Wednesday, November 27, 2013

টিকফা রহস্য ও আমাদের পোড়া কপাল

'টিফা’ বা 'টিকফা' গতকাল (২৫ নভেম্বর) স্বাক্ষরিত হোল। খুব তড়িঘড়ি করে এমন সময় চুক্তিটি স্বাক্ষর করা হলো যখন শাসকদল নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকার গঠন করেছে বলে দাবি করেছে এবং শুধুমাত্র নির্বাচন উপলক্ষে করনীয় জরুরী কাজগুলো সম্পাদন করবে বলে প্রচার করছে।
টিকফা কী?
টিকফা শব্দটি নতুন। আগে এর নাম ছিল টিফা। ‘টিফা’ চুক্তি হলো Trade and Investment Framework Agreements বা সংক্ষেপে TIFA, যেটিকে বাংলায় অনুবাদ করলে হয় —‘বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সংক্রান্ত কাঠামোগত সমঝোতা চুক্তি'। ‘টিফা’ চুক্তি নিয়ে কথাবার্তা হচ্ছে দশক কালেরও আগে থেকে। এই চুক্তির খসড়া প্রণয়নের কাজ শুরু হয় ২০০১ সালে। ১৩টি ধারা ও ৯টি প্রস্তাবনা সম্বলিত চুক্তিটির প্রথম খসড়া রচিত হয় ২০০২ সালে। পরে ২০০৪ সালে এবং তারও পরে আবার ২০০৫ সালে খসড়াটিকে সংশোধিত রূপ দেয়া হয়। চুক্তির খসড়া প্রণয়নের পর সে সম্পর্কে নানা মহল থেকে উত্থাপিত সমালোচনাগুলো সামাল দেয়ার প্রয়াসের অংশ হিসেবে এর নামকরণের সাথে Co-operation বা সহযোগিতা শব্দটি যোগ করে এটিকে এখন ‘টিকফা’ তথা TICFA বা Trade and Investment Co-operamework Agreement (‘বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা সংক্রান্ত কাঠামোগত সমঝোতা চুক্তি) হিসাবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে।
চুক্তিটি কার জন্য?চুক্তিটি মার্কিন সরকারের সাথে বাংলাদেশ সরকারের। চুক্তিটি যুক্তরাষ্ট্র করেছে অন্যান্য রাষ্ট্রের সাথেও। চুক্তিটির ধারা উপধারা ও আমেরিকার তৈরি। আমেরিকা চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়ে নাছোড়বান্দা এবং তারা হাল ছেড়ে না দিয়ে বছরের পর বছর ধরে বাংলাদেশের ওপর ক্রমাগত চাপ দিয়ে চলেছে। এর মাঝে এদেশে ও আমেরিকায় কয়েক দফা সরকার বদল হয়েছে। কিন্তু ‘টিফা’ চুক্তির বিষয়টি সব আমলেই যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা হয়ে থেকেছে। তারা এমনও বলেছে যে, ‘টিফা’ চুক্তি স্বাক্ষর না করলে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সহযোগিতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। যেহেতু বাণিজ্য ও বিনিয়োগ উভয়ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রাধান্য ও আধিপত্য প্রশ্নাতীত এবং এই অসামঞ্জস্য পরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা নেই, তাই ‘বাণিজ্য ও বিনিয়োগের’ স্বার্থ রক্ষার উদ্দেশ্যে করা চুক্তিটির দ্বারা প্রধানত যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক স্বার্থ সংরক্ষণের একতরফা সুবিধাপ্রাপ্তির ব্যবস্থা করা হবে। এই সমালোচনা নিরসনের জন্য ‘বাণিজ্য ও বিনিয়োগ’-এর সাথে ‘সহযোগিতা’ শব্দ যুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু চুক্তিতে যেসব প্রস্তাব ও ধারা রয়েছে সেগুলোর জন্য চুক্তিটি অসম ও মার্কিন স্বার্থবাহী।
টিকফা চুক্তিতে কী আছে?
‘টিকফা’ চুক্তিতে কী কী ধারা রয়েছে তা দেশবাসী জানে না। এই চুক্তি নিয়ে চরম গোপনীয়তা রক্ষা করা হচ্ছে। ২০০৫ সালে টিফার চুক্তি সংক্রান্ত কিছু তথ্য ফাঁস হয়ে যায়, যেটাতে দেখা যায় অন্যান্য দেশে যে সমস্ত টিফা চুক্তি হয়েছে তার সাথে বাংলাদেশের ধারা উপধারাগুলো মিলে যায়। এই আলোচনা সেই ফাঁস হওয়া ড্রাফটের ভিত্তিতে করা হয়েছে। যদিও সেই ড্রাফ্‌ট পরিবর্তিত হয়ে থাকতে পারে। তবে মূল ভাবনা এই আলোচনার বাইরে যাবে না বলেই মনে হচ্ছে। এই চুক্তির খসড়ায় বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সহযোগিতার মাধ্যমে উভয় দেশের বন্ধন সুদৃঢ় করার উল্লেখ থাকলেও চুক্তির বিভিন্ন প্রস্তাবন ও অনুচ্ছেদে বাজার উন্মুক্তকরণ এবং সেবাখাতের ঢালাও বেসরকারিকরণের মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক খাতসমূহে, বিশেষ করে সেবা খাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বহুজাতিক কোম্পানির আধিপত্য প্রতিষ্ঠার সুস্পষ্ট রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। চুক্তির প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে উভয় রাষ্ট্রই আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগের জন্য উদার নীতি গ্রহণ করবে। বেসরকারি খাতের বিকাশকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে এবং উভয় দেশের উচ্চ পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত “বাণিজ্য ও বিনিয়োগ কমিশন” প্রাইভেট সেক্টরের বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় কৌশল ও পরামর্শ সরবরাহ করবে। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে শুধু সার্ভিস সেক্টরের কথা উল্লেখ রয়েছে, ‘পণ্য’ উৎপাদনের বিষয়টি সংযুক্ত রাখা হয়নি। চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ভবিষ্যতে বাংলাদেশে যে বিনিয়োগ করবে তা শুধু সেবাখাতেই। তারা কোনো পণ্য এ দেশে উৎপাদন করবে না। চুক্তির এসব ধারা অনুযায়ী, বাংলাদেশ সরকার যুক্তরাষ্ট্রের বহুজাতিক কোম্পানির বাণিজ্য ও বিনিয়োগের জন্য দেশের বাজার উন্মুক্ত করে দিবে এবং বিদ্যমান শুল্ক এবং অশুল্ক বাধাসমুহ দূর করতে বাধ্য থাকবে। বাংলাদেশকে দেশীয় শিল্পের/কোম্পানির প্রতি সুবিধা প্রদানকারী বাণিজ্য সংক্রান্ত অভ্যন্তরীণ সংরক্ষণ নীতি প্রত্যাহার করতে হবে। টিকফা চুক্তিতে বলাই আছে, বাংলাদেশ ১৯৮৬ সালে স্বাক্ষরিত “দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগ চুক্তি” অনুযায়ী মার্কিন বিনিয়োগকারীদের অর্জিত মুনাফা বা পুঁজির ওপর কোনো কর আরোপ করতে পারবে না এবং বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নেয়া হলে তাদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এই চুক্তির মাধ্যমে বিনিয়োগের বিশেষ সুরক্ষাসহ মার্কিন কোম্পানিগুলোকে সেবাখাতে বাণিজ্যের জন্য বিশেষ সুযোগ-সুবিধা দিয়ে দেশের জ্বালানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ, বন্দর, টেলিযোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবহন ইত্যাদি সেক্টরকে মার্কিন পুঁজিপতিদের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে হবে। চুক্তির প্রস্তাব অনুযায়ী, বাংলাদেশকে দোহা ডেভেলপমেন্ট এজেন্ডা অনুসারে কৃষিতে ভর্তুকি হ্রাসকরণ এবং মুক্তবাজার অর্থনীতি গ্রহণ করতে হবে। এছাড়া টিকফা চুক্তির অন্যতম দিক হচ্ছে, মেধাসত্ব আইনের কঠোর বাস্তবায়ন।
চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে সমস্যা কী?
চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হলে দেশের সেবাখাতসমূহ রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত হয়ে মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানির দখলে চলে যাবে। এতে করে দেশীয় কোম্পানিগুলোর স্বার্থও বিঘ্নিত হবে। অবাধ মুনাফা অর্জনের জন্য বিদেশি কোম্পানিগুলো সেবার মূল্য, যেমন টেলিযোগাযোগ, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, চিকিৎসা, শিক্ষা, বন্দর প্রভৃতি ও পণ্যের দাম বহুগুণে বৃদ্ধি করবে। সেবাখাতে বিদেশি প্রাইভেট কোম্পানিগুলোর অবাধ বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সুযোগ প্রদান করলে বাংলাদেশ তার কল্যাণমূলক রাষ্ট্রনীতির আওতায় সরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দেশের দরিদ্র ও সাধারণ মানুষকে কম মূল্যে সেবাদানের যেসব কর্মসূচি নিয়ে থাকে তা সঙ্কুচিত হবে অথবা বিলুপ্ত হয়ে যাবে। ফলে সাধারণ মানুষের জীবনধারন এবং সামাজিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজে সুকৌশলে বাণিজ্য সংরক্ষণ নীতি গ্রহণ করে অনুন্নত দেশকে বাণিজ্য সুবিধা প্রদান থেকে বিরত থাকছে। দোহা এজেন্ডা অনুযায়ী বাংলাদেশ কৃষিতে ৫% -এর বেশি ভর্তুকি দিতে পারছে না, অথচ যুক্তরাষ্ট্র নিজেই কৃষিতে ১৯% এর বেশি ভর্তুকি দিয়ে তাদের কৃষি ব্যবস্থাকে সুরক্ষা দিচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের কৃষিজ পণ্যের দাম ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র নিজে কিন্তু বাণিজ্য সংরক্ষণ নীতি গ্রহণ করছে অথচ আমাদের মত অনুন্নত দেশগুলোকে বাণিজ্য উদারনীতি গ্রহণে নানা চুক্তির মাধ্যমে বাধ্য করছে।
মেধাস্বত্ব আইনের কঠোর বাস্তবায়ন হলে তা উন্নত দেশগুলোর মালিকানাধীন বহুজাতিক কোম্পানির অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবেই কাজ করবে যাতে দরিদ্র দেশগুলোর কাছ থেকে অবাধে মাত্রাতিরিক্ত মুনাফা লুণ্ঠনের আইনি বৈধতা পাওয়া যায়। উন্নত প্রযুক্তি এবং উৎপাদন পদ্ধতির অধিকারী হবার পর তারা এই জ্ঞানকে কুক্ষিগত করে রাখতে চায়। এর মাধ্যমে তারা চায় যেন অবশিষ্ট বিশ্ব প্রযুক্তি ও উৎপাদনের জন্য তাদের ওপর নির্ভরশীল থাকে এবং তাদের উৎপাদিত পণ্যের বাজারে পরিণত হয়। টিফা চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র নির্দিষ্ট সময়ের পূর্বেই মেধাস্বত্ব আইন মানতে বাধ্য করছে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে। টিকফা চুক্তির ফলে বাংলাদেশকে ২০১৬ সালের আগেই মেধাস্বত্ব আইন মেনে চলতে হবে। চুক্তির প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে বাণিজ্য সম্পর্কিত মেধাস্বত্ব অধিকার (TRIPS) এবং অন্যান্য প্রচলিত মেধাস্বত্ব আইনের যথাযথ এবং কার্যকরী রক্ষণাবেক্ষণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে । দোহা ঘোষণা ২০০০ অনুযায়ী, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার আওতায় বাণিজ্যবিষয়ক মেধাসম্পদ স্বত্ব চুক্তি অনুসারে স্বল্পোন্নত সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ ২০১৩ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন পণ্য ও সেবায় এবং ২০১৬ পর্যন্ত ওষুধের ক্ষেত্রে মেধাস্বত্ববিষয়ক বিধিনিষেধ থেকে ছাড় পেয়েছে এবং এই সুবিধা গ্রহণ করে বাংলাদেশের ওষুধ কোম্পানিগুলো বিভিন্ন পেটেন্ট করা ওষুধ উৎপাদন এবং রফতানি করতে পারছে। কিন্তু টিকফা এ সে ধরনের কোনো সুযোগ রাখা হয়নি। এর ফলে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প, কম্পিউটার সফটওয়্যার সহ গোটা তথ্যপ্রযুক্তি খাত আমেরিকার কোম্পানিগুলোর পেটেন্ট, কপিরাইট, ট্রেডমার্ক ইত্যাদির লাইসেন্স খরচ বহন করতে গিয়ে বিভিন্ন পণ্য এবং প্রযুক্তির দাম অভাবনীয়ভাবে বেড়ে যাবে। মেধাস্বত্ত্ব আইন কার্যকর হলে বাংলাদেশের ওষুধ কোম্পানিগুলো অনেক ওষুধ তৈরি করতে পারবে না, আমাদের কয়েকগুণ বেশি দামে বিদেশি কোম্পানির পেটেন্ট করা ওষুধ খেতে হবে। বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প রপ্তানি সম্ভাবনা হারাবে। দরিদ্ররা ওষুধ কিনতে গিয়ে হিমশিম খাবে। বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হবে, কেননা দেশীয় ওষুধ কোম্পানিগুলো নিজদেশেই তাদের ওষুধ বিক্রি করতে গিয়ে বিদেশি কোম্পানির সাথে অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়বে। ফলে অনেক মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্প ধংস হয়ে যাবে। আবিষ্কারক কোম্পানি সুদীর্ঘ ২০ বছর ধরে নিজের ইচ্ছামতো দামে ওষুধটির একচেটিয়া ব্যবসা করে অবাধে মুনাফা করবে।
‘টিকফা’ চুক্তির খসড়ায় পণ্য ও পুঁজির চলাচলকে অবাধ করার কথা এবং সেই সূত্রে মুনাফার শর্তহীন স্থানাস্তরের গ্যারান্টির কথা বলা হলেও শ্রমশক্তির অবাধ যাতায়াতের সুযোগের কথা কিছুই বলা হয়নি। অথচ শ্রমশক্তিই হলো আমাদের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও মূল্যবান সম্পদ যার রপ্তানির ক্ষেত্রে আমাদের রয়েছে বিপুল আপেক্ষিক সুবিধা। কিন্তু সেক্ষেত্রে ‘খোলাবাজার’ নীতিটি যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োগ করতে রাজি নয়। তারা তা প্রয়োগ করতে প্রস্তুত কেবল পুঁজি এবং পণ্য-সেবা পণ্যের ক্ষেত্রে, যে ক্ষেত্রে তার রয়েছে বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বেশি আপেক্ষিক সুবিধা। অন্যদিকে, টিকফাতে ‘শুল্ক বহির্ভূত বাধা’ দূর করার শর্ত চাপানো হলেও ‘শুল্ক বাধা’ দূর করার কথা বেমালুম এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশের রপ্তানিকৃত তৈরি পোশাক শিল্পের পণ্যের ক্ষেত্রে, গড় আন্তর্জাতিক শুল্ক যেখানে ১২%, যুক্তরাষ্ট্রের তা ১৯%।
পেটেন্ট আইন মানতে হলে সমস্যা কী?
