Sunday, December 25, 2016

সবচে ধনী, সবচে রহস্যময় পরিবার রথচাইল্ড


বিশ্বের সবচেয়ে ধনাঢ্য পরিবার হওয়ার পাশাপাশি সম্ভবত সবচেয়ে রহস্যময় পরিবারও ইউরোপের রথচাইল্ড ফ্যামিলি। সতেরো শতকের ষাটের দশকে ব্যাংকিং ব্যবসা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আজকের অবস্থানে উঠে আসে এই ইহুদি পরিবার। গত কয়েক শতক ধরে এদের নিয়ে প্রচলিত আছে বহু ষড়যন্ত্র তত্ত্ব। কেউ কেউ এসব সত্য বলে মানেন। আবার কেউ নিছক ষড়যন্ত্রই মনে করেন।
ব্যবসার শুরু থেকেই কঠোর গোপনীয়তা অবলম্বন করে আসছে রথচাইল্ড। আর এ কারণেই হয়তো সাধারণের কাছে রহস্য হয়েই থাকে পরিবারটি। তাদের মোট সম্পদের পরিমাণ কখনোই কাউকে জানানো হয় না। ধারণা করা হয় প্রায় এক লাখ কোটি ডলারের মালিক তারা। তবে রথচাইল্ডের শুরুটা কিন্তু হয়েছিল একেবারে সাদামাটাভাবে। অবশ্য কৌশলটা ছিল বেশ সূক্ষ্ম। সেই জোরেই রথচাইল্ড এখন ‘ব্যাংক অব দ্য ব্যাংকস’, ‘গভর্নমেন্ট অব দ্য গভর্নমেন্টস’।
এই পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা মায়ার আমসেল রথচাইল্ডের জন্ম ১৭৪৪ সালে এক জার্মান ইহুদি পরিবারে। বাবা মোজেস আমসেল বাউয়ার ছিলেন একজন মহাজনী ব্যবসায়ী ও স্বর্ণকার। ছোটবেলা থেকেই ছেলেকে সুদী ব্যবসা শিক্ষা দিতে শুরু করেন তিনি। সেই সঙ্গে রথচাইল্ডকে ইহুদি রাব্বি বানানোরও স্বপ্ন ছিল তার। ১৭৫৫ সালে মারা যান মোজেস। এরপর হ্যানোভারের একটি ব্যাংকে কাজ শুরু করেন রথচাইল্ড। অসাধারণ কৌশল আর মেধা কাজে লাগিয়ে অল্প সময়েই হয়ে যান প্রতিষ্ঠানের জুনিয়র পার্টনার।
ব্যস, সেই থেকে শুরু। আর পেছনে ফিরতে হয়নি মায়ার রথচাইল্ডকে। হ্যানোভারে কাজ করার সময় ইউরোপের প্রায় প্রতিটি রাজপরিবারের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে তোলেন তিনি। ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয় আরেক ব্যবসায়ী উইলিয়ামের সঙ্গে। কোনো একটা ঘটনাকে কেন্দ্র করে ডেনমার্কে পালিয়ে যেতে হয়েছিল উইলিয়ামকে। আর তখন তিনি রথচাইল্ডকে দিয়ে যান ৬০ হাজার পাউন্ড, যার তৎকালীন মূল্যমান প্রায় ৩০ লাখ মার্কিন ডলার।

রথচাইল্ড পরিবারের নেতৃত্বে যারা
পাঁচ সন্তানের জনক মায়ার রথচাইল্ড মার্চেন্ট ব্যাংক খোলার জন্য তার চার ছেলেকে পাঠিয়ে দেন ইউরোপের চার সমৃদ্ধ শহর নেপলস (ইতালি), প্যারিস (ফ্রান্স), ভিয়েনা (অস্ট্রিয়া), ও লন্ডনে (যুক্তরাজ্য)। আরেক ছেলেকে রেখে দেন ফ্রাঙ্কফুর্টে। এই পাঁচ শহরে থেকে ইউরোপজুড়ে নিজেদের অর্থনৈতিক রাজ্য গড়ে তোলেন রথচাইল্ডের সন্তানরা। ১৮১২ সালে মারা যান মায়ার আমসেল রথচাইল্ড। এরপর ব্যবসা পরিচালনার দায়িত্বে আসেন তার ছেলে নাথান রথচাইল্ড।
বিভিন্ন দেশের সরকার এবং প্রতিষ্ঠানকে উচ্চ সুদে ঋণদানই ছিল রথচাইল্ড পরিবারের মূল ব্যবসা। এর পাশাপাশি পণ্য পরিবহনের ব্যবসাও ছিল তাদের। বলা হয়ে থাকে, দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ বাঁধিয়ে দিয়ে উভয় সরকারকেই ঋণ দিতো রথচাইল্ড। বিনিময়ে বন্ধক রাখতে হতো রাষ্ট্রের জমিজমা আর ধন-সম্পদ। পাঁচ ভাই পাঁচ দেশে থাকার কারণে কাজটি বেশ সুবিধাজনক ছিল তাদের জন্য। যুদ্ধের ফলাফল যাই হোক, লাভ গুণতো রথচাইল্ড।
যেমন: ফ্রান্স এবং ‍ব্রিটেনের মধ্যকার ওয়াটারলুর যুদ্ধে দুই দেশকেই ঋণ দিয়েছিল তারা। ওই যুদ্ধে শুধু ১৮১৫ সালেই ব্রিটেনের মিত্রদের ৯৮ লাখ পাউন্ড ঋণ দিয়েছিল তারা, বর্তমান হিসাবে তা প্রায় ১ হাজার ১ কোটি মার্কিন ডলারের সমান। তখন এর পাশাপাশি আরো একটি লাভজনক ব্যবসা চালাতে পেরেছিল রথচাইল্ড পরিবার। ওয়াটারলুর যুদ্ধে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের মধ্যে সব ধরনের জাহাজ চলাচলই ছিল বন্ধ। চলতো শুধু এই পরিবারটির জাহাজ। কারণ দুই দেশের সরকারই তাদের জাহাজের নিরাপত্তা দিত।
ওই যুদ্ধের পর রথচাইল্ডের সম্পদের পরিমাণ বেড়ে যায় প্রায় ২০ গুণ। যুদ্ধকালীন ব্রিটেনের শেয়ারের দর পড়ে যাওয়ায় সব শেয়ার কিনে নেয় তারা। এভাবে পুরো ব্রিটিশ অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ চলে আসে পরিবারটির হাতে। একই অবস্থা ছিল ফ্রান্সের। দেশটির সমস্ত বন্ড কিনে নিয়ে ১৮১৮ সালের ৫ নভেম্বর সবগুলো বাজারে ডাম্প করে তারা। এতে বিপর্যয় দেখা দেয় ফরাসি অর্থনীতিতে। সরকার ধরণা দিতে শুরু করে রথচাইল্ডের কাছে। এভাবে একে একে ব্রিটিশ, ফ্রান্সসহ ইউরোপের পুরো অর্থনীতি চলে আসে তাদের হাতে।
ব্যবসার ব্যাপারে গোপনীয়তা আর কঠোর নিয়ম কানুন মেনে চলে এই ব্যবসায়ী পরিবার। নিজেদের বাণিজ্য কখনোই পরিবারের বাইরে যেতে দেয়নি। এমনকি মেয়েদের ব্যবসায়ে অংশগ্রহণের ব্যাপারে আছে কঠিন নিষেধাজ্ঞা। সম্পদ রক্ষার জন্য পরিবারের মধ্যেই মেয়েদের বিয়ে দেয়ার রীতিও আছে।
উনিশ শতকের শুরুর দিক থেকেই মূলত ইউরোপের দেশগুলোর অর্থনীতি আর রাজনীতির নিয়ন্তা হয়ে ওঠে রথচাইল্ড।
১৮৭৫ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের আইন প্রণেতা হন এই পরিবারের লিওনেল রথচাইল্ড। মিশরের সুয়েজ খাল নিয়ন্ত্রণে নিতে ব্রিটিশ সরকারকে রাজি করাতে পারেন তিনি। আর এজন্য যুক্তরাজ্যকে ৪০ লাখ পাউন্ড ঋণদানেও সমর্থ হন। তখন থেকে রাজনীতিও পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নিতে শুরু করে এই পরিবার। বলা হয়ে থাকে, সারা পৃথিবীতে অসংখ্য ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান আছে তাদের। কিন্তু কখনোই এসবের তথ্য প্রকাশ করে না তারা।

রথচাইল্ড নিয়ে যত ষড়যন্ত্র তত্ত্ব
প্রায় ২০০ বছর ধরে এই রথচাইল্ডকে নিয়ে আছে অনেক রহস্য। কারো কাছে এসব স্রেফ ষড়যন্ত্র তত্ত্ব, আবার কারো কাছে বাস্তবতা। ষড়যন্ত্র তাত্ত্বিকরা বলেন- ফরাসি বিপ্লব, ওয়াটারলুর যুদ্ধ, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, রুশ বিপ্লব, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা, এমনকি হিটলারের হলোকাস্ট- এর সব কিছুর পেছনেই ভূমিকা আছে রথচাইল্ড পরিবারের। নিজেদের ব্যবসার স্বার্থেই এসব করেছে তারা। সঙ্গে কাজ করেছে ধর্মীয় অনুভূতিও।
১৯১৯ সালের ২৯ মার্চ বলশেভিক বিপ্লব বিষয়ে ব্রিটিশ গণমাধ্যম টাইমস অব লন্ডন এক প্রতিবেদনে বলে, ‘বলশেভিক বিপ্লবের ব্যাপারে সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক ব্যাপারটি হচ্ছে- এর নেতাদের একটি বিরাট অংশই রুশ নয়। বিপ্লবের মূলে ভূমিকা রাখা ২০ থেকে ৩০ নেতার মধ্যে ইহুদির হার ৭৫ ভাগের কম হবে না। ভ্লাদিমির লেনিন নিজেও ইহুদি।’
তবে পরে নাকি রুশদের সঙ্গে আর মিলে থাকা সম্ভব হয়নি রথচাইল্ডের। কারণ বিপ্লবের সময় কথা ছিল, কোনো কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না সরকার। পরে সে কথা রাখেনি বলশেভিক সরকার।
ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পেছনে রথচাইল্ডের ভূমিকার কথাও বলে থাকেন অনেকে। ইসরায়েলকে যাতে স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র ঘোষণা করা হয় সেজন্য ৩৩তম মার্কিন প্রেসিডেন্ট হেনরি এস ট্রুম্যানকে ২০ লাখ ডলার দিয়েছিল তারা। নির্বাচনী প্রচারণা তহবিলের নামে দেয়া হয়েছিল ওই অর্থ। পরে যুক্তরাষ্ট্রই ইসরায়েলকে প্রথম স্বীকৃতি দেয়। চীনের মাও সে তুংয়ের বিপ্লবেও নাকি অর্থ দিয়েছিল রথচাইল্ড!
এসব তত্ত্বের কোনটা সঠিক, আর কোনটা ভুল- তা যাচাই করা কঠিন। তবে সবকিছু ছাপিয়ে বিশ্বের ধনাঢ্য পরিবারের তালিকায় শীর্ষেই থাকছে রথচাইল্ড। আর সেই সঙ্গে হয়ে আছে রহস্যময়।

Friday, December 2, 2016

ইতিহাসের ধারায় আরাকান-বাংলাদেশ সম্পর্ক

যে দেশটাকে আমরা এখনো বাংলায় সাধারণভাবে ডাকি আরাকান (বর্তমান নাম রাখাইন) তাকে ফারসিতে বলা হতো AviLO। আবুল ফজল তার আইন-ই-আকবরীতে আরখঙ সম্পর্কে লিখেছেন : সুবে বাঙ্গালহ-ও দক্ষিণ-পূর্বে হলো AviLO রাজ্য। এই রাজ্যে অনেক হাতি পাওয়া যায়। কিন্তু অশ্ব খুবই মহার্ঘ। গাধা ও উট এখানে চড়া দামে বিক্রি হয়। এই রাজ্যে গরু ও মহিষ দেখা যায় না। এখানে মানুষ গাভীজাতীয় একপ্রকার প্রাণীর দুধ পান করে। এই দেশে মানুষ না হিন্দু, না মুসলমান। যমজ ভাতা ভগ্নীর মধ্যে এই দেশে বিবাহ প্রচলিত আছে। মাতা-পুত্র ব্যতীত আর সবার মধ্যে বিবাহ সম্পন্ন হতে পারে। এই দেশে লোকে তাদের পুরোহিতের (ওয়ালির) সম্পূর্ণ আজ্ঞাবহ। এখানে রাজপ্রাসাদে স্ত্রী লোক প্রহরীর কাজ করে। পুরুষ মানুষের মুখে দাড়ি হয় না।

ব্রিটিশ শাসনামলে আরাকান ছিল বর্মার একটি বিভাগ (Division)। এই বিভাগের ছিল চারটি জেলা। যথা : ১. আরাকান হিলট্রাক্টস, ২. আকিয়াব, ৩. সান্ডওয়ে ও ৪. কাউকপিউ। বর্তমানে আরাকান বা রাখাইন হলো মিয়ানমারের একটা প্রদেশ; বিভাগ আর নয়; কিন্তু বর্তমান আরাকান প্রদেশের আয়তন হলো আগের আরাকান বিভাগের চাইতে ছোট। এই ছোট হওয়ার কারণ, আরাকান হিলট্রাক্টসকে জুড়ে দেয়া হয়েছে মিয়ানমারের আরেকটা প্রদেশের সাথে। মিয়ানমার বর্তমানে সাতটা প্রদেশ (Constituent stats) এবং সাতটি বিভাগ নিয়ে গঠিত। এই সাতটি বিভাগে বাস করেন খাঁটি বর্মিভাষী জনসমষ্টি; কিন্তু আর সাতটি প্রদেশের মধ্যে ছয়টির জনসমষ্টির মাতৃভাষা বর্মি বা ম্রনমা নয়। আরাকান হলো এমন একটি প্রদেশ, যার মানুষের মাতৃভাষা খাঁটি বর্মি নয়; কিন্তু বর্মি ভাষার খুবই কাছাকাছি। একে বলতে হয় প্রাচীন বর্মি ভাষার অনুরূপ। অর্থাৎ আরাকান প্রদেশের অবস্থান ভাষাগত দিক থেকে বর্মি পরিবারভুক্ত হলেও বেশ কিছুটা ভিন্ন। আরাকানের সব লোক মঙ্গল মানবধারার নয়। এখানে অনেক মানুষের চেহারা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের অনুরূপ। তাদের চোখ আয়ত, নাক সরল ও উন্নত, মাথার চুল মসৃণ। তাদের পুরুষের মুখে দাড়ি গোঁফের প্রাচুর্য থাকতে দেখা যায়। এদের মাথা প্রধানত মধ্যমাকৃতির; কিন্তু যাদের মনে করা হয় একান্তভাবেই আরাকানীয় তাদের মাথার আকৃতি গোল, চুল ঋজু, চোখের ওপর পাতায় থাকে বিশেষ ধরনের ভাঁজ। যে কারণে তাদের চোখ দেখে মনে হয় ছোট এবং বাঁকা। এদের গণ্ডের হাড় হয় উঁচু, যে কারণে এদের মুখমণ্ডল দেখে মনে হয় সমতল। পুরুষের মুখে দাড়িগোঁফের প্রাচুর্য থাকতে দেখা যায় না। এরা অনেক খর্বাকৃতির। মানবধারার দিক থেকে এদের বলা চলে, দক্ষিণ চীনের মঙ্গলধারার। 

ভূগোলের দিক থেকে আরাকান বর্মার (ব্রহ্ম) মূল ভূখণ্ড থেকে ছিল বিচ্ছিন্ন। বর্মা ও আরাকান পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন পর্বতশ্রেণী দ্বারা। এই পর্বতশ্রেণীকে বলে আরাকান ওমা। এর মধ্য দিয়ে আছে তিনটি গিরিপথ। এই তিনটি গিরিপথের মধ্য দিয়ে কেবলমাত্র একটি দিয়ে বছরে সব সময় যাতায়াত করা চলে। অন্য দু’টির মধ্য দিয়ে বর্ষাকালে যাতায়াত করা কঠিন হয়ে পড়ে। বর্মার মূল ভূ-খণ্ডের সাথে আরাকানের যোগাযোগ ছিল সমুদ্রপথে। জাপান বর্মার মূল ভূখণ্ড দখল করে ১৯৪১ সালের ডিসেম্বর মাসে। বর্মার মূল ভূখণ্ড থেকে জাপানিরা ১৯৪২ সালে সমুদ্রপথে স্পিডবোটে এসে করেছিল সম্পূর্ণ আরাকান দখল। আরাকান থেকে স্থলপথে এসে পৌঁছেছিল চট্টগ্রামের মহেশখালী পর্যন্ত। তবে তারা মহেশখালী দখলে রাখতে পেরেছিল না। আরাকানসহ বর্মা জাপানের দখলে ছিল ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত। বাংলাদেশ থেকে স্থলপথে আরাকানে যাওয়া ছিল সহজ। বাংলাদেশ থেকে মানুষ গিয়েছে আরাকানে। আবার আরাকান থেকে মানুষ এসেছে বাংলাদেশে। এটা ঘটেছে বহু যুগ ধরেই।

