Thursday, November 19, 2015

হুমায়ূন আহমেদ ও মার্কসবাদ ব্যাক্তিগত মূল্যায়ন

যে মনোজগতের অন্য একটা এলাকায় তিনি প্রবেশ করেছিলেন। যেটাকে আমরা বলি শ্রেণিচেতনা। হুমায়ূনের প্রায় লেখার মধ্যেই সর্বহারা জাতীয় একটা না একটা চরিত্র থাকবেই। হুমায়ূনকে যারা কাহিনির যাদুকর বলে তাক লাগাচ্ছেন। তাদের সাথে একমত হওয়া কঠিন। হুমায়ূনের এই সফলতার পেছনে আছে ভাষা। ডায়লগের ভেতর থেকে এন্টিডায়লগ তৈরির খেলা। দুইটা চরিত্র হুমায়ূনের প্রায় নভেল নাটকে যুদ্ধ করেছে সবসময়। ডায়লগ আরেএন্টিডায়লগ। মধ্যবিত্ত আর সর্বহারা। সামন্ত আর সর্বহারা। হুমায়ূনের কাহিনী এমন কোনো আহামরি কিছু না। হয়তো একটা জার্নি। রেলে, গাড়িতে, ভ্যানে ইত্যাদি। অথবা কোনো ভঙ্গুর জমিদার পরিবার। সামন্তীয় অহঙ্কার আর সর্বহারার অসহায়ত্ব। এই দ্বান্ধিক পদ্ধতিতেই এগিয়েছে তার কাহিনি আর সংলাপ। ‘তুই জানস, তোরে কইছে’ ‘শরবতের মইধ্যে একটা মরিচ ভাইঙ্গা দিমু’। হয়ত কোনো সামন্তীয় কুসংস্কারের বিরুদ্ধে অথবা শরবত দেবার আদেশের বিরুদ্ধে এই এন্টিডায়লগ তৈরি হয়েছে। কিন্ত সেই সর্বহারা চরিত্রগুলা শেষ পর্যন্ত এই এন্টিডায়ালগেই আবদ্ধ থেকেছে। এই এন্টিডায়লগ উৎপাদনের পরও সর্বহারা চরিত্রগুলা প্রদত্ত আদেশ পালন করেছে যেন কিছুই হয়নি সেরম ভাব নিয়া। কিন্তু এই যে আদেশের বিরুদ্ধে সাথে সাথে অ্যাকশন এটা একটা প্রস্তুতি।

আজ হুমায়ূন আহেমেদর জন্মিদন। তার ইন্তেকালের পর থেকে তাকে নিয়া হুদা-বেহুদা বহুত কথাবার্তা চালু হয়েছে। কোনো অতিবিজ্ঞাপিত মানুষ ইন্তেকাল করলে এইটা স্বাভাবিক। কেউ কেউ কাল্পনিক এশকের ঠেলায় তাকে বড়ছোট করতে জগতের সব লেখক, ভাবুকদের ভলিউম বাড়াচ্ছেন, কমাচ্ছেন। বাংলাদেশে বই পড়ে অথচ হুমায়ূন আহমেদ পড়ে নাই সেরম পাঠক নাই। পশ্চিমবঙ্গেও তার পাঠক আছে। তার শ’ শ’ উপন্যাসের অন্তত কয়েকটাতো পড়েছেই পাঠককুল। নিজেরাও পড়েছি একসময় দেদারছে। তার প্রথম উপন্যাসতো বলতে গেলে ফর্জ ছিল বাংলাদেশের পাঠকদের জন্য। যে কোনো নবীন পাঠক তার ফিকশন পড়ার ফিরিস্তি দেয়ার সময় নন্দিত নরকের কথা বলবেই। নিজেও বার কয়েক পড়েছি। মনোজগতের এই টানাপড়েন, দৈহিক জগতের অচেনা রন্দ্র পাঠের জগতে খানিকটা অচেনা লাগতো। পরে অবশ্য ফ্রয়েডকে মনে পড়ে গিয়েছিল। অয়দিউপাস কমপ্লেক্সিটির কথা মনে হয়েছিল।

খুবই স্বাভাবিকভাবে এরপর হুমায়ূন আহমেদ তার লেখার ভঙ্গি বদলেছিলেন। পরেও আরো অনেক উপন্যাস পড়েছি তার। বাসস্টেশন, রেলস্টেশনে, মফস্বলের পত্রিকার স্টল, থানাসদরে নোটবই বিক্রির দোকানে সবখানে তার অজস্র বই পাওয়া যায়। সে গুলো ৩ থেকে ৫ ফর্মার ভেতর ঘোরাফেরা করে। এরকমও ঘটেছে একদিনে দুইটাও শেষ করা গেছে। পরে তার নভেলে আর সেরম ইউরোপিয় দৈহিক মানসিক কমপ্লেক্সিটি, টেকনিক হিসাবে আসে নাই ফলে তিনি বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্তের ড্রয়িংরুমে সহজেই জায়গা দখল করেছিলেন।

