Monday, September 21, 2015

অমরত্বের পথে যাত্রা

দিমিত্রি এস্কোভ একজন রাশিয়ান কোটিপতি। গণমাধ্যম ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তবে ৩২ বছরের এই মানুষটি আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছেন একটি অসাধারণ ধারণাকে বাস্তবে রূপদানের কর্মপ্রচেষ্টার জন্য। সেই প্রচেষ্টার অংশীদার অন্তত মনে করেন সব মরণশীল মানুষই। দিমিত্রির মূল চেষ্টাটি হলো মানুষকে অমরত্ব দান করা।
সে কাজের শুরুটা হয়েছিল ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। ‘ইনিশিয়েটিভ ২০৪৫’ নামের একটি প্রজেক্ট চালু করেন দিমিত্রি। তিনি তাঁর প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক। সে প্রজেক্টকে সফল করতে তৈরি করেন ‘গ্লোবাল ফিউচার ২০৪৫ কংগ্রেস’। কংগ্রেসের প্রথম সাধারণ সভাটি বসে ২০১২ সালে রাশিয়ার মস্কোতে। দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সভাটি হয় ওই বছরের ১৫ ও ১৬ জুন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে। সেখানে উপস্থিত হন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের নামকরা বিজ্ঞানী, রাজনীতিবিদ, মানবাধিকার কর্মী, ব্যবসায়ী ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব। তিনি তাঁর উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘মূল্যবোধের অবক্ষয়, যুদ্ধ, ব্যাধি ইত্যাদিতে সংকটের মুখে আছে পৃথিবী। এসব থেকে উত্তরণের পথ বের করতে না পারলে খুব তাড়াতাড়িই ধ্বংস হয়ে যাবে মানুষ। এ জন্য চালু করা হয়েছে ‘ইনিশিয়েটিভ ২০৪৫’। যা আধুনিক মানুষের একটি সমৃদ্ধ বিবর্তনের সূচনা করবে।’
দিমিত্রি এস্কোভের লক্ষ্য, মানুষকে অমর করে তোলা। শারীরিকভাবে অমর করতে না পারলেও হলোগ্রাফিক অবয়বের মাধ্যমে তা সম্ভব করে তুলতে চান তিনি। এই অবয়বের অন্য একটি নাম দিয়েছেন তারা ‘অ্যাভাটার’। তাঁদের অ্যাভাটারের মানে হলো-শরীর না থাকলেও অন্য কোনো বেশে উপস্থিত হওয়া বা অন্যের শরীরে স্থাপিত হওয়া। তবে হলোগ্রাফিক শরীরটি কাজ করতে পারবে তার শরীরে যে মানুষের মস্তিষ্ক স্থাপন করা হবে তার মতোই। পুরো কর্মপ্রক্রিয়াকে চারটি স্তরে ভাগ করে ৩০ জন বিজ্ঞানী এখন কাজ করে চলেছেন।
প্রথমে তাঁরা ২০১৫ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে তৈরি করবেন একটি রোবট দেহ। এটি হলো প্রথম প্রজন্মের অ্যানড্রয়েড রোবট। সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেক বেশি ক্ষমতাবান-বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে কাজ করতে পারবে, ক্লান্তিহীন গাড়ি চালাতে সক্ষম, যেকোনো উদ্ধার অভিযানে সাহায্য করতে সক্ষম, এমনকি অক্সিজেনও কম নেবে শরীরে। এমনকি কোনো দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেটিরও সমাধান করতে পারবে। রোবটটি চালিত হবে ‘ব্রেন কম্পিউটার ইন্টারফেস’-এর নামের এক ধরনের রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে। এটাই হলো অ্যাভাটারের প্রথম স্তর। তাদের ভাষায় ‘অ্যাভাটার এ’।
পরের স্তরে আছে ‘অ্যাভাটার বি’। এটি তৈরি করা হবে ২০২০-২৫ সালের মধ্যে। মৃত বা শারীরিকভাবে অক্ষম মানুষের সচল মস্তিষ্কও স্থাপন করা সম্ভব হবে, তার জন্যই তৈরি নকল শরীর। দেহ কাঠামোটি তৈরিতে ব্যবহার করা হবে খুবই উচ্চমানের হাইড্রো বায়ো-ইলেকট্রনিক ডিভাইস। তবে সমস্যা একটাই-কোনোভাবে মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া চলবে না। কারণ এটি পুনঃস্থাপন কষ্টসাধ্য।
তৃতীয় স্তরের নাম দেওয়া হয়েছে ‘রি-ব্রেন’ বা ‘মস্তিষ্কের পুনঃস্থাপন’। এই স্তরে রোবটের শরীরে স্থাপন করা হবে নকল মস্তিষ্ক। কৃত্রিমভাবে তৈরি এই মস্তিষ্ক সে মানুষটির ব্যক্তিত্ব, অভ্যাস, মূল্যবোধসহ অন্যান্য ক্ষমতা পুনঃস্থাপন করা হবে। এটি তৈরি করতে চান তাঁরা ২০৩০ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে। এই মস্তিষ্কের মাধ্যমে মানুষের চিন্তা ও কাজের ক্ষমতাকে হাজার গুণে বাড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হবে বলে আশাবাদী তাঁরা। আর সাধারণ মানুষ ইচ্ছা করলে এই মস্তিষ্কের মাধ্যমে নিজেকে একের বেশি বিষয়ে মনোনিবেশ করাতে পারবেন। সেটিও হবে অনেক গুণে বেশি কার্যক্ষম।
ইনিশিয়েটিভ ২০৪৫ সালের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো চতুর্থ স্তর। এটি তৈরি করা হবে ২০৪০-৪৫ সালের মধ্যে। এটাকেই ভবিষ্যতের মানবসভ্যতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় হিসেবে বিবেচনা করছেন তাঁরা। এই স্তরে তাঁরা মানুষকে হলোগ্রাফিক শরীর দিতে চান। যে শরীরের মূল চালিকাশক্তি-সে ব্যক্তির চিন্তা, কাজের ক্ষমতা, মূল্যবোধ ও ব্যক্তিত্ব। আর দিমিত্রি চান তাঁর নতুন মানুষটি হবেন দার্শনিক ভাবনা, মূল্যবোধ, সাংস্কৃতিক বিকাশ ও সৎ গুণাবলির অধিকারী। তাঁর এই মানুষ তৈরি করবেন নতুন চিন্তার অধিকারী হয়ে একটি মানবিক সমাজ, সুন্দর বিশ্ব।

NO VAT ON EDUCATION

১১ সেপ্টেম্বর বড় বড় দৈনিক পত্রিকার খবর হচ্ছে ঢাকা চট্টগ্রাম সিলেটে যানজট। কারা দায়ী? প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। কেন? তারা শিক্ষার ওপর ভ্যাট আরোপের প্রতিবাদে বিক্ষোভ করতে গিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো আটকে দিয়েছে। ফলে অসহ্য যানজট। গতকাল অধিকাংশ টেলিভিশানে এই ছিল খবর। আজ অধিকাংশ পত্রিকার কমবেশী একই হাল।

কোন কোন পত্রিকার খবর পড়ে বোঝার উপায় নাই তারা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের বিক্ষোভের খবর দিচ্ছে, নাকি যানজট বা সাধারন মানুষের দুর্ভোগের সংবাদ জানাতে চায়। যানজট হয়েছে সত্য, সাধারণ মানুষের ভোগান্তিরও শেষ নাই। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি আর বাতাসের আর্দ্রতার কারণে শেষ ভাদ্রের ভ্যাপসা গরম। সাধারণ মানুষের প্রচণ্ড কষ্ট হয়েছে। খবর হিসাবে যানজট আর সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ গুরুত্বপূর্ণ। অবশ্যই তা খবরে আসা উচিত। কিন্তু মুল খবরকে গৌণ করে যানজটকেই প্রধান খবর করা হলে তার পেছনে রাজনীতি থাকে। আর সেই রাজনীতি যে ছাত্রদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো শুধু তা নয়, সরকারের তাঁবেদারি করাও বটে। তবে সবাইকে টেক্কা দিয়েছে একটি ইংরেজি দৈনিক। তিন কলাম জুড়ে মস্তো ছবি। শিশুকোলে একজন মহিলা হেঁটে যাচ্ছে রাস্তায়। তার মাথার ওপর ছাতি ধরে রেখেছে দুইজন। সাধারণ মানুষ – বিশেষত নারী আর শিশুদের কষ্ট বোঝাতে এই বিশাল ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। এই খবর পড়বে দূতাবাস, বহুপাক্ষিক ও দ্বিপাক্ষিক সাহায্য সংস্থার কর্মকর্তারা এবং ঢাকার ধনি শ্রেণির সেই অংশ যারা বাংলাদেশে নেহায়েতই কাজের দরকারে থাকে। নইলে দেশের বাইরেই তাদের বাস। তাদের ছেলেমেয়েরা দেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে না। বিদেশে পড়েও বছরে একবার দুইবার দেশে বেড়াতে আসতে পারে। খবর পরিবেশনার মধ্য দিয়ে গণ্মমাধ্যমগুলো প্রমাণ করত চাইছে নিউ লিবারেল অর্থনীতি বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতায় শিক্ষার ওপর কর বসানোর বিরুদ্ধে ছেলেপিলেদের আন্দোলন ঠিক না। তাদের বিক্ষোভে সাধারণ মানুষের ভীষণ কষ্ট। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রদের প্রতি সাধারণ মানুষের সমর্থন নাই।

অনেক গণমাধ্যমের ভূমিকার মধ্যেই গড়বড় আছে। ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের ধরণ আমাদের জানা। তারা যানজট আর গণদুর্ভোগের কথা বলে ছাত্রদের বিক্ষোভ বিরোধিতা করবেই। অন্যদের ক্ষেত্রে মুশকিলটা খবরে নয়, মুশকিল হচ্ছে খবর পরিবেশনার মধ্যে। খবর পরিবেশনার মধ্য দিয়ে যানজট আর সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের খবর প্রধান করে ফেলায় প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদেরই দায়ী করা হয়ে যায়। ঘুরে ফিরে যাহা তেপ্পান্ন তাহাই ছাপান্ন। যানজট আর মানুষের ভোগান্তির দোষে ছাত্রদের দায়ী করে ছাত্রদের আন্দোলনের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করাকেই খবর হিসাবে হাজির করা, ক্ষমতাসীনদের পক্ষপাতী হওয়া। কিছু কিছু গণমাধ্যমের নির্লজ্জ সমর্থনে লজ্জাই পেতে হয়।

মনে আছে কিনা অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে আমার কোনো সমর্থন নেই। তারা ৫০ হাজার, ৩০ হাজার টাকা বেতন দিতে পারে; আর মাত্র সাড়ে সাত শতাংশ ভ্যাট কেন দেবে না? খবর পরিবেশনার মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের বিপরীতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি রিপোর্ট করার ক্ষেত্রে পারঙ্গম গণমাধ্যমগুলো আসলে অর্থমন্ত্রীকে জানান দিচ্ছে, আমরা আপনার সঙ্গেই আছি। আন্দোলনকারি পোলাপানদের পক্ষে না। ওরা বড়লোকের ছেরলে, কর দিতে পারে, কিন্তু দিতে চায় না। ওরা খারাপ।

কিভাবে কর্পোরেট স্বার্থ শ্রেণি নৈতিকতার বাচালগিরি করে সেটা খুবই মজার ব্যাপার! গরিবের ভোগান্তি হচ্ছে বলে ‘বড়লোক’ ছেলেপিলেদের ন্যায্য দাবির বিরোধিতা করা। ভাবখানা এমন যে কর্পোরেট মিডিয়া খুব গরিব বান্ধব! এটা শুধু বাচালতা নয় নৈতিক নোংরামিও বটে। কষ্ট তো গাড়িওয়ালা বড়লোকদের হয়েছে। তো তাদের বাদ দিয়ে গরিব মহিলা কেন? নোংরামি বলছি কেন? কারণ যদি গরিবের পক্ষেই এতো দরদ তাহলে শিক্ষা ব্যবস্থাকে যখন মুনাফা কামাবার ক্ষেত্র বানানো হচ্ছিল, তখন গরিবের প্রতি মহানুভব এইসকল গণমাধ্যম কোথায় ছিল?

আরও বলি। কোথায় ছিলেন আপনি মহামান্য অর্থমন্ত্রী? আপনি কি আশির দশকে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের অর্থনীতির কাঠামোগত সংস্কারের যুগে সামরিক শাসক হুসেন মোহাম্মদ এরশাদের মন্ত্রী ছিলেন না? ভুলে গিয়েছেন? আমাদের মনে আছে। আপনি ১৯৮২ সালের মার্চ থেকে ১৯৮৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এরশাদের মন্ত্রী ছিলেন। সেই শাসক, মনে আছে কি আপনার -- ছাত্রদের বুকের উপর গুলি চালিয়েছিল? মনে আছে কি ১৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৮২? আপনি ছাত্রদের ওপর দমন নিপীড়নের তোয়াক্কা না করেই মন্ত্রী হয়েছিলেন। আপনি কি সেই সামরিক শাসকের মন্ত্রী নন যার ট্রাক ছাত্রদের শান্তিপূর্ণ মিছিলের পেছন দিক থেকে এসে ট্রাকের চাকার তলায় সেলিম দেলোয়ারসহ ছাত্রদের পিষে মেরেছিলো? বলুন!

আবুল মাল আব্দুল মোহিত পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসের পুরানা আমলা। সেই প্রশ্নও উঠতে পারে। যেমন এখন হাসানুল হক ইনুর নাম উঠছে, যিনি মুজিব সরকারের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে এখন সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বড় বড় কথা বলেন। মুহিত কাজ করেছেন বিশ্বব্যাংক, আইএম, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ধরণের আন্তর্জাতিক অর্থ প্রতিষ্ঠানে যাদের কাজ ছিল তৃতীয় বিশ্বকে আরও গরিব করে রাখা এবং দুনিয়া জুড়ে মুনাফালোভী কর্পোরেট অর্থনীতির পথ সাফ করা। শিক্ষাকে প্রাইভেট খাতে তুলে দেওয়া নিউ লিবারেল অর্থনৈতিক সংস্কারেরই অংশ। এই নীতির সারকথা হচ্ছে আপনার জীবন কর্পোরেশানে মুনাফার জন্য বিক্রি করে দিতে হবে। সমাজ বা রাষ্ট্র বা সমাজ থেকে কিছু চাইবার নাগরিক অধিকার আপনার নাই। পড়তে চাইলে আপনাকে প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিগুলোকে উচ্চ হারে শিক্ষা খরচ দিতে হবে যাতে ইউনিভার্সিটির মুনাফা হয়। যেন মুনাফার টাকা ব্যক্তির পকেটে যায়, রাজস্ব খাতে না। একই সঙ্গে আপনাকে একশ টাকায় সাড়ে সাত টাকা অর্থ মন্ত্রী আবুল আল আব্দুল মুহিতকে দিতে হবে যাতে তিনি তার দলের চোর ডাকাতদের মধ্যে তা রাষ্ট্র ও সরকারের নামে বিতরণ করতে পারেন। এই হোল অবস্থা।

তরুণ ভাই বোনেরা শিখে রাখো, ইহাকেই নিউ লিবারেল অর্থনীতি বলা হয়। যেহেতু পড়ে শেখার ধৈর্য নাই, তাই এখন রাস্তায় বিক্ষোভ করে আর গুলি খেয়ে শেখো। বলো, ‘গুলি করো কিন্তু নো ভ্যাট’। আমি তোমাদের সঙ্গে আছি। কারণ জীবন শেখার জন্য এবং প্রতিবাদের ভাষা আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে তোমরা সংক্ষেপে কর্পোরেট নিয়ন্ত্রিত জীবন ও শিক্ষা ব্যবস্থার খানিক উত্তাপ ব্যক্ত করেতে পেরেছ। নো ভ্যাট, কিন্তু অর্থমন্ত্রী আপনার পুলিশকে বলুন গুলি করুক। সাম্রাজ্যবাদ বলো কি নিউ লিবারেলিজম বলো এটা আসলেই শেখার জিনিস। যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয়ে এইসব শেখানো হয় না তো রাস্তায় এসে শেখো। এটাও জেনে রাখা দরকার আবুল মাল আব্দুল মুহিত জেনে শুনে একজন সামরিক সরকারের মন্ত্রী হয়েছিলেন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করবার ক্রেডেনশিয়াল পাবার জন্য। শিক্ষার ওপর ভ্যাট বসানোর এই প্রতিভাবান আইডিয়া তো পুরানা। শিক্ষার ওপর ভ্যাট বসিয়ে তিনি এখন কর্পোরেট জগতকে খুশি করতে চাইছেন। ট্যাক্স তিনি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের লাভের টাকার ওপর নয়, বসাতে চাইছেন যারা মুনাফা দূরে থাকুক, আয় করে না। তারা বাপের টাকায় পড়তে এসেছে। অনেকে জমিজমা বেচে ধার কর্জ করে পড়ছে। অর্থমন্ত্রী তাদেরকে সর্বস্বান্ত করে হলেও ভ্যাট আদায় করবেন। তিনি জানেন চিরদিন কারো সমান নাহি যায়। তাঁর এই চাকরি চিরকাল থাকবে না। নতুন চাকুরি দরকার। বর্তমান চাকুরি হারাবার পর তাকে নতুন চাকুরি খুঁজতে হবে। এই ভ্যাট বসানো তার নতুন চাকুরির ক্রেডিনশিয়াল তৈরির নগ্ন চেষ্টা নয় কি? মাননীয় অর্থমন্ত্রী, একে আমরা আর কিভাবে বুঝবো বলুন তো? এর কী যুক্তি? এতে সরকারের কী লাভ?

দুই

তর্কটা মোটেও পাবলিক প্রাইভেট কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েদের তর্ক নয়, যা অনেকে সরকারের পক্ষে দালালি করতে গিয়ে করতে চাইছেন। শিক্ষার বর্তমান দুর্দশার জন্য বিএনপি, জাতীয় পার্টি, আওয়ামি লীগ প্রতিটি দলই দায়ী। রাজনৈতিক দল তো হাওয়ায় তৈরি হয় না, তাই দায়ী জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে সকলে একমত হতে না পারা। যেমন, শিক্ষা। স্বীকার করি, সকলে একমত হওয়া অসম্ভব, কিন্তু নিদেনপক্ষে একটা সংখ্যাগরিষ্ঠ মত তৈরির চেষ্টার প্রকট অভাব বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার বর্তমান দুর্যোগের কারণ।

শিক্ষা নিয়ে আমাদের কিছু সুস্পষ্ট নীতির দরকার ছিল। বাংলাদেশ রাষ্ট্র গরিব, আমরা শিক্ষা ব্যবস্থার ব্যয় বহন করতে পারি না। অতএব সকলের উচ্চ শিক্ষার দরকার নাই। দরকার সকলের জন্য বাধ্যতামূলক শক্তিশালী অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা। উচ্চ শিক্ষা সকলের দরকার না থাকতে পারে, কিন্তু প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে কোন প্রকার আপোষের বা ছাড় দেবার সুযোগ নাই। উচ্চশিক্ষা সম্পর্কে এই যুক্তির পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ একমত কিনা জানি না, কিন্তু এই যুক্তি সম্পর্কে সকলেই আমরা অবহিত। রাষ্ট্রকেই শিক্ষার সব দায় নিতে হবে এমনকি কেউ বিএ, এমএ, এমএসসসি, বিএসসি, বিবিএ, এমবিএ পিএইচডি করলেও রাষ্ট্রকেই বিনা খরচে কিম্বা ভর্তুকি দিয়ে সকলকেই সকল স্তরে পড়াতে হবে বা পড়াবার খরচ বহন করতে হবে এটা কেউই আজকাল বলে না, আশাও করে না। অবশ্য আবেগী হয়ে বা পুরানা পেটি বুর্জোয়া সমাজতন্ত্রের জ্বর থাকলে সেটা ভিন্ন কথা। কিন্তু কথাটা এখানে শেষ হয় না। বাস্তব জায়গার ওপর দাঁড়িয়ে এই বিষয়ে পরস্পরের সঙ্গে কথা বলা দরকার।

ধরা যাক বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অসম প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দিতার মুখে এটাই রাষ্ট্রের শিক্ষা নীতি। এর পক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠ মত। সকলকে উচ্চ শিক্ষা দেওয়া যাবে না, ঠিক আছে। কিন্তু এই শিক্ষার উদ্দেশ্য কি হবে? নিদেন পক্ষে এর তিনটি উদ্দেশ্য থাকতেই হবে। প্রথমত ভাল, সচেতন, ভালমন্দ বিচার করতে সক্ষম নাগরিক তৈরি করা যারা একই সঙ্গে কর্মঠ ও উৎপাদনশীল। কর্মঠ অথচ ভালমন্দ বিচারজ্ঞান না থাকা যেমন সমাজ, রাজনীতি ও সংস্কৃতির জন্য বিপজ্জনক, তেমনি ভালমন্দ বোঝে অথচ কোন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের দক্ষতা অর্জনের প্রাথমিক শিক্ষা পায় নি তারাও সমাজের জন্য অর্থনৈতিক বোঝা হয়ে ওঠে। প্রাথমিক শিক্ষার উদ্দেশ্যের সারকথা দাঁড়ায় এই যে আত্মসচেতন গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক জনগোষ্ঠি তৈরি, যেন বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় শক্তিশালী অবস্থান পাবার জন্য তারা শক্তিশালী কর্মীবাহিনী হিসাবে কাজ করতে পারে। যেন প্রাথমিক শিক্ষা সামষ্টিক সংকল্প ও জাতীয় দক্ষতা তৈরি করতে সক্ষম হয়। নাগরিকতা যদি অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর না দাঁড়ায় তাহলে তা খোঁড়া, আর শ্রমিকতা যদি সামষ্টিক রাজনৈতিক সচেতনতা দ্বারা পরিচালিত না হয় তাহলে তা অন্ধ।

