Tuesday, September 15, 2015

যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলা ও বিপন্ন মানুষ

সবখানে এখন চলছে যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলা। ব্যক্তি পর্যায়ে আছে অন্তর্যুদ্ধ। যুদ্ধ চলছে পরিবারের সদস্যদের মাঝে- কে কাকে ঠকাবে। যুদ্ধ আছে সামাজিক ও জাতীয় পর্যায়ে- ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে, গোষ্ঠীতে গোষ্ঠীতে, এ-দলে ও-দলে। যুদ্ধ আছে দেশের বিরুদ্ধে দেশের। যুদ্ধ আছে বিশ্ব মোড়লদের মাঝে। সবখানে চলা এই যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলা মানবতাকে করে তুলেছে বিপন্ন। এ যুদ্ধ চলছে ঘরে-বাইরে। বাবা ছেলেকে, ছেলে বাবাকে, স্ত্রী স্বামীকে, স্বামী স্ত্রীকে, সমাজের নানা ক্ষেত্রে একজন আরেকজনকে খুন করছি, গুম করছি, অত্যাচার-নির্যাতন করছি, দমন-পীড়ন করছি। একদল আরেক দলকে, এক পরিবার আরেক পরিবারকে, এক সম্প্রদায় আরেক সম্প্রদায়কে, এক জাতি আরেক জাতিকে নিশ্চিহ্ন করার খেলায় মেতেছি সবাই। এ সবই যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলা। সবাই বলছি এ যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলা থামাতে হবে। কিন্তু বাস্তবে তা থামছে না। এ খেলা যেন থামার নয়। ফলে মানুষে মানুষে বাড়ছে বৈষম্য, বাড়ছে মানুষের দুর্ভোগ। আর মানুষই হয়ে উঠেছে মানুষের যাবতীয় দুর্ভোগের কারণ। যে দুর্ভোগ মানবজাতির মোকাবেলা করার কথা ছিল না, তাও মোকাবেলা করতে হচ্ছে। সার্বিকভাবে মানবজাতির চাহিদা মেটানোর মতো সম্পদ মানুষের কাছে পৌঁছতে পারছে না। কিংবা যে পরিমাণ সম্পদ সৃষ্টি হওয়ার কথা ছিল, সে পরিমাণ সম্পদ সৃষ্টি হচ্ছে না, বরং উল্টো চলছে সম্পদ বিনাশের মহোৎসব। এই যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলার কারণে আজ যত সব অনাসৃষ্টি। বিপন্ন মানবজাতি।

তাই আজ বিভিন্ন মহল থেকে দাবি উঠেছে- চাই নয়া অর্থনৈতিক ব্যবস্থাসহ সামগ্রিক বিশ্বব্যবস্থা। যেখানে মানুষে মানুষে থাকবে না কোনো দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাত, যুদ্ধবিগ্রহ। যে অর্থনৈতিক ও বিশ্বব্যবস্থা মানুষে মানুষে বৈষম্য কমাবে, মানুষের হাতে মানুষের নিপীড়নের অবসান ঘটাবে। জন্ম দেবে এক অনাবিল মানবিক বিশ্ব। তখন মানুষকে উদ্বাস্তু হয়ে দেশ ছাড়তে হবে না। শরণার্থী হয়ে হতে হবে না অমানবিক লাঞ্ছনা-বঞ্চনার শিকার। কাক্সিক্ষত সে বিশ্ব সৃষ্টির জন্য করণীয় নির্ধারণে নানা মহল থেকে নানা পরামর্শ উচ্চারিত হচ্ছে। কেউ বলছে, সুষ্ঠু সমাজ পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। প্রত্যেক মানুষের জন্য সুশিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। সমাজে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের পছন্দের সরকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে হানাহানি বন্ধ করে পারস্পরিক সহিষ্ণুতা কায়েম করতে হবে। জাতীয় স্বার্থকে সব কিছুর ঊর্ধ্বে স্থান দিনে হবে। জাতিতে জতিতে সৌহার্দ্যরে পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। দেশের ওপর দেশের কর্তৃত্বের অবসান ঘটাতে হবে। 

