Wednesday, October 21, 2015

পুরোটাই ভারতের লাভ

চারদেশীয় সড়ক যোগাযোগ কার্যতঃ ‘অন্ধকে হাতি দেখানোর’ নামান্তর। আন্তঃদেশীয় এ যোগাযোগের মাধ্যমে বাংলাদেশের ঝুলিতে নতুন কিছুই জুটছে না। বরং চার দেশীয় যোগাযোগের নামে ভারতকে ট্রানজিট দেয়া নিশ্চিত করা হয়েছে। ভারতকে ট্রানজিট দেয়া ইস্যুতে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষ প্রতিবাদী হওয়ায় সুকৌশলে চার দেশীয় সড়ক যোগাযোগ প্রসঙ্গ সামনে আনা হয়েছে। এ চুক্তি কার্যকর হলে বাংলাদেশের লাভের খাতা শূন্যই থাকবে। আর লাভের পুরোটাই ভারত ঘরে তুলবে- এমনটাই মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। 

চারদেশীয় সড়ক যোগাযোগের মোড়কে ভারতীয় যান চলাচল নিশ্চিত করতে বাংলাদেশকে ব্যয় করতে হবে ৪০ হাজার কোটি থেকে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। নামে ‘চারদেশীয় কানেকটিভিটি’ বা বিবিআইএন (বাংলাদেশ, ভুটান, ইন্ডিয়া ও নেপাল) বলা হলেও থিম্পুতে স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী ভারতের মাত্র তিনটি শহরেই সীমাবদ্ধ থাকছে বাংলাদেশের যানবাহন চলাচল। অপরদিকে ভারত বাংলাদেশের ভূখ-ের একপ্রান্ত থেকে অপরপ্রান্ত ব্যবহার করতে পারবে। চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের দুই সমুদ্রবন্দর ব্যবহারের সুবিধা পাচ্ছে ভারত। এদিকে বাংলাদেশের উপর দিয়ে চলাচলকারী যানবাহনের জন্য প্রস্তাবিত শুল্কের ৭৬ শতাংশ কমানোর প্রস্তাব করেছে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রণালয়। 

বিবিআইএন অনুযায়ী, রুট চূড়ান্ত করা হলেও শুল্ক নিয়ে এখনো চূড়ান্ত কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেনি বাংলাদেশ। তবে শুল্কের বিষয়টি চূড়ান্ত হওয়ার আগেই আগামী জানুয়ারী থেকে চার দেশের মধ্যে যান চলাচল শুরুর ঘোষণা দিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। সড়ক পথে বাংলাদেশের উপর দিয়ে প্রতিটন পণ্য পরিবহনের জন্য কিলোমিটারপ্রতি ৪ টাকা ২৫ পয়সা চার্জ আদায়ের প্রস্তাব করেছে ট্রানজিট বিষয়ক কোর কমিটি। কিন্তু কোর কমিটির প্রস্তাব উপেক্ষা করে তা ১ টাকা ২ পয়সা নির্ধারণ করে প্রস্তাব দিয়েছে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রণালয়। তবে মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবে আপত্তি তুলে পুনরায় প্রস্তাব দিতে বলেছে ট্রানজিট ফি নির্ধারণ-সংক্রান্ত যৌথ কারিগরি কমিটি (জেটিসি)। গত ১৬ সেপ্টেম্বর জেটিসির বৈঠকে এ প্রস্তাব করা হয়। বিষয়টি কবে চূড়ান্ত করা হবে তা এখনো নিশ্চিত নয়।এ বিষয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গণমাধ্যমকে বলেন, বিবিআইএন একটি স্বপ্ন, যা সত্য হতে চলেছে। এ ধরনের চুক্তি সাধারণতঃ কাগজেই থাকে, বাস্তবায়ন হয় না। তবে চার দেশের রাজনৈতিক সদিচ্ছায় আগামী জানুয়ারিতেই বিবিআইএনের আওতায় চার দেশের মধ্যে যান চলাচল শুরু হবে।জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমান বলেন, ট্রানজিট, ট্রান্সশিপমেন্ট বা কানেকটিভিটি- আমরা যে নামেই বাংলাদেশ-ভারত আন্তঃরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে চিহ্নিত করি না কেন, মূল বিষয় হচ্ছে একটি- এই মুহূর্তে ভারতের এক অঞ্চলের সঙ্গে অন্য অঞ্চলের যোগাযোগ স্থাপন। আর এক্ষেত্রে ব্যবহার করা হচ্ছে বাংলাদেশের ভূখ-। এতে একতরফাভাবে ভারতই লাভবান হচ্ছে। বিশ্বের অন্য অঞ্চলের কানেকটিভিটি ঠিক এমনটি নয়। গত ৬ ও ৭ জুন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরের পর ১৫ জুন ভুটানের রাজধানী থিম্পুতে ‘বিবিআইএন’ (বাংলাদেশ, ভুটান, ইন্ডিয়া ও নেপাল) চুক্তি স্বাক্ষর হয়। 

চুক্তি অনুযায়ী গত সেপ্টেম্বরে ঢাকায় অনুষ্ঠিত নোডাল অফিসার্স কমিটির সভায় ছয়টি রুট চূড়ান্ত করা হয়েছে। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে ভারতের তিনটি পূর্ণাঙ্গ ও একটি আংশিক, ভুটানের একটি পূর্ণাঙ্গ ও একটি আংশিক এবং নেপালের একটি। রুটগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নামে চতুর্দেশীয় কানেকটিভিটি বলা হলেও বাংলাদেশের যানবাহনকে ভারতের মাত্র তিনটি শহরেই সীমাবদ্ধ থাকতে হবে। এগুলো হচ্ছে কলকাতা, শিলিগুড়ি ও গুয়াহাটি। এর মধ্যে কলকাতা ছাড়া বাকী দু’টি ভারতের বাণিজ্যিক শহর নয়। ফলে বাংলাদেশ ভারতের মাত্র একটি বাণিজ্যিক শহরে প্রবেশ করতে পারছে।এ বিষয়ে সাবেক রাষ্ট্রদূত মো. হুমায়ূন কবির বলেন, বিবিআইএন চুক্তির আওতায় ভারত বলা হলেও দেশটির সীমান্তবর্তী শহর বলা হচ্ছে না। ফলে ভারতের অন্যান্য শহরে যাওয়ার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা বাঞ্ছনীয়। এ মুহূর্তে সেটি সম্ভব না হলেও একটি প্রভিশন থাকতে পারে। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক কর্মকা-ের জন্য অন্যান্য শহরে যাতায়াতের বিষয়টি বিবেচনায় রাখবে। পাশাপাশি বাংলাদেশের ওপর দিয়ে চলার আগে সব ধরনের স্বার্থ বিবেচনা করে শুল্ক নির্ধারণ করতে হবে।শুধুমাত্র তিনটি শহরেই সীমাবদ্ধ থাকা নয়, বাংলাদেশকে নানা শর্ত দিয়ে আটকে দেয়া হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশের পণ্যবাহী গাড়ি নির্দিষ্ট গন্তব্যে পণ্য খালাস করে খালি গাড়ি নিয়ে ফিরে আসতে হবে। যাত্রীবাহী ও ব্যক্তিগত গাড়ির ক্ষেত্রেও একই শর্ত প্রযোজ্য। তিন শহরের বাইরে যেতে না পারায় এবং খালি গাড়ি ফিরে আসতে হলে প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশী ব্যবসায়ীরা ভারতে তাদের পণ্য প্রবেশ করাতে উৎসাহিত হবে না। 

ট্রাক-কাভার্ডভ্যান পণ্য খালাস করে খালি ফেরায় যাওয়া ও আসার ভাড়া পণ্যের মালিককে বহন করতে হবে। এতে পণ্যের মূল্য বেড়ে যাবে। ভারতের নির্ধারিত শুল্ক ও অন্যান্য ব্যয় মিটিয়ে ভারতীয় বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের মূল্য বেড়ে যাবে। ফলে ব্যবসায়ীরা ভারতে পণ্য রপ্তানিতে নিরুৎসাহিত হবে। এতে ভারতের সাথে বাণিজ্য ঘাটতি আরো বেড়ে যাবে বলে মনে করছেন বিশিষ্টজনরা। সাবেক রাষ্ট্রদূত মো. হুমায়ূন কবির এ বিষয়ে বলেন, ‘ট্রাক শুধু পণ্য খালাস করে খালি ফিরলে ব্যবসায়ীরা নিরুৎসাহিত হবেন। এতে পরিবহন ব্যয়ও অনেক বেড়ে যাবে, চুক্তিটির মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে যা সঙ্গতিপূর্ণ নয়। বিষয়টি মুক্ত থাকা উচিত।’বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ভারত থেকে পণ্য আমদানিতে যে খরচ, তার চেয়ে কমে হংকং থেকে পণ্য আনতে পারে বাংলাদেশ। অশুল্ক বাধার কারণেই মূলত দুই দেশের (বাংলাদেশ-ভারত) বাণিজ্য ব্যাহত হচ্ছে। তাই বিবিআইএন চুক্তির সুষ্ঠু বাস্তবায়নে অশুল্ক বাধা তুলে দিতে হবে। চুক্তির আওতায় প্রটোকল চূড়ান্ত করার সময় সরকারের বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখা উচিত। তা না হলে বিবিআইএনের সুফল পাওয়া যাবে না।তবে বিবিআইএন রুট অনুযায়ী ভারতের যানবাহন বাংলাদেশের ভূখ-ের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে পারবে। 

অন্যদিকে নেপাল এবং ভুটানও বিবিআইএন-এর সাথে যুক্ত থাকছে। ফলে ভারতীয় পরিবহন অতি সহজেই বাংলাদেশের ভূখ- ব্যবহার করে একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে এমনকি অন্য দেশেও যেতে পারবে। এছাড়াও বাংলাদেশের দুই সমুদ্রবন্দরও ব্যবহার করতে পারবে ভারতসহ অপর দুই দেশ। চুক্তি অনুযায়ী ভারতের তিনটি শহরে বাংলাদেশের পরিবহন চলাচল সীমাবদ্ধ থাকলেও নেপাল ও ভুটানের রাজধানী পর্যন্ত যেতে পারবে।জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ এক মন্তব্যে বলেন, প্রকৃতপক্ষে এ চুক্তির প্রধান দিক, ভারতের এক অঞ্চলের সঙ্গে অন্য অঞ্চলের যোগাযোগের করিডর ব্যবস্থা। ‘কানেকটিভিটি’ বা সংযুক্ততা নামক শব্দ ব্যবহার আসলে এ বিষয়টি আড়ালের চেষ্টা, এটা বুঝতে কোনো অসুবিধা হয় না।বিবিআইএন চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য লাভবান না হলেও বাংলাদেশকে বিশাল অংকের অর্থ ব্যয় করতে হবে। ২০১২ সালে ট্যারিফ কমিশনের দেয়া রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি করতে (যা কানেকটিভিটির জন্য প্রয়োজন হবে) প্রয়োজন হবে প্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে রেলপথে ব্যয় হবে ১৭ হাজার ৩১৮ কোটি টাকা, সড়কপথে ৯ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা, নৌপথে ৪ হাজার ৫৭৮ কোটি টাকা, মংলা বন্দরের অবকাঠামো উন্নয়নে প্রায় ২ হাজার ৬৯০ কোটি টাকা এবং বিভিন্ন স্থলবন্দরের অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় হবে বাকি ৪৮৯ কোটি টাকা। 

এই ব্যয়ের পরিমাণ আরো বাড়তে পারে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়।এছাড়াও দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য বাংলাদেশকে ব্যয় করতে হবে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার ১৬০ কোটি টাকা। সম্প্রতি ‘রিজিওনাল ট্রান্সপোর্ট ইনফ্রাস্ট্রাকচার : ম্যাপিং প্রোজেক্টস টু ব্রিজ সাউথ এশিয়া অ্যান্ড সাউথইস্ট এশিয়া’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন এ তথ্য প্রকাশ করেছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর যোগাযোগ ব্যবস্থায় বাংলাদেশ এ অর্থ ব্যয় করলে সেখানেও একচ্ছত্রভাবে লাভবান হবে ভারত।অন্যদিকে নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরের সময় প্রতিশ্রুত ২০০ কোটি ডলার বা ১৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন। বিআইডিএসের গবেষক কেএএস মুরশিদ তার এক গবেষণায় দেখিয়েছেন, ট্রানজিট থেকে বাংলাদেশের প্রত্যক্ষ লাভ সীমিত। তবে বিনিয়োগটা করতে হবে বাংলাদেশকেই। মোদির ঢাকা সফরের সময় ভারত যে ২০০ কোটি ডলারের ঋণপ্রস্তাব দিয়েছে, তার একটা অংশ ব্যয় হবে এ খাতে। 

বাংলাদেশকে সুদসহ মূল টাকা ফেরত দিতে হবে। এই ঋণের ধরন নিয়ে নানা প্রশ্ন থাকলেও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে এই ঋণের সঙ্গে কোনো শর্ত যুক্ত নেই।কিন্তু ভারতের এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক যদুভেন্দ্র মাথুরের টাইমস অব ইন্ডিয়ায় এক সাক্ষাতে বলেছেন, ভারতের দেওয়া ঋণের শর্তানুযায়ী ঋণের অর্থে নেয়া প্রকল্পগুলোর অন্তত ৭৫ শতাংশ যন্ত্রপাতি ও সেবা ভারত থেকে নিতে হবে। এসব পণ্য ও সেবার উৎপাদন প্রক্রিয়া হবে ভারতেই। টাইমস অব ইন্ডিয়ার মতে, ভারতীয় এ ঋণের টাকায় বাংলাদেশে নেয়া প্রকল্পগুলোকে কেন্দ্র করে ভারতে নতুন করে ৫০ হাজার লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।

Saturday, October 17, 2015

জঙ্গি বানানোর কারখানায় বাংলাদেশের নাম কেন?

