ন পরিষদ (এসপিডিসি) গঠন করে শুরু হয় সামরিক শাসনের নতুন অধ্যায়। ১৯৯২ সালে স্বাস্থ্যগত কারণে জেনারেল মুং ক্ষমতা ছেড়ে দিলে তার সেকেন্ড ইন কমান্ড জেনারেল থান শোয়ে নিজেকে সিনিয়র জেনারেল পদমর্যাদায় উন্নিত করার ঘোষণা দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় বসেন। আগের শাসকদের তুলনায় থান শোয়ে ছিলেন অনেক বেশি আগ্রাসী। তার সময় আন্তর্জাতিক মহল থেকে দেশটিতে শান্তি ও স্থিতিশীলতা আনয়নের চেষ্টা করা হলেও তাতে কর্ণপাত করেননি। জাতিসঙ্ঘ মহাসচিবসহ বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকেরা বারবার অনুরোধ করেও তাকে অং সান সু চির সাথে সংলাপে বসতে রাজি করাতে পারেনি। ২০০৫ সালে তিনি রাজধানী পরিবর্তন করে ইয়াঙ্গুন থেকে পিনমানা শহরে নিয়ে আসেন। শহরটির নতুন নামকরণ করা হয় নেইপিদো অর্থাৎ রাজাদের শহর। ২০০৭ সালে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি নিয়ে বৌদ্ধভিক্ষুরা প্রতিবাদী হয়ে উঠলে থান শোয়ে ভিক্ষুদের আন্দোলন কঠোরহস্তে দমন করে। ২০০৮ সালে প্রবর্তন করা হয় নতুন সংবিধান। এ সংবিধানে সামরিক জান্তা দেশটির প্রশাসনসহ সব স্তরকে সামরিকীকরণের বৈধতা দেন। ২০১০ সালে জাতীয় নির্বাচনের আয়োজন করে এই সরকার। তবে পাতানো নির্বাচনের অভিযোগে অং সান সু চির দল সেই নির্বাচন বয়কট করে। অবশ্য নির্বাচনের আগেই সু চিকে গৃহবন্দী করা হয়। সু চি তার গণতান্ত্রিক আন্দোলনের বিষয়ে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন। জান্তা সরকার তাকে চিরতরে দেশ ত্যাগের শর্ত দিলেও তিনি স্বামী-সন্তানের সান্নিধ্য ত্যাগ করে গৃহবন্দী অবস্থায় দেশেই থেকেছেন।
অনিয়মের অভিযোগে ২০১০ সালের সাধারণ নির্বাচন বয়কট করে সু চির দল এনএলডি। সে বছরই নভেম্বরে সু চিকে মুক্তি দিলে ২০১২ সালের উপনির্বাচনে ৪৫টি আসনের মধ্যে ৪৩টি লাভ করে তার দল। এ সময় দেশী-বিদেশী চাপে ধীরে ধীরে নমনীয় হতে থাকে সেনাসমর্থিত সরকার। ২০১৫ সালের নির্বাচনে সু চির দল বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলে অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পর গণতন্ত্র ফিরে আসে দেশটিতে।

বর্তমান রাজনৈতিক চিত্র
দীর্ঘ প্রায় ছয় দশক পর গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরে এসেছে মিয়ানমার। তবে দীর্ঘ দিনের সেনাশাসনের প্রভাব থেকে পুরোপুরি বের হতে পারেনি দেশটি। সামরিক শাসকেরা দেশের বিভিন্ন সেক্টরে সেনাবাহিনীর আধিপত্য কায়েম করেছে। ২০০৮ সালের ১০ মে গৃহীত নতুন সংবিধানে অদ্ভুত একটি ধারা সংযোজিত করা হয় যাতে বলা হয়েছে, কোনো নেতার স্বামী বা সন্তান বিদেশের নাগরিক হলে তারা প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন না। মূলত অং সাং সু চি যাতে প্রেসিডেন্ট না হতে পারে তার জন্যই রাখা হয়েছে এই ধারাটি। উল্লেখ্য, সু চির প্রয়াত স্বামী একজন ব্রিটিশ নাগরিক, তার দুই সন্তানেরও রয়েছে ব্রিটিশ নাগরিকত্ব।
অতীতে সেনাসরকার সু চিকে দেশছাড়া করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু গণতন্ত্রের জন্য আপসহীন সু চি স্বামী আর দুই সন্তানকে বিদেশে রেখেও দেশ ছাড়তে রাজি হননি। এরপর তাকে কোণঠাসা করতেই এমন সংবিধান চালু করে জান্তা সরকার। তাই নির্বাচনের জিতলেও রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে আসীন হতে পারেননি তিনি। নিজের অনুগত দলীয় কর্মী ও একসময়ে ব্যক্তিগত গাড়িচালক থিন কিউকে করেছেন প্রেসিডেন্ট। সু চি স্টেট কাউন্সিলর নামক একটি নতুন সৃষ্ট পদে থেকে নেপথ্যে দেশ পরিচালনা করছে।
নতুন ওই সংবিধানে পার্লামেন্টের শতকরা ২৫ ভাগ আসন সংরক্ষিত রাখা হয়েছে সেনাবাহিনীর জন্য। এ কারণে দল ক্ষমতায় গেলেও সু চি রাতারাতি সংবিধান পরিবর্তনও করতে পারবেন না। এ জন্য তাকে অবশ্যই সেনাবাহিনীর সমর্থন লাগবে। দেশের সমগ্র প্রশাসনিক ব্যবস্থা সেনাবাহিনীর দখলে। সব গুরুত্বপূর্ণ দফতরে রয়েছে সাবেক সেনাকর্মকর্তা বা তাদের নিয়োগকৃত লোক। এসব কারণে দেশ পরিচালনায় কিছুটা হলেও হিমশিম খাচ্ছেন সু চি ও তার দল। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা আসেনি, মানবাধিকার পরিস্থিতি কিছটা উন্নত হলেও তা প্রত্যাশামতো নয়। মাদক উৎপাদন ও বণ্টন মহামারী আকার ধারণ করেছে। অবশ্য এসব বিষয়ে সরকার কতখানি আন্তরিক এমন প্রশ্নও তুলছেন সমালোচকেরা। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেনাবাহিনীর সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার একটি প্রচেষ্টা লক্ষ করা গেছে সু চির মধ্যে। গণতান্ত্রিক পেশাদার প্রশাসনিক কাঠামো ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টাও চলছে।
সেনাবাহিনী ছাড়াও দেশটিতে উগ্র বৌদ্ধভিক্ষুদের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নির্যাতনের মূল হোতা এই উগ্র ভিক্ষুরা। কিন্তু সরকার কখনোই তাদের নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেয়নি। গত নির্বাচনের আগে এই ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর চাপে রোহিঙ্গাদের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। ভিক্ষুরা চায়নি, তাই সু চির দল কোনো মুসলমানকে প্রার্থী করেনি তাদের দল থেকে। এদের সমর্থন হারানোর ভয়ে এমন চরম অন্যায় আবদার মেনে নিয়েছে এনএলডির মতো গণতান্ত্রিক দল। অথচ অতীতের সব নির্বাচনে দেশটির মুসলিম রাজনীতিবিদেরা প্রধান দলগুলো থেকে যোগ্যতা অনুযায়ী প্রার্থী হতেন। ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর বাধার কারণে রোহিঙ্গাদের ভোটাধিকার বাতিলেও কোনো প্রতিবাদ করেনি দলটি। সেনাবাহিনী দেশের জনগণকে শোষণের পাশাপাশি এই উগ্র ভিক্ষুদের প্রশ্রয় দিয়েছে। ধর্মপ্রাণ জনগণকে দলে ভেড়াতে এটি ছিল সেনাশাসকদের একটি হঠকৌশল।

অভ্যন্তরীণ সশস্ত্র বিদ্রোহ
স্বাধীনতার পর সরকার গঠন ও রাষ্ট্র পরিচালনা নিয়েই শুরু হয় মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ কোন্দল। ক্ষমতাদ্বন্দ্বের সাথে রয়েছে জাতিগত ও আঞ্চলিক গোষ্ঠিভিত্তিক সঙ্ঘাত। বেশ কয়েকটি অঞ্চলের বিভিন্ন গ্রুপ স্বাধীনতা কিংবা স্বায়ত্তশাসন চায়। ১৯৩৯ সালে গঠিত কমিউনিস্ট পার্টি বার্মা স্বাধীনতার পর প্রথম সরকারবিরোধী সশস্ত্র আন্দোলন শুরু করে চীন সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোতে। পরবর্তীকালে দলটি নিষিদ্ধ হয় মিয়ানমারে। ১৯৪৯ তৎকালীন কারিন (বর্তমান কাইন) রাজ্যের স্বাধীনতার দাবিতে সশস্ত্র আন্দোলন শুরু করে কারিন ন্যাশনাল ইউনিয়ন। গঠন করে কারিন ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি নামে সামরিক গ্রুপ। জাতিগত কারিন সম্প্রদায়ের পৃথক রাষ্ট্র গঠনের দাবিতে এই সশস্ত্র লড়াই। একই গ্রুপের আরেকটি সংগঠন কারিন ন্যাশনাল ডিফেন্স অরগানাইজেশন কাইনের পাশাপাশি কায়াহ রাজ্যে সশস্ত্র আন্দোলন শুরু করে। প্রাকৃতিক ও কৃষিজ সম্পদে পরিপূর্ণ রাজ্যটি তাদের সম্পদ ছিনিয়ে নেয়ার অভিযোগ আনে সরকারের বিরুদ্ধে। বিদ্রোহ দমাতে এখানে হত্যা, গুম, ধর্ষণসহ চরম সহিংসতা করেছে সরকারি বাহিনী। ১৯৭৬ সালে স্বাধীনতার দাবি থেকে সরে এসে ফেডারেল রাষ্ট্রব্যবস্থার দাবি জানায় কারিন ন্যাশনাল ইউনিয়ন। সে দাবিতে এখনো অনড় এই গ্রুপটি। ১৯৯৫ সালে সরকারি বাহিনী গ্রুপটির সদর দফতরসহ বিভিন্ন স্থাপনা গুঁড়িয়ে দিলে জঙ্গলে আশ্রয় নেয় এই বিদ্রোহীরা। বর্তমানে এই গ্রুপটির সাথে মিয়ানমার সরকারের যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর রয়েছে। প্রায় একই সময় পূর্বাঞ্চলীয় কারেনি (বর্তমান কায়াহ) রাজ্যে সশস্ত্র আন্দোলন শুরু করে কারেনি আর্মি। তারাও স্বাধীনতা কিংবা স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে আন্দোলন করছে। ২০১২ সালে যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরের আগ পর্যন্ত এই গ্রুপটি নিয়মিতই সশস্ত্র হামলা চালাত সরকারি বাহিনী ও স্থাপনায়।
তবে মিয়ানমারের সবচেয়ে শক্তিশালী বিদ্রোহী গ্রুপ হচ্ছে উত্তরাঞ্চলীয় কাচিন প্রদেশের কাচিন ইন্ডিপেন্ডেন্ট আর্মি। ১৯৬১ সালে সরকারের সাথে বিরোধের সূত্র ধরে সশস্ত্র আন্দোলন শুরু করে খ্রিষ্টানপ্রধান প্রদেশটি। সেনাবাহিনীতে কর্মরত জাতিগত কাচিন সম্প্রদায়ের লোকেরা বাহিনী ত্যাগ করে গড়ে তোলে পৃথক বিকল্প বাহিনী। শুরু হয় সরকারের সাথে রক্তক্ষয়ী সঙ্ঘাত। ২০১১ সালে এই গ্রুপটির সাথে সংঘর্ষে একসাথেই নিহত হয়েছে ২১১ সরকারি সৈন্য। বিভিন্ন সময় কাচিন বিদ্রোহীদের সাথে সরকারের যুদ্ধবিরতি চুক্তি হলেও তা স্থায়ী হয়নি। কাচিন প্রদেশে সক্রিয় আছে আরাকান আর্মি (কাচিন) নামে আরেকটি বৃহৎ বিদ্রোহী সংগঠন। বর্তমানে সংগঠনটির প্রধান তাওং ম্রাত নাইং। পাশাপাশি আরাকান আর্মি সক্রিয় আছে রাখাইন ও শান প্রদেশ এবং বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে। আরাকান আর্মি (কাইন) নামক পৃথক সংগঠন সক্রিয় আছে কাইন রাজ্যে। এ দুটি সংগঠনই আরাকান জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিদ্রোহ করছে। এ ছাড়া রাখাইন রাজ্যে দীর্ঘ দিন বৌদ্ধ চরমপন্থী ও সরকারের নির্যাতনের শিকার রোহিঙ্গা মুসলমানদের মধ্যে কেউ কেউ সশস্ত্র বিদ্রোহের সাথে জড়িত বলে সরকার অভিযোগ করছে। যদিও রোহিঙ্গাদের কোনো স্বীকৃত বিদ্রোহী সংগঠন নেই।
জাতিগত সঙ্ঘাতে জর্জরিত আরেকটি প্রদেশ শান। স্বাধীনতার আগে সায়ত্তশাসনের বিষয়ে থাই সীমান্তবর্তী প্রদেশটির শান নেতাদের সাথে চুক্তি হয়েছিল স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা অং সানের। কিন্তু স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিরা সেই চুক্তি বাতিল করে। উল্টো আন্দোলরত শানদের ওপর চলে নির্যাতন। তবে তাতে দমে যায়নি শান সম্প্রদায়। বর্তমানে প্রদেশটিতে শান স্টেট আর্মি (সাউথ), শান স্টেট আর্মি (নর্থ), মিয়ানমার ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স আর্মিসহ ছয়টি পৃথক সশস্ত্র সংগঠন সক্রিয় রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে রাখাইনের পর মিয়ানমারের যেকোনো রাজ্যের চেয়ে শানে বেশি অস্থিরতা বিরাজ করছে। বিচ্ছিন্নতাবাদীরা প্রায়ই সরকারি বাহিনীর ওপর হামলা করছে। সব মিলে ছোট-বড় একুশটি বিদ্রোহী গ্রুপ সক্রিয় মিয়ানমারে। এর প্রায় সবই আঞ্চলিক কিংবা জাতিগত বিচ্ছিন্নতাবাদের লক্ষ্যে সংগ্রাম করছে।