রোহিঙ্গা নামটির একটি বিশেষ ইতিহাস আছে। সংক্ষেপে তা হলো এই রকম : খ্রিষ্টীয় পঞ্চম শতাব্দীর প্রথম ভাগে (১৪০৬ খ্রিষ্টাব্দের কাছাকাছি) নিম্ন ব্রহ্মের রাজা মেং-শো-আই আরাকান জয় করেন। আরাকানের রাজা মেং-শোআ মউন যুদ্ধে হেরে পালিয়ে যান গৌড়ের সুলতান জালাল-আল-দীন শাহ-এর কাছে। তিনি আরাকানের পরাজিত রাজাকে অনেক সৈন্য প্রদান করেন গৌড়ের এক সেনাপতির অধীনে, যাতে করে আরাকানের রাজা মেং-শোআ মউন বর্মা রাজাকে পরাজিত করে আবার আরাকানের রাজা হতে পারেন; কিন্তু গৌড়ের এই সেনাপতি বিশ্বাসঘাতকতা করেন। মেং-শোআ মউন আবার বন্দী হন বর্মার রাজার কাছে। অনেক কষ্টে আরাকানের পরাজিত রাজা আবার গৌড়ে পালিয়ে আসতে সক্ষম হন। এবার গৌড়ের সুলতান তাকে আর একজন সেনাপতির অধীনে আরো অনেক সৈন্য প্রদান করেন। এই সেনাপতি ও সৈন্যের সহযোগিতায় মেং-শোআ মউন যুদ্ধে জয়ী হন। তিনি আরাকানের নতুন রাজধানী গড়েন বাংলার সীমানার কাছে। এই রাজধানীর নাম দেন রোহং অথবা ম্রোহং। আরাকানের রাজা চান না গৌড়ের সৈন্য ফিরে যাক। গৌড়ের এসব মুসলমান সৈন্য থেকে যায় রাজধানী রোহং শহরে। এদেরই বংশধররা হলো রোহিঙ্গা। রোহং শহরকে বাংলা ভাষায় বলা হতে থাকে রোসাঙ্গ। একসময় রোসাঙ্গ আর আরাকানকে ডাকা হতে থাকে একই রোসাঙ্গ নামে। দৌলত কাজী তার সতী ময়নামতী লিখেছেন-
কর্ণফুলী নদী পূর্বে আছে এক পুরী।
রোসাঙ্গ নগরী নাম স্বর্গ অবতারী।।
তাহাতে মগধ বংশ ক্রমে বুদ্ধাচার।
নাম শ্রীসুধর্ম্মা রাজা ধর্ম্ম অবতার।।
প্রতাপে প্রভাত ভানু বিখ্যাত ভুবন।
পুত্রের সমান করে প্রজার পালন।।
আরাকানের রাজারা গৌড়ের সাথে যোগাযোগ রেখে চলতেন। তারা তাই বাংলা ভাষা শিখতেন। আরাকানের রাজসভায় এই জন্য হতে পেরেছে বাংলা সাহিত্যের চর্চা। দৌলত কাজী ছিলেন আরাকানের রাজসভার একজন খুবই খ্যাতনামা কবি। তিনি জন্মে ছিলেন চট্টগ্রামের অন্তর্গত বর্তমান রাওজান উপজেলার সুলতানপুর গ্রামে। সেখান থেকে প্রথম যৌবনে তিনি চলে যান আরাকানে। এ সময় আরাকানের রাজা ছিলেন থিরি থুধর্মা (১৬২২-১৬৩৫ খ্রি. রাজত্বকাল)। যার বাংলা নাম দাঁড়ায়, শ্রীসুধর্ম্মা। শ্রীসুধর্ম্মার লস্কর উজির (প্রতিরক্ষামন্ত্রী) ছিলেন আশরাফ খান। আশরাফ খান ছিলেন চট্টগ্রামের বর্তমান উপজেলা হাটহাজারীর অন্তর্গত চারিয়া গ্রামের অধিবাসী। তিনি সেখান থেকে যান আরাকানে। ইনার সহায়তায় দৌলত কাজী আরাকানের রাজসভায় প্রতিষ্ঠিত হতে পারেন। দৌলত কাজী খ্যাত হয়ে আছেন সতী ময়নামতী নামক কাব্যগ্রন্থ রচনার জন্য। এটা তিনি রচনা করেন সাধন নামে উত্তর ভারতের একজন কবির লেখা কাব্য ময়না সৎ নামক কাব্যগ্রন্থের অনুসরণে। ময়না সৎ কাব্যগ্রন্থ লিখিত হয়েছে পূর্বী হিন্দিতে। দৌলত কাজী তার কাব্য শেষ করার আগেই হঠাৎ ইন্তেকাল করেন। তার এই কাব্য সমাপ্ত করেন কবি আলাওল বেশ কিছু দিন পরে। কবি আলাওলের একটি বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থের নাম পদ্মাবতী। এটি তিনি রচনা করেন মালিক মুহম্মদ জয়সি নামে উত্তর ভারতের একজন সুফি কবির লেখা পাদুমাবৎ নামক কাব্যগ্রন্থের ওপর নির্ভর করে। পদুমাবৎও লিখিত হয়েছিল পূর্বী হিন্দিতে। বাংলা সাহিত্যের ওপর ফারসি সাহিত্যের প্রভাব পড়েছে। এই প্রভাব বহুদিন আগে থেকেই পড়তে আরম্ভ করে। তবে নতুন করে আবার পড়ে সম্রাট শাজাহানের পুত্র বাংলার সুবেদার সুজার আমলে। সুজা বাংলার সুবেদার ছিলেন প্রায় ২০ বছর (১৬৩৯-১৬৬০)। সুজা আরোঙ্গজেবের সেনাপতি মীর জুমলার হাতে পরাজিত হয়ে আরাকানে প্রস্থান করেন। সুজার সময় সুবে বাংলার রাজধানী ছিল রাজমহল, যা এখন পড়েছে ভারতের ঝাড়খণ্ড প্রদেশে। আলাওল চট্টগ্রাম অঞ্চলের মানুষ ছিলেন না। ছিলেন ফরিদপুর অঞ্চলের (ফাতেহাবাদ) লোক। তিনি তার পিতার সাথে নৌপথে কোথাও যাওয়ার সময় পর্তুগিজ জলদস্যুদের হাতে পড়েন। আলাওলের পিতা পর্তুগিজ জলদস্যুদের সাথে যুদ্ধাবস্থায় মারা যান। আলাওলকে পর্তুগিজ জলদস্যুরা ধরে এনে বিক্রি করেন আরাকানে। আলাওল অনেকগুলো ভাষা জানতেন। বাংলা, উড়িয়া, ফারসি, আরবি, পূর্বী হিন্দি ও সংস্কৃত। আলাওল ফারসি থেকে বাংলায় অনুবাদ করেন হফত পয়কর ও সিকান্দর নামা। আলাওলের যেসব পুঁথি পাওয়া গিয়েছে, তা বাংলা অক্ষরে লিখিত নয়। সবই লিখিত আরবি-ফারসি অক্ষরে। আরাকানে সুজার সাথে আলাওলের বিশেষ সখ্যতা গড়ে ওঠে। আরাকানের রাজা সুজাকে হত্যা করেন। এই হত্যার একটি কারণ ছিল আরাকানের রাজা সুজার এক কন্যাকে বিবাহ করতে চান; কিন্তু সুজা রাজি হন না। সুজার সাথে সখ্যতার জন্য আলাওলকে পড়তে হয় আরাকানের রাজার কোপে। সুজার মৃত্যুর পর তার সৈন্যসামন্ত ও লোকজন সবাই থেকে যায় আরাকানে। রবীন্দ্রনাথ ডালিয়া বলে একটি ছোট গল্প লিখেছেন। যার বিষয়বস্তু হলো- সুজার কন্যার সাথে আরাকান রাজার প্রেম। তবে এটা ইতিহাসের নিরিখে সত্য নয়; কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হলো, আরাকান রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। আর কোনো লেখক আরাকান নিয়ে তার সময়ে এ রকম কিছু লিখেননি।

মগ বলতে ঠিক কাদের বোঝাত, তা জানা যায় না। চট্টগ্রামে মগ বলতে একদল বাংলাভাষীকেও বোঝায়। যারা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। এই মগরা বলেন, তাদের পূর্বপুরুষ এসেছিল বিহারের মগধ থেকে। দৌলত কাজী বলেছেন, সুধর্ম্মার পূর্বপুরুষও ছিলেন মগধ থেকে আগত। সম্ভবত এরা পূর্বী হিন্দি সম্বন্ধেও ছিলেন অবগত। তাই আরাকানের রাজসভায় কাব্যচর্চা করতে যেয়ে পূর্বী হিন্দিতে লিখিত বইয়ের অনুবাদ করতে হয়েছেন সচেষ্ট। সাধারণভাবে বাংলাদেশে এখনো মগেরমুল্লুক বলতে, লোকে বোঝে চরম অরাজক রাজত্ব। সম্ভাবত মগদের একাংশ পর্তুগিজ জলদস্যুদের সংশ্রবে এসে হয়ে ওঠে ভয়ঙ্কর প্রকৃতির দস্যু। এই দস্যুদের সমূলে ধ্বংস করতে সক্ষম হন আরোঙ্গজেব কর্তৃক নিযুক্ত সুবেদার শায়েস্তা খান। 

আরাকান আগে বর্মার অংশ ছিল না। আরাকান বর্মার বিশেষ অংশ হয়ে ওঠে ব্রিটিশ শাসনামলে। যখন একে ব্রহ্মদেশের সাথে একটি বিভাগ হিসেবে যুক্ত করা হয়; কিন্তু ব্রিটিশ শাসনামলেও চট্টগ্রাম থেকে বহু মানুষ গিয়েছেন আরাকানে চাকরি করতে। বিশেষ করে পুলিশ ও শিক্ষা বিভাগে। এ ছাড়া হয়েছেন নৌপথে চলাচলকারী মোটর-বোটের সারেং ও মাঝি-মাল্লা। ব্রিটিশ আমলে চট্টগ্রামের হাটহাজারী থেকে আরাকানের আকিয়াব বন্দর পর্যন্ত রেল স্থাপনের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল; কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে সেটা সম্ভব হয়েছিল না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কিছু ঘটনা আজকের রোহিঙ্গা সমস্যা বিশ্লেষণে যথেষ্ট প্রাসঙ্গিক। জাপান বর্মাকে খুব সহজেই দখল করতে পেরেছিল। এর কারণ, কেবলই সামরিক কৌশল ছিল না। জাপান এ সময় বলেছিল, এশিয়া শাসিত হতে হবে এশীয়বাসীর দ্বারা। জাপান এশীয়। জাপানিরা ছিলেন ধর্মের দিক থেকে অনেকেই বৌদ্ধ। জাপান বলে, এশিয়ার বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে তারা সহযোগিতা সৃষ্টি করতে চায়, যা এশিয়ার বিভিন্ন রাষ্ট্রকে করে তুলবে সমসমৃদ্ধ। এর একটা প্রভাব পড়েছিল বর্মার মানুষের ওপর। তারা সহযোগিতা করেছিল জাপানের। বর্মার প্রধান রাজনৈতিক দল ছিল দোবামা আসিওরে। এরা প্রথমে নেয় জাপানের পক্ষ। এরা আওয়াজ তোলে বর্মা হতে হবে বর্মিদের জন্য। এরা ছিল বিশেষভাবেই বর্মি জাতীয়তাবাদী। ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে প্রায় দশ লাখ মানুষ সমুদ্রপথে বর্মায় গিয়েছিলেন, ব্যবসা-বাণিজ্য করতে। এরা অনেকেই বর্মায় নিয়োজিত হয়েছিলেন অসাধু ব্যবসা-বাণিজ্যে। ঠকিয়েছিলেন বর্মিদের। বর্মি জাতীয়তাবাদ তাই কেবল ব্রিটিশবিরোধী ছিল না, ভারতবিরোধীও ছিল। যুদ্ধের সময় বর্মা ছেড়ে পালিয়ে আসতে হয়েছিল এইসব ভারতীয়দের। আরাকানে এ সময় মুসলমানরা জাপানের পক্ষ নিতে চাননি। জাপানিরা বৌদ্ধ। জাপানিরা আরাকানি বৌদ্ধদের যেভাবে সাহায্য সহযোগিতা প্রদান করবে, তারা মনে করেন মুসলমানদের জাপানিরা সে রকম করবে না। এ সময় ব্রিটিশ শাসকেরা প্রতিশ্রুতি প্রদান করে, তারা উত্তর আরাকানকে একটা আলাদা প্রদেশ করবে। উত্তর আরাকান মুসলিম প্রধান। কেবল তাই নয়, উত্তর আরাকানের বেশির ভাগ লোক দেখতে বাংলাদেশের অধিবাসীর মতো। উত্তর আরাকানে হাটেবাজারে চলতো চট্টগ্রামের বাংলাভাষা, আরাকানি ভাষা নয়। ১৯৪৬ সালে গঠিত হয় আরাকান মুসলিম লীগ। এরা তোলে আরাকানকে বিভক্ত করার দাবি; কিন্তু আরাকান মুসলিম লীগের এই দাবি জিন্নাহ সাহেব সমর্থন করেন না। তিনি বলেন, বর্মা এখন একটা পৃথক দেশ। আরাকানে মুসলমানদের জন্য পৃথক রাষ্ট্র গঠনের দাবি তুললে ভারতে পাকিস্তান আন্দোলন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আসলে আরাকান মুসলিম লীগ কখনই আরাকানভিত্তিক একটি দল ছিল না। ছিল চট্টগ্রামভিত্তিক একটা দল, যাতে নেতৃত্ব দিতেন ফজলুল কাদের চৌধুরী। যিনি ছিলেন চট্টগ্রাম শহরের লোক। আরাকানি মুসলিম লীগ কোনো দিনই আরাকানে সাড়া জাগাতে পারে না। ১৯৪৮ সালে বর্মা স্বাধীন হওয়ার ঠিক পরেপরে আরাকানি মুসলমানদের একাংশ কাশেম রাজার নেতৃত্বে বিদ্রোহ করেন; কিন্তু এদের সংখ্যা খুব উল্লেখযোগ্য ছিল না। কাশেম রাজা পেশায় ছিলেন ধীবর। তিনি একসময় সমুদ্রে মৎস্য শিকার করতেন; কিন্তু তিনি ছিলেন ভালো সংগঠক ও নেতৃত্ব গুণে গুণান্বিত। ফলে হয়ে উঠতে পারেন একজন বিশিষ্ট নেতা। তিনি গড়ে তোলেন মুসলিম মুজাহিদ বাহিনী। কাশেম রাজা পাকিস্তানের কাছে সাহায্য চান; কিন্তু পান না। কাশেম রাজা ১৯৫৪ সালে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে এসে ধরা পড়েন ও কারারুদ্ধ হন। আরাকানে মুসলিম মুজাহিদরা হয়ে পড়েন শক্তিহীন। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব চান না বর্মার সাথে পাকিস্তানের সম্পর্কে জটিলতার সৃষ্টি হোক। নাফ নদীর ওপারে ৫ মাইল জায়গা নিয়ে বর্মার সাথে বিরোধ সৃষ্টি হয়েছিল। আইউব সেটা বর্মাকে ছেড়ে দিয়ে সীমান্ত সমস্যার একটা শান্তিপূর্ণ সমাধানে আসেন। বর্মা স্বাধীন হওয়ার সাথে সাথে আরাকানিরা স্বাধীন হতে চেয়েছিল; কেবলই আরাকানের মুসলমানরাই নয়। কিন্তু আরাকানের মোট জনসংখ্যা শতকরা ৩৫ ভাগ মানুষ হলো মুসলমান। জেনারেল নে উইন (ঘব ডরহ) ১৯৫৮ সালে বর্মায় ক্ষমতায় আসেন। তিনি ছিলেন কঠোর বর্মি জাতীয়তাবাদী। তিনি মনে করেন আরাকানে রোহিঙ্গাদের প্রভাব প্রতিপত্তি কমাতে না পারলে ভবিষ্যতে আরাকান একটি পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র হয়ে যেতে পারে। তার সময় থেকেই শুরু হয় রোহিঙ্গা নির্যাতন। যাতে করে রোহিঙ্গারা আরাকান ছেড়ে পাকিস্তানে চলে আসতে চায়। 

আজ যে সমস্যা আরাকানে সৃষ্টি হয়েছে, তার মূলে আছে উগ্র বর্মি জাতীয়তাবাদ। রোহিঙ্গাদের ওপর আজ যে জঘন্য নির্যাতন হচ্ছে সেটা করছে মিয়ানমার মূল ভূখণ্ড থেকে আসা বর্মি সৈন্যরা। এর মূলে আছে উগ্র বর্মি জাতীয়তাবাদ, যার উদ্ভব হয়েছে বর্মার মূল ভূখণ্ডে, আরাকানে নয়। আরাকানে যা ঘটছে, তা ঘটতে পারার একটা কারণ হলো বাংলাদেশ একটা যথেষ্ট সবল রাষ্ট্র নয়। সবল রাষ্ট্র হলে বর্মার সৈন্যরা রোহিঙ্গাদের ওপর এ রকম অত্যাচার করতে কখনো এতটা সাহসী হতো না। বাংলাদেশ সরকার বিশ্বের কাছে আবেদন জানাচ্ছে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের জন্য। মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় বহু মুসলমানের বাস। আমাদের চেষ্টা হওয়া উচিত এই দু’টি দেশের জনমতকে বিশেষভাবে পক্ষে পাওয়া। কেননা, এই দু’টি দেশ যদি বর্মার ওপর রোহিঙ্গা নিপীড়নের জন্য চাপ সৃষ্টি করে তবে তা কার্যকর হবে সবচেয়ে বেশি। তবে একান্তই যদি দেখা যায় যে, রোহিঙ্গাদের ওপর অত্যাচার বন্ধ হচ্ছে না, তবে মনে হয় শেষ পর্যন্ত উচিত হবে রোহিঙ্গাদের স্বাধিকারের জন্য সব ধরণের সাহায্য প্রদান করা। রোহিঙ্গারা যদি হাতে অস্ত্র পান, তবে লড়াই করে তারা তাদের নিজেদের দাবি-দাবাকে প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন বলে মনে করার কারণ আছে। কেননা, মিয়ানমারের মূল ভূখণ্ডে কারেন, শান, কাচিন প্রভৃতি জাতি তাদের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করছে। বর্মি বাহিনী খুব যে সুবিধার মধ্যে আছে, তা কিন্তু নয়। রোহিঙ্গাদের দমন করার জন্য মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকার যদি অধিক সৈন্য পাঠাতে বাধ্য হয়, তবে মিয়ানমারের মূল ভূখণ্ডে অন্য জাতিসত্তাদের সংগ্রাম আরো জোরালো হবে। ফলে মিয়ানমারের সরকারকে পড়তে হবে যথেষ্ট জটিলতায়। মিয়ানমারের সাতটি প্রদেশেই আছে কম বেশি বিচ্ছিন্নতাবাদী তথা স্বাধীনতাকামী প্রবণতা। আজকের মিয়ানমার হলো ব্রিটিশ শাসনের ফল। কোনো খাঁটি বর্মি রাজা এত বড় অঞ্চলকে কখনো শাসন করতে পারেননি। 

Wednesday, November 16, 2016

মাওলানা ভাসানীর সংক্ষিপ্ত জীবনী !!!

(জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর জীবনপঞ্জির (১৮৮০- ১৯৭৬) গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলীঃ
মাওলানা ভাসানী রিসার্চ সেন্টার কর্তৃক প্রকাশিত
১লা বৈশাখ ১৪১৭, ১৪ এপ্রিল ২০১০
সৈয়দ ইরফানুল বারী কর্তৃক সল্কলিত ও সম্পাদিত সন্তোষ, টাঙ্গাইল।)

১৮৮০ খ্রীস্টাব্দ : ১২ ডিসেম্বর জন্ম। সিরাজগঞ্জ শহরের অদুরে সয়া ধানগড়া গ্রামে। পিতা আলহাজ শরাফত আলী খান। মাতা মজিরন বিবি। শৈশব- কৈশোরের সন্ধিক্ষনে পিতৃহারা হন। তখনই উপমহাদেশের প্রখ্যাত সূফী সৈয়দ নাসির উদ্দিন আহমদ বোগদাদীর (রঃ আঃ ) দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। যৌবনের উন্মেষে চিরদিনের জন্য গৃহত্যাগী হন। সূফীর সহচর্যে ময়মনসিংহ শহরের উপকন্ঠে বাদে কলপা গ্রামে তিন বৎসর কাটিয়ে তাঁরই সাথে আসামের ধুবরী মহকুমার জলেশ্বর গ্রামে বসবাস করেন। সৈয়দ নাসির উদ্দিন আহমদ বোগদাদীর (রহঃ) তত্ত্বাবধানে কালক্রমে তাসাউফের সাধনা সমাপ্ত করেন। একই সাথে চলে কিতাবী শিক্ষা গ্রহন।
১৯০৩ হতে ১৯০৫: সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনে যোগদান। বিভিন্ন কর্মকান্ডে যোগদান করার পর সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন পরিত্যাগ।
১৯০৭ হতে ১৯০৯: সৈয়দ নাসিরউদ্দিন আহমদ বোগদারীর (রহঃ আঃ) নির্দেশে উত্তর ভারতের দেত্তবন্দ দারুল উলুম- এ অবস্থান করেন। সেখানে শায়খুল হিন্দ মওলানা মাহমুদুল হাসান ও শায়খুল ইসলাম সৈয়দ হেসোইন আহমদ মাদানীর প্রত্যক্ষ সাহচার্যে শিক্ষা লাভ করেন। এদের সাহচর্যেই রবুবিয়াতের রাজনৈতিক দর্শন শিক্ষা লাভ হয়।
১৯১১: মওলানা মোহাম্মদ আলীর সান্নিধ্যে ও নেতৃত্বে প্রথম প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক কর্মকান্ডে যোগদান। (শ্রদ্ধার নিদর্শন স্বরূপ তাঁর নামে ১৯৫৭ সালে কাগমারীতে মওলানা মোহাম্মদ আলী কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন।)
কংগ্রেসে যোগদান।

১৯১৭-১৮: প্রবাসী সরকারের নেতৃত্বে তুরস্কের সাহায্যে ভারতবর্ষ স্বাধীন করার পরিকল্পনা অর্থাৎ ইতিহাস খ্যাত রেশমী রুমাল আন্দোলনে যোগদান এবং এতদউদ্দেশ্যে হেজাজে (বর্তমান সৌদি আরব) গমন ও প্রথম হজ সমাপন। আন্দোলনের নেতাদের মাল্টায় নির্বাসন। তাঁর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন।
১৯১৯: প্রথম কারাবরণ। দেশবন্দু চিত্তরঞ্জন দাসের সাহচর্য লাভ যা ১৯২৫ সন পর্যন্ত অব্যাহত।
১৯২০ হতে ১৯২৫: দেশবন্ধুর স্বরাজ আন্দেলন ও বেঙ্গল প্যাক্টের সাথে একাত্ব হয়ে রাজনৈতিক কর্মকান্ডে যোগদান। জয়পুরহাট জেলার পাঁচবিবি থানার বীরনগর গ্রামে বিবাহ (স্ত্রী আলেমা খাতুন ভাসানী)
১৯২১ হতে ১৯২৩: খিলাফত আন্দোলন ও অসহযোগ আন্দোলনে যোগদান এবং কারাবরণ। উত্তর বঙ্গের প্রলয়য়ঙ্করী বন্যায় ত্রাণ কার্যে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় ও নেতাজী সুভাস বসুর সাথে যোগদান। সকলের দুষ্টি আকর্ষণ।
১৯২৪: কলকাতা কেন্দ্রীক রাজনৈতিক জীবনকে প্রাধান্যে না রেখে বিশেষ করে ১৯১৯ সন হতে আসামের ও পূর্ব বাংলার গ্রামে গঞ্জে শহরে বন্দরে কৃষক মজুরদের সুসংগঠিত করার ধারাবাহিক কর্মপ্রয়াস বাস্ত বায়নের পর আসামের ভাসান চরে ঐতিহাসিক কৃষক- প্রজা সম্মেলন অনুষ্ঠান। পারিবারিক নাম “মোঃ আবদুল হামিদ খান” এর সাথে “ভাসানী” উপাধি প্রাপ্তির যোগসূত্র এখানেই। তিনদিন ব্যাপী অনুষ্ঠিত এ সম্মেলন বাংলা- আসামের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করে।
১৯২৫ হতে ১৯২৭: আসামে ও পূর্ব বাংলায় কৃষক- মজুরদের স্বার্থে সংগঠন গড়ে তোলায় এবং জমিদার ও সুদখোর মহাজন বিরোধী আন্দোলন তীব্রতর করনে আত্বনিয়োগ।
১৯২৮: কলকাতায় অনুষ্ঠিত খিলাফত সম্মেলনে যোগদান।
১৯২৯: আসামের ভাসান চরে দ্বিতীয় বারের কৃষক- প্রজা সম্মেলন অনুষ্ঠিত। সর্বভারতীয় নেতৃবৃন্দের যোগদান। আলোড়ন সৃষ্টিকারী এ সম্মেলন পরবর্তীতে- প্রজা-স্বার্থে আইন প্রনয়ণে প্রভাব সৃষ্টি করে।
১৯৩0: রাভী নদীর তীরে অনুষ্ঠিত কংগ্রেসের সম্মেলনে যোগদান ও গুরুতর মতবিরোধ।
১৯৩১: প্রলয়ঙ্করী বন্যায় আক্রান্তদের জন্য ত্রাণ সামগ্রী নিয়ে আসাম হতে টাঙ্গাইলে আগমন। খোশনদপুর তথা সন্তোষের ওয়াকফ সম্পত্তির জবর দখলকারী মহারাজার সাথে বিরোধ ও বিবাদ।
১৯৩২: তদান্তীন ময়মনসিংহ জেলা হতে বহিস্কৃত। ডিসেম্ভর সিরাজগঞ্জের কাওয়াখোলা ময়দানে তিনদিন ব্যাপী কৃষক- প্রজা সম্মেলন অনুষ্ঠান। অতঃপর জন্মভূমি পাবনা জেলা হতে বহিস্কৃত।
১৯৩৩ হতে ১৯৩৫: ১৯৩৩ এ আসামের ভাসান চরে এবং ১৯৩৪ সনে টাঙ্গাইলের চারাবাড়ীতে কৃষক সম্মেলন। আসাম ও পূর্ব বাংলায় সামন্ত প্রথা, সামন্ত শোষন বিরোধী আন্দোলন জোরদার করণ। উত্তর ভারতের আমরুহাতে অনুষ্ঠিত (১৯৩৫) সর্বভারতীয় বিপ্লবী চিন্তাধারার আলেমদের সম্মেলনে যোগদান এবং আলামা আজাদ সোবহানীর সাহচর্য লাভ।
১৯৩৬: আনুষ্ঠানিকভাবে কংগ্রেস ত্যাগ করে মুসলিম লীগে যোগদান। আসামের প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সভাপতির পদ বরণ। আলামা আজাদ সোবহানীর সাথে মিসরে আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে গমন।
১৯৩৭: আসামে কুখ্যাত লাইন প্রথা বিরোধী আন্দোলন তীব্রতর করণ। আসামের মজলুম মানুষের এ জীবনমরণ আন্দোলনে অব্যাহত গতিতে নেতৃত্ব দান। আসাম প্রাদেশিক পরিষদে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সদস্য নির্বাচিত যা ১৯৪৭ পর্যন্ত বহাল।
১৯৩৮: আসামের বড়পেটায় এবং মঙ্গলদৈ-এ কৃষক সম্মেলন। পূর্ব বাংলার গাইবান্ধায় কৃষক সম্মেলন।
১৯৩৯: জনগণের পার্টিতে পরিণত করতে মুসলিম লীগের কর্মকান্ড জোরদার করণ।
১৯৪০: মুসলিম লীগের লাহোর সম্মেলনে প্রাদেশিক সভাপতি (আসাম মুসলিম লীগ) হিসাবে যোগদান। লাহোর প্রস্তাবের সাবজেক্ট কমিটির সদস্য হিসাবে পাকিস্তান প্রস্তাব প্রণয়নে বিশেষ ভূমিকা পালন। দ্বিতীয় বারের মত হজ্ব সমাপন।
১৯৪১: যুগপৎ লাইন প্রথা বিরোধী আন্দোলন এবং স্বাধীনতার লক্ষ্যে পাকিস্তান আন্দোলন পরিচালনা (১৯৪৭ পর্যন্ত)।
১৯৪৪: বড়পেটায় আসাম মুসলিম লীগের সম্মেলন।
১৯৪৫: পূর্ব বাংলায় এবং আসামে ব্যাপক সফর।
১৯৪৬: পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নির্বাচনী আন্দোলন । মে মাসে আসামের বাস্তুহারা অসহায় মানুষের অধিকার আদায় করতে অনশন। টাঙ্গাইলের পোড়াবাড়ীতে কৃষক সম্মেলন অনুষ্ঠান।
১৯৪৭: ৫ মার্চ সমগ্র আসামে আন্দোলনের ডাক। আসাম দিবস পালনের প্রস্তুতিতে সংগ্রামী ঘোষণা। ডুরাং ত্যাগের নির্দেশ অমান্য করায় কারাবরণ। ২০ জুন জোরহাট জেলা হতে মুক্তি লাভ। পূর্ব বাংলায় আগমন। ঐতিহাসিক আসাম- জীবনের অবসন।
১৯৪৮: ১৭ মার্চ পূর্ব বাংলার ব্যবস্থাপক সভায় বাংলা ভাষার পক্ষ সমর্থন। পাকিস্তানের প্রথম বিরোধী গ্রæপ সংগঠন। সাপ্তাহিক ইত্তেফাক প্রকাশ।
১৯৪৯: ২৩ জুন আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠা। সভাপতির পদ গ্রহণ। অক্টোবরের পূর্ব বাংলার খাদ্যাভাব ও মূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে জনসভা এবং বিক্ষোভ মিছিলে নেতৃত্ব দান। কারাবরণ। পাকিস্তানের বিশেষতঃ পূর্ব বাংলার রাজনীতিতে বিরোধী দলীয় আন্দোলনের পত্তন।
১৯৫০-৫১: কারাবাস এবং আওয়ামী মুসলিম লীগ এর সাংগঠনিক প্রতিষ্ঠার জন্য ব্যপক কর্মসূচী বাস্তায়ন।
১৯৫২: সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় ভাষা সংগ্রাম পরিষদ- এর সভাপতি হিসাবে মহান ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দান। ২২ ফেব্রুয়ারি গায়েবানা জানাজায় ইমামতি। ২৩ ফেব্রুয়ারি কারাবরণ।
১৯৫৩: এপ্রিল মাসে কারামুক্তি। ডিসেম্বরে যুক্তফ্রন্ট গঠন।
১৯৫৪: ২১ দফা ইশতেহার নিয়ে নির্বাচনে বিপুল জয়লাভ। বিশ্বশান্তি সম্মেলনে যোগদানের জন্য ইউরোপ সফর । প্রত্যাবর্তনে সরকারি নিষেধাজ্ঞা ।
১৯৫৫: ২৫ এপ্রিল দেশে প্রত্যাবর্তন। ১৫ জুন পূর্ব বাংলার স্বায়ত্বশাসনের দাবিতে ঐতিহাসিক পল্টন ময়দানে জনসভা। আওয়ামী মুসলিম লীগ দলের আওয়ামী লীগ নামকরণ। নভেম্বরে কাগমারীতে কর্মী সম্মেলন অনুষ্ঠান।
১৯৫৬: প্রস্তাবিত শাসনতন্ত্র বিরোধী আন্দোলন। ভুখা মিছিলে নেতৃত্ব দান। মিসর আক্রমণ করায় মিত্র শক্তি বিরোধী আন্দোলন। ফুলছুরি ঘাটের সম্মেলনে কৃষক সমিতি প্রতিষ্ঠা।
১৯৫৭: ৬ হতে ১১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ঐতিহাসিক কাগমারী সম্মেলন। পশ্চিম পাকিস্তানের উদ্দেশে বিখ্যাত “আসসালামু আলাইকুম” ঘোষণা। মার্চে বিরোধ দেখা দেওয়ায় আওয়ামী লীগ হতে পদত্যাগ। ২৬ জুলাই ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির প্রতিষ্ঠা। বগুড়ায় কৃষক সম্মেলন। খাদ্য- সংস্কট, স্বায়ত্বশাসন ও পররাষ্ট্র নীতির প্রশ্নে অনশন।
১৯৫৮: সামরিক আইনে অক্টোবরে কারাবরণ। ১৯৬২ তে মুক্তিলাভ।
১৯৬৩: মহাচীন সফর। ডিসেম্বরে আইন অমান্য আন্দোলন ষোঘণা।
১৯৬৪: হাভানায় ও টোকিওতে বিশ্বশান্তি সম্মেলনে যোগদান। ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি পুনরুজ্জীবিত করণ।
১৯৬৫: আইয়ুব- বিরোধী নির্বাচনে মিস ফাতেমা জিন্নাহর পক্ষে অংশ গ্রহণ। পাক-ভারত যুদ্ধে দেশপ্রেমিকের অনন্য ভূমিকা পালন।
১৯৬৬: ন্যাপের পক্ষ হতে বিখ্যাত ১৪ দফা দাবী উত্থাপন।
১৯৬৭: রংপুর সম্মেলনে ন্যাপের বিভক্তি। তত্ত¡গত প্রশ্নে মহাচীনের সমর্থনে ন্যাপের অবস্থান।
১৯৬৮: ১০ দফা “দাবি সপ্তাহ” পালন। আইয়ুব শাহীর পতন ঘটানোর লক্ষ্যে ঘেরাও আন্দোলনের ডাক। গভর্নর হাউস ঘেরাও। হরতাল।
১৯৬৯: আইয়ুব আহূত গোলটেবিল বৈঠক বর্জন। সামরিক শাসন ও আইন উপেক্ষা করে শাহপুরে বিখ্যাত কৃষক সম্মেলন অনুষ্ঠান।
১৯৭০: সন্তোষে জানুয়ারিতে ঐতিহাসিক কৃষক সম্মেলন, পাকিস্তানের টোবাটেক সিং-এ মার্চে কৃষক সম্মেলন, পাঁচবিবির মহিপুরে এপ্রিলে কৃষক সম্মেলন অনুষ্ঠান। জুন মাসে দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলন। ৮ সেপ্টেম্বর সন্তোষ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়-এর পত্তন ঘোষণা। নভেম্বরে জলোচ্ছ্বাস-বিধ্বস্ত এলাকায় ব্যাপক সফর। ২৩ নভেম্বর পল্টনে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিষোদগার। ৪ ডিসেম্বর পল্টনের জনসভায় স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান ঘোষণা। সেদিন তাঁর বিখ্যাত উক্তি : লাকুম দ্বীনুকুম ওয়ালইয়া দ্বীন। সকল প্রকার নির্বাচন বর্জন।
১৭৭১: ৭ জানুয়ারিতে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য ৫ দফা কর্মসূচী ঘোষণা। ৯ জানুয়ারি সন্তোষ দরবার হলে স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে সর্বদলীয় সম্মেলন অনুষ্ঠান। ২৭ ফেব্রুয়ারি সন্তোষ দরবার হলে পূর্ব পাকিস্তান শিক্ষা ও কৃষ্টি সম্মেলন অনুষ্ঠান। এক দফা দাবী তথা স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জনমত সৃষ্টি করতে দেশ ব্যাপী ব্যাপক সফর। ৯ মার্চ পল্টনের জনসভায় স্বাধীনতার দাবীতে আপোষহীন থাকার আহ্বান। ১২ মার্চ ময়মনসিংহে কৃষক সম্মেলন। ৪ এপ্রিল এবং ৬ এপ্রিল পাক-বাহিনীর মোকাবিলা এবং প্রত্যুৎপন্নমতিত্বের কারণে প্রাণ রক্ষা। ১৬ এপ্রিল রৌমারীর সীমান্ত পথে ভারতে প্রবেশ। স্বাধীনতা আদায়ের সংগ্রামে ভারতে অবস্থান। গৃহবন্দীত্ব বরণ।
১৯৭২: ২২ জানুয়ারি স্বদেশ প্রত্যাবর্তন। ২৬ ফেব্রুয়ারি সন্তোষে রাজনৈতিক সমাবেশ। আলোড়ন সৃষ্টিকারী সাপ্তাহিক হক-কথা প্রকাশ। ৯ এপ্রিল ঢাকার পল্টন ময়দানে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম জনসভা। ভারতীয় পণ্য বর্জনের ডাক। দুঃশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সূত্রপাত। ডিসেম্বরে নিখিল বাংলা জোয়ান-কর্মী সম্মেলন অনুষ্ঠান।
১৯৭৩: খাদ্যমূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে ও অন্যান্য ইস্যুতে ভুখা মিছিল পরিচালনা ও অনশন। আইন অমান্য আন্দোলন। ১২ ডিসেম্বর সন্তোষে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা সম্মেলনে অনুষ্ঠান।
১৯৭৪: দেশব্যাপী ভুখা মিছিলের ডাক। দুর্ভিক্ষের প্রেক্ষাপটে আন্দোলন। সন্তোষ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত এবং শিক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু। ৭ এপ্রিল সন্তোষে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা সম্মেলন। ৮ এপ্রিল হুকুমতে রাব্বানিয়া সমিতির প্রতিষ্ঠা ও সম্মেলন অনুষ্ঠান। ১৪ এপ্রিল পল্টনে জনসভা। ২৯ জুন ঢাকায় ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিলে নেতৃত্ব দান। ৩০ জুন হতে সন্তোষে স্বগৃহে অন্তরীণ।
১৯৭৫: সন্তোষ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্মাণ কাজে আতœনিয়োগ। ৭ নভেম্বরের সিপাহী-জনতার বিপ্লবকে সমর্থন দান। ৭ ডিসেম্বর সন্তোষে চাষী সম্মেলন অনুষ্ঠান।
১৯৭৬: জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে সীমান্ত এলাকায় ব্যাপক সফর। ভারতীয় হামলার প্রতিবাদ। ২৭ ফেব্রুয়ারি খুলনায় গুরুতর অসুস্থ। ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত ফারাক্কা মিছিলের ডাক। ১৬ ও ১৭ মে রাজশাহী হতে কানসাট পর্যন্ত ফারাক্কা মিছিলে নেতৃত্বদান। আগস্ট-সেপ্টেম্বর লন্ডনে চিকিৎসার্থে অবস্থান। অক্টোবরে খোদায়ী খিদমতগার প্রতিষ্ঠা। ১৩ নভেম্বরে সন্তোষ দরবার হলে খোদায়ী খিদমতগার সম্মেলনে জীবনের সর্বশেষ ভাষণ দান। ১৭ নভেম্বর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ৯ নম্বর কেবিনে রাত সাড়ে সাতটায় ইন্তেকাল। ইন্না লিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজেউন।
১৮ নভেম্বর বাদ আসর পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সন্তোষে সমাহিত।