২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহ। কদিন পরই নাইন-ইলেভেন বার্ষিকী। শতাব্দীর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ওই হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের যে তিন হাজার পরিবার তাদের আপনজন হারিয়েছে তারা আরো একবার শোকাবহ সেই দিনটির মুখোমুখি হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এমন সময় Search for International Terrorist Entities (SITE) Institute-এর বরাত দিয়ে মার্কিন গণমাধ্যমে একটি খবর প্রকাশিত হয়। খবরের শিরোনাম ‘নাইন-ইলেভেনের বার্ষিকীতে ভিডিও বার্তা দেবেন বিন লাদেন’। এর কিছুদিন পরই SITE-এর পক্ষ থেকে বিন লাদেনের ৩০ মিনিটের একটি ভিডিও বার্তা হাতে পান এফবিআইর দুই কর্মকর্তা। বলা বাহুল্য, তখনো আল-কায়েদার অডিও ভিস্যুয়াল উইং আল শাহাবের পক্ষ থেকে লাদেনের কোনো ভিডিও প্রকাশ করা হয়নি। এর এক মাস পর ওয়াশিংটন পোস্টের এক রিপোর্টে জানা যায় ‘আল-কায়েদার পক্ষ থেকে প্রচারের পর প্রকাশ করা হবে’ এমন শর্তে এফবিআইয়ের দুই কর্মকর্তাকে লাদেনের দুটি টেপ দিয়েছিলো SITE. ওই টেপ সম্পর্কে বার্তা সংস্থা এপির রিপোর্টে বলা হয়েছে ৩১ মিনিটের ওই ভিডিওতে লাদেনকে মাত্র দুই বার মাথা নাড়িয়ে কথা বলতে দেখা গেছে। বাকি পুরোটা সময় লাদেনের ভিডিও ‘ফ্রিজ’ মনে হয়েছে। প্রশ্ন হলো আল কায়েদার প্রচারের আগেই কীভাবে লাদেনের টেপ পেল SITE? নাকি বিশ্বজুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করা ওই টেপগুলোর আসল কারিগর SITE নিজেই?  
১১ সেপ্টেম্বর ২০১৫। বরাবরের মতো এবারও নাইন ইলেভেনের বার্ষিকীতে যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলার হুমকি এসেছে। এবারের হুমকিটি এসেছে আইএস জঙ্গিদের কাছ থেকে। এফবিআই বলছে নাইন ইলেভেন বার্ষিকীতে হামলা চালাবে ‘হোম গ্রোন’ বা স্বদেশি কোনো আইএস জঙ্গি। এফবিআইয়ের সেই ‘দ্বৈব বাণী’ সত্যি হয়েছে। ১৩ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের কানসাসে নাইন-ইলেভেনের ঘটনায় নিহত দমকল কর্মীদের এক স্মরণ অনুষ্ঠানে বোমা হামলার পরিকল্পনা নস্যাৎ করে এফবিআই। স্ট্রিং অপারেশন চালিয়ে আটক করা হয় এক আইএস জঙ্গিকে। জঙ্গিদের অনলাইন দুনিয়ায় তাঁর নাম ‘অস্ট্রেলি উইটনেস’ বা ‘অস-উইটনেস’। এই দুটি নামের টুইটার অ্যাকাউন্টে আইএসের পক্ষে প্রচার প্রপাগাণ্ডা চালাত কুড়ি বছর বয়সী এই অস্ট্রেলীয়-মার্কিন দ্বৈত নাগরিক। যিনি একাধারে অস্ট্রেলিয়ার পার্থ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় থাকতেন। ইঁদুর মারার বিষ, কাচের গুঁড়ো আর স্প্লিন্টার ব্যবহার করে ঘরে বসেই একটি পাইপ বোমা তৈরি করেছেন তিনি। অনলাইনে আরেক জঙ্গির সাথে যোগাযোগ করে কানসাসের নাইন ইলেভেনের বার্ষিকীতে বোমাটি বিস্ফোরণের পরিকল্পনা ছিল তাদের। কিন্তু অনলাইনের সেই দ্বিতীয় জঙ্গিটি ছিলেন এফবিআইয়ের একজন তথ্যদাতা। ধরা পড়েন ‘অস্ট্রেলি উইটনেস’। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি পরে জানা গেল কুড়ি বছর বয়সী এই তরুন মুসলিম কেউ নন। তিনি একজন ইহুদি। তাঁর আসল নাম জশুয়া রায়ান গোল্ডবার্গ। ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী না হয়েও টুইটারে তিনি আইএস জঙ্গিদের হয়ে প্রচারণা চালাতেন। মহানবীর ব্যাঙ্গচিত্র প্রকাশের দায়ে অস্ট্রেলিয়ার জনপ্রিয় কার্টুনিস্ট ল্যারি পিকারিঙকে হত্যার হুমকিও দিয়েছেন। প্রশ্ন হলো ইহুদি হয়েও কেন আইএসের কথিত খিলাফতের পক্ষে প্রচারণা চালিয়ে আসছিলেন গোল্ডবার্গ? পরের ঘটনা আরো বিস্ময়কর!
জানা গেল গোল্ডবার্গ মোটেও কোনো আইএস অনুরক্ত কেউ নন। মুসলমান বা মুসলিম বিশ্বের প্রতি তীব্র ঘৃণা পোষনকারী এই তরুণ কিছুদিন আগেও স্বাধীনতাকামী ফিলিস্তিনিদের জঙ্গি আখ্যা দিয়ে ব্লগ লিখেছেন। পাশাপাশি SITE-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা রিটা কাৎজের তথ্যদাতা হিসেবে কাজ করেছেন। কিন্তু জঙ্গি ভেবে এফবিআইয়ের হাতে বোমা তুলে দিতে গিয়ে বিপাকে পড়েছেন। SITE-ও এখন আর তাকে স্বীকার করছে না। কারণ তাহলে হাটে হাড়ি ভেঙে যাবে। 
SITE-এর জঙ্গি নির্মাণ বাণিজ্যের ওপর সবচেয়ে বড় আঘাতটি হেনেছে যুক্তরাষ্ট্রেরই কয়েকটি বিকল্প গণমাধ্যম। মনে আছে নিশ্চয়ই গত বছরের অক্টোবরে মার্কিন সাংবাদিক স্টিভেন জোয়েল সটলফ, জেমস ফলি, ডেভিড হাইনেস ও দুই জাপানি নাগরিককে ভিডিও ক্যামেরার সামনে জবাই করে হত্যা করেছিল আইএস জঙ্গিরা। প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের ভিডিও প্রচারের সোল এজেন্ট ছিল SITE. এই সংস্থার কাছ থেকে পাওয়া ভিডিওগুলোই প্রচার হয়েছে ইউরোপ-আমেরিকার সব মূল ধারার গণমাধ্যমে। এখানেও উঠেছে জালিয়াতির অভিযোগ। স্টিভেন সটলফের হত্যার দুই রকম ভিডিও পাওয়া যায় অনলাইনে। যার একটি SITE-এর তৈরি করা ভিডিও। সেই ভিডিও বিশ্লেষণের ভুরি ভুরি প্রমাণও পাওয়া যাচ্ছে ইন্টারনেটে। যার বিস্তারিত বর্ণনা অনেক পাঠকের জন্য স্বস্তিকর হবে না। তাই বর্ণনায় যাচ্ছি না। জঙ্গিদের সাথে নিবিড় যোগাযোগ না থাকলে কোনো ব্যক্তি বা সংস্থা সে যতই শক্তিশালী হোক, এমন দ্রুত ভিডিও পাওয়া বা তথ্য পাওয়া কি সম্ভব? আর যদি এই সংস্থার সাথে জঙ্গিদের এত নিবিড় যোগাযোগই থাকবে; তাহলে যুক্তরাষ্ট্র কেন সেই জঙ্গিদের হদিস জানবে না আর কমান্ডো অপারেশন চালিয়ে নিজ দেশের নাগরিকদের উদ্ধার করবে না; যাদের নিরাপত্তার জন্যই তাদের এই যুদ্ধ!   
যুদ্ধ না বলে প্রক্সি ওয়ার বা ছায়া যুদ্ধ শব্দটাই এখানে বেশি কার্যকর।যুক্তরাষ্ট্রের কথিত এই ছায়া যুদ্ধের অন্যতম ছায়াসঙ্গি হলেন সাবেক ইসরাইলি গুপ্তচর রিটা কাৎজ ও তাঁর মালিকানাধীন মার্কিন-ইসরায়েল মদদপুষ্ট প্রতিষ্ঠান SITE, যুক্তরাষ্ট্রের কথিত সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ এবং SITE-এর বয়স কাল সমান। অর্থাৎ ২০০১ সাল। সেটাই হওয়ার কথা। কারণ বিভিন্ন দেশের ভূখণ্ড দখলের জন্য কথিত এই যুদ্ধের গোড়া থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের এমন একটি প্রোপাগাণ্ডা মেশিনারিজের দরকার ছিল। কখনো জঙ্গি নেতাদের নামে টেপ প্রচার, কখনো জবাই করে মানুষ হত্যার ভিডিও প্রচার। অর্থাৎ বিশ্বজুড়ে শান্তিকামি মানুষের মনে আতঙ্কের অশান্তি সৃষ্টি করাটাই এই সংস্থার অন্যতম কাজ। যা কি না শাখের করাতের মতো দুই দিকেই কাটে। অর্থাৎ আতঙ্ক সৃষ্টির এই মোক্ষম অস্ত্র দিয়ে যেমন বিদেশের মাটিতে দখলদারত্ব চালানো যায়, তেমনি আবার নিজ দেশের মানুষের জনসমর্থনও আদায় করা যায়। যেমন ২০০৪ সালে ভোটের আগের দিন লাদেনের টেপ প্রচার করেই রাতারাতি জনসমর্থন উল্টে দ্বিতীয় দফায় হোয়াইট হাউসের ক্ষমতা নিশ্চিত করেছিলেন জর্জ বুশ। বলাবাহুল্য সেই টেপ প্রচারের পেছনেও রিটা কাৎজের হাত ছিল। কারণ যেকোনো মূল্যে বুশের জয় চাইছিল ইহুদি লবি। আর কে না জানে রিটা কাৎজ মানেই মার্কিন রাজনীতিতে ইহুদি লবির আরেক গোপন অস্ত্র। মজার ব্যাপার হলো সে বছর থেকেই মার্কিন সরকারের অর্থায়নে আরো জোরেশোরে কাজ শুরু করেন রিটা কাৎজ।
১৫ বছর ধরে মার্কিন রাজনীতি তো বটেই বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের দখলদারত্বের ক্ষেত্র প্রস্তুতের কাজটাই করে আসছে SITE। তাই রিটা কাৎজের এই ওয়েবসাইটে বাংলাদেশের নাম যুক্ত হওয়াটা মোটেই কাকতালীয় নয়।
বাংলাদেশে আইএস-এর সাংগঠনিক কোন তৎপরতা নেই। যেমন ছিলো না আল কায়দারও। কিন্তু আলকায়দা, তালেবান, তেহরিক তালেবান কিংবা লস্কর-ই-তৈয়বার মতো জঙ্গিদের যারা জন্ম দিয়েছেন; অন্তরালের সেই কুশীলবরা বরাবরাই বাংলাদেশে সক্রিয় ছিলেন, এখনো আছেন। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে বাংলাদেশসহ এই উপমহাদেশে জঙ্গিবাদের বীজতলা নির্মাণের পেছনের কলকাঠিটা আইএসের হাতে নয় বরং আইএসআইয়ের হাতে। গেল আগস্ট মাসেই আফগানিস্তানে পরপর কয়েকটি জঙ্গি হামলার জন্য সরাসরি পাকিস্তানের এই গোয়েন্দা সংস্থাটির বিরুদ্ধে অভিযোগের আঙ্গুল তুলেছিলেন আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট আশরাফ গণি। তিনি বলেছেন, “We hoped for peace, but war is declared against us from Pakistani territory,”  যুক্তরাষ্ট্রের কথিত সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের অন্যতম সহযোদ্ধা পাকিস্তান কীভাবে আল কায়েদাকে মদদ দিয়েছে, কীভাবে তালেবান, তেহরিক-ই-তালেবানের মতো জঙ্গিদের সৃষ্টি করে সন্ত্রাসের মাঠে ছড়িয়ে দিয়েছে, সেই ইতিহাস এখন আর কারো অজানা নয়। 

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ এখন একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। দুই শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীর বিচারের রায় কার্যকরের বিষয়টি আইনি প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত ধাপে রয়েছে। তাঁদের কারো কারো সাথে পাকিস্তানের এই গোয়েন্দা সংস্থাটির অতীতের সম্পর্ককে ‘আত্মার আত্মীয়’ বললে মোটেই বাড়িয়ে বলা হবে না। যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মতো দেশগুলো ১৯৭১ সালে যেমন বাংলাদেশ রাষ্ট্রটির জন্মের বিরোধিতা করেছে, তেমনি এখন ঘৃণ্য যুদ্ধাপরাধীদের বিচারেরও বিরোধিতা করছে। নানা কৌশলে এই বিচার বানচালের চেষ্টা করছে। এ কথা নিশ্চিত করেই বলা যায় হাসিনা সরকার আজ যদি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ করে দেয়; তো কাল থেকে জঙ্গিরা সব গা ঢাকা দেবে। মুক্তমনা ব্লগার হত্যা থেমে যাবে, সুফিবাদ ও মানবতাবাদে বিশ্বাসী অহিংস মানুষগুলোকে হত্যা করা বন্ধ হবে, বিদেশিদের ওপর কোনো হুমকি থাকবে না এবং রিটা কাৎজের কথিত জঙ্গি বানানোর কারখানায় বাংলাদেশের নামও পাওয়া যাবে না। 