বহির্বিশ্বের সাথে সম্পর্ক
সাম্প্রতিক সময়ে মিয়ানমারের সাথে সম্পর্ক জোরদারের ক্ষেত্রে চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমাদের মধ্যে চলছে একটি নীরব প্রতিযোগিতা। মিয়ানমারের ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্বই এর প্রধান কারণ। এশিয়ার বড় ও শক্তিধর দুটি দেশ ভারত ও চীনের সাথে মিয়ানমারের রয়েছে দীর্ঘ সীমান্ত। এ ছাড়া বিশ্ববাণিজ্যে ভারত মহাসাগরের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। মিয়ানমার থেকে ভারত মহাসাগরে প্রবেশের সরাসরি পথ আছে। দেশটির রয়েছে প্রাকৃতি সম্পদের প্রাচুর্যতা। এসব কারণেই দিন দিন বিশ্বরাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে মিয়ানমার।
মিয়ানমারের ওপর অর্থনৈতিক ও সামরিক দিক থেকে সবচেয়ে বেশি প্রভাব চীনের। রাজনৈতিক সঙ্কটের কারণে দেশটির সাথে পশ্চিমা দেশগুলোর বৈরিতার সুযোগে চীন প্রভাব বিস্তার করেছে এখানে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে মিয়ানমারের সামরিক শাসকেরা যখন দেশ চালাতে হিমশিম খেয়েছে, সেটিকেই সুযোগ হিসেবে নিয়েছে চীন। অর্থনৈতিক ও সামরিক সহায়তার সুযোগে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ থেকে ঘনিষ্ঠতর করেছে।
তবে শুরু থেকেই চীনের সাথে উষ্ণ সম্পর্ক ছিল না মিয়ামারের। স্বাধীনতালাভের পর মিয়ানমারের কমিউনিস্ট পার্টির সশস্ত্র আন্দোলনে সমর্থন দিয়েছে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির সরকার। এ নিয়ে মিয়ানমারের সাথে বৈরিতা সৃষ্টি হয় চীনের। তবে ’৮৬তে কমিউনিস্ট বিদ্রোহীদের ওপর সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয় চীন। এর বদলে তারা সম্পর্ক জোরদার করে সামরিক শাসকদের সাথে। ’৮৯ সালে বেইজিং ও রেঙ্গুন ‘উন্নয়ন আগে, পরে গণতন্ত্র’ নামক অদ্ভুত এক নীতি গ্রহণ করে। সামরিক শাসকেরাও সেই সুযোগটা নিয়েছে। কোটি কোটি ডলারের অর্থসাহায্য আর দেশব্যাপী সশস্ত্র বিদ্রোহ দমনে সামরিক সহায়তা চীনকে শক্ত স্থান করে নেয়ার সুযোগ দিয়েছে দেশটিতে। মিয়ানমারের অবকাঠামো নির্মাণ, শিল্প ও প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণে প্রচুর বিনিয়োগ করেছে চীন। সারা বিশ্বের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে সামরিক শাসকদের বছরের বছর দেশ পরিচালনার মূলশক্তি ছিল চীনা-সহায়তা। চীনের প্রশ্রয় পেয়েই দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘন কিংবা ভিন্ন মত দমনে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে দেশটি।
তবে মিয়ানমারের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে পরিবর্তনের হাওয়া লাগতেই দেশটির সাথে সম্পর্ক জোরদারে সচেষ্ট হয় ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র। ইউরোপীয় দেশগুলো মিয়ানমারকে নিজেদের বন্ধু করতে উঠেপড়ে লাগে। চলতি দশকের শুরু দিকেই ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসতে থাকে রাজনৈতিক ধারায়। সু চিকে মুক্তি দিয়ে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ফেরার আভাস দেয় সরকার। পরিবর্তন আসন্ন বুঝতে পেরে ২০১২ সালে দ্বিতীয় দফায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে প্রথম বিদেশসফরেই মিয়ানমার যান বারাক ওবামা। কয়েক দশক ধরেই চীনকে মোকাবেলায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নিজেদের প্রভাব বাড়াতে কাজ করছে যুক্তরাষ্ট্র। তার অংশ হিসেবে মিয়ানমারের প্রতি বন্ধুত্বের হাত বাড়ায় দেশটি। ধীরে ধীরে শুরু হয় সামরিক শাসকদের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া। পশ্চিমা ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ করার পথ খুঁজতে থাকে মিয়ানমারে। এরপর গত বছর সু চির গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর আরো খুলে যায় দুই দেশের সহায়তার দ্বার। সু চি সরকারও চীনের ওপর এককভাবে ভরসা না করে বিশ্বব্যাপী মিত্রতা ছড়িয়ে দিতে আন্তরিক হয়। সর্বশেষ বারাক ওবামা ক্ষমতা ছাড়ার কিছু দিন আগে মিয়ানমারের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেন।
একই রকমভাবে মিয়ানমারের দিকে ঝুঁকেছে ভারত। গত আগস্টে নয়াদিল্লি সফর করেন মিয়ানমারের প্রধানমন্ত্রী থিন কিউ। এ সময় বেশ কিছু সমঝোতা স্মারক ও চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় দেশ দুটির মধ্যে। পূর্ব এশিয়ায় বাণিজ্য প্রসারিত করতে মিয়ানমার ভারতের জন্য চমৎকার একটি সুযোগ হিসেবে কাজ করবে। অন্য দিকে মিয়ানমারের উদ্যোক্তারা মুখিয়ে আছেন ভারতের বিশাল বাজার ধরার জন্য। সহযোগিতার নজির হিসেবে ভারত মিয়ানমারের সিত্তেয় বন্দর নির্মাণে সহযোগিতা দেয়। মিয়ানমারের সাথে সম্পর্কেও ক্ষেত্রে ভারতের যে শুধু বাণিজ্যিক লক্ষ্যই রয়েছে তা নয়; এখানে আছে আঞ্চলিক রাজনীতির জটিল সমীকরণ। ভারতের বৃহৎ শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশের প্রধান শর্ত হচ্ছে এশিয়ায় প্রভাব জোরদার করা এবং চীনকে মোকাবেলা করা। পাশাপাশি মিয়ানমারে চীনের সামরিক স্থাপনাগুলোও ভারতের জন্য উদ্বেগজনক। সে হিসেবে মিয়ানমারের সাথে মিত্রতা কিছুটা হলেও সুবিধাজনক অবস্থায় রাখবে ভারতকে। আঞ্চলিক সামরিক, রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতায় মিয়ানমার যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে ধরণা করা হচ্ছে। চীন ইতোমধ্যেই শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানের সাথে লাভজনক বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন করেছে। নেপালের সাথেও ভারতের চেয়ে চীনের সম্পর্ক ভালো। সে ক্ষেত্রে অনেকটাই পিছিয়ে আছে ভারত। তাই মিয়ানমারে একক চীনা আধিপত্যে ভাগ বসাতে পারলে তা কিছুটা হলেও জোরদার করবে ভারতের প্রভাব। তবে দীর্ঘ দিনের বন্ধু চীনের বিরাগভাজন হতে চায় না সু চি সরকার। সবার সাথে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্কের নীতিই গ্রহণ করেছে তারা।

সাম্প্রদায়িক সঙ্ঘাত ও সংখ্যালঘু নির্যাতন
সাম্প্রদায়িক সঙ্ঘাত ও সংখ্যালঘু নির্যাতনে বিশ্বে শীর্ষসারির দেশ মিয়ানমার। দেশটিতে সরাসরি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সংখ্যালঘুদের উচ্ছেদ ও হত্যাকাণ্ড পরিচালনার মতো ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর যে বর্বর হত্যাকাণ্ড চালানো হয়েছে তা ইতিহাসে বিরল।
দেশটিতে সরাসরি সরকারিভাবে রোহিঙ্গা মুসলমানদের নির্মূল করার অভিযান শুরু হয়েছে। এই অভিযানে কাজ করছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। হিটলারের নাৎসি বাহিনীর পরে সশস্ত্রবাহিনী কর্তৃক সংখ্যালঘুদের এমন নির্যাতনের ঘটনা ইতিহাসে বিরল। নাগরিকত্ব অস্বীকার করে, অবৈধ বিদেশী আখ্যা দিয়ে বিশাল এই জনগোষ্ঠীকে তাদের পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করার চেষ্টা চলছে। জাতিসঙ্ঘের মতে, রোহিঙ্গারা বিশ্বের সবচেয়ে নির্যাতিত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। অথচ ইতিহাস বলছে রোহিঙ্গারাই মিয়ানমারের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় আরাকান বা রাখাইন রাজ্যের আদিবাসী।
১৯৮২ সালে জেনারেল নে উইন সরকারের সময়ে গৃহীত ‘বার্মিজ জাতীয়তা আইনে’ রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব অস্বীকার করা হয়। রাষ্ট্রীয়ভাবে অবহেলা আর বঞ্চনার শিকার রোহিঙ্গাদের ওপর সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় হামলাা খড়গ নামে ২০১২ সালে। লাখ লাখ রোহিঙ্গা দেশ ছেড়ে পালায় জীবন বাঁচাতে। যারা পালাতে পারেনি জীবন দিয়েছে ধর্মান্ধদের হাতে। সে বছর জুলাই মাসে অনুষ্ঠিত জাতীয় আদমশুমারিতে রোহিঙ্গাদের অন্তর্ভুক্ত না করে তাদেরকে ‘রাষ্ট্রহীন বাঙ্গালি মুসলমান’ হিসেবে আখ্যায়িত করে জান্তা সরকার। আর সর্বশেষ ২০১৬ সালের নভেম্বরে যা হয়েছে তাকে শুধু গণহত্যার সাথেই তুলনা করা যায়। সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের নাম করে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে অঘোষিত যুদ্ধে নামে সেনাবাহিনী। নির্বিচারে হত্যা, ধর্ষণ আর অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটায় সেনাসদস্যরা। বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া নারী ও তরুণীদের লাশ পাওয়া যায় রাস্তা কিংবা জঙ্গলের ধারে। বাড়িতে আগুন দিয়ে তার মধ্যে ছুড়ে ফেলা হয় অবুঝ শিশুদের। দুই মাসে নিহত হয়েছে কয়েক শ’ রোহিঙ্গা। কয়েক হাজার ঘর-বাড়ি-মসজিদে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। নতুন করে উদ্বাস্তু হয়েছে ৪০ হাজার লোক। যুদ্ধক্ষেত্রের মতো হেলিকপ্টার গানশিপ থেকে নির্বিচারে গুলি চালানো হয়েছে রোহিঙ্গাদের ওপর। পুরো অঞ্চলটি অবরোধ করে কোনো পর্যবেক্ষক, সাংবাদিক বা ত্রাণকর্মীকে ঢুকতে দেয়া হয়নি। সব দেখেও না দেখার ভান করে ছিলেন সু চি। অথচ তার সরকার ক্ষমতায় আসার পর মানবাধিকার পরিস্থিতি উন্নত হবে বলে আশা ছিল সবার। আন্তর্জাতিক মহলের চাপে নামকাওয়াস্তে তদন্ত চালিয়েছেন রোহিঙ্গ গণহত্যা বিষয়ে। সরাসরি সাফাই গেয়েছেন সেনাবাহিনীর।
রোহিঙ্গা ছাড়াও জাতিগত কারিন, চিন, খ্রিষ্টধর্মপ্রধান কাচিন জাতিগোষ্ঠীর ওপর ব্যাপক বৈষম্য ও নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে। সব মিলে মোট ১৩৫টি জাতিগোষ্ঠীর বাস মিয়ানমারে। যার মধ্যে অনেকেই সংখ্যাগুরুদের বৈষম্যের শিকার।

Sunday, February 19, 2017

অস্ত্রের জোরে ব্যবসাই ছিল মূলমন্ত্র

অস্ত্রের জোরে ব্যবসাই ছিল মূলমন্ত্র অস্ত্রের জোরে ব্যবসাই ছিল মূলমন্ত্র
সেকালে কার কত ক্রীতদাস আর রত্নরাজি ছিল, তা দিয়েই সম্পদের হিসাব হতো। এ যুগে ধনকুবেরদের ঐশ্বর্যের প্রকাশ ঘটে সুপারইয়ট, জেট ও অবকাশকেন্দ্রের ফিরিস্তিতে।
সম্পদ ও সম্পদশালীর সাদৃশ্য-বৈসাদৃশ্যের বয়ান— জন ক্যাম্পফনারের দ্য রিচ অবলম্বনে ধারাবাহিক আয়োজন ইয়ান হুইহেন ফ্যান লিনচোটেন পেশায় যাজক। জাতীয়তা ডাচ। গোয়ায় পর্তুগিজ আর্চবিশপের পক্ষে কাজ করতেন তিনি। ইতিনিনারিও নামে একটি বই লেখেন ইয়ান। মসলাজাতীয় বিভিন্ন উদ্ভিদের বর্ণনাসংবলিত বই। দূর দেশে নাবিকদের অভিযাত্রা ও মসলা বাণিজ্যের গল্প শুনে ডাচরা বিপুল সংখ্যায় উদ্দীপ্ত হতে থাকে। ইয়োহান ফ্যান ওলডেনবারনফেলট নামের এক ব্যবসায়ী এ হুজুগকে নিয়ন্ত্রণে আনতে উদ্যোগী হন।

১৬০২ খ্রিস্টাব্দে ইয়োহান ছয়টি প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানিকে একীভূত করে ফেরেনিগড ইস্ট ইন্ডিজ কোম্পানি (ভিওসি) গঠন করেন। এটাই ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। হিরেন সেভেনটিন বা সেভেনটিন জেন্টলম্যান নামে কোম্পানির একটি পরিচালনা পর্ষদ গঠন করা হয়। শেয়ারহোল্ডার অর্থনীতির পুরোধা এই কোম্পানি। যে কেউ ভিওসিতে বিনিয়োগ করতে পারতেন এবং লগ্নি অনুযায়ী মুনাফা পেতেন। ক্রমে ক্রমে বিদেশীদের জন্যও ভিওসির শেয়ার উন্মুক্ত হয়। 

ভিওসি বা ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঠিকুজিতে মিশে ছিল একটি বিষয়: একচেটিয়াত্ব। কোম্পানি গঠনের উদ্দেশ্য হিসেবে ‘উত্তমাশা অন্তরীপ থেকে ম্যাজিলান প্রণালি পর্যন্ত এলাকায় সব ধরনের বাণিজ্যে প্রাথমিকভাবে ২১ বছরের জন্য একচেটিয়াত্ব প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়। পরবর্তী দুই দশকে এ কোম্পানি পৃথিবীর অর্ধেক জায়গাকে এক অর্থে নিজেদের করায়ত্ত করে ফেলে। স্বভাবতই সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী ও বেপরোয়া মানুষগুলো এ কোম্পানিতে চাকরি নেয়।

ভিওসিতে চাকরি নেয়া মানুষদের একজন ইয়ান পিটারসুন কোয়েন। ১৬০৭ খ্রিস্টাব্দে অ্যাসিস্ট্যান্ট মার্চেন্ট হিসেবে তিনি সমুদ্রযাত্রা করেন। তিন বছর তিনি ইস্ট ইন্ডিজে ছিলেন। ১৬১২ খ্রিস্টাব্দে ইয়ান যখন দ্বিতীয়বার যাত্রা করেন, তত দিনে তিনি সিনিয়র মার্চেন্ট পদে উন্নীত হন। সেবার তিনি দুটি জাহাজের কমান্ড পান।

এশিয়ায় থাকাকালে ইয়ান একটি ব্যবসায়িক পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন। হিরেন সেভেনটিনের কাছে তিনি ওই পরিকল্পনা পাঠান। ইয়ান কোম্পানিকে জায়ফল, লবঙ্গ ও দারচিনির ব্যবসায় একচেটিয়াত্ব প্রতিষ্ঠার পরামর্শ দেন। কারণ এ মসলাগুলো রান্নার জন্য অপরিহার্য, আবার ঔষধি গুণও রয়েছে। একচেটিয়াত্ব প্রতিষ্ঠায় ইয়ান প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ গ্রহণের পরামর্শ দেন। তিনি লেখেন, ‘কোনো স্থানীয় অথবা বিদেশী কোম্পানিকে এ পথে দাঁড়াতে দেয়া যাবে না।’ কোম্পানির পরিচালকদের উদ্দেশে ইয়ান লেখেন, ‘আপনারা নিশ্চয়ই জানেন যে এশিয়ায় নিজেদের অস্ত্রের জোরে ব্যবসা করতে ও ব্যবসাকে রক্ষা করতে হবে। ব্যবসায়ের মুনাফা থেকেই অস্ত্রের ব্যয় বহন করতে হবে। কারণ আমরা যুদ্ধ ছাড়া বাণিজ্য করতে পারব না, বাণিজ্যের উদ্দেশ্য ছাড়া যুদ্ধ করব না।’ইয়ানের এ বাক্যই ডাচ ইন্ডিয়া কোম্পানির মূলমন্ত্র হয়ে ওঠে।

কোম্পানি মনে করত, সম্পদ অধিকার ও আহরণে অস্ত্রশক্তি একটি জরুরি হাতিয়ার। যেকোনো প্রয়োজনে কোম্পানি চূড়ান্ত সহিংসতার জন্য প্রস্তুত থাকত। এজন্য নিজস্ব সেনাবাহিনী গড়ে তোলা হয়। ডাচ কর্মীরা হল্যান্ডে কোম্পানির অফিস ও জাহাজঘাটে নিয়োগ পেত। সৈন্যদের নেয়া হতো জার্মানি ও ফ্রান্স থেকে। পুরোদস্তুর একটি রাষ্ট্রের মতো আচরণে অভ্যস্ত হয় এ কোম্পানি।

মসলা ব্যবসায় মুনাফা ছিল বিরাট। এশিয়ায় এক বিলেতি পেনির চেয়ে কম খরচে ১০ পাউন্ড জায়ফল কেনা যেত। ইউরোপে একই পরিমাণ জায়ফল ক্রয়মূল্যের ৮০০ গুণের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হতো। মসলা দ্বীপ তথা ইন্দোনেশিয়া থেকে আনা লবঙ্গ ভারতে পৌঁছালেই তার দাম ১০০ গুণ বেড়ে যেত। লিসবন যেতে যেতে ওই লবঙ্গের দাম বাড়ত ২৪০ গুণ। ১৬৩০-৭০ সময়কালে ভিওসি শেয়ারহোল্ডাররা বার্ষিক ১০ শতাংশ অথবা আরো বেশি হারে ডিভিডেন্ড ভোগ করতেন।

ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রসারের পাশাপাশি ইয়ানের ক্যারিয়ারও এগোতে থাকে। ১৬১৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি কোম্পানির মহাহিসাবরক্ষক, পরের বছর জাভার বান্টাম দ্বীপে বাগান ও ট্রেডিং কার্যক্রমের প্রধান, এর পর ভিওসির ট্রেড বিভাগের ডিজি এবং সবশেষে ১৬১৯ খ্রিস্টাব্দে ইস্ট ইন্ডিজের গভর্নর জেনারেল পদে নিয়োগ পান। গভর্নর জেনারেল হয়ে ইয়ান কোম্পানির নতুন সদর দপ্তর প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। এজন্য তিনি জাকার্তাকে বেছে নেন। জাকার্তার দখল পেতে কোম্পানির সৈন্যরা স্থানীয়দের বসতিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। জোরপূর্বক অন্যকে তাড়িয়ে তার জায়গা দখল ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রেওয়াজে পরিণত হয়েছিল।