দ্বিতীয় উদ্দেশ্য হচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই মেধাবি,পরিশ্রমী, অধ্যবসায়ী এবং শিক্ষাদীক্ষায় বহুদূর যেতে আগ্রহীদের চিহ্নিত করা যাদের উচ্চ শিক্ষা নিশ্চিত করা জরুরী। এই নীতি হতে পারে এরকম যারা নিজেদের মেধাবি প্রমাণ করেছে তাদের জন্য রাষ্ট্রের সামর্থ অনুযায়ী বৃত্তি দেওয়া, এবং অর্থনৈতিক ভাবে বঞ্চিতদের প্রতি সুবিচারের জন্য গরিব ছাত্রদের বড় একটি অংশের জন্য শিক্ষাবৃত্তির ব্যবস্থা করা।

কথা গুলো মার মার কাট সিদ্ধান্ত হিসাবে বলছিনা, তর্কের খাতিরে বলছি। কিন্তু আমরা পুরা শিক্ষা ব্যবস্থাকে তুলে দিয়েছি বাজারের হাতে। সেটা করেছি এমন ভাবে যাতে তা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, মুনাফা কামাবার মেশিনে তৈরি হয়। শিক্ষা কিম্বা শিক্ষকের মান পরীক্ষার কোন কার্যকর মানদণ্ড আমাদের নাই। কার্যকর মানে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো টাকা নিয়ে যে শিক্ষা দিচ্ছে সেটা স্রেফ সার্টিফিকেট বিতরণ নাকি কিছু শিক্ষা বা দক্ষতা তৈরি করছে সেটা পরীক্ষার কোন ব্যবস্থা নাই। কি ধরণের শিক্ষা শিক্ষার্থীরা পাচ্ছে তা বিচারেরও কোন মানদণ্ড আমাদের নাই। সার্টিফিকেট পাওয়া অনেকের জন্য সামাজিক স্টাটাস – শিক্ষার এর বেশী মূল্য তাদের কাছে নাই। দ্বিতীয়ত শিক্ষার অর্থ দাঁড়িয়েছে কোম্পানির দাস অথবা সরকারের চাকুরে হবার সাধনা। শিক্ষা বলতে যা বোঝা যায় – যার সঙ্গে একটি জনগোষ্ঠির মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াবার হিম্মত অর্জনের সাধনা -- তার ছিঁটেফোঁটা বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় নাই। তরুণরা যদি কিছু শিখে থাকে তা একান্তই নিজের চেষ্টায় শেখে। এই ক্ষেত্রে সরকার, রাষ্ট্র কিম্বা কর্পোরেট সেক্টরের কোন অবদান নাই। ফাঁকফোঁকরে তেমন শিক্ষক আছেন, যিনি নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই নীতি মেনে ধর্মভীরুর মতো মাথা নত করে ছেলেপিলেদের পড়িয়ে যাচ্ছেন। এই ধরণের শিক্ষক কিম্বা তরুণদের জন্য আমরা কিছু করি নি যাতে তারা আমাদের সমীহ করবে।

জেনেশুনেই আমাদের মহান রাজনীতিবিদরা শিক্ষা খাতকে প্রাইভেট সেক্টরে ছেড়ে দিয়েছে। অন্যদিকে পাবলিক শিক্ষাব্যবস্থাকে করেছে রাজনীতির আখড়া। সেখানে ছাত্রদের রাজনীতি করতে দেওয়া হয় না, কিন্তু শিক্ষকদের মান পরীক্ষা হয় রাজনীতি দিয়ে। ফলে ভাল শিক্ষকরা থাকছেন না। বিদেশে চলে যাচ্ছেন, বিদেশে গেলে আর আসতে চান না। ছাত্রদের রাজনীতি করতে না দেওয়ার মানে সরকারি দল কেউ যদি না করেন তো বিশ্ববিদ্যালয়ে তার কোন স্থান নাই। সরকারি দলের ছাত্ররা বিরোধী দলের ছাত্রদের পিটিয়ে ক্যাম্পাসের বাইরে রাখে, ঢুকতে দেয় না। ডাকসুসহ বিভিন্ন সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউনিয়নগুলোতে ছাত্র নির্বাচন হয় না। কারণ নির্বাচন হলে সরকারী দলের হারার সম্ভাবনা। ছেলেমেয়েরা সরকারী শিক্ষাব্যবস্থা নামক জাহান্নমের ভেতর দিয়ে কিভাবে পাশ করে বের হয় তা অবিশ্বাস্যই বলতে হবে।

কতো খরচ হয় প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে? একটি দৈনিক পত্রিকা্র খবরে দেখলাম ইস্ট-ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির এক শিক্ষার্থী জানিয়েছে তার বিবিএ কোর্স করতে ৬ লাখ ৭৯ হাজার ৪০০ টাকা খরচ হবে। নতুনভাবে ৭.৫ ভ্যাট আরোপ করায় অতিরিক্ত তাকে ৪৭ হাজার ৫০০ টাকা গুনতে আরেক শিক্ষার্থী জানিয়েছে ১২ সেমিস্টারে তার খরচ হবে প্রায় ৮ লাখ ৬৪ হাজার টাকা। নতুন ভ্যাট কার্যকর হলে তাকে আরও ৬৫ হাজার টাকা গুনতে হবে। (দেখুন ‘স্তব্ধ ঢাকা’, মানব্জমিন’ ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৫) । যারা কর্পোরেট বা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে তারা সকলেই ধনির দুলাল এর চেয়ে মিথ্যা আর বাজে প্রচারণা আর কিছুই হতে পারে না। জমি বেচে ধারদেনা করে অনেকেই পড়ছে। একটি প্লাকার্ড দেখলাম ছাত্ররা বলছে ‘আমার বাবা এটিএম বুথ না’ – অর্থাৎ টিপলেই পিতার বুথ থেকে টাকা গড়িয়ে পড়বে অর্থমন্ত্রীর এই অনুমান ঠিক না। এই প্লাকার্ডের মানে হচ্ছে অধিকাংশেরই আয় সীমিত।

আমি ছাত্রছাত্রীদের এই আন্দোলন সমর্থন করি। তাদের প্রতিরোধের ধরণ গুরুত্বপূর্ণ। তারা গুলি খেতে রাজি, কিন্তু জ্বালাও পোড়াও রাজনীতি করছে না। কোথাও ছেলেমেয়েরা ভাংচুর করে নি। এই সেই ‘তরুণ প্রজন্ম’ যারা গুলির ভয়ে ভীত নয়। সাবাশ। অথচ একটি গণমাধ্যমও এই সময়ে প্রতিরোধের এই বিশেষ চরিত্রের ওপর জোর দেয় নি। যা বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

স্বাস্থ্য, চিকিৎসা এবং উপনিবেশবাদ

অনুবাদকের ভূমিকা: ফ্রাঁনৎস ফাঁনোর জন্ম মার্তিনিক (Martinique)-এর রাজধানী ফোর্ট দে ফ্রান্স (Fort-de-France) শহরে, ১৯২৫ সালের ২০ জুলাই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ফাঁনো ফরাসি মুক্তিবাহিনীর কালোসেনাদের ইউনিটে যোগ দেন। যুদ্ধের পর লিয়ন (Lyon)-এ ডাক্তারি পড়তে যান ফাঁনো। সেখানেই মনোবিজ্ঞান ও মানসিক রোগ বিষয়ে আগ্রহী হয়ে উঠেন তিনি। লিয়নেই প্রথম তার সাথে স্ত্রী জোসি (Marie-Josephe Duble´Josie)-এর সাথে পরিচয় হয়। সেখানেই তারা বিয়ে করেন। ১৯৫৩ সালে মনোরোগবিদ্যা বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি লাভের পর ফাঁনো আলজেরিয়াতে যান। সেখানে থাকেন তিন বছর। এরপর তিউনিস, ঘানা হয়ে চিকিৎসার জন্য সোভিয়েত রাশিয়ায় যান ১৯৬১ সালের অক্টোবরে। ঐ বছর ডিসেম্বরে লিউকেমিয়াতে আক্রান্ত হয়ে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যাণ্ডে মৃত্যুবরণ করেন তিনি।

আলজেরিয়াতে যাবার পর ফাঁনো এক নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। বিশেষ করে সেখানকার গরীব, অসহায় লোকজনকে চিকিৎসা দিতে গিয়ে তিনি বিরোধিতার সম্মুখীন হন। উপনিবেশবাদীদের আচরণ ও প্রতিষ্ঠানসমূহের প্রতি স্থানীয়দের মানসিক প্রতিক্রিয়া ও মনোভাব তিনি খুব গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। এর উপর ভিত্তি করেই ১৯৫৯ সালে তিনি লিখেন L’an cinq de la revolution alge´rienne।ইংরেজিতে এটা A Dying Colonialism নামে তরজমা করা হয়েছে ।এই বইয়ের চতুর্থ অধ্যায়ে ফাঁনো ফরাসি উপনিবেশকালে আলজেরিয়ার স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে আলোচনা করেছেন। বাংলা ভাষার পাঠকদের জন্য এই অংশটাই তরজমা করেছি এখানে।

ফাঁনো মূলত লেখক নন, বরং কথক। তরজমাকৃত এই অধ্যায়সহ এই বইয়ের আরো তিনটি অধ্যায় তিনি তার বউয়ের কাছে বর্ণনা করেছিলেন।১৯৫৯ সালের শুরুতে বলা কথাগুলো ঐ বছরের শেষদিকে গ্রন্থবদ্ধ করা হয়। প্রতিটি লেখাতেই উপনিবেশি সমাজ ও সেখানকার বাস্তবতা সম্পর্কে ফাঁনোর গভীর উপলব্ধিজাত অভিজ্ঞতা প্রতিফলিত হয়েছে। ফাঁনোর মৃত্যুর অর্ধশতাব্দীকালেরও বেশি সময় পরে এসে তার লেখা নিয়ে আলাপের বিশেষ তাৎপর্য আছে। উপনিবেশি কাঠামোর মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসাব্যবস্থা উপনিবেশভুক্তদের মনে কিরূপ প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয় বা এর ফলে কোন কিসিমের পরিবেশ-পরিস্থিতির উদ্ভব হয় তা নিয়ে গভীর চিন্তা-পর্যালোচনার দরকার আছে। কেননা আর সব উপনিবেশি অঞ্চলের মত ভারতবর্ষেও পশ্চিমা চিকিৎসা বিজ্ঞানের প্রবর্তন হয় ইউরোপীয় সাহেবদের হাত ধরে। ফাঁনোর লেখায় আলজেরিয়ার জায়গায় ভারতবর্ষের যেকোন অঞ্চলকে এবং ফরাসিদের জায়গায় ব্রিটিশদের বসিয়ে দিলে আমরা দেখব হুবহু এখানকার বর্ণনাই দিচ্ছেন তিনি।

আধুনিক চিকিৎসাবিদ্যার জন্ম পশ্চিমে- ইউরোপে। উপনিবেশায়নের সুবাদে উপনিবেশি অঞ্চলসমূহে আঠারো শতকের শেষে ও উনিশ শতকের শুরুতে পশ্চিমা চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রবর্তন হয়। উপনিবেশবাদের ধারণাই ছিল এমন যে, যা কিছু পশ্চিমা তাই আধুনিক, চিরন্তন ও একমাত্র সহীহ তরিকা। আগে থেকে বিদ্যমান যে কোন পদ্ধতি বা কৌশল প্রাচীন ও সেকেলে। ফলে পশ্চিমা চিকিৎসাবিজ্ঞান পুরাতন চিকিৎসা পদ্ধতিকে পুরোদমে নাকচ করে দেয়। একে বাতিল ঘোষণা করে উপনিবেশভুক্তদের উপর নয়া পদ্ধতি চাপিয়ে দেয়। যেখানে ডাক্তার নিজে উপনিবেশি প্রভূদের অন্তর্ভূক্ত এবং রোগীদের সাথে সে ক্ষমতাবান শ্রেণীর জায়গা থেকেই আচরণ করে। এ কারনে উপনিবেশবাদীদের প্রবর্তিত চিকিৎসাব্যবস্থা সব দেশে, সব অবস্থাতেই উপকারী বলে বিবেচিত হলেও স্থানীয় জনগণ একে জুলুমের নতুন তরিকা বলেই মনে করত।

উপনিবেশি জুলুমতন্ত্রের অংশ হওয়ায় স্থানীয় জনগণ ইউরোপীয় ডাক্তারদের বিশ্বাস করত না। এই অবিশ্বাসের সংস্কৃতি পশ্চিমা ব্যবস্থায় শিক্ষিত স্থানীয় ডাক্তারদের জন্যও প্রযোজ্য ছিল। কারন তারাও উপনিবেশি প্রভূদের মত স্বভাব রপ্ত করত। আমাদের এখানে এখনো এই অবিশ্বাসের সংস্কৃতি দেখা যায়। রোগীরা এখানে ডাক্তারদের বিশ্বাস করে না। ডাক্তারও মনে করে রোগীরা মূর্খ, কিছুই জানে না বা বোঝে না। ঢালাওভাবে এর জন্য ডাক্তার বা রোগীকে দায়ী করলেই দায়মুক্তি ঘটে না। এখানকার স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে সামগ্রিকভাবে এখনো পর্যন্ত কোন পর্যালোচনামূলক আলাপ-আলোচনা হয় নাই। ফলে উত্তর উপনিবেশি ডাক্তারি ব্যবস্থা ও তত্ত্ব এখনো যে উপনিবেশকালের প্রেতাত্মা বয়ে বেড়াচ্ছে তা কারো কাছেই স্পষ্ট নয়। এই অবস্থা থেকে উত্তরণ ও একটি গণমুখী স্বাস্থ্যব্যবস্থা প্রণয়নের জন্য ফাঁনোর আলাপের বোঝাপড়া জরুরি। সেই তাগিদ থেকেই এই তরজমা কর্ম। -- শাহ্ মোহাম্মদ ফাহিম

... ... ... ...

স্বাস্থ্য, চিকিৎসা এবং উপনিবেশবাদঃ আলজেরিয়ার উদাহরণ
ফরাসিদের অব্যহত শোষণ ও জুলুমতন্ত্রের অংশ হিসাবেই আলজেরিয়াতে পশ্চিমা চিকিৎসা বিজ্ঞানের প্রবর্তন করা হয়। বৈশিষ্ট্যগত দিক দিয়ে তা ছিল চরম বর্ণবাদী ও স্থানীয় জনগণের প্রতি অপমানকর। এ কারনে সাহেবদের চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পর্কে স্থানীয়দের মনে হামেশাই অনিশ্চয়তার দোলাচল ঘুরপাক খেতে থাকে। অবশ্য দখলদারদের সব কর্মকাণ্ডের ব্যাপারেই স্থানীয় মানুষজনের মনে এই ধরনের দ্বিধা-দ্বন্দ্ব লক্ষ্য করা যায়। চিকিৎসা সেবা বা ওষুধও তার ব্যতিক্রম নয়। কার্যত পশ্চিমা চিকিৎসা পদ্ধতির মাধ্যমে উপনিবেশি ব্যবস্থার অন্যতম করুণ একটা দিক আমাদের সামনে খোলাসা হয়ে উঠে। এই আলোচনায় আমরা সেদিকেই নজর দিব।

প্রযুক্তিগতভাবে অগ্রসর কোন দেশ তার বিজ্ঞানীদের জ্ঞান, মেধা ও উদ্ভাবন দ্বারা উপকার লাভ করে থাকে। বস্তুগতভাবে মানব সমাজের সব ক্ষেত্রে, সব অবস্থাতেই এটা প্রযোজ্য। বিষয়টা আসলেই খুব ভালো। কিন্তু এটা যখন মানুষের স্বাস্থ্য বা দৈহিক সুস্থতার সাথে জড়িত, যার প্রধান লক্ষ্যই হচ্ছে শারীরিক ব্যথা-বেদনা বা কষ্ট থেকে মুক্তি, তখন কোন নেতিবাচক প্রক্রিয়াই গ্রহণযোগ্য নয়। উপনিবেশ কালের পরিস্থিতি এমন ছিল যে উপনিবেশভুক্ত জনগণ উপনিবেশি শক্তির সব অবদানকেই চরম মানহানিকর বলে গণ্য করত। এ কারনে তারা ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, স্কুল শিক্ষক, পুলিশ, গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সৈনিক, এদের সবাইকে সহজাত সন্দেহের চোখে দেখত। ডাক্তারের বাধ্যতামূলক রোগী দেখা কার্যক্রম তখন পুলিশ প্রশাসনের মধ্যস্থতাতেই সম্পন্ন হত। পুলিশ সাধারণ মানুষদের ডাক্তারের দুয়ারে এনে হাজির করত। তবে যেসব ডাক্তাররা এই ধরনের বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতেন তারা কেউই স্থানীয় ডাক্তার ছিলেন না। তারা প্রায় সবাই হয় প্রভাবশালী মহলের অন্তর্ভূক্ত কিংবা সেনাবাহিনীর সদস্য ছিলেন।

উপনিবেশবাদীরা প্রায়ই স্থানীয়দের স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতা বিষয়ক বিভিন্ন সূচকের উন্নতি দেখিয়ে প্রতিবেদন পেশ করত। এর মাধ্যমে তারা দাবী করত যে তাদের প্রবর্তিত চিকিৎসার কল্যাণেই স্থানীয়দের রোগ-ব্যাধি মোকাবেলার ক্ষমতা বেড়েছে। তবে স্থানীয়রা কখনোই এমনটা মনে করত না। তারা বরং এসব পরিসংখ্যানগত তথ্যকে দখলদারের কর্তৃত্ব বৃদ্ধির সুনির্দিষ্ট প্রমাণ বলেই মনে করত। ফরাসি কর্তাব্যক্তিরা যখন পরিদর্শকদের তিঁজি ওঁজো স্যানিটোরিয়াম বা আলজিয়ার্সের মোস্তফা হাসপাতাল দেখাত, তখন স্থানীয়দের কাছে এর অর্থ ছিল এমন, ‘দেখ, এই দেশের মানুষের জন্য আমরা কত কিছুই না করেছি। এখানে যা কিছু হয়েছে তার সব কিছুর জন্যই এদের উচিত আমাদের কাছে চিরঋণী হয়ে থাকা। আমরা না এলে তো এই দেশেরই অস্তিত্ব থাকত না।’ তবে স্থানীয়দের তরফে মানসিক জড়তা ছিল। বস্তুনিষ্ঠ ভূমিকা পালন করাটা তাদের জন্য কঠিন ছিল। আসলে গম থেকে তুষ আলাদা করার কাজটা অত সহজ ছিল না।

অবশ্য ব্যতিক্রমও ছিল। পরিস্থিতি শান্ত থাকলে কিংবা পারস্পরিক বিরোধপূর্ণ মনোভাব কিছুটা শিথিল থাকলে, স্থানীয় লোকজন শাসকদের অনেক ভালো কাজের কথাই খোলাখুলিভাবে স্বীকার করত। কিন্তু দখলদাররা তাৎক্ষণিকভাবে এই আস্থা ও বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে নিত। তারা একে দখলের পক্ষে ন্যায্যতা হিসেবে হাজির করত। সত্যের পথে সংগ্রামে সর্বাত্মক প্রচেষ্টার পর তাদের সব প্রতিরোধ ভেস্তে গেছে মনে করে স্থানীয়রা যদি বলে বসত, ‘এই বিষয়টা ভালো। আমি একে ভালো বলছি কারন আমি আসলেই তা মনে করি।’ তখন দখলদাররা তার অর্থ বিকৃত করে ভিন্নভাবে তরজমা করত। তারা বলত এর অর্থ হচ্ছে, ‘আমাদের ছেড়ে যেও না। তোমাদের ছাড়া আমাদের কি করে চলবে?’