তবে মনোজগতের অন্য একটা এলাকায় তিনি প্রবেশ করেছিলেন। যেটাকে আমরা বলি শ্রেণিচেতনা। হুমায়ূনের প্রায় লেখার মধ্যেই সর্বহারা জাতীয় একটা না একটা চরিত্র থাকবেই। হুমায়ূনকে যারা কাহিনির যাদুকর বলে তাক লাগাচ্ছেন। তাদের সাথে একমত হওয়া কঠিন। হুমায়ূনের এই সফলতার পেছনে আছে ভাষা। ডায়লগের ভেতর থেকে এন্টিডায়লগ তৈরির খেলা। দুইটা চরিত্র হুমায়ূনের প্রায় নভেল নাটকে যুদ্ধ করেছে সবসময়। মধ্যবিত্ত আর সর্বহারা। সামন্ত আর সর্বহারা। এইটা যে হুমায়ূন সচেতনভাবে করেছে তা নাও হতে পারে। কারণ সব কিছুর ভেতরই তো শ্রেনিদ্বন্ধ বহমান। হুমায়ূনের কাহিনি এমন কোনো আহামরি কিছু না। হয়তো একটা জার্নি। রেলে, গাড়িতে, ভ্যানে ইত্যাদি। অথবা কোনো ভঙ্গুর জমিদার পরিবার। সামন্তীয় অহঙ্কার আর সর্বহারার অসহায়ত্ব। এই দ্বান্ধিক পদ্ধতিতেই এগিয়েছে তার কাহিনি আর সংলাপ। ‘তুই জানস, তোরে কইছে’ ‘শরবতের মইধ্যে একটা মরিচ ভাইঙ্গা দিমু’। হয়ত কোনো সামন্তীয় কুসংস্কারের বিরুদ্ধে অথবা শরবত দেবার আদেশের বিরুদ্ধে এই এন্টিডায়লগ তৈরি হয়েছে। কিন্ত সেই সর্বহারা চরিত্রগুলা শেষ পর্যন্ত এই এন্টিডায়ালগেই আবদ্ধ থেকেছে। এই এন্টিডায়লগ উৎপাদনের পরও সর্বহারা চরিত্রগুলা প্রদত্ত আদেশ পালন করেছে যেন কিছুই হয়নি সেরম ভাব নিয়া। কিন্তু এই যে আদেশের বিরুদ্ধে সাথে সাথে অ্যাকশন এটা একটা প্রস্তুতি।

জানতে পারি নাই হুমায়ূন মার্কস পড়েছিলেন কিনা। কিন্তু তিনি মার্কসের সাহিত্য মানসের থেকে খুব দূরে ছিলেন না। হুমায়ূন না পড়া মার্কসবাদী অথবা মার্কস না পড়া হুমায়ূনিদের লগে আমি এই তর্ক করতে অনিচ্ছুক।

হুমায়ূন আহমেদকে মার্কসবাদী প্রমাণ করা আমার উদ্দেশ্য নয়। কারণ মার্কসবাদ আকাশ থেকে পড়ে না। জগতের প্রতিটি খণ্ড খণ্ড সমাজ রাষ্ট্র যেই দ্বান্ধিকতার ভেতর দিয়ে বিকশিত হয়েছে মার্কস সেটা আবিস্কার করার চেষ্টা করেছেন মাত্র।

হুমায়ূন সম্পর্কে বলতে গিয়ে তরুণ সাংবাদিক মাহবুব মোর্শেদ বলেন ‘অজনপ্রিয়তার সুযোগ নিয়ে ছোট লেখকরাও নিজেদের বড় লেখক বলার সুযোগ পাচ্ছেন তার একটা শক্ত প্রেক্ষাপট আছে। এই প্রেক্ষাপট রচিত হয়েছে, একটা ভুল ভিত্তির ওপর। এর মূল সুর মার্কসবাদী সাহিত্যতত্ত্বের সমাজ-বাস্তবতা, নিম্নবর্গ-প্রীতি, লড়াই-সংগ্রাম, নিম্নবর্গের পিঠচাপড়ানি। মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রা এ সাহিত্যে পরিত্যাজ্য। এলেও আসতে হবে নেতিবাচকভাবে’।

শ্রেণি না বুঝা একজন হাইব্রিড সাংবাদিকের স্বমস্তিস্কপ্রসূত বা প্রকল্পভিত্তিক এই তথ্য সন্দেহ নাই। তারও চেয়ে বড় কথা হচ্ছে এইটা ধান ভানতে শিবের গীতের মত লাগে। যেন তিনি ভুল ভিত্তি আর মূলভিত্তি চিহিৃত করবার ওহি পেয়েছেন। মার্কসবাদে মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রা পরিত্যাজ্য এমন কথা স্বয়ং কার্ল মার্কসও বলেন নাই। কারণ সমাজ বাস্তবতাকে বুঝার ক্ষেত্রে সাহিত্য অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ হিসাবে ধরা হয় মার্কসিয় সাহিত্যতত্ত্বে। মধ্যবিত্ত এমন একটা শ্রেণি যারা সমাজ পরিবর্তনের মূল কাঁচামাল না হলেও মূল পরিকল্পনাকারী। কারণ তারা থাকেন সর্বহারা আর সর্বপাওয়াদের মাঝখানে। দুইশ্রেণিরই লিয়াঁজো হিসাবে। কার্ল মার্কসও ছিলেন মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসা। জগতের অজস্র বিপ্লবী লেলিন, স্তালিন, মাও, কাস্ত্রো, চে, সিমন বলিভার, শাভেজ, চারু মজুমদার, সরুজ দত্ত প্রমূখ মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসা। মধ্যবিত্তের চরিত্রটাই হচ্ছে টলটলায়মান। মধ্যবিত্তের কাজই হচ্ছে উচ্চবিত্তের শোষণের সহযোগিতা। এছাড়া সে বাঁচতে পারে না। কিন্তু তার একটা অংশ সবসময় অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেয়ার সাথে সাথে সর্বহারায় পরিণত হয়। আর একটা অংশ ক্রমাগত উপরের দিকে ধাবমান।