পেটেন্ট কোন প্রতিষ্ঠানকে মেধাস্বত্ত্ব দিয়ে দেয়। ফলে সে সেই মেধাস্বত্ত্বের ভিত্তিতে সেই পেটেন্টের সাথে সম্পর্কিত যেকোন বাণিজ্যে সে রয়্যালটি দাবি করতে পারে। যেমন নিমের পেটেন্ট করা আছে আমেরিকার, তাই নিমগাছ থেকে উৎপাদিত যেকোন পণ্যে সে উৎপাদক প্রতিষ্ঠানের কাছে রয়্যালটি দাবি করতে পারবে। বাংলাদেশ, ভারত, ব্রাজিলসহ বিভিন্ন দেশের নিজস্ব জীববৈচিত্রের অনেক জীব-অণুজীব এবং উদ্ভিদ প্রজাতি এখন বহুজাতিক কোম্পানির পেটেন্টের দখলে। ভারত উপমহাদেশের শতাধিক গাছগাছড়া যুক্তরাষ্ট্রের পেটেন্ট অফিসে রেজিস্ট্রেশনের অপেক্ষায় রয়েছে। পেটেন্ট আইন বাস্তবায়ন আমাদের দেশের জীববৈচিত্র্য এবং কৃষিতে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে। পেটেন্টের মাধ্যমে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন এখন আর শুধু সামরিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়, বরং ফল ফসল এবং গাছগাছড়ার ওপরও বিস্তৃত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পেটেন্ট আইনে বলা আছে, “কোন কিছুর পেটেন্টের বেলায় যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে অলিখিত উৎসের অনুসন্ধানের কোন বাধ্যবাধকতা নেই”|
এর মানে হচ্ছে, হাজার হাজার বছর ধরে উন্নয়নশীল দেশের প্রচলিত উৎপাদন প্রণালী, জীববৈচিত্র্য, কৃষকদের নিজস্ব শস্যবীজ ইত্যাদি শুধুমাত্র প্রযুক্তি এবং অর্থের জোরে পেটেন্ট করে নিতে পারবে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো। এক্ষেত্রে কোম্পানিগুলো তাদের উন্নত জেনেটিক টেকনোলজির মাধ্যমে ডি এন এ ফিংগার প্রিন্ট নির্ণয় করে অন্যদেশের জীববৈচিত্র্য এবং কৃষিজ সম্পদকে নিজের বলে পেটেন্ট করিয়ে নেবে। কৃষিতে পেটেন্ট বাস্তবায়ন হলে কৃষকদের শস্যবীজ উৎপাদন, সংরক্ষণ, পুনরুৎপাদন এবং রক্ষণাবেক্ষণের অধিকার কেড়ে নেয়া হবে। মেধাস্বত্ব আইন অনুযায়ী, রয়্যালটি পাবে আমেরিকার বহুজাতিক কোম্পানিগুলো আর ধ্বংস হবে দেশী প্রজাতি, পরিবেশ এবং কৃষি উৎপাদন কাঠামো। বীজ এবং কৃষি পণ্যের দাম অনেক গুণ বেড়ে যাবে বলে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে। তৈরি পোশাক শিল্পকেও ব্র্যান্ড নামে ব্যবহৃত এদেশের তৈরি এ্যাকসেসরিজের জন্য সংশ্লিষ্ট মার্কিন কোম্পানিকে রয়্যালটি দিতে হবে। বাসমতি চাল, চিরতার রস, নিমের দাঁতন ইত্যাদি হেন বস্তু নেই যা আগেভাগেই মার্কিনীসহ বিদেশি কোম্পানিরা পেটেন্ট করে রাখেনি। মেধাস্বত্ব অধিকারের ধারা প্রয়োগ করে তারা এসবকিছুর জন্য রয়্যালটি প্রদানে বাংলাদেশকে ‘টিকফা’ চুক্তি মাধ্যমে বাধ্য করতে চায়।
টিকফাতে শ্রমিক বান্ধব ধারাও কি আছে?
মোটেও না। টিকফার প্রস্তাবনায় মানবাধিকার, শ্রমের মান এবং শ্রমজীবীদের অধিকার ও পরিবেশগত বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হলেও তার লক্ষ্য শ্রমজীবীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা নয়, বরং এগুলোকে নন-ট্যারিফ (অশুল্ক) বাধা হিসেবে ব্যাবহার করে যুক্তরাষ্ট্র তার বাজারে বাংলাদেশী পণ্যের রফতানি ইচ্ছামতো নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। মানবাধিকার, শ্রম পরিবেশের মান ইত্যাদি বিষয়কে অশুল্ক বাধা হিসাবে চিহ্নিত করে মার্কিনীরা ‘টিকফা’ চুক্তি দ্বারা বাংলাদেশকে উত্তরণ অসাধ্য প্রতিকূলতায় আটকে ফেলার ফন্দি করেছে। কয়েক শতাব্দী ধরে তারা আমাদের মতো দেশে ঔপনিবেশিক শাসন চালিয়ে, নিজ নিজ দেশে নির্মম ও অমানবিক শ্রম-শোষণ চালিয়ে, শ্রম পরিবেশের ক্ষেত্রে দাসসুলভ মান বজায় রেখে এখন উন্নত ধনী দেশে পরিণত হয়েছে। এখন আমরা উন্নয়নের পথ গ্রহণ করামাত্রই সমানে সমানে প্রতিযোগিতায় নামার কথা বলে আমাদের ওপর তাদের মতো সমান মাত্রার শর্তাবলী চাপিয়ে দিতে চাচ্ছে। এ যেন, হাত-পা খোলা মোটা তাজা মানুষ কর্তৃক পেছনে হাত বাঁধা অনাহারী মানুষকে সমানে সমানে কুস্তি প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ জানানো!
চুক্তির জন্য কেন এতো গোপনীয়তা?
বাংলাদেশের সংবিধানে আন্তর্জাতিক চুক্তি সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, ‘বিদেশের সাথে সম্পাদিত সকল চুক্তি রাষ্ট্রপতির নিকট পেশ করা হইবে, এবং রাষ্ট্রপতি তাহা সংসদে পেশ করিবার ব্যবস্থা করিবেন; তবে শর্ত থাকে যে, জাতীয় নিরাপত্তার সহিত সংশ্লিষ্ট অনুরূপ কোনো চুক্তি কেবলমাত্র সংসদের গোপন বৈঠকে পেশ করা হইবে।’ যেহেতু টিকফা কোনো নিরাপত্তা বিষয়ক চুক্তি নয়, তাই সে চুক্তির ধারাগুলো প্রকাশ না করাটা সংবিধানবিরোধী। ‘টিকফা’ চুক্তির ধারাসমূহ নিয়ে গোপনীয়তা ও রাখঢাক করার যে চেষ্টা চলছে তা সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক।
টিকফা চুক্তি কি বাংলাদেশে মার্কিন বিনিয়োগ বাড়াবে? বাংলাদেশের পণ্য রফতানি বাড়াবে?
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এ চুক্তি স্বাক্ষরের পর যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমাদের দেশে বিনিয়োগ কয়েক গুণ বাড়বে, সেই সাথে যুক্তরাষ্ট্রে বাড়বে আমাদের পণ্য রফতানিও। এশিয়ার দুটি প্রধান অর্থনৈতিক শক্তি গণচীন ও ভারত তার রফতানির যথাক্রমে ২১ ও ১৯% পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি করলেও তারা এই চুক্তি স্বাক্ষর করেনি। অর্থাৎ টিকফা চুক্তি স্বাক্ষরের সাথে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রফতানির সম্পর্ক নেই। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পণ্য রফতানিতে প্রধান বাধা হচ্ছে শুল্ক বাধা। বর্তমানে বাংলাদেশি পোশাক রফতানিকারকদের যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ১৫.৩% শুল্ক দিতে হয়। অন্যদিকে চীনকে পরিশোধ করতে হয় মাত্র ৩% । তাহলে দেখা যাচ্ছে, চীন টিফা চুক্তি স্বাক্ষর না করেও বাংলাদেশের চেয়ে অনেক কম শুল্কে পণ্য রফতানি করতে পারছে। তৈরি পোশাকের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকারের লোভ দেখিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য এদেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করে যাচ্ছে। কিন্তু টিকফা এগ্রিমেন্টে তৈরি পোশাকের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকারের কোন নিশ্চয়তা রাখা হয়নি। কারণ প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, উভয় দেশ নিজ নিজ বাজারে পণ্য প্রবেশে নন-ট্যারিফ বা অশুল্ক বাধা দূর করবে। কিন্তু বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের অশুল্ক বাধা খুব সামান্যই।
