Saturday, October 3, 2015

ভারতে গরুর গোশতে কেন অস্বস্তি?

বাংলাদেশের এবারের কোরবানি এক বিশেষ ধরনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে। ভারতীয় গরু ছাড়া বাংলাদেশের কোরবানির ঈদ কাটানো কি সম্ভব নয়! ব্যাপারটা সাহসের সাথে এর আগে পরীক্ষা করে দেখা হয়নি কখনো। এবার সে সুযোগ পাওয়া গেছে এবং ভারতীয় গরু তেমন সরবরাহ ছাড়াই এবার আমাদের কোরবানির ঈদ ভালোভাবেই কেটে গেল। অন্তত বাজারে গরুর সরবরাহে বড় সঙ্কট দেখা যায়নি। সবার এবারই এ এক প্রথম অভিজ্ঞতা। প্রমাণ হয়েছে এটা কঠিন কিছু নয়। বরং ভারতের ‘গরু অবরোধ’ শাপে বর হয়েছে বলতে হবে, এমনটাই হওয়ার কথা ছিল। 

গত ৪ মার্চ ভারতে গরু জবাইবিরোধী এক আইন জারি করা হয়েছে। কথাটা বললাম বটে, পাবলিক পারসেপশনও অনেকটা এরকম। তবু কথাটা ঠিকঠাক শুদ্ধভাবে বলা হয়নি। আইনটা সারা ভারতের ওপর বলবৎ হয়নি, মানে কেন্দ্রীয় মোদির সরকার বা জাতীয় সংসদ এমন কোনো আইন পাস করেনি। আইন পাস করেছে শুধু মহারাষ্ট্র রাজ্যের প্রাদেশিক সরকার (মুম্বাই যার রাজধানী)। ফলে আইনত তা ভারতজুড়ে নয়, শুধু মহারাষ্ট্র রাজ্যসীমানার মধ্যে এ আইনি নিষেধাজ্ঞা বলবৎ হয়েছে। এতে সব ধরনের গরু জবাই করা, বহন করা, দখলে রাখা, জবাইয়ের জন্য অন্য রাজ্যে বহন করে নেয়া অথবা জবাই করে নিয়ে আসা ইত্যাদি সবই ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে; যার শাস্তি ছয় মাস থেকে পাঁচ বছরের জেল অথবা এক থেকে ১০ হাজার রুপি জরিমানা। এ ছাড়া এ অপরাধে মামলা হলে সেটা অজামিনযোগ্য অপরাধ বলে গণ্য হবে।

মহারাষ্ট্রে জারি ওই আইনের নাম ‘মহারাষ্ট্র অ্যানিমেল প্রিজারভেশন (অ্যামেন্ডমেন্ট) অ্যাক্ট ১৯৯৫’। অ্যামেন্ডমেন্ট অর্থাৎ এটা আগের কোনো আইনেরই একটা সংশোধিত আইন। হ্যাঁ তাই। প্রথম এমন আইন করা হয়েছিল ১৯৭৬ সালে। কংগ্রেস দলের শঙ্কর রাও চৌহানের সরকারের সময়, যে সময় কেন্দ্রে কংগ্রেসের জরুরি আইন জারি করে ইন্দিরা গান্ধীর শাসন চলছিল। তবে রাজ্যে কংগ্রেসের হাতে আইনটি পাস করার কার্যক্রম কখনোই শেষ হয়নি। পরে ১৯৯৫ সালে ওই আইনটিই আবার তবে এবার বিজেপি-শিবসেনা সরকারের হাতে সংশোধিত ও হাজির করা হয়। সে আইনটিই ‘মহারাষ্ট্র অ্যানিমেল প্রিজারভেশন (অ্যামেন্ডমেন্ট) অ্যাক্ট ১৯৯৫’; কিন্তু ভারতের প্রাদেশিক মানে রাজ্য সংসদে কোনো আইন পাস হওয়ার পর ভারতের রাষ্ট্রপতির অনুস্বাক্ষর লাগে, যার পরই সেটি শুধু ওই রাজ্য সীমানায় বলবৎযোগ্য আইন বলে গৃহীত হয়। তাই নানা আইনি কৌশলগত দিক পূরণ করে ভারতের রাষ্ট্রপতির অফিস থেকে অনুমোদিত হয়ে আসতে আসতে পরের প্রায় ২০ বছর লেগে যায়।