বলার অপেক্ষা রাখে না, এগুলো সবই ভালো পরামর্শ। আমাদের কাক্সিক্ষত মানবিক মর্যাদাসম্পন্ন নয়া বিশ্ব তৈরির জন্য এগুলো অপরিহার্য। এসব বিষয়ে বিস্তারিতে যাওয়ার অবকাশ না থাকায়, এ লেখায় একটি মাত্র গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর আলোকপাত সীমাবদ্ধ রাখব। আর সে বিষযটি হচ্ছে- সবার আগে অবসান ঘটাতে হবে ব্যক্তি পর্যায় থেকে শুরু করে সামাজিক, জাতীয় ও বৈশ্বিক পর্যায় পর্যন্ত বিদ্যমান যাবতীয় হানাহানি আর যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলা। একমাত্র এই যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলা বন্ধ হলে ওপরে পরামর্শিত যাবতীয় করণীয় যেমনি আপনা-আপনি সম্পন্ন হয়ে যাবে, তেমনি আমরা পেয়ে যাবো আমাদের কাক্সিক্ষত শান্তির বিশ্ব। 

একটি সাম্প্রতিক উদাহরণ দিই। আমাদের বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে একটি বড় মাপের অভিযোগ হচ্ছে, এ সরকার একটি অগ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে দেশটাকে একটি পুলিশি রাষ্ট্রে পরিণত করে সরকারবিরোধী দলগুলোর ওপর আমানবিক দমন-পীড়ন অব্যাহত রেখে দেশ চালাচ্ছে। সে লক্ষ্যেই সরকার দফায় দফায় হাজার পুলিশ নিয়োগ করছে। কিনছে পুলিশের জন্য নতুন নতুন মারণাস্ত্র। কোনো কোনো দেশ আবার বাংলাদেশ পুলিশের কাছে এ কারণ দেখিয়ে অস্ত্র ও গোলাবারুদ বিক্রি করতেও অনীহা প্রকাশ করেছে। এ খবরও প্রকাশিত হয়েছে গণমাধ্যমে। ইদানীং জনসমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিলের ওপর পুলিশি অ্যাকশনও নতুন মাত্রা পেয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, দেশে জনগণের পছন্দের সরকার প্রতিষ্ঠিত থাকলে এই অতিরিক্ত পুলিশ সদস্যও নিয়োগ দিতে হতো না, এদের জন্য অস্ত্র কেনায় বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করতে হতো না জাতিকে। এই অর্থ জনগণের ভাত-কাপড়সহ অন্যান্য কল্যাণমূলক কর্মসূচিতে খরচ করা যেত। সে দিকে না গিয়ে সরকার কার্যত পুলিশ বাহিনী দিয়ে দেশে এক ধরনের যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলায় মেতে রয়েছে। দেশের ভেতরে যে নানা রঙের সরকারি-বেসরকারি যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলা, তা আমাদের চোখের সামনেই ঘটছে। এ নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। জনগণ দেখছে, সরকার পুলিশ বাহিনীতে যে হারে লোক নিয়োগ বাড়িয়ে যাচ্ছে, তার চেয়ে শত গুণ বেশি তীব্রতা নিয়ে ভেঙে পড়ছে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। বাড়ছে মানুষের অশান্তি। কারণ সরকার বিরোধী দল দমনের নামে যা করছে, তাও এক ধরনের যুদ্ধ। এ যুদ্ধ নিজের বিরুদ্ধে নিজের। আর এই যুদ্ধের খরচ জোগাতে এখন সরকার একের পর এক করের বোঝা চাপাচ্ছে জনগণের ওপর। এমনকি শিক্ষা মৌল অধিকার হওয়া সত্ত্বেও সরকার এখন শিক্ষার্থীদের বেতনের ওপর ভ্যাটের বোঝা আরোপে মরিয়া। 