যুক্তরাষ্ট্র কেন এই চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য এতটা আগ্রহী?বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বাইরে স্বল্পোন্নত দেশের ওপর আধিপত্য বিস্তারের জন্যই আমেরিকা সহযোগিতামূলক উদ্যোগের ছদ্মাবরণে টিফা বা টিকফার মত দ্বিপাক্ষিক চুক্তিগুলো করার চেষ্টা করছে। যদি স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে দ্বিপাক্ষিক চুক্তির বেড়াজালে আবদ্ধ করা যায়, তবে আন্তর্জাতিক বহুপাক্ষিক ফোরাম ডব্লিউ টি ও -এ আমেরিকা তার আধিপত্যবাদী বাণিজ্যনীতি বাধাহীনভাবে বাস্তবায়ন করতে পারবে। এই লক্ষ্যেই পাকিস্তান, সৌদি আরব, শ্রীলঙ্কা, ভিয়েতনাম, ইরাক, উরুগুয়েসহ বিশ্বের ৩০ টিরও বেশি দেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যেই টিফা চুক্তি করেছে। স্বল্পোন্নত দেশগুলোর নেতা হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে তৃতীয় বিশ্বের প্রতিনিধিত্ব করছে। বিশ্বব্যাপী পরাশক্তিগুলোর অর্থনৈতিক আধিপত্যের বিপরীতে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর স্বার্থরক্ষার জন্য এসব ফোরামে বাংলাদেশ যাতে কোনো ভূমিকা না রাখতে পারে সেজন্য বাংলাদেশকেও টিকফা চুক্তির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রয়োজনীয়তা বোধ করছে যুক্তরাষ্ট্র। কেননা টিকফা স্বাক্ষর হলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের বাইরে যাওয়া আর সম্ভব হবে না। এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র নিরাপত্তার প্রশ্নে কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী হিসেবে বাংলাদেশকে দেখতে চায়। কারণ যুক্তরাষ্ট্র মনে করে, গণচীনের অব্যাহত উন্নয়ন ও পরাশক্তি হিসেবে চীনের অভাবনীয় অগ্রগতি ঠেকাতে এবং দক্ষিণ এশিয়ার বিশাল বাজারের ওপর নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে হলে বঙ্গোপসাগরে এবং ভারত মহাসাগরে মার্কিন বাহিনীর উপস্থিতি বজায় রাখতে হবে। আর বঙ্গোপসাগরে নিরাপত্তা বজায় রাখতে হলে বাংলাদেশ ভূরাজনৈতিকভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখবে। এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে তথাকথিত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের আঞ্চলিক পার্টনার বানাতে আগ্রহী। ভূরাজনৈতিক নিরাপত্তা ইস্যুতে ঢাকার কাছ থেকে অধিকতর সহযোগিতার জন্যই যুক্তরাষ্ট্র টিকফা চুক্তি স্বাক্ষর করতে চাচ্ছে। কেননা এই চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ মার্কিন বলয়ে আরও বেশি সম্পৃক্ত হয়ে যাবে।
উল্লেখ্য যে, দোহায় অনুষ্ঠিত বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সম্মেলনে গৃহীত ‘দোহা ডেভেলপমেন্ট এজেন্ডার’ মূল বিষয়গুলো হলো—অ-কৃষিপণ্যের বাজার উন্মুক্তকরণ, কৃষি থেকে ভর্তুকি প্রত্যাহার, মেধাজাত সম্পত্তি অধিকার (ট্রিপস) এবং সার্ভিস বা পরিবেশ খাতে বিনিয়োগ উদারিকরণ ইত্যাদি। কিন্তু এসব বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং বাংলাদেশের স্বার্থ অভিন্ন নয়। বরং এসব ক্ষেত্রে মার্কিন স্বার্থের সাথে বাংলাদেশের স্বার্থের গুরুতর বিরোধ আছে। অথচ ‘সোফা’ চুক্তির সুবাদে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে মার্কিনের পক্ষে এবং স্বল্পোন্নত দেশের বিপক্ষে বাংলাদেশকে দাঁড় করানোর সুযোগ পাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। দ্বিপাক্ষিক ‘সোফা’ চুক্তিকে কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে অবস্থান নিতে বাধ্য করতে পারবে। একথা সকলেই জানেন যে, বিভিন্ন দেশ বিশেষ করে স্বল্পোন্নত দেশগুলো তাদের অভিন্ন ও সাধারণ স্বার্থ সংরক্ষণে সম্মিলিতভাবে আন্তর্জাতিক ও বহুপাক্ষিক নানা ফোরামে অবস্থান নিতে পারে। কিন্তু টিফার মতো দ্বিপাক্ষিক চুক্তির কারণে বাংলাদেশ তা স্বাধীন মতো করতে পারবে না। শুধু তাই নয় বহুপক্ষীয়ভাবে যেকোনো বিরোধ নিরসনের সুযোগ হারাবে বাংলাদেশ। ‘টিকফা’ চুক্তির কারণে বাংলাদেশ তার জাতীয় স্বার্থরক্ষায় আন্তর্জাতিক পরিসরে বহুপাক্ষিকভাবে প্রচেষ্টা চালাবার সুযোগ নিরঙ্কুশভাবে পাবে না। উপরন্তু বাণিজ্য সমস্যা বহুপক্ষীয়ভাবে সমাধানের বদলে তা মার্কিনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয়ভাবে সমাধানের ফাঁদে পড়বে বাংলাদেশ। একপক্ষ প্রবল শক্তিশালী হলে দ্বিপাক্ষিক সমস্যার সমাধান স্বাভাবিক কারণেই দুর্বলের নয় বরং সবলের পক্ষেই যায়। সে কারণে বাংলাদেশকে সব সময়ই ক্ষতিগ্রস্ত হতে হবে।
জি এস পি সুবিধার পাবার প্রশ্নের সাথে কি টিকফা চুক্তি যুক্ত?ঢাকায় নিয়োজিত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজিনা গত ২৮ জুলাই আবারো এই চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহবান জানিয়ে বলেন, “টিকফা চুক্তি সই না করলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পণ্য শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে না।“ টিকফা চুক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে দরকষাকষিকে ‘অস্বস্তিকর’ বিষয় উল্লেখ করে তিনি জানতে চান, “এতে খারাপ কী আছে? আমি তো খারাপ কিছু দেখছি না।” টিকফার সাথে জি এস পি সুবিধার কোন সম্পর্ক নেই। দোহা নীতি অনুসারে আমেরিকা স্বল্পোন্নত দেশগুলোর ৯৭% পণ্যের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দেয়ার কথা যেটাকে সাধারণভাবে জি এস পি সুবিধা বলা হয়। আমেরিকা ঠিকই বাংলাদেশের ৯৭% পণ্যের ক্ষেত্রে এই সুবিধা দিয়েছে তবে তাতে ঐসব পণ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে যার রপ্তানির পরিমান খুবই কম। বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাককে এর বাইরে রাখা হয়েছে। সেই সব পণ্যের জন্য জি এস পি সুবিধা থাকা আর না সমান কথা। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের যে গার্মেন্টস পণ্য রফতানি হয় তার ওপর উচ্চহারে শুল্ক বসিয়ে রেখেছে তারা। যুক্তরাষ্ট্রের গড় আমদানি শুল্ক হার শতকরা ১ ভাগের মতো। কিন্তু বাংলাদেশের গার্মেন্টসের ওপর শুল্কহার শতকরা গড়ে ১৫ ভাগ। এই শুল্কহার আন্তর্জাতিক বিধিরও পরিপন্থী। এই শুল্ক এমনিতেই বাতিল হওয়া দরকার। এবছরও বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রকে শুল্কবাবদ প্রদান করেছে প্রায় ৫৬০০ কোটি টাকা। এটা যুক্তরাষ্ট্র থেকে যে ঋণ অনুদান নানাভাবে বাংলাদেশে আসে আসে তার ৬ গুণেরও বেশি। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে নয়, বাংলাদেশই যুক্তরাষ্ট্রকে অর্থের যোগান দিচ্ছে।
জাতীয় স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে রচিত ‘টিকফা’ চুক্তি পুরোটাই যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য তা আরেকটি সর্বনাশের বার্তা। দেশের গলায় আরেকটি ফাঁস পরানোর এই পাঁয়তারা দেশপ্রেমিক জনগণকে রুখতে হবে। এ কর্তব্য সব দেশপ্রেমিকদের।