বিজেপির নরেন্দ্র্র মোদি এবার ক্ষমতায় এসেছে মে ২০১৪ সালে। আর মহারাষ্ট্রে বিজেপির সরকার এসেছিল ওই একই বছরে পাঁচ মাস পরে, অক্টোবর ২০১৪ সালে। এরপর এবারের মহারাষ্ট্র বিজেপির রাজ্য সরকার গঠন হওয়ার পরে এই আইনের গেজেট হওয়ার দিন হিসাবে এ আইন ৪ মার্চ ২০১৫ থেকে বলবৎ হয়। তবে দেরি হওয়ার সবটাই কৌশলগত কারণ নয়। টেকনিক্যাল বা কৌশলগত কারণ কথাটা মুখ রক্ষার জন্য। স্পষ্ট করে বললে এ আইনের প্রয়োজনীয়তা এসেছে সস্তা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থেকে, যেটাকে বলা যায় কংগ্রেস নাকি বিজেপি, কে কত বড় ‘হিন্দুত্বের রাজনীতির’ দাবিদার এমন দুই খেদমতগারের প্রতিযোগিতা থেকে। এ নিয়েই কংগ্রেস ও বিজেপির বিপজ্জনক ও আত্মঘাতী প্রতিযোগিতা। তবে এ ঘটনার সাধারণ দিকটা হলো, দল দুটি মুখে যাই বলুক তারা উভয় দলই আসলে ‘হিন্দুত্বের রাজনীতি’ করে, তাই তাদের মূল প্রতিযোগিতা ‘হিন্দুত্বের রাজনীতি’ নিয়ে, কে কত বড় হিন্দুত্বের খেদমতগার তা প্রদর্শন করার প্রতিযোগিতা। এ আইন কেন্দ্র করে প্রথম প্রস্তাব থেকে চূড়ান্তভাবে পাস ও প্রয়োগে যাওয়া পর্যন্ত ঘটনাপ্রবাহ এরই এক ভালো প্রমাণ। মনে রাখা দরকার, কংগ্রেসের সরকারের হাত দিয়ে এ আইনের প্রস্তাবনার শুরু। আর চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়ার কর্তৃত্ব প্রেসিডেন্টের, ঘটনাচক্রে তিনিও কংগ্রেসেরই। আর বলা বাহুল্য, এ দুইয়ের মাঝখানের ঘটনাবলি সক্রিয়ভাবে সম্পন্ন করার ভূমিকায় বিজেপি। ফলে কেউ কম যায়নি, অন্যের থেকে পিছে পড়েনি, অবদান রেখেছে। তবে রেষারেষিতে প্রতিযোগিতা যেমন থাকে, তেমনি সময়ে ঢিল দিয়ে ফেলে রাখাও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বিবেচিত হয়। দেরি হওয়ার মূল কারণ এখানে। এ ছাড়া দেরি হওয়ার আরেক মূল কারণ সস্তা জনপ্রিয়তার জন্য দল দুটোর হয়তো এ আইন প্রয়োজন; কিন্তু মানুষের দৈনন্দিন জীবন সংগ্রামে এর কোনো ভূমিকা নেই। ফলে গণতাগিদ নেই। ফলে কোনো তাড়া নেই।