দেশের বাইরে তাকান। সবখানে শুধু যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলা। এই যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলায় আজ বিশ্বজুড়ে চলছে চরম এক অস্থিতিশীলতা। বিশ্বে এ সময়ে শরণার্থী সমস্যা নিয়ে আমরা গণমাধ্যমে যেসব অমানবিক ঘটনার খবর পাচ্ছি, তা এই যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলারই অপরিহার্য পরিণতি। আর এই পরিণতির জন্য যে বিশ্ব মোড়লেরাই দায়ী, তা বোঝার জন্য প্রয়োজন নেই কারো কোনো রথী-মহারথী হওয়ার, ধ্রুপদী পণ্ডিতজন হওয়ার। সাধারণ জ্ঞান-বুদ্ধিতেই তা ধরা পড়ে। কারণ, উইকিলিকসের জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ আমাদের চোখ খুলে দেয়ার মতো অনেক তথ্যই এর মধ্যে ফাঁস করে দিয়েছেন। সাম্প্রতিক একটি নতুন বই প্রকাশের সময় তার দেয়া তথ্যমতে, সিরিয়া প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি অপরিহার্যভাবে জর্জ বুশ সরকারের নীতিরই সম্প্রসারণ, যা প্রণীত হয়েছিল সিরিয়া বিপ্লব শুরু হওয়ার পাঁচ বছর আগে ২০০৬ সালে। এই নীতি ছিল সিরিয়া সরকারের উৎখাত। সে পরিকল্পনায় ছিল প্রপাগান্ডা আর সেক্টারিয়ানিজম প্রচার করে সরকারবিরোধী বিপ্লবে প্ররোচনা দেয়া। একই কাজটি যুক্তরাষ্ট্র করেছিল ইরাকেও। জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ ঠিকই বলেছেন, শুধু ইরাক আর সিরিয়ায় নয়, বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র এ ধরনের নানা যুদ্ধ খেলায় মেতে আছে। আর বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের অপছন্দের সরকারের পতন ঘটাতে যে অস্থিতিশীল ও যুদ্ধ পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়, এর শিকার হয়ে মারা যায় অসংখ্য নিরীহ মানুষ, অনেকে হয় বাস্তুচ্যুত। যে সাতটি দেশের সরকার উৎখাতের পরিকল্পনা করে বুশ সরকার, সিরিয়া তারই একটি। আর এ ধরনের কাজ সম্পন্ন করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র নামের আধুনিক বিশ্বমোড়ল বিশ্বে ১২০টি দেশে স্থাপন করেছে ১৪০০-এরও বেশি সামরিক ঘাঁটি। রাশিয়ার রয়েছে বিভিন্ন দেশে ১২টি সামরিক ঘাঁটি। চীনের নেই একটিও। যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের করের অর্থে চলে এসব মার্কিন সামরিক ঘাঁটি। অবশ্য বিশ্বব্যাপী নানা যুদ্ধ জিইয়ে রেখে অস্ত্র বিক্রি করে পাওয়া অর্থও এসব ঘাঁটির পেছনে খরচ হয়। মার্কিন জনগণের বিন্দুমাত্র লাভ তাতে নেই। যুক্তরাষ্ট্র এখন চাইছে সিরিয়া ও ক্রিমিয়া থেকে রুশ ঘাঁটিগুলো সরিয়ে দিতে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের ৫০ শতাংশ সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করত, এখন করে ৪০ শতাংশ। একইভাবে বিশ্বের সামরিক ব্যয়ের ৫০ শতাংশ করত যুক্তরাষ্ট্র। এখন তা নেমে এসেছে ৪০ শতাংশে। তবে মার্কিন গোয়েন্দা বিভাগের খরচ বিশ্বের গোয়েন্দা খাতের খরচের ৬০ শতাংশ। বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র এখন বিশ্বের প্রতিটি মানুষের ওপর গোয়েন্দা নজর জারি রাখে। 

যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান নীতি হচ্ছে- ‘আনকনভেনশনাল ওয়ারফেয়ার’ কাজে লাগানো। এর অর্থ কোনো দেশে যুক্তরাষ্ট্রের অপছন্দের সরকার উচ্ছেদে ‘সারোগেট ফোর্স’ তথা প্রতিভূ বাহিনী ব্যবহার করা। যুক্তরাষ্ট্র তার সব শাখা ও এজেন্সিকে এ কাজে লাগায়- সামরিক থেকে গোয়েন্দা, বাণিজ্যিক, আর্থিক শাখা পর্যন্ত এ কাজে লাগানো হয়। সেই সাথে ব্যবহার করা হয় আইএমএফ ও ইউএসএআইডির মতো এজেন্সিকে, লক্ষিত দেশের ওপর নানা শর্তারোপ করা হয় দেশটিকে কাবু করার জন্য।