বিরোধীদের যোগ্যতম হিসাবে গড়ে তুলতে উপনিবেশবাদীদের মধ্যে সব সময়ই তীব্র অনীহা ছিল। পুরো উপনিবেশি সমাজ জুড়ে এমনটিই আমাদের নজরে আসে। ব্যাপারটি এমন যে দখলদাররাই সব যোগ্যতার অধিকারী এবং তাদের যোগ্যতাকে স্বীকৃতি দেয়ার অর্থ হচ্ছে জুলুম-নিগ্রহের অনুমোদন বা স্থানীয়দের জন্মগত অক্ষমতার স্বীকারোক্তি। এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার পরে উপনিবেশভুক্ত জনগণ ভালো-খারাপ নির্বিশেষে শাসক শ্রেণীর সব কাজ-কর্মের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট পন্থায় কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখানো শুরু করে। এ কারনে এমন মন্তব্য খুব একটা অস্বাভাবিক শোনায় না যে, ‘তোমাদের কাছে তো কেউ কিছু চায় নাই। তোমাদের কে এখানে দাওয়াত করে এনেছে? তোমাদের হাসপাতাল আর বন্দরের সুবিধা আমাদের দরকার নাই। এগুলো বন্ধ করে নিজ দেশে ফেরত যাও।’

প্রকৃতপক্ষে সামরিক অভিযান ও পুলিশি ব্যবস্থার মাধ্যমেই উপনিবেশবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়। এ কারনে তা সব সময় নিজের দখলদারির ন্যায্যতা ও কাজের বৈধতার পক্ষে যুক্তি খুঁজে বেড়াত।

সত্য ও যুক্তির দোহাই দিয়ে দখলদারদের নিত্য নতুন কর্মসূচীতে সায় দেয়ার মাধ্যমে স্থানীয় জনগণ যে ধীরে ধীরে পুরো উপনিবেশি ব্যবস্থায় বন্দী হয়ে পড়ছে তা তারা বুঝতে পারছিল। তাদের কাছে এটাও স্পষ্ট ছিল যে, ফরাসি উপনিবেশবাদ এবং সেখানকার ফরাসি স্বাস্থ্যসেবা এই দু’টিকে কোনমতেই জুদা করা সম্ভব না। কাজেই ফরাসি স্বাস্থ্যসেবাকে মেনে নেয়া মানে উপনিবেশবাদকেই স্বীকৃতি দেয়া। নিজ দেশের জনগণ, যারা নিজেদের মাটিতে স্বাধীন অস্তিত্বে বিশ্বাসী, তাদের প্রত্যাখ্যান করা। কিন্তু স্থানীয়দের জন্য এ কাজটা সহজ ছিল না। অতএব তারা ভিনদেশী ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, স্কুল শিক্ষক, বিমান আরোহী ছত্রীসেনা সবাইকে একই সাথে একই কায়দায় উপেক্ষা করা শুরু করল।

উপনিবেশ বহির্ভূত বা অ-উপনিবেশি সমাজে ডাক্তারের উপর রোগীর এক ধরনের আস্থা কাজ করে। রোগী তাকে বিশ্বাস করে। এই বিশ্বাসের কারনেই সে নিজেকে ডাক্তারের হাতে সঁপে দেয়। নিজের শরীরকে পুরোপুরি ডাক্তারের কাছে সমর্পণ করে। ডাক্তার তাকে ব্যথা দিতে পারে বা ব্যথার তীব্রতা আরো বাড়তে পারে বলেই সে মেনে নেয়। কারন সে বিশ্বাস করে ডাক্তারি পরীক্ষার এই তীব্র যন্ত্রণা হয়ত তাকে দৈহিক সুস্থতার পথে নিয়ে যাবে।

উপনিবেশ বহির্ভূত সমাজে রোগী কখনোই ডাক্তারকে অবিশ্বাস করে না। জ্ঞান এবং পেশাগত দক্ষতার উপর ভিত্তি করে হয়ত রোগীর মনে উদ্ভূত সংশয় দূর করা সম্ভব। কিন্তু ডাক্তারের তরফে যদি কোন সীমাবদ্ধতা থাকে তবে রোগীরা খুব একটা ভরসা পান না। এটা যে কোন জায়গাতেই ঘটতে পারে। তবে এটা সুস্পষ্ট যে, সুনির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে ডাক্তার ও রোগীর সম্পর্কে দৃশ্যমান পরিবর্তন ঘটতে পারে। কোন জার্মান কারাবন্দীকে যদি ফরাসি সার্জন অপরেশন করতে যায় তবে চেতনানাশক ওষুধ প্রয়োগের আগে সে বারবার তার জীবননাশ না করার জন্য ডাক্তারের কাছে মিনতি করতে থাকে। একই অবস্থায় সফলতার সাথে অপারেশন সমাপ্ত করা নিয়ে সার্জনও খুব পেরেশান থাকেন। কারন অপারেশন টেবিলে রোগী মারা গেলে কি ধরনের পরিস্থিতির উদ্ভব হবে বা অন্য কারাবন্দীরা এটাকে কিভাবে নিবে তা তিনি উপলব্ধি করতে পারেন। জার্মান ক্যাম্পে বন্দী ফরাসি কারাবন্দীদের ক্ষেত্রেও একই চিত্র লক্ষ্য করা যায়। তাদেরকে ক্যাম্প হাসপাতালে কর্মরত জার্মান ডাক্তারদের অপারেশনে সহায়তা করতে বলা হলে তারাও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করত। গল্প, উপন্যাস এবং চলচ্চিত্রে এই ধরনের বহু পরিস্থিতির কথা উঠে এসেছে। কিন্তু প্রতিটি যুদ্ধের পরই এর সাথে সম্পর্কিত সমস্যাগুলোকে সমাধান না করে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। উপনিবেশি অঞ্চলগুলোতে এই ধরনের পরিস্থিতি আরো বেশি দেখা যেত।

রুগ্ন ও আহতদের সেবা প্রদানকারী যে কোন প্রতিষ্ঠানে হঠাৎ করেই কেউ না কেউ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে পারে। ঐসব প্রতিষ্ঠানের এটাই সাধারণ চিত্র। অথচ হাসপাতালে আলজেরিয় নাগরিকদের হঠাৎ মৃত্যুকে ইচ্ছাকৃত হত্যা বা ইউরোপীয় ডাক্তারের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বলেই ধরে নেয়া হত। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ব্যাপারে আলজেরিয় নাগরিকদের মধ্যে চরম অনীহা কাজ করত। মূলত স্থানীয় জনগণের মনে উপনিবেশি ডাক্তারদের মৌলিক মানবীয় গুণাবলির ব্যাপারে দীর্ঘস্থায়ী সন্দেহই এর পিছনে মূল কারন ছিল। এটাও বলা রাখা দরকার যে, নির্দিষ্ট কিছু হাসপাতালে সেবা দেয়ার নাম করে জীবিত রোগীদের উপর গবেষণা চালানো হত। সম্পূর্ণ বেআইনি এই কাজটা এমন পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল যে একে নগণ্য বলেও ধরে নেয়া যায় না।১

ডাক্তারদের নানা রকম অনুরোধ-উপদেশ সত্ত্বেও প্রায় এক যুগ ধরে হাসপাতালে ভর্তির ব্যাপারে আলজেরিয় জনগণের মনে চরম দ্বিধা-দ্বন্দ্ব কাজ করত। এই ব্যাপারে কোন ধরনের দোনোমনা ভাব যে রোগীর জীবনকে আরো বিপন্ন করে তুলতে পারে তা জানার পরও রোগীকে বাড়িতে ফেরত নিয়ে যাওয়া হত । এমনকি বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররা জোরাজুরি করলেও রোগীকে কোনমতেই হাসপাতালে নেয়া হবে না বলে তাদেরকে জানিয়ে দেয়া হত। দেখা যেত, একেবারে শেষ সময়ে যখন ডাক্তারের আর তেমন কিছুই করার থাকে না, তখন হাসপাতালে নেয়ার ব্যাপারে সম্মতি মিলত। তবে যিনি অনুমতি দিতেন তাকে সবার মতের বিরুদ্ধে গিয়েই এই সিদ্ধান্ত নিতে হত। কিন্তু যেহেতু রোগীর অবস্থা আগে থেকেই সংকটাপূর্ণ ছিল এবং হাসপাতালে আনার সিদ্ধান্তটাও ছিল অনেক বিলম্বিত, সে কারনে বেশিরভাগ সময়ই রোগীকে আর বাঁচানো যেত না।

এই অভিজ্ঞতা দখলদারদের ব্যাপারে স্থানীয়দের পুরনো বিশ্বাসকেই আরো মজবুত করত। আর তা হচ্ছে, মৌলিকভাবেই দখলদাররা সবাই বদ এবং ডাক্তাররাও এর ব্যতিক্রম নয়। স্থানীয়দের কেউ কেউ অনেক চেষ্টার পরে চিরাচরিত সংস্কারগুলোকে লক্ষণীয় মাত্রায় অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছিল। রোগীকে হাসপাতালে নেয়ার ব্যাপারে তারাও জোরালো ভূমিকা রাখত। কিন্তু এই ধরনের পরিস্থিতির পর তাদের মনেও মারাত্মক অপরাধবোধ কাজ করত। একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করবে না বলে তারা মনে মনে ওয়াদা করে নিত। পক্ষান্তরে মূহুর্তের মধ্যে স্থানীয়রা সব মূল্যবোধ বিসর্জন দিয়ে তাদের বিশ্বাসের সপক্ষে জোরালো এবং একরোখা অবস্থান নিত।

তবে স্থানীয়দের এই আচরণকে ইতিপূর্বে বর্ণিত ইউরোপীয় রাষ্ট্রসমূহের গ্রামীন দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সাথে তুলনা করা যাবে না। কেউ যদি এটা করে তবে তা হবে মারাত্মক ভুল এবং এর ফলে স্থানীয়দের মনোভাব চিরকালের জন্য অবোধ্যই থেকে যাবে। উপনিবেশভুক্ত জনগণ যে শহরের ভয়ে, দূরত্বের ভয়ে কিংবা পারিবারিক নিরাপত্তা ও সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হবার ভয়ে রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি হতে বাধা দিত এমনটা নয়। তাদের কাছে হাসপাতালে পাঠনোর অর্থই ছিল পরিবারের বোঝা কমানোর নামে কাউকে নিশ্চিত মৃত্যুর পথে ঠেলে দেয়া। এই বিষয়টাকেই তারা ভয় পেত। তারা যে শুধুমাত্র রোগীদের হাসপাতালে পাঠানোতে অস্বীকৃতি জানাত তা নয়, বরং রোগীকে সাদা চামড়ার ভিনদেশি বিজেতাদের হাসপাতালে পাঠানোর তীব্র বিরোধী ছিল।

ধৈর্য্য সহকারে এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় উনিবেশভুক্ত জনগণের প্রতিটি প্রতিক্রিয়ার পর্যালোচনা করা জরুরি। কোন জায়গায় তাদের মনোভাব না বুঝলে মেনে নিতে হবে যে, এখন আর কোনভাবেই উপনিবেশ আমলে ফিরে যাওয়া সম্ভব না। ফলে সেই সময়কার যে কোন ঘটনার পটভূমি ঠাহর করা আমাদের তরফে অনেকটাই অসম্ভবই। স্থানীয় জনগণ আরোগ্যের জন্য নিজ দেশীয় প্রাচীন ডাক্তারি কৌশল-পদ্ধতি এবং সগোত্রীয় হেকিম, দরবেশ বা ফকির-কবিরাজের উপর নির্ভর করত। অনেক সময় এ কারনেই ইউরোপীয় ডাক্তারদের উপর পূর্ণ আস্থা জানাতে তাদের মধ্যে অনাগ্রহ কাজ করত। এই ধরনের মানসিক প্রতিক্রিয়া যে শুধুমাত্র অগ্রসর জাতিসমূহের জনসাধারণের মধ্যেই ছিল তা নয়। বরং ডাক্তারদের মধ্যেও এর দেখা মিলত এবং এটা খুব বেশিদিন আগের কথাও নয়। লেরিখ (Leriche)-এর বরাতে আমরা জানতে পারি, অনেক ডাক্তারই থার্মোমিটার ব্যবহারে অস্বীকৃতি জানাতেন বা কুণ্ঠাবোধ করতেন। কারন তারা নাড়ী টিপে বা পালস দেখে তাপমাত্রা মাপতেই অভ্যস্ত ছিলেন। এই ধরনের উদাহরণকে অনির্দিষ্টহারে বহুগুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে বিবেচনা করা যেতে পারে। বিশেষ কোন রোগের চিকিৎসায় যিনি নির্দিষ্ট ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতি অনুসরণ করতেন তার পক্ষে সেই পদ্ধতি বাদ দিয়ে ঐ একই রোগের প্রতিকারে নতুন পদ্ধতির অনুসরণ করতে না চাওয়াটাকে খুব একটা অস্বাভাবিক বলা যাবে না। কারন নতুন কার্যপদ্ধতি বা চিকিৎসা কৌশল তার উপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। তাছাড়া নতুন পদ্ধতি পুরাতন পদ্ধতিকে সম্পূর্ণ নাকচ করে দিয়ে তার জায়গা দখল করে নেয় এবং তা পুরাতন চিকিৎসা পদ্ধতির বিন্দুমাত্র অস্তিত্বও সহ্য করতে পারত না। এটাও নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি বা কৌশল প্রত্যাখান করার অন্যতম কারন ছিল।

এক্ষেত্রে আমরা সেই একই জিগির শুনি, ‘আমার বউয়ের কাশি হলে আমি এতদিন ধরে যে চর্চা করে আসছিলাম তা বাদ দিয়ে যদি ইউরোপীয় ডাক্তারকে ইনজেকশন প্রদানের অনুমতি দেই বা তিনদিন ধরে মাথাব্যথার অভিযোগ করায় প্রচলিত সামাজিক নিয়ম-রীতি থেকে শেখা উপায়ে আমার ছেলের মাথায় আঁচড় কেটে দেই এবং এর কারনে যদি আমাকে অপদস্থ হতে হয় ও মুখে বলতে হয় আমি আসলেই বর্বর, তবেই যৌক্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যাবে যে আমি যথার্থ আচরণ করছি। যেমন আমার ছেলের যদি মেনিনজাইটিস (মস্তিষ্ক ঝিল্লির প্রদাহজনিত রোগ) হয় তবে মেনিনজাইটিসেরই চিকিৎসা দিতে হবে এবং এটাই দেয়া উচিত। কিন্তু উপনিবেশকালের হাল-হাকিকত এমন ছিল যে, আমাকে সাহায্য করতে চাওয়া যে কারো ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সনির্বন্ধ অনুরোধকেও দখলদারদের ঔদ্ধত্য এবং তাচ্ছিল্যের মনোভাব হিসাবে বিবেচনা করা হত’।

উপনিবেশভুক্ত সমাজ ও উপনিবেশি সমাজের পক্ষে একই সময়ে, একই জায়গায়, নির্দিষ্ট কোন বিশ্বাস বা মূল্যবোধের ব্যাপারে সম্মতি জ্ঞাপন ও সম্মান প্রদর্শন করা সম্ভব ছিল না। সব সম্ভাব্যতার বিপরীতে, যদি কোন বিষয়ে উপনিবেশভুক্ত সমাজ উপনিবেশি দখলদারদের সাথে একমত পোষণ করত, তবে সাথে সাথেই সেখানে এই দুই সমাজের সফল একীভূতকরণের ব্যাপারে আলোচনা শুরু হয়ে যেত। স্থানীয়দের ধারণা ছিল ফরাসি দখলদারির কারনে নতুন নতুন অসুখ-বিসুখের উদ্ভব হয়েছে। এসবের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সমস্যা নিয়ে আলজেরিয় সমাজে যে সাধারণ প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছিল তার বিয়োগান্তক গলিঘুঁজির প্রতি এখনই নজর দেয়া জরুরি। তাহলে আমরা দেখতে পাব যে, মুক্তি সংগ্রামের পথে ডাক্তারি কলা-কৌশল সম্পর্কে আলজেরিয় জনগণ কর্তৃক গৃহীত নতুন আচার পদ্ধতি কোন সব প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গিয়েছে।

ডাক্তার দেখানোর প্রক্রিয়া

উপনিবেশি আমলে ডাক্তার দেখাতে যাওয়া যে কোন ব্যক্তির মধ্যে এক ধরনের দ্বিধা বা সংকোচ কাজ করত। ডাক্তারের প্রশ্নের জবাবে সে এক অক্ষরে উত্তর দিত এবং এর ব্যাখ্যা জানতে চাইলে সে ডাক্তারকে খুব সামান্য পরিমাণ তথ্যই প্রদান করত। এতে খুব সহসাই ডাক্তারের ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটত। সাধারণত ডাক্তারের উপস্থিতিতে রোগীর মনে এক ধরনের অদম্য ভয়ের উদ্ভব হয়। তবে স্থানীয়দের আচরণকে এর সাথে মিলিয়ে ফেললে চলবে না। আমরা প্রায়ই শুনে থাকি অমুক ডাক্তারের আদব-লেহাজ ভালো, কেননা রোগী তার আচরণে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। কিন্তু উপনিবেশকালে ব্যক্তিগত সান্নিধ্য, একাত্ম হওয়ার সামর্থ্য বা যোগাযোগ স্থাপণ করা ও তা বজায় রাখার ঘটনা খুব একটা নজরে পড়ত না। উপনিবেশি দখলদারি সম্পর্কগুলোকে নতুন আকার দান করে এবং এর মাধ্যমে উপনিবেশি সমাজ লক্ষণীয় মাত্রায় দ্বিধা-বিভক্ত হয়ে পড়ে।

দেখা যেত, ডাক্তার নিজেও উপনিবেশভুক্ত রোগীর কাছ থেকে কোন ধরনের তথ্য পাওয়ার আশা ছেড়ে দিতেন। তিনি শারীরিক পরীক্ষার জন্য রোগীকে চটজলদি শুয়ে পড়তে বলতেন। কারন তার ধারণা ছিল, এর মাধ্যমে হয়ত রোগ সম্পর্কে আরো বেশি তথ্য পাওয়া যাবে। কিন্তু রোগীর দেহকেও তিনি একইরকম অনমনীয় অবস্থায় দেখতে পেতেন। পরীক্ষা-পর্যবেক্ষণের পুরো সময় রোগীর মাংসপেশীগুলো সংকুচিত অবস্থাতেই থাকত। প্রসারণের কোন লক্ষণ দেখা যেত না। এটা এমন এক পরিস্থিতি যখন উপনিবেশভুক্ত ব্যক্তি একই সাথে একজন আরোগ্যশিল্পী এবং একজন উপনিবেশবাদীর মুখোমুখি হতেন।২ এই বিষয়ে অবশ্য ইউরোপীয় ডাক্তার যিনি রোগীকে পরীক্ষা করে দেখেছেন তার মন্তব্যও শোনা উচিত। তিনি বরং বলতেন, ‘তাদের ব্যথার ধরনটা প্রোটোপ্যাথিক, খুব সামান্যই তফাৎযোগ্য এবং সারা শরীর জুড়ে বিস্তৃত। অনেকটা পশুদের মত। মূলত এটা এক ধরনের সাধারণ অস্বাচ্ছন্দ্যবোধ, দেহের কোন নির্দিষ্ট স্থানে সীমাবদ্ধ অসুস্থতা নয়’। রোগীর ভাষ্য ছিল এমন যে, ‘তারা আমার সমস্যা সম্পর্কে জানতে চাইল। ভাবখানা এমন যে আমিই ডাক্তার। তারা নিজেদের খুব বুদ্ধিমান ও করিৎকর্মা মনে করে। অথচ আমার কোথায় ব্যথা তাই বলতে পারে না। বরং তাদের কাছে যাওয়া মাত্রই জিগেশ করে, আপনার সমস্যা কোথায়?’

ডাক্তার বলেন, ‘এই মানুষগুলা অভদ্র এবং রুক্ষ’। আর রোগীর কথা হচ্ছে, ‘আমি এদের বিশ্বাস করি না’। ডাক্তারের মতে, উপনিবেশভুক্ত রোগীরা জানেই না যে তারা আসলে কি চায়, তারা কি সুস্থ হতে চায় নাকি অসুখ নিয়েই বাঁচতে চায়। কিন্তু স্থানীয়রা সেই পুরানো কথাই বলতে থাকে, ‘আমি জানি কিভাবে তাদের হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। কিন্তু সেখান থেকে ছাড়া পাওয়ার কোন উপায় আমার জানা নাই, যদিওবা আমি ছাড়া পেয়েও থাকি’। কাজেই খুব দ্রুত ডাক্তাররা, এমনকি নার্সরাও এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতেন যে, এদের উপর চিকিৎসাবিদ্যা প্রয়োগ করার কোন উপায় অবশিষ্ট নাই। এদের সাথে বরং পশুচিকিৎসকের মতই আচরণ করতে হবে।৩ শেষ পর্যন্ত অবশ্য সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় রোগ সম্পর্কে ডাক্তারের কমবেশি একটা ধারণা হত এবং সে অনুসারে তিনি রোগীকে একটা ব্যবস্থাপত্র দিতেন। কিন্তু অনেক সময়ই রোগীরা তা মানত না। সমাজবিজ্ঞানীরা এসমস্ত কর্মকাণ্ড গুলোকে ব্যাখ্যা করার একটা ঝুঁকি নিতে পারেন এবং একে নিয়তিবাদের অধীনে শ্রেণীবদ্ধ করতে পারেন।

এর বিপরীতে, উপনিবেশি কাঠামোর অভ্যন্তরে বিদ্যমান এই ধরনের আচরণ পর্যালোচনার মাধ্যমে আমরা ভিন্ন ধরনের উপসংহার টানতে পারি।

উপনিবেশভুক্ত কোন ব্যক্তি যদি তার শরীরের ইন্টেগ্রিটি বা অখণ্ডতা অক্ষুন্ন রেখে ডাক্তারের কাছ থেকে পালাতে পারত তবে সে নিজেকে চমকপ্রদ মাত্রায় বিজয়ী বলে মনে করত। স্থানীয়দের কাছে ডাক্তার দেখানোর বিষয়টা সব সময়ের জন্যই অগ্নিপরীক্ষা বলে বিবেচিত হত। যদি উপনিবেশবাদীদের আরোপিত চিকিৎসা সুবিধা বড়ি বা তরল মিক্শ্চার গেলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকত, তবে উপনিবেশভুক্তদের মনে শত্রুর উপর বিজয় লাভের গভীর সুখানুভূতি তৈরী হত। ডাক্তার দেখানো শেষ হওয়ার মধ্য দিয়ে এই যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটত। অবশ্য ডাক্তারের দেয়া ওষুধ, উপদেশ ইত্যাদি অগ্নিপরীক্ষার ধারাবাহিকতা বলেই বিবেচিত হত। নিয়তিবাদের বিষয়গুলোকে দুইভাবে বিবেচনা করতে হবে। উদাহরণ হিসাবে একজন পিতার ঘটনা উল্লেখ করা যায়। যিনি সন্তানের জীবন বাঁচানোর জন্য উপনিবেশবাদীদের অপারেশনের প্রতি ঋণ স্বীকার করতে চান না। প্রথমত, এক্ষেত্রে উপনিবেশভুক্ত ব্যক্তির উপলব্ধি অনুন্নত দেশের সাধারণ জনগোষ্ঠী কিংবা দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা এতিমদের মত হয়। সে অনুধাবন করে, জীবনটা অত্যাবশ্যক উৎপাদনশীলতার উন্নয়ন বা সমৃদ্ধি নয়। বরং সর্বত্র বিরাজমান মৃত্যুর সাথে চিরস্থায়ী সংগ্রাম। এই সদা ভয়প্রদর্শনকারী মৃত্যু আঞ্চলিক দুর্ভিক্ষ, বেকারত্ব, উচ্চ মৃত্যুহার, হীনমন্যতাবোধ এবং নিরাশ ভবিষ্যতের মাধ্যমে অনুভূত হয়।