ফলে দুইদিকটাই তার অভিজ্ঞতার আওতাভুক্ত হওয়ার কারণে তার চেতনার এলাকা প্লাবিত হয় সবার আগে। এই টলটলায়মান জীবন সর্বহারাদের চেয়েও মারাত্মক। তাই অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরিবর্তনের তত্ত্বগত অস্থিরতা মধ্যবিত্ত সমাজেই দেখা দেয় সর্বাগ্রে। জগতের অধিকাংশ সাহিত্যই মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তরাই উৎপাদন করে।

১৯৫১ সালে মার্কিন প্রশাসন ‘পূর্ব বাংলায় কমিউনিস্ট রুখতে একটি সমন্বিত কর্মসূচি’ নামে একটি প্রকল্প খাড়া করেছিলেন। সম্প্রতি আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্ট তাদের পুরানা গোপন নথিপত্র, যা এত দিন সিক্রেট বা ক্লাসিফায়েড বলে বাক্সবন্দী হয়ে পড়েছিল, তা খুলে দিয়েছে। ফলে এই নথিটি আমাদের সামনে উন্মোচিত হয়েছে। (http;//www.icdc.com/paulwolf/Pakistan/pakindiawars.htm#bangladesh)এই প্রকল্পে কমিউনিস্টকে ভুল প্রতিপন্ন করতে অনেকগুলা উদ্যোগ নেয়া হয়, বিভিন্ন সেক্টরে। এর একটা পয়েন্ট ছিল এরকম:
যেসব তথ্যমাধ্যম ব্যবহৃত হবে: সংবাদপত্র, রেডিও, চলচ্চিত্র, প্রকাশনা (বই ও পুস্তিকা), গ্রাফিক আর্টস। (আমি পুরা রিপোর্টটা পাঠকদের পড়তে অনুরোধ করবো। কারণ আমাদের চিন্তা জগতে এই প্রকল্পটার মারাত্মক প্রভাব এখনো নিরন্তর প্রবাহমান)
এই জিনিস খুব সফলতার সাথে সেই ৫১ সাল থেকে ক্রমে ক্রমে এই দেশটির সাংস্কৃতিক আবহে এমনভাবে মিশে গেছে যে নিজেরাই আমরা এখন সেসব এজেন্ডা সামনে নিয়া আসছি। আমাদের এই সাংবাদিকটিও এর ব্যতিক্রম নয়। তিনি হয়তো এই প্রকল্পের অংশ নয়তো তার নিজের অজান্তে তিনি সংক্রামিত।
তিনি বাজার ব্যবস্থার কথা বলেন। সব সাহিত্যকেই বাজারি সাহিত্য বলে তকমা মারেন। তাইলে বলতে পারি পত্রিকা আর ম্যাগাজিনের আড়ালে সবচাইতে বেশি বাজারজাত হয় পর্ণ ম্যাগাজিন। লেখকদের কি উচিত নয়, সাহিত্য-ফাহিত্য ছেড়ে পর্ণসাহিত্য করা? বাজারের উদ্দেশ্য বা লক্ষ্যতো তাই যেখানে লাভ সেখানে বিনিয়োগ। যেমন হলিউডি সিনেমায় পর্ণসিনেমায় বিনিয়োগ জেনারেল সিনেমায় বিনিয়োগের চাইতে কম নয়।

বাজার ব্যবস্থা ও পণ্যের জনপ্রিয়তা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘জনপ্রিয়তা সম্পর্কে যে ভুল ধারণা আমাদের সমাজে আছে তা বাজার সম্পর্কে ভুল ধারণা থেকে জন্ম নেওয়া। বাজারি কথাটার মতো আরেকটি কথা শস্তা জনপ্রিয়তা। বস্তুত, জনপ্রিয়তাই মূল্যবান। যা লোকে কষ্টে উপার্জিত টাকা দিয়ে স্বেচ্ছায় কিনছে নিশ্চিতভাবেই সেটি তার অবশ্যপ্রয়োজনীয় বস্তুর তালিকায় আছে।’