সংসদে কোনো আইন প্রণয়ন করার সময় আইনটা কেন করা দরকার ‘উদ্দেশ্য কী’ তা স্পষ্ট উল্লেখ করতে হয়। এটা বাধ্যতামূলক। স্বভাবতই এ আইনটা পাস হয়ে যাওয়ার পরে এখন আইনটি সম্পর্কে যে ব্যাখ্যা দেয়া হচ্ছে এর সাথে আগে ‘লিখিত স্পষ্ট উল্লেখ করা; উদ্দেশ্যের কোনো সম্পর্ক নেই। না কংগ্রেস, না বিজেপি; যার যার সময়ে আইনটিতে হাত লাগানোর সুযোগ পেয়েছে; কিন্তু কেউ উল্লেখ করেনি যে, হিন্দুত্বের সুড়সুড়ি দিতে ‘পবিত্র পূজনীয় গোমাতা রক্ষার প্রয়োজনে’ এরা এ আইনটি চাচ্ছেন। যেমনটা এখন ব্যাখ্যা দেয়া হচ্ছে। বরং উভয় দলই উদ্দেশ্যের ঘরে লিখেছিল, গোদুধ পাওয়ার জন্য, চাষাবাদ ও মাল টানাতে বলদের ব্যবহারের উদ্দেশ্যে গরু, বলদ, বাছুরসহ সব ধরনের গরুর সংরক্ষণ, সুরক্ষা এ আইনের উদ্দেশ্য। সার কথায় কৃষিকাজ, ফলে মানুষের জীবনযাপন সহজ করার জন্য গোসম্পদ রক্ষা এখানে উদ্দেশ্য। আপাত চোখে মনে হতে পারে ভালোই তো ‘গোমাতা রক্ষার্থের মতলব’ এই আসল উদ্দেশ্য তো ভালোভাবেই লুকিয়ে একটা মিথ্যা উদ্দেশ্য দেখাতে পেরেছিল। না, আসলে পারেনি। যদি কৃষির প্রয়োজন উদ্দেশ্য হিসাবে দেখানো হয়ে থাকত তবে আইনের মুসাবিদা ভিন্ন রকম হতে হতো। যেমন- সব ধরনের গরুর ওপর ঢালাওভাবে এ আইন জারি করা হয়েছে; কিন্তু এমন গরুও তো থাকবে জন্মাবে যে দুধও দেয় না, মালামালও টানে না, আবার বাছুরও না, ফলে গোশতের উৎস হিসেবে ব্যবহার হতে পারে- জন্ম থেকেই এমন গোশতের ক্যাটাগরির গরু তো না চাইলেও জন্ম নেবে। এ ছাড়া এমন গরু পরিকল্পিতভাবেই গোশতের উদ্দেশ্যে পালন করলেই বা অসুবিধা কী? এটা তো কোথাও প্রমাণ হয়নি, গোশতের জন্য গরু পাললে সে দেশে কৃষিকাজে গরুর অভাব দেখা দেবে। আকার-ইঙ্গিতে এখানে অর্থ করা হয়েছে যেন ভারতের দুই হিন্দুত্বের দলই কৃষিকাজের সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে খুবই উদ্বেগ থেকে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আচ্ছা ভারতের কৃষিতে গরুর বড় অভাব চলছে ব্যাপারটা কি সেরকম? কোনো সহায়ক গবেষণা বা তথ্য কি আছে, যা এমন অনুমান সমর্থন করে? জানা যায় না। বরং ভারতের কৃষি অর্থনীতির কাছে নিজ দেশে গরু পালন ও বড় করে বাংলাদেশ হলো বিক্রির এক বিরাট লোভনীয় বাজার। চাহিদা-বাজার-অর্থনীতিবিষয়ক এ তথ্য মহারাষ্ট্রের জবাই নিষিদ্ধ আইনে ‘লিখে রাখা’ উদ্দেশ্যকে সমর্থন করে না। এ ছাড়া এমন গরু কি হবে না, যার আর দুধ হয় না, হবে না; আবার মালামালও তেমন টানতে পারে না; কিন্তু এখনো কয়েক বছর আয়ু আছে। সেসব গরু কী করা হবে? মালিককে এমন গরু হয় কাজ ছাড়া বসিয়ে বসিয়ে খাওয়াতে হবে, নইলে না খাইয়ে মেরে ফেলতে হবে। কারণ গোশতের জন্য তো বিক্রি নিষেধ। কেন? এসব প্রশ্নের জবাব আইনে প্রদত্ত উদ্দেশ্যের মধ্যে নেই, লুকানো হয়েছে। অর্থাৎ যে ক্যাটাগরির পালিত গরু গোশতের জন্য ব্যবহার হতে পারে সে ক্যাটাগরির গরু প্রসঙ্গে কিছুই না বলে উহ্য রেখে দেয়া হয়েছে। আবার ও দিকে কৌশলে কথার মারপ্যাঁচে ‘সব ধরনের গরুর ওপর’ নির্বিচারে নিষেধাজ্ঞা বলবৎ করা হয়েছে- এর ভেতর দিয়ে আইনটির উদ্দেশ্য লুকানোর চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে গেছে। এ ছাড়া মোদি সরকারের নেতা, মন্ত্রী তো গোমাতা রক্ষার উদ্দেশ্যে এ আইন করা হয়েছে তা খোলাখুলিই বলছে।