ইয়ান দুবার গভর্নর জেনারেল পদে দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় তিনি অনেকগুলো নৌ-রুট উন্মোচন করেন। পরবর্তী দুই দশকে কোম্পানি এসব রুট অনুসরণ করে। কোম্পানির পুঁজি ভিত্তি শক্ত করতে ইয়ান কিছু পরিকল্পনা করেন। সে অনুযায়ী সুমাত্রায় ভারতীয় কাপড় বিক্রি করে কোম্পানি মরিচ কিনত। একইভাবে জাপানে চীনা পণ্য বিক্রি করে তারা রুপা সংগ্রহ করত। আবার শ্রীলংকা থেকে হাতি কিনে সেগুলো সিয়ামে বিক্রি করা হতো।

এভাবে একেকটি নতুন রুট উন্মোচনের পর কোম্পানি অর্থনৈতিক ও সামরিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় মরিয়া হতে থাকে। বিভিন্ন অঞ্চলে কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানগুলোয় কোম্পানি সশস্ত্র অগ্রবর্তী দল পাঠাত। নিত্যনতুন জায়গায় পতাকা ওড়ানো, দখল দাবি করা, সংঘর্ষ— এমনকি প্রকাশ্য যুদ্ধ ছিল কোম্পানির পরিচালন ধারার অংশ।

ষোলো শতকের শেষ দিকে ডাচদের এ ট্রেডিং চর্চা পৃথিবীকে সম্পূর্ণ নতুন এক অর্থনীতির সঙ্গে পরিচিত করায়। সময়টাকে বিশ্বায়নের সূচনাকাল বলা যায়। ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বা ভিওসিকে বলা যায় প্রথম বৈশ্বিক কনগ্লোমারেট। উত্পাদক, ভোক্তা, মধ্যস্থতাকারী, পণ্য পরিবহনকারী ও বিক্রেতা— বিভিন্ন পর্যায়ে ১৬২৫ সাল নাগাদ কোম্পানির কর্মিসংখ্যা ১৫ হাজারে উন্নীত হয়। এটা এমন সময়ের কথা, যখন কয়েকশ কর্মীকেই বড় জনবল ভাবা হতো। ইয়ানের পরিকল্পনায় কোম্পানি এ পর্যায়ে উন্নীত হয়। তাকে বলা যায়, হল্যান্ডের স্বর্ণযুগের কমোডিটি কিং।

জন ক্যাম্পফনারের দ্য রিচ অবলম্বনে 

Thursday, February 9, 2017

স্যাপিয়েন্সঃ মানবজাতির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস by Yuval Noah Harari পর্ব ১ঃ বুদ্ধিমত্তার বিপ্লব- প্রথম অধ্যায়