Tuesday, November 15, 2016

আব্রাহাম লিঙ্কন যেভাবে নিহত হলেন

আব্রাহাম লিঙ্কন। আমেরিকার ১৬তম প্রেসিডেন্ট। প্রেসিডেন্ট পদে আসীন হন ১৮৬১ সালের মার্চে। নিহত হওয়ার আগ পর্যন্ত এ পদে আসীন ছিলেন। গুলির আঘাতে নিহত হন ১৮৬৫ সালের ১৫ এপ্রিল সকাল ৭টা ২২ মিনিটে। এর আগে ১৪ এপ্রিল রাত সোয়া ১০টায় তাকে গুলি করা হয়। এ সময় তার বয়স ছিল ৫৬ বছর।

আমেরিকার বড় ধরনের সাংবিধানিক, সামরিক, রাজনৈতিক ও নৈতিক সঙ্কটের সময়ে তিনি তার দেশকে সফলভাবে নেতৃত্ব দেন। এসব সঙ্কটের সূত্রে সৃষ্ট আমেরিকার গৃহযুদ্ধ মোকাবেলা করে সাফল্যের সাথে রক্ষা করেন আমেরিকা ইউনিয়ন। অবসান ঘটান দাসপ্রথার। দেশে আনেন আর্থিক কর্মকাণ্ডে ও অর্থায়নে আধুনিকতা। দেশের পশ্চিমাঞ্চলের এক গরিব পরিবারের সন্তান লিঙ্কন প্রধানত ছিলেন সুশিক্ষিত। তিনি ছিলেন একজন কান্ট্রি লয়ার, ইলিনয়ে রাজ্যের লেজিসলেটর। এক মেয়াদে ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য। যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট নির্বাচনে পরাজিত হন দুইবার। ১৮৬০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হন। ১৮৬৪ সালে এ পদে পুনঃনির্বাচিত হন।

নির্বাচনী প্রচারাভিযানে যুক্তরাষ্ট্রে দাসপ্রথা সম্প্রসারণের বিরোধিতা করে তিনি ১৮৬০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান দলীয় মনোনয়ন পান। এবং নির্বাচনে জয় পান। ১৮৬১ সালের মার্চে প্রেসিডেন্ট পদে আসীন হওয়ার আগেই যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলের সাতটি রাজ্য ইউনিয়ন থেকে বিচ্ছিন্নতা ঘোষণা করে একটি কনফেডারেসি গঠন করে। ১৮৬৯ সালের ১২ এপ্রিল কনফেডারেট ফোর্ট সামটার হামলা করলে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। লিঙ্কন এই বিচ্ছিন্নতার অবসান ঘটিয়ে আমেরিকা ইউনিয়ন সমুন্নত রাখার পক্ষে অবস্থান নেন। তিনি মনোযোগ দেন গৃহযুদ্ধের সামরিক ও রাজনৈতিক মাত্রার ওপর। তিনি ব্যাপকভাবে যুদ্ধক্ষমতা প্রয়োগ করেন। সন্দেহভাজন বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিনা বিচারে আটক ও কারাগারে বন্দী রাখার উপায় অবলম্বন করেন। তিনি ১৮৬১ সালে দক্ষতার সাথে কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে ঠেকিয়ে দেন কনফেডারেসির প্রতি ব্রিটিশ স্বীকৃত।

গৃহযুদ্ধ চলার সময় ১৮৬৩ সালের ৩ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ‘এমানসিপেশন প্রক্লেমেশন’ নামে একটি নির্বাহী আদেশ জারি করেন। এতে প্রথমে ১০টি রাজ্যে ও পরে বিদ্রোহী রাজ্যগুলোতে দাসদের মুক্ত ঘোষণা করা হয়। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ৪০ লাখ দাসের মধ্যে তখন ৩১ লাখ দাস মুক্তিলাভ করে। এ জন্য দাস মালিকেরা কোনো ক্ষতিপূরণ পায়নি। তারই উদ্যোগে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বত্র দাসপ্রথা অবৈধ ঘোষণা করা হয় সে দেশের সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এবং তা কার্যকর হয় ১৮৬৫ সালের ডিসেম্বরে।
লিঙ্কন সামগ্রিক গৃহযুদ্ধ পরিচালনা করেন। জেনারেলদের নিয়োগ থেকে শুরু করে কমান্ডিং জেনারেল উলিসিস এস গ্রান্টকে বাছাই করেন তিনি নিজে। দলের বিভিন্ন বিবদমান অংশ থেকে নেতা নির্বাচন করে মন্ত্রিসভায় ঠাঁই দেন। তাদের ওপর চাপ দেন সহযোগিতা করতে। তার নেতৃত্বে ইউনিয়ন নৌ-অবরোধ গড়ে তুলে দক্ষিণাঞ্চলের সাথে স্বাভাবিক ব্যবসায়-বাণিজ্য বন্ধ করে দেয়া হয়।

যুদ্ধের শুরুতেই নিয়ন্ত্রণ নেয়া হয় বর্ডার স্লেভ স্টেটগুলোর ওপর।গানবোট দিয়ে দক্ষিণাঞ্চলের নদীব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়। কয়েকবার চেষ্টা চালান কনফেডারেসির রাজধানী রিচমন্ড দখল করতে। যে জেনারেলই তা দখলে ব্যর্থ হয়েছেন, তাকেই সরিয়ে দিয়ে তার জায়গায় নিয়োগ দেয়া হয়েছে নতুন জেনারেল। শেষ পর্যন্ত উলিসিস গ্রান্ট তাতে সফল হন। তিনি ১৮৬৫ সালে রিচমন্ড দখল করেন।

রাজ্যগুলোর অধিকার বনাম ফেডারেল কর্তৃত্ব ও দাসপ্রথা নিয়ে দক্ষিণাঞ্চলের রাজ্যগুলোর মধ্যে টানাপড়েনের জের ধরে ১৮৬১ সালে আমেরিকান গৃহযুদ্ধের সূচনা। ১৮৬০ সালে দাসপ্রথাবিরোধী রিপাবলিকান প্রার্থী আব্রাহাম লিঙ্কনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর দক্ষিণাঞ্চলের সাতটি রাজ্য ইউনিয়ন থেকে বিচ্ছিন্নতা ঘোষণা করে একটি কনফেডারেট রাষ্ট্র গঠনের ঘোষণা দেয়। এরপর তাদের সাথে যোগ দেয় আরো চারটি রাজ্য। ১৮৬১ থেকে ১৮৬৫ সাল পর্যন্ত চলে আমেরিকার গৃহযুদ্ধ। এটা ছিল রাজ্যের বিরুদ্ধে রাজ্যের যুদ্ধ। বলা হয়, এটি যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে প্রতিবেশীর যুদ্ধ, ভাইয়ের বিরুদ্ধে ভাইয়ের যুদ্ধ। ১৮৬৫ সালে কনফেডারেটদের আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে এ গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটে। এটা ছিল আমেরিকার মাটিতে সবচেয়ে বড় ক্ষয়ক্ষতির যুদ্ধ। এ যুদ্ধে আমেরিকার ২৪ লাখ সৈন্যের মধ্যে মারা যায় ৬ লাখ ২০ হাজার। আহত হয় আরো কয়েক লাখ।


লিঙ্কন হত্যা
প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কনকে হত্যা করা হয় গুড ফ্রাইডেতে। সে দিন ছিল ১৪ এপ্রিল, ১৮৬৫। আমেরিকার গৃহযুদ্ধের অবসানের শেষ পর্বে এসে আমেরিকাবাসী হারালো তাদের ষোলতম প্রেসিডেন্টকে। তার মৃত্যুর মাত্র পাঁচ দিন আগে ৯ এপ্রিল কনফেডারেটদের আর্মি অব নর্দার্ন ভার্জিনিয়ার কমান্ডিং জেনারেল রবার্ট ই. লি. আত্মসমর্পণ করেন ইউনিয়ন আর্মির জেনারেল উলিসিস এস গ্রান্ট এবং আর্মি অব পটোম্যাকের কাছে। আমেরিকান গৃহযুদ্ধের ইস্টার্ন থিয়েটারের প্রধান ইউনিয়ন আর্মি ছিল এই পটোম্যাক আর্মি। লিঙ্কন হচ্ছেন প্রথম প্রেসিডেন্ট, যাকে হত্যাকারী সাফল্যের সাথে হত্যা করতে সমর্থ হয়। এর ৩০ বছর আগে ১৮৩৫ সালে আমেরিকার সপ্তম প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু জ্যাকসনকে হত্যার ব্যর্থ চেষ্টা করা হয়েছিল।

আব্রাহাম লিঙ্কনকে হত্যার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করেন জন উইলকেস বুথ। তিনি ছিলেন একজন সুপরিচিত অভিনেতা। কনফেডারেট পুনরুদ্ধারের বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই লিঙ্কন হত্যার পরিকল্পনা তৈরি হয়। বুথের সহযোগী ষড়যন্ত্রকারী ছিলেন লুই পাদুয়েল এবং ডেভিড হ্যারল্ড। তাদের ওপর দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম এইচ সেওয়ার্ডকে হত্যা করার। আরেক সহযোগী ষড়যন্ত্রকারী জর্জ অ্যাটজেরোদতের ওপর দায়িত্ব ছিল ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু জনসনকে হত্যার। উইলকেস বুশ ও তাহার সহযোগীরা মনে করেছিলেন, একসাথে এই তিন শীর্ষ ব্যক্তিকে হত্যা করতে পারলে ফেডারেল সরকার বিশৃঙ্খল হয়ে পড়বে। কারণ তখন কে হবেন প্রেসিডেন্টের উত্তরসূরি সে ব্যাপারে সৃষ্টি হবে নানা দ্বিধাদ্বন্দ্বের। উইলকেস বুথ ফোর্ড’স থিয়েটারে কাছ থেকে গুলি করে হত্যা করেন আব্রাহাম লিঙ্কনকে। তারা সে দিন এ থিয়েটারে ‘আওয়ার আমেরিকান কাজিন’ নামের নাটক উপভোগ করতে গিয়েছিলেন। বাকি সহযোগী ষড়যন্ত্রকারীদের হত্যা পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়ে যায়। লুই পাওয়েল সে দিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সেওয়ার্ডকে আহত করতে পেরেছিলেন মাত্র। আর অ্যাটজেরোদত ভাইস প্রেসিডেন্ট জনসনকে হত্যা করতে পারেননি। কারণ স্নায়বিকভাবে দুর্বল হয়ে তিনি ওয়াশিংটন ছেড়ে পালিয়ে যান।

 মূল পরিকল্পনা : অপহরণ
১৯৬৪ সালের মার্চে ইউনিয়ন আর্মির কমান্ডিং জেনারেল উলিসিস এস গ্রান্ট সিদ্ধান্ত নেন যুদ্ধবন্দী বিনিময় বাতিলের। এ সিদ্ধান্ত উভয় পক্ষের যুদ্ধবন্দীর জন্য ছিল এক ক্ষোভের কারণ। গ্রান্ট মনে করতেন বন্দী বিনিময় গৃহযুদ্ধকেই প্রলম্বিত করছেন। জন উইলকেস বুথ ছিলেন একজন সাউদার্নার ও কনফেডারেটদের খোলাখুলি সমর্থক। বুথ পরিকল্পনা করেন আব্রাহাম লিঙ্কনকে অপহরণ করে কনফেডারেটদের হাতে তুলে দেবেন। আর এভাবে তাকে বন্দী করে রাখা হবে, যতক্ষণ না উত্তরের ইউনিয়ন সরকার বন্দী বিনিময় আবার শুরু করা হয়। সোজা কথা লিঙ্কনকে জিম্মি হিসেবে আটক রেখে কনফেডারেট বন্দীদের মুক্ত করা হবে। বুথ তার উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য তার দলে ভেরান স্যামুয়েল আরনল্ড, জর্জ অ্যাটজেরোদত, ডেভিড হেরল্ড, মাইকেল ও লাফলেন, লুই পাওয়েল (লুই পেইন নামেও পরিচিত) ও জন সুরাটকে। তারা চলে যান ওয়াশিংটন ডিসির এক বাড়িতে। বুথ ঘন ঘন এ বাড়িতে যেতেন।
১৮৬০ সালের শেষ দিকে বাল্টিমোরে গড়ে তোলেন প্রো-কনফেডারেট গোপন সমিতি ‘নাইটস অব দ্য গোল্ডেন সার্কেল’ তথা কেজিসি। তিনি লিঙ্কনের দ্বিতীয়বারের প্রেসিডেন্ট মেয়াদের উদ্বোধন অনুষ্ঠানেও যোগ দেন ১৮৬৫ সালের ৪ মার্চ। সেখানে তিনি ছিলেন একজন আমন্ত্রিত অতিথি। আমন্ত্রণটি এসেছিল তার গোপন বাগদত্তা লুসি হেইলের কাছ থেকে। লুসি হেইল ছিলেন নিউ হ্যাম্পশায়ারের আইনবিদ ও আমেরিকান রাজনীতিবিদ জন পার্কার হেইলের কন্যা। বুথ পরবর্তী সময়ে তার ডায়েরিতে লিখেছেন কী চমৎকার সুযোগই না ছিল, যদি আমি সে দিনের উদ্বোধনী দিনটায় প্রেসিডেন্টকে হত্যা করতে চাইতাম : 'what an excellent chance I had, if I wished, to kill the president on inauguration day.

১৮৬৫ সালের ১৭ মার্চ বুথ তার সহযোগী ষড়যন্ত্রকারীদের জানান, লিঙ্কন ক্যাম্পবেল সামরিক হাসপাতালে ‘স্টিল ওয়াটার রানস ডিপ’ নামে একটি নাটক দেখতে যাবেন। বুথ তার লোকজনকে শহরের এক প্রান্তের একটি রেস্তোরাঁয় জড়ো করেন। পরিকল্পনা ছিল পথে একটি বিস্তৃত সড়কে তারা প্রেসিডেন্টকে আটক করে পাকড়াও করবেন। প্রেসিডেন্ট ক্যাম্পবেল হাসপাতাল থেকে ফিরবেন, তখন এ হামলা চলবে এমনটিই পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু দেখা গেল লিঙ্কন সেখানে যাননি। এর বদলে তিনি গেছেন ন্যাশনাল হোটেলে। সেখানে তিনি যোগ দেন ১৪২তম ইন্ডিয়ানা ইনফেন্ট্রির এক অনুষ্ঠানে। এ অনুষ্ঠানে গভর্নর ওলিভার মর্টনকে উপহার দেয়া হয় গৃহযুদ্ধে আটক করা একটি কনফেডারেট ব্যাটল ফ্ল্যাগ। বুথ তখন বসবাস করছিলেন এই ন্যাশনাল হোটেলেই। যদি তখন বুথ ক্যাম্পবেলে হাসপাতালে না যেতেন তবে হয়তো ন্যাশনাল হোটেল প্রেসিডেন্ট লিঙ্কনকে হত্যার একটা সুযোগ হাতে পেয়েও যেতেন।

এ দিকে পতনের মুখোমুখি কনফেডারেসি। ৩ এপ্রিল ভার্জিনিয়ার রিচমন্ডের অর্থাৎ কনফেডারেট রাজধানীর পতন ঘটে ইউনিয়ন আর্মির হাতে। কনফেডারেসির মূল সামরিক বাহিনী ছিল নর্দান ভার্জিনিয়া আর্মি। এ বাহিনী ৯ এপ্রিল আত্মসমর্পণ করে অ্যাপামেটক্স কোর্ট হাউজে পটোম্যাক আর্মির কাছে। কনফেডারেট প্রেসিডেন্ট জেফারসন ডেভিস এবং তার সরকারের বাকি সবাই তখন দ্রুত পালাচ্ছিল। সাউদার্নারদের অনেকেই কনফেডারেটের ব্যাপারে নিরাশ হলেও বুথ সে আশা ছাড়েননি। তিনি যেন লড়েই যাচ্ছিলেন কনফেডারেসি পুনরুদ্ধারে।


লির বাহিনী গ্রান্টের বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণের দুই দিন পর ১৮৬৫ সালের ১১ এপ্রিল বুথ হোয়াইট হাউজে লিঙ্কনের এক বক্তৃতায় যোগ দেন। সে ভাষণে লিঙ্কন সাবেক দাসদের ভোটাধিকার ও রাজনৈতিক অধিকার দেয়ার কথা বলেন। বুথ তাতে ক্ষুব্ধ হন এবং প্রেসিডেন্টকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেন। বলা হয় তখন বুথ বলেছিলেন : 'That means nigger citizenship. Now, by God, I'll put him through. That is the last speech he will ever give.'