সিরিয়ায় যেমন সব জঙ্গির নিরাপদ ছাতার নাম আইএস। বাংলাদেশে সেটি যুদ্ধাপরাধী তথা জামায়াত শিবির। এই বিষবৃক্ষের শাখা প্রশাখাগুলোই কখনো জেএমবি কখনো হিজবুত তাহরীর কিংবা কখনো হরকাতুল জিহাদ। কারণ জঙ্গিবাদের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়; কট্টরপন্থী কোনো জিহাদি কিংবা হঠাৎ গজিয়ে ওঠা বিপ্লবী কোনো গ্রুপের হাত ধরে দুনিয়ায় ধর্মীয় উগ্রপন্থার বিস্তার ঘটেনি। বরং অর্থ, অস্ত্র আর প্রশিক্ষণের তেলজল দিয়ে উগ্রপন্থীদের ক্ষুদ্র সামর্থ্যকে দানবীয় করে তোলা হয়েছে; নানা নামে নানা মোড়কে তাদের মাঠে নামানো হয়েছে। 
এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে বাংলাদেশ এখনো এমন এক ভূখণ্ড যেখানে খুব সহজেই অন্তরালের এই কুশীলবরা চাইলেই ধর্মের নামে হাজারো তরুণকে উগ্রপন্থার জমিনে ছেড়ে দিতে পারেন। মাদ্রাসা পড়ুয়া, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া তরুণদেরও ধর্মের দোহাই দিয়ে ‘ইসলাম গেল গেল’ রব তুলে ভাতৃঘাতী পথে নামিয়ে দিতে পারেন। ‘হেফাজতে ইসলামের ৫ মে আমাদের সেটা হাড়ে হাড়ে টের পাইয়ে দিয়েছে এবং তারা জানেন এজন্য তাঁদের কখনোই বিচারের মুখোমুখি হতে হবে না। জঙ্গিদের অন্তত ২০০ মামলা প্রায় একযুগ ধরে ঝুলে আছে বিচার হয়নি। এই দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এখনো কাজের চাইতে কথার ফুলঝুরিই বেশি ফোটায়। বাংলাদেশ সম্ভবত বিশ্বের সেই বিরলতম দেশ যেখানে জঙ্গিদের ঠেকাতে পুলিশকে রাজপথে মোটরবাইকের হাস্যকর মহড়ায় নামতে দেখা যায়। কারণ এই দেশের কর্তা ব্যক্তিরা এখনো মনে করেন নিরাপত্তা মানেই দৃশ্যমান শো ডাউন পুলিশী হম্বিতম্বি আরো কত কী! অথচ আজকের যুগে দৃশ্যমান পুলিশি উপস্থিতি যে মোটেই নিরাপত্তা নয় বরং এটা নিরাপত্তার নামে নিজেদের দুর্বলতাকেই গোটা দুনিয়ার সামনে (এবং জঙ্গিদের সামনেও) প্রকাশ করে দেওয়া- এই উপলব্ধিটা তাঁদের আজও হয়নি। সহসা হবে এমন লক্ষণও নেই। 

অথচ এই মুহূর্তেও নানা নামে নানা মোড়কে অনলাইনে ফেসবুকে, টুইটারে সোচ্চার বাংলাদেশের উগ্রপন্থী হাজার হাজার তরুণ। সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইটগুলো যেন রীতিমতো উগ্রপন্থা বিস্তারের নিরাপদ স্বর্গে পরিণত হয়েছে।

আজ পর্যন্ত এসব অপরাধে পুলিশ কাউকে আটক করেছে এমনটা শোনা যায়নি। তারা ধরেই নিয়েছে ফেসবুকে রাজনৈতিক নেতানেত্রীদের ছবি বিকৃত করার দায়ে জড়িতদের আটক করাটাই তাঁদের প্রধান কাজ। আমাদের রাজপথে সিসি ক্যামেরা থাকবে কিন্তু সেটির কোনো ছবি পাওয়া যাবে না। অনলাইনে উগ্রপন্থার বিস্তার ঘটবে কিন্তু সেটা দেখার কেউ  থাকবে না। নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন হিজবুত তাহরীর ঘোষণা দিয়ে তাদের কর্মী-সমর্থকদের সাথে ভিডিও কনফারেন্স করবে, কিন্তু আমাদের পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিট সেটা আমলে নেবে না। চীনের উগ্রপন্থী যু্বক থাইল্যান্ডে বোমা হামলা চালিয়ে আমাদের দেশে এসে লুকিয়ে থাকবে, আমরা সেটা জানতে পারব না। আমি মনে করি এই ‘না’গুলো যত দিন না পর্যন্ত ‘হা’ হচ্ছে তত দিন আমরা বারবার রিটা কাৎজদের ষড়যন্ত্রের বলি হব। কারণ আমাদের অবস্থাটা এখনো ‘আমার সব নিয়ে বসে আছি সর্বনাশের আশায়’ ঠিক এই বাক্যের মতোই। 

Wednesday, October 14, 2015

পুতিনের সাতকাহন

পুতিন একবিংশ শতাব্দী রাশিয়া কিভাবে শেষ করবে? আবার ব্যক্তি শাসনের ধারায় চলে যাবে রাশিয়া! প্রায় ১৫ কোটি মানুষের দেশে কোনো স্থায়ী রাজনৈতিক দল নেই। ফলে ভোটারদের সংগঠিত করা এবং ভোটদান নিশ্চিত করা অসম্ভবের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ দিকে সেনাবাহিনীর অবস্থা হামাগুড়ি দেয়ার মতো এবং তারা তাদের স্বাভাবিক হিংস্রতা ত্যাগ করেছে বলেই মনে করা হয়। তবে দোর্দণ্ড প্রতাপে বিরোধীদের নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত হচ্ছে সিক্রেট পুলিশ। আর এই বাহিনী এক ব্যক্তির পকেটে। দেশটির হাইড্রোকার্বন সেক্টর ব্যক্তিগত ব্যাংকে পরিণত হয়েছে। শিল্পকারখানার মালিকানার বেশির ভাগ জায়গা বরাদ্দ দেয়ার মতো বিতরণ করা হচ্ছে। গণমাধ্যম কম বেশি রাষ্ট্রপতি পুতিনের প্রশাসনই নিয়ন্ত্রণ করছে। সরকারের প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপগুলো সমৃদ্ধ বটে কিন্তু কেন্দ্রে শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ অনুপস্থিত। গত বছরের অক্টোবরে রুশ ও বিদেশী বিশেষজ্ঞদের এক গুরুত্বপূর্ণ সমাবেশে পুতিনের এক উপদেষ্টা গর্ব করে বলেছিলেন, রুশরা অনুধাবন করেছে যে, যদি পুতিন না থাকে তাহলে রাশিয়া বলে কিছু থাকবে না। রুশ পণ্ডিত স্লানসিলাভ বেলকোভস্কি বলেছেন, সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তি যে জাতীয় নীতিমালার ভিত্তিতে রচিত হয়েছিল তার কবর রচিত হয়েছে। এখন স্পষ্ট যে, রাশিয়ার জাতীয় নীতি হলো ভøাদিমির ভøাদিমিরোভিচ পুতিন।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য মতে, রাশিয়া এখন অর্থনৈতিক দিক দিয়ে খুবই ভালো অবস্থায় রয়েছে। বেকারত্ব হ্রাস, গড় আয় বৃদ্ধি, মধ্যবিত্তের বিলাসী জীবন, ইউরোপের কোনো কোনো দেশের তুলনায় ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর হার বৃদ্ধি উন্নত রাশিয়ার কথাই মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু অর্থনৈতিক বন্ধ্যত্ব, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও উৎপাদনের ক্ষেত্রে শ্রমিক সমাজের শ্লথগতি এবং দম্ভ করার মতো শিক্ষাব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। উল্লিখিত সেক্টরগুলো যারপরনাই দুর্নীতিগ্রস্তও হয়ে পড়েছে। কেন্দ্রের অনুরূপ এ অব্যবস্থা রাজ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে। দেশব্যাপী বড় বড় পদকর্মকর্তারা মোটা টাকার বিনিময়ে কিনে নিচ্ছেন। এই ক্রেতারা সঙ্ঘবদ্ধ ক্রাইম সিন্ডিকেট গঠন যেমন করছেন তেমনি প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে সরকারি উকিল ও বিচারকদেরও দলে ভিড়িয়ে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছেন। প্রেসিডেন্ট পুতিন স্থিতিশীলতার যে জিকির তুলছেন তা এ ক্ষেত্রে অসার বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। অবশ্য ১৫ বছর ধরে পুতিন ক্ষমতায় আছেন। পুতিনের যে ক্ষমতার কোনো দিন অবসান ঘটবে এমনটি কিছু মনে হচ্ছে না। স্টালিন তিন দশক রাশিয়ার ক্ষমতায় ছিলেন। ব্রেজনেভ ছিলেন দুই যুগ। সে তুলনায় পুতিন তরুণ এবং সুস্বাস্থ্যের অধিকারী। পুরনো স্ত্রীকে তালাক দিয়ে তিনি নতুন কনের সন্ধান করছেন। 

পুতিন প্রশাসনের সর্বত্র তার লোক বসিয়েছেন। কেজিবির সাবেক প্রধান হিসেবে এসব তার নখদর্পণে। তিনি যদি তার ওই দুই পূর্ব সুরি থেকেও বেশি দিন ক্ষমতায় থাকেন তাহলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। এতে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা চালুর লক্ষ্যে ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেলেও সেই স্বপ্ন রুশদের কাছে অধরাই রয়ে যেতে পারে। বস্তুত গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার পরিবর্তে রাশিয়ায় এখন চলছে পুতিনের স্বৈরাচারী শাসন- যা সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট শাসনব্যবস্থার ধারে কাছেও নেই। আজ রাশিয়ার সামনে একক কোনো আদর্শও নেই; নেই কোনো সুশৃঙ্খল ক্ষমতাসীন দল। আইনের শাসনেরও বিন্দুমাত্র বিধিব্যবস্থা অনুপস্থিত। আজকের রাশিয়ায় ব্যক্তিগত সম্পত্তি অর্জনের যেমন অধিকার বিদ্যমান তেমনি সীমান্ত পারাপারেও অবাধ সুযোগ রয়েছে। 

যে প্রক্রিয়ায় পুতিন একের পর এক দুর্নীতিপরায়ণ ব্যক্তিদের সৃষ্টি ও উৎসাহিত করে চলেছেন, অখণ্ড সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তির পর যে স্বপ্নের রাশিয়া গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকে পরিণত হলেন, পুতিনকে তার খেসারত কম দিতে হচ্ছে না। জনসমক্ষে পুতিন নিজেই বলেছেন, তিনি যে আদেশ নির্দেশ দেন তার কুড়ি ভাগও বাস্তবায়িত হয় না। এ ক্ষেত্রে তিনি যদি শক্তি প্রয়োগ করেন স্বার্থান্বেষী মহল তাতে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। পুতিনের পক্ষে এত বস, গভর্নর এবং কর্মকর্তাদের জনে জনে নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন। আবার অনেকে পুতিনের নাম ভাঙিয়ে কার্যসিদ্ধি করে থাকেন। ব্যক্তি শাসনের সুফল হলো প্রভূত ক্ষমতার অধিকারী হওয়ার পাশাপাশি কৌশলগত সংস্থা যেমন সিক্রেট পুলিশ কিংবা ক্যাম স্লো নিয়ন্ত্রণকারীদের নজরে রাখা। কিন্তু ওই সংস্থাগুলো স্বচ্ছতা আনয়নের ক্ষেত্রে অকার্যকর হয়ে পড়েছে।

পুতিনের জন্ম লেলিনগ্রাদে ১৯৫২ সালের ৯ অক্টোবর। তার কোনো ভাইবোনও নেই। পিটার দ্য গ্রেটের দুর্ধর্ষ অঞ্চলে তিনি বেড়ে উঠেছেন। মার্শাল আর্টে দক্ষ পুতিন লেলিনগ্রাদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনের ডিগ্রি নিয়ে প্রায় ভিক্ষা করার মতো কেজিবির একটি চাকরি নিয়ে ১৯৮৫ সালে পূর্ব জার্মানিতে পোস্টিং নেন। ১৯৯০ সালে বার্লিন ওয়ালের বিলুপ্তিতে পুতিনকে দেশে ডেকে পাঠানো হয়। এখানে তিনি তার বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক আনাতোলি শোবচাকের মাধ্যমে ভাগ্য ফেরাতে সক্ষম হন। শোবচাক প্রথমে সিটি কাউন্সিলের চেয়ারম্যান এবং পরে মেয়র হন। পুতিন তার শীর্ষ ডেপুটি হিসেবে নিয়োগ পান। পুতিন লেলিনগ্রাদে ক্ষমতার ছড়ি ঘোরানোর পাশাপাশি নিজে যেমন প্রচুর অর্থ সঞ্চয়ের সুযোগ পান তেমনি তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের ভাগ্য গড়ে দিতে এগিয়ে আসেন। এভাবে তিনি গোপনে গোপনে একটি সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। ১৯৯৬ সালে শোবচাক পুনর্নির্বাচনে হেরে গেলে মাত্র ৪৩ বছর বয়সে পুতিন বেকার হয়ে পড়েন। কিন্তু এক বছরের মাথায় রুশ প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলৎসিনের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ আলেক্সি কুরভিনের মাধ্যমে মস্কোতে রাষ্ট্রপতির অফিসে বড় বড় কাজের দায়িত্ব পান পুতিন। আলেক্সিও শেবচকের একসময়ের সহকারী ছিলেন। ১৯৯৮ সালে প্রেসিডেন্ট ইয়েলৎসিন সাবেক লে. কর্নেল পুতিনকে গোয়েন্দা সংস্থা এফএসবি পরে কেজিবির প্রধান করেন। এর কিছু দিনের মধ্যে পুতিন রাশিয়ার প্রথম ভারপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রী এবং ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হন। পুতিনের এ ক্ষমতা আরোহণের জয়যাত্রায় তিনি কোনো পর্যায়েই জনপ্রতিনিধি ছিলেন না। তিনি সব পর্যায়েই সিলেকটেড হয়েছেন।