সাংবাদিকদেরও অর্থনীতি পড়ার প্রয়োজন আছে। না হলে এরকম গায়ের জোরে সবকিছুকে ভুল প্রতিপন্ন করতে থাকবেন। এই ঢাকা শহরের কথাই বলি প্রতিদিন সকালে অফিসের বা কাজের উদ্দেশে বেরুনো এক লোক ডানে বামে সামনে পিছনে চলমান বাসের ভেতরে বাইরে অথবা রাস্তার ধারে, ফুটওভার ব্রিজে অথবা সংবাদপত্রে অথবা বাসায় চলতে থাকা টেলিভিশনের বিভিন্ন চ্যানেলে নিরন্তর যেই জিনিসটার মুখোমুখি হয় তার নাম বিজ্ঞাপন। ‘জনপ্রিয়তা’ বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে বানিয়ে তোলা ব্যাপার। পাঠকপ্রিয়তা আর জনপ্রিয়তা একই বস্তু নয়। কোম্পানির অজস্র বিজ্ঞাপন নিজের অজান্তে ভোক্তার সম্মতি উৎপাদন করে। বাণিজ্য খানিকটা দানবীয় ভাবে নিজের পণ্য বিজ্ঞাপিত করে জনপ্রিয় করে তোলে। এছাড়াও আরো নানান কৌশলে একেকটা পণ্যকে জনপ্রিয় করা তোলা হয়। যে বস্তু দিয়া সবচাইতে বেশি পণ্যকে জনপ্রিয় করে তোলা যায় তা হচ্ছে যৌনতা।

তিনি আরো বলেন ‘এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। আপনি আমাকে এমন কোনো লেখকের নাম বলতে পারবেন যার লেখা মানহীন, বিষয়বস্তু শস্তা অথচ জনপ্রিয়তা পেয়েছেন?

এই প্রশ্নের উত্তর দিতে বিশ্বসাহিত্যের দরবারে যাওয়া লাগেনা। দেশেই ইমদাদুল হক মিলন, কাসেম বিন আবুবকর, আব্দুস সালাম মিতুল, প্রণব ভট্ট, আনিসুল হক, সুমন্ত আসলামের মত লেখকরা জনপ্রিয় কি কারণে। এদের বইগুলার ভেতর কি আছে? রাজনৈতিক কারণেই বাংলাদেশের সাহিত্য জগতও দুই পার্টিতত্ত্বে ভাগ হয়ে গেছে। এখানে বাজারটা খানিকটা এভাবেও তৈরি হয়েছে। আওয়ামী ও বাম ঘরানার লেখক আর বিএনপি বা জামাত ঘরানার লেখক। নির্মলেন্দু গুণ, বা আল মাহমুদতো পার্টিতত্ত্বের কারণে জনপ্রিয়, স্বাভাবিক জনপ্রিয়তার সাথে সেটা যুক্ত হয়েছে । স্ব স্ব পার্টির কাছে তারা মহীরুহ।  অল্পসংখ্যক কবিতা ছাড়া তাদের লেখার মধ্যে কি আছে? হরেম রকমের নারী সঙ্গমের বাসনা, দালালি মার্কা শস্তা কবিতা বাদ দিলে কী থাকে? আল মাহমুদের কবিতাগুলা বাদ দিলে শস্তা যৌন শুড়শুড়ি মার্কা গদ্যগুলো আর জামাত মার্কা স্মৃতিকথাগুলা কি পড়া যায়? তিনি নাকি মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন। কোথায়, কলকাতায়? লক্ষ লক্ষ নিহত মুক্তিযোদ্ধাদের রক্তের সাথে বেঈমানী করেছেন তিনি। তিনি এখন ঘাতকদের কবি। আওয়ামীলীগ বিরোধীতা আর মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতা এক জিনিস নয়। দেশের তথাকথিত লেখকরা কোনো না কোনো এজেন্ডা নিয়া জনপ্রিয় হচ্ছে। এটার সাথে জড়িত রাজনৈতিক অর্থনীতি।

তিনি বলেন, ‘অপরের উপকার করার মিশনারি চিন্তা, পেটিবুর্জোয়া পাপবোধ সর্বোপরি পলায়নপরতা আমাদের সাহিত্যকে জীবনের স্পর্শবিহীন, দিশাহীন এক জায়গায় নিয়ে গেছে। বিগত ষাট বছরে আমাদের সাহিত্য মহাকালজয়ী লেখকদের হাতে কী ঘোড়ার আন্ডা প্রসব করেছে তা আমরা সবাই জানি।’