লিঙ্কনের দুঃস্বপ্ন
ওয়ার্ড হিল ল্যামন। লিঙ্কনের বন্ধু ও জীবনীকার। লিঙ্কন নিহত হওয়ার তিন দিন আগে ল্যামনের ও অন্যদের সাথে তার কিছু স্বপ্নের কথা বলেছিলেন। ল্যামনের মতে, লিঙ্কন তার সেসব স্বপ্নের কথা তাদের কাছে প্রকাশ করতে গিয়ে বলেছিলেন : ‘দশ বছর আগে বেশ দেরিতেই আমি বিশ্রামে যাই। তখন ফ্রন্ট থেকে গুরুত্বপূর্ণ খবরের অপেক্ষায় ছিলাম। নিশ্চিন্তে আরামে ঘুমুতে পারছিলাম না। কারণ দেহ-মনে ক্লান্ত ছিলাম। শিগগিরই স্বপ্ন দেখতে শুরু করলাম। আমি যেন মরার মতো স্থবির হয়ে গেলাম। তখন শুনলাম, চাপা ফুঁপিয়ে কান্নার স্বপ্ন। যেন বেশ কয়েকজন একসাথে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। ভাবলাম বিছানা ছেড়ে সিঁড়ি ভেঙে নিচে যাই। সেখানেও নীরবতা ভেঙে করুণ ফোঁপানো কান্নার শব্দ। কিন্তু যারা শোকে কাঁদছেন তাদের কাউকে দেখা গেল না। আমি এ কক্ষ থেকে ওই কক্ষে গেলাম, কোনো প্রাণীকে দেখা গেল না। যখন চলাফেরা করছিলাম একই ধরনের শোকের কান্নার শব্দ আমাকে বিচলিত করে তোলে। সব কক্ষেই আলো দেখলাম। সব বস্তুই আমার পরিচিত। কিন্তু হৃদয়ভাঙা কাতরতা নিয়ে যারা কান্না করছিল, ওরা সব কোথায়? আমি ধাঁধায় পড়ে গেলাম এবং সতর্ক হলাম। এসবের অর্থ কী হতে পারে? এ রহস্যময় অবস্থার কারণ জানতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে আমি চলতে চলতে পূর্ব দিকের কক্ষে এসে থামলাম। পূর্ব দিকের কক্ষটি হোয়াইট হাউজের সবচেয়ে বড় কক্ষ। সেখানে দেখলাম ভয়াবহ অবাক করা কিছু। আমার সামনে ছিল একটি শবাধার রাখার জন্য মঞ্চ বা ক্যাটাফ্লেক। সেখানে রাখা অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার পোশাকে জড়ানো একটি লাশ। এর চার পাশে ছিল সৈনিকেরা। এরা গার্ড হিসেবে কাজ করছিলেন। ছিল একদল জনতা। লাশের ওপর পড়ে এরা শোক প্রকাশ করছে। লাশটির মুখ ঢাকা ছিল। অন্যরা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল। হোয়াইট হাউজের কে মারা গেল? একজন সৈনিকের কাছে জানতে চাইলাম। ‘প্রেসিডেন্ট’ এই ছিল তার জবাব। তিনি আততায়ীর হাতে নিহত হয়েছেন। এর জন্যই জনতার উচ্চস্বরে কান্না। আমি জেগে উঠলাম। এখানেই স্বপ্নের শেষ। সে রাতে আর ঘুমাতে পারিনি। যদিও এটি ছিল একটি স্বপ্ন মাত্র, তবুও এর পর থেকে আমি ভীত হয়ে পড়লাম।’

 হত্যার দিন
১৪ এপ্রিল উইলকেস বুথের সকালটা শুরু হয় মধ্যরাতে জেগে ওঠার মধ্য দিয়েই। ন্যাশনাল হোটেলের বিছানায় শুয়েই মায়ের কাছে লিখেন সব কিছু ঠিকই আছে। তার ডায়েরিতে লিখেন, ‘আমাদের লড়াইয়ে আমরা প্রায় হেরে গেছি। চূড়ান্ত ও বড় ধরনের একটা কিছু করতেই হবে।’
বেশ কিছু দিন পর আব্রাহাম লিঙ্কনকে সকালবেলা বেশ খোশমেজাজেই দেখা গেল সে দিন। নতুন ট্রেজারি সেক্রেটারি হাফ ম্যাককুলুচ বলেছেন, সেদিন সকালে লিঙ্কনকে দেখে মনে হয়েছে, এর আগে তিনি এতটা হাসিখুশি ছিলেন না। যে কেউ এই পার্থক্যটা ধরতে পারতেন। বেশ কয়েক মাস প্রেসিডেন্টকে ফ্যাকাসে দেখাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল চোখগুলো যেন বসে গেছে। লিঙ্কন নিজে অনেকের কাছে বলেছেন, তার শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। এ নিয়ে ফার্স্টলেডি ম্যারি টড লিঙ্কন কিছুটা চিন্তিত ছিলেন। সেদিন লিঙ্কন তার মন্ত্রিসভার সদস্যদের সাথে মিলিত হন। এরপর সংক্ষিপ্ত বৈঠক করেন ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু জনসনের সাথে।

দুপুরের দিকে ফোর্ড থিয়েটারে গিয়ে তার চিঠিগুলো খুলে পড়ে দেখেন। এই থিয়েটারে বুথের একটি স্থায়ী ডাকবাক্স ছিল। সেখানে এ থিয়েটারের মালিক জন ফোর্ডের ভাইয়ের কাছে বুথ জানতে পাবেন প্রেসিডেন্ট ও জেনারেল গ্রান্ট আজ রাতে ফোর্ড থিয়েটারে ‘আওয়ার অ্যামেরিকান কাজিন’ নাটক উপভোগ করবেন। বুথ স্থির সিদ্ধান্ত নিলেন এটাই মোক্ষম সুযোগ, এ সুযোগ হারানো যাবে না। এ রাতেই চূড়ান্ত একটা কিছু করে ফেলতে হবে। তিনি থিয়েটারের লেআউট সম্পর্কে ভালো করেই জানেন। এ থিয়েটারে বেশ কয়েকবার অভিনয়ে অংশ নিয়েছেন। এই আগের মাসেও এ থিয়েটারে অভিনয় করেছেন, ওই দিন বিকেলে ওয়াশিংটন ডিসির ম্যারি সুররাতেস বোর্ডিং হাউজে যান। বোর্ডিং হাউজের মালিক ম্যারি এলিজাবেথ জেনকিন সুররাতকে বলেন, তার ম্যারিল্যান্ডের সুররাতসভিলি পানশালার একটি প্যাকেজ দিতে। তিনি সুররাতের টেনেন্টকে এ-ও জানাতে অনুরোধ করেন যে, সেখানে রাখা বন্দুক ও গুলি তৈরি রাখতে, যাতে সন্ধ্যায় বুথ তা নিয়ে আসতে পারেন।

তিনি বুথের অনুরোধ রক্ষা করেন এবং তার বর্ডার ও পুত্রের বন্ধু লুই জে ওয়েকম্যানের সাথে সেখানে যান। উল্লেখ্য, ম্যারি সুররাতকে লিঙ্কন হত্যার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার দায়ে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। তাকে ফাঁসি দিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তিনি ছিলেন যুক্তরাষ্ট্র ফেডারেল সরকারের প্রথম মহিলা, যাকে ফাঁসি দেয়া হয়। তার ছেলে জন এইচ সুররাত জুনিওরও এ ষড়যন্ত্রের জন্য অভিযুক্ত ছিলেন, তবে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়। তার বন্ধু লুই জে ওয়েকম্যান ছিলেন লিঙ্কন হত্যা মামলায় সরকারপক্ষের প্রধান সাক্ষী। প্রথম দিকে এই হত্যাকাণ্ডের জন্য তাকে দায়ী বলে সন্দেহ করা হয়েছিল। কারণ, সুররাত পরিবারের সাথে তার ঘনিষ্ঠতা ছিল।
সে দিন সন্ধ্যা ৭টায় জন উইলকেস শেষবারের মতো তার অন্যান্য সহযোগী ষড়যন্ত্রকারীদের সাথে দেখা করেন। বুথ লুই পাওয়েলকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম এইড সেওয়ার্ডকে হত্যা করার দায়িত্ব দেন। বলা হয় তাকে তার বাড়িতে হত্যা করা হবে। আর জর্জ অ্যাটজেরোদতকে বলেন, ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু জনসেনকে তার কির্কউড হোটেলের আবাসস্থলে হত্যা করতে। আর ডেভিড ই হ্যারল্ডকে বলা হয়, পাওয়েলকে গাইড করে সেওয়ার্ডের বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য। বুথের পরিকল্পনা ছিল সিঙ্গলশুট ডেরিঞ্জার পিস্তল দিয়ে গুলি করে লিঙ্কনকে হত্যা করবেন। এরপর ছুরি মেরে হত্যা করবেন গ্রান্টকে। তাদের হত্যা করা হবে ফোর্ড থিয়েটারে। এরা সবাই রাত ১০টা বাজার ঠিক পরপর এই হত্যাকাণ্ড ঘটাবে একযোগে এমনটি ছিল তাদের পরিকল্পনা। আবজেরোদতের আসলে এখানে কিছু করার ছিল না। কারণ সে সম্মত ছিল ভাইস প্রেসিডেন্টকে অপহরণের জন্য।

খবর ছিল জেনারেল ও মিসেস গ্রান্ট লিঙ্কন ও মিসেস লিঙ্কনের সাথে ফোর্ড থিয়েটারে নাটক দেখতে যাবেন। কিন্তু মিসেস গ্রান্ট ও মিসেস লিঙ্কনের মধ্যে তখন খুব একটা সুসম্পর্ক ছিল না। তাই জেনারেল গ্রান্ট নাটক দেখার আমন্ত্রণ গ্রহণ করেননি। আরো অনেককেই সে অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত মেজর হেনরি বাথবোন এবং তার বাগদত্তা ক্লারা হ্যারিস (নিউ ইয়র্ক সিনেটর ইবা হ্যারিসের কন্যা) এই আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছিলেন।

লিঙ্কন পার্টি একটু দেরি করে ফোর্ড থিয়েটারে গিয়ে পৌঁছেন। বসেন প্রেসিডেন্ট বক্সে। এটি আসলে ছিল একটি-দু’টি কোনাওয়ালা বক্সসিট। সিট দু’টির মাঝখানে বিভাজন দেয়াল সরিয়ে নেয়া হয়েছিল। মিসেস লিঙ্কন প্রেসিডেন্টের সাথে ফিসফিস করে কথা বলছিলেন। মিস্টার লিঙ্কন তার হাত ধরে ছিলেন। মিসেস লিঙ্কন বললেন : ‘আমাদের এভাবে দেখতে পেয়ে মিস হ্যারিস কী ভাববে’। প্রেসিডেন্ট জবাব দিলেন : ‘এ নিয়ে তিনি কিছুই ভাববেন না’। এটাই ছিল আব্রাহাম লিঙ্কনের জীবনের শেষ উচ্চারিত বাক্য। তখন ঘড়িতে সময় রাত সোয়া ১০টা।

সে দিন সম্ভবত প্রেসিডেন্ট বক্স গার্ড দিচ্ছিলেন জন ফ্রেডারিক পার্কার নামের পুলিশ। সব সময় তার রহস্যজনক আগ্রহ ছিল বডিগার্ড হওয়ার জন্য। মধ্যবিরতির সময় ফ্রেডারিক কাছের একটি পানশালায় গেলেন লিঙ্কনের ফুটম্যান ও কোচম্যানকে সাথে করে। এটা স্পষ্ট নয়, তিনি আর থিয়েটারে ফিরে এসেছিলেন কি না। তবে বুথ যখন বক্সে ঢুকেন, তখন জন ফ্রেডারিক নিশ্চিত তার পোস্টে ছিলেন না। তা ছাড়া একজন সেলিব্রিটি অভিনেতা হিসেবে বুথের প্রবেশ নিয়ে কোনো দর্শক-শ্রোতাও কোনো প্রশ্ন তোলেননি। মনে করা হচ্ছিল তিনি প্রেসিডেন্টের সাথে দেখা করতে আসছেন। প্রেসিডেন্ট বক্সে প্রবেশের প্রথম দরজা দিয়ে ঢুকে একটি কাঠের কাঠি দিয়ে তার পেছনের ইনওয়ার্ড সুইংগিং ডোরটি ব্যারিকেড দেন। এরপর দরজা ও দেয়ালের মাঝখানটা উঁকিঝুঁকি দিয়ে দেখলেন। এরপর ঘুরে দাঁড়িয়ে একটি ছোট্ট সঙ্কীর্ণ ছিদ্র দিয়ে তাকালেন। দ্বিতীয় দরজায় এই ছিদ্রটি করা হয়েছিল আগের দিন। এ দরজাটি পার হলেই ঢোকা যায় প্রেসিডেন্ট বক্সে। তখন নাটকের ২ নম্বর অঙ্কের তৃতীয় দৃশ্য চলছিল।

বুথ নাটকটিকে ভালো করেই জানতেন। তাই তিনি অপেক্ষায় ছিলেন মোক্ষম সময়টার জন্য। যখন অভিনেতা হ্যারি হক (‘কাজিন’-এর মুখ্য অভিনেতা) একা মঞ্চে থাকবেন, নাটকটির সবচেয়ে মজার দৃশ্যে অভিনয়ের জন্য, তিনি অপেক্ষা করছিলেন সে সময়টার জন্যই। মোক্ষম সে সময় এলো। বুথ দরজা খুলে একদম প্রেসিডেন্টের পেছনে চলে গিয়ে কাছ থেকে গুলি করেন। বাম কানের নিচটায়। লিঙ্কন মারাত্মক আহত হয়ে তার চেয়ারে পড়ে গেলেন। ম্যারি টড ক্লিনটন এসে প্রেসিডেন্টকে ধরলেন। এরপর আর্তনাদ করে উঠলেন।

গুলির শব্দ শুনে রাথবোন তার আসন থেকে লাফিয়ে উঠে বুথের পালিয়ে যাওয়া ঠেকাতে চাইলেন। বুথ তখন তার ছুরি বের করে মেজর বাথবোনের হাতে আঘাত করেন। বাথবোন আবার উঠে চেষ্টা করেন বুথকে ধরে ফেলতে। তখন বুথ তৈরি হচ্ছিল বক্সসিটের চৌকাঠ থেকে লাফিয়ে পড়ার জন্য। বুথ আবার ছুরি দিয়ে বাথবোনকে আঘাত করেন। এরপর বুথ ১২ ফুট নিচে মঞ্চে বক্স থেকে লাফিয়ে পড়েন। এ সময় শরীরের নানা অংশে আঘাত পান। তিনি কোনোমতে উঠে দাঁড়ান এবং মঞ্চ অতিক্রম করেন এভাবে, যেন দর্শকেরা মনে করেন তিনিও অভিনেতাদেরই একজন। বুথ তখন তার রক্তমাখা ছুরিটি উপরে তুলে উচ্চারণ করেন ভার্জিনিয়া রাজ্যের মটো : ‘সিক সেম্পার টাইরেনিস’, যার অর্থ ‘ডাউন উইথ টাইরেন্টস’। অন্য বর্ণনায় আছে তখন তিনি বলেছিলেন : ‘দ্য সাউথ ইজ অ্যাভেঞ্জড’।

ম্যারি লিঙ্কন ও ক্লারা হ্যারিসের আর্তনাদ ও বাথবোনের ‘লোকটাকে ধরো’ বলে চিৎকার শুনে দর্শকেরা শেষ পর্যন্ত বুঝল এটি তো নাটকের কোনো অংশ নয়। মানুষ জেনে গেল লিঙ্কন হত্যার এই ঘটনার কথা। বুথ এই নকল অভিনয় করে মঞ্চের বাইরে গিয়ে অপেক্ষারত ঘোড়ায় চড়ে চলে গেল। কেউ কেউ তার পিছু নিলেও বুথ পালাতে সক্ষম হন। তিনি নেভি ইয়ার্ড ব্রিজ দিয়ে চলে গেলেন হেরল্ড ও পাওয়েলের সাথে দেখা করতে।

 প্রেসিডেন্ট লিঙ্কনের মৃত্যু
চার্লস লিয়ানি। তিনি একজন আর্মি সার্জন। সে রাতে তার কোনো ডিউটি ছিল না। তিনি লিবার্টিতে ছিলেন। ওই রাতে তিনিও ফোর্ড থিয়েটারে এসেছিলেন নাটক দেখতে। ঘটনার পর তিনি ভিড় ঠেলে প্রেসিডেন্ট বক্সের দরজার কাছে চলে যান। কিন্তু দেখলেন দরজাটি খুলছে না। শেষে দেখলেন দরজায় একটি খাঁজ কেটে একটি কাঠি দিয়ে দরজাটি পেছন থেকে জ্যাম করে দেয়া হয়েছে। বাথবোন চিৎকার করে লিয়ালি বলছেন দরজাটি খোলার ব্যবস্থা করতে। তখন লিয়ালি দরজা থেকে ফিরে যাচ্ছিলেন। যা-ই হোক লিয়ালির সহায়তায় বাথবোন দরজাটি খুলেন। লিয়ালি প্রেসিডেন্ট বক্সে ঢোকেন। লিয়ালি দেখলেন বাথবোনের বাম হাত থেকে প্রচুর রক্ত ঝরছে। তা সত্ত্বেও তিনি বাথবোনকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যান লিঙ্কনের দিকে। তিনি পড়ে আছেন তার সিটে। তাকে ধরে রেখেছেন ম্যারি টড লিঙ্কন। ম্যারি তখন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না করছিলেন। লিঙ্কনের শিরা তখন চলছিল না। লিয়ালি মনে করলেন, তিনি আর নেই। লিয়ালি প্রেসিডেন্টকে মেঝেতে নামিয়ে আনেন। দর্শকদের মধ্যে দ্বিতীয় আরেকজন ডাক্তার ছিলেন। তার নাম চার্লস ম্যাবিন ট্যাফট। রেলিং বেয়ে মঞ্চ থেকে তিনি ওপরে উঠে এলেন। ট্যাফট ও লিয়ালি লিঙ্কনের রক্তমাখা শার্টের কলার কেটে শার্ট খুলে ফেলেন। লিয়ালি হাত লাগিয়ে দেখলেন গুলি লেগেছে তার বাম কানের দিকে মাথায়। লিয়ালি বুলেট বের করে আনতে চেষ্টা করেন। কিন্তু আঘাতের স্থানে জমাটবাঁধা রক্তের কারণে বুলেটের অবস্থান বোঝা যাচ্ছিল না। এরই মধ্যে লিঙ্কনের শ্বাস-প্রশ্বাস পরিস্থিতির উন্নতি দেখা গেল। লিয়ালি জানতেন, জমাটবাঁধা রক্ত একটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সরাতে পারলে শ্বাস-প্রশ্বাস পরিস্থিতির উন্নতি ঘটানো যাবে। এরপর লিয়ালি দেখলেন, গুলি মগজের ভেতর ঢুকে পড়েছে। তিনি ঘোষণা দেন, তাকে বাঁচানো সম্ভব নয়। তিনি অবশ্যই মারা যাবেন।

দর্শকদের মধ্যে অ্যালবার্ট কিং নামে তৃতীয় এক ডাক্তার ছিলেন। তারা তিনজন দ্রুত নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করেন, প্রেসিডেন্টকে দ্রুত এখান থেকে সরিয়ে নিতে হবে। এবড়ো-খেবড়ো সড়কপথে হোয়াইট হাউজে নেয়ার প্রশ্নই ওঠে না। পিটার টলেটাভোলসের ‘স্টার স্যালুন’ ছিল ফোর্ডস থিয়েটারের কাছেই। সিদ্ধান্ত হলো সেখানেই প্রেসিডেন্টকে সরিয়ে নেয়া হবে। এই তিন ডাক্তার ও দর্শকদের মধ্যে থাকা সৈনিকেরা তাকে নিয়ে যান থিয়েটারের প্রবেশপথে। সারা পথে একটি মানুষ হাতে হারিকেন ধরে যাচ্ছিলেন আর বলছিলেন : ‘ব্রিং হিম ইন হেয়ার! ব্রিং হিম ইন হেয়ার’। লোকটির নাম হেনরি স্যাফোর্ড, তিনি ফোর্ডস থিয়েটারের বিপরীত দিকের উইলিয়াম পিটারসনসের বোর্ডিং হাউজের একজন বর্ডার। সারা পথ লোকটি ছিলেন ভয়ে উত্তেজিত। লোকটি লিঙ্কনকে বোর্ডিং হাউজে নিয়ে গেলেন দ্বিতীয় তলার একটি বেডরুমে। সেখানে বিছানায় কোনাকোনি তাকে শোয়ানো হলো। কারণ তার সুদীর্ঘ দেহ ছোট বিছানায় লম্বালম্বি ঠাঁই হচ্ছিল না। পিটারসন হাউজে তাকে পর্যবেক্ষণ শুরু হলো। এ তিনজন ডাক্তারের সাথে এসে যোগ দিলেন যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর সার্জন জেনারেল জোসেফ কে বার্নস, ত্রয়োদশ সার্জন জেনারেল চার্লস হেনরি ক্রেস, এন্ডারসন বাফিন অ্যাবেটে এবং রবার্ট কে স্টোন প্রমুখ চিকিৎসক। ক্রেস ছিলেন একজন মেজর এবং বার্নসের সহকারী। স্টোন ছিলেন লিঙ্কনের ব্যক্তিগত চিকিৎসক।