ইয়েলৎসিন পরিবারে অন্তর্ভুক্তির সুযোগে পুতিনের ভাগ্য আরো খুলে যায়। ইয়েলৎসিনের নিজস্ব একটি গণ্ডি ছিল। ইয়েলৎসিনের আত্মজীবনীর ঘোস্ট রাইটার ভ্যালেন্টিন ইউমালেভ এবং তার হবু স্ত্রী ও ইয়েলৎসিনের মেয়ে তাতিয়ানা অনেকের মধ্য থেকে পুতিনকে তাদের পরিবারের একজন করে নেন। প্রশাসনে দক্ষ এবং ওই পরিবারের বশ্যতা স্বীকারে পারঙ্গম এর যোগ্যতা বলে পুতিন কাজ পেয়ে যান। তার প্রধান কাজ হলো সব ক্ষেত্রে ইয়েলৎসিন পরিবার এবং একই সাথে রাশিয়ার স্বার্থ দেখভাল করা। ২০০০ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে রাশিয়ার প্রধান টিভি চ্যানেল ওয়ানের নিয়ন্ত্রণ কুক্ষিগত করে পুতিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। প্রাপ্ত ভোটের শতকরা ৫৩ ভাগ ভোট অর্থাৎ চার কোটি ভোট পান পুতিন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী পান ২৯ শতাংশ ভোট।

মজার কথা হলো, পুতিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেও বছর দুই মূল ক্ষমতা ছিল তার চিফ অব স্টাফ আলেকজান্ডার ভালাসিনের হাতে। কেননা ভালাসিন পুতিনের চেয়েও ইয়েলৎসিনের পরিবারের কাছে বেশি বিশ্বাসযোগ্য ছিলেন। তরুণ ভালাসিন ও তার বন্ধুরা সব ক্ষেত্রে চাঁদাবাজি করেন। রাশিয়ার তখন ছিল ৮৯টি অঞ্চল। এসব অঞ্চলের প্রধান গভর্নরদের কারো কাছেই কোনো জবাবদিহিতা করতে হতো না। এ অরাজক অবস্থায় পুতিন বুদ্ধিবলে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণ নিজ হাতে নিতে সক্ষম হন। তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ও লোকদেখানো তৎপরতা চালান। টিভি সেন্টারের নিয়ন্ত্রণ নেন; নিয়ন্ত্রণ নেন তেল ও গ্যাস কোম্পানির। গ্রেফতার করেন বহু নাটের গুরুকে। তাদের মধ্যে একজন হলেন ভালাসিনের অনুগামী বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মিখাইল খোদরকভিস্কিকে। তার প্রাইভেট বিমান ছিল। এ বিমানের ছবি পুতিনের নিয়ন্ত্রণাধীন টিভিতে হাজারবার প্রদর্শিত হয়। রুশ নাগরিকেরা বলে উঠতে থাকেন পুতিন রাশিয়াকে রক্ষা করলেন। এ সময় অর্থনৈতিক অবস্থা হঠাৎ করে ভালো হয়ে ওঠে। এ সময় রাশিয়ায় কৃষ্ণ মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উন্মেষ ঘটে। প্রচুর বেড়ানো এবং মার্কেটিং করার সুযোগ সৃষ্টি হয় তাদের। রাশিয়ায় মোবাইল ফোনের হার শূন্য থেকে শতকরা একশত ভাগে উন্নীত হয়। অনেক বিশ্লেষক এসব ক্ষেত্রের এই উন্নয়নকে শুভ লক্ষণ বলে অভিহিত করেন। কল-কারখানায় উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। যদিও পুতিন বিরোধীরা এসব উন্নয়নের জন্য পুতিনকে কোনো কৃতিত্ব দিতে চাইছিলেন না।

রুশ আমেরিকান সাংবাদিক মাশা জেসেন ১৯১২ সালে পুতিনের আত্মজীবনী লেখেন। এ জীবনীর সার কথা হলো পুতিন রাশিয়ার জন্য একটা এক্সিডেন্ট। মাশা জেসেন পুতিনকে একজন মার্ডারার কিন্তু আলটিমেটলি একজন স্মল ম্যান হিসেবে অভিহিত করেন। কিন্তু এ কথাও সত্য এক্সিডেন্টের কারণে কোনো লোক এত দিন ক্ষমতা পাকাপোক্ত করে রাখতে সমর্থ মনে করা সঙ্গত নয়। পুতিন সম্পর্কে আরেকটি বই লিখেছেন রাশিয়ারই ফিয়োনা হিল ও ক্লিফোর্ড গ্যাডি। এ বইয়ে তারা পুতিনকে ফ্রি মার্কেটিয়ার, কেস অফিসার এ রকম ছয়টি অভিধায় চিহ্নিত করেছেন। বইয়ে তারা লিখেছেন যে, পুতিন একজন মস্কোবাসী নন, কেজিবির মূল ধারার লোকও নন। আবার কেস অফিসার বলতে গিয়ে বলেছেন, ম্যানিপুলেশনের মাধ্যমে পুতিন মানুষের মন জয়ে দক্ষ, ব্ল্যাকমেইল এবং ঘুষ প্রদানেও দক্ষ।

ইউক্রেনকে কেন্দ্র করে জারিকৃত পশ্চিমাদের অবরোধ শুধু রাশিয়ার বিরুদ্ধে নয়, পুতিনের দুষ্কর্মের সাথীদেরও ব্যাপকভাবে ক্ষতির মুখে ফেলেছে। কারণ দাওইশা বলেছেন, গ্যাস পাইপলাইন, কনস্ট্রাকশন ফার্ম, গানভর গ্রুপ, গ্যানপ্রমের মালিকসহ বহু কোম্পানির মালিকেরা এ অবরোধে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। কারণ এসবের মালিকদের অনেকেই পুতিনের সেন্ট পিটার্সবার্গ আমলের বন্ধু। পুতিনের সাথে এরা সিন্ডিকেট গড়েছিলেন বহু আগে। দাওইশা পুতিনের জীবন কাহিনী লিখতে গিয়ে বলেছেন, পুতিনের ওইসব বন্ধু কিন্তু বনেদি ধনী নয়। তাদের উত্থানপর্ব শুরু হয় ১৫-১৬ বছর আগে থেকে। আসলে পুতিনের সাহায্য নিয়ে গ্যাস, বিদ্যুৎ সরকারি ঠিকাদারি, রহস্যজনক ব্যাংক ঋণ গ্রহণ ইত্যাদি নিয়ে তারা বড় লোক হয়েছেন। দাওইশা লিখেছেন, তিনি পুতিনের হাতে জনসমক্ষে সাত লাখ মার্কিন ডলার মূল্যের ঘড়ি দেখেছেন। দাওইশার হিসাব অনুযায়ী পুতিনের সম্পদের মূল্য ৪০ বিলিয়ন ডলার।

পুতিনের ওপর লিখিত বেশির ভাগ গ্রন্থই তার প্রথম দফার প্রেসিডেন্ট হওয়ার সময়কালকে নিয়ে। কিন্তু দাওইশা লিখেছেন যে, সোভিয়েত ইউনিয়ন বিলুপ্তির পর কেজিবি ব্যক্তি খাতে ব্যবসাবাণিজ্য শুরু করেছিল। এর মূল হোতা হলেন পুতিন। পুতিন তার সিন্ডিকেট নিয়ে সেই সামান্য ক্ষমতার আমলেই বেসরকারি খাতে ব্যবসাবাণিজ্যের বীজ রোপণ করেছিলেন। পুতিন প্রেসিডেন্ট পদে দুই বছরের মাথায় যখন সত্যিকারভাবে ক্ষমতাসীন হয়ে ওঠেন তখন খোদরকভস্কিসহ যেসব ব্যবসায়ীকে ব্যাপক ভোগান্তির সম্মুখীন হতে হয়েছিল তার মূলেও কিন্তু পুতিনের সেন্ট পিটার্সবার্গ কেন্দ্রিক সিন্ডিকেট দায়ী। দাওইশা আরো লিখেছেন, অপরিণত গণতন্ত্রকে সত্যিকার ভিতের ওপর দাঁড় করানোর কোনো বাসনা পুতিনদের ছিল না। ক্ষমতায় আসীন হওয়ার পরই পুতিনের সিন্ডিকেট গণতন্ত্রকে ডেকোরেশন হিসেবে বিবেচনা করেছেন- ডাইরেকশন হিসেবে নয়। দাওইশা কেজিবির এক শীর্ষ কর্মকর্তার বরাত দিয়ে লিখেছেন যে, পুতিনকে ক্ষমতায় বসিয়েছে ইতিহাস। পরাশক্তি রাশিয়াকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে এবং বিশ্বকে ভারসাম্যপূর্ণ করার জন্য ইতিহাস পুতিনকে বিশেষ অপারেশনের জন্য ক্ষমতায় বসিয়েছে। দাওইশা মেদভেদভকে টেডি বিয়ার অভিহিত করে বলেছেন, তাকে বিশেষ প্রয়োজনে পুতিন সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে এসেছিলেন। তার অনেক বন্ধু ও সহচর প্রধানমন্ত্রী পুতিনকে বরখাস্ত করার বহু অনুরোধ-উপরোধ করেছেন বটে তবে তা বাস্তবায়িত হয়নি। অথচ পুতিনকে বরখাস্ত করার যথেষ্ট ক্ষমতা মেদভেদেভের হাতে ছিল। কিন্তু রুশ জনগণ এবং পশ্চিমা বিশ্বকে মেদভেদেভকে দেখিয়ে বছরের পর বছর বোকা বানিয়ে চলেছেন পুতিন।

বিশাল দেশ রাশিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের সাথে কথা বলে পুতিনের ওপর বই লিখেছেন সাংবাদিক বেন জুডাহ। তার মতে ভঙ্গুর সাম্রাজ্য রাশিয়ায় তৃতীয়বারের মতো পুতিনের প্রেসিডেন্ট হওয়াটা দেশের জনগণের ওপর একটা চপেটাঘাত ছাড়া আর কিছুই নয়। সেন্ট পিটার্সবার্গ সিটি অ্যাসেম্বলির সাবেক প্রধান আলেকজান্ডার বেলায়েৎ বলেছেন, বন্ধু বানাতে পুতিন বিশেষভাবে দক্ষ। একই সাথে বন্ধুদের প্রতি পুতিন খুবই লয়্যাল। মানুষের স্বভাব চরিত্র বুঝতে তার মতো মেধাবী লোক বিশ্বজুড়ে খুব কমই আছে। আর ট্যাকটিস ও কার্যোদ্ধারেও তার জুড়ি নেই।
পুতিনের সেন্ট পিটার্সবার্গ কেন্দ্রিক বন্ধু যিনি একটি প্রাসাদ কিনতে পুতিনকে অর্থ সাহায্য দিয়েছিলেন; সেই সের্গেই কোলেসনিকভকে একটি দুর্নীতি মামলায় এস্তোনিয়ায় নির্বাসনে পাঠানো হয়। সের্গেই সাংবাদিক বেন জুডাহকে বলেছেন, পুতিন পুনর্বার প্রেসিডেন্ট হওয়ায় আমি বিস্মিত। প্রথম দিকে আমি আমার সাধ্যমতো পুতিনকে সহযোগিতা করছিলাম বটে। আসলে ১৯৯০ সাল থেকে দুষ্টচক্র ক্ষমতা দখল করেছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তির মাধ্যমে আমি একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আশা করেছিলাম। অথচ দেখতে পাচ্ছি, রাশিয়াজুড়ে এক ব্যক্তির স্বৈরাচারী ব্যবস্থার উদ্ভব ঘটেছে।

জুডাহ তার দুইটি বইয়ের একটিতে আরো লিখেছেন যে, প্রোপাগান্ডা যে সব সময় ভালো ফল দেয় তা নয়। তাহলে নিরাপত্তা খাতে পুতিনকে ব্যয় এত বেশি বৃদ্ধি করতে হতো না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা খাতে ২০০০ সালে ব্যয় হয়েছিল দুই দশমিক আট বিলিয়ন ডলার। ২০১০ সালে সেই ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৩৬ দশমিক পাঁচ বিলিয়ন ডলারে। নতুন মধ্যবিত্তের ৪০ শতাংশ রাষ্ট্রের জন্য কাজ করে। কিন্তু তারা স্বাধীন জনগণ নয়। সাংবাদিক জুডাহ লিখেছেন, মস্কো নিজ ভূখণ্ডেই নির্যাতক কলোনিয়াল শাসন চালাচ্ছে।