Friday, April 26, 2013

লাশগুলো শুধুই সংখ্যা


যে লাশগুলো দেখছি সেগুলো শুধুই সংখ্যা, যে হাত কাঁটা কিংবা পা কাঁটা পঙ্গুদেহগুলো শুধুই সংখ্যা। সংখ্যার পিছোনে সংখ্যাই থাকে যার জন্য সংখ্যা আমাদের কোন ক্রিয়া করেনা। শত শত স্বজন মারা গেল তারপরও আমরা সংখ্যা নিয়ে ব্যস্ত, এটা গত ঘটে যাওয়ার ধ্বংসের চাইতে বেশী সংখ্যার জীবনহানি ঘটেছে, রাষ্ট্র যায় সংখ্যা কম দেখাতে, সরকার বিরোধীরা চায় সংখ্যা বেশী দেখাতে মনে হয় সংখ্যা সংখ্যা খেলা।
সরকারের কাছে হত বা আহত এই সব সংখ্যা, পুজিঁলগ্নীকারীদের কাছে ক্ষতিপূরণের সংখ্যা, বিদেশী ক্রেতাদের কাছে দর কষাকষির উপযুক্ত হাতিয়ার এই সংখ্যা। যেমনটি আমাদের বলার জন্য বলি ৩০ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে বাংলাদেশ, মানে ৩০ লক্ষ টাই মূখ্য এর ভিতরে ত্যাগ, গ্লানী, মানসিক শক্তি কোন ব্যাপার নয়। ঠিক তেমনি আজ আমরা রানা প্লাজায় কতজন মারা গেছে সেটার সংখ্যা দিয়ে বিচার করছি।
একজন প্রধানমন্ত্রী তৈরী করতে ৩০০ সংখ্যা দিয়ে ১৫২ পাশ মার্ক দিয়ে বিবেচনা করছি, সেই ৩০০ রা আবার একেক জন্য হাজার লক্ষ দিয়ে ১ সংখ্যা তৈরী করেছে, প্রধান এক সংখ্যা কখনও ভাবেনা যে তার তৈরীর পিছোনে ৩০০ ও বাইরে কোটি লক্ষের মধ্যেও একটা সংখ্যা আছে যে সংখ্যাটার একটা জীবন আছে ঠিক তারই মত তার ও হারানোর বেদনা থাকতে পারে, তারও পেটে খাদ্যের প্রয়োজন, তারও স্বপ্ন আছে, সেও দেশ প্রকৃতি পৃথিবীকে ভালবাসে। একেকটা সংখ্যা মানের একেকটি পৃথিবীর মৃত্যু, যা ভেবে দেখিনা।
যখনই সংখ্যা দিয়ে বিচার করছি তখন সংখ্যা দিয়েই কথিত সমাধান হচ্ছে সংখ্যা দিয়ে। হয়তো মৃত্যের স্বজনদের রাষ্ট্রের কোষাগার থেকে কিছু টাকা ( সংখ্যা) তুলে দেয়া হবে, আত্মীয় স্বজনরা নগদ টাকা পেয়ে বিপুল সংখ্যার টাকা পেয়ে সেই সংখ্যাকে ভুলে যাবে, হয়ত কারো ঘরে কিছুদিন ছবি টানা থাকবে, আর যারা আহত হবে তারাও সংখ্যা পাবে, সেই সংখ্যা পেয়ে হয়ত ভুলেই যাবে সেও সংখ্যায় গণিত হয়েছে।
টেলিভিশনে উত্তাপ্ত বাক্যে সংখ্যা দিয়ে বলবে গত সংখ্যা থেকে এই সংখ্যা বেশী কিন্তু আমরা চাইবো না আমরা শুধুই সংখ্যা নয়, আমদেরও স্বপ্ন আছে, আমরাও বাঁচতে চাই, প্রধান মন্ত্রী যাওয়ার পথে সকল রাস্তা খালি করা হয় যে নিরাপত্তরা জন্য ঠিক তেমনি না হলেও আমাদের সাধারনের নিরাপত্তাতো সেই একক ( প্রধানমন্ত্রী) সংখ্যারই করার কথা। নিরাপত্তার জন্য অস্ত্র না কিনে মানুষের নিরাপত্তার জন্য দূযোর্গ সময়ে উদ্ধার সরঞ্জাম বেশী প্রয়োজন। আর এটা আমার বুঝলে হবেনা বুঝতে হবে একক সংখ্যাকে।

Sunday, April 21, 2013

স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে


থ্রি ইডিয়টস চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে চেতন ভগতের উপন্যাস অবলম্বনে। চেতন ভগত সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের অন্যতম জনপ্রিয় লেখক। জন্ম ভারতের নয়াদিল্লিতে, ১৯৭৪ সালের ২২ এপ্রিল। বই লেখার পাশাপাশি তরুণদের জন্য উৎসাহমূলক বক্তৃতা করেন তিনি। চেতন ভগত ২০০৮ সালের ২১ নভেম্বর দিল্লিতে হিন্দুস্তান টাইমস লিডারশিপ সামিটে এই বক্তৃতা দেন।

আমি নেতা নই। আমি একজন স্বপ্নচারী মানুষ যে ধৈর্যের সঙ্গে কাজ করে স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করতে জানে। আজ আমি বলতে এসেছি কীভাবে দেশের নাগরিক হিসেবে আমরা জাতির স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে পারি।

বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে আগে আমাদের নিজেদের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলোর সমাধান করতে হবে। ভেবে দেখো, সবাই সুখী, ধনী আর সফল প্রতিবেশীর সঙ্গেই বন্ধুত্ব করতে চায়, তাই না? যে পরিবারে সব সময় দ্বন্দ্ব আর ঝগড়া লেগেই থাকে, তাদেরকে সবাই এড়িয়ে চলে। জাতির ক্ষেত্রেও ঠিক একই নীতি প্রযোজ্য। আমাদের মধ্যে অসংখ্য সমস্যা আর বিভেদ। তবে আজ আমাদের প্রশ্ন এটা নয় যে এই সমস্যার দায় কার। আমাদের প্রশ্ন, কীভাবে এই সমস্যার সমাধান করা হবে?
এমন দেশ গড়তে হবে যেখানে সবাই নিজের যোগ্যতা, উদ্যম আর পরিশ্রম দিয়ে উন্নতি করতে পারবে। যেখানে কেউ জিজ্ঞেস করবে না, তুমি কোথা থেকে এসেছ, সবাই জানতে চাইবে, তুমি কোথায় যচ্ছে। আমরা সবাই এমন দেশের স্বপ্ন দেখি।
এই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে অনেক কিছু করতে হবে এবং রাজনীতিবিদদের দোষ দিয়ে বসে থাকলে চলবে না। আমি মনে করি, তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আমাদের চিন্তাধারা অবশ্যই বদলাতে হবে, শুধু জনগণ নয়, নেতাদেরও একই কাজ করতে হবে। এগুলো হলো, ভেদাভেদের রাজনীতির বদলে ঐকমত্যের রাজনীতির প্রচলন করা, আভিজাত্যের খোলস ছেড়ে জনতার কাতারে মিশে যাওয়া এবং ব্যবহারিক ইংরেজির চর্চা করা।
প্রথমে রাজনীতির কথায় আসি। আমি পাঁচ বছর ধরে ভারতের তরুণদের পর্যবেক্ষণ করছি। শুধু বড় শহরগুলোতে নয়, প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে তাদের গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা করেছি। আমাদের জনসংখ্যার একটি বিশাল অংশজুড়ে আছেন এই তরুণেরা, এঁরাই প্রকৃত ভোটব্যাংক। কিন্তু রাজনীতিবিদদের ভাষণে তরুণদের স্বপ্ন প্রতিফলিত হয় না। নেতারা এখন পুরোনো আমলের দেশপ্রেমের বুলি কপচান আর ধর্ম-বর্ণ ইত্যাদি সংস্কারের মাহাত্ম্য প্রচার করেন। কিন্তু তরুণেরা আসলে কী চান? তাঁরা চান ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে, ভালো চাকরি করতে, নিজেদের সামনে আদর্শ হিসেবে অনুকরণীয় কাউকে পেতে। মেধাবী শিক্ষার্থীদের স্থান করে দেওয়ার মতো এত আসন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নেই, চাকরির ক্ষেত্রেও তাই। তরুণদের সবচেয়ে বড় একতা এখানেই যে তাঁরা সবাই দেশকে এগিয়ে নিতে চান, উন্নতি করতে চান। তরুণদের এই স্বপ্ন পূরণের জন্য অবকাঠামো প্রয়োজন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রয়োজন। এসব অর্জন করা মোটেই সহজ নয়, কিন্তু আমাদের মধ্যে একতা গড়ে তোলার জন্য এর কোনো বিকল্প নেই।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে একটি দৃঢ় কিন্তু নিরপেক্ষ কণ্ঠের খুব প্রয়োজন। কেউ যখন কোনো ছুতোয় আমাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে চাইবে, তখন সেই বিভেদ সৃষ্টিকারীর দলের কাউকেই জোর গলায় এর প্রতিবাদ করে তার অপচেষ্টা রুখে দিতে হবে। কেউ যদি বলে যারা মারাঠি নয়, তাদের আক্রমণ করা উচিত, তাহলে মারাঠিদের মধ্য থেকেই এই আগ্রাসী আহ্বানের প্রতিবাদ করতে হবে। জাতির বিবেকরূপী কণ্ঠস্বরই পারে সবাইকে দেশের স্বার্থে একত্র করতে। তরুণ প্রজন্মও তাই চায়।
দ্বিতীয়ত, আমাদের ঠুনকো আভিজাত্যের অহংকারে মাটিতে পা না ফেলার অভ্যাসটা একটু বদলাতে হবে। যখনই কেউ একটু সফল, একটু বেশি শিক্ষিত, ধনী, বিখ্যাত, মেধাবী কিংবা সংস্কৃতিমনা হয়ে ওঠে, সে নিজেকে খুব একটা কেউকেটা ভাবা শুরু করে। নিজেকে সাধারণ জনগণের কাছ থেকে আলাদা করে এমন লোকদের সঙ্গে মেলামেশা করা শুরু করে, যারা সাধারণ মানুষকে মানুষ বলেই মানতে নারাজ। বায়বীয় বুদ্বুদে বুদ্ধিজীবী পরিবেষ্টিত হয়ে থাকতে ভালো লাগে মানি, কিন্তু এই বুদ্ধির উপযোগিতা কোথায়?
টিভি খুললে শতকরা ৭০ ভাগ সময় দিল্লি, মুম্বাই কিংবা বেঙ্গালুরুর খবর দেখতে পাই, কিন্তু শুধু এই তিনটি শহর নিয়েই ভারত নয়। ভারতের শতকরা ৯০ ভাগ মানুষ এসব শহরে থাকে না। তাদের খবর যদি গণমাধ্যমে যথাযথভাবে প্রচার করা না হয়, দেশ কীভাবে এগিয়ে যাবে? আমি মানবিক দিক বিবেচনা করে এসব করতে বলছি না। দেশে ব্যবসা করতে হলেও জনগণকে জানতে হবে, তাদের চাহিদা বুঝতে হবে। এতে মানসম্মান নষ্ট হয় না। আমার বই রেলস্টেশনে, শহরের অলিগলিতে বিক্রি হয়। এতে তো পাঠকের চোখে আমি সস্তা হয়ে যাই না। শুধু মুম্বাইয়ের র‌্যাম্পে হেঁটে চলা মডেলরা কী পরেছে, তা নয়, ইন্দোর আর রায়পুরের রাস্তায় হেঁটে চলা মানুষেরা কী ভাবছে, তা-ও জানতে হবে। মেকি আভিজাত্য না দেখিয়ে খেটে খাওয়া মানুষের সঙ্গে মিশে যেতে হবে। শুধু অপসংস্কৃতির ধুয়ো তুলে গালিগালাজ করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না।
সবশেষে আমি বলতে চাই, ইংরেজি শেখার ব্যাপারে আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে। শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবই আর পরীক্ষার খাতায় সীমাবদ্ধ না রেখে, ইংরেজি শিক্ষা সর্বস্তরে ছড়িয়ে দিতে হবে। আমি একজন গ্রামের ছেলেকে হিন্দিতে জ্যামিতি বা পদার্থবিদ্যা শেখাতে পারি, কিন্তু সে যখন চাকরি খুঁজতে যাবে, তখন সেটা তার খুব একটা কাজে লাগবে না। কিন্তু ইংরেজি তাকে একটা ভালো চাকরি পেতে সাহায্য করবে। ইংরেজির প্রসার ঘটিয়ে আমরা যদি দেশের মানুষের ভাগ্য উন্নয়ন করতে পারি, তাহলে আমরা সংস্কৃতি রক্ষার জন্য অনেক উদ্যোগ নিতে পারব, কিন্তু অসংখ্য মানুষকে বেকার কিংবা ক্ষুধার্ত রেখে আর যা-ই হোক, সংস্কৃতি রক্ষার কথা ভাবা যায় না।
এসব শুধু বক্তৃতা করার জন্য বলা নয়, আমাদের নিজেদের অবস্থান থেকেই আমরা কোনো না কোনোভাবে এই কাজগুলো করতে পারি। অন্তত বন্ধুদের আড্ডাতেই না-হয় সবাই কিছুক্ষণ এটা নিয়ে কথা বললেন। যদি আরও কোনো উপায়ে এই ধারণাগুলো দশজনের মাঝে ছড়িয়ে দিতে পারেন, তবে তা-ই করুন। আজ আমরা এখানে বসে চমৎকার বক্তৃতা শুনছি, এর অর্থ হচ্ছে আমাদের অনেক কিছু আছে, যা এ দেশের কোটি কোটি মানুষের নেই। দেশের কাছ থেকে তো অনেক কিছুই নিলাম, আসুন, এবার ভেবে দেখি, দেশকে আমরা কী দিতে পারি।