পর্ব ১ঃ বুদ্ধিমত্তার বিপ্লব- প্রথম অধ্যায়
গুরুত্বহীন একটি প্রাণী
তেরোশো পঞ্চাশ কোটি বছর আগে Big Bang বা মহাবিস্ফোরণের মাধ্যমে জন্ম নিল বস্তু, শক্তি, সময় এবং স্থান। পদার্থবিজ্ঞানীরা আমাদের বিশ্বব্রহ্মহান্ডের এসব মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে গবেষণা করেন।
এর তিন লক্ষ বছর পর পদার্থ এবং শক্তির মিলনে জন্ম নিতে শুরু করলো বিভিন্ন পরমাণু এবং এসব পরমাণুর পারস্পরিক বিক্রিয়ায় ফলে অণু। রসায়ন এসব অণু পরমাণুর ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া ব্যাখ্যা করে।
তারপর, আজ থেকে তিনশ আশি কোটি বছর আগে, পৃথিবী নামের এক গ্রহে বিশেষ কিছু অণুর সমন্বয়ে খুব জটিল ধরনের বস্তু তৈরি হতে লাগল, যেগুলোকে বলা চলে জীব বা প্রাণ, ইংরেজিতে যাকে বলে organism। এই জীব অথবা organism এর বিজ্ঞান হচ্ছে জীববিজ্ঞান।
আর মাত্র সত্তুর হাজার বছর আগে হোমো স্যাপিয়েন্স (Homo sapiens) প্রজাতির জীবেরা তৈরী করতে শুরু করলো আরো জটিল ধরনের সংগঠন, যাকে বলা হয় সংস্কৃতি। মানব সংস্কৃতির উত্তরোত্তর বিকাশের কাহিনিই হল ইতিহাস।
তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিপ্লব এই ইতিহাসের গতিপথ নির্ধারণ করেছে। বুদ্ধিমত্তার বিপ্লব সত্তুর হাজার বছর আগে ইতিহাসের জন্ম দিয়েছে, কৃষি বিপ্লব বারো হাজার বছর আগে একে গতিময় করেছে আর বৈজ্ঞানিক বিপ্লব আজ থেকে মাত্র পাঁচশ’ বছর আগে শুরু হয়ে অকল্পনীয় সব নতুন নতুন ইতিহাস তৈরি করছে। এই বৈজ্ঞানিক বিপ্লবই হয়ত অদূর ভবিষ্যতে ইতিহাসের মৃত্যু ঘটিয়ে সম্পূর্ণ নতুন কিছুর জন্ম দেবে। কিভাবে এই তিন বিপ্লব মানুষ এবং মানুষের সহযাত্রী অন্য সব প্রাণীর জীবন গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে, এই বইয়ে সেটাই বলা হবে।
ইতিহাস শুরুর বহুকাল আগেও মানুষ ছিল। আসলে প্রায় মানুষের মত জীব পৃথিবীতে এসেছে পঁচিশ লক্ষ বছর আগে। কিন্তু মাত্র সত্তুর হাজার বছর আগে পর্যন্ত এরা অন্যান্য প্রাণীর তুলনায় বিশেষ কিছুই ছিল না। বিশ লক্ষ বছর আগের পূর্ব আফ্রিকায় আমরা যদি ফিরে যেতে পারতাম, তাহলে খুব সম্ভবত দেখা পেয়ে যেতাম এসব আদিম মানুষের। আমরা দেখতে পেতাম যে তাদের চরিত্রও আমাদের থেকে খুব আলাদা কিছু নয়। এই আদিম মানবসন্তানেরা ভালবাসত, খেলত, বন্ধুত্ব করত, আবার ক্ষমতা আর পদমর্যাদার লোভে প্রতিযোগিতাও করত। কিন্তু এসব তো শিম্পাঞ্জি, বেবুন অথবা হাতিও করত! তাই একে মানবজাতির একক কৃতিত্ব মোটেই বলা যায়না।
তখনকার মানুষ স্বপ্নেও ভাবেনি যে তাদেরই বংশধর একদিন চাঁদে পা রাখবে, পরমানু ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করবে, genetic code পড়তে পারবে অথবা ইতিহাসের বই লিখবে। প্রাগৈতিহাসিক যুগের মানুষ সম্পর্কে সবচয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এই যে তারা ছিল নিতান্তই নগণ্য। পৃথিবীর ওপর তাদের প্রভাব গরিলা, জোনাকিপোকা অথবা জেলিফিসের চেয়ে বেশি কিছু ছিল না।
জীববিজ্ঞানীরা প্রাণীজগতকে (এবং উদ্ভিদজগতকেও) বিভিন্ন প্রজাতিতে (Species) ভাগ করেন। যেসব প্রাণী পারস্পরিক দৈহিক মিলনে উর্বর বংশধর জন্ম দিতে পারে, তাদের একই প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ঘোড়া আর গাধা একই পূর্বপুরুষ থেকে এসেছে এবং সেটা খুব বেশি আগের কথাও নয়। তাই তাদের অনেক শারীরিক বৈশিষ্ট একই রকম। কিন্তু ঘোড়া এবং গাধাকে নিজের ইচ্ছায় কখনো মিলিত হতে দেখা যায়না। যদিও এদের পারস্পরিক মিলনে বাচ্চার জন্ম হয়, কিন্তু বাচ্চাটি ঘোড়াও হয়না গাধাও হয়না, হয় খচ্চর। খচ্চর কখনো সন্তানের জন্ম দিতে পারে না। তাই গাধার ডিএনএতে সময়ের সাথে যে পরিবর্তন (mutation) হয়, তা কখনো ঘোড়া দেহে স্তানান্তরিত হতে পারে না। একই ভাবে ঘোড়ার দেহ থেকে গাধার দেহেও তা আসতে পারে না। এই দুটি প্রাণী বিবর্তনের দুই ভিন্ন পথে হেঁটে চলছে, তাই এদেরকে দুটি ভিন্ন প্রজাতি হিসাবে গণ্য করা হয়। অন্যদিকে, বুলডগ এবং স্প্যানিয়েল দেখতে একদম আলাদা হলেও তারা কুকুর প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত, কারণ তারা একই ডিএনএ ভান্ডারের এর শরিক। বুলডগ আর স্প্যানিয়েলের মিলনে যে কুকুরছানার জন্ম হয় তারা বড় হয়ে অন্য কুকুরের সাথে মিলিত হয়ে আরো কুকুরছানার জন্ম দিতে পারে।
যেসব প্রজাতি একই পূর্বপুরুষ থেকে বিবর্তিত হয়ে এসেছে তাদের জীববিজ্ঞানীরা একই গণ(Genera) এ ফেলেন। সিংহ, বাঘ, চিতা এবং জাগুয়ার ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতি তবে তারা একই গণ প্যান্থেরার (Panthera) অন্তর্ভুক্ত। জীববিজ্ঞানে জীবের নামকরণ হয় লাতিন ভাষায়, যার দুটি অংশ থাকে। প্রথম অংশ হলো গণ আর পরের অংশ হলো প্রজাতি। যেমন, সিংহের বৈজ্ঞানিক নাম হলো Panthera Leo – Panthera গণের অন্তর্ভুক্ত Leo প্রজাতির প্রাণী। আমি মোটামুটি নিশ্চিত, এই বই যারা পড়ছেন তারা সবাই হোমো স্যাপিয়েন্স (Homo Sapience), হোমো (দ্বিপদী)গণের অন্তর্ভুক্ত স্যাপিয়েন্স (প্রাজ্ঞ)প্রজাতির প্রাণী।
একই ধরনের গণগুলোকে আবার একটি নির্র্দিষ্ট গোত্র(Family) এর সদস্য হিসেবে গণ্য করা হয়, যেমন বেড়াল (Felidae) গোত্র, যার ভেতরে আছে সিংহ, চিতা, বেড়াল, ইত্যাদি, কুকুর (Canidae) গোত্রে যার ভেতরে আছে নেকড়ে, শেয়াল, কুকুর, ইত্যাদি, এবং হাতি (Elephantidae) গোত্র, যার সদস্য হচ্ছে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া ম্যামথ এবং মাস্টাডন আর হাতি। একটা গোত্রের সব সদস্যের পূর্বপুরুষ একই। যেমন ঘরের ছোট্ট মিনি বেড়াল থেকে শুরু করে ভয়ংকর সিংহ, সবার পূর্বপুরুষ এক ধরনের আদিম বেড়াল, যারা আজ থেকে পঁচিশ লক্ষ বছর আগে পৃথিবীর বুকে ঘুরে বেড়াত|
হোমো স্যাপিয়েন্সও একটা গোত্রের সদস্য। কিন্তু এই সাধারণ বিষয়টিই এতদিন ধরে ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে গোপন কথা। হোমো স্যাপিয়েন্স প্রজাতি এতদিন পর্যন্ত নিজেদের পুরো প্রাণীজগত থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এক বিশেষ জাতিসত্বা বলে ভাবতে ভালবাসত, যেন এমন এক অনাথ যার কোন পরিবার নেই, নেই কোন আত্মিয় স্বজন আর সবচেয়ে বড় বিষয়, যার কোন পূর্বপুরুষও নেই। কিন্তু সেটা একেবারই ঠিক নয়। আমাদের শুনতে ভালো লাগুক আর নাই লাগুক, হোমো স্যাপিয়েন্স হলো বিরাট এক গোত্র উল্লুক বা গ্রেট এইপস (Great Apes) এর সদস্য। আমাদের সবচে কাছের জীবিত আত্বীয় স্বজনের মধ্যে আছে গরিলা, শিম্পাঞ্জি এবং ওরাংওটাং। এদের মধ্যে শিম্পাঞ্জি আবার ঘনিষ্টতম আত্মীয়। মাত্র ষাট লক্ষ বছর আগে এক এইপ জননীর দুই মেয়ে হলো, তাদের একজন হলেন শিম্পাঞ্জিদের মা আরে আরেকজন হলেন আমাদের মাতামহ।
মানুষের গুপ্ত ইতিহাস
আমরা, হোম স্যাপিয়েন্সরা, আসলে এর চেয়েও অস্বস্তিকর আরেকটা কথা এতদিন গোপন রেখেছি। আমাদের যে শুধু দূর সম্পর্কের বুনো আত্মিয় স্বজন আছে তাই নয়, এক সময় আমাদের বেশ কয়েকজন আপন ভাইবোনও ছিল। আমরা ভাবতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি যে আমরাই পৃথিবীর একমাত্র মানবজাতি (human)। তার কারণ হচ্ছে গত হাজার দশেক বছর ধরে আমরা আসলেই তাই। কিন্তু ইংরেজীতে human শব্দের বৈজ্ঞানিক সংজ্ঞা হচ্ছে হোমো গণের অন্তর্ভূক্ত যে কোন প্রাণী। এক সময় এই গণের ভেতরে আরো অনেক প্রাণী ছিল।এমনকি অদুর ভবিষ্যেতে হয়ত আমাদের অ-স্যাপিয়েন্স (non-sapience) প্রজাতির ‘মানুষের’ মুখোমুখিও হতে হবে। এই বিষয়টা এই বইয়ের একদম শেষের দিকে আসবে। এখন থেকে আধুনিক মানুষ বোঝাতে আমি সবসময় হোমো স্যাপিয়েন্স শব্দটি ব্যাবহার করব। আর মানুষ বা মানবজাতি শব্দটি রেখে দেব হোমো স্যাপিয়েন্স সহ বর্তমানে বিলুপ্ত হোমো গনের সব প্রজাতির কথা বোঝাতে।
প্রায় পঁচিশ লক্ষ বছর আগে অস্ট্রালোপিথেকাস (Australopithecus) নামের এক এইপ গণের বিবর্তনে প্রথম মানুষের আবির্ভাব। অস্ট্রালোপিথেকাসের অর্থ হচ্ছে দক্ষিনদেশীয়(আফ্রিকার)এইপ। বিশ লক্ষ বছর আগে এই আদিম মানব-মানবীদের কেউ কেউ তাদের আদি নিবাস ছেড়ে যাত্রা শুরু করে ছড়িয়ে পড়ে উত্তর আফ্রিকা, এশিয়া এবং ইউরোপের বিস্তির্ণ এলাকাজুড়ে। উত্তর ইউরোপের তুষারঢাকা প্রকৃতিতে বেঁচে থাকতে হলে যে ধরনের শারিরীক বৈশিষ্ট প্রয়োজন, ইন্দোনেশিয়ার উষ্ণ, আর্দ্র পরিবেশে তার থেকে সম্পূর্ণ অন্যরকম বৈশিষ্টের প্রয়োজন। তাই এই দুই অঞ্চলের মানুষের বিবর্তন সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে হয়েছে। একইভাবে পৃথিবির বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়া মানুষের বিবর্তন হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন ধারায়। এর ফলে কালক্রমে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় আলাদা আলাদা মানব প্রজাতির জন্ম হয়েছিল, বিজ্ঞানীরীরা যাদের নানারকম গালভরা লাতিন নাম দিয়েছেন।
ইওরোপ এবং পশ্চিম এশিয়ার মানুষেরা বিবর্তিত হয়ে হলো হোমো নিয়ান্ডারথালেসিস (Homo neanderthalensis), নিয়ান্ডার (Neander) উপত্যকার মানুষ, সাধারনভাবে যাদের আমরা নিয়ান্ডার্থাল বলে থাকি। নিয়ান্ডার্থাল মানুষের দেহ ছিল আমাদের চেয়ে পেশীবহুল এবং সুগঠিত। তারা এভাবে অভিযোজিত হয়েছিল ইউরেসিয়ার বরফযুগ মোকাবেলা করতে করতে। আর এশিয়ার পূব দিকে যে মানব প্রজাতির আবির্ভাব হল, তাদের বলা হয় হোমো ইরেক্টাস (Homo erectus) বা ‘খাঁড়া মানব’। মানুষের বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে হোমো ইরেক্টাসরা সবচে দীর্ঘ সময় পৃথিবীতে টিকে ছিল, প্রায় বিশ লক্ষ বছর। এই রেকর্ড খুব সম্ভবত আমদের প্রজাতিও ভাংতে পারব না। হোমো স্যাপিয়েন্স আগামী এক হাজার বছর বেঁচে থাকবে কি না, সে বিষয়েই যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ আছে। বিশ লক্ষ বছর তো অনেক দূরের ব্যাপার।
ইন্দোনেশিয়ার জাভা দ্বীপে বাস করত হোম সোলোন্সিস (Homo soloensis), সোলো উপত্যকার মানুষ। এরা গৃষ্মমন্ডলীয় এলাকায় বসবাসের উপযোগী হিসাবে অভিযোজিত হয়েছিল। ফ্লোরেস নামের ইন্দেনেশিয়ার আরেকটি ছোট দ্বীপে প্রাচীন মানুষেরা বিবর্তনের ফলে খাটো হয়ে গিয়েছিল। বরফযুগে যখন সমুদ্রপৃষ্ঠ অস্বাভাবিকভাবে নীচে নেমে এসেছিল, তখন এই দ্বীপে মানুষের সহজ যাতায়ত ছিল। তারপর সমুদ্রপৃষ্ঠ যখন ওপরে উঠে এল, তখন কিছু মানুষ এখানে আটকা পড়ে গেল। এই দ্বীপে খাবার খুব কম ছিল। বড়সড় মানুষের খাদ্যের চাহিদা থাকে বেশি, তাই তারা না খেয়ে মারা পরল। বেঁচে রইল ছোটখাট মানুষেরা। এভাবে বংশানুক্রমে ফ্লোরেসের মানুষেরা অনেকটা বেঁটে হয়ে গেল। বিজ্ঞানীদের কাছে হোমো ফ্লোরেসিয়েনসিস(Homo floresiensis) নামে পরিচিত ব্যাতিক্রমী এই প্রজাতির মানুষদের উচ্চতা ছিল সর্বোচ্চ মাত্র এক মিটার (৩.৩ ফিট)এবং সর্বোচ্চ ওজন ছিল মাত্র পঁচিশ কেজি। কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা পাথরের বিভিন্ন সরঞ্জাম বানাতো। এমনকি মাঝেসাঝে তারা হাতিও শিকার করে ফেলত, যদিও বলতে হবে যে ফ্লোরেসের হাতীগুলোও সেখানকার লোকেদের মত ছোটখাটই ছিল।
মাত্র ২০১০ সালে আরেকটি হারিয়ে যাওয়া মানব প্রজাতির খবর পাওয়া গেল। সাইবেরিয়ার ডেনিসোভা গুহা খনন কাজের সময় বিজ্ঞানীরা একটা আঙ্গুলের ফসিল খুজে পান। এর জিন বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন যে এই আঙ্গুলটি একদম ভিন্ন কোন মানব প্রজাতির, যাদের সন্ধাণ আমরা আগে পাইনি। এই প্রজাতির নাম দেওয়া হল হোমো দেনিসোভা (Homo denisova)। কে জানে আমদের এরকম হারিয়ে যাওয়া আরো আত্মিয় স্বজন কোন গুহায় বা কোন দ্বীপে আমাদের অপেক্ষায় আছে?
যখন ইউরোপ আর এশিয়ার মানুষেরা বিবর্তিত হচ্ছিল, তখন যে পূর্ব আফ্রিকার মানুষেরা বসে ছিল তা নয়। আদি মানবের জন্মভূমি একের পর এক নতুন প্রজন্মের জন্ম দিয়ে যাচ্ছিল। তাদের মাঝে আছে হোমো রুডলফেন্সিস(Homo rudolfensis) বা লেক রুডলফের মানুষ এবং হোমো এর্গাষ্টার (Homo ergaster) বা কাজের মানুষ। এদের কেউ কেউ ছিল বিশালদেহী, কেউ কেউ ছিল ছোটখাটো। কেউ ছিল চৌকস শিকারী আবার কেউবা ছিল নিরীহ, নিরামিশাষী। কোন কোন প্রজাতি একটা দ্বীপেই সীমাবদ্ধ ছিল, আবার কোনটা ছড়িয়ে পড়েছিল মহাদেশ থেকে মহাদেশে। শেষ পর্যন্ত আফ্রিকাতেই এলাম আমরা, আর বেহায়ার মত নিজেদের নাম দিলাম হোমো স্যাপিয়েন্সে বা প্রাজ্ঞ মানুষ। তবে হোমো স্যাপিয়েন্স হোক আর হোমো এর্গাষ্টার হোক, আমরা সবাই হোম গনের অন্তর্ভুক্ত প্রজাতি, আমরা সবাই হিউমান বা মানুষ।
বিবর্তন নিয়ে আমাদের বেশিরভাগের একটা ভীষণ রকম ভুল ধারনা আছে। আমরা ভাবি যে বিবর্তন একটা সরলরেখায় চলে। ইন্টারনেটে ‘মানুষের বিবর্তন’ লিখে খোঁজ করলেই যে ছবিটা চলে আসে, সেটা দেখলে মনে হয় যে এরগাষ্টার মায়ের কোলে জন্ম নিল ইরেক্টাস, ইরেক্টাস প্রজাতি বিবর্তিত হয়ে জন্মাল নিয়ান্ডার্থাল আর নিয়ান্ডার্থাল প্রজাতির বিবর্তনে স্যাপিয়েন্স। এই সরলরৈখিক বিবর্তনের ধারণার কারণে আমরা ভাবি, একটা নির্দিষ্ট সময়ে শুধু এক প্রজাতির মানুষ এই পৃথিবীতে বেঁচে ছিল। বিভিন্ন প্রজাতির মানুষের সহাবস্থান আমরা কল্পনা করতে পারি না। কিন্তু আসলে বিশ লক্ষ থেকে মাত্র দশ হাজার বছর আগে পর্যন্ত বিভিন্ন প্রজাতির মানুষ এই পৃথিবীতে একই সময়ে বসবাস করেছে। সেটা অসম্ভবই বা হবে কেন? আজকের দিনেও কি আমরা একই গণের বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীর সহাবস্থান দেখতে পাই না, যেমন নেকড়ে আর কুকুর? মাত্র এক লক্ষ বছর আগেও পৃথিবীতে অন্তত ছয় প্রজাতির মানুষ একই সময় হেঁটে বেড়িয়েছে। আসলে ভেবে দেখলে বোঝা যাবে, বিভিন্ন প্রজাতির মানুষের সহাবস্থানটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। বরং হোমো স্যাপিয়েন্স প্রজাতির একক রাজত্বটাই অস্বাভাবিক। এমনকি এই একক রাজত্বটা ন্যায়সংগত কি না সে বিষয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। একটু পরেই আমরা জানব যে অন্যান্য মানব প্রজাতির ইতিহাস মুছে ফেলার যথেষ্ট কারণ হোম স্যাপিয়েন্সদের ছিল। হয়ত একারনেই তাদের সম্পর্কে আমরা এতদিন অজ্ঞ ছিলাম?
বুদ্ধিমত্তার মূল্য
বিভিন্ন প্রজাতির মানুষের মাঝে অনেক পার্থক্য আছে সত্যি। আবার এদের মধ্যে অনেক মিলও আছে যা অন্য কোন প্রাণীর সাথে মেলে না। প্রথমত, সব প্রজাতির মানুষের মস্তিষ্কের আকার অন্যান্য যে কোন প্রাণীর তুলনায় অস্বাভাবিক রকমের বড়। কোনো স্তন্যপায়ী প্রাণীর ওজন যদি ষাট কিলোগ্রাম হয়, তবে এর মস্তিষ্কের আকার হয় সাধারাণত দু’শ ঘন সেন্টিমিটার। সেখানে পঁচিশ লক্ষ বছর আগের আদিমতম মানব মানবীর মস্তিষ্ক ছিল ৬০০ ঘন সেন্টিমিটার। আধুনিক মানুষ বা হোমো স্যাপিয়েন্সদের মস্তিষ্ক হয় ১২০০ থেকে ১৪০০ ঘন সেন্টিমিটার। আমাদের জাতভাই নিয়ান্ডার্থালদের মস্তিষ্ক ছিল আরও বড়।