নেভি সেক্রেটারি গিডিওন ওয়েলেস এবং যুক্তরাষ্ট্রের সমরমন্ত্রী এডউইন এম স্টেনটন পরিস্থিতি মোকাবেলার দায়িত্ব নেন। ম্যারি লিঙ্কন এই হত্যা ঘটনা দেখে এতটাই এলোমেলো হয়ে পড়েছিলেন যে, স্টেনটন চিৎকার করে তাকে কক্ষের বাইরে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেন, ‘এ মহিলাকে এখান থেকে বাইরে নিয়ে যাও, তাকে এখানে আবার আসতে দিও না।’

কিন্তু প্রেসিডেন্ট লিঙ্কনের তখন কিছুই করা সম্ভব হলো না। ১৫ এপ্রিল, ১৮৬৫ ভোর ৭:২২ মিনিটে তিনি মারা গেলেন। তার বয়স তখন ৫৬। মৃত্যুর সময় কাছে ছিলেন না ম্যারি লিঙ্কন। তার মৃত্যুশয্যার চার পাশে জড়ো হওয়া লোকজন হাঁটু গেড়ে প্রার্থনা শুরু করেন। প্রার্থনা শেষ হলে স্ট্যানটন বলেন : ‘নাউ হি বিলংগস টু অ্যাজেস’। লিঙ্কনের মৃত্যুর পর স্ট্যানটনের এই বক্তব্য প্রশ্নে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। বাক্যের শুরুটা সম্পর্কে সবাই একমত। তবে শেষ শব্দটি ‘অ্যাজেস’ না ‘অ্যাজ্ঞেলস’ ছিল, মতপার্থক্যটা সেখানে।

লিয়ালি লিঙ্কনের শেষ সময়ের চিকিৎসার জন্য বিখ্যাত হয়ে ওঠেন। বলা হয়, তার চিকিৎসার ফলেই তাকে সকাল ৭:২২ মিনিট পর্যন্ত বাঁচানো সম্ভব হয়েছিল। নইলে ফোর্ডস থিয়েটারেই সে রাতেই লিঙ্কন মারা যেতেন।

 পাওয়েলের হামলা
বুথ লুই পাওয়েলকে দায়িত্ব দিয়েছিল পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম এইচ সেওয়ার্ডকে খুন করার জন্য। ৫ এপ্রিলে সেওয়ার্ড গাড়ি থেকে ছিটকে পড়ে যান। এতে চোয়াল দুই জায়গায় ভেঙে যায়। ডান হাতের এক জায়গা ভেঙে যায়। ডাক্তার তার চোয়াল মেরামত করে দেন। লিঙ্কনের হত্যার দিনেও সেওয়ার্ড বেড রেস্টে ছিলেন, তার ওয়াশিংটনের ল্যাকায়েদি পার্কের বাড়িতে। হেরল্ড গাইড করে পাওয়েলকে সেওয়ার্ডের বাড়িতে নিয়ে যান। বাড়িটি হোয়াইট হাউজ থেকে বেশি দূরে নয়। পাওয়েলের কাছে ছিল একটি ‘১৮৫৮ হুইটনি রিভলভার। এটি ছিল আকারে বড়, ওজনে ভারী। আমেরিকান গৃহযুদ্ধের সময় এটি ছিল জনপ্রিয় অস্ত্র। তা ছাড়া তার কাছে ছিল মিলভারের হাতলওয়ালা একটি ছুরি।

পাওয়েল সামনের দরজায় টোকা দেন। তখন রাত ১০টা। সেওয়ার্ডের খানসামা উইলিয়াম বেল এর জবাব দেন। পাওয়েল বলেন, ডাক্তার ভেরডি সেওয়ার্ডের জন্য একটি ওষুধ দিয়েছেন। ওষুধটা কিভাবে ব্যবহার করতে হবে তা তাকে দেখিয়ে দিতে হবে। ঘরে ঢোকার পর পাওয়েল সিঁড়ি ভেঙে তিন তলায় সেওয়ার্ডের শোবার ঘরে যেতে শুরু করলেন। সিঁড়ির শেষ মাথায় তাকে থামানো হলো। সেওয়ার্ডের পুত্র ও সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফ্রেডারিক ডব্লিউ সেওয়ার্ড তাকে থামালেন। পাওয়েল একই কথা বললেন ফ্রেডারিককে, যা তিনি বলেছিলেন বেলকে। ফ্রেডারিকের সন্দেহ হলো পাওয়েলের সম্পর্কে। ফ্রেডারিক বললেন তার বাবা ঘুমুচ্ছেন।

হলে এসব কথাবার্তা শুনে সেওয়ার্ডের কথা ফ্যানি সেওয়ার্ডের কক্ষের দরজা খোলেন এবং বলেন : ‘ফ্রেড, বাবা এখন জেগে আছেন’। এরপর দরজা বন্ধ করে দেন। এভাবে পাওয়েল জেনে গেলেন কোথায় এখন সেওয়ার্ড অবস্থান করছেন। প্রথমে পাওয়েল সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে শুরু করেন। হঠাৎ পেছন ফিরে রিভলবার তুলে ফ্রেডারিকের কপালে নিশানা করেন। এরপর ট্রিগার টানেন, কিন্তু বন্দুকটি মিসফায়ার করে। আবার ট্রিগার না টেনে ভীত হয়ে রিভলবার দিয়ে ফ্রেডারিকের কপালে আঘাত করেন। ফ্রেডারিক আঘাতের পর অচেতন হয়ে মেঝেতে পড়ে যান। কিন্তু পাওয়েলের রিভলবার এতটাই নষ্ট হয়ে গেল যে, মেরামতের উপায় নেই। ফ্যানি বাইরে এই গণ্ডগোলের শব্দ শুনে দরজা দিয়ে আবার বাইরের দিকে তাকান। দেখলেন, তার ভাই রক্তাক্ত অবস্থায় সংজ্ঞাহীন হয়ে মেঝেতে পড়ে আছেন। আর পাওয়েল দৌড়ে তার দিকেই ছুটে আসছেন। পাওয়েল ধাক্কা মেরে ফ্যানিকে এক দিকে সরিয়ে সেওয়ার্ডের বিছানার দিকে এগিয়ে যান। এরপর সেওয়ার্ডের ঘাড়ে ও মুখমণ্ডলে বারবার ছুরি দিয়ে আঘাত করতে থাকেন। প্রথম আঘাত ব্যর্থ হয়। তৃতীয় আঘাতটা গালে লাগে। অল্পের জন্য গলার নিম্নাংশে ছুরি ঢুকতে পারেনি।

সার্জেন্ট রবিনসন ও সেওয়ার্ডপুত্র অগাস্টাস চেষ্টা করেছিলেন পাওয়েলকে তাড়াতে। অগাস্টাস তার কক্ষে ঘুমে ছিলেন। কেনিচের আর্তচিৎকারে তিনি জেগে ওঠেন। বাসার বাইরে ডেভিড হেরল্ডও ফেনির আর্তনাদের শব্দ শুনতে পেয়েছিলেন। ভয়ে পাওয়েলকে ফেলে হেরল্ড দৌড়ে পালিয়ে যান। পাওয়েলের জানা ছিল না, কোন পথে শহর ছেড়ে পালাতে হবে। যা-ই হোক পাওয়েলের মুষ্টাঘাতে সেওয়ার্ড বিছানার পেছন দিকে মেঝেতে পড়ে যান, পাওয়েল সেখানে আর যেতে পারেনি। পাওয়েল হামলা চালায় রবিনসন, অগাস্টাস ও ফ্যানির ওপরও। এদের সবার ওপর ছুরিকাঘাত করে।

অগাস্টাস যখন তার পিস্তল আনতে যান, তখন পাওয়েল সিঁড়ি দিয়ে নেমে সামনের দরজার দিকে যায়। ঠিক তখন এমেরিক হ্যানসেল নামের এক মেসেঞ্জার সেওয়ার্ডের একটি টেলিগ্রাম নিয়ে এলেন। পাওয়েল তার পিঠেও ছুরি দিয়ে আঘাত করে। হ্যানসেল মেঝেতে পড়ে যান। এই আঘাতে এমেরিক হ্যানসেল চিরদিনের জন্য পঙ্গু হয়ে যান। বাইরে দৌড়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় ‘আমি পাগল, আমি পাগল’ বলে প্রলাপ বকছিল। হেরল্ড যেখানে গাছে বাঁধা ঘোড়া ফেলে গিয়েছিল। সে ঘোড়া নিয়ে একা পালিয়ে যায় পাওয়েল।

ফ্যানি আর্তনাদ করছিল : ‘ওহ মাই গড! মাই ফাদার ইজ ডেড!’ রবিনসন সেওয়ার্ডকে মেঝে থেকে তুলে বিছানায় শোয়ান। সেওয়ার্ড থুথু দিলে মুখের ভেতর থেকে রক্ত বের হয়। তিনি বলেন : ‘আমি মরিনি, ডাক্তার ডাকো, পুলিশ ডাকো।’ বাড়িতে লোকজনের যাতায়াত বন্ধ করে দাও।’ সেওয়ার্ড রক্তাক্ত হলেও বড় ধরনের কোনো আঘাত লাগেনি। অন্ধকারে পাওয়েল এলোপাতাড়ি ছুরি দিয়ে আঘাত করেছিল বলেই রক্ষা।

 অ্যাটজেরোদত ব্যর্থ
কথা ছিল অ্যাটজেরোদত হত্যা করবেন ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু জনসনকে। বুথ তাকে সে দায়িত্বই দিয়েছিলেন। অ্যাটজেরোদত থাকতেন ওয়াশিংটনের কির্কউড হোটেলে। কথা ছিল অ্যাটজেরোদত ভাইস প্রেসিডেন্টের কক্ষে যাবেন রাত সোয়া ১০টায়। তখন তাকে গুলি করে মারা হবে। ১৪ এপ্রিল অ্যাটজেরোদত কির্কউডের ১২৬ নম্বর কক্ষ ভাড়া নেন। এই রুমটি ঠিক সেই কক্ষটির ওপরে, যেটিতে জনসন থাকছিলেন। নির্বাচিত সময়ে কির্কউডে পৌঁছে নিচে যান। সাথে ছিল তার ব্যক্তিগত একটি গান ও ছুরি। অ্যাটজেরোদত বাবটেন্ডার মাইকেল হেনরির কাছে ভাইস প্রেসিডেন্টের স্বভাব-প্রকৃতি ও আচার-আচরণ সম্পর্কে জানতে চান। হোটেল সেখানে কিছুটা সময় কাটিয়ে অ্যাটজেরোদত নেশা পান করেন। এরপর ওয়াশিংটনে রাস্তায় ঘোরাফেরা করেন। রাস্তায় ছুরিটি কয়েকবার খোলাখুলি করে উপরে ছুড়ে মারেন। রাত ২টায় পেনসিলভানিয়া হাউজ হোটেলের পথ ধরেন। সেখানে একটি কক্ষে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। ওই দিন আরো আগে বুথ কির্কউড হোটেলে এসে জনসনের উদ্দেশে একটি নোট রেখে যান। তাতে লেখা ছিল : ‘আই ডোন্ট উইশ টু ডিস্টার্ব ইউ। আর ইউ অ্যাট হোম? জে উইলফেস বুথ’। জনসনের একান্ত সচিব উইলিয়াম ব্রাউনিং এই মেসেজ কার্ডটি হাতে নেন সে রাতেই। বছরের পর বছর ধরে এই কার্ড নিয়ে নানা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ চলেছে। একটি তত্ত্ব ছিল বুথ শঙ্কিত ছিলেন, অ্যাটজেরোদত জনসনকে হত্যায় সফল হবেন না, কিংবা শঙ্কিত ছিলেন, অ্যাটজেরোদত ভাইস প্রেসিডেন্ট জনসনকে খুন করার মতো সাহস দেখাতে পারবেন না। আরেকটি ব্যাখ্যা হচ্ছে এর মাধ্যমে বুথ জানতে চেয়েছিলেন ওই দিন ওই রাতে জনসন কির্কউড হোটেলে থাকবেন কি না।

 ষড়যন্ত্রকারীদের ধরার লড়াই
ঘটনার আধঘণ্টার মধ্যে ফোর্ডস থিয়েটার থেকে ঘোড়ায় চড়ে বুথ নেভি ইয়ার্ড ব্রিজ দিয়ে ওয়াশিংটন ছেড়ে চলে যান রিল্যান্ড রাজ্যে। ডেভিড হেরল্ড এক ঘণ্টার ভেতর একই সেতু পার হয়ে বুথের সাথে গিয়ে মেলেন। সুররাতভিলিতে আগেই মজুদ করে রাখা অস্ত্র পুনরুদ্ধার করে এরা মেরিল্যান্ডের স্থানীয় ডাক্তার স্যামুয়েল এ মাডের কাছে যান। এ ডাক্তার নিশ্চিত করেন বুথের একটি পা ভেঙে গেছে। এ ডাক্তার একটি কাঠের ফলক দিয়ে তা পা ব্যান্ডেজ করে দেন। পরে স্যামুয়েল মাড এ খুনির জন্য একজোড়া ক্র্যাচ তৈরি করে দেন। স্যামুয়েল মাডের বাড়িতে এক দিন থাকার পর বুথ ও হেরল্ড একজন লোক ভাড়া করেন। ভাড়া করা লোকটি তাদের পথ দেখিয়ে কর্নেল স্যামুয়েল ফক্সের বাড়িতে নিয়ে যাবেন। উল্লেখ্য, মেরিল্যান্ডে বেল অ্যান্টনের কাছে রিখ পর্বতে গৃহযুদ্ধের সময়ে কর্নেল স্যামুয়েল কক্স একটি বাড়ির মালিক হন। তিনি গৃহযুদ্ধের সময়ে এ বাড়িতে কনফেডারেটদের থাকতে দিতেন। প্রেসিডেন্ট আব্রাহামকে হত্যার পর বুথ ও তার সাথী হেরল্ডকে সে বাড়িতে পাঠিয়ে দেয় সেখানে লুকিয়ে থাকার জন্য। রিখ পর্বতের কাছের জলাভূমিতে এরা লুকিয়ে থাকবেন এমনটিই কথা ছিল। বুথ ও হেরল্ড ২১ এপ্রিল এ স্থান ছেড়ে একটি ছোট্ট নৌকায় করে পটোম্যাক নদী পার হয়ে অন্যত্র চলে যান। এরপর বুথ যখন ধরা পড়লেন, তখন বুথকে সহায়তা করার জন্য কর্নেল স্যামুয়েল ফক্সের বিচার হয়, তাকে এ জন্য লঘু শাস্তি দেয়া হয়।

২৪ এপ্রিল বুথ ও হেরল্ড রিচার্ড এইচ গ্যারেট নামের জনৈক তামাকচাষির খামার বাড়িতে গিয়ে পৌঁছান। গ্যাবেটকে বুথ বলেন, তিনি একজন আহত কনফেডারেট সৈনিক। এরা দু’জন গ্যাবেটের বাড়িতে ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত। এরপর এ খামার বাড়িতে এলো ষোড়শ নিউ ইয়র্ক ক্যাডলেরি থেকে ইউনিয়ন সৈনিকেরা। সৈনিকেরা গোলবাড়ি ঘেরাও করে। এই গোলাবাড়িতেই ছিলেন বুথ ও হেরল্ড। হেরল্ড আত্মসমর্পণ করেন। কিন্তু সৈনিকদের আত্মসমর্পণের আহ্বান সত্ত্বেও বুথ সাহসের সাথে বলেন : ‘আই উইল নট বি টেকেন এলাইভ আমাকে জীবিত নেয়া যাবে না।’ তার এ ধরনের কথা শুনে সৈনিকেরা গোলাবাড়ির দিকে গুলি ছুড়তে লাগলেন। এরপর বুথ পা টেনে টেনে পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে আসেন। এক হাতে আন্দোলিত এক রাইফেল, অপর হাতে একটি পিস্তল। কিন্তু রাইফেল বা পিস্তল থেকে একটি গুলিও তিনি ছোড়েননি।

বোস্টন ফরবেট নামের একজন সৈনিক গোলাবাড়ির পেছন থেকে এসে বুথের ঘাড়ে গুলি করেন। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় তার মেরুদণ্ড। বুথকে গোলাবাড়ির বাইরে বয়ে আনা হয়। একজন সৈনিক তার মুখে পানি ছিটাচ্ছিলেন। বুথ ওই সৈনিকটিকে বললেন : ‘টেল মাই মাদার, আই ডাই ফর মাই কান্ট্রি’। মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতর বুথ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নাড়াতে অক্ষম। বুথ একজন সৈনিককে তার দু’টি হাত মুখের সামনে তুলে ধরতে বলেন। হাত দু’টির দিকে তাকিয়ে বুথ বিড় বিড় করে বলেন : ‘ইউজলেস...ইউজলেস’। এই ছিল তার মুখের শেষ কথা। ফরবেটের গুলির দুই ঘণ্টা পর গ্যাবেট ফার্মের বারান্দায় ২৬ এপ্রিল মারা যান বুথ।