জুডাহ ঘুরতে ঘুরতে রাশিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চল যা এক সময় মঙ্গোলিয়ার অর্ন্তগত ছিল সেই টুডায় যান। সেখানে শিকারের আয়োজনে পুতিন সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে ক্যামেরার সামনে পোজ দিয়েছিলেন বলে জানা যায়। সেখানকার এক গ্রামবাসী বলেন, পুতিন? সে কখনোই দেশের জন্য ভালো কিছু করেনি। সে তেল ও গ্যাসক্ষেত্র থেকে শুধু কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা কামিয়েছে। তার বন্ধুদের ধনী বানিয়েছে। আমরা কেন পুতিনকে সমর্থন করে যাবো। জুডাহ ইহুদিদের হোমল্যান্ড বলে পরিচিত চীন সন্নিহিত বিরোবিদখান নামের একটি এলাকায় যান। সেখানে তিনি রাশিয়ার গ্রামেই শত শত চীনা নাগরিককে দেখতে পান। সেখানে তিনি এক মাশরুম চাষির কাছে জানতে চান এ ভূমি কি রাশিয়ার দখলে থাকবে না চীনাদের অধীনে চলে যাবে। এ মাশরুম চাষিই আসলে চীনা নাগরিক। চাষিটি জুডাহকে যে উত্তর দেন তাকে গালাগাল বললেও কম বলা হবে এবং তার বলার ভঙ্গিটি ছিল এমন যে, এটি আসলে চীনেরই ভূমি। জুডাহ লিখেছেন, রাশিয়ার বহু স্থানেই পুতিন অপরিচিত এবং বহু এলাকাই ভূস্বামীদের নিয়ন্ত্রণে। আসলে ইতিহাস যে কখনো কখনো নেতা বানিয়ে ফেলে পুতিন তার সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণ। তাকে তুচ্ছ ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা না করে দুর্যোগ হিসেবেই বিবেচনা করা উচিত বলে অনেকের অভিমত।
এক যুগ আগে সুইডেনের উপশালা বিশ্ববিদ্যালয়ের রুশবিষয়ক গবেষক স্টেফান হুডল্যান্ড দ্বাদশ শতাব্দীর পূর্ব শ্লাভিক ইতিহাস নিয়ে একটি সমৃদ্ধ প্রবন্ধ লেখেন। পুতিনের প্রায় স্বৈরাচারী মনোভাব নিয়ে লিখতে গিয়ে তিনি উল্লেখ করেন যে, রাশিয়া ১৬১০-১৩, ১৯১৭-১৮ এবং ১৯৯১ সালে কলাপস করেছিল। হুন্ডল্যান্ড উল্লেখ করেন যে, প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে রাশিয়ার কোনো সাফল্য নেই। যদিও রাশিয়া সব সময় পরাশক্তি হতে চেয়েছে। ১৯৯৯ সালে পুতিন অনলাইনে তার যে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেন সেখানে তিনি স্পষ্টতই বলেন যে, গত দুই থেকে তিন শত বছরের মধ্যে রাশিয়ার অবস্থান দ্বিতীয় বা তৃতীয় স্থানে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। রাশিয়ার জন্য এটা একটা দুঃসময়। পুতিন রাশিয়াকে বিশ্বের সেরা হিসেবে পরিগণিত করার প্রত্যয় ঘোষণা করেন। তবে অনেক সাফল্যের মধ্যে একটি হলো সোভিয়েত ইউনিয়নের সময়ের চেয়ে বর্তমান রাশিয়ায় গোত্র ও সম্প্রদায়গত সম্প্রীতি যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে তেমনি জাতীয়তাবাদী চেতনারও উন্মেষ বৃদ্ধি পেয়েছে। ক্রেমলিন বিশ্বাস করে আমেরিকা বিশ্বব্যবস্থায় অস্থিরতা আনয়নকারী। পক্ষান্তরে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় রাশিয়া ভারসাম্য যেমন বজায় রাখছে তেমনি পরাশক্তি হিসেবে ভিকটিম দেশকে যথাসম্ভব সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে। 

লিলিয়া সেকটসোভা নামের এক বিশ্লেষকের মতে, রাশিয়া হলো ‘লোনলি পাওয়ার।’ তার মতে পুতিনের রাজনীতি হলো লুণ্ঠনপূর্ণ। দেশের অভ্যন্তরে এবং বিদেশে দুই স্থানেই তার একই আচরণ। ইউরোপের সন্ত্রাসবাদীদের সাথে তার যেমন অন্তরঙ্গতা বিদ্যমান তেমনি শক্তিশালী চীনের সাথে ভাব বজায় রাখাটাকেও রাশিয়ার বড় ধরনের কৌশল বলে মনে করেন পুতিন। প্রকৃতপক্ষে রাশিয়ার কোনো মিত্র নেই এবং সব গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক পুতিন নষ্ট করে ফেলেছেন। যেমন পশ্চিম জার্মানির সাথে একসময়কার মধুর সম্পর্ক আজ আর নেই। তার মতে, জাতীয়তাবাদ ও রক্ষণশীল মনোভাব সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পরও অক্ষুণœ ছিল। কিন্তু ২০১২ সালের পর রাশিয়ায় এ স্লোগান আরো ব্যাপকভাবে প্রচার করা হচ্ছে। এর কারণ হলো পুতিন পুনর্বার প্রেসিডেন্ট হতে চাইলে ২০১১-১২ সালে লোকজন প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে এসেছিল। এ দিকে ইউক্রেন ও ক্রিমিয়া নিয়ে পুতিন বিশ্ববাসীকে যা দেখাতে চাইলেন তা হলো, রাশিয়াকে গ্রেট পাওয়ার হিসেবেই গণ্য করতে হবে। যদিও জুডাহ লিখেছেন, পুতিনের শাসনামলের যবনিকাপাত ঘটার আর খুব বেশ দেরি নেই। গবেষকদের এ পর্যায়ে উপসংহার হলো, রুশ নেতা নিজেকেই নিজের জালে যেমন আবদ্ধ করে ফেলেছেন তেমনি বরফে ঢাকা সমস্যাগুলোও মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে বৈকি! পুতিন কিংবা তার পশ্চিমা প্রতিপক্ষ কোনোক্রমেই ইউক্রেন নিয়ে বিরোধ দীর্ঘকাল জিইয়ে রাখবে না। রাশিয়ার ক্রিমিয়া দখল এবং ইউক্রেনের বিদ্রোহীদের সমর্থন আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন এবং রুশ সমর্থিতদের দ্বারা একটি বেসামরিক বিমান ধ্বংস পশ্চিমাদের অবরোধ জারিতে বাধ্য করেছে। কিন্তু সমস্যাটা শুধু রাশিয়ার আগ্রাসন কিংবা রাশিয়াকে ওই অঞ্চল থেকে উৎখাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। যদি শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে রাশিয়াকে ওই এলাকা থেকে উৎখাত করাও হয় তা দীর্ঘ দিন কার্যকরও রাখা যাবে না।

দীর্ঘ সময় ধরে ইউক্রেনকে দুর্বল থেকে দুর্বল করেছে রাশিয়া। দুই দশকের অপশাসন তো ছিলই। কিন্তু এটাও বাস্তবতা যে, এই স্বাধীন দেশটি এতই বিশাল যে, রাশিয়ার পক্ষে তা গ্রাস করা বা গিলে ফেলা সম্ভব নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিভিন্ন দেশের সীমানা বিন্যাস ও একীভূতকরণ শুরু হয়। যেমন হংকং এবং মেকাও শান্তিপূর্ণভাবে চীনের সাথে চলে গেছে। যুগোস্লাভিয়া যুদ্ধ ও সহিংসতা শেষে ভেঙে গেছে। অভ্যুদয় হয়েছে কসোভোর। আজারবাইজানের নগোর্নো-কারাবাস, মনটোভার ট্রান্সনিসাট্রিয়া, জর্জিয়ার আবখাজিয়া এবং দক্ষিণ ওসেটিয়া তাদের অবস্থান বদল করেছে। দোনেস ও লুথান্সকও ইউক্রেনের অংশ। লক্ষ্যযোগ্য দিক হলো স্টালিনের সীমান্ত নির্মাণের সাথে ওই স্থানগুলোর সম্পর্ক বিদ্যমান।

যা হোক, ইউক্রেনের যে সমস্যা তা ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষে সমাধান সম্ভব নয়। এমনকি জাতিসঙ্ঘও পারবে না। আমেরিকাও ইউক্রেনকে ঘিরে যুদ্ধ শুরু কিংবা রাশিয়ায় বোমা ফেলতে যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে, আমেরিকা ইউক্রেনে নতুন করে সীমান্ত তৈরির সমঝোতার পথে এগোবে। কিন্তু বৃহৎ শক্তির দম্ভের কারণে সমঝোতার পথে রাশিয়াকে কতটা মানানো যাবে তা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। আর পুতিনের জীবদ্দশায় কোন বিরোধের কী ধরনের পরিণতি হবে তা বলাও মুশকিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউক্রেনকে এভাবে প্রতিবন্ধী হয়ে যেমন থাকতে হবে এবং ইউরোপের অর্থনীতিও তেমনি ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকবে। সবচে বড় কথা পুতিনের রাশিয়াকে হ্যান্ডেল করা দিনকে দিন কঠিনতর হয়ে উঠবে। তবে রুশ নেতাদের বিদ্যমান বিশ্বব্যবস্থার সাথে তাল মিলিয়ে যে পদক্ষেপ নিতে হবে তা বলাই বাহুল্য। পুতিন নিশ্চয়ই সে ব্যাপারটি স্মরণে রাখবেন।


Saturday, October 3, 2015

ভারতে গরুর গোশতে কেন অস্বস্তি?

বাংলাদেশের এবারের কোরবানি এক বিশেষ ধরনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে। ভারতীয় গরু ছাড়া বাংলাদেশের কোরবানির ঈদ কাটানো কি সম্ভব নয়! ব্যাপারটা সাহসের সাথে এর আগে পরীক্ষা করে দেখা হয়নি কখনো। এবার সে সুযোগ পাওয়া গেছে এবং ভারতীয় গরু তেমন সরবরাহ ছাড়াই এবার আমাদের কোরবানির ঈদ ভালোভাবেই কেটে গেল। অন্তত বাজারে গরুর সরবরাহে বড় সঙ্কট দেখা যায়নি। সবার এবারই এ এক প্রথম অভিজ্ঞতা। প্রমাণ হয়েছে এটা কঠিন কিছু নয়। বরং ভারতের ‘গরু অবরোধ’ শাপে বর হয়েছে বলতে হবে, এমনটাই হওয়ার কথা ছিল। 

গত ৪ মার্চ ভারতে গরু জবাইবিরোধী এক আইন জারি করা হয়েছে। কথাটা বললাম বটে, পাবলিক পারসেপশনও অনেকটা এরকম। তবু কথাটা ঠিকঠাক শুদ্ধভাবে বলা হয়নি। আইনটা সারা ভারতের ওপর বলবৎ হয়নি, মানে কেন্দ্রীয় মোদির সরকার বা জাতীয় সংসদ এমন কোনো আইন পাস করেনি। আইন পাস করেছে শুধু মহারাষ্ট্র রাজ্যের প্রাদেশিক সরকার (মুম্বাই যার রাজধানী)। ফলে আইনত তা ভারতজুড়ে নয়, শুধু মহারাষ্ট্র রাজ্যসীমানার মধ্যে এ আইনি নিষেধাজ্ঞা বলবৎ হয়েছে। এতে সব ধরনের গরু জবাই করা, বহন করা, দখলে রাখা, জবাইয়ের জন্য অন্য রাজ্যে বহন করে নেয়া অথবা জবাই করে নিয়ে আসা ইত্যাদি সবই ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে; যার শাস্তি ছয় মাস থেকে পাঁচ বছরের জেল অথবা এক থেকে ১০ হাজার রুপি জরিমানা। এ ছাড়া এ অপরাধে মামলা হলে সেটা অজামিনযোগ্য অপরাধ বলে গণ্য হবে।

মহারাষ্ট্রে জারি ওই আইনের নাম ‘মহারাষ্ট্র অ্যানিমেল প্রিজারভেশন (অ্যামেন্ডমেন্ট) অ্যাক্ট ১৯৯৫’। অ্যামেন্ডমেন্ট অর্থাৎ এটা আগের কোনো আইনেরই একটা সংশোধিত আইন। হ্যাঁ তাই। প্রথম এমন আইন করা হয়েছিল ১৯৭৬ সালে। কংগ্রেস দলের শঙ্কর রাও চৌহানের সরকারের সময়, যে সময় কেন্দ্রে কংগ্রেসের জরুরি আইন জারি করে ইন্দিরা গান্ধীর শাসন চলছিল। তবে রাজ্যে কংগ্রেসের হাতে আইনটি পাস করার কার্যক্রম কখনোই শেষ হয়নি। পরে ১৯৯৫ সালে ওই আইনটিই আবার তবে এবার বিজেপি-শিবসেনা সরকারের হাতে সংশোধিত ও হাজির করা হয়। সে আইনটিই ‘মহারাষ্ট্র অ্যানিমেল প্রিজারভেশন (অ্যামেন্ডমেন্ট) অ্যাক্ট ১৯৯৫’; কিন্তু ভারতের প্রাদেশিক মানে রাজ্য সংসদে কোনো আইন পাস হওয়ার পর ভারতের রাষ্ট্রপতির অনুস্বাক্ষর লাগে, যার পরই সেটি শুধু ওই রাজ্য সীমানায় বলবৎযোগ্য আইন বলে গৃহীত হয়। তাই নানা আইনি কৌশলগত দিক পূরণ করে ভারতের রাষ্ট্রপতির অফিস থেকে অনুমোদিত হয়ে আসতে আসতে পরের প্রায় ২০ বছর লেগে যায়।