ভারতের বিচারব্যবস্থা বিশেষ করে উচ্চ আদালতে বিচারমান বাংলাদেশের চেয়ে অনেক উঁচুতে, গুণে মানসম্পন্ন। ফলে ‘পবিত্র পূজনীয় গোমাতা রক্ষার্থে’ কথাটা আইনের উদ্দেশ্যের মধ্যে কংগ্রেস বা বিজেপি যে কেউ যদি লিখত তবে ওই আইন আদালতে চ্যালেঞ্জ হয়ে তা নাল অ্যান্ড ভয়েড মানে বাতিল হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা ছিল। অনুমান করা যায়, এ কারণেই দুই দলের নেতাদের সাহসে কুলায়নি আইনটির প্রকৃত উদ্দেশ্যই স্পষ্ট প্রকাশ করে।

কংগ্রেস ও বিজেপিসহ ভারতের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব যারা ভারতে গরু জবাইবিরোধী আইনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন, তারা আসলে কী চান এর আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। অনেকের শুনে হয়তো অবাক হবেন, ভারত এক গরুর গোশত রফতানিকারক দেশ। বলা হচ্ছে, ভারত মোট গরুর গোশত উৎপাদন করে ৩৭ লাখ মেট্রিক টন, যার প্রায় ২০ লাখ টন অভ্যন্তরীণ বাজারে ভোগ্য হয়, আর বাকি ১৭ লাখ টন বিদেশে রফতানি হয়। অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক রফতানি হয়, এটা ২০১২ সালের তথ্য। এ সংখ্যাতেই ভারত বিফ উৎপাদক হিসেবে পঞ্চম আর রফতানিকারক হিসেবে প্রথম স্থান দখলকারী। আবার দামের অঙ্কে বললে, ২০১৩ সালে বিফ থেকে পাওয়া রফতানির মোট আয় ছিল ৪৫০ কোটি ডলার। এপ্রিল-নভেম্বর ২০১৪ সালের এ আট মাসে এর আগের বছর ঠিক ওই আট মাসের তুলনায় রফতানি ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে। তবে একটি কথা মনে রাখতে হবে, এখানে বিফ বললেও রফতানির অফিসিয়াল ডকুমেন্টে এগুলো ‘বাফেলো মিট’ দেখিয়ে আইনত বৈধ করে নেয়া হয়েছে। কারণ মহিষের গোশতের বেলায় জবাই, বহন, দখলে রাখা সবই বৈধ, কোনো বিধিনিষেধ নেই। এখন কাগজপত্রে গরুর জায়গায় কেটে মহিষ লিখে রাখা কোনো বড় ব্যাপার নয়; কিন্তু প্রায় ৪০ লাখ টনের গোশত সমাজ কমিউনিটি থেকে বের করে আনতে গরুর রক্তের ছোটখাটো অন্তত ডোবা না তৈরি করে তা করা সম্ভব নয়। বলাই বাহুল্য, সমাজের এক বড় অংশকে খোলাখুলি না জানিয়ে এটা করা সম্ভব নয়, অন্তত শহরের কশাই কমিউনিটি আর তাদের মাধ্যমে অন্যরা তো জানবেই। এ ছাড়া এই বিশাল গোশতের রফতানিকারক ভারত, এ কথা প্রমাণ করে যে, ‘কৃষিকাজের উদ্দেশ্যে গোসম্পদ সংরক্ষণ’ এটা সাদা মিথ্যা কথা। এরই মধ্যে গরুর গোশতের রফতানির পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় তা উল্লেখ করে কংগ্রেস নেতা দিগি¦জয় সিং মোদির সরকারকে খোঁচা দিয়েছেন।