এসবের কারণেই বিশ্বজুড়ে সব সময় কোথাও না কোথাও জারি থাকে কোনো না কোনো যুদ্ধ, কিংবা অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধ। আর এই যুদ্ধের খরচ কিংবা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ক্ষতিও তো আছে অপরিহার্যভাবে, যা বহন করে বিশ্বের কোনো না কোনো দেশের মানুষ। এই খরচ বা ক্ষতি এতই বিপুল যে, তা আন্দাজ-অনুমান করাও মুশকিল। বিশ্বব্যাপী যুদ্ধ-প্রতিষ্ঠানগুলো চলে জনগণের করের টাকায়। অথচ যুদ্ধ না থাকলে এই অর্থ খরচ করা যেত প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ ও জনকল্যাণমূলক কাজে। আজ আর স্নায়ুযুদ্ধ নেই। এরপরও একটি পরিসংখ্যান মতে, বিশ্বে বছরে ১.৭ ট্রিলিয়ন (১.৭ মিলিয়ন মিলিয়ন বা ১ লাখ ৭০ হাজার কোটি) ডলার খরচ হয় অস্ত্র কেনার পেছনে। আমরা যদি এই অর্থ অস্ত্র কেনার পেছনে ব্যয় না করে করতে পারতাম শিক্ষা, দুর্ভিক্ষপীড়িতদের ত্রাণকাজ, শরণার্থীদের ত্রাণকাজ, অবকাঠামো উন্নয়ন, জনস্বাস্থ্য ও এমনই সব নানা কাজে, তা হলে মানুষের কষ্ট কতই না লাঘব হতো। 

বিশ্বমোড়লেরা অনেকটা কাতুকুতু দিয়ে বিশ্বের এখানে-সেখানে গৃহযুদ্ধ বাধাচ্ছে, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে হানাহানি উসকে দিচ্ছে। দেশে দেশে যুদ্ধ লাগিয়ে দিচ্ছে। এ জন্য যুদ্ধের পেছনে মানুষকে খরচ করতে হচ্ছে কাঁড়ি কাঁড়ি অর্থ। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ম্যালেরিয়া উচ্ছেদ অভিযান পুরোদমে চালাতে পারছে না তহবিলের অভাবে। সামরিক স্থাপনাগুলোর এক দিনের খরচের অর্থও লাগে না এই ম্যালেরিয়া কর্মসূচি পরিচালনার জন্য। বিশ্বের পাঁচ দিনের অস্ত্র কেনার খরচের সমান বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০ বছরের গুটিবসন্ত উচ্ছেদ কর্মসূচির খরচ। বিশ্বে প্রতি এক লাখ মানুষের বিপরীতে রয়েছে ৫৫৬ জন সৈনিক। কিন্তু এই এক লাখ মানুষের জন্য ডাক্তার রয়েছে ৮৫ জন। প্রতিটি সৈনিকের জন্য বছরে গড়ে খরচ ২০ হাজার ডলার। অথচ বিশ্বের প্রতিটি স্কুলবয়সী শিশুর পেছনে আমরা খরচ করছি মাত্র ৩৮০ ডলার। বিশ্বে তিন সপ্তাহে যে সামরিক খরচ হয়, তা দিয়ে গোটা বিশ্বের মানুষের সারা বছরের খাবার পানি জোগান দেয়া যেত। আর এর ফলে গোটা মানবসমাজের রোগশোক অর্ধেক কমে যেত। সম্প্রতি এশিয়া ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন এলাকায় এক ধরনের যক্ষ্মা রোগ দেখা দিয়েছে, যা ওষুধ খেয়ে থামানো যায়। এই নতুন যক্ষ্মা ঠেকানোর জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দরকার ৫০ কোটি ডলার, যা বিশ্বের ১ ঘণ্টা ৬ মিনিটের অস্ত্র খাতের খরচের সমান। আজকের পৃথিবীতে বছরে দারিদ্র্যসংশ্লিষ্ট রোগ ও ক্ষুধায় মারা যায় এক কোটি শিশু। এ ছাড়া অসংখ্য শিশু হয় অপুষ্টি ও প্রতিরোধযোগ্য রোগের শিকার। অনেক শিশু বঞ্চিত হয় শিক্ষা নামের মৌলিক অধিকার থেকে। অনেক স্বল্পোন্নত দেশে নিরক্ষর মানুষ ৮০ শতাংশ। বিশ্বে এমন মানুষের সংখ্যা ৮০ কোটি। অথচ আমরা ১ মিনিটে অস্ত্রের পেছনে খরচ করছি ৬৫ লাখ ডলার। এটি সরল সত্য- সামরিক প্রতিষ্ঠানের পেছনে বিশ্বের মানুষ যা খরচ করছে তা যদি মানুষের কল্যাণে খরচ করা যেত, তবে মানবসমাজের যাবতীয় সমস্যা সমাধান হয়ে যেত। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, মানুষ আজ যে পরিমাণ অর্থ খরচ করছে উন্নয়ন খাতে, সে তুলনায় ২০ গুণ বেশি খরচ করছে যুদ্ধের পেছনে। 