পাওয়েলের কাছে ওয়াশিংটন ছিল অপরিচিত। ডেভিড হেরল্ডকে না পেয়ে ওয়াশিংটনের রাস্তায় তিন দিন ঘোরাফেরার পর ১৭ এপ্রিল ফিরে যান সুররাত হাউজে। তিনি দেখতে পান গোয়েন্দা সেখানে উপস্থিত। পাওয়েল বলে ম্যারি সুরবাত তাকে ভাড়া করেছেন পরিখা খননের জন্য। কিন্তু ম্যারি সুররাত তাকে চেনেন না বলে জানান। গোয়েন্দারা এরা দু’জনকেই গ্রেফতার করে। জর্জ অ্যাটজেরোদত ম্যারিল্যান্ডের জার্মানটাউনের এক খামার বাড়িতে লুকিয়ে ছিলেন। জার্মানটাউন ওয়াশিংটন থেকে ৪০ কিলোমিটার উত্তর পশ্চিমে। সেখানে তিনি ধরা পড়েন ২০ এপ্রিল। শুধু জন সুররাত ছাড়া বাকি ষড়যন্ত্রকারী ধরা পড়েন মাস শেষ হওয়ার আগেই। জন সুররাত পালিয়ে যান কানাডার কিউবেকে। সেখানে রোমান ক্যাথলিক যাজকেরা তাকে লুকিয়ে রাখেন। ১৮৬৫ সালের সেপ্টেম্বরে ইংল্যান্ডের লিভারপুল অভিমুখী এক জাহাজে চড়ে বসেন। সেখানে নগরীর হলি ক্রস ক্যাথলিক চার্চে থাকেন। সেখানে থেকে তিনি অলক্ষিতে গোটা ইউরোপ ঘুরে বেড়ান। এরপর প্যাপাল স্টেটসের পদাতিক বাহিনীতে যোগ দেন। ১৮৬৬ সালের বসন্তে তার এক স্কুলবন্ধু হেনরি সেন্ট ম্যারি তাকে দেখতে পান প্যাপল স্টেটসে গার্ড বাহিনীতে। সে বিষয়টি জানিয়ে দেন যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে। প্যাপল কর্তৃপক্ষ জন সুররাতকে আটক করে। কিন্তু রহস্যজনকভাবে তিনি পালাতে সক্ষম হন। পরে ১৮৬৬ সালের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের অ্যাজেন্টরা তাকে মিসরে গ্রেফতার করে।

১৮৬৭ সালের গ্রীষ্মে ওয়াশিংটনে জন সুররাতের বিচার হয়। অভিযোগ লিঙ্কনকে খুন করার। বিচারে তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হন। ১৯১৬ সালে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত মুক্তভাবে জীবনযাপন করেন।

 ষড়যন্ত্রকারীদের বিচার
হত্যাকাণ্ডের পর প্রচুরসংখ্যক সন্দেহভাজন ষড়যন্ত্রকারীদের হত্যা করা হয়। তাদের কারাগারে আটক রাখা হয়। বুথ ও হেরল্ডের সাথে যাদের সামান্যতম যোগসূত্র ছিল তাদেরও জেলে পাঠানো হয়। এসব আটক লোকদের মধ্যে মিসেস সুররায়ত’স হাউজের বর্ডার লুই জে ওয়েকম্যানও আটক হন।

আরো আটক হন : বুথের ভাই জুনিয়াস (তিনি ছিলেন অভিনেতা ও মঞ্চ ব্যবস্থাপক); থিয়েটার মালিক জন টি ফোর্ড, তিনি কারারুদ্ধ ছিলেন ৪০ দিন; ওয়াশিংটনের আস্তাবল মালিক জেমস পাম্পেরি, তার কাছ থেকে বুথ ঘোড়া ভাড়া করেছিলেন; জন এম লাঞ্চ, তার কাছ থেকে মিসেস সুররাত পানশালা ভাড়া নিয়েছিলেন এবং ১৪ এপ্রিল রাতে বুথ ও হেরল্ডকে ছোট্ট বন্দুক, দড়ি ও হুইস্কি সরবরাহ করেছিলেন; স্যামুয়েল ফক্স; পটোম্যাক নদী পার হতে বুথ ও হেরল্ডকে সহায়তাকারী থমাস জে জোনস। তারা ছাড়াও আরো অনেককে গ্রেফতার, আটক করা হয়েছিল। আটকের পর অনেকে ছাড়াও পান। শেষ পর্যন্ত আটজনকে সন্দেহজনক ষড়যন্ত্রকারী বিবেচনা করা হয়। এদের মধ্যে সাতজন পুরুষ ও একজন নারী। এই আটজন হলেন : স্যামুয়েল আরনল্ড, জর্জ অ্যাটজেরোদত, ডেভিড হেরল্ড, স্যামুয়েল মাড, মাইকেল ও’লকনান, লুই পাওয়েল, এডমন্ড স্প্যাংলার এবং ম্যারি সুররাত।

তৎকালীন প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু জনসনের ১৮৬৫ সালের ১ মে’র দেয়া আদেশ বলে গঠিত এক সামরিক ট্রাইব্যুনালে তাদের বিচার হয়। নয় সদস্যদের কমিশনের প্রেসিডেন্ট ছিলেন মেজর জেনারেল ডেভিড হান্টার। বাকি আটজন ভোটিং মেম্বার ছিলেন : অগাস্ট কাউট্জ, অ্যালবিয়ন পি হাওয়ে, জেমস এ একিন, ডেভিড ক্লেনডেনিন, লিও ওয়ালেস, রবার্ট ফস্টার, থমাস এম হ্যারিস এবং চার্লস এইচ থম্পসন। প্রসিকিউশন টিমে অর্থাৎ সরকারপক্ষে ছিলেন জাজ অ্যাডভোকেট জেনারেল জোসেফ হোল্ট, জন এ বিংহাম এবং এইচ এল ডানেট। বিচারের বিবরণ রেকর্ড করেন বেন পিটম্যান ও তার কয়েকজন সহকারী। এই বিবরণ প্রকাশ করা হয় ১৮৬৫ সালে। সামরিক ট্রাইব্যুনালে বিচার হওয়ার বিষয়টি নিয়ে তখন অনেকের সমালোচনা আসে। তাদের বক্তব্য ছিল বিচার হওয়া উচিত বেসামরিক আদালতে, অবশ্য অ্যাটর্নি জেনারেল জেমস স্পিড সামরিক ট্রাইব্যুনালে বিচার হওয়াকে যুক্তিযুক্ত বলে অভিমত দেন। এই ট্রাইব্যুনালের জুরিরা সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে রায় ঘোষণা দিতে পারতেন। মৃত্যুদণ্ড দেয়ার জন্য প্রয়োজন ছিল দুই-তৃতীয়াংশ জুরির সম্মতি। প্রেসিডেন্ট ছাড়া আর কারো কাছে আসামিদের আপিল করারও সুযোগ ছিল না। এসব বিষয় নিয়েও তখন সমালোচনা ওঠে।
৩৬৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য শেষে ৬ সপ্তাহে বিচারপ্রক্রিয়া শেষ হয় ৩০ জুন। কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া লুই ওয়েকম্যান ছিলেন মুখ্য সাক্ষী। সব আসামিই দোষী প্রমাণিত হন। ম্যারি সুররাত, লুই পাওয়েল, ডেভিড হেরল্ড আর অ্যাটজেবোদতকে দেয়া হয় মৃত্যুদণ্ড। তাদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আদেশ দেয়া হয়। বাকিদের দেয়া হয় আজীবন কারাদণ্ড। স্যামুয়েল মৃত্যুদণ্ড থেকে বেঁচে যান একটি মাত্র ভোটে। ট্রাইব্যুনালে তার বিরুদ্ধে ৫-৪ ভোট পড়ে। এডমন্ড স্প্যাঞ্জারকে দেয়া হয় ৬ বছরের জেল। এ দিকে ম্যারি সুররাতকে ফাঁসির আদেশ দেয়ার পর পাঁচজন জুরি তার দণ্ড মওকুফের সুপারিশপত্র স্বাক্ষর করেন। কিন্তু জনসন তা প্রত্যাখ্যান করেন। জনসন পরে দাবি করেন, তিনি কখনোই এই সুপারিশপত্র পাননি।

সুররাত, পাওয়েল, হেরল্ড ও অ্যাটজেবোদতকে ওল্ড আর্সেনাল পেনিটেনশিয়ারিতে ১৯৬৫ সালের ৭ জুলাই ফাঁসি দেয়া হয়। মাইকেল ও’লকনান ১৮৬৭ সালে পীত জ্বরে কারাগারে মারা যান। মাড, আরনল্ড ও স্পেঞ্জারকে ১৮৬৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ক্ষমা ঘোষণা করা হয়। প্রেসিডেন্ট জনসন সে ক্ষমা ঘোষণা দেন। স্পেঞ্জার মারা যান ১৮৭৫ সালে। তিনি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দাবি করে গেছেন আব্রাহাম লিঙ্কন হত্যার সাথে তার বিন্দুমাত্র যোগসূত্র নেই। মাডের অপরাধের বিষয়টি রয়ে গেছে রহস্যময়। মাডের নাতি রিচার্ড মাডও তাকে নিরপরাধ দাবি করেছেন। এই হত্যাকাণ্ডের শত বছর পর প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার ও রোল্যান্ড রিগ্যানও রিচার্ড মাডের কাছে চিঠি দিয়েছেন এই বলে যে, তার দাদা কোনো অপরাধে জড়িত ছিলেন না।

Tuesday, November 1, 2016

স্বাধীন কাশ্মীর যেভাবে ভারতের পদানত হলো!

কাশ্মীরটা কী? 
দেশভাগের আগে ১৯৪১-এর সেন্সসাস অনুযায়ী কাশ্মীরের জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৪০ লক্ষ্য। আজকে ঠিক কত হবে আমি জানিনা। কাশ্মীরে যারা বাস করেন তাদের মধ্যে আছে ডোগরা। ডোগরা নামটা অনেকে শুনেছেন। ওদের মধ্যে হিন্দু আছেন, মুসলমান আছেন। বর্ণ হিসাবে (Caste) ডোগরাদের মধ্যে ব্রাহ্মণ আছেন, রাজপুত আছেন, ক্ষত্রিয়, মহাজন আছেন, সবার নীচে আছেন হরিজন। এই ডোগরারাই জনসংখ্যার একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল --- যখন মহারাজ হরি সিং কাশ্মীর ছেড়ে চলে গেলেন। ডোগরারা থাকেন মূলত জম্মুতে।