ভারতের গরু গোশত রফতানির ফেনোমেনাটা বেশ তামাশার। বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কথাগুলো বলার কারণ, ভারত গরুর গোশত রফতানি করে কথাটার অর্থ হলো, ভারতের বিদেশের মুসলমান ছাড়াও অন্যান্য অজানা লোকের জন্য গরু জবাই করতে রাজি, গোশত পাঠাতে রাজি। তাতে ভারতের কোনো অস্বস্তি নেই, কোনো ধর্মীয় বাধা অনুভব নেই; কিন্তু এই গোশত যদি ভারতের মুসলমানেরা খেতে চায় তাহলেই আকাশ ভেঙে পড়বে মনে করা হবে। নিজেদের ধর্ম নষ্ট হচ্ছে মনে করা হবে। একইভাবে বলা যায়, এই গোশত রফতানিতে বিজেপির কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের কোনো আপত্তি নেই; কিন্তু বিদেশ বলতে বাংলাদেশ বোঝানো যাবে না। বাংলাদেশে গেলে ভীষণ আপত্তি। বাংলাদেশে ভারতের গরু আসতে পারবে না। বাংলাদেশের ওপর এই আপত্তি কারণ এই গোশত মুসলমানেরা খাবে তাই। এটা এক প্যাথোলজিক্যাল কেস! অসুস্থ মানুষের চিন্তার সমস্যা! 

সোজা ভাষায় বললে, এটাই ঘোরতর বর্ণবাদ। এমন মুসলমানবিদ্বেষ এটা জলাতঙ্কের চেয়েও ভয়াবহ ইসলামোফোবিয়া। তাই বলছিলাম, মহারাষ্ট্রে কংগ্রেস ও বিজেপির উদ্যোগে গরু জবাইবিরোধী আইনটা খোলাখুলি মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়ানো ছাড়া এর আর কোনো উদ্দেশ্য নেই। 

পাঠককে আবার স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, গরুর গোশত জবাই, বিক্রি, বহন, দখল ইত্যাদি নিষিদ্ধ আইনটি কেবল রাজ্যের বিষয়, ভারতের সব রাজ্যে বলবৎ হয়েছে এমন নয় বা কেন্দ্রীয় সরকারের আইন নয়। অর্থাৎ মোদি সরকারের আইন নয় এটা। মোদি ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে বহু লেখায় বলে আসছি যে, মোদি সরকার বা মোদির দল বিজেপির মুসলমানবিদ্বেষী এবং প্রায়ই বর্ণবাদী হয়ে ওঠা বক্তব্য বা নীতি এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছে। মোদি দলের কর্মসূচিগুলো যেমন ‘ঘর ওয়াপসি’ সাথে তার সরকারের কোনো সম্পর্ক নেই এমন যোগাযোগহীন অবস্থা দেখিয়ে থেকেছেন। একসময়ে বিশেষত ক্রিশ্চিয়ান স্থাপনা বা চার্চে আক্রমণ, ঘর ওয়াপসি কর্মসূচির নামে দলের মুসলমানদের প্রতি বিদ্বেষ ও ফোবিয়া ছড়ানোর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে দাঁড়াতে মোদিকে নিজের দলের কর্মসূচি, দলের নেতা, এমনকি আরএসএসের নেতাদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে হুঁশিয়ারি দিতেও আমরা দেখেছি; কিন্তু স্পষ্ট করে বলা দরকার, গরু নিষেধাজ্ঞা ইস্যুতে এসে নরেন্দ্র মোদি পুরোপুরি পরাজিত হয়েছেন ও সারেন্ডার করেছেন। তিনি অবলীলায় এখন রাজ্য সরকারের গরু জবাই নিষিদ্ধ আইনের পক্ষে খোদ নিজ কেন্দ্রীয় সরকারকে দাঁড় করিয়েছেন। ফলে এবার যেন আর তিনি শুধু বিজেপি নয় একেবারে আরএসএসের প্রধানমন্ত্রী মোদি হিসেবেই হাজির হয়েছেন।