না আমরা জানি না। এরকম স্ববিরোধী কথার সাথেও একমত নই। অপরের উপকার কি রূপে পলায়নপরতা হয় বুঝি না। আর উপকার পাওয়া ছাড়া কোনো সাহিত্য কালজয়ী হয়েছে কিনা সেটাও আমার জানা নাই। পাঠকের জানা থাকলে বলবেন। তলস্তয়ের পুণরুজ্জীবন সম্পর্কে বলা হয় পাঠের আগের পাঠক আর পরের পাঠক এক থাকতে পারে না। আন্না কারেনিনাও তাই। জোলার নানা, সয়েলকে কি উপকারী সাহিত্য বলবনা? গোর্কির মাকে? শালোকভের প্রশান্ত দন? অস্ত্রভস্কির ইস্পাত? গোগলের তারাস বুলবা? বালজাকের হিউমেন কমেদিয়া? মার্কেজের শতবছরের নিসঙ্গতা? দস্তইয়েভস্কির কারামাজভ ভাইগণ, অপরাধ ও শাস্তি, অভাজন, ইডিয়ট কি এমনি এমনি পাঠকপ্রিয় হয়েছে? লাতিন আমেরিকার প্রতিরোধী সাহিত্য সমূহ হুয়ান রুলফো, আলেহা কার্পেন্তিয়ার, য়োসা, কার্লোস ফুয়েন্তেস, মারিয়ানো আসোয়েলা, ম্যানুয়েল পুইগ, আন্তনিও স্কারমেত্তা, সের্হিও রেমিরেসের সাহিত্য কি উপকারী সাহিত্য নয়? আফ্রিকার আচিবি, ওসমান সেমবেন, নগুগি ওয়া থিয়াঙ্গো, তালাল আসাদ, তায়িব সালেহ, ওলে সোয়িঙ্কা, লিওপোল্ড সেদর সেঙ্গর, ফ্রাঞ্চ ফানোনের সাহিত্য কি উপকারী সাহিত্য নয়? প্রবন্ধ ও দর্শনের বইগুলার কথা না হয় বাদই দিলাম। তিনি কি ভাবছেন সাহিত্য বড় বড় দালান করিয়ে দিয়ে দেখাবে, দাতব্য প্রতিষ্টান করে দেখাবে? সাহিত্য কীভাবে কাজ করে তা কি তিনি কল্পনা করতেও অক্ষম!

ষাট বছরের পরিসংখ্যান চেয়েছেন তিনি, ভাবছি পাকিস্তান আমল থেকেই জানতে চাচ্ছেন, জসিম উদ্দীন, আব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদ, কাজী আব্দুল ওদুদ, মোহাম্মদ বরকতুল্লাহ, সিকান্দার আবুজাফর, আব্দুল গণি হাজারী, আবুল কালাম শামসুদ্দীন, মুহাম্মদ এনামুল হক, মোতাহের হোসেন চৌধুরী, আব্দুল হক, আবুল ফজল, আহমদ ছফা, শওকত ওসমান, হাসান আজিজুল হক, সত্যেন সেন, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, মাহমুদুল হক, শওকত আলী, আবু ইসহাক, যতীন সরকার, আবুল মনসুর আহমদ, রেহমান সোবহান, আনিসুজ্জামান, বদরুদ্দীন উমর, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, ফরহাদ মজহার, সৈয়দ শামসুল হক, হুমায়ুন আজাদ, সলিমুল্লাহ খান এদের লেখা কি ঘোড়ার আন্ডা? এদের লেখাকি প্রভূত উপকার করে নাই দেশিয় জনগণের মানস গঠনে? ষাট বছরে আর কত ‘ঘোড়ার আন্ডা’ চান তিনি!

অতিরিক্ত শস্তা জনপ্রিয় সাহিত্য পাঠ মনে হয় তাকে দিশাহীন করে তুলেছে ‘আমাদের’ করে নাই। তিনি নিজের কথা ‘আমাদের’ বলে চালিয়ে দেবার খায়েস করছেন।

তিনি বলেন, ‘তিনি (হুমায়ূন) ছাড়া বাকী জনপ্রিয়রা কিন্তু বিক্রিতে ৫ হাজারের কাতারে। আর সিরিয়াসরা এক হাজারের ওপরে উঠতে পারেন না।’

তাকে কে দিয়েছে এই পরিসংখ্যান? আবার বলছেন, ‘আমাদের জনপ্রিয় সাহিত্যিকের বই যেখানে ৫ হাজার বিক্রি হয়। সেখানে পশ্চিমবঙ্গে প্রবন্ধের বই বিক্রি হয় ৫ হাজার।’

এ দ্বারা কি প্রমাণ করতে চান তিনি! ইংরাজ আমলের রাজনৈতিক কারণেইতো পশ্চিমবঙ্গ কমপক্ষে ৫০ বছর আগানো। এইটা খুবই স্বাভাবিক বিষয়। আর তা ছাড়া পশ্চিমবঙ্গে বাংলা বইপড়া ক্রমশ কমছে। পশ্চিমবঙ্গে লেখক বেশি আর পাঠক বেশি বাংলাদেশে। এক জনপ্রিয় সাহিত্যিকের বসার ঘরে দেখেছিলাম সিংহভাগ ইংরাজি বইয়ে ঠাসা তার বইয়ের সেল্ফ। জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, পশ্চিমবঙ্গের লেখকরাতো বাংলাবই খুব বেশি পড়ে না। তারা বাংলায় লেখে, তাদের বাজার পূর্ববঙ্গ তথা বাংলাদেশ। পশ্চিমবঙ্গে অধিকাংশ মধ্যবিত্তরা ঘরে ইংরাজি পত্রিকা পড়ে। নিম্নবিত্ত কথা বলা শুরু করেছে হিন্দিতে। সেখানে তার এই পরিসংখ্যান মনগড়া মনে হয়। আর প্রবন্ধ কি সাহিত্যের বাইরে, প্রাবন্ধিকদেরকেও কি সাহিত্যিক বলব না?