আমাদের কাছে মনে হতে পারে বিবর্তন যে বড় মস্তিষ্কের প্রজাতিগুলোকেই সুবিধা দেবে সে আর আশ্চর্য কি। আমরা নিজেদের বুদ্ধিমত্তায় এতই মুগ্ধ যে আমদের কাছে মনে হওয়াটা খুব স্বাভাবিক যে মস্তিষ্ক যত বড় ততই ভাল। কিন্তু বিশাল মস্তিষ্ক একটা বিশাল বোঝাও বটে। এত বড় মস্তিষ্ক বয়ে বেড়ানো খুব সোজা ব্যাপার না, বিশেষত যেখানে খুলিটা আরো বড় এবং ভারী। মস্তিষ্কের প্রচুর শক্তিও দরকার হয়। যদিও হোমো স্যাপিয়েন্সের মস্তিষ্কের ওজন এর দেহের মাত্র দুই থেকে তিন শতাংশ, স্বাভাবিক অবস্থায় শরীর যখন বিশ্রামে থাকে তখন সমস্ত দেহে যে পরিমান শক্তি ব্যবহৃত হয়, তার চার ভাগের এক ভাগই ব্যবহার করে মস্তিষ্ক। অন্যদিকে এইপ বা শিম্পাঞ্জী জাতের প্রাণীর ক্ষেত্রে এই ব্যবহারের হার মাত্র আট শতাংশ। আদিম মানুষ দুইভাবে এই বিশাল মস্তিষ্কের মূল্য দিয়েছে। প্রথমত, এরা বেশিরভাগ সময় ব্যস্ত থেকেছে খাবারের সন্ধানে এবং দ্বিতীয়ত, এদের দেহের পেশী ধীরে ধীরে ক্ষয় পেয়েছে। গরীব সরকার যেমন শিক্ষা খাত থেকে টাকা সরিয়ে সামরিক খাতে নিয়ে যায়, তেমনি মানুষের শক্তি তাদের পেশি থেকে মস্তিষ্কে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। কাজেই আদিমযুগে মানুষের বড় মস্তিষ্ক যে খুব কাজের কিছু ছিল, তা বলা যায় না। তখন তো আর গ্রাম বা শহর ছিল না। বনে জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানো মানুষের সাথে শিম্পাঞ্জি হয়ত তর্কে হেরে যেত, কিন্তু শিম্পাঞ্জি চাইলেই মানুষকে কাপড়ের পুতুলের মত ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলতে পারত। বাঘ সিংহের কথা নাহয় বাদই দিলাম।
আজকের দিনে আমাদের মস্তিষ্ক অবশ্যই আমাদের সম্পদ। আমাদের বানানো গাড়ি পৃথিবীর দ্রুততম প্রাণীকে অবলীলায় টেক্কা দিয়ে যায়। আমাদের বানানো বন্দুক দিয়ে আমরা হাতীর মত প্রাণীকেও গুলি করে মারতে পারি নিরাপদ দুরত্ব থেকে। আমাদের এখন আর বন্য জন্তুর সাথে কুস্তি করতে হয়না। কিন্তু গাড়ি, বন্দুক এসব হল একেবারেই ইদানিংকার বিষয়। বলতে গেলে গত পঁচিশ লক্ষ বছর ধরেই মানুষের দৌড় ধারালো পাথরের বা কাঠের অস্ত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু তা সত্বেও মানুষের মস্তিষ্কের আকার ক্রমাগত বেড়েছে। বিবর্তন কেন মানুষের এই বিশাল ‘বোঝা’ বাড়তে দিয়েছে? সত্যি কথা বলতে কি, আমাদের কাছে এর ভাল কোন উত্তর নেই।
মানব প্রজাতিগুলোর আরেকটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট হল, দুই পায়ে হাঁটতে পারা। দাঁড়াতে পারার বিশেষ কিছু সুবিধা আছে। দাঁড়িয়ে অনেকটা দূর পর্যন্ত দেখা যায়। হাঁটার কাজ থেকে নিস্তার পাওয়া হাতগুলো অন্য অনেক কাজে, যেমন পাথর ছুঁড়ে মারতে অথবা নিজেদের মাঝে সংকেত আদান প্রদান করতে ব্যবহার করা যায়। তাই দুর্বল প্রাচীন মানুষ হাতের ব্যবহার যত ভালভাবে করতে পারত, তাদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনাও তত বাড়ত। ফলে বিবর্তনের সাথে সাথে মানুষের হাতের পেশী এবং স্নায়ুগুলো ধীরে ধীরে জটিল এবং সুক্ষ কাজের উপযোগী হয়ে উঠলে লাগল। মানুষ হাত দিয়ে অস্ত্র বানাতে পারত সৃষ্টির প্রায় শুরু থেকেই। প্রত্নতত্ববিদরা প্রায় পঁচিশ লক্ষ বছর আগে তৈরি পাথরের অস্ত্র খুঁজে পেয়েছেন। প্রাচীন অস্ত্র এবং অন্যান্য যন্ত্রপাতি এবং এসব ব্যবহারের নিদর্শনগুলোকে প্রত্নতত্ববিদরা সম্ভাব্য আদি মানবের অস্তিত্বের একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসাবে মনে করেন।
তবে দুপায়ে হাঁটার অসুবিধাও আছে। আমদের পুর্বপুরুষদের মেরুদন্ড লক্ষ লক্ষ বছর ধরে অভিযোজিত হয়েছিল চার পায়ে হাঁটার জন্য। তাদের মাথার আকার এবং ওজনও ছিল আমাদের চেয়ে অনেক কম। তাই দুপায়ে হাঁটতে শেখাটা মানুষের জন্য বেশ কঠিন ছিল, বিশেষত এত বড় একটা মুন্ডু কাঁধে করে। মানবজাতির ‘দূরদৃষ্টি’ আর দক্ষ হাতের মূল্য হচ্ছে তাদের কোমর, পিঠ আর ঘাড়ে যখন তখন অযাচিত ব্যথা।
দুপায়ে হাঁটার মূল্য নারীরা দিয়েছে আরো বেশি। স্বভাবতই! দুপায়ে হাঁটার সুবিধার্থে তাদের নিতম্ব সরু হয়ে গেল আর এতে তাদের যোনিপথ সংকুচিত হয়ে পড়ল। অন্যদিকে মানব শিশুর মাথার আকার ক্রমাগত বাড়ছিল। মরার ওপর খাড়ার ঘা। শিশু জন্মকালীন মাতৃমৃত্যু তখন মহামারীর আকার ধারণ করল। শুধু যেসব মায়ের প্রসব হয়ে যেত গর্ভের শিশু পূর্ণতাপ্রাপ্তির আগেই, সেসব ক্ষেত্রে এরকম মৃত্যুর হার ছিল কম। আগে আগে জন্মানোর কারণে সেসব শিশুর দেহ, বিশেষত মাথার আকার হত ছোট। অন্যন্য নারীর তুলনায় তাই এসব মায়েরা বেশি হারে বাঁচতে লাগল এবং আরো সন্তানের জন্ম দিতে লাগল। অদ্ভুত হলেও প্রাকৃতিক নির্বাচন (natural selection) অপূর্ণাঙ্গ জন্মের প্রতি পক্ষপাত দেখাল। বিবর্তনের ফলে তাই মানবশিশুর জন্মের সময় এগিয়ে এল অনেকটা। জন্মের পর পর আমাদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ অংগই পুরোপুরিভাবে বিকশিত হয়না। জন্মের বহু বছর পর পর্যন্ত আমরা পরনির্ভরশীল থাকি। অন্য যেকোন প্রাণীর শিশু মানুষের তুলনায় অনেক দ্রুত স্বনির্ভর হয়। বাছুর জন্মেই তিড়িং বিড়িং করে লাফায়, বেড়ালছানা জন্মের দুই তিন সপ্তাহ পরেই নিজে নিজে খাবার খুঁজে নেয়। কিন্তু আমরা পারি না, আমাদের খাইয়ে পরিয়ে, শিক্ষা দিয়ে তিল তিল করে বড় করতে হয়।
শিশুর এই অসহায়ত্ব একই সাথে মানবজাতি অতুলনীয় সামাজিক দক্ষতা এবং দুর্দশার একটা বিরাট কারণ। আদিমযুগে (এখনো এটা বেশ সত্যি) একা একজন মায়ের পক্ষে নিজের আর সন্তানের খাবার যোগাড় করা ছিল প্রায় অসম্ভব। সন্তান লালন পালনে তাই সর্বক্ষন মাকে আত্বিয়-স্বজন আর প্রতিবেশির সাহায্য নিতে হত। কথায় বলে একটা শিশুর বেড়ে ওঠার জন্য পুরো একটা গ্রাম প্রয়োজন। একদম সত্যি। তাই যেসব মানুষ একটা শক্ত সামাজিক ভিত্তি তৈরি করতে পেরেছিল, বিবর্তনে তারাই টিকে গেল।
আবার শারিরীক ও মানসিকভাবে অপরিপক্ক অবস্থায় জন্ম নেয়ার ফলে মানবশিশুকে শিক্ষা দিয়ে গড়েপিটে নেওয়াও সম্ভব হল, নানারকম ছাঁচে ফেলাও সম্ভব হল। এটা অন্য কোন প্রাণীর ক্ষেত্রে সেভাবে প্রযোজ্য নয়। কুমারের মাটির জিনিষ গড়ার তুলনাটা এখানে বেশ যুতসই। অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর বাচ্চা হল শুকানো পোড়ানো মাটির ঘড়া, যাকে নতুন করে ছাঁচে ফেলা অসম্ভব। আর মানবশিশু হচ্ছে নরম এঁটেল মাটি যা কুমার স্বাধীন হাতের যত্নে আর চাকার ঘুর্নিতে যেমন খুশি তেমন আকার দিতে পারে, নিখুঁতভাবে পালিশ করতে পারে। সে কারনেই আমরা আমাদের শিশুদের শিক্ষা দিতে পারি, তাদেরকে যেমন চাই তেমন করে গড়ে তুলতে পারি, তাদের বানাতে পারি খ্রিস্টান অথবা বৌদ্ধ, সমাজতন্ত্রী অথবা পুঁজিবাদী, যুদ্ধংদেহী অথবা শান্তিপ্রিয়।
আমরা ভাবি যে বড় মস্তিষ্ক, যন্ত্রপাতি ব্যবহারের দক্ষতা, শিখতে পারার অস্বাভাবিক ক্ষমতা আর উন্নত সমাজব্যবস্থা আমাদের জন্য আশির্বাদ। এই কারনেই যে মানুষ পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী প্রাণীতে পরিণত হয়েছে এটা প্রায় দিনের আলোর মতই পরিষ্কার। কিন্তু এতসব গুণ থাকা সত্যেও আদিম মানুষের জন্ম থেকে শুরু করে মাত্র সত্তুর হাজার বছর আগে পর্যন্ত মানুষ পৃথিবীর দুর্বল এবং নগণ্য প্রাণীর কাতারেই রয়ে গিয়েছিল। লক্ষ লক্ষ বছর আগের মানুষ তাদের বিরাট মস্তিষ্ক নিয়ে, যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে, তাদের জ্ঞান দক্ষতা কাজে লাগিয়ে খুব বেশি কিছু করতে পারেনি। তারা সবসময় হিংস্র প্রাণীর ভয়ে কাবু থেকেছে, বহু কষ্টে ছোট ছোট প্রাণী শিকার করেছে, বন থেকে ফলমূল সংগ্রহ করে বেড়িয়েছে, মাটি থেকে পোকামাকড় খুঁটে খেয়েছে আর বাঘ সিংহের ফেলে যাওয়া উচ্ছিস্ট দিয়ে ভুরিভোজ করেছে।
পাথরের অস্ত্রের একটা প্রাচীনতম ব্যবহার হল হিংস্র প্রাণীর খাওয়ার পর ফেলে যাওয়া শিকারের হাড় ভেংগে মজ্জা বের করা। অনেক গবেষক বিশ্বাস করেন, হাড় ভেংগে মজ্জা খেতে পারাটা ছিল মানুবজাতির একন্ত নিজস্ব এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন একটা দক্ষতা। কাঠঠোকরার বিশেষ বৈশিষ্ট যেমন শক্ত কাঠ ঠুকে ঠুকে পুষ্টিকর পোকা বের করে খাওয়া, মানুষের বিশেষ বৈশিষ্ট ছিল ধারালো অস্ত্র দিয়ে হাড় ভেঙ্গে মজ্জা বের করে খাওয়া। কিন্তু কেন শুধু মজ্জা? ধরুন আপনি ক্ষুধার্ত অবস্থায় বনে ঘুরছেন। দূর থেকে দেখতে পেলেন, একদল সিংহ একটা হরিনকে কাবু করে ফেলেছে। আপনি তখন কি করবেন? ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করবেন কখন সিংহগুলো খাওয় শেষ করে সেখান থেকে যাবে। আপনি ভাবছেন যে তারপর আপনি এগিয়ে যাবেন? ভুল। এরপর ছুটে আসবে হায়েনা আর শেয়ালের দল। এদের সাথে লাগতে যাওয়ার শারিরীক বল কি আপনার আছে? নেই। তাই এদের যাওয়া পর্যন্ত আপনি ঘাপটি মেরে থাকবেন। তো যখন আপনার পালা, তখন কিন্তু শুধু হাড়টাই পড়ে আছে। তাই আপনাকে শিখতে হবে কি করে হাড় ভেংগে তার সারটুকু খাওয়া যায়। ঠিক সেটাই ঘটেছিল আদিম মানবসমাজে।
এই বিষয়টা মানুষের ইতিহাস এবং মানসিক গঠন বুঝতে খুব সাহায্য করে। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে মানুষ খাদ্য শৃঙ্খলের (food chain) মোটামুটি মাঝামাঝি একটা অবস্থানে ছিল। মানুষ ছোট ছোট জীব জন্তু শিকার করত আর বড় হিংস্র প্রাণীর শিকার হত। মাত্র চার লক্ষ বছর আগে মানুষ নিয়মিতভাবে বড় প্রাণী শিকার করা শুরু করল। আর গত এক লক্ষ বছরে হোমো স্যাপিয়েন্সের উত্থানের ফলে মানুষ এক লাফে খাদ্য শৃঙ্খলের চূড়ায় উঠে এল।
এই অভূতপূর্ব উত্থানের একটা বিশেষ তাৎপর্য আছে। অন্য যেসব প্রাণী খাদ্য শৃঙ্খলের শিখরে আছে, যেমন শিংহ বা হাঙ্গর, তারা লক্ষ লক্ষ বছর ধরে বিবর্তিত হয়ে এই অবস্থানে এসেছে। এই ধীর প্রকৃয়া প্রকৃতিকে একটা ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করেছে। যেমন, সিংহ যত শক্তিশালি আর হিংস্র হয়েছে, হরিন তত দ্রুতগতিসম্পন্ন হয়েছে, জলহস্তি তত বদমেজাজী হয়েছে। কিন্তু হোমো স্যপিয়েন্সের এই উত্থান এত দ্রুত হয়েছে যে প্রকৃতি এর সাথে তাল মিলিয়ে ভারসাম্য রক্ষা করতে পারেনি। সবচেয়ে বড় কথা হল, স্যাপিউয়েন্সরা নিজেরাও নিজেদের এই পরিবর্তনের সাথে ভাল মত খাপ খাওয়াতে পারেনি। পৃথিবীর বেশিরভাগ শিকারী প্রাণীর মধ্যে একটা রাজকীয় ব্যপার আছে। লক্ষ লক্ষ বছরের বিবর্তনে এসব প্রাণী শুধু শারিরীকভাবেই শক্তিশালী হয়নি, এদের মানসিক মনোবল, নিজের প্রতি আস্থা সবকিছুই বেড়েছে। সে তুলনায় হোমো স্যাপিয়েন্সের এই দ্রুত উত্থান যেন আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ। প্রায় সারা জীবন প্রাণীজগতের প্রায় নিম্নস্তরে থেকে হঠাত রাজা হলেও এরা রাজসিক মনোভাব অর্জন করতে পারে নি। বরং সদ্যপ্রাপ্ত মর্যাদা হারিয়ে ফেলার ভয়ে মানুষ হয়ে উঠল সদা উৎকণ্ঠ। আর এই উৎকণ্ঠা থেকেই মানুষ অন্য যে কোন হিংস্র প্রাণীর চেয়ে অনেক বেশি হিংস্র আর বিপদজনক হয়ে উঠল। ইতিহাসের অনেক ভয়াবহ ঘটনা, যেমন রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ অথবা প্রকৃতির ওপর ধংসযজ্ঞ মানুষের এই নিরাপত্তাহীনতার ফল।
রাধুনে জাতি
শিখরে ওঠার একটা বিশাল গুরুত্বপূর্ণ ধাপ ছিল আগুনকে পোষ মানানো। কোন কোন মানব প্রজাতি প্রায় আট লক্ষ বছর আগেও মাঝে সাঝে আগুন ব্যবহার করত। কিন্তু তিন লক্ষ বছর আগে থেকে হোমো ইরেক্টাস, নিয়ান্ডার্থাল আর হোমো স্যাপিয়েন্সের পূর্ব পুরুষেরা নিয়মিতভাবে আগুনের ব্যবহার শুরু করল। আগুনকে বশ মানাতে পেরে মানুষ এক লাফে অনেকটা এগিয়ে গেল। আগুন হয়ে উঠল আলো আর উষ্ণতার এক নির্ভরযোগ্য উৎস, চারপাশে ঘুরে বেড়ানো হিংস্র জানোয়ারদের বিরুদ্ধে এক মরনঘাতি অস্ত্র। কিছুদিনের মধ্যেই মানুষ পরিকল্পিতভাবে দুর্গম বন পুড়িয়ে তৃণভুমি তৈরি করা শুরু করল, যে তৃণভূমিতে অবাধে বিচরন করত হরিন, বাইসনসহ নানা রকম লোভনীয় শিকার। আবার বনের আগুন নিভে যাওয়ার পর মানুষ কুড়িয়ে আনত পুড়ে যাওয়া জন্তুর দেহাবশেষ, ভাজা বাদাম আর মূলজাতীয় সব্জী।
কিন্তু রান্না করতে পারাটা ছিল আগুনের সর্বোত্তম ব্যবহার। অনেক খাবার মানুষ কাঁচা খেয়ে হজম করতে পারে না, যেমন গম, চাল বা আলু। রান্নার গুনে এসব হয়ে উঠল মানুষের প্রধান খাদ্য। আবার যেসব খাবার দীর্ঘ সময় ধরে চিবিয়ে খেতে মানুষ সময় আরে দৈহিক শক্তি ক্ষয় করত, যেমন ফলমূল, বাদাম, পোকামাকড়, কাঁচা মাংস, সেসব খাবার রান্নার গুনে হয়ে উঠল নরম, সহজপাচ্য এবং মুখোরোচোক। শিম্পাঞ্জী যেখানে দৈনিক পাঁচ ছয় ঘন্টা ধরে লতাপাতা চিবায়, সেখানে রান্না করা খাবার খেতে সারাদিনে মাত্র ঘন্টাখানেক হলেই মানুষের চলে। আগুন যে শুধু এসব খাবারে রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটিয়ে এগুলোকে সহজপাচ্য করে তুলেছিল তা নয়। খাবারে জৈবিক পরিবর্তন এনেও আগুন মানুষের বিরাট উপকার করেছিল। যেমন, খাবারে নানা রকম ক্ষতিকর ব্যাক্টেরিয়া ধ্বংস হয়ে যেত রান্নার ফলে।
রান্নার প্রবর্তনে তাই মানুষ খাবারে বৈচিত্র আনতে পারল, খাওয়ার পেছনে সময়ের অপচয় কমাতে পারল। তাছাড়া অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর তুলনায় ছোট দাঁত আর অপেক্ষাকৃত ছোট অন্ত্রই যথেষ্ট হল মানুষের জন্য। অনেক বিজ্ঞানী মনে করেন মানুষের রান্না করা খাবার খাওয়ার সাথে অন্ত্রের দৈর্ঘ কমে আসা আর মস্তিষ্কের আকার বৃদ্ধি পাওয়ার একটা সরাসরি যোগাযোগ আছে। লম্বা অন্ত্র আর বড় মস্তিষ্ক, দুটোরি প্রচুর শক্তির প্রয়োজন। তাই দুটো একসাথে পাওয়া একটু দুঃসাধ্য। রান্নার ফলে যেহেতু অপেক্ষাকৃত ছোট অন্ত্র দিয়েই কাজ চলত, তাই বিবর্তনে মানব অন্ত্রের আকার এবং শক্তির ব্যবহার ক্রমাগত কমতে থাকল। আর অন্ত্রের অব্যবহৃত শক্তি ব্যবহার করে মস্তিষ্কের আকার ক্রমাগত বাড়তে থাকল, বিশেষত নিয়ান্ডার্থাল আর হোমো স্যাপিয়েন্সদের।
তাছাড়া আগুন অন্য যেকোন প্রাণী আর মানুষের মধ্যে এক অনতিক্রম্য ব্যবধান ঘটিয়ে দিল। যে কোন প্রাণীর ক্ষমতা নির্ভর করে তার দৈহিক সম্পদের ওপর, যেমন পেশীর শক্তি, দাঁতের ধার আর পাখার বিস্তার। অন্যান্য প্রাণী প্রাকৃতিক শক্তি যেমন বাতাস বা পানির স্রোত ব্যবহার করে নিজেদের শক্তি বাড়াতে পারে নিশ্চই, কিন্তু এসব শক্তি তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। এসব প্রাণীর ক্ষমতা বলতে গেলে সম্পুর্নভাবে তাদের শারিরীক ক্ষমতার ভেতর সীমাবদ্ধ। যেমন ধরুন মাটির ওপর বিভিন্ন কারনে সাময়িকভাব গরম বাতাসের স্তম্ভ তৈরি হয়। ঈগল পাখি সেটা বুঝতে পারে আর ভারি শিকার নখে করে উড়ে যাওয়া সহজ করতে এই গরম বাতাসে পাখা ছড়িয়ে দেয়। বাতাসের স্তম্ভ কখন বা কোথায় হবে সেটা কিন্তু ঈগল নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। আবার ছড়িয়ে দেওয়া পাখার ক্ষেত্রফল যতটুকু, ঈগল এই বায়ুস্তম্ভের ঠিক ততটুকুই ফায়দা নিতে পারবে, তার বেশি কিছুতেই নয়।