এই সমস্ত দুশ্চিন্তার কারনে উপনিবেশভুক্ত ব্যক্তিদের জীবন অসম্পূর্ণ মৃত্যুর ছায়ায় পরিণত হত। ডাক্তারি চিকিৎসাকে উপেক্ষা করা বা প্রত্যাখান করার মানে যে বেঁচে থাকতে অস্বীকৃতি জানানো তা নয়। বরং এর অর্থ ছিল আসন্ন মৃত্যুর সংক্রমণের প্রতি চূড়ান্ত নির্লিপ্ততা প্রদর্শন করা। ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে অবশ্য বলা যায় যে, স্থানীয়দের আচরণে উন্নত স্বভাব-চরিত্রের অনুপস্থিতি উপনিবেশি ডাক্তারদের উপর উপনিবেশভুক্তদের অবিশ্বাসই নির্দেশ করে। ডাক্তার বা কারিগরী প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অন্যান্য পেশাজীবিদের যে কোন কথাই নিন্দনীয় অর্থে বুঝা হত। ফলে নিরপেক্ষভাবে বর্ণিত সত্য কথাও উপনিবেশি পরিস্থিতির মিথ্যা দ্বারা প্রতিনিয়ত কলুষিত হতে থাকে।

ডাক্তারি তত্ত্বাবধান, চিকিৎসা এবং ‘ক্ষমতার দ্বৈত রূপ’

ডাক্তারের অফিসের কেউই উপনিবেশভুক্ত আলজেরিয়দের গুনত না। সেখানে তাদেরকে অসন্তোষজনক রোগী হিসাবেই সাব্যস্ত করা হত। উপনিবেশবাদী ডাক্তারের নজরে আসে যে, তার রোগী নিয়মিত ওষুধ খাচ্ছে না। খেলেও তা ভুল মাত্রায় খাচ্ছে। নির্দিষ্ট সময় অন্তর অন্তর ডাক্তার দেখানোর কথা থাকলেও সে নিয়মিত আসছে না। এমনকি ডাক্তারের নির্ধারণ করে দেয়া খাদ্যতালিকার প্রতিও সে এক ধরনের আপাত বিরোধী ও ছেলেমানুষি আচরণ প্রদর্শন করছে। এগুলাই সব নয়। তিনি সব চাইতে বিস্ময়কর এবং অদ্ভুত আচরণ হিসেবে এই কয়টাকে চিহ্নিত করেন। অতএব এর মাধ্যমে একটা সাধারণ ধারণা তৈরী হয় যে, রোগী ডাক্তারের সাথে লুকোচুরি খেলছে। তার উপর ডাক্তারের কোন নিয়ন্ত্রণ নাই। তিনি আরো লক্ষ্য করলেন যে, বারবার ওয়াদা ও প্রতিশ্রুতি নেয়ার পরও রোগীর পলায়নপর, নির্লিপ্ত স্বভাবটা রয়ে গেছে। এসব পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য ডাক্তার এবং তার সহযোগী নার্সদের সব প্রচেষ্টাই রোগীর পক্ষ থেকে মোকাবেলা করা হত। তবে কোন সুনির্দিষ্ট পন্থায় নয়, বরং হুট করে উধাও হয়ে যাওয়ার মাধ্যমেই তা করা হত।

প্রথমত লক্ষণীয় যে, রোগী আর কখনোই ফিরে আসত না। অথচ রোগীকে ভালো করে বুঝিয়ে বলা হত যে, নির্দিষ্ট সময় অন্তর অন্তর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানোর জন্য তাকে আসতে হবে। পুরোপুরি সুস্থ হওয়ার জন্য বেশ কয়েকবার হাজিরা দেয়াটা অত্যন্ত জরুরি। ডাক্তারের ব্যবস্থাপত্রে এটা স্পষ্ট করে লেখা থাকত। বারবার এর গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে রোগীকে বুঝানো হত। এমনকি ডাক্তারের সাথে সাক্ষাৎের জন্য তাকে নির্দিষ্ট দিন-তারিখও ধার্য করে দেয়া হত। কিন্তু ডাক্তারের সব প্রচেষ্টা এবং রোগীর জন্য তার অপেক্ষা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হত। কারন রোগী আর আসত না। যখন সে আসত তখন দেখা যেত রোগের তীব্রতা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। প্রকৃতপক্ষে রোগী পাঁচ থেকে ছয়মাস বা কখনো কখনো বছরখানেক পরে আসত। আরও খারাপ বিষয় হচ্ছে, রোগী ডাক্তারের ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী ওষুধ খেত না। জিগেশ করলে জানা যেত, সে হয়ত মাত্র একবার ওষুধ খেয়েছে। কিংবা যে ওষুধ পুরো এক মাস ধরে খাওয়ার কথা ছিল তা একবারের বেশি খাওয়া হয় নাই। এই ধরনের ঘটনার বিচার-বিশ্লেষণ রোগীকে সম্পূর্ণ অসন্তোষজনক বিবেচনা করার কারন বুঝতে আমাদের সাহায্য করে।

সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, স্থানীয়দের মনে এই বিশ্বাস অটুট ছিল যে একবার সুস্থ হওয়া মানে সম্পূর্ণরূপে আরোগ্যলাভ করা। রোগ যে তাদের দেহে ধীরে ধীরে বাসা বেঁধেছে এটা তারা মনে করত না। তারা বরং একে ব্যক্তিবিশেষের উপর আকস্মিক অভিঘাত বলেই মনে করত। তাদের কাছে যে কোন পথ্যের কার্যকারিতা এর নিয়মিত, পরিমিত এবং সঠিক মাত্রায় গ্রহণের উপর নির্ভর করত না। স্থানীয়রা ওষুধের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া বা ফলাফল দেখতে চাইত। এ কারনে ইনজেকশনের প্রতি তাদের বিশেষ অনুরক্তি ছিল। তাদের কথা হচ্ছে, এক বসাতেই রোগীকে সুস্থ করে দিতে হবে। ডাক্তারের কাজ বলতে তারা এটাকেই বুঝত। ধর্মীয় আচার-বিধির অবমাননা বা নিষিদ্ধ পাপকাজে জড়িয়ে পড়াকেই স্থানীয়রা রোগের কারন হিসেবে মনে করত। পূণ্যস্থানে তীর্থযাত্রা করা, তাবিজ-কবজ লাগানো বা এক টুকরা কাগজে মন্ত্র লিখে সাথে রাখা- এগুলোকে তারা সর্বোচ্চ কার্যকারিতার চিকিৎসা হিসাবে বিবেচনা করত এবং এগুলোর তাৎক্ষণিক প্রয়োগে বিশ্বাসী ছিল। তাদের ধারণা ছিল, এই কাজগুলো করা বা কবিরাজ-দরবেশের পথ্য গ্রহণের মাধ্যমে অসুখ-বিসুখ বিতাড়ণ এবং জীবন পরিচালনার নির্ণায়ক শক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।

নিঃসন্দেহে এই মতামত বা বিশ্লেষণের যথার্থতা আছে। কিন্তু কোন কোন ক্ষেত্রে বিদেশি অধিক্রমণের আগেই উপনিবেশি পরিবেশ-পরিস্থিতির বাইরের কোন ঘটনার ব্যাখ্যা হাজির করাকে আমাদের কাছে ভুল বলে মনে হতে পারে। এমনকি চরিত্রের ধরন অনুযায়ী তা যদি চিরায়ত ধারার অনুরূপ হয়ে থাকে তারপরও। আমরা দেখেছি, উপনিবেশি আধিপত্য উপনিবেশভুক্তদের মনে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ও প্রত্যাখানের আচরণ জন্ম দেয় এবং স্বভাবগত এই জটিলতাকে টিকিয়ে রাখে। উপনিবেশভুক্ত জনগণ উপনিবেশি দুনিয়া থেকে দূরে থাকতে ও দখলদারদের যে কোন কর্মকাণ্ড থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাত। তারপরও প্রতিনিয়ত উপনিবেশভুক্ত জনগণ ও উপনিবেশি দখলদারদের মধ্যে দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন বিষয়ে অর্থনৈতিক, কৌশলগত এবং প্রশাসনিক নির্ভরতা গড়ে উঠছিল। এটা স্পষ্ট যে, উপনিবেশবাদ স্থানীয় সমাজব্যবস্থার সব উপাদানকেই গড়বড়ে করে দেয়। ক্ষমতাবান শ্রেণী তাদের নিজস্ব মূল্যবোধ ও বিশ্বাস সঙ্গে করে নিয়ে আসত এবং বলপ্রয়োগের মাধ্যমে তা উপনিবেশভুক্তদের দৈনন্দিন জীবনের উপর চাপিয়ে দিত। প্রতিরোধ করা ছাড়া স্থানীয়দের তখন আর কোন উপায় থাকত না। কমবেশি গোপন কর্মপন্থার মাধ্যমেই তাদের এই প্রতিরোধ কার্যক্রম পরিচালিত হত। উপনিবেশি কর্তৃত্বপরায়নতা উপনিবেশভুক্তদের নিজস্ব সংস্কৃতির সাথে বিরাজমান সম্পর্ককে বিনষ্ট করে দিত। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ঐতিহ্যের চর্চাকে উপদ্রব বলে গণ্য করা হত। উপনিবেশভুক্তরাও চিকিৎসাবিজ্ঞানের আধুনিক উদ্ভাবন এবং রোগের বিরুদ্ধে হাসপাতাল, অ্যাম্বুলেন্স ও নার্সদের কার্যকর হাতিয়ারগুলোকে এড়িয়ে চলতে পারত না। এ কারনে স্থানীয়দের অনেকেই তাদের উপর ডাক্তারি কায়দা-কানুনের হস্তক্ষেপ মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু এটা মেনে নেয়ার পর কেউ যদি হাসপাতালে না যেত তবে নিজ গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে তার উপর চাপ প্রয়োগ করা হত। তার ক্ষেত্রে আধুনিক চিকিৎসা কৌশলের পাশাপাশি চিরায়ত চিকিৎসা পদ্ধতিও অনুসরণ করা হত। তাদের মত ছিল, ‘দুই পদ্ধতির পথ্য অন্তত এক ধরনের চিকিৎসা হতে উত্তম’। আমাদের মনে রাখতে হবে, পেনিসিলিন বা ডিজিটালিনের মত ওষুধ গ্রহণ করার পরও উপনিবেশভুক্ত ব্যক্তিকে তার নিজ গ্রাম বা জেলার কবিরাজ বা হেকিমের চিকিৎসা গ্রহণ করতে হত।

পেনিসিলিন যে তুলনামূলক বেশি কার্যকর তা উপনিবেশভুক্ত ব্যক্তিও অল্প অল্প বুঝত। কিন্তু রাজনৈতিক, মানসিক ও সামাজিক কারনে তাকে চিরায়ত চিকিৎসা পদ্ধতির প্রাপ্যও প্রদান করতে হত। কেননা স্থানীয় কবিরাজ অন্তত একটা দায়িত্ব তো পালন করেছে। জীবিকা হিসাবে তারও তো কিছু প্রাপ্য। মানসিকভাবে উপনিবেশভুক্তকে খুব কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হত। কারন এই অসুখের সময় তাকে তার নিজস্ব সমাজ-সংস্কৃতির আচার-প্রথা-কর্মকাণ্ড পরিহার করতে হত। বিদেশি ওষুধ গ্রহণ করার অর্থই ছিল পশ্চিমা ব্যবস্থার বৈধতা মেনে নেয়া। মাত্র একবার খেলেও বা মনের মধ্যে সন্দেহ থাকলেও স্বল্প পরিসরে এর যথার্থতাই স্বীকার করে নেয়া হয়। এর মাধ্যমে বিদেশিদের চিকিৎসা বিজ্ঞানের প্রতি যে কারো আস্থাই প্রমাণিত হয়। এমনকি এক ঢোকে পুরো ওষুধ গিলে ফেললেও তা একই অর্থ বহন করে।

উপনিবেশবাদীদের ব্যবস্থাপত্রের প্রতি বদ্ধমূল শ্রদ্ধাবোধ অবলম্বন করা প্রায়ই কঠিন বলে গণ্য হত। আসলে উপনিবেশি ব্যবস্থার অন্য দিকটা ক্ষমতা চর্চার নামে পশ্চিমা চিকিৎসা পদ্ধতির সমন্বিত ব্যবস্থার ভেতর হস্তক্ষেপ করে তা একেবারে ভেঙ্গে ফেলত। প্রতিটা বড়ি বা ইনজেকশনের মাধ্যমে উপনিবেশি ব্যবস্থা আরোপ বা ভিনদেশি যাজকদের সাথে সাক্ষাৎের দাওয়াত দেয়া হত। মাঝে মাঝে রোগীদের মনে যুদ্ধের ময়দানের মত সম্পূর্ণ ভিন্ন ও বিরোধী শক্তিকে মোকাবেলার ভয় অনুভূত হত। এই ভয় থেকে উদ্ভূত মানসিক চাপের কারনে অসুস্থতার পুরো চিত্রই বদলে যেত। মূলত এর মাধ্যমে উপনিবেশি দুনিয়া আরো একবার তার জটিল ও বিচিত্র কাঠামো পেশ করত, যেখানে সব সময় দুনিয়াদারি, এর বিভিন্ন কৌশল-পদ্ধতি এবং মূল্যবোধের মধ্যে স্ববিরোধী মিথস্ক্রিয়া বা প্রবল বিরোধিতা পরিলক্ষিত হত।

উপনিবেশভুক্ত ব্যক্তি ও স্থানীয় ডাক্তার

উপনিবেশি পরিস্থিতি কেবল ডাক্তার ও রোগীর সম্পর্কে ফাটলই ধরাত না। বরং আমরা দেখেছি যে, উপনিবেশি ব্যবস্থায় ডাক্তার সব সময় দখলদার শক্তির মুখপাত্র হিসেবে ভূমিকা রাখত। আমরা দেখব যে, ডাক্তার স্থানীয় হলেও রোগীর মধ্যে চিকিৎসা গ্রহণে দোটানা কাজ করত। নিজেদের কেউ যদি ভিনদেশি বিজেতাদের কোন কায়দা-কানুন বা আচার-প্রথা গ্রহণ করত তবে তার ব্যাপারে স্থানীয়দের মধ্যে এক ধরনের দ্বিধা লক্ষ্য করা যেত। অথচ নিজ দেশের কেউ পেশাজীবি হলে তা এটাই প্রমাণ করে যে, স্থানীয়দের মধ্য থেকেও ডাক্তার, প্রকৌশলী বা উকিল হওয়া যায়। তারাই স্থানীয়দের সক্ষমতার সাক্ষাৎ প্রমাণ। কিন্তু সেখানে একই সময় পর্দার অন্তরালে নিজ জাতিগোষ্ঠী ও স্থানীয় দক্ষ পেশাজীবিদের হঠাৎ বিপথগামিতার বিষয়ে সচেতনতা তৈরী হয়। যদিও সে ব্যক্তি নিজে তার কওমের মানসিক ও আবেগতাড়িত বিভাজন প্রক্রিয়াকে উতরে গেছে। স্থানীয় ডাক্তারও ইউরোপীয় বা পশ্চিমা ধাঁচের ডাক্তার। কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাকে আর স্থানীয়দের সমাজভুক্ত বলে বিবেচনা করা হত না। অত্যাচারীদের বা বিরোধী শিবিরের অন্তর্ভূক্ত হিসাবে তাকে নীরবে-নিভৃতে প্রত্যাখান করা হত। কিছু উপনিবেশি অঞ্চলে স্থানীয় লোকজন শিক্ষিত হবার পরে তারা প্রভূর স্বভাব রপ্ত করেছে বলে প্রচার করা হত। অবশ্য এটা যে ভুলবশত করা হত তা বলা যাবে না।

উপনিবেশভুক্তদের কাছে স্থানীয় ডাক্তার আর স্থানীয় পুলিশের মধ্যে কোন তফাৎ ছিল না। উভয়ের আচরণই প্রভূ বা বিশিষ্টজনের মত ছিল। উপনিবেশভুক্তরা তার স্বগোত্রীয়র সাফল্যে গর্ববোধ করত। কিন্তু একই সাথে তাকে ‘খারেজি’ হিসেবে বিবেচনা করত। এ কারনেই হয়ত বহুদিন পর্যন্ত নিজ দেশীয় চিরায়ত চিকিৎসা পদ্ধতির প্রতি স্থানীয় ডাক্তারদের আচরণ যথেষ্ট আক্রমনাত্মক ছিল।

নতুন শেখা বিদ্যা তুলনামূলক যৌক্তিক দুনিয়ায় প্রয়োগের ব্যাপারে স্থানীয় ডাক্তার মানসিক তাগিদ অনুভব করত। এই কারনে সে অপ্রত্যাশিতভাবে নিজ দেশের জনগণের চর্চিত ঝাড়ফুঁক-পানিপড়া ইত্যাদি পদ্ধতিকে প্রত্যাখ্যান করত। স্থানীয় ডাক্তারের ব্যাপারে উপনিবেশভুক্তদের এবং নিজস্ব সংস্কৃতির বেশ কিছু রীতি-রেওয়াজের ব্যাপারে স্থানীয় ডাক্তারের দোটানা ডাক্তার-রোগীর সম্পর্কের মাঝখানে অপরিহার্যভাবে দেয়াল গড়ে তোলে। এক্ষেত্রে উপনিবেশভুক্ত রোগীই প্রথমে আওয়াজ তুলত। চিরায়ত চিকিৎসা পদ্ধতির উপরে যদি পশ্চিমা চিকিৎসার শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নেয়া হত তবে উপনিবেশবাদীদের কাছে যাওয়াই শ্রেয় বলে বিবেচিত হত। কেননা তারাই তো এই পদ্ধতির মূল অধিকর্তা। ফলে দেখা যেত ইউরোপীয় ডাক্তারের কাছে আলজেরিয় এবং ইউরোপীয় দুই ধরনের রোগীই যেত। কিন্তু আলজেরিয় ডাক্তার শুধুমাত্র আলজেরিয়ার রোগীই পেত। ব্যতিক্রম অবশ্যই ছিল। তবে মোটা দাগে বলা যায় পুরো আলজেরিয়ার চিত্র এমনই ছিল। উপনিবেশি সমাজকে নিয়ন্ত্রনকারী জটিল মানসিক আচার-বিধির প্রভাবে স্থানীয় ডাক্তারকে প্রায়ই এই ধরনের কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হত।

স্বাধীনতা সংগ্রামের আগে আমাদের উপনিবেশভুক্ত বুদ্ধিজীবিদের নানান কিসিমের রঙ্গ দেখতে হয়েছে। জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের যুদ্ধ আলজেরিয়াতে কি কি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা করেছে তা আমরা একটু পরেই দেখতে পাব।

মুক্তি সংগ্রামের সময় ইউরোপীয় ডাক্তারের ভূমিকা

এমনিতে আলজেরিয়দের মুক্তি সংগ্রামের ব্যাপারে উপনিবেশবাদী ডাক্তাররা তাদের স্বদেশি দখলদারদের মত একই ধারণাই পোষণ করতেন। মানবতার অসুখ সারানোই ডাক্তারের কাজ। অথচ আলজেরিয়াতে দেখা যেত কর্তৃত্বশালী সমাজের অংশে পরিণত হওয়ার মাধ্যমে ডাক্তাররা উচ্চমাত্রার সুযোগ-সুবিধা ভোগ করত। শহরে বাসরত অন্য পেশার সহকর্মীদের তুলনায় তাদের জীবনযাত্রার মান অনেক উন্নত ছিল।৪

উপনিবেশভুক্ত এলাকাগুলোতে নজর দিলে দেখা যায় ডাক্তারদের প্রায় সবাই ভূস্বামী বা জমির মালিক ছিলেন। আলজেরিয়ার উপনিবেশ বসতি স্থাপনের মত যথেষ্ট আকর্ষনীয় ছিল। এ কারনে অভিবাসীরা সহজেই আকৃষ্ট হতেন। চাষাবাদ করে না বা জমি-জমার সাথে সম্পর্ক নাই এমন কোন ডাক্তার আলজেরিয়াতে ছিলেন না। ডাক্তাররা উত্তরাধিকারসূত্রে পরিবারের কাছ থেকে জমির মালিকানা পেতেন। অথবা অভিবাসী হলে নিজেই কিনতেন। আলজেরিয়ার ইউরোপীয় অভিবাসীদের অর্থনৈতিক জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে এখনো পর্যন্ত আলাদা করে কোন আলাপ-আলোচনা হয় নাই। উপনিবেশি সমাজ কাঠামো দুর্বল হলেও তা চলমান বা গতিশীল ছিল। পেশাগত দক্ষতার সনদ থাকার পরও ইউরোপীয়দের সবাই বিভিন্ন ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রী অর্জন করত। ইউরোপীয়দের প্রত্যেকেই নিজেকে একজন শক্তিশালী পথপ্রদর্শক ও দুঃসাহসী অভিযাত্রী বলে মনে করত। এমনকি যেসব সরকারী কর্মকর্তা বছর দুয়েকের জন্য উপনিবেশি এলাকায় আসতেন তারাও মাঝে মাঝে এই মানসিক সীমাবদ্ধতাকে উতরাতে পারতেন না।