চেতন ভগত


সূত্র: ওয়েবসাইট, ইংরেজি থেকে সংক্ষেপিত অনুবাদ: অঞ্জলি সরকার

Friday, April 19, 2013

পয়লা বৈশাখের কথা

 বাংলা সনের মূল নাম ছিলো তারিখ-এ-এলাহী। মোগল সম্রাট আকবর ১৫৮৫ সালে তার রাজত্বকালের ২৯তম বর্ষের ১০ কিংবা ১১ মার্চ তারিখে এক ডিক্রি জারির মাধ্যমে তারিখ-এ-এলাহী প্রবর্তন করেন। সিংহাসনে আরোহণের পরপরই তিনি একটি বৈজ্ঞানিক, কর্মোপযোগী এবং গ্রহণযোগ্য বর্ষপঞ্জী প্রবর্তনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন, যেখানে দিন ও মাসের হিসাবটা যথাযথ থাকবে। এ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে তিনি তৎকালীন বিখ্যাত বিজ্ঞানী ও জ্যোতির্বিদ আমীর ফতুল¬াহ শিরাজীকে নতুন বর্ষপঞ্জী তৈরির দায়িত্ব প্রদান করেন। বিখ্যাত প-িত ও সম্রাট আকবরের মন্ত্রী আবুল ফজল এ সম্বন্ধে ব্যাখ্যা প্রদান করেন যে, হিজরী বর্ষপঞ্জী কৃষিকাজের জন্য মোটেই উপযোগী ছিলো না কারণ চন্দ্র বছরের ৩১ বছর হয় সৌর বছরের ৩০ বছরের সমান। চন্দ্র বছরের হিসাবেই তখন কৃষকশ্রেণীর কাছ থেকে রাজস্ব আদায় করা হতো অথচ চাষবাস নির্ভর করতো সৌর বছরের হিসাবের উপর। চন্দ্র বছর হয় ৩৫৪ দিনে। সেখানে সৌর বছর ৩৬৫ বা ৩৬৬ দিনে। ফলে দুটি বর্ষপঞ্জীর মধ্যে ব্যবধান থেকে যায় বছরে ১১ বা ১২ দিন। বাংলা সনের জন্ম ঘটে সম্রাট আকবরের এই রাজস্ব আদায়ের আধুনিকীকরণের প্রেক্ষাপটে।

তারিখ-এ-এলাহীর বারো মাসের নাম ছিলো কারবাদিন, আর্দি, বিসুয়া, কোর্দাদ, তীর, আমার্দাদ, শাহরিয়ার, আবান, আজুর, বাহাম ও ইস্কান্দার মিজ। কারো পক্ষে আসলে নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয় কখন এবং কিভাবে এসব নাম পরিবর্তিত হয়ে বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র, আশ্বিন, কার্তিক, অগ্রহায়ণ, পৌষ, মাঘ, ফাল্গুন ও চৈত্র হয়। অনুমান করা হয়, বারোটি নক্ষত্রের নাম নিয়ে পরবর্তীতে নামকরণ করা হয় বাংলা মাসের। বিশাখা নক্ষত্র থেকে বৈশাখ, জায়ীস্থা থেকে জ্যৈষ্ঠ, শার থেকে আষাঢ়, শ্রাবণী থেকে শ্রাবণ, ভদ্রপদ থেকে ভাদ্র, আশ্বায়িনী থেকে আশ্বিন, কার্তিকা থেকে কার্তিক, আগ্রায়হন থেকে অগ্রহায়ণ, পউস্যা থেকে পৌষ, ফাল্গুনী থেকে ফাল্গুন এবং চিত্রা নক্ষত্র থেকে চৈত্র।

পয়লা বৈশাখ বা বাংলা নতুন বছর উদযাপন প্রথাটাও কিন্তু আকবরেরই তৈরি। আকবরের সময়ে তার প্রবর্তিত ১৪টি উৎসব পালিত হতো মহাসমারোহে। তার মধ্যে একটি ছিলো নওরোজ বা নববর্ষ উৎসব। মজার ব্যাপার হলো, এই নওরোজ বা নববর্ষ উদযাপন অনুষ্ঠানেই রাজপুত্র সেলিম (পরে সম্রাট জাহাঙ্গীর) মেহেরুন্নেছার (ইতিহাসে নূরজাহাজ নামে খ্যাত) প্রেমে পড়েন। এরকম আরেকটি নববর্ষের উৎসবে রাজপুত্র খুররম ( পরে সম্রাট শাহজাহান) খুঁজে পান তার জীবনসঙ্গিনী মমতাজ মহলকে, যার জন্যে তিনি নির্মাণ করেন জগদ্বিখ্যাত তাজমহল। যদি এই নববর্ষ উৎসব না থাকতো, তাহলে আমরা হয়তো নূরজাহানকেও পেতাম না, বিশ্বের বিস্ময় তাজমহলও পেতাম না।