বিজেপির নরেন্দ্র্র মোদি এবার ক্ষমতায় এসেছে মে ২০১৪ সালে। আর মহারাষ্ট্রে বিজেপির সরকার এসেছিল ওই একই বছরে পাঁচ মাস পরে, অক্টোবর ২০১৪ সালে। এরপর এবারের মহারাষ্ট্র বিজেপির রাজ্য সরকার গঠন হওয়ার পরে এই আইনের গেজেট হওয়ার দিন হিসাবে এ আইন ৪ মার্চ ২০১৫ থেকে বলবৎ হয়। তবে দেরি হওয়ার সবটাই কৌশলগত কারণ নয়। টেকনিক্যাল বা কৌশলগত কারণ কথাটা মুখ রক্ষার জন্য। স্পষ্ট করে বললে এ আইনের প্রয়োজনীয়তা এসেছে সস্তা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থেকে, যেটাকে বলা যায় কংগ্রেস নাকি বিজেপি, কে কত বড় ‘হিন্দুত্বের রাজনীতির’ দাবিদার এমন দুই খেদমতগারের প্রতিযোগিতা থেকে। এ নিয়েই কংগ্রেস ও বিজেপির বিপজ্জনক ও আত্মঘাতী প্রতিযোগিতা। তবে এ ঘটনার সাধারণ দিকটা হলো, দল দুটি মুখে যাই বলুক তারা উভয় দলই আসলে ‘হিন্দুত্বের রাজনীতি’ করে, তাই তাদের মূল প্রতিযোগিতা ‘হিন্দুত্বের রাজনীতি’ নিয়ে, কে কত বড় হিন্দুত্বের খেদমতগার তা প্রদর্শন করার প্রতিযোগিতা। এ আইন কেন্দ্র করে প্রথম প্রস্তাব থেকে চূড়ান্তভাবে পাস ও প্রয়োগে যাওয়া পর্যন্ত ঘটনাপ্রবাহ এরই এক ভালো প্রমাণ। মনে রাখা দরকার, কংগ্রেসের সরকারের হাত দিয়ে এ আইনের প্রস্তাবনার শুরু। আর চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়ার কর্তৃত্ব প্রেসিডেন্টের, ঘটনাচক্রে তিনিও কংগ্রেসেরই। আর বলা বাহুল্য, এ দুইয়ের মাঝখানের ঘটনাবলি সক্রিয়ভাবে সম্পন্ন করার ভূমিকায় বিজেপি। ফলে কেউ কম যায়নি, অন্যের থেকে পিছে পড়েনি, অবদান রেখেছে। তবে রেষারেষিতে প্রতিযোগিতা যেমন থাকে, তেমনি সময়ে ঢিল দিয়ে ফেলে রাখাও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বিবেচিত হয়। দেরি হওয়ার মূল কারণ এখানে। এ ছাড়া দেরি হওয়ার আরেক মূল কারণ সস্তা জনপ্রিয়তার জন্য দল দুটোর হয়তো এ আইন প্রয়োজন; কিন্তু মানুষের দৈনন্দিন জীবন সংগ্রামে এর কোনো ভূমিকা নেই। ফলে গণতাগিদ নেই। ফলে কোনো তাড়া নেই।

সংসদে কোনো আইন প্রণয়ন করার সময় আইনটা কেন করা দরকার ‘উদ্দেশ্য কী’ তা স্পষ্ট উল্লেখ করতে হয়। এটা বাধ্যতামূলক। স্বভাবতই এ আইনটা পাস হয়ে যাওয়ার পরে এখন আইনটি সম্পর্কে যে ব্যাখ্যা দেয়া হচ্ছে এর সাথে আগে ‘লিখিত স্পষ্ট উল্লেখ করা; উদ্দেশ্যের কোনো সম্পর্ক নেই। না কংগ্রেস, না বিজেপি; যার যার সময়ে আইনটিতে হাত লাগানোর সুযোগ পেয়েছে; কিন্তু কেউ উল্লেখ করেনি যে, হিন্দুত্বের সুড়সুড়ি দিতে ‘পবিত্র পূজনীয় গোমাতা রক্ষার প্রয়োজনে’ এরা এ আইনটি চাচ্ছেন। যেমনটা এখন ব্যাখ্যা দেয়া হচ্ছে। বরং উভয় দলই উদ্দেশ্যের ঘরে লিখেছিল, গোদুধ পাওয়ার জন্য, চাষাবাদ ও মাল টানাতে বলদের ব্যবহারের উদ্দেশ্যে গরু, বলদ, বাছুরসহ সব ধরনের গরুর সংরক্ষণ, সুরক্ষা এ আইনের উদ্দেশ্য। সার কথায় কৃষিকাজ, ফলে মানুষের জীবনযাপন সহজ করার জন্য গোসম্পদ রক্ষা এখানে উদ্দেশ্য। আপাত চোখে মনে হতে পারে ভালোই তো ‘গোমাতা রক্ষার্থের মতলব’ এই আসল উদ্দেশ্য তো ভালোভাবেই লুকিয়ে একটা মিথ্যা উদ্দেশ্য দেখাতে পেরেছিল। না, আসলে পারেনি। যদি কৃষির প্রয়োজন উদ্দেশ্য হিসাবে দেখানো হয়ে থাকত তবে আইনের মুসাবিদা ভিন্ন রকম হতে হতো। যেমন- সব ধরনের গরুর ওপর ঢালাওভাবে এ আইন জারি করা হয়েছে; কিন্তু এমন গরুও তো থাকবে জন্মাবে যে দুধও দেয় না, মালামালও টানে না, আবার বাছুরও না, ফলে গোশতের উৎস হিসেবে ব্যবহার হতে পারে- জন্ম থেকেই এমন গোশতের ক্যাটাগরির গরু তো না চাইলেও জন্ম নেবে। এ ছাড়া এমন গরু পরিকল্পিতভাবেই গোশতের উদ্দেশ্যে পালন করলেই বা অসুবিধা কী? এটা তো কোথাও প্রমাণ হয়নি, গোশতের জন্য গরু পাললে সে দেশে কৃষিকাজে গরুর অভাব দেখা দেবে। আকার-ইঙ্গিতে এখানে অর্থ করা হয়েছে যেন ভারতের দুই হিন্দুত্বের দলই কৃষিকাজের সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে খুবই উদ্বেগ থেকে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আচ্ছা ভারতের কৃষিতে গরুর বড় অভাব চলছে ব্যাপারটা কি সেরকম? কোনো সহায়ক গবেষণা বা তথ্য কি আছে, যা এমন অনুমান সমর্থন করে? জানা যায় না। বরং ভারতের কৃষি অর্থনীতির কাছে নিজ দেশে গরু পালন ও বড় করে বাংলাদেশ হলো বিক্রির এক বিরাট লোভনীয় বাজার। চাহিদা-বাজার-অর্থনীতিবিষয়ক এ তথ্য মহারাষ্ট্রের জবাই নিষিদ্ধ আইনে ‘লিখে রাখা’ উদ্দেশ্যকে সমর্থন করে না। এ ছাড়া এমন গরু কি হবে না, যার আর দুধ হয় না, হবে না; আবার মালামালও তেমন টানতে পারে না; কিন্তু এখনো কয়েক বছর আয়ু আছে। সেসব গরু কী করা হবে? মালিককে এমন গরু হয় কাজ ছাড়া বসিয়ে বসিয়ে খাওয়াতে হবে, নইলে না খাইয়ে মেরে ফেলতে হবে। কারণ গোশতের জন্য তো বিক্রি নিষেধ। কেন? এসব প্রশ্নের জবাব আইনে প্রদত্ত উদ্দেশ্যের মধ্যে নেই, লুকানো হয়েছে। অর্থাৎ যে ক্যাটাগরির পালিত গরু গোশতের জন্য ব্যবহার হতে পারে সে ক্যাটাগরির গরু প্রসঙ্গে কিছুই না বলে উহ্য রেখে দেয়া হয়েছে। আবার ও দিকে কৌশলে কথার মারপ্যাঁচে ‘সব ধরনের গরুর ওপর’ নির্বিচারে নিষেধাজ্ঞা বলবৎ করা হয়েছে- এর ভেতর দিয়ে আইনটির উদ্দেশ্য লুকানোর চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে গেছে। এ ছাড়া মোদি সরকারের নেতা, মন্ত্রী তো গোমাতা রক্ষার উদ্দেশ্যে এ আইন করা হয়েছে তা খোলাখুলিই বলছে।

ভারতের বিচারব্যবস্থা বিশেষ করে উচ্চ আদালতে বিচারমান বাংলাদেশের চেয়ে অনেক উঁচুতে, গুণে মানসম্পন্ন। ফলে ‘পবিত্র পূজনীয় গোমাতা রক্ষার্থে’ কথাটা আইনের উদ্দেশ্যের মধ্যে কংগ্রেস বা বিজেপি যে কেউ যদি লিখত তবে ওই আইন আদালতে চ্যালেঞ্জ হয়ে তা নাল অ্যান্ড ভয়েড মানে বাতিল হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা ছিল। অনুমান করা যায়, এ কারণেই দুই দলের নেতাদের সাহসে কুলায়নি আইনটির প্রকৃত উদ্দেশ্যই স্পষ্ট প্রকাশ করে।

কংগ্রেস ও বিজেপিসহ ভারতের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব যারা ভারতে গরু জবাইবিরোধী আইনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন, তারা আসলে কী চান এর আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। অনেকের শুনে হয়তো অবাক হবেন, ভারত এক গরুর গোশত রফতানিকারক দেশ। বলা হচ্ছে, ভারত মোট গরুর গোশত উৎপাদন করে ৩৭ লাখ মেট্রিক টন, যার প্রায় ২০ লাখ টন অভ্যন্তরীণ বাজারে ভোগ্য হয়, আর বাকি ১৭ লাখ টন বিদেশে রফতানি হয়। অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক রফতানি হয়, এটা ২০১২ সালের তথ্য। এ সংখ্যাতেই ভারত বিফ উৎপাদক হিসেবে পঞ্চম আর রফতানিকারক হিসেবে প্রথম স্থান দখলকারী। আবার দামের অঙ্কে বললে, ২০১৩ সালে বিফ থেকে পাওয়া রফতানির মোট আয় ছিল ৪৫০ কোটি ডলার। এপ্রিল-নভেম্বর ২০১৪ সালের এ আট মাসে এর আগের বছর ঠিক ওই আট মাসের তুলনায় রফতানি ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে। তবে একটি কথা মনে রাখতে হবে, এখানে বিফ বললেও রফতানির অফিসিয়াল ডকুমেন্টে এগুলো ‘বাফেলো মিট’ দেখিয়ে আইনত বৈধ করে নেয়া হয়েছে। কারণ মহিষের গোশতের বেলায় জবাই, বহন, দখলে রাখা সবই বৈধ, কোনো বিধিনিষেধ নেই। এখন কাগজপত্রে গরুর জায়গায় কেটে মহিষ লিখে রাখা কোনো বড় ব্যাপার নয়; কিন্তু প্রায় ৪০ লাখ টনের গোশত সমাজ কমিউনিটি থেকে বের করে আনতে গরুর রক্তের ছোটখাটো অন্তত ডোবা না তৈরি করে তা করা সম্ভব নয়। বলাই বাহুল্য, সমাজের এক বড় অংশকে খোলাখুলি না জানিয়ে এটা করা সম্ভব নয়, অন্তত শহরের কশাই কমিউনিটি আর তাদের মাধ্যমে অন্যরা তো জানবেই। এ ছাড়া এই বিশাল গোশতের রফতানিকারক ভারত, এ কথা প্রমাণ করে যে, ‘কৃষিকাজের উদ্দেশ্যে গোসম্পদ সংরক্ষণ’ এটা সাদা মিথ্যা কথা। এরই মধ্যে গরুর গোশতের রফতানির পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় তা উল্লেখ করে কংগ্রেস নেতা দিগি¦জয় সিং মোদির সরকারকে খোঁচা দিয়েছেন।

ভারতের গরু গোশত রফতানির ফেনোমেনাটা বেশ তামাশার। বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কথাগুলো বলার কারণ, ভারত গরুর গোশত রফতানি করে কথাটার অর্থ হলো, ভারতের বিদেশের মুসলমান ছাড়াও অন্যান্য অজানা লোকের জন্য গরু জবাই করতে রাজি, গোশত পাঠাতে রাজি। তাতে ভারতের কোনো অস্বস্তি নেই, কোনো ধর্মীয় বাধা অনুভব নেই; কিন্তু এই গোশত যদি ভারতের মুসলমানেরা খেতে চায় তাহলেই আকাশ ভেঙে পড়বে মনে করা হবে। নিজেদের ধর্ম নষ্ট হচ্ছে মনে করা হবে। একইভাবে বলা যায়, এই গোশত রফতানিতে বিজেপির কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের কোনো আপত্তি নেই; কিন্তু বিদেশ বলতে বাংলাদেশ বোঝানো যাবে না। বাংলাদেশে গেলে ভীষণ আপত্তি। বাংলাদেশে ভারতের গরু আসতে পারবে না। বাংলাদেশের ওপর এই আপত্তি কারণ এই গোশত মুসলমানেরা খাবে তাই। এটা এক প্যাথোলজিক্যাল কেস! অসুস্থ মানুষের চিন্তার সমস্যা! 