মানুষ যখন আগুন বশ মানালো, তখন বস্তুত মানুষের নিয়ন্ত্রণে চলে এল প্রচন্ড শক্তিশালি অন্তহীন এক ক্ষনতা। ঈগল যেটা পারেনি মানুষ সেটা পারল। কোথায় কখন কতটুকু আগুন জ্বালতে হবে, মানুষ নিজেই তা ঠিক করতে পারত। আগুন ব্যবহার করে মানুষ নানারকম কাজও করতে শিখল। সবচেয় গুরুত্বপূর্ন বিষয় হচ্ছে, এই আগুন নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা মানুষকে তার শারিরীক ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করে বহুদূর চলে যাওয়ার ঔদ্ধত্য দিল। একা একজন মানুষ সামান্য চকমকি পাথরের ঘষায় কয়েক ঘণ্টার ভেতরে একটা বিশাল বন পুড়িয়ে ছারখার করে দিতে পারত। মানুষের কাছে আগুনের দাসত্ব তাই মানুষের ভবিষ্যত একক রাজত্বের আগাম বার্তা নিয়ে এসেছিল।
আমাদের ভাই বোনেরা
কিন্তু আগুন বশে আনার দেড় লক্ষ বছর পরও মানুষ পৃথিবীতে নিতান্ত নগন্য প্রাণী হয়েই ছিল। হ্যা, তারা আগুন দিয়ে বাঘ সিংহকে ভয় দেখাতে পারত, শীতের রাতে দেহ উষ্ণ রাখতে পারত, বন জংগল পুড়িয়ে সাফ করতে পারত। কিন্তু ইন্দোনেশিয়া দ্বীপপূঞ্জ থেকে শুরু করে ইউরোপের দঃক্ষিন-পশ্চিম সীমান্তের ইবেরিয়ান উপদ্বীপ পর্যন্ত মোটের ওপর লাখ দশেক মানুষ ছিল। সেই সময়কার জীবজগতের বৈচিত্র আর আকার চিন্তা করলে মানুষের উপস্থিতি ছিল বিশাল সাগরে এক ফোঁটা পানির মত।
আমাদের প্রজাতি, মানে হোমো স্যাপিয়েন্স, ততদিনে পৃথিবীর মঞ্চে পদার্পন করেছে ঠিকই, কিন্তু তখনো তারা আফ্রিকা মহাদেশের এক কোনায় নিজেদের প্রাণ বাঁচাতেই ব্যস্ত। হোমো স্যাপিয়েন্সের আবির্ভাব ঠিক কবে বা কোথায় হয়েছে এই বিষয়ে নিশ্চিত করে এখনো বলা যাচ্ছে না। তবে বেশিরভাগ বিজ্ঞানীরা একমত যে দেড় লক্ষ বছর আগে আফ্রিকাতে যে মানবপ্রজাতি বংশবিস্তার করেছিল, তারা দেখতে ছিল একদম আমাদেরই মত। এসব মানুষের কোন একজনের শবদেহ যদি কোনভাবে আজকের দিনের মর্গে চলে আসে, ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞরা এতে অস্বাভাবিক কিছু দেখতে পাবেন না। আগুনের বদৌলতে ততদিনে তাদের দাঁত এবং মস্তিষ্কের আকার আমাদের মতই হয়ে এসেছে।
বিজ্ঞানীরা এ বিষয়েও মোটামুটি একমত যে সত্তুর হাজার বছর আগে হোমো স্যাপিয়েন্সরা প্রথমে আরব এবং পরে দ্রুত ইওরোপ আর এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু হোমো স্যাপিয়েন্স যখন আরবে এল, তখন ইওরেশিয়ায় অন্যান্য আরো মানব প্রজাতির বসবাস ছিল। তাদের কি হল? এবিষয়ে দুটি পরস্পরবিরোধী তত্ব আছে।
“আন্তঃপ্রজনন” তত্বটি হল প্রেম আর শারিরিক আকর্ষণের। আফ্রিকার হোমো স্যাপিয়েন্সরা ইওরেশিয়ার অন্যান্য মানব প্রজাতির সাথে শারীরিকভাবে মিলিত হয়ে সন্তান জন্ম দিয়েছে আর আমরা হচ্ছি সেই সন্তান।
আফ্রিকা থেকে মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপে এসে স্যাপিয়েন্সরা নিয়ান্ডারর্থালদের দেখা পেল। নিয়ান্ডার্থালদের ছিল স্যাপিয়েন্সদের চেয়ে বড় মস্তিষ্ক আর পেশীবহুল দেহ। তারা বিশেষত ইউরোপের ঠান্ডা আবহাওয়ার সাথে মানিয়ে নিতেও পারতো স্যাপিয়েন্সদের চেয়ে বেশি। তারা যন্ত্রপাতির ব্যবহার জানতো, ভাল শিকার করতে পারতো, আবার অসহায় দুর্বল আত্মীয় বন্ধুর সেবাও করত। সমর্থ নিয়ানডার্থালরা অনেকদিন যাবৎ শারিরীকভাবে অক্ষম নিয়ান্ডার্থালদের সাথে বাস করেছে এমন প্রত্নতাত্বিক নজির পাওয়া যায়। তাতে ধারণা করা যায়, নিয়ান্ডার্থালরা যথেষ্ঠ মানবিক ছিল। নিয়ান্ডার্থালদের নিয়ে আধুনিক সমাজে অন্যায়রকম ভুল ধারণা আছে। নিয়ানডার্থাল বলতে আমাদের চোখে ভেসে ওঠে বর্বর নির্বোধ গুহাবাসী আদিম মানুষাকৃতির প্রাণী। কিন্তু অধুনা আবিষ্কৃত প্রত্নতাত্বিক প্রমাণ সে কথা বলে না।
যাই হোক, আন্তঃপ্রজনন তত্ব অনুযায়ী স্যাপিয়েন্সরা ইউরোপের নিয়ান্ডার্থালদের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে এক জাতিতে পরিণত হয়েছে। সেটা যদি সত্যি হয়ে থাকে, তাহলে বর্তমান ইউরোপিয়ানরা খাঁটি স্যাপিয়ন্স নয়, তারা হল স্যাপিয়েন্স অরে নিয়ান্ডার্থালদের মিলিত বংশধর। এই যুক্তি অনুযায়ী, যেসব স্যাপিয়েন্স পূর্ব এশিয়ায় এসেছিল, তারা হোমো ইরেক্টাসদের সাথে মিশে গিয়েছিল, তাই পুর্ব এশিয়ার লোকেরা আসলে স্যাপিয়েন্স আর ইরেক্টাসদের সংকর।
“প্রতিস্থাপন তত্ব” আবার সম্পূর্ণ উল্টো কথা বলে। এই তত্বটা হলো অসহিষ্ণুতা, ঘৃণা এবং গণহত্যার। এই তত্ব অনুযায়ী স্যাপিয়েন্সদের শারীরিক গঠন এমনকি গন্ধ অন্যান্য মানব প্রজাতিগুলোকে চেয়ে আলাদা ছিল। এদের প্রতি স্যাপিয়েন্সদের শারীরিক আকর্ষণ বোধ করাটা তাই একটু অস্বাভাবিক। আবার যদি নিয়ানডার্থাল রোমিও আর স্যাপিয়েন্স জুলিয়েটের প্রেম হয়েও যেত কোনভাবে, এদের জিনগত পার্থক্য এতো বেশি ছিল যে এদের মিলনে উর্বর সন্তান জন্মের সম্ভাবনা ছিল খুবই কম। এই তত্ব অনুযায়ী স্যাপিনেসের সাথে নিয়ান্ডার্থালদের কোন জিনগত সংমিশ্রণ হয়নি। তাই নিয়ান্ডার্থালরা যখন মরে সাফ হয়ে গেল, অথবা তাদের মেরে ফেলা হল, নিয়ানডার্থাল জিনেও সেখানে মৃত্যু হলো । এই তত্ব অনুযায়ী স্যাপিয়েন্সদের সাথে অন্য কোন মানব প্রজাতির কোনরকম সংমিশ্রণ হয়নি। স্যাপিন্সরা শুধুমাত্র অন্য মানব প্রজাতিগুলোর জায়গা দখল করেছে। সেক্ষেত্রে বলা যায় সত্তুর হাজার বছর আগে পূর্ব আফ্রিকার স্যাপিয়েন্সরাই আমাদের আদি পুর্বপুরুষ। আমরা একশ ভাগ স্যাপিয়েন্স।
এই দুই তত্বের কোনটা সত্য তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। বিবর্তনের সময়ক্রমে সত্তুর হাজার বছর কিছুই না। প্রতিস্থাপন তত্ত্ব যদি সত্যি হয়ে থাকে তাহলে সব আধুনিক মানুষের জিনের গঠন মোটামুটি একই রকম, সেক্ষেত্রে সাদা, কালো, ভারতীয় বা চীনাদের ভেতরে সত্যিকারে খুব বেশি তফাৎ নেই। কিন্তু যদি আন্তঃপ্রজনন তত্ব ঠিক হয় তাহলে এসব জাতির মধ্যে গত সত্তুর হাজার বছরে অনেক জিনগত পার্থক্য চলে এসেছে। বৈশ্বিক এবং ঘরোয়া রাজনীতির দরবারে এটা হবে একটা ডিনামাইট। এই তত্বকে ব্যবহার করে জাতিবিদ্বেষ এবং বর্ণবাদ আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে।
গত কয়েক দশক ধরে প্রতিস্থাপন তত্ব বিজ্ঞানীদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয় হয়েছে। এই তত্বের পেছনে জোরালো প্রত্নতাত্বিক প্রমাণ আছে। তাছাড়া বিভিন্ন নৃগোষ্ঠির মধ্যে জিনগত পার্থক্যের মত অস্বস্তিকর একটা কথা প্রমাণ করে জাতিবিদ্বেষ এবং বর্ণবাদের বিষবাস্প ছড়ানোর দায় ঘাড়ে নেয়ার কোন শখ বিজ্ঞানীদের নেই। কিন্তু যখন দীর্ঘ চার বছরের প্রচেষ্টার পর ২০১০ সালে নিয়ান্ডার্থালদের জিনের সম্পূর্ণ নকশা প্রকাশিত হল, তখন এই ছাই চাপা আগুন হঠাত বেরিয়ে এল। নিয়ান্ডার্থালদের ফসিল থেকে বিজ্ঞানীরা যথেষ্ট ডি এন এ সংগ্রহ করতে পেরেছিলেন এবং এর মাধ্যমে তাঁরা এই প্রজাতি এবং হোমো স্যাপিয়েন্সের জিন নকশার তুলনা করতে পারলেন। এবং বিজ্ঞানীরা স্তম্ভিত হলেন।
বিজ্ঞানীরা দেখলেন যে ইওরোপিয়ান এবং আরবজাতির ১-৪% স্বকীয় জিন, যেগুলো অন্য নৃগোষ্ঠীর মধ্যে নেই, সেগুলো নিয়ান্ডার্থালদের সাথে সম্পূর্ণ মিলে যায়। ১-৪% হয়ত খুব বেশি কিছু নয়, কিন্তু যথেষ্ট। এর মাত্র কয়েকমাসের মধ্যেই ডেনিসোভায় প্রাপ্ত সদ্য আবিষ্কৃত মানবপ্রাজাতির আঙ্গুলের জিননকশা করা হল। দেখা গেল যে হোমো ডেসিনোভা প্রজাতির ৬% জিন প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপূঞ্জের বর্তমান অধিবাসি মেলানেশিয়ান আর অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসি এবরিজিনদের স্বতন্ত্র জিনের সাথে মিলে যায়।
আমাদের মনে রাখতে হবে যে বিভিন্ন মানব প্রজাতির জিননকশা নিয়ে গবেষণার শুরু হয়েছে মাত্র। ভবিষ্যতে হয়ত এমন তথ্য বেরিয়ে আসবে যেগুলো আন্তঃপ্রজনন তত্বকে আরো শক্তিশালি করবে অথবা সম্পূর্ণ নতুন রকমের প্রমাণ উপস্থাপন করবে। কিন্তু এই দুই আবিষ্কার আন্তঃপ্রজনন তত্বকে কিছুটা হলেও বৈধতা দিয়েছে। তাই বলে এরকম ভাবাটা ঠিক হবে না যে প্রতিস্থাপন তত্ব সম্পূর্ণ ভুল। যেহেতু নিয়ান্ডার্থাল আর ডেসিনোভান ডিএনএর পরিমান আধুনিক মানুষের ভেতরে খুব বেশি না, তাই এসব প্রজাতির সাথে স্যাপিয়েন্স সম্পূর্ণভাবে মিশে গিয়েছিল, সেটা বলা বোধহয় ঠিক হবে না।
যদিও এদের জিনের সাথে স্যাপিয়েন্স জিনের পার্থক্য এত বেশি না যে তাদের মিলনে উর্বর সন্তান জন্ম নেয়া অসম্ভব, তবে এতটুকু পার্থক্যই এরকম মিলনের সম্ভাবনা কমিয়ে দেয় অনেকখানি।তাহলে স্যাপিয়েন্স আর অন্যান্য মানব প্রজাতির মধ্যে সম্পর্কটা ঠিক কিরকম ছিল? এটা পরিষ্কার যে এরা গাধা আর ঘোড়ার মত সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রজাতি ছিল না। আবার তারা একই প্রজাতির ভিন্ন ভিন্ন জাত, যেমন বুলডগ আর স্প্যানিয়েলের মতও ছিল না।
জীববিজ্ঞান অংকের সুত্র না, তাই নির্দিষ্ট কোন একটা উত্তর এখানে সাধারানত খাটে না। তাছাড়া অনেক অস্পষ্টতাও আছে। দুটি প্রজাতি, যেমন ঘোড়া আর গাধা, যদি একই পূর্বপুরুষ থেকে এসে থাকে, তাহলে কোন না কোন একসময় তারা একই প্রজাতির ভিন্ন দুটো জাত ছিল, যেমন বুলডগ আর স্প্যানিয়েল। ধীরে ধীরে তারা বিবর্তিত হয়ে ভিন্ন প্রজাতি হয়েছে। কিন্তু এই বিবর্তনের ধারায় নিশ্চই এমন একটা পর্যায় ছিল, যখন এই দুই জাত অনেকটাই আলাদা হয়ে গেছে, কিন্তু তখনো তারা ক্বচিৎ কখনো মিলিত হয়ে উর্বর সন্তান জন্ম দিতে পারত। তার পরের পর্যায়েই হয়ত এই দুই জাতের পার্থক্য এতই বেশি হয়ে গেল যে সেটা আর সম্ভব হল না, ফলে দুই জাতের সম্পর্ক পুরোপুরি ঘুচে গেল।
ধারনা করা হয়, পঞ্চাশ হাজার বছর আগে স্যাপিয়েন্স, নিয়ান্ডার্থাল আর ডেসিনোভানরা পুরোপুরিভাবে আলাদা হয়ে যাওয়ার আগের পর্যায়ে ছিল, প্রায় সম্পূর্ন আলাদা কিন্তু একশ ভাগ না। অবশ্য হোমো স্যাপিয়েন্সরা ততদিনে যথেষ্ঠই আলাদা হয়ে গেছে, শুধু ডিএনএ বা শারিরিক বৈশিষ্টের দিক থেকেই না, বুদ্ধিমত্তা আর সামাজিক দক্ষতার দিক থেকেও। তারপরও হয়ত হঠাৎ হঠাৎ স্যাপিইয়েন্সদের সাথে অন্য প্রজাতির আন্তঃপ্রজননে উর্বর সন্তান জন্ম নিত। তাই স্যাপিয়েন্সের সাথে নিয়ান্ডার্থাল বা ডেসিনোভানদের পুরোপুরি সংমিশ্রণ হল না, শুধু এদের মধ্যে ভাগ্যবান কারো কারো জিন স্যাপিয়েন্স দেহে ভর করে বেঁচে রইল। এক সময় যে আমরা, মানে স্যাপিয়েন্সরা, অন্য ‘প্রাণীর’ সাথে শারিরিকভাবে মিলিত হয়ে বাচ্চা জন্ম দিতে পারতাম, এ বিষয়টা খুব অস্বস্তিকর, আবার অন্যভাবে ভেবে দেখলে বেশ রোমাঞ্চকরও বটে।
কিন্তু নিয়ান্ডার্থাল ও ডেসিনোভানদের যদি স্যাপিয়েন্সদের সাথে পুরোপুরি সংমিশ্রন না হয়ে থাকে, তাহলে তারা কি হাওয়ায় মিলিয়ে গেল? একটা সম্ভাবনা হচ্ছে স্যাপিয়েন্সরা এদের হারিয়ে দিয়েছে সম্পদের প্রতিযোগিতায়। ভেবে দেখুন, স্যাপিয়েন্সরা যখন দক্ষিন পশ্চিম ইওরোপের বলকান উপত্যকায় প্রথম এল, তখন সেখানে নিয়ান্ডার্থালরা হাজার হাজার বছর ধরে বাস করছে। স্যাপিয়েন্সরা এসে ভাগ বসাল তাদের শিকার এবং খাদ্যে। যেহেতু স্যাপিয়েন্সদের কাছে উন্নত প্রযুক্তি আর সামাজিক দক্ষতা ছিল, তাই নিয়ান্ডার্থালরা প্রতিযোগিতায় স্যাপিয়েন্সদের কাছে হারতে লাগল। ফলস্রুতিতে স্যাপিয়েন্সের বংশবিস্তার হতে লাগল এবং নিয়ান্ডার্থালদের জীবন ধারণ কঠিন থেকে কঠিনতর হতে লাগল। তাদের সংখ্যা দিনে দিনে কমতে থাকল এবং এক সময় তারা পুরোপুরি হারিয়ে গেলে পৃথিবীর মাটি থেকে।
আরেকটা সম্ভাবনা হচ্ছে, স্যাপিয়েন্সরা যুদ্ধ করে এদের ধ্বংস করেছে। স্যাপিয়েন্স প্রজাতির সহনশীলতার সুনাম এমনিতেই প্রশ্নবিদ্ধ। সামান্য গায়ের রং, ধর্ম আর মতবাদের অমিলের কারনে পৃথিবীতে তারা বারে বারে যুদ্ধ করেছে, গণহত্যা করেছে, সীমাহীন নৃশংসতার পরিচয় দিয়েছে। তাই আমাদের আদি পূর্বপুরুষরা সম্পূর্ন ভিন্ন প্রজাতির মানুষের সাথে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করেছে, সেরকমটা ভাবা ঠিক যুক্তিযুক্ত না। হয়ত স্যাপিয়েন্সরা প্রথম যখন নিয়ান্ডার্থালদের মুখোমুখি হয়েছিল, সে মুহূর্তেই প্রথম রক্তক্ষয়ী জাতিগত দাঙ্গা আর গণহত্যার ইতিহাস রচিত হয়েছিল।
সত্য যেটাই হোক, নিয়ান্ডার্থাল আর অন্যন্য মানব প্রজাতি যদি ধ্বংস না হত, তাহলে কি হত সেটা একটা বিরাট প্রশ্ন। ভাবুন তো একবার আজকের দুনিয়ায় শুধু আমরা নেই, নিয়ান্ডার্থাল, ডেসিনোভান সহ আরো অন্যান্য প্রজাতি আছে পাশাপাশি। কেমন হত আমাদের সমাজ ব্যবস্থা, সংস্কৃতি অথবা রাস্ট্রব্যবস্থা? ধর্মীয় মতবাদই বা কেমন হত? বুক অফ জেনেসিস কি নিয়ান্ডার্থালকে আদম হাওয়ার বৈধ বংশধরের স্বিকৃতি দিত? যিশু কি ডেসিনোভানদের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে গিয়ে মারা যেতেন? আর মুসলমানদের বেহেশতে কি সব প্রজাতির পূন্যবান মানুষের জায়গা হত? নিয়ান্ডার্থালরা কি রোমান সেনাবাহিনীর অংশ হতে পারত? আমেরিকার স্বাধিনতার ঘোষনাপত্রে (Declaration of Independence) কি প্রজাতি নির্বিশেষে সকল মানুষের সমান মর্যাদার কথা বলা থাকত? কার্ল মার্ক্স কি সব প্রজাতির নিপীড়িত মানুষেকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহবান জানাতেন?
গত দশ হাজার বছর ধরে আমরা আমদের একক আধিপত্যে এতটাই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি যে এসব সম্ভাবনা কল্পনা করাও আমাদের পক্ষে কঠিন। আমাদের ‘ভাই বোন’ পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার কারনে আমাদের মনে হয় আমরা সৃষ্টির শ্রেষ্ঠতম জীব, অন্যান্য যেকোন প্রাণীর সাথে আমাদের আকাশ পাতাল তফাৎ। চার্লস ডারউইন যখন প্রথম মানুষকে শুধুমাত্র একটা ‘প্রাণী’ হিসাবে অভিহিত করলেন, তখন সবাই খুব রেগে গিয়েছিল। এমনকি আজ পর্যন্ত মানুষের বিরাট একটা অংশ এটা বিশ্বাস করে না। নিয়ান্ডার্থালরা বেঁচে থাকলে কি আমরা নিজেদের শ্রেষ্ঠ বলে দাবি করতে পারতাম? কে জানে হয়ত একারনেই আমরা তাদের পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিয়েছি। তারা এতটাই আমাদের মত ছিল যে তাদের উপেক্ষা করা আমাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না, আবার এতটাই আলাদা ছিল যে তাদের সহ্য করাও সম্ভাব ছিল না।
স্যাপিয়েন্সদের দোষী সাব্যস্ত করা যাবে কি যাবে না, সে প্রশ্নের যথাযথ উত্তর নেই।। কিন্তু স্যাপিয়েন্সরা যখনই নতুন কোন এলাকায় পা রেখেছে, অন্যান্য মানব প্রজাতি সেখান থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। হোমো সোলেন্সিসরা পঞ্চাশ হাজার বছর আগে পর্যন্ত বেঁচে ছিল। তার পর পরই গেছে হোমো ডেনিসোভানরা। নিয়ান্ডার্থালরা তিরিশ হাজার বছর আগে পর্যন্ত বাঁচতে পেরেছিল। আর সর্বশেষ গেছে ফ্লোরেস দ্বীপের অধিবাসী বামন প্রজাতির মানুষ, তাও প্রায় বারো হাজার বছর আগে। তারা ফেলে গেছে কিছু ফসিল, পাথরের যন্ত্রাংশ, আমাদের দেহে তাদের কিছু জিন আর অনেক অনেক প্রশ্ন।
স্যাপিয়েন্সের সফলতার মূলমন্ত্র কি ছিল? কিভাবে তারা এত দ্রুত পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছিল? কিভাবে বিভিন্ন জায়গার চরম প্রতিকুল জলবায়ুর সাথে খাপ খাইয়েছিল? কিভাবে তারা অন্যান্য মানব প্রজাতিগুলোকে নিশ্চিহ্ন করেছিল? শক্তিশালি, বুদ্ধিমান আর ঠান্ডা জলবায়ুতে অভ্যস্ত নিয়ান্ডার্থালরা পর্যন্তও আমাদের কাছে টিকতে পারল না? এই বিতর্কের কোন শেষ নেই। কিন্তু এই বিতর্কের একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন সূত্র হল স্যাপিয়েন্সদের একান্ত নিজস্ব ভাষা।