বাংলাদেশের অধিকাংশ পত্রপত্রিকার মালিকানা সম্প্রতি শোষক বুর্জোয়াদের হস্তগত হয়েছে। কোন একটা বিষয় পেলেই সেটা নিয়ে কমপক্ষে একসপ্তাহ যাবত চটকিয়ে পত্রিকার পসার বাড়ানোর কালচার তৈরি হয়েছে। যে কোনো বিষয় পেলেই পত্রিকাপালিত বেতনভুক্ত বুদ্ধিজীবীরা হাজার শব্দে উগরে দিচ্ছে তাদের হাইব্রিড জার্নালিজম। আর কিছু লেখা পত্রিকার মালিকরা নিজেদের শ্রেণি স্বার্থে উৎপাদন করায়। সাংবাদিক মাহবুবের লেখাগুলাও এর ব্যতিক্রম মনে হয় ন 

Sunday, November 15, 2015

‍ ‍"আপনার প্রোফাইলের ছবিতে ফ্রান্সের পতাকা " আপনি কতটা মানবিক ??

‍ ‍"আপনার প্রোফাইলের ছবিতে ফ্রান্সের পতাকা " আপনি কতটা মানবিক ??
অনেকেই জানেনা গতকাল লেবাননে আইসিস ৪৭ জনকে মেরেছে, প্রায় ২০০ আহত হয়েছে। প্যালেস্টাইনে কত হাজার নিরস্র মানুষ মরলো। গতবছর সিরিয়াতে ৪ লক্ষ নিরীহ মানুষ জীবন হারিয়েছে। ৫ বছর আগে ইরাকে ১৫ লক্ষ সাধারণ মানুষ নিহত হয়েছে। লিবিয়া ইয়েমেনের কথা নাই বললাম। পাকিস্তান, আফগানিস্থানে সন্ত্রাস বন্ধ করতে গিয়ে বিয়ের অনুষ্ঠানে পর্যন্ত্ বোমা মারা হচ্ছে ড্রোন দিয়ে প্রতিদিন। মসজিদে নামাজ পড়তে যেয়ে সেজদাতে মাথা উড়ে যাচ্ছে বোমায়। গোহত্যার অভিযোগে মানব হত্যা হচ্ছে পিটিয়ে। নিরীহ বিদেশী খুন হচ্ছে বাংলাদেশে পরিকল্পিতভাবে, তার জন্যে বাংলাদেশ সফর অযোগ্য হয়ে আছে। যেকোনো কারণে নিরীহ মানুষ হত্যা করার অপরাধ ক্ষমাহীন, নিকৃষ্টতম অন্যায়।
এতদিন পর পৃথিবীর সবাই তা বুঝতে পেরেছে। এখন প্রেসিডেন্ট ওবামা তার বক্তৃতায় দুটি কথা বলেছেন, প্রথম কথা,- এই আক্রমন শুধু প্যারিসের ওপর নয়, এটি হচ্ছে সমগ্র মানবিকতার ওপর আক্রমন। তার দ্বিতীয় কথা,-- প্রেসিডেন্ট বুশের ইরাক আক্রমনের কারণে আইসিস তৈরী হয়েছে, এই কথার অর্থ যেটা তিনি বক্তৃতায় বলেন নাই, সেটা হলো-- ফ্রেঞ্চরা আমাদের স্ট্যাচু অব লিবার্টি উপহার দিয়েছিলো, আমেরিকা আপনাদের আইসিস উপহার দিলো।
তিনি আরো বলেছেন ৬০টি দেশের কোয়ালিশন আইসিস হটাবে পৃথিবী থেকে। প্রসঙ্গিক জানতে ইচ্ছে হচ্ছে, কি মাল বানাইলেন যা ধংশ করতে এতগুলি দেশের শক্তি একত্র করা লাগে, রাশান বোমাগুলি পড়ল কই তাহলে ? নাকি নতুন কোনো কঠিন ষড়যন্ত্র, নতুন কোনো আগ্রাসন দেখতে হবে আবার, খুব টেনশনে আছি।
আজ পৃথিবীর সবাই কাদছে, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট থেকে ফেসবুক প্রেসিডেন্ট সবার চোখে পানি। সবার প্রফাইল ফিল্টারড। আমরাও কাদছি তাদের সাথে একাত্ম হয়ে। শুধু মনে করিয়ে দিচ্ছি, গরিব নিরীহ অসহায় সাধারণ মানুষগুলি নিহত হওয়ার পেছনে হয় থাকে এই অতি উন্নত বিশ্বের হাই প্রফাইল মরনাস্র আর তাদের প্রযুক্তি, না হয় তাদের অতি মেধাবী পরিকল্পনা। প্যারিসের এই দুঃখজনক ঘটনায় সেরকম কিছু বের হলে পাগল হয়ে যাবো মনে হয়।
কেউই তো ১০০ বছরের বেশি বাচবেননা। খাবেন তিন বেলাই, কত পদ দরকার ? যত দামী খানা খাইনা কেন, পরের দিন সকালে সবার বর্জ্য একই রকম, কয়টা কাপড় পরা যায় একত্রে ? ঘুমাতে কয়টা বেডরুম লাগে ? আরো কত উন্নত হওয়া দরকার আপনাদের ?
আমাদেরকেও বাচতে দিন পৃথিবীর এক কোনায়। জোর করে এই পৃথিবীতে আমরা আসিনি। আসুন সবাই মিলে শান্তির পৃথিবীর একটা ফ্লাগ বানাই। সবার কান্না প্যারিসের কান্নার সাথে মিলে হোক নবজাতক শান্তির কান্না। এই অনুভুতি কি শুধু প্রফাইলে ফ্লাগ ফিল্টার করে বোঝানো যায় ?