এর ফলে প্রথমত মোদির কাছে যে প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই তা হলো : এক. তার সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং কেন সামান্য এক রাজ্য সরকারের গোজবাই নিষিদ্ধ আইন ও কর্মসূচি ফেরি করতে বাংলাদেশ সীমান্তে বিএসএফের কাছে এলেন? অথচ রাজ্য সরকারের কোনো কাজ, আইন বা নীতির দায় কোনোভাবেই কেন্দ্রের সরকারের নেই, কোনোভাবেই সম্পর্কিত নয়। ফলে মোদি সরকার মনে করলেও বা দাবি করলেও আইনত তার কোনো গোজবাই নিষিদ্ধ আইন বলে কিছুই নেই। অথচ অনুমানে ধরে নেয়া হয়েছে যেন কেন্দ্রীয় সরকারের এমন এক কল্পিত আইন আছে। ফলে কল্পিত গোজবাই নিষিদ্ধ কর্মসূচি অনুযায়ী বিএসএফকে পরিচালিত হতে তিনি নির্দেশমূলক বক্তৃতা দিয়েছেন। অথচ এমন আইন তার বাস্তবে সরকারের নয় বলে তার সরকারের এ বিষয়ে বাংলাদেশকে জানানোরও কিছু নেই, তিনি কখনোই জানাননি। অথচ সীমান্তে এসে রাজনাথ বাংলাদেশের মানুষকে কিভাবে গরুর গোশত না খাইয়ে মারবেন, মুসলমান বিদ্বেষমূলক দামামা তিনি বাজালেন। তিনি বললেন, ‘বাংলাদেশে গরুর দাম যেন এত বেড়ে যায় যে, বাংলাদেশের মুসলমানেরা গরুর গোশত খাওয়া ছেড়ে দেয়। এমন ব্যবস্থার পক্ষে বিএসএফকে তৎপর হতে হবে।’

শকুনের বদদোয়ায় গরু মরে না। তা হলে তো শকুনের খাদ্য হতে মৃত গরুতে ভাগাড় ভরে উঠত। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভারতের তামাশার গরু অবরোধের মধ্যে বাংলাদেশের এবার প্রথম এক কোরবানির ঈদ কাটল। নিঃসন্দেহে এক নতুন অভিজ্ঞতা। শুধু অর্থনীতির চোখে দেখলে আমাদের এ ঈদটা হলো, মূলত শহুরে ক্রেতা আর গরুর ব্যবসায়ী এ দুইয়ের পরস্পর পরস্পরের ওপর সুবিধা নেয়ার জন্য বাজারের খেলা। শেষের দিনগুলোয় এটা এমনকি ঘণ্টায় ঘণ্টায় সিচুয়েশন কার পক্ষে যাবে কে কার ওপর কিছুক্ষণ সুবিধা পাবে এরই লড়াই। ফলে এটা এক বাজার এবং দরকষাকষি। কারণ, একমাত্র বাজারই সাব্যস্ত করে দিতে পারে ব্যবসায়ীর জন্য গরুটার সর্বোচ্চ দাম সে কত পেতে পারে। আবার ক্রেতার দিক থেকে সবচেয়ে কত কম দামে সে গরুটা কিনে বাসায় যেতে পারে। অতএব ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের জন্য সাম্যাবস্থার সেই অপটিমাম পয়েন্টটা কোথায় এরই খোঁজাখুঁজি চলে সেখানে। এটাকেই আমরা দরকষাকষি বলি। আর দরকষাকষি ছাড়া তা জানার আপাতত আর সহজ উপায় কই? তবে বাজারটা একপেশে যাতে না হয়ে যায় সেজন্য এমন পর্যাপ্ত ক্রেতা এবং বিক্রেতা যেন হাজির থাকে এটা নিশ্চিত করার এক ভূমিকা সরকারের আছে।