Tuesday, January 31, 2017

জহির রায়হানসহ বুদ্ধিজীবী হত্যা ও ষড়যন্ত্রের নেপথ্যে

বাংলা চলচ্চিত্রের নামকরা পরিচালক জহির রায়হানের ৪৫তম গুম দিবস আজ। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে কিংবা এর পরে কত মানুষ, কতজন বুদ্ধিজীবী নিহত হয়েছে কিভাবে নিহত হয়েছেন কারা হত্যা করেছে। আজকের জোর গলায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ব্যবসায়ীরা কে কোথায় কিভাবে সময় কাটিয়েছে এরকম অনেক প্রশ্ন রহস্যই থেকে গেছে। এ নিয়ে কোনো গবেষণাই আলোর মুখ দেখেনি, থেমে গেছে শাসকের ধমকে,  এমনকি এই গবেষণা করতে যারা ময়দানে নেমেছেন তাদের অনেকেই গুম হয়ে গেছেন। গুমের শিকার তেমনি একজন হলেন বাংলা চলচ্চিত্রের নামকরা পরিচালক জহির রায়হান। শুধু ‍তিনিই নন তার গুম হওয়ার সাথে সাথে গুম হয়ে গেছে তার গবেষণা, এক সত্য ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধের স্বত্বভোগীদের মুখোশ উন্মোচনের দলীল। কারণ স্বাধীনতার চেতনার ব্যবসায়ী ও স্বত্বলোভীরা কখনোই চায়নি এরকম কোনো গবেষণা হোক। শুধু এটাই নয় বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে নিজেদের মুখোশ উন্মোচনের ঝুঁকি এড়িয়ে আবার এক ঢিলে দুই পাখি মারার মত বুদ্ধিজীবি হত্যার দায় চাপিয়েছে নিরাপরাধ জামায়াত নেতৃবৃন্দের উপর।

আসুন দেখা যাক কি রহস্য রয়েছে জহির রায়হানসহ বুদ্ধিজীবী হত্যা ও ষড়যন্ত্রের নেপথ্যে

জহির রায়হান অন্তর্ধান রহস্য ঘাঁটতে গিয়ে এমন কিছু ব্যক্তির এমন কতগুলো চাঞ্চল্যকর তথ্যের সন্ধান পাওয়া গেল যেগুলো পড়ে শরীরের লোম খাড়া হয়ে ওঠে। এসব তথ্য পাওয়া গেছে জহির রায়হানের শালী অভিনেত্রী ববিতা, জহির রায়হানের ভাবী আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য পান্না কায়সার এবং ঘাদানিক নেতা শাহরিয়ার কবির প্রমুখের কাছ থেকে। এছাড়াও এদের জবানীতে সত্যজিৎ রায় এবং শেখ মুজিবের যেসব উক্তি উদ্ধৃত করা হয়েছে সেসব পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, জহির রায়হান ৩০ জানুয়ারি মৃত্যুবরণ করেননি। তার পরেও বেশ কয়েকদিন তাকে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছিল। এদের বক্তব্য থেকে বোঝা যায় যে, তিনি বাংলাদেশে এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীর বেষ্টনীর মধ্যেই ছিলেন।

জহির রায়হানের পরিচয়:

জহির রায়হান ১৯৩৫ সালের ১৯ আগস্ট বর্তমান ফেনী জেলার অন্তর্গত মজুপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। জন্ম ফেনীতে হলেও ওনারা পারিবারিকভাবে থাকতেন কলকাতায়। ১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের পর তিনি তার পরিবারের সাথে কলকাতা হতে বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) স্থানান্তরিত হন। তিনি ১৯৫৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে বাংলায় স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি ব্যক্তিগত জীবনে দু'বার বিয়ে করেন। ১৯৬১ সালে সুমিতা দেবীকে এবং ১৯৬৬ সালে তিনি সুচন্দাকে বিয়ে করেন, দুজনেই ছিলেন সে সময়কার বিখ্যাত চলচ্চিত্র অভিনেত্রী।

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর জহির রায়হান আগরতলা হয়ে কলকাতায় পৌঁছান। নিজেকে যুক্ত করেন মুক্তিযুদ্ধের প্রচার কাজ সংগঠিত করার কাজে নিজেকে যুক্ত করেন এবং পাকিস্থানের গণহত্যা বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরার জন্য ‘’স্টপ জেনোসাইড" নামের একটি প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করার উদ্যোগ নেন। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো যুদ্ধে শরণার্থী শিবিরে মানুষের দুর্দশার চিত্র, কলকাতায় পালিয়ে যাওয়া বড় বড় নেতাদের আরাম আয়েশের চিত্র তুলতে গিয়ে জহির রায়হান মুজিবনগর সরকারের রোষানলে পড়েছিলেন। সাধারন মানুষদের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করার অমানুষিক পরিশ্রমের অনেক চিত্র তিনি জীবন বাজি রেখে ধারন করেছিলেন । ‘স্টপ জেনোসাইড’ প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করার সময় ও মুক্তির দেয়ার সময় কলকাতায় আওয়ামীলীগ নেতারা বারবার জহির রায়হানকে বাধাগ্রস্থ করেছিলেন।

"স্টপ জেনোসাইড" ছবিটি নির্মাণের সময় আওয়ামী লীগের নেতারা তাঁকে নানাভাবে বাধা দিয়েছে। বিভিন্ন সেক্টরে শুটিং করতে দেয় নি, এমন কি কোন কোন সেক্টরে তাঁর গমন পর্যন্ত নিষিদ্ধ ছিল। 

... আওয়ামী লীগের নেতারা ছবি দেখে ছাড়পত্র না দেয়ার জন্য পশ্চিমবঙ্গ সেন্সর বোর্ডকে অনুরোধ জানিয়েছিলেন।” 

তথ্যসূত্র : একুশে ফেব্রুয়ারী / জহির রায়হান (ভূমিকা : শাহরিয়ার কবির) ॥ [ পল্লব পাবলিশার্স - আগস্ট, ১৯৯২ । পৃ: ১৩-১৬ ] 
গুম হওয়ার ঘটনা:

বাংলাদেশ স্বাধীন হলে ১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর জহির রায়হান ঢাকায় ফিরে আসেন। ফিরে এসেই শুনলেন তার অগ্রজ শহীদুল্লাহ কায়সার ১৪ ডিসেম্বর থেকে নিখোঁজ। তার উদ্যোগে বেসরকারি বুদ্ধিজীবী হত্যা তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ডসহ অন্যান্য ঘটনার প্রচুর প্রমাণাদি তিনি সংগ্রহ করেন এবং সাংবাদিক সম্মেলনে ঘোষণা করেন যে, তার সংগৃহীত প্রমাণাদি প্রকাশ করলেই অনেকের কুকীর্তি ফাঁস হয়ে যাবে। স্বাধীনতাযুদ্ধ চলাকালে ভারতের মাটিতে আওয়ামী লীগের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী কর্মকান্ড, বিভিন্ন হোটেলে বিলাসবহুল ও আমোদ-ফুর্তিময় জীবনযাপন, রাজনৈতিকভাবে প্রতিপক্ষ আওয়ামী আদর্শে বিশ্বাসহীন বাঙালিদের নির্মূল করার ষড়যন্ত্র প্রভৃতির প্রামাণ্য দলিল জহির রায়হান কলকাতা থাকাকালে সংগ্রহ করেছিলেন। বড় ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারের নিখোঁজ ও বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ডের ঘটনাবলী তাকে বিচলিত করে। এসব ঘটনা তাঁর পূর্বেকার রাজনৈতিক বিশ্বাসের ভিত নাড়িয়ে দেয়।  

শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের সর্বময় ক্ষমতায় আসীন হওয়ার ১৫ দিন পর ১৯৭২ সালের ২৫ জানুয়ারি ঢাকা প্রেসক্লাবে এক সাংবাদিক সম্মেলনে চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান ঘোষণা দেন, বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ডের পেছনে নীলনকশা উদ্ঘাটনসহ মুক্তিযুদ্ধের সময়ের অনেক গোপন ঘটনার নথিপত্র, প্রামাণ্য দলিল তার কাছে আছে, যা প্রকাশ করলে সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশের মন্ত্রীসভায় ঠাঁই নেয়া অনেক নেতার কুকীর্তি ফাঁস হয়ে পড়বে। আগামী ৩০ জানুয়ারি সন্ধ্যায় এই প্রেসক্লাবে ফিল্ম শো প্রমাণ করে দেবে কার কি চরিত্র ছিল।

১৯৭২ সালের ২৫ জানুয়ারি সাংবাদিক সম্মেলনের কয়েকদিন পর ৩০ জানুয়ারি রোববার সকালে এক রফিক নামের অজ্ঞাত টেলিফোন আসে জহির রায়হানের কায়েতটুলির বাসায়। রফিক ছিলেন জহিরের পূর্ব পরিচিত যিনি ইউসিসে চাকরি করতেন । প্রথমে ফোন ধরেছিলেন জহির রায়হানের ছোট বোন ডাক্তার সুরাইয়া যার কাছে জহিরকে খোঁজা হচ্ছিল । সুরাইয়া জহির রায়হানকে ডেকে ফোন ধরিয়ে দেয় । টেলিফোনে জহিরকে বলা হয়েছিল, আপনার বড়দা মিরপুর বারো নম্বরে বন্দী আছেন। যদি বড়দাকে বাঁচাতে চান তাহলে এক্ষুণি মিরপুর চলে যান। একমাত্র আপনি গেলেই তাকে বাঁচাতে পারবেন। টেলিফোন পেয়ে জহির রায়হান দুটো গাড়ী নিয়ে মিরপুরে রওনা দেন। তাঁর সাথে ছিলেন ছোট ভাই মরহুম জাকারিয়া হাবিব, চাচাত ভাই শাহরিয়ার কবির, বাবুল (সুচন্দার ভাই), আব্দুল হক (পান্না কায়সারের ভাই), নিজাম ও পারভেজ।মিরপুর ২ নং সেকশনে পৌছার পর সেখানে অবস্থানরত ভারতীয় সেনাবাহিনী, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী (ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট) এবং পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে জহির রায়হানের টয়োটা গাড়ি (ঢাকা-ক-৯৭৭১)সহ থাকতে বলে অন্যদের ফেরত পাঠিয়ে দেন। শাহরিয়ার কবির অন্যদের সাথে করে বাড়ী ফিরে আসেন । এভাবেই জহির চিরতরে হারিয়ে যায়। অথচ সেদিন বিকেলেই প্রেসক্লাবে তাঁর কাছে থাকা অনেক দুর্লভ তথ্য প্রমান ফাঁস করার কথাছিল যা ফাঁস হলে অনেকের মুখোশ উম্মোচিত হয়ে যেতো যা আর কোনদিন করা হলো না ।

জহির রায়হানের স্বজনদের সন্দেহ ও কারণ:

ঘটনা পরম্পরা পর্যালোচনা করলে তার মৃত্যুর দায়-দায়িত্ব তৎকালীন প্রশাসনকেই গ্রহণ করতে হয় এবং (তাদের ভাষায়) রাজাকার বা দালালদের ওপর কোনভাবেই চাপানো যায় না। এই কলামে নিজস্ব মন্তব্যের পরিবর্তে ওপরে উল্লেখিত ব্যক্তিবর্গের উদ্ধৃতি এবং মন্তব্য ব্যাপকভাবে তুলে ধরা হচ্ছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশ যখন অপপ্রচার এবং উস্কানিমূলক প্রচারণার বিষবাষ্পে আচ্ছন্ন তখন এসব ব্যক্তিবর্গের সেদিনের উক্তি এবং আজকের ভূমিকা মিথ্যা প্রচারণায় বিভ্রান্ত মানুষকে সত্যের আলোকবর্তিকা দেখাতে সাহায্যে করবে।

| এক |
সেই সময়কার সরকার নিয়ন্ত্রিত সাপ্তাহিক ‘বিচিত্রায়’ বিশ্ববিখ্যাত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের একটি সাক্ষাৎকার ছাপা হয়েছিল। সংখ্যাটি ছিল ১৯৯২ সালের ১ মে। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন আজকের আওয়ামীপন্থী বুদ্ধিজীবী শাহরিয়ার কবির। সাক্ষাৎকারের একপর্যায়ে সত্যজিৎ রায় শাহরিয়ার কবিরকে হঠাৎ করে জিজ্ঞেস করলেন… -“জহিরের ব্যাপারটা কিছু জেনেছো?”