Sunday, November 1, 2015

এক অদ্ভুত বিপন্ন সময়

পাখি একটা নীড় থাকার কথা্ যেখানে শান্তি স্বাধীনতা থাকবে অথচ সে ভয়ে ফুলে আশ্রয় নেয়। ফুল সুন্দর কিন্তু নিরাপদ নয়, স্থায়ীতো নয়।
এক অদ্ভুত বিপন্ন এ এক অদ্ভুত, বিষণ্ন সময়। চারদিকে অসহায়ত্ব, অস্থিরতা, উদ্বেগ ও আতঙ্ক। এ এমন এক সময় যখন পিতা তার সন্তানের হত্যার বিচার চান না। একের পর এক দুর্ঘটনায় বাকরুদ্ধ, স্তব্ধ মানুষ। গোরস্তানমুখী এ মিছিল কোথায় নিয়ে যাবে এ জাতিকে- সে প্রশ্ন এখন উচ্চকিত। ষড়যন্ত্র তত্ত্ব আর রাজনীতির খেলা বাংলাদেশকে এক বিপর্যয়ের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। অনেকেরই আশঙ্কা, সামনে আরও ঝড় আসছে।

তিন মাসের অবরোধ-পেট্রল সন্ত্রাসের পর প্রায় ছয় মাস ভালোই চলছিল দেশ। গণতন্ত্রের সংকট যদিও ছিল। নতুন একটি নির্বাচন নিয়েও রাজনীতির অন্দরমহলে আলোচনা চলছিল। কিন্তু গত ২৮শে সেপ্টেম্বর হঠাৎ এক নতুন বিপদের মুখে পড়ে বাংলাদেশ। যখন রাজধানীর কূটনৈতিক পাড়ায় হত্যাকাণ্ডের শিকার হন ইতালীয় নাগরিক সিজার তাভেলা। জঙ্গি সংগঠন আইএস ওই হত্যার দায় স্বীকার করলেও বাংলাদেশ সরকার ওই দাবি নাকচ করে দেয়। তবে এখন জানা যাচ্ছে, ফাইভ আইজ নামে পাঁচটি দেশের গোয়েন্দা জোট সেপ্টেম্বরে তথ্য পেয়েছিল বাংলাদেশে বিদেশীদের ওপর হামলা হতে পারে। ‘ফাইভ আইজ’ জোটের দেশগুলো হলো- অস্ট্রেলিয়া, বৃটেন, কানাডা, নিউজিল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্র। এর পরই অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দলের বাংলাদেশ সফর স্থগিত হয়। কয়েকটি দেশ বাংলাদেশ সফরের ব্যাপারে সতর্কতা জারি করে। নিউ ইয়র্ক টাইমস বলছে, মার্কিন কর্মকর্তারা সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিল, ইসলামিক স্টেটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সন্ত্রাসীরা বাংলাদেশের ভূখণ্ডে তৎপরতা বৃদ্ধি করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এরপর ২৮শে সেপ্টেম্বর থেকে ১লা নভেম্বর। এ সময় সিজার তাভেলার পর খুন হয়েছেন জাপানের নাগরিক কুনিও হোশি। ঢাকায় ছুরিকাঘাতে নিহত হয়েছেন এক পুলিশ কর্মকর্তা। শিয়া সম্প্রদায়ের তাজিয়া মিছিলের প্রস্তুতি সভায় হামলা হয়েছে। এতে এ পর্যন্ত দুজন নিহত হয়েছেন। সর্বশেষ শনিবার ঢাকায় দুটি প্রকাশনা দপ্তরে হামলা হয়েছে। নিহত হয়েছেন এক প্রকাশক। আনসার আল ইসলাম (আল-কায়েদার ভারত উপমহাদেশ শাখা) এ হামলার দায় স্বীকার করেছে। ক্ষমতাসীনরা অবশ্য এখনও এসবকে বিচ্ছিন্ন ঘটনাই মনে করছেন। যদিও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু তার নিজের ওপরও হামলার আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন।

একের পর এক অঘটন বাংলাদেশের অর্থনীতিকেও চাপে ফেলছে। পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি হতে শুরু করলেও প্রকাশক হত্যা পুরো বিষয়টিকে আবার নাজুক করে ফেলছে। দেশী-বিদেশী সবার মধ্যেই বিরাজ করছে নিরাপত্তাহীনতা। সরকারের অনুরোধ সত্ত্বেও পশ্চিমা কোন দেশই এখনও সতর্কতা প্রত্যাহার করেনি। যদিও কিছু কিছু সংবাদ খাওয়ানোর চেষ্টা হয়েছে। পশ্চিমা কূটনীতিকদের কেউ কেউ বিশ্বাস করেন বাংলাদেশে কোন না কোন মাত্রায় আইএসের কার্যক্রম রয়েছে। খুব সহসাই বর্তমান পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে বলে তারা মনে করেন না।