সোজা ভাষায় বললে, এটাই ঘোরতর বর্ণবাদ। এমন মুসলমানবিদ্বেষ এটা জলাতঙ্কের চেয়েও ভয়াবহ ইসলামোফোবিয়া। তাই বলছিলাম, মহারাষ্ট্রে কংগ্রেস ও বিজেপির উদ্যোগে গরু জবাইবিরোধী আইনটা খোলাখুলি মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়ানো ছাড়া এর আর কোনো উদ্দেশ্য নেই। 

পাঠককে আবার স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, গরুর গোশত জবাই, বিক্রি, বহন, দখল ইত্যাদি নিষিদ্ধ আইনটি কেবল রাজ্যের বিষয়, ভারতের সব রাজ্যে বলবৎ হয়েছে এমন নয় বা কেন্দ্রীয় সরকারের আইন নয়। অর্থাৎ মোদি সরকারের আইন নয় এটা। মোদি ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে বহু লেখায় বলে আসছি যে, মোদি সরকার বা মোদির দল বিজেপির মুসলমানবিদ্বেষী এবং প্রায়ই বর্ণবাদী হয়ে ওঠা বক্তব্য বা নীতি এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছে। মোদি দলের কর্মসূচিগুলো যেমন ‘ঘর ওয়াপসি’ সাথে তার সরকারের কোনো সম্পর্ক নেই এমন যোগাযোগহীন অবস্থা দেখিয়ে থেকেছেন। একসময়ে বিশেষত ক্রিশ্চিয়ান স্থাপনা বা চার্চে আক্রমণ, ঘর ওয়াপসি কর্মসূচির নামে দলের মুসলমানদের প্রতি বিদ্বেষ ও ফোবিয়া ছড়ানোর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে দাঁড়াতে মোদিকে নিজের দলের কর্মসূচি, দলের নেতা, এমনকি আরএসএসের নেতাদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে হুঁশিয়ারি দিতেও আমরা দেখেছি; কিন্তু স্পষ্ট করে বলা দরকার, গরু নিষেধাজ্ঞা ইস্যুতে এসে নরেন্দ্র মোদি পুরোপুরি পরাজিত হয়েছেন ও সারেন্ডার করেছেন। তিনি অবলীলায় এখন রাজ্য সরকারের গরু জবাই নিষিদ্ধ আইনের পক্ষে খোদ নিজ কেন্দ্রীয় সরকারকে দাঁড় করিয়েছেন। ফলে এবার যেন আর তিনি শুধু বিজেপি নয় একেবারে আরএসএসের প্রধানমন্ত্রী মোদি হিসেবেই হাজির হয়েছেন।

এর ফলে প্রথমত মোদির কাছে যে প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই তা হলো : এক. তার সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং কেন সামান্য এক রাজ্য সরকারের গোজবাই নিষিদ্ধ আইন ও কর্মসূচি ফেরি করতে বাংলাদেশ সীমান্তে বিএসএফের কাছে এলেন? অথচ রাজ্য সরকারের কোনো কাজ, আইন বা নীতির দায় কোনোভাবেই কেন্দ্রের সরকারের নেই, কোনোভাবেই সম্পর্কিত নয়। ফলে মোদি সরকার মনে করলেও বা দাবি করলেও আইনত তার কোনো গোজবাই নিষিদ্ধ আইন বলে কিছুই নেই। অথচ অনুমানে ধরে নেয়া হয়েছে যেন কেন্দ্রীয় সরকারের এমন এক কল্পিত আইন আছে। ফলে কল্পিত গোজবাই নিষিদ্ধ কর্মসূচি অনুযায়ী বিএসএফকে পরিচালিত হতে তিনি নির্দেশমূলক বক্তৃতা দিয়েছেন। অথচ এমন আইন তার বাস্তবে সরকারের নয় বলে তার সরকারের এ বিষয়ে বাংলাদেশকে জানানোরও কিছু নেই, তিনি কখনোই জানাননি। অথচ সীমান্তে এসে রাজনাথ বাংলাদেশের মানুষকে কিভাবে গরুর গোশত না খাইয়ে মারবেন, মুসলমান বিদ্বেষমূলক দামামা তিনি বাজালেন। তিনি বললেন, ‘বাংলাদেশে গরুর দাম যেন এত বেড়ে যায় যে, বাংলাদেশের মুসলমানেরা গরুর গোশত খাওয়া ছেড়ে দেয়। এমন ব্যবস্থার পক্ষে বিএসএফকে তৎপর হতে হবে।’

শকুনের বদদোয়ায় গরু মরে না। তা হলে তো শকুনের খাদ্য হতে মৃত গরুতে ভাগাড় ভরে উঠত। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভারতের তামাশার গরু অবরোধের মধ্যে বাংলাদেশের এবার প্রথম এক কোরবানির ঈদ কাটল। নিঃসন্দেহে এক নতুন অভিজ্ঞতা। শুধু অর্থনীতির চোখে দেখলে আমাদের এ ঈদটা হলো, মূলত শহুরে ক্রেতা আর গরুর ব্যবসায়ী এ দুইয়ের পরস্পর পরস্পরের ওপর সুবিধা নেয়ার জন্য বাজারের খেলা। শেষের দিনগুলোয় এটা এমনকি ঘণ্টায় ঘণ্টায় সিচুয়েশন কার পক্ষে যাবে কে কার ওপর কিছুক্ষণ সুবিধা পাবে এরই লড়াই। ফলে এটা এক বাজার এবং দরকষাকষি। কারণ, একমাত্র বাজারই সাব্যস্ত করে দিতে পারে ব্যবসায়ীর জন্য গরুটার সর্বোচ্চ দাম সে কত পেতে পারে। আবার ক্রেতার দিক থেকে সবচেয়ে কত কম দামে সে গরুটা কিনে বাসায় যেতে পারে। অতএব ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের জন্য সাম্যাবস্থার সেই অপটিমাম পয়েন্টটা কোথায় এরই খোঁজাখুঁজি চলে সেখানে। এটাকেই আমরা দরকষাকষি বলি। আর দরকষাকষি ছাড়া তা জানার আপাতত আর সহজ উপায় কই? তবে বাজারটা একপেশে যাতে না হয়ে যায় সেজন্য এমন পর্যাপ্ত ক্রেতা এবং বিক্রেতা যেন হাজির থাকে এটা নিশ্চিত করার এক ভূমিকা সরকারের আছে।

তাহলে মূল জিনিসটা হলো বাজার। রাজনাথসহ বিজেপির বন্ধুদের রাজনীতির সারকথা মুসলমানবিদ্বেষ, এ ছাড়া আর কিছু নয়। এরা যদি বাজারবিষয়ক কিছু কথা শিখে রাখতে পারতেন তাহলে হয়তো নিজেরা বেঁচে যেতেও পারেন। আমাদেরও উদ্ধার করতেন।

বাংলাদেশ ভারতের জন্য গরু বিক্রির বাজার এ কথাটার অর্থ হলো, বাংলাদেশের চেয়ে ভারতে গরুর উৎপাদন খরচ তুলনামূলক কম। বাংলাদেশে গরুর সমতুল্য ভিন্ন জিনিস উৎপাদনের বেলায় আবার সেগুলো গরুর চেয়ে লাভ বেশি। তাই দেশে বিনিয়োগ উদ্যোগ সবই গরুর দিকে ছিল না। এখন ভারত যদি তার পড়ে যাওয়া বাজার হেলায় হারাতে চায়, তবে সেটার ফল আমাদের জন্য আখেরাতে ভালো ছাড়া খারাপ হবে না। কী অর্থে? ভারতের সস্তা গরু আসে বলেই দেশে গরু পালন তেমন লাভজনক হয় না। ভারতীয় গরু আসেনি, এবার আসবে না, নাও আসতে পারে ইত্যাদি মেসেজের মধ্যে এবারের বাজার-অনিশ্চয়তায় আমরা পার করেছি। এমন মেসেজের ফলে বাজারে গরুর গড় দামের থেকে এবার দাম একটু চড়া গেছে; কিন্তু এতে বাড়তি যে মুনাফাটা এসেছে এটাই বাংলাদেশে গরু পালন-উৎপাদন ব্যবসায়কে আকর্ষণীয় করবে। প্রণোদনা হিসেবে কাজ করবে। সেই সাথে জান বাজি রেখে ভারতীয় গরু চোরাচালানে বাংলাদেশে আনার বিপদের দিকগুলো যদি ভারত জারি রাখে তবে এসবের সম্মিলিত ফলাফলে আগামী বছর দেশী বাজার বাংলাদেশের গরু আবার দখল করে নেবে। ফলে তা ভারতীয় গরু ব্যবসায়ীর কাছ থেকে দেশের বাজার উদ্ধার করে আনতে সক্ষম হওয়ার সম্ভাবনা।

যে পর্যায়টা পেরোনো সবচেয়ে কঠিন ছিল এবং আমরা পেরোতে পেরেছি তা হলো, বাজার কি এবারো একটু চড়া থাকবে? নাকি চাহিদা-জোগানের ভারসাম্যহীন হয়ে ক্রেতার মর্জির বাজারে সব ঝড় ব্যবসায়ীর ওপর দিয়ে যাবে? বাজার একটু চড়া যাবে এটা কাম্য ছিল। তাই হয়েছে। সব মিডিয়ার রিপোর্ট হচ্ছে, শেষ দিনের দিকে হাটে গরুর অভাব বোঝা যাচ্ছিল, ফলে বাজার বিক্রেতার পক্ষে সরে গিয়েছিল। এ ফেনোমেনাটা দেশী গরু পালক ও ব্যবসায়ীদের জন্য আগামীতে বিরাট প্রণোদনা হিসেবে কাজ করবে তথা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। 

Thursday, October 1, 2015

পররাষ্ট্র সম্পর্কের ক্ষেত্রে হঠাৎ অস্থিরতা

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সম্পর্কের ক্ষেত্রে হঠাৎ এক ধরনের অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশে বর্তমান সরকার ২০০৮ সালে যাত্রা শুরুর পর থেকে এ ক্ষেত্রে দৃশ্যমান একটি নীতি অনুসরণ করে আসছিল। সেই নীতি অনুসারে প্রতিবেশী ভারতের সাথে ছিল বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের ঘোষিত-অঘোষিত কৌশলগত সম্পর্ক। দেশটির উত্তর-পূর্বাংশের বিদ্রোহ দমন ও অন্যান্য নিরাপত্তা ইস্যুতে কোনো রাখঢাক ছাড়াই বাংলাদেশ সহায়তা করেছে। ভারতের অনুকূলে ট্রানজিট এবং কানেকটিভিটি প্রদানের ইস্যুতে করেছে সর্বোচ্চ পর্যায়ের সহযোগিতা। দেশের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে ভারতের স্বার্থবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত শক্তিকে দমন বা উৎখাতের জন্য সম্ভব সবকিছু করা হয়েছে। এ জন্য বড় রকমের অস্থিরতা সৃষ্টির মতো অবস্থা মোকাবেলার ঝুঁকিও নেয়া হয়েছে। 

গত সাড়ে ছয় বছরে ৫২টির বেশি দ্বিপক্ষীয় দলিল স্বাক্ষরিত হয়েছে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে। এর মধ্যে কানেকটিভিটি ও ট্রানজিট উন্নয়ন, জ্বালানি, অর্থনীতি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিক্ষা, পরিবেশ এবং নিরাপত্তাসংক্রান্ত নানা ইস্যু রয়েছে। এগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে সীমান্ত ইস্যু, সিকিউরিটি ও ল’ এনফোর্সমেন্ট সহযোগিতা, পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, বিদ্যুৎ খাত উন্নয়ন, কানেকটিভিটি ও বাণিজ্য ক্ষেত্রে কিছু উদ্যোগের বাস্তবায়ন হয়েছে। ট্রানজিট ও কানেকটিভিটির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ, ভুটান, ইন্ডিয়া ও নেপাল মোটর ভেহিক্যাল অ্যাগ্রিমেন্ট, টু ওয়ে কোস্টাল শিপিং অ্যাগ্রিমেন্ট এবং ইনল্যান্ড ওয়াটার ট্রানজিট কার্যকর করার বিষয় বেশ এগিয়েছে।

ভারতের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে অর্থনৈতিক, নিরাপত্তা এবং সংবেদনশীল অন্যান্য ইস্যুতে সরকার অঘোষিতভাবে নীরব সহযোগিতা করে গেছে। দেশের অভ্যন্তরীণ বা রাজনৈতিক কনজাম্পশনের জন্য প্রধানত যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপারে কিছু রেটরিক ধরনের বৈরী বা বিদ্বেষ প্রকাশমূলক কথাবার্তা সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে বলা হয়েছে। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে অনুসৃত নীতিতে তাদের স্বার্থহানির মতো কোনো কিছু করা হয়নি। ২০১৩ সালে নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দেশটির পক্ষ থেকে বিশেষভাবে চাওয়া টিকফা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ। এর আগে ২০১২ সালে হিলারি ক্লিনটন-দীপু মনি দু’দেশের মধ্যে সহযোগিতার ব্যাপারে একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এর আওতায় দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ইস্যুতে পরস্পরের স্বার্থে অভিন্ন অবস্থান গ্রহণের কথা উল্লেখ করা হয়। দু’দেশের মধ্যে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ মোকাবেলায় সহযোগিতা ও সমন্বয়ের ব্যাপারেও গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি হয়েছিল। একই সাথে, দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের অংশীদার বিবেচিত হবে বলেও উল্লেখ করা হয়। এর আওতায় দু’দেশের মধ্যে বঙ্গোপসাগরে নিয়মিত যৌথ মহড়া অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