শাহরিয়ার কবির বলেন, “তাকে সরিয়ে ফেলার পেছনে ষড়যন্ত্র রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। আমরা ব্যক্তিগতভাবে তদন্ত করে যা বুঝতে পেরেছি তাতে বলা যায়, ৩০ জানুয়ারি দুর্ঘটনায় তিনি হয়তো মারা যাননি। তারপরও দীর্ঘদিন তাকে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছিল বলে অনেকে মনে করেন। সেটাই ষড়যন্ত্রের মূলসূত্র বলে ধরছি। মিরপুরে দুর্ঘটনায় তার মৃত্যু হলে গভীর ষড়যন্ত্র মনে করার কোনো করণ ছিল না। আমি যতদূর জানি, বুদ্ধিজীবীদের হত্যার তদন্ত করতে গিয়ে তিনি এমন কিছু তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন যা অনেক রথী-মহারথীর জন্যই বিপজ্জনক ছিল, যে জন্য তাকে সরিয়ে ফেলার প্রয়োজন হয়েছিল।”

 তথ্যসূত্র : একুশে ফেব্রুয়ারী / জহির রায়হান (ভূমিকা : শাহরিয়ার কবির) ॥ [ পল্লব পাবলিশার্স - আগস্ট, ১৯৯২ । পৃ: ১৩-১৬ ] 

১৯৯২ সালেও শাহরিয়ার কবির মনে করতেন যে, জহির রায়হানকে ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারির পরেও দীর্ঘদিন বাঁচিয়ে রাখা হয়েছিল। তাহলে ঘাদানিক নেতৃবৃন্দ এবং আওয়ামী বুদ্ধিজীবীরা বলুন যে, স্বাধীন বাংলাদেশে জহির রায়হানকে আটকে রাখার ক্ষামতা ছিল কাদের? বলা হচ্ছে যে, বুদ্ধিজীবী হত্যার তদন্ত করতে গিয়ে জহির রায়হানের হাতে এমন কিছু তথ্য এসেছিল যেটা রথী-মহারথীদের জন্য ছিল বিপজ্জনক। স্বাধীন বাংলাদেশে আওয়ামী সরকারের আমলে কারা ছিলেন রথী-মহারথী? যে বিপজ্জনক তথ্যের জন্য তাকে সরিয়ে ফেলার প্রয়োজন হয়েছিল সেসব তথ্য কাদের জন্য বিপজ্জনক ছিল? তাদের ভাষায় ‘রাজাকার’ এবং ‘পাকিস্তানী দালালদের’ রাজনীতি তো নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। কারা তাহলে জহির রায়হানকে সরিয়েছে? যুদ্ধাপরাধী বা দালালদের বিচার করতে গেলে এসব প্রশ্ন এসে পড়বে।

| দুই |
জহির রায়হান নিখোঁজের প্রায় এক বছর পর [ ১৯৭৩ সালের ২২ শে জানুয়ারি] সাংবাদিক আহাম চৌধুরীর লিখা '' জহির রায়হান হত্যা রহস্য আর কতদিন ধামাচাপা পড়ে থাকবে '' শীর্ষক এক প্রতিবেদনে বলেছিলেন - জহির রায়হান মিরপুর কলোনির অভ্যন্তরে যাননি । ক্যাম্প থেকেই তিনি নাকি নিরুদ্দেশ হয়েছিলেন । কারা তাঁকে নিয়ে গিয়েছিলেন সেই খবরও কারো অজানা নয় । সরকার নিখোঁজ জহির রায়হান'কে খুঁজে বের করার কোন আন্তরিকতা দেখায়নি বরং জহির রায়হান নিখোঁজের রহস্য ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু কতদিন থাকবে এই ধামাচাপা?
মুজিবনগরে যে কজন রুই কাতলার সাথে জহির রায়হানের চিন্তাধারার সাথে বচসা হয়েছিল জহির হত্যাকাণ্ডে তারাও নাকি জড়িত রয়েছেন । জহির হত্যার পরিকল্পনা ১৫ দিন ধরে করা হয়েছিল । জহিরকে তিরিশে জানুয়ারি খাঁচায় পুরে একত্রিশ তারিখে অন্য একটি স্থানে সরিয়ে দেয়া হয় । সেখানে তাঁকে তদন্ত কমিটি ভেঙে দেয়ার আহবান জানানো হয় । বুদ্ধিজীবী হত্যার তদন্তের চিন্তা না করে ভাতের চিন্তা করতে বলা হয় । জহির রায়হানের হত্যাকারী দল আরও একদিন তাঁকে চিন্তা করার সময়ও নাকি দিয়েছিলেন - আর সেদিনটি নাকি ছিল উনিশ'শ বাহাত্তর সালের দ্বিতীয় মাসের প্রথম দিন যথা সর্বনাশা ফেব্রুয়ারির সর্বনাশা মঙ্গলবার । '' 

|তিন|
জহির রায়হান এর প্রথম স্ত্রী প্রয়াত অভিনেত্রী সুমিতা দেবী এক সাক্ষাতকারে বলেছিলেন ''জহির রায়হান নিখোঁজ এই নিয়ে পত্র-পত্রিকায় বেশ লেখালেখিও হলো। একদিন বড়দি অর্থাৎ জহিরের বড় বোন নাসিমা কবিরকে ডেকে নিয়ে শেখ মুজিব বললেন, জহিরের নিখোঁজ হওয়া নিয়ে এ রকম চিৎকার করলে তুমিও নিখোঁজ হয়ে যাবে। পরে নাসিমা আর কিছু বলেনি। টেলিফোন করেছিল যে রফিক, তাকে নিয়ে যখন পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি শুরু হলো। তখন তাকে নাগরিকত্ব দিয়ে পুরো পরিবারসহ আমেরিকায় পাঠিয়ে দেয়া হলো। এই ঘটনা জহিরের নিখোঁজ হওয়ার সম্পর্কে রফিকের ভূমিকাকে আরো সন্দেহযুক্ত করে তোলে আমার কাছে।''

 (সুত্রঃ দৈনিক আজকের কাগজ ৮ ডিসেম্বর ১৯৯৩)

|চার|
দৈনিক আজকের কাগজ ৮ ডিসেম্বর ১৯৯৩ সংখ্যা ‘জহির রায়হানের হত্যাকারী রফিক এখন কোথায়' শীর্ষক প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে  সরকার সাহাবুদ্দিন আহমদ লিখেছেন, প্রতিবেদনে বলা হয়, জহির রায়হান নিখোঁজ এই নিয়ে লেখালেখি হলে একদিন বড়দি অর্থাৎ জহির রায়হানের বড় বোন নাফিসা কবিরকে ডেকে নিয়ে শেখ মুজিব বললেন, জহিরের নিখোঁজ নিয়ে এ রকম চিৎকার করলে তুমিও নিখোঁজ হয়ে যাবে। কিন্তু এখন প্রশ্ন হচ্ছে যে, জহির রায়হানের মতো একজন বিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা স্বাধীনতার পর নিখোঁজ হয়েছে এটা নিয়ে চিৎকার হওয়াটাই স্বাভাবিক।  কিন্তু শেখ মুজিব কেন জহির রায়হানের বড় বোনকে ডেকে নিয়ে নিখোঁজ করে ফেলার হুমকি দিলেন। কি রহস্য ছিল এর পেছনে? তাহলে কি বুদ্ধিজীবী হত্যার ব্যাপারে শেখ মুজিব এমন কিছু জানতেন, যা প্রকাশ পেলে তার নিজের কিংবা আওয়ামী লীগের জন্য ক্ষতির কারণ হতো? আর কেনইবা তড়িঘড়ি করে জহির রায়হানের তথাকথিত হত্যাকারী রফিককে সপরিবারে আমেরিকা পাঠিয়ে দেয়া হলো? রফিক কে ছিলেন/ কি তার রাজনৈতিক পরিচয়?

 সূত্র : সরকার সাহাবুদ্দিন আহমদ, রাহুর কবলে বাংলাদেশের সংস্কৃতি, ঢাকা, পৃষ্ঠা-১০৮, আসলাম সানী রচিত “শত শহীদ বুদ্ধিজীবী”

|পাঁচ|
৯ আগস্ট ১৯৯৯ দৈনিক বাংলার বাণী পত্রিকায় প্রকাশিত হয় জহির রায়হানের মেজো সন্তান অনল রায়হানের অভিযোগ। তিনি অভিযোগ করেন, ‘জহির রায়হান নিখোঁজ হওয়ার পর আওয়ামী লীগ সরকার এক ভুয়া তদন্ত কমিটি গঠন করেছিলেন। এই কমিটি কোনো কাজ করেনি। মুক্তিযুদ্ধের প্যানপ্যানানি করে আওয়ামী লীগ সরকার আবার ক্ষমতায় এলো ...মুজিব হত্যার বিচার হচ্ছে। এই হত্যাকান্ড ঘটেছে ১৯৭৫ সালে। এর আগে জহির রায়হানসহ অনেক বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করা হয়েছে। কই তাদের তো বিচার হলো না।

|ছয়|
শহীদ সেলিমের মায়ের মতে, বঙ্গভবনের ওর ঘর থেকে যে প্রয়োজনীয় কাগজগুলো উধাও হয়েছিল সেগুলো সম্ভবত তদন্ত কমিটির গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রই হবে। খোদ বঙ্গভবন থেকে জিনিসপত্র উধাও হয়ে যাবে তা ভাবতেও বিশ্বাস হয় না। শহীদ সেলিম বুদ্ধিজীবী হত্যা তদন্তের কাজে সরাসরি জড়িত ছিলেন একথা আমি আগে জানতাম না। আমি কেন, আর কেউ জানে কিনা তাও জানি না। জহির রায়হান ও সেলিমের নিখোঁজ রহস্য এখন আমার কাছে আরও রহস্যজনক বলে মনে হচ্ছে। বুদ্ধিজীবী হত্যা যেমন ৭১ সালে গুরুত্বের সঙ্গে উদঘাটিত হয়নি, তেমনি জহির রায়হান নিখোঁজ রহস্যও গুরুত্বের সঙ্গে উদঘাটিত করার প্রয়োজনীয়তা কেউ অনুভব করেনি। অথচ এটা একটা গভীর ষড়যন্ত্র। যে ষড়যন্ত্রের বিষবৃক্ষের বীজ রোপণ হয়েছিল সেদিন।”

সূত্র: দৈনিক ‘বাংলার বাণী’ বাংলা ১৩৯৯, ১০ জৈষ্ঠ্য, ইং ১৯৯২ 

|সাত|
জহির রায়হানের ভাবী আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য পান্না কায়সার নিজেই বলেছেন যে, খোদ বঙ্গভবন থেকে গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র উধাও হয়ে যাবে সেটা ভাবনারও অতীত। জহির রায়হানের সাথে লেফটেন্যান্ট সেলিমও বুদ্ধিজীবী হত্যা তদন্তে সরাসরি জড়িত ছিলেন। এ সম্পর্কিত কাগজপত্র জহির রায়হান এবং সেলিম উভয়ের কাছ থেকেই উধাও হয়ে গেছে। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রেসিডেন্টের ভবন থেকে কাগজপত্র উধাও করতে পারে কারা? ‘রাজাকার’ বা ‘পাকিস্তানপন্থীরা’ অবশ্যই নয়। এটা করা সম্ভব একমাত্র তাদের পক্ষে, যারা ক্ষমতার আশপাশে ছিলেন।

সূত্র: দৈনিক ‘বাংলার বাণী’ বাংলা ১৩৯৯, ১০ জৈষ্ঠ্য, ইং ১৯৯২ 

|আট|
জহির সম্পর্কে বলতে গিয়ে,জহির রায়হানের স্ত্রী সুচন্দার ছোট বোন নায়িকা ববিতা উল্লেখ করেছেন, ভারত থেকে ফিরে আসার পর একবার এক মিটিংয়ে উনি বলেছিলেন “যুদ্ধের নয়মাস আমি কলকাতায় ছিলাম। আমি দেখেছি সেখানে কে কি করেছে। কে দেশের জন্য করেছে, আর কে নিজের আখের গুছিয়েছে। আমার কাছে সব রেকর্ড আছে। আমি সব ফাঁস করে দেব। এটাই জহির রায়হানের জীবনে কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এজন্যই জহিরকে ফাঁদে ফেলে মিরপুর নিয়ে যাওয়া হয় এবং পরিকল্পনামাফিক তাকে সরিয়ে দেয়া হয় পৃথিবী থেকে। 

সূত্র: ‘আনন্দ ভুবন’ এর ১৬ মার্চ, ‘১৯৯৭ সংখ্যায় ‘কুলায় কালস্রোত’ বিভাগে শিরোনাম ‘পুরানো সেই দিনের কথা’ 

|নয়|
বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ও প্রখ্যাত লেখক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর এবনে গোলাম সামাদের ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে’ শীর্ষক লেখায় তিনি বলেছেন, “চলচ্চিত্র পরিচালক জহির রায়হানের সঙ্গে আমার কলকাতায় পরিচয় ঘটে। তার থাকবার কোন জায়গা ছিল না প্রথমে। আমি তাকে তিন মাসের জন্য থাকবার একটা খুব ভাল ব্যবস্থা করে দিতে পেরেছিলাম কলকাতায়। দেশে ফিরবার পর তিনি মারা যান। 

ড. সামাদ আরো বলেছেন, ৭ ডিসেম্বর (৭১) কলকাতায় বাংলাদেশ দূতাবাসে একটি উৎসব হয়। রায়হান সেখানে উপস্থিত ছিলেন। আমিও ছিলাম। তিনি বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব হিসেবে ছিলেন আমার দু’সারি আগে। হঠাৎ তাকে বলতে শুনি “দেশকে দু’বার স্বাধীন হতে দেখলাম। আবার একবার স্বাধীন হতে দেখবো কিনা জানি না।” কেন তিনি এ ধরনের মন্তব্য করেছিলেন, তা ভেবে আমার মনে পরে অনেক প্রশ্ন জেগেছে। তার মৃত্যু আজো হয়ে আছে রহস্যঘেরা।

জহির রায়হানের উপরোক্ত মন্তব্যে দেখা যায়, তিনি ৪৭ সালে ইংরেজদের বিদায়, ভারতবর্ষ বিভক্তি, পাকিস্তানের জন্মকেও স্বাধীনতা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। তার চেয়েও বেশি তাৎপর্যমণ্ডিত ব্যাপার হলো, মওলানা ভাসানীর অনুসারী জহির খুব সম্ভব বাংলাদেশের স্বাধীনতা ভবিষ্যতে ভারতের আগ্রাসন ও আধিপত্যবাদ কবলিত হওয়া এবং তার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে জনগণের আরেকবার বিজয় অর্জনের দিকেই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। আর এই ইঙ্গিতে ভারতপন্থী মহল এবং তাদের গুরুদের গা-জ্বালা ধরে যাওয়াই স্বাভাবিক। তখনকার পরিস্থিতিতে খোদ কলকাতায় বসে প্রকাশ্যে এমন উক্তি করা তাদের কাছে ‘স্পর্ধা’ বলে মনে হতে পারে। হয়তো এই দুঃসাহসের মূল্য হিসেবেই জহিরকে জীবন দিতে হয়েছে। আমার বিশ্বাস জহির মিরপুরে মারা যায়নি। ঘাতকরা তাকে অন্য কোথাও হত্যা করেছে। এ বিশ্বাস এখনো আমার আছে, ।

|দশ|
বামপন্থীদের একটি পক্ষের মতে পাকিস্তানি হানাদার বা অবাঙালিরা নয়, মুক্তিযোদ্ধাদের একটি অংশই জহির রায়হানকে খুন করেছে। মুক্তিযোদ্ধাদের এ অংশটির লক্ষ্য ছিল - বাংলাদেশকে স্বাধীন করা এবং সঙ্গে সঙ্গে বামপন্থী বুদ্ধিজীবিসহ সামগ্রিকভাবে বামপন্থী শক্তিকে নি:শেষ করে দেয়া। এরা নাকি বামপন্থী বুদ্ধিজীবিদের হত্যার একটা তালিকা প্রণয়ন করেছিল। এদের ধারণা এ তালিকাটি জহির রায়হানের হাতে পড়েছিল। জহির রায়হানও জানত তার জীবন নিরাপদ নয়। তবুও সে ছিল ভাইয়ের শোকে মূহ্যমান। তাই শহীদুল্লাহ কায়সারের নাম শুনেই সে ছুটে গিয়েছিল মিরপুরে তারপর আর ফিরে আসেনি। এ মহলই তাকে ডেকে নিয়ে খুন করেছে।

তাহলে কোনটি সত্য? জহির রায়হানকে কারা গুম করেছে? পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীরা, আল বদর, আল শামস্, না রাজাকার? নাকি মুক্তিবাহিনীর একটি অংশ? স্পষ্ট করে বললে বলা যায় - মুক্তিবাহিনীর এ অংশটি মুজিব বাহিনী।
১৯৭১ সালে প্রবাসী স্বাধীন বাংলা সরকারের অজান্তে গড়ে ওঠা মুজিব বাহিনী সম্পর্কে অনেক পরস্পরবিরোধী তথ্য আছে। বিভিন্ন মহল থেকে বারবার বলা হয়েছে, এ বাহিনী গড়ে উঠেছিল ভারতের সামরিক বাহিনীর জেনারেল ওবান-এর নেতৃত্বে। এ বাহিনী নাকি মিজোরামে ভারতীয় বাহিনীর সঙ্গে মিজোদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছে। এদের নাকি দায়িত্ব ছিল - রাজাকার, শান্তি কমিটিসহ বাংলাদেশের সকল বামপন্থীদের নি:শেষ করে ফেলা। মুজিব বাহিনী সম্পর্কে এ কথাগুলো বারবার লেখা হচ্ছে। কোন মহল থেকেই এ বক্তব্যের প্রতিবাদ আসেনি। অথচ দেশে মুজিব বাহিনীর অনেক নেতা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে আছেন। তারা কোন ব্যাপারেই উচ্চবাচ্চ্য করছেন না। তাদের নীরবতা তাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত বক্তব্যই প্রতিষ্ঠিত করছে এবং সর্বশেষ জহির রায়হানের নিখোঁজ হবার ব্যাপারেও মুজিব বাহিনীকেই দায়ী করা হচ্ছে॥"

- নির্মল সেন / আমার জবানবন্দি ॥ [ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ - ফেব্রুয়ারি, ২০১২ । পৃ: ৪০৫-৪০৬ ]