তুলনামূলক স্থিতিশীল ও সংহত সমাজব্যবস্থায় কোন ইউরোপীয় বসতি স্থাপণ করত না। উপনিবেশি সমাজে লাগাতার আন্দোলন চলতে থাকত। প্রত্যেক অভিবাসী নতুন সমাজব্যবস্থার প্রবর্তন করত বা নতুন কাঠামোর উদ্ভাবন করত। কুটিরশিল্প কারিগর, সরকারী কর্মচারী, কর্মজীবি ও পেশাজীবিদের মধ্যে ফারাক খুব কমই ছিল। প্রত্যেক ডাক্তারের নিজস্ব আঙ্গুর খেত ছিল। অন্যান্য অভিবাসীদের মত উকিলরাও তাদের ধানখেত নিয়ে ব্যস্ত থাকত। সামাজিকভাবেও ডাক্তার বলতে শুধুমাত্র ডাক্তারি করাকেই বুঝানো হত না। বরং তাদেরকে কারখানা, মদের ভাণ্ডার বা কমলা বাগানের মালিকের মতই গণ্য করা হত। ডাক্তারিকে তারা আয়ের সম্পূরক উৎস হিসাবেই উল্লেখ করতেন। ভূসম্পত্তি থেকে প্রচুর আয়ের সুবাদে জীবিকার জন্য ডাক্তারকে পেশাগত চর্চার উপর নির্ভর করতে হত না। এ কারনে তাদের মধ্যে ডাক্তারি চর্চার পেশাগত নৈতিকতা ও মূল্যবোধ সম্পর্কে নিজস্ব মত তৈরী হয়। তারা বলত, ‘জীবিকার জন্য আমাকে খদ্দেরের অপেক্ষায় বসে থাকতে হয় না’। এই বক্তব্যের মাধ্যমে অসহায়ের প্রতি সেই একই উপনিবেশি ঔদ্ধত্য, গ্রাহকদের প্রতি ঘৃণা এবং নিন্দনীয় বর্বর আচরণই ফুটে উঠে। বেসাঙ্কন, লিয়েজ বা বাসেলের ডাক্তাররা তাদের নিজ বসত-ভিটা ছেড়ে পেশাগতভাবে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি লাভ করা যায় এমন এলাকায় স্থানান্তরিত হতেন। অসহায় মানবতা এবং দুস্থ ও রোগাক্রান্তের সংস্পর্শে থাকার কারনে ডাক্তারদের মধ্যে কিছু চিরায়ত মূল্যবোধ ও বিশ্বাসের জন্ম নিত। ফলে তিনি কোন গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের সদস্যপদ গ্রহণ করতেন। তার চিন্তা-চেতনা-বিশ্বাস উপনিবেশ বিরোধী বলে তিনি প্রচার করতেন। কিন্তু প্রকৃত অর্থে উপনিবেশগুলোতে ডাক্তাররা উপনিবেশায়ন, কর্তৃত্বপরায়নতা ও শোষণের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিলেন। আলজেরিয়াতেও উপনিবেশবাদী আন্দোলনের নেতৃত্বে ডাক্তার এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের অধ্যাপকরাই ছিলেন। এতে অবশ্য খুব একটা অবাক হওয়ার কিছু নাই।

অর্থনৈতিক স্বার্থেই ডাক্তাররা আলজেরিয়াতে উপনিবেশি জুলুম কায়েম রাখার পক্ষপাতি ছিলেন। তাদের কাছে এটা ইনসাফ বা মূল্যবোধের প্রশ্ন ছিল না। উপনিবেশি পরিস্থিতির কৃপায় তাদের জীবনযাত্রার মান অনেক উন্নত ছিল। এটা টিকিয়ে রাখার জন্যই তারা উপনিবেশবাদের পক্ষে ভূমিকা রাখত। তাদেরকে প্রায়ই মিলিশিয়া বাহিনীর প্রধান কিংবা সন্ত্রাস বিরোধী অভিযানের সংগঠক বলে মনে হত। তবে উপনিবেশগুলোতে স্বাভাবিক সময় বা জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের আন্দোলন শুরু হওয়ার আগে বেশ কজন বুজুর্গ ব্যক্তি ছিলেন। এমনকি বুদ্ধিজীবিদের মধ্যেও কয়েকজন পথিকৃৎ ছিলেন। তাছাড়া আরেক দল লোক ছিলেন যারা কাউবয় বা রাখাল বালক নামে পরিচিত ছিল। যে কোন সংকটের সময় এরা নিজেদের রিভলভার বা হাতিয়ার তাক করে ভূমিকা রাখত।

আলজেরিয়াকে রক্তের বন্যায় ভাসিয়ে দেয়া যুদ্ধের প্রতিটি ঘটনাবলিকেই পূঙ্খানুপূঙ্খভাবে বিচার-বিশ্লেষণ করা উচিত। কেননা নিরপেক্ষভাবে বিবেচনা করলে ঐ সময়ের অনেক ঘটনাকেই পীড়াদায়ক বলে মনে হবে। আলজেরিয়াতে ঐ সময়ে বেশ কজন ডাক্তারকে হত্যা করা হয়। দুনিয়ার মানুষজনের কাছে এসব হত্যার প্রকৃত কারন কখনোই বোধগম্য ছিল না। ঐতিহ্যগতভাবে যুদ্ধের সময় সেনাবাহিনীর চিকিৎসা বিভাগের সদস্যদের গায়ে কোন আঁচড়ও দেয়া হত না। ইতিহাসের নির্মম যুদ্ধগুলোতেও এই নীতির হেরফের হয় নাই। উদাহরণ হিসাবে ১৯৪৪ সালের একটি ঘটনা উল্লেখ করা যায়। বেলফোর্ট অঞ্চলের একটা গ্রামে যুদ্ধ চলছিল। ঐ সময় গ্রামের স্কুলঘরে জার্মান ডাক্তাররা আহতদের অপারেশন করছিলেন। আমরা তখন মাত্র একজন পাহারাদারকে তাদের নিরাপত্তার জন্য নিযুক্ত করে স্থান ত্যাগ করেছিলাম। আলজেরিয়ার রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ যুদ্ধের নিয়ম-নীতি সম্পর্কে ভালোভাবে ওয়াকেবহাল ছিলেন। তারা সমস্যার পরিণতি, জটিলতা এবং ইউরোপীয় জনগণের হাল-হাকিকত সম্পর্কেও সম্পূর্ণ অবহিত ছিলেন। এরপরও তারা কিভাবে ডাক্তারের জীবন নাশের মত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন? এটা কি আসলেই কোন যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব?

চিকিৎসা পেশার সুবাধে ডাক্তারের চারপাশে নৈতিকতা ও মূল্যবোধের একটি প্রতিরক্ষা বৃত্ত গড়ে উঠে। কিন্তু নিজেদের আচরণের কারনেই কিছু কিছু ডাক্তার সেই বৃত্ত ভেঙ্গে বেরিয়ে পড়েন। এই কারনেই ডাক্তার হত্যার মত ঘটনা ঘটেছিল। বিচ্ছিন্ন ঘটনায় যে কয়জন ডাক্তারকে হত্যা করা হয় তারা সবাই কোন না কোনভাবে যুদ্ধাপরাধী ছিলেন। উপনিবেশি সমাজে এর বিশেষ বাস্তবতাও ছিল। নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় ডাক্তারকে উপনিবেশবাদীদের মধ্যে সব চাইতে নির্মম ও রক্তাক্ত পরিণতি বরণ করতে হয়েছে। ডাক্তার হলেও তিনি যেহেতু সম্পত্তির মালিক, অতএব তিনি জালেম। পেশাগত কারনে তার শুধু ডাক্তারিতেই মনোনিবেশ করা উচিত ছিল। কিন্তু তিনি তা করেন নাই বলে তার চিকিৎসক পরিচয়কে বিবেচনায় আনা হয় নাই। এসব ঘটনার কারনে ক্ষমতাসীন প্রশাসন ডাক্তারদের সামগ্রিক আচার-আচরণকে সুশৃঙ্খল করার উদ্যোগ নেয়। কারন এর সাথে স্বাধীনতা সংগ্রামের বিষয়টি জড়িত ছিল। এরপর থেকে আলজেরিয়দের চিকিৎসা করতে আসা কোন ডাক্তার যদি জখমের অবস্থা আশঙ্কাজনক দেখত তবে আইনি শাস্তি এড়ানোর জন্য রোগীর নাম-ঠিকানা টুকে রাখত। এমনকি রোগীর সাথে আসা লোকজনেরও বিস্তারিত নাম-পরিচয় জেনে নিত। তারপর এসব তথ্য প্রশাসনের কাছে পৌঁছে দিত।৫

ডাক্তারের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া পেনিসিলিন, স্ট্রেপটোমাইসিন, সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিক, অ্যালকোহল, বিশোষক তুলা, ধনুষ্টংকার প্রতিরোধী সেরাম (অ্যান্টি-টিটেনাস সেরাম) ইত্যাদি না দেয়ার জন্য ওষুধের দোকানদারদের নির্দেশ দেয়া হত। এছাড়া রোগীর বিশদ পরিচয় ও ঠিকানা টুকে রাখার জন্য তাদের উপরও কঠোর নির্দেশনা ছিল।

জনগণের সাথে তাদের চেনা-জানা বাড়ার সাথে সাথে এটা স্পষ্ট হয়ে যেত যে, উপনিবেশবাদীরা জনগণের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাবার পক্ষে একমত। প্রশাসনের এসব পদক্ষেপ তাদের ধারণাকে আরো মজবুত করত। তারা নিশ্চিত থাকত যে ইউরোপীয় ডাক্তার এবং ওষুধ দোকানদাররাও এসব সিদ্ধান্তের প্রতি সমর্থন জানাবে। যেসব এলাকায় আলজেরিয়দের পরিচালিত ওষুধের দোকান বেশি ছিল সেখানে ফরাসি প্রশাসন সাদা পোশাকের পুলিশ বা গুপ্তচর নিয়োগ দিত। বেশ কিছু এলাকায় ওষুধ সরবরাহ করা কঠিন ও পীড়াদায়ক কাজে পরিণত হল। সেখানে অ্যালকোহল, সালফা ড্রাগ ও সিরিঞ্জ সরবরাহে নিষেধাজ্ঞা ছিল। ১৯৫৫ সালে আলজেরিয়দের মৃত্যুর তালিকায় ফরাসি সামরিক নেতৃত্ব শুধুমাত্র নির্দিষ্ট সংখ্যক আহতদের নাম যুক্ত করত। মজার ব্যাপার হচ্ছে, তাদের মৃত্যুর কারন হিসাবে ‘যথাযথ চিকিৎসার অভাব’-কেই উল্লেখ করা হত।

উপনিবেশি ডাক্তারের আচরণের মধ্যেই কর্তৃত্বশীল সমাজের অভিজাত শ্রেণীতে তার সদস্যপদ প্রাপ্তির বিষয়টি ফুটে উঠত। পুলিশি জেরার সময় মৃত্যুবরণ করে নাই এমন আলজেরিয়দের ব্যাপারে বিচার বিভাগীয় তদন্তের সিদ্ধান্ত হত। বাদীপক্ষ তখন আইনগত ডাক্তারি পরীক্ষার আবেদন জানাত। মাঝে মাঝে এই দাবী মেনে নেয়া হত। অভিযুক্ত ব্যক্তির দেহে নির্যাতনের কোন আলামত পাওয়া যায় নাই বলেই দায়িত্বপ্রাপ্ত ইউরোপীয় ডাক্তার জানাতেন। তিনি হামেশা এই একই কথা বলে তার প্রতিবেদনের সমাপ্তি টানতেন। ১৯৫৫ সালের শুরুর দিকে বারকয়েক আলজেরিয় ডাক্তারকে বিশেষজ্ঞ হিসাবে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু কয়েকদিন পরেই এটা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে কঠোর নির্দেশনা জারি করা হয়। অন্যদিকে ঘটনাক্রমে যদি কোন ইউরোপীয় ডাক্তার লিখতেন যে, অভিযুক্ত ব্যক্তির দেহে আঘাত ও নির্যাতনের আলামত মিলেছে, তবে সাথে সাথেই তার বিরোধিতা করার মত কাউকে হাজির করা হত। আর ঐ ডাক্তারকে অতি অবশ্যই দ্বিতীয়বার আর ডাকা হত না। যে কোন আলজেরিয় ব্যক্তির মৃত্যুকে স্বাভাবিক মৃত্যু উল্লেখ করে ইউরোপীয় ডাক্তাররা বিচারিক আদালতে মৃত্যু সনদ পেশ করতেন। অথচ সে ব্যক্তিকে হয় চরম নির্যাতন করে কিংবা ঠাণ্ডা মাথায় ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়েছে। একইভাবে বাদীপক্ষের দাবী অনুযায়ী ময়নাতদন্ত করা হলেও সুরতহাল প্রতিবেদন সব সময়ই তাদের বিপক্ষে যেত।

উপনিবেশি শক্তির সাথে সক্রিয় আঁতাতের মাধ্যমেই ইউরোপীয় ডাক্তাররা যাবতীয় ভয়াবহ অপকর্মগুলো সম্পন্ন করতেন। আমরা এখানে ইউরোপীয় ডাক্তার বাহিনীর বেশ কিছু কর্মকাণ্ডের উপর আলো ফেলব। আশা করি এর মাধ্যমে ডাক্তারদের হত্যাযজ্ঞ সম্পর্কে কিছু ধারণা পাওয়া যাবে।

প্রথমত, ‘সত্য সেরাম’ এর বিষয়টা বলব। এই ওষুধের মূলনীতি সবাই জানে। এটা শিরাপথে প্রয়োগযোগ্য এমন একটি রাসায়নিক দ্রব্য যার সম্মোহন ক্ষমতা আছে। অপারেশনের সময় এটা প্রয়োগ করলে রোগী ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণ হারায় এবং তার অনুভূতিশক্তি লোপ পায়। চিকিৎসার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করলে এটা অবশ্যই বিপদজনক প্রক্রিয়া হিসাবে বিবেচিত। কারন এর প্রয়োগে ব্যক্তিত্বহানি বা মানসিক বৈকল্য হতে পারে। পরীক্ষা-পর্যবেক্ষণের পর উপকারের চাইতে অপকারের মাত্রা বেশি প্রমাণিত হওয়ায় বহুকাল আগেই মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা একে বর্জন করেছেন।

সারা দুনিয়ায় চিকিৎসাবিদ্যার সব প্রতিষ্ঠান আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে আইনগতভাবে এর ব্যবহার নিষিদ্ধ করছে। এই আদেশ অমান্যকারী ডাক্তারকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রাথমিক মূলনীতি লঙ্ঘনকারী হিসাবে বিবেচনা করা হয়। নিজ দেশের জনগণের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াইকারী ডাক্তারকেও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পেশাগত মানদণ্ড ও মূলনীতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা উচিত। সারা দুনিয়ার সব দেশে অপরাধ করলে ডাক্তারকেও মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। নাৎসীদের মানবিক পর্যবেক্ষণ শিবিরগুলোর ডাক্তারদের উদাহরণ এক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়।

আলজেরিয়াতে ইউরোপীয় ডাক্তাররা আশ্চর্যজনকভাবে ‘সত্য সেরাম’-কে ঘন ঘন ব্যবহার করতেন। এক্ষেত্রে আমরা হেনরি আলেগ রচিত ‘দি কুয়েশ্চেন’ বইয়ের কথা স্মরণ করতে পারি।৬

দিনের পর দিন জুলুমের শিকার নারী ও পুরুষদের চিকিৎসা দেয়ার সুযোগ হয়েছিল আমাদের। এই ধরনের চর্চা আখেরে কি ফল নিয়ে আসতে পারে তা নিয়ে আমরা অন্যত্র আলাপ করব। কিন্তু এখানে আমরা এটা নিশ্চিত করতে পারি যে সুনির্দিষ্টভাবে সত্য-মিথ্যার ফারাক করতে আমরা সমর্থ নই এবং যে বিষয়টা গোপন রাখা উচিত তা নিয়ে কথা বলতে আমাদের মনে অত্যাধিক ভয় কাজ করে। আমাদের অবশ্যই এটাও মনে রাখতে হবে যে, আলজেরিয়দের মধ্যে বিপ্লব সংক্রান্ত গোপন বিষয়াদির ব্যাপারে কোন নির্দিষ্ট দল-মতের অনুসারীর ভূমিকা পালনকারী হিসাবে কাউকে পাওয়া যাবে না। মাসব্যাপী নির্যাতনের পর ঐ কয়েদি তার নাম ও জন্মস্থান জানাতেও সংকোচ বোধ করত। জেরার সময় সেই একই অভিজ্ঞতাই হত। প্রত্যেকটা প্রশ্নের মধ্য দিয়ে জালেম ও মজলুমের মধ্যকার সম্পর্কের পুনরাবৃত্তিই হাজির হত।

বিভিন্ন নির্যাতন কেন্দ্রের ডাক্তাররা প্রতিবার জিজ্ঞাসাবাদ পর্ব শেষ হওয়ার সাথে সাথেই সেখানে হস্তক্ষেপ করতেন। তারা অভিযুক্তকে আবার আগের জায়গায় নিয়ে যেতেন এবং একই প্রক্রিয়ায় নির্যাতন করে তাকে পরবর্তী জিজ্ঞাসাবাদ পর্বের জন্য প্রস্তুত করতেন। জেরার মুখে কোন তথ্য যাতে মুখ ফসকে বের না হয়ে যায় সে ব্যাপারে অভিযুক্ত ব্যক্তি খুব সচেষ্ট থাকত। এই পরিস্থিতিতে এটাই তার কাছে সব চাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। অন্যকথায় তার কাছে এটাই ছিল বেঁচে থাকার প্রকৃত অর্থ। আলজেরিয় ব্যক্তিকে জেরা করার আগে, পরে এবং জেরার সময়ও হৃদক্রিয়া উত্তেজক ওষুধ ও উচ্চমাত্রার ভিটামিন ওষুধ প্রয়োগ করা হত। উদ্দেশ্য ছিল তাকে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ঝুলিয়ে রাখা। জিজ্ঞাসাবাদ প্রক্রিয়ায় ডাক্তার যতবার হস্তক্ষেপ করতেন ততবারই অভিযুক্তদের উপর জুলুমের খড়গ নেমে আসত।

আলজেরিয়ার ইউরোপীয় চিকিৎসা বিভাগ, বিশেষ করে সামরিক চিকিৎসা বিভাগগুলোতে এই চিত্র হামেশাই দেখা যেত। চরম অসভ্য, নিকৃষ্ট এবং বিকৃত আচরণের ধারাবাহিকতায় পেশাগত নৈতিকতা, চিকিৎসা নীতিশাস্ত্র, আত্মমর্যাদাবোধ এবং অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের মত বিষয়গুলো বিসর্জন দেয়া হয়েছিল। পুলিশকে সহায়তা করার জন্য বেশ কজন মনোবিদের নিয়মিত বিমানে চড়ার প্রবণতার বিষয়টাও মাথায় রাখা দরকার। আলজিয়ার্সে এমন কিছু মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ছিলেন যারা অভিযুক্তদের চিকিৎসার নামে বৈদ্যুতিক শক দিতেন। অধিকাংশ কয়েদি তাদের ভালো করে চিনতেন। শক দেয়ার পর শরীর নিস্তেজ হয়ে পড়ত। এই অবস্থা থেকে জেগে উঠার মূহুর্তে যখন শরীর শিথিল অবস্থায় থাকে তখন অভিযুক্তদের জেরা করা হত। কারো পক্ষেই এ সময় আত্মপক্ষ সমর্থনের খুব একটা সুযোগ থাকে না। এমন বর্বর নির্যাতনের পরও যদি ডাক্তাররা কোন তথ্য আদায় করতে না পারতেন তবেই হয়ত অভিযুক্তকে ছেড়ে দেয়া হত। কিন্তু ততক্ষণে তাকে বিকারগ্রস্থ করার প্রক্রিয়াটা আমাদের কাছে খোলাসা হয়ে যায়। এই ব্যক্তিকে পুনর্বাসন করাটা খুব কঠিন ছিল। আলজেরিয়ার ফরাসি উপনিবেশকে দোষী সাব্যস্ত করার জন্য অনেক পাপকাজের হদিস মিলে। তার মধ্যে এটাকে অন্যতম গুরুতর হিসাবে ধরা যায়।৭

আলজেরিয় জনগণ, চিকিৎসা পদ্ধতি এবং স্বাধীনতার লড়াই

আলজেরিয়দের ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নতুন ধরনের বিপ্লবী চরিত্রের আবির্ভাব ও বিন্যাস চিহ্নিত করার মত বেশ কিছু ঘটনা আমাদের জানা আছে। উপনিবেশবাদের শৃঙ্খল ভেঙ্গে ফেলার কারনে একরোখা আচরণ সংযত হয়েছে, চরমপন্থা কমেছে এবং সুনির্দিষ্ট কিছু স্বেচ্ছাচারী ধ্যান-ধারণা বাতিল হয়ে গিয়েছে। চিকিৎসা বিজ্ঞান এবং স্বাস্থ্য বিষয়ক ভাবনা-চিন্তা দখলদার শক্তির মাধ্যমেই আরোপ করা হত। কিংবা বলা যায় তারাই ছিল এই ব্যবস্থার প্রকৃত প্রস্তাবক। উপনিবেশ আমলে পরিচ্ছন্নতা শিক্ষা ও মহামারী সম্পর্কে ধারণা লাভ করার জন্য শারীরিক ও মানসিক পরিস্থিতি তৈরী করা সম্ভব ছিল না। উপনিবেশকালে ডাক্তার দেখাতে যাওয়া আর প্রশাসনিক কর্মকর্তা, পুলিশ কনস্টেবল বা মেয়রের সাথে দেখা করা একই কথা ছিল। উপনিবেশি সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার প্রবণতা ও উপনিবেশবাদীদের প্রশাসনিক প্রতিনিধিদের উপর অনাস্থার বিষয়টি অনেকটা যান্ত্রিক রূপ ধারণ করে। ফলে জনগণের জন্য কল্যাণকর ও লাভজনক বিষয়েও সেই একই ধরনের নির্লিপ্ততা ও অনাস্থাই প্রকাশ পেতে থাকে।