এর বিপরীত ক্ষেত্রে, বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক পরাশক্তি চীনের সাথেও সমান্তরাল সম্পর্ক রক্ষার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। চীনের অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যিক স্বার্থের প্রতি অধিক গুরুত্ব দেয়ার নীতি অনুসরণ করার পরিপ্রেক্ষিতে তাদের সরকারি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে নানা ধরনের কন্টাক্ট দিয়ে বোঝানো হয়েছে, সরকার চীনা স্বার্থ রক্ষার ব্যাপারে পুরোপুরি সজাগ। গভীর সমুদ্রবন্দরের মতো কিছু সংবেদনশীল কাজের ব্যাপারেও চীনকে অব্যাহতভাবে প্রতিশ্রুতি দিয়ে যাওয়া হয়েছে। দু’দেশের মধ্যকার বাণিজ্য ইতোমধ্যেই এক হাজার কোটি ডলারে উন্নীত হয়েছে, যা যেকোনো দেশের সাথে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অঙ্ক।

বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি ও সাম্প্রতিক সময়ে প্রভাব বিস্তারের ব্যাপারে আগ্রাসী হয়ে ওঠা রাশিয়ার সাথেও সরকার সচেতনভাবে নানা ধরনের স্বার্থগত সম্পর্ক নির্মাণ করছে এবং পুরনো লেনদেন অব্যাহত রাখছে। এ ক্ষেত্রে তেল ও গ্যাস খাতে রাশিয়ার গ্যাজপ্রমের সাথে অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি করা হয়েছে। সবচেয়ে বড় যে কাজটি রাশিয়াকে দেয়া হয়েছে, তা হলো- ২০০ কোটি ডলার (১৬ হাজার কোটি টাকা) ব্যয় সাপেক্ষ দুই হাজার মেগাওয়াটের পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ। এ ব্যাপারে দেশের ভেতরে-বাইরে কোনো ধরনের সমালোচনাকেই গুরুত্ব দেয়া হয়নি। সারা বিশ্ব যেখানে পারমাণবিক বিদ্যুৎ বা অন্যান্য প্রকল্পের ঝুঁকি বিবেচনায় এ ধরনের প্রকল্প ধীরে ধীরে পরিত্যাগ করছে, সেখানে রাশিয়ার মতো দেশের দুর্ঘটনাপ্রবণ ও ঝুঁকিপূর্ণ পারমাণবিক প্রকল্প গ্রহণ করে তা বাস্তবায়নও শুরু করে দেয়া হয়েছে। 

সংবিধান থেকে মুসলিম দেশগুলোর সাথে বিশেষ সম্পর্ক রাখার অনুচ্ছেদ বাতিল এবং মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠভাবে চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে সরকারের নীতিতে দৃশ্যমান অনাগ্রহই ব্যক্ত হয়েছে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে তাদের সাথে সম্পর্ক যাতে ভেঙে না পড়ে, সে জন্যও নানাভাবে প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে। এ ব্যাপারে মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও হিসাব নিকাশকে ব্যবহার করা হয়েছে বিশেষভাবে। 

একটি প্রতিবেশী দেশের সাথে নির্ভরশীলতা এবং বিশেষ সম্পর্ক রেখে বাকি শক্তিগুলোর সাথে কৌশলগত ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে যে ধরনের কৌশলী পদক্ষেপ নেয়ার কথা, তা সব ক্ষেত্রেই সম্ভব হয়েছে, তা বলা যাবে না। এ নিয়ে কোনো কোনো শক্তিমান দেশের সাথে সম্পর্র্কে টানাপড়েনও দেখা দিয়েছে। কিন্তু তা ম্যানেজ করার ক্ষেত্রে সরকার নানাভাবে সফলও হয়েছে। ফলে সরকারের পতন ঘটার মতো পরিস্থিতি বিভিন্ন সময় দেখা দিয়েছে বলে মনে করা হলেও কার্যক্ষেত্রে সে রকম কিছু ঘটেনি। লেজিটিমেসি বা বৈধতা প্রশ্নে প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন করে কেবল রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ও পুলিশি শক্তি প্রয়োগে সরকার ক্ষমতাকে অব্যাহত রাখতে পেরেছে, যা অনেকের কাছে বিস্ময়কর মনে হয়েছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত বিষয় ছিল বিশ্বকে যেসব করপোরেট ও স্বার্থগত গোষ্ঠী নিয়ন্ত্রণ করে, তাদের মূল জায়গার সাথে বিশেষ সম্পর্ক তৈরি করা। সরকার এ ব্যাপারে বৈশ্বিকভাবে প্রভাবশালী ও কার্যকর উচ্চ ক্ষমতার লবিস্ট ফার্মের সহায়তা নিতে পেরেছে। 

তবে ক্ষমতার মেয়াদ দীর্ঘ হতে থাকলে পরস্পর বৈরী শক্তিগুলোর সাথে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করা অনেক সময় দুরূহ হয়ে পড়ে। নানা ধরনের বৈশ্বিক স্বার্থগত সঙ্ঘাত দেখা দেয় বিভিন্ন বিপরীত পক্ষকে দেয়া সরকারের প্রতিশ্রুতি রক্ষার ব্যাপারে। এ সঙ্ঘাতে সৃষ্ট চাপের মুখে অনেক প্রতিশ্রুতি রক্ষা সম্ভব হয় না এবং এতে বিশ্বাস হারানোর মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। তেমন একটি চ্যালেঞ্জ সরকার এখন মোকাবেলা করছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। 

পররাষ্ট্র সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক ধরনের বিশেষ অস্থিরতা লক্ষ করা যাচ্ছে। ভারতের ক্ষমতায় পালাবদল ঘটে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সরকারের বিদায়ের পর বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকার আসায় বাংলাদেশে তাদের অনুসৃত নীতিতে কিছু পরিবর্তন আসবে বলে ধারণা করা হয়েছিল। কিন্তু গত দেড় বছরে তেমন কিছু সেভাবে দৃশ্যমান হয়নি। বরং আন্তঃরাষ্ট্র সম্পর্কের ক্ষেত্রে কিছু অগ্রগতি দেখা গেছে। এ ক্ষেত্রে ভারতের আমলা, গোয়েন্দা ও সিভিল সোসাইটিকে বাংলাদেশের সরকারের পক্ষে প্রভাবিত করার প্রচেষ্টা ভালো ফল দিয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক কিছু ঘটনায় এ ক্ষেত্রে কিছুুটা ব্যতিক্রম ঘটার মতো সঙ্কেত পাওয়া যাচ্ছে। ভারতে সরকার পরিবর্তনের পর বাংলাদেশের ব্যাপারে একটি পরিবর্তন বিশেষভাবে লক্ষণীয় ছিল। সেটি হলো, সরকারের সাথে দিল্লির এক ধরনের মসৃণ সম্পর্ক বজায় রাখার প্রচেষ্টা থাকলেও অন্য রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সাথে সমান্তরাল সম্পর্ক সৃষ্টির চেষ্টা। কূটনীতিতে যেটাকে ‘সব ডিম এক ঝুড়িতে না রাখার নীতি’ বলে তার অংশ হিসেবে বিএনপির সাথেও এক ধরনের যোগাযোগ ভারতীয় স্টাবলিশমেন্ট তৈরি করেছে। এই যোগাযোগকে সরকার খুব বেশি যে স্বস্তির সাথে নিতে পারছে না তার ইঙ্গিত পাওয়া যায় গত আগস্টের শেষ সপ্তাহে মন্ত্রিসভার এক বৈঠকের অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় ভারতের গোয়েন্দাদের বিএনপির সাথে যোগাযোগ রক্ষার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর কিছু সংবেদনশীল মন্তব্যে। 

এ মন্তব্যকে রেটরিক মনে না করার মতো কিছু কার্যক্রমও পরে দৃশ্যমান হয়। চীনকে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল করতে দেয়ার জন্য এমওইউ চুক্তি হয়। এই সমঝোতা স্মারক বলে চায়না হারবার ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড আনোয়ারার ৭৭৪ একর জমির ওপর একটি বিশেষ শিল্প জোন স্থাপন করবে। এর বাইরে সেই আনোয়ারারই আরেকটি স্থানে অন্য এক চীনা কোম্পানি চায়না মেশিনারি ইন্ডাস্ট্রি অ্যান্ড এক্সপোর্ট কপোরেশনকে ৫০৪ একর এলাকা ভিন্ন একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার জন্য দেয়ার বিষয়ও বিবেচনার মধ্যে রয়েছে। এর বাইরে গভীর সমুদ্রবন্দর এবং একটি বিমানবন্দর নির্মাণের কাজও চীনা প্রতিষ্ঠানকে দেয়ার ব্যাপারে নতুন করে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। এর বাইরে ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট, ইন্টারনেটের থ্রি-জি প্রযুক্তি চালু এবং ২৫জি নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণসহ হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প প্রস্তাব সরকারের অনুমোদন প্রক্রিয়ার বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে।

চীনের সাথে যখন এ ধরনের জোরালো সম্পর্ক নির্মাণের প্রচেষ্টা লক্ষ করা যাচ্ছে, তখন দু’দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের চার দশক পূর্তিকে উপলক্ষ করে দেশটির প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরের জন্য একটি চেষ্টা চলছে। ধারণা করা হচ্ছে, এই সফর চীনের দুই নাম্বার ক্ষমতাধর ব্যক্তির কোনো সাধারণ সফর হবে না। এটি হবে চীনের সাথে বাংলাদেশের নতুন করে কৌশলগত ও বড় রকমের অর্থনৈতিক সম্পর্ক তৈরির সফর। 

এশিয়ার রাজনীতিতে চীনের এমন এক অবস্থান রয়েছে যার কারণে দেশটির সাথে আমেরিকা বা অন্য কোনো পাশ্চাত্য দেশ যেমন নানাভাবে এই অঞ্চলে কাজের সম্পর্ক বজায় রাখে, তেমনিভাবে ভারতও তার অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অন্যান্য বৈশ্বিক সাধারণ স্বার্থে সম্পর্ক বজায় রাখে বেইজিংয়ের সাথে। কিন্তু অন্য কোনো দেশ চীনা বলয়ে চলে যাক, সেটি কোনোভাবেই মেনে নিতে চায় না ভারত বা আমেরিকা কেউই। শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ ও নেপাল নিয়ে এ ধরনের টানাপড়েন নিকট অতীতে হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ ধরনের কিছু ঘটার ব্যাপারে এক ধরনের শঙ্কা কাজ করছে। 

আন্তঃআঞ্চলিক এ ধরনের মেরুকরণ সাধারণত বড় কোনো গেমের অংশ হিসেবে ঘটে থাকে। বাংলাদেশ তেমন এক পর্বে নতুন করে প্রবেশের কিছু লক্ষণ এখন দৃশ্যমান হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ কয়েকটি ঘটনার মধ্যে রয়েছে, ট্রানজিটের অবকাঠামো নির্মাণের কাজে কিছুটা ধীর গতি সৃষ্টি এবং ট্রানজিট ফি নির্ধারণ নিয়ে ভারতের সাথে বিরোধের বিষয়টি প্রকাশ্যে চলে আসা, নিরাপত্তার অজুহাতে অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট টিমের শেষ মুহূর্তে বাংলাদেশ সফরে না আসা এবং এর পরপরই কূটনৈতিক জোনে ইতালিয়ান নাগরিক হত্যা ও যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডাসহ বেশ কয়েকটি পশ্চিমা দেশের বাংলাদেশে চলাচলের ক্ষেত্রে তাদের নাগরিকদের সতর্ক করা। তদুপরি, এর সাথে জঙ্গি সংগঠন আইএসকে সংশ্লিষ্ট করে ফেলা। 

এখনকার নানা ঘটনাপরম্পরা অবলোকন করলে মনে হয় বর্তমানে যা কিছু ঘটছে, তা অনেক বড় কিছুর ইঙ্গিত মাত্র। এটি হতে পারে বাংলাদেশে জঙ্গি উত্থানের এমন এক আশঙ্কা সৃষ্টি করা, যাতে পাশ্চাত্য অংশগ্রহণমূলক একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে নতুন করে যে চাপ সৃষ্টি করছে তা থেকে বিরত থাকে এবং দমনমূলক নীতি চালিয়ে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার বিষয়ে সরকারকে অনুমোদন করে। চীনের সাথে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করার বিষয়টিকে একটি হুমকি হিসেবে সামনে রাখা যেন নির্বাচনের জন্য চাপাচাপি করা হলে চীন-রাশিয়ার বলয়ে কৌশলগত অবস্থান নিতে পারে এ সরকার। আর তারা নির্বাচন ছাড়াই ক্ষমতায় থাকতে সব ধরনের সহায়তা দিতে পারে। এ বার্তাটি পাশ্চাত্য ও ভারত দুই পক্ষের কাছে দেয়ার একটি প্রচেষ্টা সাম্প্রতিক ঘটনায় থাকতে পারে। 

বাংলাদেশের মতো একটি দেশে কৌশলগত সম্পর্ক নিয়ে এ ধরনের ‘খেলাধুলা’ যে বড় রকমের ঝুঁকি তৈরি করে, তার উদাহরণ এর আগে দেখা গেছে। কিন্তু এরপরও কোন হিসাব নিকাশের ভিত্তিতে মারাত্মক ঝুঁকি গ্রহণ করার বিষয় বিবেচিত হচ্ছে তার রহস্য এখনো স্পষ্ট হচ্ছে না। এ জন্য চলমান নানা ঘটনায় গভীর নজর রাখার প্রয়োজন রয়েছে।