আরেকটা অংশ হল পাহাড়ী। পাহাড়ীরা থাকেন কাশ্মীর উপত্যকা আর জম্মুর মাঝখানে যে পাহাড়গুলি আছে তার মাঝখানের অঞ্চলে। এদের কথা বলার ভাষা মিশ্র -- হিন্দী, পাঞ্জাবী, ডোগরা আর সংস্কৃতি শব্দ নিয়ে তৈরী এই ভাষা।
এরপর আছে গুজর। এরা হল জিপসী, বাদুইন জাতি। এরা কোথায় থাকেন? এদের কোনো স্থায়ী আস্তানা নেই। পুঞ্চ, রিয়াসী, মুজফফরাবাদ জেলায় এদের ভারী সংখ্যায় পাওয়া যায়। গ্রীষ্মকালে তারা পালিত ভেড়া, ছাগলের পাল নিয়ে বিভিন্ন দিকে বেরিয়ে পড়েন।
এরপর হল কাশ্মিরী। এদেরই কথা আপনারা শোনান, যাকে বলা হয় কাশ্মিরীয়ত্‌। এরা ইন্দো-এশিয়ান সভ্যতার অংশ। বর্তমানে এদের বেশীরভাগ মুসলমান হলেও, এই সমস্ত সভ্যতা ১৪শ শতকের আগে মোটামুটি হিন্দু সভ্যতা ছিল। এ ছিল প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতার অংশ। এরা ছাড়াও কাশ্মীরে নিষাদ, খাসাস, দারাদ, ভাউট্রা, ভিক্‌সাস, দামারাস, তান্ত্রিন ইত্যাদি উপজাতি সম্প্রদায়ের মানুষ ছিলেন। কিন্তু বাইরে থেকে অন্যান্য ভূখন্ড ও জনসমষ্টির সাংস্কৃতিক সম্মিলন কাশ্মীরে খুব হয়নি। হয়নি তার কারণ পাহাড়।
পাহাড়ের কারণেই তখনকার দিনে লোকেরা কাশ্মিরে ঢুকে খুব বেশী কিছু করতে পারেনি। কাশ্মীর ছিল ভৌগোলিক কারণে বিচ্ছিন্ন। আবার এখানে যারা এসেছেন, তাদের কিন্তু কাশ্মিরীরা নিজেদের মধ্যে মিলিয়ে নিয়েছেন। ফলে যেটা হয়েছে তা হল, সেই প্রথম থেকে আজ পর্যন্ত এখানে একধরনের অ-সাম্প্রদায়িক জীবনযাপনের ভঙ্গী রয়েছে। উত্তর ভারতে যেমন আমরা দেখি -- আমি হিন্দু, আমি মুসলমান। কাশ্মিরে গড়ে উঠেছে কাশ্মিরীয়ত্‌। এর নিজস্ব স্বকীয়তা আছে।
প্রথমে ছিল নাগা কালট্‌ (Cult) তারপর এল ব্রাম্ভণ-বাদ (Brahminism) খ্রীষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে বৌদ্ধধর্ম এল কাশ্মীরে। বৌদ্ধরা বিহার এবং মন্দির বানিয়েছেন। এমনকি হিন্দু দেব-দেবতাদের উৎসর্গ করে সেগুলি তৈরী করেছেন। একধরনের বিশ্বাস থেকে অন্য ধর্মবিশ্বাসে উৎক্রমণ ছিল বরাবর শান্তিপূর্ণ। বাংলাদেশে যেমন হিন্দু থেকে মুসলমান হয়েছে। জোর করে ধর্মান্তরীকরণ হয়নি। ১৪শ শতকে যখন প্রথম ইসলাম আসে কাশ্মীরে, এটা প্রথমে ছিল শান্তিপূর্ণ। এর মধ্যে ব্যতিক্রমও ছিল। যেমন ৫৫১-৫৫০ খ্রীষ্টাব্দে মিহিরগুলের রাজত্বকালে বৌদ্ধ-বিরোধী ধর্মযুদ্ধ হয়েছে।
১৫শ শতকে মুসলমান শাসক বুটসী খানের আমলে প্রবল অত্যাচার হয়েছে। কিন্তু সব মিলিয়ে এত রাজত্ব পরিবর্তন হয়েছে,ধর্মের পরিবর্তন হয়েছে হাঙ্গামা হয়নি। এমনকি স্যার ওয়াল্টার রোপার লরেন্স (যিনি কাশ্মীরের সেটালমেন্ট অফিসার ছিলেন) 'দ্য ইন্ডিয়া উই সার্ভড্‌' বইতে লিখেছেন, ১৮৮৯ সাল পর্যন্ত একটাও সাম্প্রদায়িক ঘটনা তিনি কাশ্মীরে দেখেননি।
কাশ্মীরে লিখিত ইতিহাস যা পাই, খ্রীষ্টপূর্ব ২৭৩ থেকে ২৩২-এ মৌর্য রাজা অশোকের সময় থেকে। এর আগের কথা লিখেছে কলহান, তার 'রাজতরঙ্গিনী' বইতে। এতে আগের দিনের ইতিহাস খুব প্রামাণ্য বলে মনে করেন না ঐতিহাসিকরা। কিন্তু তাঁর নিজের সময়টা অর্থাৎ ১১৪৮- ৫০ মোটামুটি ঐতিহাসিক।
মৌর্য রাজবংশের পর এল কুশানরা। তারপর এল গোনান্দরা- ১৭৮ খ্রীষ্টাব্দে। এরপর ৫১৫-৫৫০ খ্রীষ্টাব্দে কাশ্মীরে চলেছিল অত্যাচার হুন রাজবংশের মিহিরগুলের রাজত্বকাল। এইভাবে একটার পর একটা অত্যাচার কাশ্মিরে হয়েছে। দুঃখের কথা হল আজ পর্যন্ত তারা কোনো ভাল গভর্নমেন্ট পায়নি। ফলে কাশ্মীরের লোকেরা কাপুরুষ হয়ে গিয়েছিলেন।
এখনও কাশ্মীরের মানুষ মিহিরগুলের অত্যাচার মনে রেখেছেন। ৩ কোটি লোককে নাকি উনি মেরেছিলেন। মিহিরগুলের মৃত্যুর পর আসে গোনান্দা রাজবংশ। তারপর বিক্রমাদিত্য রাজবংশ। ১৯২ বছর ধরে এই হিন্দু রাজত্ব চলে। চীনা পর্যটক হিউয়েন সাঙ কাশ্মীরে এসেছিলেন ৬৩১-৩৩ খ্রীষ্টাব্দে। দারুণ বর্ণনা করেছেন তিনি কাশ্মীরের। উনি লিখেছেন, কাশ্মিরীরা দারুণ কাব্যিক, দারুণ সংস্কৃতিবান। দারুণ একটা জিনিস এরা তৈরী করে- শাল।
মুসলমান শাসনের শুরুটা চমৎকার। ১৩০১-১৩২০ খ্রীষ্টাব্দে হিন্দুরাজা সহদেব দুজনকে আশ্রয় দিয়েছিলেন। তাদের একজন এসেছিলেন লাদাখ থেকে- বৌদ্ধ রাজকুমার রিনচেন এবং আরেকজন এসেছিলেন দার্দিস্তানের সোয়াট্‌ উপত্যকা থেকে। তিনি ছিলেন মুসলমান, নাম শাহ্‌মীর। ১৩১৯ সালে তাতাররা কাশ্মীর আক্রমণ করে। সহদেব পালিয়ে যান। সহদেবের প্রধানমন্ত্রী রামচন্দ্রের মেয়ে কোটা রাণীকে বিয়ে করে রিনচেন রাজা হলেন। উনি প্রাণপণ হিন্দু হওয়ার চেষ্টা করেন। হিন্দুরা ওকে হিন্দু হতে দেয়নি। শেষ পর্যন্ত বিরক্ত হয়ে উনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। ১৩২৩-এ তাঁর মৃত্যুর পর কোটা রাণী সহদেবের ভাই উদয়নদেবকে বিয়ে করে তাঁকে সিংহাসনে বসালেন। ১৩৩৮-এ উদয়নদেব মারা গেলে শাহ্‌মীর রাজা হলেন। তখন থেকেই শুরু হল মুসলমান রাজত্বকাল।
এরপর মুসলমান রাজত্ব চলল তিনপর্বে -- স্বাধীন সুলতানি আমল, মোগল বাদশাহী আমল এবং আফগান আমল। তারপর এসেছে শিখরা। সমস্ত সময় জুড়ে প্রচন্ড অত্যাচার হয়েছে কাশ্মীরে। কেবল মোগলরা সেরকম অত্যাচার করেনি, কারণ তারা দেশ শাসন করতে জানত। সবচেয়ে বেশী করেছে আফগান ও শিখরা। হিন্দু রাজার সময়ও অত্যাচার হয়েছে। স্বাধীন সুলতানী আমলে হিন্দুদের উপর বেছে বেছে অত্যাচার হয়েছে। এর ব্যতিক্রম ছিলেন জয়নুল আবেদিন। সুশাসনের জন্য দুজনকে কাশ্মীরের মানুষ মনে রেখেছে - জয়নুল আবেদিন এবং ললিতাদিত্য।
শিখ রাজা রঞ্জিৎ সিং এর আমলে ডোগরা রাজপুত বংশের সন্তান গোলাব সিং তাঁর কমান্ডার নিযুক্ত হন। বৃটিশ শাসকদের সঙ্গে 'অমৃতসর চুক্তি'-র মাধ্যমে ১৮৪৬ সালে জম্মু ওকাশ্মীর ৭৫ লক্ষ টাকার বিনিময়ে গোলাব সিং-এর শাসনে আসে। ১৯২৫ সাল থেকে হরি সিং রাজা হন। হরি সিং-এর রাজত্বকালে অত্যাচারের নমুনা এরকমঃ 'রিজিওনাল রেকর্ডস সার্ভে কমিশন অব দ্য কাশ্মীর গভর্নমেন্ট' থেকে জানা যায় যে, মোট রাজত্ব আদায়ের মধ্যে শাসক নিজে নিত ১২.৫ শতাংশ,৪০ শতাংশ যেত বিদেশে, মাত্র ৩০ শতাংশ পেত জম্মু এবং নামমাত্র ১৭.২৫ শতাংশ বরাদ্ধ ছিল কাশ্মীরের জন্য। কাশ্মীর ছিল এই রাজত্বের মধ্যে সবচেয়ে জনবহুল অংশ। তাহলে বুঝুন কিরকম রাজত্ব চলত কাশ্মীরে।
এই রাজত্বেই ১৯০৫ সালে জন্ম হল শেখ আবদুল্লার। উনি ১৯৩০ সালে এম. এস. সি. পাস করেন। 'অল ইন্ডিয়া কাশ্মীর মুসলিম কনফারেন্স' বলে একটা সংগঠন ছিল পাঞ্জাবে। কাশ্মিরীদের মধ্যে যারা শিখদের অত্যাচারে পাঞ্জাবে পালিয়ে গিয়েছিল, তারা এবং কিছু পাঞ্জাবীরা লাহোর থেকে এই সংগঠন চালাতো। এরা গরীব মুসলমান ছাত্রদের উচ্চশিক্ষার জন্য স্কলারশিপ দিত। শেখ আবদুল্লা এরকম একটা স্কলারশিপ নিয়ে আলিগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটিতে পড়তে আসেন।
১৯৩০ সালে তিনি এম. এস. সি. পাস করে শ্রীনগর থেকে একটা সরকারী হাইস্কুল জুনিয়ার টিচারের চাকরী পান। মাইনে ছিল মাসিক ৬০ টাকা। তখনকার দিনে ৬০ টাকা অনেক। জিনিসপত্রের দাম কম ছিল। দাম বাড়তে থাকলো '৪২-এর পর। শেখ আবদুল্লা একটা 'রিডিং রুম' স্থাপন করেন শ্রীনগরে। সেখানে আলোচনা হত কাশ্মিরী মুসলমানদের দুঃখ-দুর্দশা কিভাবে দূর করা যায়, লেখাপড়া কিভাবে শেখানো যায়। একই সময়ে গোলাম আব্বাস জম্মুর মুসলমানদের নিয়ে 'ইয়ংমেনস্‌ মুসলিম এয়াসোসিয়েশন'তৈরী করেছিলেন। অন্যদিকে লাহোরে কাশ্মিরী ও পাঞ্জাবী মুসলমানদের নিয়ে গঠিত 'অল ইন্ডিয়া কাশ্মীর মুসলিম কনফারেন্স' কাশ্মীরের রাজনীতি নিয়ে চর্চা করতো।
১৯৩০-এ ইন্ডিয়াতে স্বাধীনতা আন্দোলন শুরু হয়। গান্ধীর নেতৃত্বে এই আন্দোলনের কথা আমরা জানি। অন্যদিকে মহম্মদ ইক্‌বাল তখন বলতে শুরু করেছেন মুসলমানরা স্বতন্ত্র। উত্তর-পশ্চিম ভারতে একটা মুসলমান বেল্ট তৈরীর কথা উনি বলেছেন। এই দুই ধরনের আন্দোলনের প্রভাবই ছিল কাশ্মিরী মুসলমানদের মধ্যে। 'রিডিং রুম' থেকে বিক্ষোভ শুরু হয় কাশ্মীরে। মুসলমানদের চাকরী দিতে হবে, লেখাপড়া শিখতে দিতে হবে। রাজা হটাও আন্দোলন তখনও শুরু হয়নি। বিক্ষোভ বাড়তে থাকে।
মহারাজার বৃটিশ মন্ত্রী জি.ই.সি ওয়েকফিল্ড রাজাকে একটা পরামর্শ দেন, বলেন- একটা কাজ কর, এদের কাছ থেকে একটা ডেপুটেশন নিয়ে শোনো এরা কি বলতে চায়। ১৯৩১'র ২১শে জুন, মুসলমানরা একত্র হয়ে ৭জন প্রতিনিধি বাছাই করে। এই প্রতিনিধিরা ডেপুটেশনে যাবে। রাজাকে বলবে কি চাই তাদের। এই সময় আবদুল কাদির নামে এক পাচক হঠাৎ ওই সভায় এসে বলে- হিন্দুদের মারো, হিন্দুদের না মারলে কাশ্মিরীদের কিছু হবে না। হিন্দুদের মারো বললে হিন্দুরাজার আমলে শুনবে কেন? তাকে গ্রেপ্তার করা হল।
১৩ই জুলাই যখন তাকে বিচারের জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, সেই সময় জনতা জেলখানার বাইরে জড় হয়ে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। উপস্থিত সরকারী রক্ষীরা ভয় পেয়ে গুলি ছোড়ে। ২১ জন মারা যান। এইভাবে শুরু হল কাশ্মীরের স্বাধীনতা আন্দোলনের। ১৯৩১'র ১৩ই জুলাই কাশ্মিরীদের স্মরণীয় দিন।
১৯৩২ সালের জুলাই মাস। শেখ আবদুল্লা দেখলেন এইভাবে আবেদন নিবেদন করে চলবে না, আমাকে একটা রাজনৈতিক দল করতে হবে। তাঁর পরামর্শদাতা ছিলেন চারজন। যার মধ্যে প্রেমনাথ বাজাজ, গিরিধারীলাল ডোগরার মত হিন্দু ব্যক্তিরাও ছিলেন। প্রেমনাথ বাজাজই ওনাকে রাজনৈতিক দল গঠন করার পরামর্শ দেন। ১৯৩২-এ 'অল জম্মু এয়ান্ড কাশ্মীর মুসলিম কনফারেন্স' গঠন হয়। এইসব নানা আন্দোলন চলেছে। সাতবছর এই নামেই সংগঠন চলে।
কিন্তু ১৯৩৯-এ এসে শেখ আবদুল্লার মনে হল-- আমরা তো শুধু মুসলমানদের হয়ে লড়াই করছি না। সত্যিই এই সাত বছর এঁরা যে আন্দোলন করেছেন তাতে শিখ ও হিন্দুরাও যুক্ত হয়েছেন। আন্দোলনটা কি? রাজার স্বৈরাচারী ক্ষমতা কমাতে হবে, এয়্যাম্বলী করতে হবে, ৭০ শতাংশ চাকরী মুসলমানদের জন্য সংরক্ষণ করতে হবে, আইন প্রণয়ন করতে হবে ইত্যাদি। সত্যিই মুসলমানদের কোন চাকরী ছিল না। পন্ডিতরা লেখাপড়া জানত, তাই প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা দিয়ে তারা কিছু চাকরী পেত। সবচেয়ে বেশী চাকরী ছিল ডোগরা রাজপুতদের, ওরা রাজত্ব করতো। ম্যাট্রিক পাস না করে, এমনকি সই করতে না পেরেও তারা বড় বড় বিভাগীয় সেক্রেটারী পদে সরকারী চাকরী পেত। সুতরাং মুসলমানরা আন্দোলন তো করবেনই। আর তাতে হিন্দু, শিখরাও যোগ দিয়েছিলেন। এই আন্দোলনের নেতা হিসাবে শেখ আবদুল্লা বুঝতে পারলেন যে তাদের 'ধর্মনিরপেক্ষ' সংগঠন করতে হবে। লড়াই তো মহারাজার বিরুদ্ধে। সুতরাং আলাদা কোনো দল নয়। ১৯৩২'র 'মুসলিম কনফারেন্স' ১৯৩৯'এ নাম বদল করে হল 'ন্যাশনাল কনফারেন্স'।
ন্যাশনাল কনফারেন্স কি করল? একটা 'ন্যাশনাল ডিমান্ড' পেশ করল- ১৯৩৯'র ৩০শে সেপ্টেম্বর। তাতে তারা 'যৌথ ভোট ব্যবস্থা' চাইল, 'দায়িত্বশীল আইন-প্রণয়ন' চাইল এবং একটা আলাদা প্রস্তাবে কংগ্রেসের যুদ্ধ সম্পর্কিত মতকে সমর্থন করলো। এদিকে মুসলীম লিগের কোনো যুদ্ধ সম্পর্কিত নিজস্ব মত ছিল না, প্রচ্ছন্নভাবে বৃটিশের প্রতি সহানুভূতি ছিল। সুতরাং কাশ্মীরের এই ব্যাপারটা তাদের মোটেই ভাল লাগলো না।
এইবার কংগ্রেসের কথায় আসি। বৃটিশ রাজত্বে দুটো ভাগ ছিল। একটা হল বৃটিশ ইন্ডিয়া, যাতে আমরা ছিলাম। আর একটা হল নেটিভ স্টেট্‌স, ইন্ডিয়ান ইন্ডিয়া, যাকে আমরা করদ রাজ্য বলি। এদের সংখ্যা ছিল ৫৬৫। কিছু কিছু রাজত্ব খুব বড় ছিল, যেমন মাইসোর, কাশ্মীর, হায়দ্রাবাদ। অধিকাংশ ছিল ছোট। এদের সঙ্গে বৃটিশের সম্পর্ক কেমন ছিল? এরা নিজের নিজের এলাকায় সৈন্য রাখতে পারতো। কিন্তু কারো বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারতো না, সেটা বৃটিশের এক্তিয়ার। এরা এমনকি নিজেদের টাকাপয়সাও তৈরী করতে পারতো। কিন্তু ইন্ডিয়ান মানি (বৃটিশ) চলতো সব জায়গায়। আভ্যন্তরীণ স্বশাসন, কিন্তু বাইরে বৃটিশের বিষয়, বাইরের পরিচয় তাদের কিছু ছিল না। 'ডকট্রীন অব প্যারামাউন্টসী' অনুযায়ী তোমরা রাজারা নিজেদের ব্যাপারটা দেখো। ইন্ডিয়ান ইন্ডিয়া বা নেটিভ স্টেট-এ গণতন্ত্র ছিল না, রাজত্ব ছিল খুবই খারাপ।
সর্বভারতীয় কংগ্রেস কিন্তু এই নেটিভ স্টেতগুলিকে একটুখানি ক্ষমার চোখে দেখতো। কেন? তারা মনে করতো এইগুলি কতগুলি দুর্গ। এদের তাতিয়ে রাখলে দরকারমতো এদের দিয়ে বৃটিশকে আঘাত করা যাবে। যতদিন গেল, তারা বুঝতে পারলো যে আসলে পরের লড়াইটা করতে হবে বৃটিশ গভর্মেন্টের সঙ্গে, আর এই করদ রাজ্যগুলিকে আনতে হবে ইন্ডিয়ার মধ্যে। আনতে গেলে দুটো বাধা- রাজা নিজে চাইবে না ইন্ডিয়ার মধ্যে আসতে। বৃটিশ গভর্মেন্ট যখন বলেছিল তখনও তারা রাজী হয়নি। দ্বিতীয় বাধা হল প্রজা- রাজতন্ত্রে যার কোনো ক্ষমতা নেই। ফলে রাজাকে ক্ষমতাচ্যূত করতে হবে। আর দায়িত্বশীল গণতান্ত্রিক সরকার গঠন করে তারপর ইন্ডিয়ার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
কংগ্রেস প্রথমে ছিল নিরপেক্ষ। পরে আস্তে আস্তে সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯২৭'এ 'অল ইন্ডিয়া স্টেটস পিপল্‌স কনফারেন্স' গঠন হল সব রাজ্যের মানুষকে নিয়ে। ১৯২৮'এ কংগ্রেস নেটিভ স্টেট বা করদ রাজ্যগুলির ব্যাপারে নির্দিষ্ট অবস্থান নিতে শুরু করে। ১৯৩৯'এ 'অল ইন্ডিয়া স্টেট্‌স পিপল্‌স কনফারেন্স'-এর প্রেসিডেন্ট হলেন জহরলাল নেহরু। তিনি ঘোষণা করলেন- আমাদের দুটো জিনিস করতে হবে। রাজাকে ক্ষমতাচ্যূত করে ভিতরে গণতন্ত্র আনতে হবে। আর নেটিভ স্টেটকে ইন্ডিয়ার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হতে হবে। আমরা 'ডকট্রীন অব প্যারামাউন্টসী' মানি না। হয় ইন্ডিয়ায় যেতে হবে, নয় পাকিস্তানে যেতে হবে। স্বাধীন থাকতে পারবে না।
১৯৪০ সালে নেহরু কাশ্মীরে যেন। কাস্মীরে যাওয়ার পর নেহরুর সঙ্গে শেখ আবদুল্লার একটা সমঝোতা হয়। তারপর থেকেই ন্যাশনাল কনফারেন্স 'নেহরু লাইন' ও কংগ্রেসের দ্বারা প্রভাবিত হয়। এইসব দেখে জম্মুর মুসলমান নেতা গোলাম আব্বাস ১৯৪১'এ আলাদা হয়ে 'মুসলিম কনফারেন্স' করেন। এই মুসলিম কনফারেন্সকে জিন্না সমর্থন দেন, আর ন্যাশনাল কনফারেন্সকে কংগ্রেসের তল্পিবাহক আখ্যা দেন। সেখ আবদুল্লার সঙ্গে জিন্নার সম্পর্ক খারাপ হয়।
ন্যাশনাল কনফারেন্স ১৯৪৪'এ 'নয়া কাশ্মীর' পরিকল্পনা তৈরী করে। এটা সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের ধাঁচে একটা কাশ্মিরী পরিকল্পনা। ১৯৪৬ সালে ন্যাশানাল কনফারেন্সের নেতৃত্বে শুরু হল 'কুইট কাশ্মীর' আন্দোলন। মহারাজা হরি সিং-কে বলা হল- তুমি এক কথায় তল্পিতল্পা নিয়ে কাশ্মির ছেড়ে চলে যাও। এই আন্দোলনটা কংগ্রেসী নেতারা খুব ভাল চোখে দেখেননি। কারণ কংগ্রেসী নেতারা কাশ্মীরের স্বায়ত্ত্বশাসন বা স্বশাসন চাইলেও হরি সিং-কে কাশ্মীর থেকে তাড়াতে চাননি। এই আন্দোলনেও কিন্তু কাশ্মীরে হিন্দু ও মুসলমানরা একসঙ্গে ছিল। তখন কাশ্মীরের জনসাধারণ শেখকে 'দেবতুল্য' বলে মানতো।
১৯৪৭'এ দেশভাগের সময় বৃটিশ গভর্নমেন্ট বলল কাশ্মীর ইত্যাদিরা স্বাধীন হয়ে যাবে। নেহরু এবং কংগ্রেস বলল- আমরা তা মানি না। আমরা মানি যে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছ থেকে বৃটিশ গভর্নমেন্ট যেমন নেটিভ স্টেটগুলির অধিকার পেয়েছে, আমরাও তেমনি সেগুলি ন্যায়সঙ্গত উত্তরাধিকার হিসাবে পাব। যারা পাকিস্তানে যাবে, তারা যেতে পারে। বাদবাকী স্টাটগুলি আসবে ইন্ডিয়ায়, সে তারা নিজেরা মানুক আর নাই মানুক।
এই সময় বল্লভভাই প্যাটেল একটা বিভাগ খুললেন- স্টেট ডিপার্টমেন্ট, আমেরিকার মতো। ঐ বিভাগে সেক্রেটারী হয়েছিলেন ভি.পি.মেনন। ঠিক হল প্রতিরক্ষা, বৈদেশিক বিষয়, যোগাযোগ- এই তিনটি বিষয়ে নেটিভ স্টেটগুলি 'ইন্সট্রুমেন্ট অ্যাকসেশন' -এর মাধ্যমে ১৫ই আগষ্টের মধ্যে ইন্ডিয়ার অন্তর্ভুক্ত হবে। সব রাজারা ১৫ই আগষ্টের আগে সই করল এই 'ইন্সট্রুমেন্ট অব অ্যাকসেশন'-এ। করল না কাশ্মীর, জুনাগড় এবং হায়দ্রাবাদ (তেলেঙ্গানা)।
কাশ্মীরের মহারাজ হরি সিং ঠিক করতে পারছিলেন না কি করবেন। যখন অক্টোবরে উপজাতি আক্রমণ শুরু হল, তারা মিউরিয়া বিদ্যুৎ কেন্দ্র পর্যন্ত এগিয়ে এল, তখন ভি.পি.মেনন শ্রীনগরে এসে মহারাজার সঙ্গে দেখা করলেন। দেখলেন মহারাজা পুরোপুরি ঘাবড়ে গেছেন। তিনি মহারাজাকে দ্রুত পরিবার ও মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে জম্মুতে চলে যেতে বললেন।
সেইসময় জম্মু ও কাশ্মীরে প্রধান মন্ত্রী মেহেরচাঁদ মহাজন দিল্লীতে এসে নেহরুর সঙ্গে দেখা করে বললেন, "সৈন্য পাঠান, কাশ্মীরকে ইন্ডিয়ার অন্তর্ভুক্ত করুন। আর জনসাধারণের দলকে যে ধরনের ক্ষমতা চান দিন। কিন্তু আজ সন্ধ্যার মধ্যেই সেনাবাহিনীর শ্রীনগরে যাওয়া দরকার। না হলে আমি জিন্নার কাছে যাব এবং তার সঙ্গে রফা করে শহরকে বাঁচাব। একথা শুনে প্রধানমন্ত্রী নেহরু উঠে দাঁড়ালেন, রেগে গিয়ে উনি আমাকে বেরিয়ে যেতে বললেন। যেই আমি বেরোনোর জন্য উঠে দাঁড়িয়েছি, একটা ঘটনা ঘটল- যেটাই কাশ্মীরকে পাকিস্তানের হাত থেকে রক্ষা করলো। প্রধানমন্ত্রীর বাড়িতে শেখ আবদুল্লা ছিলেন, তিনি আমাদের কথাবার্তা শুনছিলেন। পরিস্থিতি খারাপ বুঝে উনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটা ছোট্ট কাগজ পাঠান। প্রধানমন্ত্রী কাগজটা পড়লেন এবং বললেন- আপনি যা বলছেন সেটা আবদুল্লারও মত। আর তাঁর মনোভাব পুরো পালটে গেল।"
এভাবেই জম্মু ও কাশ্মীর ভারতের অন্তর্ভুক্ত হল।