আমরা দেখেছি, আন্দোলনের একেবারে প্রথম মাসেই ফরাসি প্রশাসন অ্যান্টিবায়োটিকস, ইথার, অ্যালকোহল ও ধনুষ্টংকার প্রতিরোধী ভ্যাকসিন (অ্যান্টি টিটেনাস ভ্যাকসিন)-এর উপর অবরোধ আরোপের সিদ্ধান্ত নেয়। এগুলো কিনতে গেলে যে কোন আলজেরিয় নাগরিককে ওষুধের দোকনদারের কাছে তার এবং সংশ্লিষ্ট রোগীর বিশদ পরিচয় দিতে হত। আলজেরিয়ার জনগণ যদি অন্য কারো চিকিৎসার উপর নির্ভর করবে না বলে সিদ্ধান্ত নিত তবে উপনিবেশি শক্তি ওষুধ ও সার্জারির যন্ত্রপাতি বেচা-বিক্রি নিষিদ্ধ করে দিত। যখনই কোন আলজেরিয় নাগরিক বেঁচে যেত এবং নিজেই নিজের যত্ন-আত্তি করা শুরু করত, তখনই দখলদারদের অত্যাচারে তার জীবন অতীষ্ট হয়ে উঠত। অনেক পরিবারকেই তাদের নিজ বাড়িতে আশ্রয় নেয়া আহত মুজাহিদকে ধনুষ্টংকারে আক্রান্ত হয়ে মরতে দেখতে হয়েছে। চোখের সামনে এমন বর্বরতা দেখেও অন্তরে তীব্র ঘৃণা নিয়ে অসহায়ের মত দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখা ছাড়া তাদের আর কিছুই করার থাকত না। বিপ্লবের শুরুর মাসগুলোতে ন্যাশনাল ফ্রন্টের প্রতি নির্দেশনা ছিল এমন যে, জখম যত মৃদুই হোক না কেন আহতকে সাথে সাথেই ধনুষ্টংকার প্রতিরোধী ভ্যাকসিন (অ্যান্টি টিটেনাস ভ্যাকসিন) দিতে হবে। এটা জনগণ জানত। খারাপ ধরনের জখম হলে চিকিৎসার স্বার্থে প্রথমে ক্ষতস্থান ভালোমত পরিষ্কার করে ময়লা দূর করা হত। এরপর হঠাৎ করেই হয়ত আক্রান্ত ব্যক্তির সহযোগীদের আশঙ্কা হত যে তার ধনুষ্টংকারের সংক্রমন হতে পারে। কিন্তু ওষুধের দোকানদার তা বেচবে না। সে এই ব্যাপারে অনড় কেননা ধনুষ্টংকার প্রতিরোধী ভ্যাকসিন বা অ্যান্টি টিটেনাস ভ্যাকসিন বেচা নিষিদ্ধ। ডজন ডজন আলজেরিয় নাগরিক এর প্রত্যক্ষ সাক্ষী। তারা সবাই জখমি ব্যক্তির ধীরে ধীরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার ভয়াবহ বর্ণনা দিতে পারবে। টিটেনাস বা ধনুষ্টংকারের বিষ কিভাবে আক্রান্ত ব্যক্তির সারা শরীরকে অসাঢ় করে দিত, তারপর সারা শরীর পেঁচিয়ে জখমি ব্যক্তি কিভাবে আবার পক্ষাঘাতগ্রস্থের মত পড়ে থাকতেন তা এখনও আলজেরিয়দের স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে আছে। তারা এই বলে সমাপ্তি টানবে যে, শেষ পর্যন্ত কারোই আর ঘরে থাকার সুযোগ হয় নাই।

আলজেরিয়রা যদি কোন ইউরোপীয়কে দিয়ে তাদের কেনাকাটা করাতে পারত তবে তারা দেখত ইউরোপীয় নাগরিক কোন বাধা-বিপত্তি ছাড়াই ওষুধসহ সব ধরনের দ্রব্য কিনে নিয়ে এসেছে। অথচ আলজেরিয় নাগরিকরা এলাকার সব ওষুধের দোকানে গিয়ে মিনতি করলেও কেউ ওষুধ দিত না। বরং ওষুধের দোকানদারদের কঠোর চোখ রাঙানি ও জেরার মুখে সে ফিরে আসত। অথচ ইউরোপীয়রা নিরীহ ব্যক্তির মত নির্ভাবনায় দোকান থেকে ওষুধের টাল নিয়ে ফিরত। এইসব অভিজ্ঞতার কারনে আলজেরিয়রদের তরফে ইউরোপীয় সংখ্যলঘুদের প্রতি সুষম আচরণ করা সহজ ছিল না। রাজনীতিমুক্ত বিজ্ঞান বা মানবসেবার বিজ্ঞান উপনিবেশগুলোতে খুঁজে পাওয়া যেত না। এই কারনে মাত্র একশ গ্রাম জীবাণুমুক্ত তুলার জন্য আলজেরিয়দের ঘন্টার পর ঘন্টা কাকুতি-মিনতি করে ব্যর্থ হয়ে ফিরে যেতে হত। অথচ উপনিবেশবাদীরা পুরা একখণ্ড তুলা নিয়ে ফিরত। একইভাবে অ্যালকোহলও নিষিদ্ধ ছিল। অ্যালকোহলের অভাবে কুসুম গরম পানি দিয়ে জখমের পরিচর্যা বা ড্রেসিং করা হত এবং ইথারের অভাবে অবশ না করেই অঙ্গচ্ছেদ করা হত।

বিরোধীদের কর্তৃক ওষুধ ও অন্যান্য অত্যাবশ্যকীয় রসদসামগ্রী প্রত্যাহার করে নেয়ায় স্থানীয়দের তরফে এগুলোকে নতুনভাবে মূল্যায়ন করা শুরু হয়। মুক্তিসংগ্রামের আগে ওষুধকে চিকিৎসাসামগ্রী স্বীকৃতি দেয়া হলেও এহেন পরিস্তিতিতে তাকে অস্ত্র হিসাবে বিবেচনা করা হয়। ফলে ওষুধ সরবরাহের দায়িত্বে নিয়োজিত থাকা বিপ্লবী বাহিনীর নগর শাখার গুরুত্ব বেড়ে যায়। তখন একে বিরোধী শক্তির পরিকল্পণা ও গতিবিধির উপর নজরদারির দায়িত্বপ্রাপ্তদের সমান মর্যাদা দেয়া হত। আলজেরিয় ব্যবসায়ীরা নাগরিকদের রেডিও সরবরাহের পথ খুঁজে বের করত। ঠিক একইভাবে আলজেরিয় ওষুধের দোকানদার, নার্স ও ডাক্তাররা স্বদেশি আহত ব্যক্তিদের অ্যান্টিবায়োটিক ও ড্রেসিং সামগ্রীর জোগান দিতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাত। সুদূর তিউনিসিয়া থেকে মরক্কো পর্যন্ত এই প্রচেষ্টা অব্যহত ছিল। চিকিৎসা সামগ্রীর নিরবচ্ছিন্ন জোগানের কারনে ১৯৫৬ ও ১৯৫৭ সালের সংকটকালীন সময়ে অসংখ্য মানুষের জীবন বেঁচেছে।

মুক্তি সংগ্রামের সময় পুরো আলজেরিয়াকে ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মির কয়েকটি ঘাঁটিতে ভাগ করা হয়। যুদ্ধের তীব্রতা বাড়ার সাথে সাথে ঘাঁটিগুলোতে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও এ সম্পর্কিত সমস্যাগুলো মারাত্মক আকার ধারণ করে। বিরোধী হামলার ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা বাড়ার কারনে প্রাত্যহিক ও নিয়মিত কর্মকাণ্ড বিঘ্নিত হচ্ছিল। রোগীর ডাক্তার দেখাতে আসা কার্যক্রমও এর মধ্যে অন্তর্ভূক্ত ছিল। যুদ্ধের ঝুঁকি এড়ানোর জন্য ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট হয়ত দিনের মধ্যে জনগণকে তাদের বাড়ি-ঘর ছেড়ে অন্যত্র সরে যেতে বলত। যারা পারত না তাদের ব্যাপারে কঠোর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হত। তখনই তারা স্থানান্তর করা সম্ভব এমন কোন নিজস্ব জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা স্থাপণের তাগিদ অনুভব করে। যেখানে অন্তত নিয়মিত পরীক্ষা-পর্যবেক্ষণের জন্য ডাক্তারের কাছে আসার বিষয়টাকে প্রতিস্থাপন করা যাবে। এর মাধ্যমে স্থানীয় এলাকার স্বাস্থ্যবিষয়ক দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি বিপ্লবী ব্যবস্থার জরুরি সদস্যে পরিণত হন। কিন্তু সমস্যাগুলো অচিরেই আরো বেশি জটিল হয়ে পড়ে। সাধারণ নাগরিকদের উপর বোমাবর্ষণ ও হামলাও তখন অসুস্থতা বা বালাই হিসাবে হাজির হয়। প্রত্যেক আলজেরিয় সৈনিককে আঘাতের বিপরীতে কমপক্ষে দশজন সাধারণ নাগরিককে হত্যা করা হত বা জখম হতে হত। এটা সবাই জানে। ফরাসি সৈনিকদের জবানেও এর সপক্ষে সাক্ষ্যের অভাব হবে না। এই পরিস্থিতিতে চিকিৎসা সামগ্রীর জোগান এবং ডাক্তারের উপস্থিতি অপরিহার্য হয়ে পড়ত। এটাই সেই সময় যখন চিকিৎসা বিজ্ঞানের ছাত্র-ছাত্রী, নার্স এবং ডাক্তারদের যুদ্ধে যোগ দেয়ার হুকুম দেয়া হয়েছিল। উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলায় চিকিৎসাবিদ ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দদের নিয়ে বৈঠকের আয়োজন করা হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই জনস্বাস্থ্য সমস্যা চিহ্নিত ও সমাধান করতে নাগরিকদের একটি প্রতিনিধিদলকে দায়িত্ব দেয়া হয়। বিপ্লবের প্রতি গভীর সংহতি ও তেজোদ্দীপ্ত চেতনা সহকারেই তারা প্রত্যেকটা ঘাঁটিতে নিয়োগপ্রাপ্ত হিসাবে এই দায়িত্ব পালন করেন।

এখানে খবরদারি বা ভীরুতা বলে কিছু ছিল না। বরং এর বিপরীতে স্বাস্থ্য বিষয়ক পরিকল্পণাগুলো সফলভাবে বাস্তবায়নে সম্মিলিত প্রয়াস ছিল। অনুন্নত জনগোষ্ঠীর উপর বিজয় লাভের উদ্দেশ্যে চিকিৎসাবিদরা কোন ‘বিশেষ মানসিক প্রকল্প’ আরম্ভ করেন নাই। তবে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের অধীনে থেকে জনগণের স্বাস্থ্যের তত্ত্বাবধান এবং নারী, শিশু ও যোদ্ধাদের জীবন রক্ষা করাটা কঠিন ছিল।

আমাদের এই বাস্তবতা মেনে নিতে হবে যে ১৯৫৪ সাল থেকে আলজেরিয়াতে জাতিগত ক্ষমতার উত্থান ঘটে। এই জাতীয় সরকার জনগণের স্বাস্থ্যসেবার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেয়। জনগণও তাদের পুরানো স্বভাব বা নিষ্ক্রিয়তা পরিত্যাগ করতে থাকে। এমনকি মৃত্যুর সাথে লড়াইয়ে লিপ্ত লোকজনও নির্দেশ পালনের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমী বুদ্ধি-বিবেচনা ও উদ্দীপনা দেখাতে থাকে।

আমরা দেখেছি, জাতীয় যুদ্ধের আগে আলজেরিয় ডাক্তার বা স্থানীয় ডাক্তারকে দখলদারদের প্রতিনিধি হিসাবে বিবেচনা করা হত। কিন্তু এ সময় তাকেও দলভুক্ত করে নেয়া হয়। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে মাটির বিছানায় নোংরা পরিবেশে একসাথে ঘুমিয়ে বা জনগণের জীবনকে আরো নাটকীয় ও প্রাণবন্ত করে তোলার মাধ্যমে আলজেরিয় ডাক্তার আবার মাতৃভূমি আলজেরিয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হন। মুখ বুঝে নিপীড়ণ সওয়ার সময়কার চিরন্তন চাপাস্বভাব তখন আর থাকে না। তখন তিনি ‘ঐ ডাক্তার’- এর স্থলে ‘আমাদের ডাক্তার’ বা ‘আমাদের চিকিৎসক’-এ পরিণত হন।

অতঃপর জনগণ বিদেশি বৈশিষ্ট্য বাদ দেয়া চিকিৎসা পদ্ধতির দাবী করত এবং সে অনুসারেই নিজেরা চর্চা করত। মুক্তি সংগ্রামের কারনে আলজেরিয়ার অসংখ্য অঞ্চলে চিকিৎসা পদ্ধতির সূত্রপাত হয় ও সাধারণ জনগণের সাথে স্থানীয় ডাক্তারের পরিচয় ঘটে। এর আগে হয়ত লোকেরা মাসে একবার বা বছরে দুইবার ইউরোপীয় ডাক্তারের কাছে যেত। কিন্তু এখন তারা দেখল আলজেরিয় ডাক্তার তাদের গ্রামে স্থায়ীভাবে বসত গড়ছে। বিপ্লব এবং চিকিৎসা সমানতালে তাদের উপস্থিতিকে আরো দৃশ্যমান করে তুলল।

স্বভাবগত পরিবর্তন ও তার সাথে গতিশীলতার অনুপম সমন্বয়ের পিছনে যে এই ঘটনাগুলোই ভিত্তি হিসাবে কাজ করেছে তা সহজেই বুঝা যায়। পরিচ্ছন্নতা ও রোগ প্রতিরোধ সম্পর্কিত সমস্যাগুলো মানুষের কাছে তুলে ধরার জন্য যথেষ্ট সৃষ্টিশীল পরিবেশের উদয় হয়েছিল। উপনিবেশি প্রশাসন গ্রামে গ্রামে শৌচাগার স্থাপনের সুপারিশ করলেও তা শোনা হয় নাই। কিন্তু এখন প্রচুর সংখ্যক শৌচাগার স্থাপন করা হল। আন্ত্রিক পরজীবির সংক্রমন সংক্রান্ত ধারণা লোকজন সাথে সাথেই গ্রহণ করল। নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর জলাশয়গুলো বর্জনের উদ্যোগ নেয়া হল। নবজাতকদের প্রসব পরবর্তী চোখের প্রদাহজনিত রোগ মোকাবেলায় দৃশ্যমান সাফল্য অর্জিত হল। মায়ের অবহেলার কারনে বাচ্চার রোগ-বালাই হওয়ার সম্ভাবনা কমতে থাকে। বরং সময়মত অরিওমাইসিন না পাওয়াটাই তখন সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। লোকজন সুস্থ হতে চাইত, যত্ন-আত্তি প্রত্যাশা করত এবং তার রোগ সম্পর্কে ডাক্তার ও নার্সদের পেশ করা ব্যাখ্যা বুঝার চেষ্টায় চিন্তিত থাকত।৮ নার্সদের জন্য স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হল। দেখা গেল মাত্র অল্প ক’দিনেই অশিক্ষিতরা শিরাপথে ইনজেকশন দেয়ার যোগ্যতা অর্জন করে ফেলল।

একইসাথে পুরনো কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসে ফাটল ধরতে শুরু করে। জাদুবিদ্যা, ম্যারাব্যুটিজম (যদিও বুদ্ধিজীবিদের অব্যহত প্রচারণায় ম্যারাব্যুটিজমের যথেষ্ট সুনামহানি হয়েছিল) ও জ্বিনে বিশ্বাস আলজেরিয়দের যাপিত জীবনের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে ছিল। কিন্তু বিপ্লবের কারনে সূচিত নতুন কর্মপন্থা ও রীতি-নীতির প্রভাবে এগুলো সব ঝেঁটিয়ে বিদায় করা হয়।৯ এমনকি প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত সমাজব্যবস্থাতেও কঠিন বলে বিবেচিত নির্দেশাবলি আলজেরিয়রা সহজেই মেনে নেয়। আমরা এখানে এ সম্পর্কিত দু’টি গুরুত্বপূর্ণ নজির পেশ করব।

প্রথমত, একটা নিয়ম ছিল এমন যে পেটে জখম হলে কাউকে পানি পান করতে দেয়া যাবে না। এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট নির্দেশনা ছিল এবং জনগণকে বক্তব্য-বিবৃতির মাধ্যমে তা জানানো হত। এ নিয়মের অধীনে কোন ছেলে বা মেয়ের এই বিষয়ে অনবহিত থাকাকে মেনে নেয়া হত না। নিয়মটা হচ্ছে, ‘পেটে জখম হওয়া সৈনিককে পানি দেয়া যাবে না, এমনকি কেবল এক ফোঁটা হলেও’। একটি যুদ্ধের পর সবাই আহত ব্যক্তিকে ঘিরে দাঁড়িয়ে ডাক্তারের জন্য অপেক্ষা করছিল। এসময় তারা দুর্বলতা প্রদর্শন না করে আহত যোদ্ধার অনুরোধ শুনছিল। আহত যোদ্ধা পানির জন্য আকুতি করলেও অন্তত কয়েক ঘন্টা তাকে পানি দেয়া যাবে না বলে সেখানে উপস্থিত নারীরা জানিয়ে দিল। তারা এ বিষয়ে খুব কঠোরতা দেখাত। এমনকি মুজাহিদের সন্তানও পানি দিতে অস্বীকৃতি জানাত। সে বরং বলত, ‘এই নাও তোমার অস্ত্র। আমাকে তুমি মেরে ফেল। তারপরও আমি তোমাকে পানি এনে দিতে পারব না’। ডাক্তার আসার পর জরুরি ভিত্তিতে অপারেশন করা হত। এরপর হয়ত ঐ মুজাহিদ যোদ্ধা আস্তে আস্তে পুরোপুরি সেরে উঠত।

দ্বিতীয় উদাহরণটি টাইফাস সংক্রমণের সময় খাবার গ্রহণে কঠোর নিয়মানুবর্তিতা অনুসরণ করার সাথে সম্পর্কিত। রোগী দেখতে পারিবারিক সদস্যদের হাসপাতালে যাওয়ার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা ছিল। হাসপাতালের নিয়ম-নীতি কঠোরভাবে পালন করা হত। কেননা অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, যখনই কোন পারিবারিক সদস্য টাইফাস আক্রান্ত রোগীকে দেখতে যেত সে রোগীর ক্ষুধার যন্ত্রণা দেখে গলে যেত এবং কোন না কোন ভাবে রোগীর জন্য কিছু পিঠা ও মুরগীর তরকারি রেখে আসত। ফলশ্রুতিতে রোগীর অন্ত্রনালী ফুটা হয়ে যেত। এমন ঘটনা প্রায়ই ঘটত।

উপনিবেশি পরিস্থিতিতে এই ঘটনা বিশেষ তাৎপর্য বহন করত। উপনিবেশভুক্ত জনগণ এই ধরনের ডাক্তারি অনুশাসনকে নিপীড়ণ ও দুর্ভিক্ষের নতুন ধরন বলে মনে করত। তাদের কাছে এটা ছিল দখলদারদের অমানবিক আচরণ প্রকাশের নয়া মাধ্যম। টাইফাস আক্রান্ত রোগীটি যদি শিশু হয় তবে তার মায়ের অনুভূতি কেমন হত তা সহজেই অনুমেয়। অন্যদিকে আলজেরিয় নার্স ও ডাক্তাররা রোগীর পরিবারের সদস্যদের এ বিষয়টি বোঝাতে সক্ষম হন। তারা স্বাস্থ্য সতর্কতা, ওষুধ গ্রহণের নিয়ম-কানুন, হাসপাতালে রোগীর সাথে দেখা করার উপর নিষেধাজ্ঞা, পৃথকীকরন এবং অন্তত কয়েকদিন খাবার গ্রহণে কঠোর নিয়ম মেনে চলা- এসব বিষয়ে তাদের কাছ থেকে পূর্ণ সহযোগিতা আদায় করে নেন। যে আলজেরিয় মা জীবনে কখনো ডাক্তার দেখে নাই, সেও চিকিৎসকের কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করা শুরু করে।

জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের সময় আলজেরিয়ার অনুন্নত জনগোষ্ঠীর মধ্যে যে নতুন ধরনের পরিস্থিতির আবির্ভাব ঘটেছিল তাতে গভীরভাবে নজর দেয়া উচিত। স্বাস্থ্য শিক্ষার মৌলিক বিষয়াদি নিয়ে যারা কাজ করেন বা এ বিষয়ের বিশেষজ্ঞদের এগুলো নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা-গবেষণা করা উচিত। দেখা গেল, দেহ যখন আবার আগের মত সংহত ও গতিশীল প্রক্রিয়ায় বাঁচার প্রয়াস পেল তখনই সব কিছু সম্ভব হয়ে উঠল। ‘স্থানীয় মানসিকতা’ বা ‘বুনিয়াদি ব্যক্তিত্ব’-এ বিষয়গুলো নিরর্থক বলে গণ্য হল। যারা নিজ হাতে নিজেদের ভাগ্য গড়ার দায়িত্ব নিল তারা অচিরেই অত্যাধুনিক সব প্রযুক্তিকে অসাধারণ প্রতিভায় ব্যবহার করা শুরু করল -- তরজমা: শাহ্ মোহাম্মদ ফাহিম

টীকা ও প্রাসঙ্গিক তথ্য

১. ফরাসি সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রিত হাসপাতালগুলোতে আলজেরিয় নাগরিক ও দক্ষিণ সাহারার পদাতিক সেনাদের উপর পরীক্ষামূলকভাবে মৃগীরোগজনিত জ্ঞান হারানোর মাত্রা দেখা হত। মৃগী রোগের কারনে বিভিন্ন জাতি-গোত্র নির্বিশেষে জ্ঞান হারানোর সুনির্দিষ্ট সীমা ও মাত্রা জানার জন্য এই গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হত। হাসপাতালের মানসিক বিভাগে ভর্তি থাকা ফরাসি সেনাদের বরাতেই এই তথ্য জানা গেছে। বিজ্ঞানের দোহাই দিয়ে গবেষণা কাজ চালানোর নামে একই ব্যক্তিকে বারবার হাসপাতালে আনা হত।

নিজ জন্মভূমি থেকে এই কুকীর্তি উৎখাতের জন্য লড়াই করা ছাড়া আলজেরিয় সমাজ বা আলজেরিয়ার জনগণের আর কোন পথ খোলা ছিল না। অবশ্য তারা ব্যতিত এই দায়িত্ব নেয়ার মত আর কেউই ছিল না।

২. এই সুনির্দিষ্ট পর্যবেক্ষণ থেকেই উপনিবেশভুক্তদের সার্বিক মনোভাব সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। তারা খুব কম সময়ই সত্য কথা বলত। তারা কখনোই উপনিবেশবাদীদের বশ্যতা স্বীকার করত না বা তাদের হাতে নিজেকে সমর্পন করত না। এ সম্পর্কে ১৯৫৫ সালে অনুষ্ঠিত ফরাসি ভাষাভাষি মনোবিদ ও মস্তিষ্করোগ বিশেষজ্ঞদের সম্মেলনের আগের বার্তাটি পাঠক পড়ে দেখতে পারেন। এর শিরোনাম ছিল, "The Algerian and Avowal in Medico-Legal Practice."