যুদ্ধের ক্ষতি নানামুখী। বিংশ শতাব্দীর ও একুশ শতকের যুদ্ধের ফলে ক্রমবর্ধমান হারে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বেসামরিক লোকজন। বিশেষ করে শিশুরা। ছঁরহপু ডৎরমযঃ-এর পরিসংখ্যান মতে, প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে দুই কোটি ৬০ লাখ সৈনিক নিহত হয়। কিন্তু বেসামরিক লোক মারা যায় ছয় কোটি ৪০ লাখ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বে কমপক্ষে ১৫০টি সশস্ত্র সঙ্ঘাত ঘটে। এ সময়ে বিশ্বে ঘটে ১২টির মতো গৃহযুদ্ধ। ইন্দো-চীন যুদ্ধে বেসামরিক লোক মারা যাওয়ার হার ছিল ৮০ শতাংশ থেকে ৯০ শতাংশ। কোনো কোনো সূত্র মতে, লেবাননের গৃহযুদ্ধে বেসামরিক লোকক্ষয়ের হার ৯৭ শতাংশ। 

ইউনিসেফের দেয়া তথ্য মতে, সাম্প্রতিক যুদ্ধগুলোতে লোকক্ষয়ের ৯০ শতাংশই বেসামরিক লোক। আর এর ৫০ শতাংশই শিশু। এই সংস্থার অনুমিত হিসাব মতে, সাম্প্রতিক ভয়াবহ সশস্ত্র দ্বন্দ্বের ফলে বিশ্বের দুই কোটি শিশু বাস্তুহারা হয়েছে। এরা হয় ভিনদেশে শরণার্থী, না হয় নিজ দেশের ভিন্ন কোনো স্থানে চলে যেতে হয়েছে বাড়িঘর ছেড়ে। বিগত দশকে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে সশস্ত্র সংঘর্ষে ২০ লাখ শিশু নিহত, ৬০ লাখ মারাত্মক আহত বা চিরদিনের জন্য পঙ্গু হয়ে গেছে। আর এক কোটির মতো শিশু হয় এতিম হয়েছে, নয়তো পরিবার থেকে হয়েছে বিচ্ছিন্ন। ইউনিসেফ বলছে, বর্তমানে বিশ্বের ৩০টি যুদ্ধে তিন লাখ শিশুসৈনিক বাধ্য হয়ে যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে। অনেক শিশুকে জোর করে ধরে নিয়ে কিংবা অপহরণ করে নিয়ে শিশুসৈনিক বানানো হয়েছে এবং হচ্ছে। যুদ্ধের নানামাত্রিক বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় ও স্বজন হারিয়ে অনেক শিশু মারাত্মক মানসিক রোগে ভুগছে। দারিদ্র্য, ক্ষুধা ও অপুষ্টির শিকার হচ্ছে। লেখাপড়া থেকে হচ্ছে বঞ্চিত। 