তাহলে মূল জিনিসটা হলো বাজার। রাজনাথসহ বিজেপির বন্ধুদের রাজনীতির সারকথা মুসলমানবিদ্বেষ, এ ছাড়া আর কিছু নয়। এরা যদি বাজারবিষয়ক কিছু কথা শিখে রাখতে পারতেন তাহলে হয়তো নিজেরা বেঁচে যেতেও পারেন। আমাদেরও উদ্ধার করতেন।

বাংলাদেশ ভারতের জন্য গরু বিক্রির বাজার এ কথাটার অর্থ হলো, বাংলাদেশের চেয়ে ভারতে গরুর উৎপাদন খরচ তুলনামূলক কম। বাংলাদেশে গরুর সমতুল্য ভিন্ন জিনিস উৎপাদনের বেলায় আবার সেগুলো গরুর চেয়ে লাভ বেশি। তাই দেশে বিনিয়োগ উদ্যোগ সবই গরুর দিকে ছিল না। এখন ভারত যদি তার পড়ে যাওয়া বাজার হেলায় হারাতে চায়, তবে সেটার ফল আমাদের জন্য আখেরাতে ভালো ছাড়া খারাপ হবে না। কী অর্থে? ভারতের সস্তা গরু আসে বলেই দেশে গরু পালন তেমন লাভজনক হয় না। ভারতীয় গরু আসেনি, এবার আসবে না, নাও আসতে পারে ইত্যাদি মেসেজের মধ্যে এবারের বাজার-অনিশ্চয়তায় আমরা পার করেছি। এমন মেসেজের ফলে বাজারে গরুর গড় দামের থেকে এবার দাম একটু চড়া গেছে; কিন্তু এতে বাড়তি যে মুনাফাটা এসেছে এটাই বাংলাদেশে গরু পালন-উৎপাদন ব্যবসায়কে আকর্ষণীয় করবে। প্রণোদনা হিসেবে কাজ করবে। সেই সাথে জান বাজি রেখে ভারতীয় গরু চোরাচালানে বাংলাদেশে আনার বিপদের দিকগুলো যদি ভারত জারি রাখে তবে এসবের সম্মিলিত ফলাফলে আগামী বছর দেশী বাজার বাংলাদেশের গরু আবার দখল করে নেবে। ফলে তা ভারতীয় গরু ব্যবসায়ীর কাছ থেকে দেশের বাজার উদ্ধার করে আনতে সক্ষম হওয়ার সম্ভাবনা।

যে পর্যায়টা পেরোনো সবচেয়ে কঠিন ছিল এবং আমরা পেরোতে পেরেছি তা হলো, বাজার কি এবারো একটু চড়া থাকবে? নাকি চাহিদা-জোগানের ভারসাম্যহীন হয়ে ক্রেতার মর্জির বাজারে সব ঝড় ব্যবসায়ীর ওপর দিয়ে যাবে? বাজার একটু চড়া যাবে এটা কাম্য ছিল। তাই হয়েছে। সব মিডিয়ার রিপোর্ট হচ্ছে, শেষ দিনের দিকে হাটে গরুর অভাব বোঝা যাচ্ছিল, ফলে বাজার বিক্রেতার পক্ষে সরে গিয়েছিল। এ ফেনোমেনাটা দেশী গরু পালক ও ব্যবসায়ীদের জন্য আগামীতে বিরাট প্রণোদনা হিসেবে কাজ করবে তথা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। 

No comments:

Post a Comment