৩. অবশ্যই সেখানে ভালো ডাক্তারও ছিলেন। তারা রোগীর সাথে স্বাভাবিক ও মানবিক আচরণ করতেন। তবে তাদের সম্পর্কে বলা হত, ‘তারা ঠিক অন্যদের মত নয়’।

৪. উপনিবেশগুলোতে ডাক্তারি চর্চাকে নিয়মতান্ত্রিক জোচ্চুরি বলে মনে করা হত। জোচ্চুরির বহু নজির রয়েছে। বিশুদ্ধ পানি সিরিঞ্জে ভরে পরপর দুইবার ইনজেকশন দেয়ার পর পেনিসিলিন বা ভিটামিন বি-১২ এর রসিদ কাটা হত। আবার তেজস্ক্রিয় বিকিরণে সক্ষম কোন ধরনের বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি ছাড়াই ডাক্তররা বুকের এক্সরে করতেন। কিংবা ক্যান্সার নিয়ন্ত্রণের জন্য রেডিওথেরাপি দিতেন। রোগীদের একটা ধাতুর তৈরী পাতের পিছনে দাঁড় করানো হত। পনের থেকে বিশ মিনিট ঠায় দাঁড় করিয়ে রাখার পর প্রক্রিয়াটি শেষ হয়েছে বলে তাদের জানানো হত। এমনকি গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে ডাক্তাররা ভ্যাকুয়াম ক্লিনার দিয়ে এক্সরে করার মত দুঃসাহসও দেখিয়েছেন। পুরো আলজেরিয়া জুড়ে এই ধরনের আরো অনেক নজির খুঁজে পাওয়া যাবে। এখানে অরল্যান্সভিলের একটি অঞ্চল রাবেলাইস-এর এক ইউরোপীয় ডাক্তারের কথা উল্লেখ করা যায়। শুধুমাত্র হাটের দিন সকালেই তিনি ত্রিশ হাজার ফ্রাঙ্ক কামাই করতেন। তার নিজের বয়ানেই আমরা সে গল্প শুনব। তার ভাষ্যমতে, ‘আমি ভিন্ন ভিন্ন মাপের তিনটি সিরিঞ্জ নিয়ে তাতে লবণ-পানি ভরলাম। তারপর যথাক্রমে ৫০০, ১০০০ ও ১৫০০ ফ্রাঙ্ক মূল্য নির্ধারণ করে রোগীকে জিগেশ করলাম, সে কোনটি নিবে?’ ডাক্তারের বক্তব্য ছিল, ‘রোগীরা সবসময় সবচাইতে দামী ইনজেকশনটাই বেছে নিত।’

৫. এসব পদক্ষেপের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেই ফ্রান্সের ডাক্তারি অনুশাসন পরিষদ ফরাসি ঐতিহ্যের সাথে সঙ্গতি রেখে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করে।

এই পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক পাইডেলিয়েভ্রে আলজিয়ার্স, কন্সটান্টিন ও ওরানের ডাক্তারি অনুশাসন পরিষদের প্রতি একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি লিখেন। সেখানে তিনি বলেন, ‘‘আমি আপনাদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই কোন অবস্থাতে, কোন কিছুর দোহাই দিয়ে পেশাগত গোপনীয়তার লঙ্ঘন করা যাবে না। আমি নির্দিষ্ট করে বলতে চাই, ধর্ম-বর্ণ, বন্ধু-শত্রু নির্বিশেষে সবাইকে নিষ্ঠার সাথে চিকিৎসা প্রদান করতে ডাক্তাররা দায়বদ্ধ। সবশেষে আমি নীতিশাস্ত্রের আইনি বিধান সম্পর্কে আপনাদের মনযোগ আকর্ষণ করতে চাই। এই বিধানের তৃতীয় অনুচ্ছেদে স্পষ্ট করে বলা আছে, ‘ডাক্তারকে অবশ্যই নিষ্ঠার সাথে সব রোগীকে চিকিৎসা প্রদান করতে হবে। তাদের সামাজিক অবস্থা, জাতীয়তা, ধর্ম, ব্যক্তিগত সুনাম-সুখ্যাতি বা তাদের সম্পর্কে ডাক্তারের ব্যক্তিগত অনুভূতি কোন কিছুই এক্ষেত্রে বিবেচনায় আনা যাবে না।’ ’’ আমরা আরো যোগ করতে পারি যে, বহু ইউরোপীয় ডাক্তার আলজেরিয়ায় ফরাসি প্রশাসন কর্তৃক গৃহীত সিদ্ধান্তসমূহ প্রয়োগে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল।

৬. H. AlJeg, La Question, Editions de Minuit, 1958

৭. যুদ্ধাহত কোন আলজেরিয় সৈনিকের চিকিৎসার জন্য সামরিক বাহিনীর ডাক্তারদের ডাকা হলে তারা চিকিৎসা দিতে অস্বীকৃতি জানাতেন। আনুষ্ঠানিক অজুহাত হিসাবে তারা বলতেন জখম খুব মারাত্মক। একে বাঁচানোর মত আর কোন উপায় অবশিষ্ট নাই। ঐ সৈনিকের মৃত্যু হলে ডাক্তার মেনে নিতেন যে এর চাইতে জেলে থাকাই তার জন্য ভালো ছিল। কারন সেখানে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামীকেও নিয়মিত খাবার প্রদান করা হয়। কিছু কিছু হাসপাতালের পরিচালক হাসপাতালের করিডোরে পড়ে থাকা যুদ্ধাহত সৈনিকদের রক্তাক্ত বুকে পা দিয়ে আঘাত করতেন। ব্লিডা এলাকার আলজেরিয়রা এমন বেশ কজন পরিচালকেকে চিনতেন।

৮. দখলদারদের হাসপাতাল কেন্দ্রগুলোর প্রতি আলজেরিয়দের মনোভাব বদলের বিষয়টি একইভাবে নজর দেয়া দরকার। মাকুইস অঞ্চলে বেশ কিছু ওষুধ পাওয়া যেত না এবং কিছু কিছু জটিল অপারেশন করাও সম্ভব হত না। এই ওষুধের প্রয়োজনে বা সার্জারি করানোর দরকার হলে ডাক্তার রোগীকে ফরাসিদের পরিচালিত হাসপাতালে বদলি করতেন। বিপ্লবের আগে যে দ্বিধা ও অস্বীকৃতি ছিল তা আর তখন চোখে পড়ত না। লোকজন মাকুইসবাসী ডাক্তারের নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করত। ১৯৫৬-৫৭ সালের দিকে এই মনোভাবের পরিবর্তন বিশেষভাবে লক্ষণীয় ছিল। ঐ সময়ে আমার নিজের বেশ কয়েকটি হাসপাতাল পরিদর্শনের সুযোগ হয়েছিল। এই অবস্থা দেখে ইউরোপীয় ডাক্তাররা পর্যন্ত আমার কাছে বিস্ময় প্রকাশ করেন। তাদের বরাতে আমি জানতে পারি, যুদ্ধের পরে মুসলমানদের হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়ার হার বেড়েছে। তখন প্রতি পাঁচজন মুসলমানের একজন হাসপাতালে এসে চিকিৎসা নিত। আগের বছরগুলোর তুলনায় এটা অনেক বেশি। অবশ্য এটাও বলতে হয় যে এর পিছনে মাকুইস-এর হাসপাতাল প্রসাশনের কৌশলগত স্বার্থও ছিল। তারা চাইত ফরাসিরা যেন সাধারণ নাগরিকদের খাতির করে চলে এবং অপসারণ অযোগ্য সৈনিকদের জন্য পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহ রাখে।

৯. মুসলিম সূফিসাধকদের ম্যারাব্যুট বলা হত। তাদের চর্চিত চিকিৎসা পদ্ধতিকে ম্যারাব্যুটিজম বলা হত- ইংরেজি অনুবাদক।

জ্বিন (বহুবচনে জ্বিনুন) হচ্ছে এক ধরনের আত্মা । তারা ঘর-বড়ি বা শস্যক্ষেত্র সব জায়গাতেই বিচরণ করতে পারে। জন্ম, মৃত্যু, বিয়ে, মুসলমানি ও অসুস্থতার মত দুনিয়াবি জীবনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলির উপর তাদের ভূমিকা রয়েছে বলে সাধারণভাবে বিশ্বাস করা হত। অসুস্থতার সময়ও মনে করা হত খারাপ জ্বিনের প্রভাবেই এই স্বাস্থ্যহানি হয়েছে – ইংরেজি অনুবাদক।

‘বাংলাদেশের পাঠকদের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু পাঠকরা অনেক বেশি মৌলবাদী’

পশ্চিম বাংলার সাহিত্যিকদের প্রধান বাজার বাংলাদেশ। সেই দিক থেকে বাংলাদেশের বাজার রক্ষার খাতিরে বাংলাদেশের তোষামোদ করা তাদের জন্য জরুরী। এটা কোন খারাপ অর্থে বলছি না, ভাল অর্থেই বলতে চাইছি। বাজার ব্যবস্থার চরিত্রের কারণেই তোষামোদি দরকার হয়ে পড়ে। বাজার ব্যবস্থার ‘অদৃশ্য হাত’ তার প্রণোদনা। বাংলাদেশের পাঠক বা বই ভোক্তাদের নিজের প্রতি আগ্রহী করে রাখার ওপর পশ্চিম বাংলার লেখকদের বইয়ের বেচাবিক্রি অনেকাংশেই নির্ভর করে। তোষামোদির দরকার সেই কারণেই। বাংলাদেশে পশ্চিম বাংলার লেখকদের গ্রহণযোগ্যতার সঙ্গে নিজের বইয়ের বাজার সুরক্ষার প্রশ্ন জড়িত। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়সহ অনেকেই বাংলাদেশের প্রতি সে কারণে অনেক সদয় মন্তব্য করেছেন। বাজার ব্যবস্থায় তোষামোদি জায়েজ, অন্যায় কিছু নয়। লেখকদেরকেও বাজার সম্প্রসারণ প্রতিনিধি হতে হয়। বাজারের এতোই মাহাত্ম।

গত ১৩ সেপ্টেম্বর কলকাতার রবীন্দ্র সদনের একটি অনুষ্ঠানে সমরেশ মজুমদার বলেছেন, ‘বাংলাদেশের পাঠকদের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু পাঠকরা অনেক বেশি মৌলবাদী’ (দেখুন বাংলাদেশ প্রতিদিন ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৫)। এটাও তোষামদি। তুলনা করে বলতে চাইছেন হিন্দু পাঠ্কদের চেয়ে বাংলাদেশের পাঠক ভাল। আর এটা তো জানা কথাই যে তাদের অধিকাংশই মুসলমান। তারা সমরেশ মজুমদারের বই যখন পড়েন তখন তিনি হিন্দু নাকি মুসলমান সেই বিচার করেন না। তিনি ভাল লিখলেন কিনা, বইটি উপভোগ্য কিনা বাংলাদেশের পাঠক সেইসব বিচারই করে। এটাই তো পাঠকের আদর্শ হওয়া উচিত। নাকি? কিন্তু পশ্চিম বাংলার হিন্দু পাঠকরা এটা করে না। তারা বই পড়তে গিয়ে আর পাঠক থাকে না। হিন্দু হয়ে যান। খুবই আফসোসের ব্যাপার।

সমরেশ মজুমদার কলকাতার পাঠকদের বাংলাদেশের পাঠকদের সঙ্গে তুলনা করতে গিয়ে ‘মৌলবাদী’ বলেছেন। (বলা বাহুল্য, তিনি ব্যাতিক্রমের কথা বলেন নি, তবে নিশ্চয়ই ব্যাতিক্রম আছে)। হিন্দু জাতের দিক থেকে যে বর্গেরই হোক যদি নিজের ইতিহাস, ঐতিহ্য বা সনাতন চিন্তার মৌল ভিত্তির দাঁড়াতে চেষ্টা করে তাতে তো দোষের বা নিন্দার কিছু নাই। সেটা সমস্যা তৈরি করে না, তা নয়। যদি তা মতের গোঁড়ামি হয়ে ওঠে তাহলে সেটাও মুশকিলের। সেটা ভিন্ন বিতর্ক। সমরেশ মজুমদার আসলে ‘মৌলবাদ’ বলতে সাম্প্রদায়িকতা বুঝিয়েছেন। বাংলাভাষী ভিন্ন সম্প্রদায়ের জীবনচর্চা থেকে উঠে আসা শব্দ, ধারণা, লেখালিখির প্রতি পশ্চিম বাংলার পাঠকদের অস্বস্তি, বিতৃষ্ণা বা বিদ্বেষ, ইত্যাদি। যারা অধিকাংশই হিন্দু। এটা ঠিক মৌলবাদ নয়, সাম্প্রদায়িকতা। ধর্ম, আচার বা সংস্কৃতির দিক থেকে বাংলাভাষী ভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের ভাষার প্রতি অস্বস্তি। তাদের দৈনন্দিন ব্যবহারের শব্দগুলো পাঠ করলে ‘অদ্ভূত প্রতিক্রিয়া’ ঘটা।

সমরেশ মজুমদার বলছেন, “আমাদের বই যখন বাংলাদেশের পাঠকরা হাতে পান, তখন তারা বিচার করেন না- এটা কোন ধর্মের লেখক। তারা বিচার করেন এটা পাঠযোগ্য কিনা, কাহিনী তার ভালো লাগছে কি না, কিংবা পড়তে তার আরাম লাগছে কি না। কিন্তু বাংলাদেশের লেখকদের বই আমাদের পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু পাঠকরা আম্মা, ফুপা, নামাজ এইশব্দগুলো যখন দেখতে পায়- তখন তাদের মধ্যে একটা অদ্ভুত প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। এবং এই প্রতিক্রিয়ার কারণেই বাংলাদেশের অনেক লেখকের বই এখানকার পাঠকদের কাছে পৌঁছে না। আমি পরিষ্কার করে বলছি, বাংলাদেশের পাঠকদের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু পাঠকরা অনেক বেশি মৌলবাদী। এই ২০১৫ সালে দাঁড়িয়ে যদি বলতে হয় তবে বলব, আমরা অনেক বেশি মৌলবাদী, আমাদের পাঠকরা অনেক বেশি মৌলবাদী। আমাদের পাঠকরা গ্রহণ করতে পারছেন না...পশ্চিমবঙ্গের যারা মুসলমান লেখক ছিলেন, যেমন মুস্তাফা আলী সিরাজ সাহেব ছাড়া এখানকার পাঠকরা কয়জনকে গ্রহণ করতে পেরেছেন। হ্যাঁ যাদের গ্রহণ করতে পেরেছেন তাদের লেখায় ওই সব মুসলিম শব্দগুলো নেই। ফলে ওদের বই এখানে (পশ্চিমবঙ্গ) এসে পাইরেসি হবে এই সম্ভাবনা খুবই কম”।

তাঁর কথাগুলো গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে। তাই পত্রিকায় যেভাবে এসেছে সেভাবেই টুকে দিলাম। হয়তো আরও কথা বলেছেন। ‘মুস্তাফা আলী সিরাজ’ নামটা তিনি উচ্চারণ করেছেন নাকি পত্রিকার রিপোর্টিং-এর গোলমাল জানি না। তবে নামটা নিশ্চয়ই সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ (১৯৩০-২০১২) হবে। পশ্চিম বাংলা ইসলামী নাম উচ্চারণ ও বর্ণীকরণের ক্ষেত্রে যে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য প্রদর্শন করে এটা তারই আরেক নজির কিনা জানিনা। আশা করি এতো বড় ভুল নিজ দেশের একজন প্রথিতযশা সাহিত্যিক সম্পর্কে সমরেশ মজুমদার করবেন না।

কলকাতার হিন্দু পাঠকদের সাপ্রদায়িকতা বিষয়ে শুধু সমরেশ মজুমদারের কাছে নয়, পশ্চিম বাংলার অন্যান্য লেখকদের কাছ থেকেও জানার আরও আগ্রহ রইল। তিনি বইয়ের পাইরেসি নিয়ে কথা বলছিলেন। তিনি চান পশ্চিম বাঙলার বই বাংলাদেশে বে-আইনী মুদ্রণ বন্ধ হোক। পাইরেসি বা বে-আইনী ছাপা হলে তাঁরা তাঁদের বইয়ের রয়ালটি পান না। সত্যি কথা। স্রেফ ব্যাক্তিস্বার্থেই তিনি কথাগুলো বলেছেন। অন্যদিকে বাংলাদেশের মানুষ পশ্চিম বাংলার লেখক হিন্দু কিনা সেটা বিচার করে বই পড়েন না, এটা ব্যবসায়িক দিক থেকে তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে। নিজের স্বার্থের জায়গা থেকেই কথাগুলো বলা। বাংলাদেশীদের তোষামুদির কারন লেখক হিসাবে তাঁর ব্যাক্তি স্বার্থ। টাকাপয়সা পাওয়ার আকুওতি ও না পাবার বেদনা। আমরা তা বুঝি। ফলে তোষামুদিতে আমাদের আপত্তি করার কারন নাই।

দুই

কিন্তু এর সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক দিক আছে। তার প্রভাব ও পরিণতি সুদূরপ্রসারী। এর সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও দিল্লীর আধিপত্য থেকে সীমান্তের দুই পাশের বাংলাভাষী শুধু নয়, সারা দুনিয়ার বাংলাভাষীদের মুক্ত করার প্রশ্ন জড়িত। হিন্দু বাঙালির প্রকট সাম্প্রদায়িকতা বাংলাদেশীদের খুবই পরিচিত। এখানে নতুন কিছু নাই। বাঙালি মুসলমান ধর্মে মুসলমান বটে, ধর্ম প্রাণও হতে পারে, নিজেকে সে ধর্ম নিরপেক্ষ বা বাঙালি বলে গলা ফাটিয়ে দাবিও করে না। কিন্তু বাংলা সাহিত্য পড়তে গিয়ে হিন্দুর বই পড়ব না, এই কাজটা সে করে না। তার মধ্যে সাম্প্রদায়িকতা নাই, তা নয়। কিন্তু তার ক্ষেত্র অন্যত্র ও প্রকাশ ভিন্ন। কিন্তু হিন্দু লেখক যখন তার নিজ সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি, ধর্মাচরণ, আচার ঐতিহ্যের বর্ণনা করেন তখন তা পড়তে অস্বস্তি বোধ করে না। এটা তো ভাল, যে পাঠক হিসাবে সে বাঙালির আরেকটি জগত সম্পর্কে জানতে পারছে। কিন্তু বাঙালি হিন্দু পাঠক নিজেকে বাঙালি বলে হয়তো গলা ফাটিয়ে ধর্ম নিরপেক্ষ প্রমাণ করছে নিরন্তর, কিন্তু যখন লেখায় ‘আম্মা, ফুপা, নামাজ এই শব্দগুলো যখন দেখতে পায় - তখন তাদের মধ্যে একটা অদ্ভুত প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়’। পশ্চিম বাঙলার এই হিন্দু মনকে বাংলাদেশের মানুষকে আরও সতর্কতার সঙ্গে ও গভীর ভাবে বোঝা উচিত। ধর্ম ও আচারের পার্থক্য থাকার পরেও ‘বাঙালি’ নামে যে রাজনৈতিক জনগোষ্ঠি বাংলাদেশের মানুষ গড়ে তুলতে চায় সেখানে হিন্দু অন্তর্ভুক্ত। ধর্ম বিশ্বাসের দিক থেকে আলাদা হতে পারে, কিন্তু বাঙালি হিসাবে তাকে সে বাঙালি সমাজের বাইরের বলে গণ্য করে না। সেটা বাংলা সাহিত্য পড়তে গিয়ে সে হিন্দুর ধর্ম, আচার, সংস্কৃতির সরব উপস্থিতিওকে স্বাভাবিক বলেই মনে করে। কোন অস্বস্তি বোধ করে না। কিন্তু পশ্চিম বাঙলার হিন্দু সম্পর্কে একথা বলা কঠিন। সমাজ বা রাজনৈতিক জনগোষ্ঠি দূরের কথা – সাহিত্যের মতো উদার ক্ষেত্রেও এই হিন্দু শক্ত দেয়াল তুলে রেখেছে। আশ্চর্য!