বিংশ শতাব্দীতে যুদ্ধের সময়ে মারা গেছে সাড়ে ১৭ কোটি মানুষ। সেই সাথে যুদ্ধ মানবেতিহাসে জন্ম দিয়েছে অনেক পরিবেশিক ধ্বংসযজ্ঞ। যুদ্ধ শেষে শান্তিপূর্ণ সময়েও এই ধ্বংসযজ্ঞ জারি থাকে। আধুনিক এই সময়ের যুদ্ধে অভাবনীয় মাত্রায় পরিবেশ বিনষ্ট হয়। ফলে এর নাম দেয়া হয়েছে এনভায়রনমেন্টাল হলোকাস্ট। ভিয়েতনাম যুদ্ধে মার্কিন সেনারা কীটনাশক প্রয়োগ করে উত্তর ও পশ্চিম সায়গনের ৬২০ কোটি বড় গাছ মেরে ফেলে। এজেন্ট অরেঞ্জ নামের কীটনাশক ধ্বংস করে সেখানকার হাজার হাজার একর ফসলি জমি, যুদ্ধের পরও বহু বছর এগুলোতে ফসল ফলানো যায়নি। মানুষের ওপরও রয়েছে এসবের ভয়াবহ ক্ষতিকর প্রভাব। ১৯৯০ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধে ১৫০০ কোটি ব্যারেল তেল পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে, যা এক্সন ভেলডেজ ডিজেস্টারের তুলনায় ৬৫০ গুণ বেশি পরিবেশ দূষণ সৃষ্টি করে। উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় অসংখ্য ইউরেনিয়াম ডিপ্লিটেড গোলা ছোড়া হয়। এ গোলা থেকে বিস্ফোরিত ধুলা নাকে প্রবেশ করলে ক্যান্সারের সৃষ্টি হয়। যুদ্ধের পরিবেশগত বিপদের কথা লিখে শেষ করার নয়। 

মানবজাতির মাথার ওপর এখন ঝুলছে পারমাণবিক যুদ্ধের বিপর্যয়ের হুমকি। আজকের বিশ্বে রয়েছে ১৬ হাজার নিউক্লিয়ার ওয়ারহেড। শর্ট নোটিশে ঘটতে পারে এগুলোর বিস্ফোরণ। এসবের বিস্ফোরণ ক্ষমতা হিরোশিমায় বিস্ফোরিত বোমাগুলোর ক্ষমতার তুলনায় পাঁচ লাখ গুণ। এসব বোমার হামলা ঘটলে মানবজাতি যে ক্ষতি আর বিপর্যয়ের মুখে পড়বে, তা কখনোই পূরণ হওয়ার নয়। আজকের পারমাণবিক বোমা মানবজাতির জন্য যে আর্থিক ক্ষতি ও দুর্ভোগ বয়ে আনবে তা সাধারণ মানুষের কল্পনাতীত এবং সে বর্ণনায় যাওয়ার সুযোগও এ লেখায় নেই। হিরোশিমা ও নাগাসাকির আণবিক বোমার ক্ষয়ক্ষতি সে তুলনায় কিছুই নয়। 

যুদ্ধমাত্রই অপরাধ। যুদ্ধ মানেই পাগলামি। যুদ্ধ মানেই বিপন্ন মানুষ। এর অবসান চায় বিশ্বের প্রতিটি সচেতন মানুষ, ক্ষমতালোভী স্বার্থান্বেষী কিছু মানুষ ছাড়া। এদের কারণেই যাবতীয় নেতিবাচকতা নিয়েও মানবসমাজে এখনো জারি রয়েছে এই যুদ্ধ নামের খেলা। যুদ্ধ নানামাত্রা নিয়ে সদর্পে বিদ্যমান। যেই মাত্রার যুদ্ধ, সেই মাত্রার ক্ষতি। সেই মাত্রার দুর্ভোগ আর বিপর্যয়। এ কথা আমরা সবাই জানি। তবুও ভাইয়ে ভাইয়ে, পরিবারে পরিবারে, সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে, গোষ্ঠীতে গোষ্ঠীতে, রাজনৈতিক দলে দলে, দেশে দেশে চলছে যুদ্ধ। এ যুদ্ধের অবসান না হলে মানবতার মুক্তি নেই। মানুষের দুর্ভোগ আর বিপর্যয়ের অবসান কামনা তখন অহেতুক। 

No comments:

Post a Comment