চলমান পরিস্থিতিতে সংকটের গোড়ার দিকেও অনেকে দৃষ্টিপাত করেছেন। বিস্ময়কর হলেও সত্য, ফয়সাল আরেফিন দীপনের বাবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক এ বিপর্যয়ের মধ্যেও শুভবুদ্ধির উদয়ের আশা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমি কোন বিচার চাই না। আমি চাই শুভবুদ্ধির উদয় হোক। যারা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ নিয়ে রাজনীতি করছেন, যারা রাষ্ট্রধর্ম নিয়ে রাজনীতি করছেন উভয় পক্ষ দেশের সর্বনাশ করছেন। উভয় পক্ষের শুভবুদ্ধির উদয় হোক। এটুকুই আমার কামনা। জেল-ফাঁসি দিয়ে কী হবে।’ এ বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় বুদ্ধিজীবী ও চিন্তক ফরহাদ মজহার এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, অবিশ্বাস্য শোক মাথায় নিয়ে আবুল কাসেম ফজলুল হক এ কথাটা স্পষ্টভাবে বলতে পেরেছেন। আমরা দেশকে বিভক্ত করে দিয়েছি। আমরা দুই পক্ষেই আমাদের সন্তানদের হারাতে থাকবো। আমরা কাঁদতে ভুলে যাবো। নিজ নিজ সন্তানের লাশ কাঁধে নিয়ে গোরস্তানের দিকে যাবো, আর সন্তানের রক্তে আমাদের শরীর ভিজে যাবে। কে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী সেকুলার মুক্তবুদ্ধিওয়ালা আর কে ধর্মান্ধ বা ইসলামী জঙ্গি গোরস্তান তার বিচার করে না। শুধু কবরের ওপর ঘাস গজায়, আর একদা ঐতিহাসিকরা গবেষণা করতে বসে কীভাবে একটি জাতি তাদের বেয়াকুবির জন্য ধ্বংস হয়ে গেল। যেহেতু আমরা মৃত্যু নিয়ে ভাবতে অভ্যস্ত নই, তাই জীবনের কোন মূল্য আমরা দিতে জানি না। আমি দেখছি, বিভক্ত ও দ্বিখণ্ডিত বাংলাদেশে দুই দিক থেকে দুটো মিছিল গোরস্তানের দিকে যাচ্ছে। দীপন, আমি প্রাণপণ এ বিভক্তি ঠেকাতে চেষ্টা করেছি। এ ভয়াবহ বিভাজনের পরিণতি সম্পর্কে আমি জানপরান সবাইকে হুঁশিয়ার করার চেষ্টা করেছি। চেষ্টা করে যাবো। কিন্তু তাতে কি যারা চলে গেছে ফিরে আসবে? কেউই প্রত্যাবর্তন করে না। এ লাশের ভার অনেক ভারি, বাংলাদেশ বহন করতে পারবে কি? সেই দূরদর্শিতা ও বিচক্ষণতার চর্চা আমরা করি না, যা আমাদের গোরস্তানের দিকে নয়, সপ্রতিভ জীবনের দিকে নিয়ে যায়। কে জাগে?

যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক আলী রীয়াজ লিখেছেন, কে কার কাছে কিসের প্রতিবাদ করবে? কে কার কাছে কিসের বিচার চাইবে? কে চিহ্নিত করবে আততায়ীকে? রক্তের এই স্রোত ও মৃত্যুর এই ধারা দেশকে কোথায় নিয়ে যাবে? কতটা অন্ধকার নামলে আমরা বুঝবো যে আলো নেই।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ লিখেছেন, ‘বর্তমান সরকারের ক্ষমতায় থাকার যৌক্তিকতা হিসেবে বক্তব্য সমাজে ব্যাপকভাবে প্রচারিত- তা হলো যদি এ সরকার ক্ষমতায় না থাকে দেশ জঙ্গি সন্ত্রাসীরা দখল করে নেবে, সাম্প্রদায়িকতা বাড়বে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী তৎপরতা বাড়বে। এ যুক্তিতে সরকার গণতান্ত্রিক অধিকারের অনেক কিছু নিশ্চিন্তে সংকুচিত করেছে, অনেক লেখক, শিল্পী ও বুদ্ধিজীবী বহু গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতেও মুখ বন্ধ রেখেছেন পাছে এই সরকারের ক্ষতি হয়। একের পর এক যখন সন্ত্রাসী হুমকি, হামলা, লেখক-প্রকাশক খুন, সাম্প্রদায়িক আক্রমণ, ধর্মান্ধতা, জাতিগত ধর্মীয় বিদ্বেষ, দখল-লুণ্ঠন ও জাতীয় স্বার্থবিরোধী তৎপরতা বেড়েই যাচ্ছে, তখন কি এ প্রশ্ন করতে পারি দেশে এখন কোন সরকার ক্ষমতায় আছে?’

সরকারি ভাষ্য বিচ্ছিন্ন ঘটনা। তবে একের পর এক হামলা, হত্যায় আতঙ্ক ক্রমেই বাড়ছে। অনিশ্চয়তার এক গভীর গর্তে পড়েছে বাংলাদেশ। আতঙ্কের জনপদে কবে ফিরবে স্বাভাবিক জীবন, কেউ জানেন না।