সাম্প্রদায়িকতার এই ধরনের মোকাবিলা তুলনামূলক ভাবে কঠিন এ কারণে যে এই সাম্প্রদায়িকতা বাইরে দিকে বাঙালিত্ব এবং ধর্ম নিরপেক্ষতার আলখাল্লা দিয়ে ঢেকে রাখা হয়। অতএব প্রতিটি বাংলাভাষীকেই তার বিরুদ্ধে লড়াই দরকার। সমরেশ মজুমদারের কথা থেকেই পরিষ্কার কলকাতার বাংলা সাহিত্যের পাঠকদের সাম্প্রদায়িকতা কিভাবে তাদের সাহিত্য পাঠের ক্ষেত্রে অন্তরায় হয়ে রয়েছে। এটা শুধু সাহিত্যে সীমাবদ্ধ তাতো নয়। তার সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনোইতিক প্রকাশ আছে। কিন্তু তারপরও অভিনন্দন জানাই যে এদিকে আস্তে আস্তে নজর পড়ছে। এই উপলব্ধিগুলো কলকাতার জনপ্রিয় সাহিত্যিকদের মধ্যে গড়ে উঠেছে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বাংলাদেশ প্রীতি আমরা জানি। কিন্তু এ বিষয়ে তাঁর কোন পর্যবেক্ষণ ছিল কিনা জানি না। আমার চোখে পড়ে নি। আমি এই পর্যবেক্ষণ ও উপলব্ধিকে হালকা ব্যাপার বলে মনে করি না। বাংলাদেশের প্রতি পশ্চিম বাংলার গায়ক-কবি কবির সুমনের শুভেচ্ছাও অনেক বড় ব্যাপার। এ ব্যাপারে তাঁর পর্যবেক্ষণ ও বক্তব্য আমি দেখেছি। এদের আমরা জানি, সমরেশ মজুমদার সম্ভবত নতুন যোগ হলেন।

রাজনৈতিক দিক থেকে পশ্চিম বাংলার বাঙালী আর বাংলাদেশের বাঙালী এক নয়। উনিশশ পাঁচ সালে কার্জনের বাঙলা ভাগ থেকে সেই পার্থক্যের সূচনা। সাতচল্লিশের দাঙ্গা ও দুই দেশে দুই পৃথক রাজনৈতিক জনগোষ্ঠির আবির্ভাব সেই বিভক্তিকে দৃশ্যমান করে তুলেছিল। এরপর এলো একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ দিল্লীর জন্য রাজনৈতিক সংকট ঘনীভূত করবার সম্ভাবনা তৈরি করেছিল। ‘বাঙালি’ নামক রাজনৈতিক বর্গটি সীমান্তের দুই পাশেই সমান জনপ্রিয় হয়ে ওঠা ছিল তার কারণ। সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় পশ্চিম বাংলায় রাজনৈতিক আত্মপরিচয়ে রূপান্তরিত হতে পারে এই সম্ভাবনা দিল্লীর জন্য বিপজ্জনক মনে হয়েছিল। যদি বাংলাদেশের বাঙালি আর পশ্চিম বাংলার বাঙালি নিজেদের একই ভাষা ও সংস্কৃতির উত্তরাধিকারী মনে করে, ধর্ম তাদের তখন আর আলাদা রাখতে পারে না –দিল্লীর এই উৎকন্ঠা অযৌক্তিক ছিল না। সেই অবস্থায় ধর্ম জাতীয়তার নির্ধারকও থাকতে পারে না। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ যা চোখের সামনেই প্রমাণ করছিল। একাত্তরে সীমানের ওপাশেও সেই সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল। বাংলাদেশের বাঙালিরা এই ক্ষেত্রে নিজেদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত স্বাধীনতা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে প্রমাণ করে দিয়েছে। বাংলাদেশের মুসলমানদের প্রমাণ করতে হয়েছে ইসলাম তাদের ধর্ম বটে কিন্তু তারা বাংলাভাষী ও বাঙালী।

কিন্তু পশ্চিম বাঙলার হিন্দুর কাছে তার ধর্ম পরিচয় বড় নাকি ভাষা ও সাংস্কৃতিক পরিচয় বড় তুলনায় সেটা আজ অবধি প্রশ্নবোধক হয়েই রইল। কেন সেটা বুঝতে হলে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে পশ্চিম বাংলার হিন্দু কিভাবে একান্তই হিন্দুর সাহিত্য হিসাবে আগলে রাখে সেটা আমাদের বোঝা দরকার। সেখানে মুসলমানদের আম্মা, ফুপা, খালা ইত্যাদির প্রবেশাধিকার নাই। এর সঙ্গে যুক্ত বাংলা ভাষা থেকে আরবি ফারসি শব্দ তাড়িয়ে দেওয়া। বাংলাভাষা থেকে আরবি, ফারসি শব্দ বিতাড়ন বাংলা সাহিত্যের জমি হিন্দুর অধীনস্থ রাখবার প্রাণান্তকর চেষ্টায় পর্যবসিত। একাত্তরের পর সেই চেষ্টা অব্যাহত রাখা স্রেফ হীনমন্যতা। পশ্চিম বাংলার খুবই করুণ অবস্থা। বলা বাহুল্য স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে কি থাকবে আর থাকবে না সেটা সাহিত্যের প্রসাদ্গুণ দিয়েই নির্ধারত হবে। হচ্ছেও তাই। সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে সেই ক্ষেত্র করে তুলতেই হবে যেখানে সকলে একসঙ্গে বসবাস বসবাস শিক্ষা করে ও বসবাস করে। কো দেয়াল তোলে না। এই রাজনৈতিক সংকল্প থেকেই ভাষা ব্যবহার করতে গিয়ে হিন্দুয়ানি শব্দ বলে কোন শব্দ বাদ দেওয়ার কথা আমরা ভাবি না। যারা করে তাদের নিন্দা করি। তবে পশ্চিম বাংলার সাম্প্রদায়িক হিন্দুত্বপনা আমাদের সাহিত্যিকদের মধ্যেও আছে – যারা আরব ও ফারসি শব্দের প্রতি বিরাগ ও বিদ্বেষ পোষণ করেন। তাদের অবশ্য আমরা চিনি। সব সমাজের এই রকম বিরক্তিকর উপাদান থাকে।

তবে একাত্তরে পশ্চিম বাংলার মানুষের ভালবাসা ও আন্তরিকতা ছাপিয়ে বাংলাদেশীদের এই উপলব্ধি ঘটেছিল যে কলকাতার ধর্ম নিরপেক্ষ বাঙালিত্ব বা বাঙালিপনা মূলত হিন্দু জাতীয়তাবাদের বঙ্গীয় সংস্করণের অধিক কিছু হয়ে ওঠে নি। পশ্চিম বাংলা দিল্লীর পরাধীন। সেই পরাধীনতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নিজের রাজনৈতিক স্বাতন্ত্র্য দাবি করুক, এটা বাংলাদেশ প্রত্যাশা করে না। কারন ইতিহাস ও বাস্তবতা অনেক জটিল বিষয়। আমরা কুতর্ক করতেই পারি যে ভাষা ও সংস্কৃতি যদি জাতিবোধের ভিত্তি হয় তাহলে ‘বাঙালি’ সীমানের দুই পাশে বিভক্ত হয়ে থাকবে কেন? তাদের তো একই রাজনৈতিক জনগোষ্ঠির অন্তর্ভূক্ত হওয়াই সমীচিন। কিন্তু এই তর্ক আমাদের কোথাও নেবে না। পশ্চিম বাংলার মন ও মনন বোঝাটাই বরং বাংলাদেশের জনগণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, যাতে পার্থক্য চিহ্নিত করবার সঙ্গে মৈত্রীর জায়গা গুলোও আমরা শনাক্ত করতে পারি। সমরেশ মজুমদারের স্তরের একজন লেখক যখন পার্থক্যের কথাটি তোলেন তখন বাংলাদেশের পক্ষে ভাবতে সুবিধা হয়।

ইতিহাসে নজর দিলে দেখি একাত্তরে দিল্লীর ভয় কেটে যেতে অসুবিধা হয় নি। পশ্চিম বাংলার বাঙালির কাছে হিন্দু ভারতই আদর্শ এটা বুঝতে দিল্লীর দেরি হয় নি। পশ্চিম বাংলার মনে ও মননে নিজেদের রাজনৈতিক স্বাতন্ত্রের ভিত্তি ভাষা কিম্বা সংস্কৃতিতে নয়। তার ভিত্তি ধর্মে। ধর্মীয় জাতীয়তায় – হিন্দু জাতীয়তাবাদে। বং ভঙ্গে তার উনেষ ঘটেছিল, সাতচল্লিশে সেটা স্পষ্ট রূপ নিল। তারপর বাঙলাদেশের বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের তোড়ে সেটা একদমই অস্পষ্ট ও অপরিচ্ছন্ন হয়ে গিয়েছিল। বেশ তো সময় পার হোল। এখন বাংলাদেশের মানুষের কাছে এই দিকগুলো স্পষ্ট এবং যারপরনাই খোলাসা । সমরেশ মজুমদারকে অভিনন্দন তার মন্তব্য এই দিকটা বুঝতে আমাদের খুব সহায়ক হবে।

বাংলাদেশে এটা আমরা বুঝি যে একাত্তর যদি তথাকথিত ‘দ্বিজাতিতত্ত্ব’ নামক জাতীবাদী ধারণার ইন্তেকালের বছর হয়ে থাকে তাহলে তা একই সঙ্গে অখণ্ড ভারততত্ত্বের মহাপ্রয়ানের বছরও বটে। উপমহাদেশে বাঙালি যদি আলাদা জনগোষ্ঠি হিসাবে একটি রাষ্ট্র কায়েম করতে পারে তাহলে মণিপুরী, অহমিয়া, নাগা, কাশ্মিরী, পশ্চিম বাংলা, কামতাপুরিসহ প্রতিটি জাতিগোষ্ঠিরই আলাদা রাষ্ট্র কায়েম করবার দাবি ন্যায্য। স্বাধীন সার্ভভৌম বাংলাদেশ দিল্লীর জন্য এই বিপদ তৈরি করেছে। শুধু নিরাপত্তার দিক থেকে বিচার করলে আমরা বুঝব দিল্লীর পক্ষে বাংলাদেশ একটি রাষ্ট্র হিসাবে টিকে থাকাটাই বিপজ্জনক। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অন্তর্ঘাতি তৎপরতা দিল্লী চালিয়ে যাবে, যাবেই। তাকে বাংলাদেশে ইসলামি সন্ত্রাস আবিষ্কার করতেই হবে। কিম্বা প্রমাণ করতে হবে বাংলাদেশ ভারতের তথাকথিত ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’দের অভয়ারণ্য। দিল্লিকে বাংলাদেশের গণমাধ্যমে বিনিয়োগ করতেই হবে। কারণ ভারতকে অখণ্ড রাখবার জন্যই এই নিরাপত্তা নিশ্চিত করবার বিনিয়োগ। সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ অখণ্ড ভারতের জন্য সবসময়ই মারাত্মক হুমকি হয়ে বিরাজ করবে। বাংলাদেশের জনগণ এই ব্যাপারগুলো এখ জানে এবং বোঝে। ভাষা এবং সংস্কৃতির সঙ্গে রাজনীতির গভীর ও গহিন সম্পর্কগুলো এখন আর অতোটা অস্পষ্ট নাই।


বাংলাদেশ দেখেছে অখণ্ড ভারতের ভিত্তি হিসাবে ধীরে ধীরে হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদ ভারতের রাজনীতিতে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। ভারতকে অখণ্ড রাখতে হলে এটাই তো হবার কথা। পশ্চিম বাংলায় আমরা তা এখনও প্রকট দেখছি না। কিন্তু যদি ভাষা, সংস্কৃতি ও ধর্ম নিরপেক্ষতার নামে পশ্চিম বাঙলায় হিন্দুত্ববাদেরই চর্চা হয় তাহলে পশ্চিম বাংলা সাম্প্রদায়িক হিন্দুত্ববাদের দিকেই ঝুঁকবে সেই ভয় বাংলাদেশের রয়েছে। ভারতের প্রগতিশীলরা যখন ধর্ম নিরপেক্ষতার কথা বলে তখন তারা একে সংকীর্ণ রাজনৈতিক বা রাষ্ট্রনৈতিক অর্থেই ব্যবহার করেন। বহু ধর্ম, বহু জাতি, বহু বর্ণ, বহু ভাষা বহু সংস্কৃতির দেশ হিসাবে ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র ছাড়া ভারতের অখণ্ডতা টিকিয়ে রাখা কঠিন। কিন্তু সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় বা ভাষার সঙ্গে সম্পর্কের বিচার করলে ভারতীয় ধর্ম নিরপেক্ষতা হিন্দুত্ববাদের নামান্তর ছাড়া কিছু নয়। সাংস্কৃতিক দিক থেকে তার পক্ষে অন্য কোন ধর্ম গোষ্ঠির জীবনচর্চা, ভাষা বা সংস্কৃতিকে ভারতের জাতীয় সংস্কৃতির মূল ধারা ও গাঠনিক উপাদানে অন্তর্ভুক্ত গণ্য করা হিন্দু জাতীয়তাবাদের পক্ষে অসম্ভবই বটে। ভারতীয় জাতীয়তাদের এই হিন্দুত্ববাদী পরিগঠন এই অঞ্চলের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। স্বাধীনচেতা অন্যান্য জনগোষ্ঠির জন্য বিপদের কারন হয়ে দাঁড়িয়েছে। নরেন্দ্র মোদীর প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হবার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ এখন বুঝেছে যে ভারতে সাম্প্রদায়িক হিন্দু জাতীয়তাবাদ একটি শক্তিশালী ধারা এবং ভারতীয় বাংলাভাষীরা বাহ্যিক ভাবে ধর্ম নিরপেক্ষতার আদর্শ ধরে রাখতে গিয়ে এর বিরোধিতা করলেও মনে ও মননে হিন্দুত্ববাদ থেকে আলাদা কিছু নয়। হিন্দুত্ববাদী ধারার মধ্যেই তাদের বিলীন হবার সম্ভাবনা। পচিম বাংলাকে অবশ্যই সাহিত্য পাঠের এই সাম্প্রদায়িক অভ্যাস পরিহার ও পরিত্যাগ করতে হবে। এর কোন বিকল্প নাই। বাংলাদেশকে তোষামুদির দরকার নাই। পশ্চিম বাংলা বদলাক। পশ্চিম বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে পারবে কিনা, নাকি আরও ‘হিন্দুভূত’ ও ‘হিন্দিভূত’ হবে কিনা সেটাই প্রবল আশংকার বিষয় হয়ে উঠেছে।

এর পাশাপাশি বাংলাদেশের বিকাশ কোন পথ ধরে এগুবে আমরা এখনও স্পষ্ট নই। বাংলাদেশের বাঙালি জাতীয়তাবাদ নিজের মধ্যে এই দেশের জনগোষ্ঠির ধর্মভাব, জীবনযাপনচর্চা ও সংস্কৃতিকে আত্মস্থ না করে যেভাবে নিজেকে ইসলামের বিপরীতে দাঁড় করিয়েছে তাতে দিল্লীর আধিপত্য বিস্তারের হাতিয়ার হয়ে ওঠা ছাড়া আর কোন ভুমিকা পালন করতে পারে নি। এই মূর্খ বাঙালিপনার কোন ভবিষ্যত আছে কিনা সন্দেহ। অন্যদিকে প্রতিক্রিয়ায় অতিমাত্রায় ইসলামপন্থি হতে গিয়ে বাংলাদেশিদের মধ্যে ‘আরব’ বা মধ্যপ্রাচ্যের সংস্কৃতি রপ্ত করবার আগ্রহ বেড়েছে। সেটা বাড়ছে মধ্য প্রাচ্যে শ্রমিক সরবরাহ বা সম্পর্কের কারণে তা আরও সবল হয়েছে। এই পরিপ্রেক্ষতে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির ভবিষ্যৎ বাংলাদেশকে কোথায় কোন দিকে নিয়ে যাবে আমরা হলফ করে তা বলতে পারি না। বাংলাদেশ বিচ্ছিন দ্বীপ নয়। তবে পশ্চিম বাংলাকে বুঝতে হবে, তাদের নিজেদের অভিমুখ নির্ধারণ ও নিজেদের পরিবর্তনের সঙ্গে বাংলাদেশের রূপান্তরও নির্ভর করে। দিল্লীর দিকে তাকিয়ে থাকবার কিম্বা হিন্দী বলয়ের বেদিতে বাংলাভাষা ও সংস্কৃতিকে বলি দেবার কোন যুক্তি পশ্চিম বাংলার নাই। এটা চর্চার মধ্য দিয়েই মীমাংসা করতে হবে। সেই পথ হচ্ছে বাংলাভাষীদের মধ্যে সম্পর্ক বৃদ্ধি জোরদার করা। করতেই হবে। কারণ বাংলাভাষি হিসাবে আমাদের কিছু সাধারণ স্বার্থ আছে তা বাদ দিলে পশ্চিম বাংলা খোলস হয়ে যাব। তাই কলকাতার লেখকদের তোষামুদি বাংলাদেশ সহ্য করে। এটা বুঝতে হবে।

শুরুতে বলেছি পশ্চিম বাংলার বাংলাদেশ তোষামোদির পেছনে বাজার ব্যবস্থার ‘অদৃশ্য হাত’ থাকতে পারে। একটু ব্যাখ্যা করি। ‘অদৃশ্য হাত’ কথাটা আমার আবিষ্কার নয়। আধুনিক অর্থশাস্ত্রের দেবতা খোদ আদম স্মিথ মহাশয়ের। আমরা সমাজে যদি কোন কাজ সরাসরি সমাজের ভাল করার বিবেচনা থেকে করি তার চেয়ে বরং স্রেফ নিজেদের স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা ইতিবাচক ফল দেয়। অর্থাৎ ব্যাক্তি স্বার্থ রক্ষার পরিণতি সমাজের জন্য ‘ভাল’ হয়। ‘ভাল’ কথাটা কিভাবে বুঝব সেটা পুঁজিতন্ত্রের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গীর ব্যাপার। আদম স্মিথের এই অনুমান থেকে স্বার্থবাদী সমাজের ধারণা দানা বাঁধে, যাকে অনেকসময় ‘বুর্জোয়া’ বা ব্যাক্তিতান্ত্রিক সমাজও বলা হয়। স্বার্থপরতা সম্পর্কে এই গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক বিবেচনা খুব কমই আজকাল আলোচিত হয়। বাংলাদেশ ও পশ্চিম বাংলায় তো একদমই না। বাঙালি বড়ই নৈতিক!!! এই অঞ্চলের ধর্মচর্চার ইতিহাসে অতি দীর্ঘকাল ব্যাক্তি পর্যায়ে কৃচ্ছসাধনা, ত্যাগ, তিতীক্ষা, গুরুবাদ, সন্যাসতন্ত্র ইত্যাদির প্রকট প্রভাবের ফলে মোটা ময়লা তলানির আস্তর হিসাবে আমাদের মনে ও মননে নিজের স্বার্থের কথা প্রকাশ্যে বলার ক্ষেত্রে দ্বিধা রয়ে গেছে। আমরা মনেপ্রাণে স্বার্থপর অথচ প্রকাশ্যে সকলেই পরোপকারী হতে চাই। সমরেশ মজুমদার নিজের স্বার্থের কথা প্রকাশ্যে বলছেন । সেটা মন্দ না।

পশ্চিম বাংলার সাহিত্যিক বাংলাদেশের বইয়ের বাজারটা চান, কিন্তু তাদের পাঠকদের কাছে বাংলাদেশের পাঠকদের পৌঁছাবার ক্ষেত্রে অন্তরায় হিসাবে তাঁদের পাঠকদের দোষারোপ করেন। এটা কতোটা মানি সেটাই ঊপরে ব্যাখ্যা করলাম। কিন্তু এর বেশী মানি না। কলকাতার লেখকরাও বাধা তৈরি করে রেখেছেন। তাঁরা বাজার চান, কিন্তু দুই দেশের মধ্যে সাহিত্যের আদান প্রদান চান না। এটা গ্রহণযোগ্য নয়। বাংলাদেশের লেখক ও লেখালিখিকে পরিচিত করে দেওয়া এবং তাদের জন্য পাঠক তৈরি তাদের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। পশ্চিম বাংলায় বাংলাদেশের লেখকদের বাজার বৃদ্ধি করার ক্ষেত্রে সম্রেশ মজুমদারদের সহায়ক ভূমিকা পালন করা উচিত। এটা তাঁদের কর্তব্য। শুধু পাঠকদের দায়ী করবেন, সেটা ঠিক না।

এক হাতে তালি বাজানো যায় না। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের যদি বিকাশ আমরা চাই তাহলে দুইহাতে তালি বাজাতে হবে। সমরেশ মজুমদারসহ পশ্চিম বাঙলার লেখকরা সেটাই করবেন, এই আশা করি