ভোট দেয়া এটি রাষ্ট্রিয় ভুল


আমাদের সামনে দুটি পথ দৃশ্যমান হয়ে আছে বেশ কিছুদিন যাবত, এক, রাজনৈতিক সৈরতন্ত্র, দুই, সামরিক সৈরতস্ত্র। মানুষের আর কোন পথ খোলা নেই এই দুটো অবস্থা ব্যতীত। তাই বার বার মানুষ সেই দিকেই গেছে আর বার বার প্রতারিত হয়েছে, মানুষ তার ভেতরকার ক্ষমতা কাছে লাগাবার উপায় বেড় করতে পারেনি, সেই জন্য সাধারণ মানুষের উপর দায় বর্তায় আর সেই দায় নিয়ে মানুষ তার জীবনযাপনে অভ্যাস্ত হয়ে পড়েছে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে এর থেকে কি বেড় হবার কোন পথ নেই ? আমাদের লক্ষ মানুষের প্রাণের বিনিময়ে দেশ স্বাধীন হয়েছে, মানুষ আশা বেধেঁছে এই ভেবে যে, নতুন পতাকা নতুন রাষ্ট্র নিজের লোক দ্বারা শাসিত হবে দেশ তাই সকল গ্লানী মুছে নতুনের স্বপ্ন দেখলো মানুষ। সাধারণ মানুষ অত গভীর রাজনীতি বোঝেনা তাই বুঝে উঠতে পারেনি দেশ পাকিস্তানের খপ্পর থেকে ভারতের খপ্পরে পড়েছে, অনেক শিক্ষিত লোক এই স্বাধীনতাকে বেহাত বিপ্লব বলেছে, মানুষ তখনও বুঝে উঠেনি বেহাত বিপ্লবটা কি। সাধারণ মানুষ জীবন দিয়েছে দেশ রক্ষা করার জন্য দেশের আগামী সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য রক্ত দিয়েছে তাই তাদের মাথায় বেহাত বিপ্লবের কথা মাথায় আসেনি।  কষ্ট করে দেশ স্বাধীন হয়েছে তা বেহাত হবে তা কখনও কল্পনা করেনি। কিন্তু যারা দেশ স্বাধীন করার দায়িত্বে নিয়েছিলেন তারা এই বেহাত হওয়া থেকে দেশ থেকে উদ্ধার করতে পারেনি।
তেমনি পটপরির্বতন ঘটল একাধিকবার কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটেনি বরঞ্চ আরো খারাপের দিকে গেছে দিনের পর দিন। নানান অবস্থায় পটপরিবর্তনের যে ঘটনাগুলো ঘটেছে তা মূলত গোষ্ঠি ভিক্তিক অর্থনৈতিক লুটপাটের জন্য, এতে সাধারনের অংশগ্রহন থাকলেও সাধারণ মানুষ সেই সকল লুটেরাদের হয়ে কাজ করেছে মাত্র। মজার ব্যাপার হলো এই সবই হয়েছে গণতন্ত্রের নামে।
আসলে গণতন্ত্রটা কি বাংলাদেশের মানুষের কাছে কোন আদর্শিক উদাহরন ছিলোনা তাই বোধ হয় মানুষ এই বিকৃত গনতন্ত্রের পিছোনে ছুটেছে বার বার, ৯০ সালের আন্দোলনকে মানুষ তার নিজের আন্দোলন মনে করেছে। তাই মানুষ ভেবেছে এবার বুঝি দেশের স্বাধীনতার ফসল ঘরে তুলতে পারবে, একটা ভোটের ব্যবস্থা হয়েছে যা মানুষ তার মতামত টা জানান দিতে পারে, কিন্তু মানুষ এটা ভাবেনি এরশাদের সৈরতন্ত্রের চেয়ে খালেদা হাসিনার গণতন্ত্র কোন অবস্থায়ই ভিন্ন নয়। দেশের যে চেহারা ছিলো তাই আছে লুটেরা গোষ্টিগত পরিবর্তন হয়েছে কবছর জাতীয়তাবাদী গোষ্টি লুটপাট করার জন্য লাইসেন্স পায় আবার ক‘বছর আওয়ামী গোষ্টি লুটপাট করার লাইসেন্স পায়। এর বাহিরে জনমানুষের কোন সিকি ভাগ কল্যাণ সাধিত হয়নি গণতন্ত্রী লেবাসী রাজনৈতিক গোষ্টি দ্বারা।
এখন আবার মানুষ নানান খেলা দেখছে, সাধারণের জীবন অতিষ্ট, খেটে খাওয়া মানুষের কাজ নেই, সাধারণ চাকুরেরা ধার দেনায় র্জজরিত। দুই গোষ্টি মজার গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য মরিয়া, মূলত যার যারমত গণতন্ত্র প্যাকেজ বাস্তবায়নের নানান খোয়াব দেখায় আমাদের আর সেই সাথে তাদের স্বার্থের প্রতি আমাদের আকৃষ্ট করার নানান মানবিক খেলায় মেতে উঠে তাই মানুষের সমর্থনের পরিবর্তন ঘটে।
দুই গোষ্টি গণতন্ত্রের নামে যা করে তার উপযুক্ত মঞ্চ হচ্ছে জাতীয় সংসদ, কার্ল মার্কসের ভাষায় (শুয়োরের খোয়ার) যে যেভাবেই বলুন না কেন কার্ল মার্কসের এই কথাটি আমাদের জাতীয় সংসদের জন্য হাজার ভাগ সত্য। গত ৯১ থেকে আজবোধী আমাদের জাতীয় সংসদের জন কল্যানের উল্লেখযোগ্য কোন অবদানের কথা হলফ করে বলা যাবে যে সেই সংসদটি কল্যাণকর ছিলো, সাধারণ মানুষের আর্থসামাজিই উন্নয়নে যথেষ্ট ভুমিকা রেখেছে কিংবা সেই সংসদ আমাদের জন্য এমন কিছু করেছে যে মানুষের খাবারের জন্য রাস্তায হাত পাততে হয়না। এমন কোন কিছুই ঘটেনি। আমরা দেখেছি এক গোষ্টি অন্য গোষ্টিকে গালাগাল দেয়ার জন্য জাতীয় সংসদকে উপযুক্ত স্থান হিসেব নিয়েছে আর গোষ্টির স্বার্থ রক্ষার জন্য নতুন নতুন আইন (ফন্দি) তৈরী করেছে যার সাথে সাধারণের ভাগ্যন্নয়নে কোন ভুমিকা নেই।
একজন সংসদ সদস্য হতে কোটি কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রয়োজন পরে সেই জন্য সুবিধাভূগী ব্যবসায়ী গোষ্টি এখন সংসদ সদস্যের সিংহভাগ স্থান দখলে।
নতুন আরেকটি কালচার দাড়িয়েছে সংসদ বর্জন, দুই গোষ্টি কি কারণে সংসদ বর্জন করেন তার উপযুক্ত কোন কারণ নেই অথচ বিগত তেইশ বছর ধরে এটা সংসদীয় কালচারে রূপান্তর হয়েছে, এই বর্জনের জন্য কোন জবাবদেহী করতে হয়না বলেই আজ সংসদের গুরুত্ব মানুষের কাছে নেই বললেই চলে।
তবে আমরা সাধারণ মানুষ কেন তাদের বর্জন করিনা, আর কতদিন এভাবে সহ্য করবো। নতুনর কেতন উড়ার জন্য যদি আমরা আবারও ভোটের দিন সেই ভুলটি (ভোট দেয়া এটি রাষ্ট্রিয় ভুল) করি তাহলে আমরা আর কোনদিন ফিরতে পারবোনা। এখনই আওয়াজ উঠাই তোমাদের ভোটে আমরা অংশ নিব না। আমরা আমাদের রাষ্ট্র পরিচালনর  জন্য অবশ্যই একটি কিছু করবো তবে ভোট দেব না।

Monday, February 25, 2013

হুমায়ূন আহমেদের মুক্তিযুদ্ধ ভাবনা প্রসঙ্গ


‘জোছনা ও জননীর গল্প’ শীর্ষক উপন্যাসের ‘পূর্বকথা’য় নন্দিত নরকের স্রষ্টা ড. হুমায়ূন আহমেদ লিখেছেন : ‘আমার সাজানো অতি পরিচিত ভুবন পুরোপুরি ভেঙ্গে পড়ল ১৯৭১ সনে। যে পরিস্থিতিতে আমি পড়লাম, তার জন্যে কোনো রকম প্রস্তুতি আমার ছিল না। ছায়াঘেরা শান্ত দিঘির একটা মাছকে হঠাৎ যেন নিয়ে যাওয়া হলো চৈত্রের দাবদাহে ঝলসে যাওয়া স্থলভূমিতে। কত বিচিত্র অভিজ্ঞতা! ভাইবোন নিয়ে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় পালাচ্ছি। জীবন বাঁচানোর জন্যে মাদ্রাসার ছাত্র হিসেবে ভর্তি হতে গেছি শর্ষিণার পীর সাহেবের মাদ্রাসায়। পাকিস্তান মিলিটারি মাথায় গুলির বাক্স তুলে দিয়েছে। অকল্পনীয় ওজনের গুলির বাক্স মাথায় নিয়ে সৈন্যদের সাথে বারহাট্টা থেকে হেঁটে হেঁটে এসেছি নেত্রকোনা পর্যন্ত। মিলিটারির বন্দিশিবিরে কাটল কিছু সময়। কী ভয়ঙ্কর অত্যাচার! এক সকালে মিলিটারিদের একজন এসে আমার হাতে বিশাল সাইজের একটা সাগরকলা ধরিয়ে দিয়ে বলল, তোমাকে কাল সকালে গুলি করে মারা হবে। এটা তোমার জন্যে ভালো। যদি তুমি নিরপরাধ হও, সরাসরি বেহেশতে চলে যাবে। আর যদি অপরাধী হও, তাহলে মৃত্যু তোমার প্রাপ্য শাস্তি।’ (ঢাকা: অন্য প্রকাশ, ২০১০)।
মুক্তিযুদ্ধের সময় পরিবারের অন্যদের নিয়ে ‘এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায়’ পালিয়ে চলার এবং ‘শর্ষিণার পীরের মাদ্রাসায়’ ভর্তি হতে যাওয়ার ঘটনা হুমায়ূন আহমেদ বিস্তারিতভাবে লিখেছেন অনন্ত অমরে  শীর্ষক স্মৃতিকথায় (ঢাকা : কাকলী প্রকাশনী, ২০১২) এবং সংক্ষেপে বলেছেন পাক্ষিক অন্যদিন পত্রিকায় (ঢাকা : ১-১৫ নভেম্বর ২০০১) এক সাক্ষাৎকারে। পিরোজপুরের গোয়ারেখা নামের এক অজপাড়া গাঁয়ের এক মাওলানা সাহেবের বাড়িতে তারা আশ্রয় পেয়েছিলেন।
মিলিটারির হাত থেকে রক্ষার জন্য সেই মাওলানা সাহেব বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া দুই ভাই ড. হুমায়ূন আহমেদ ও ড. জাফর ইকবালকে টুপি-পাঞ্জাবি পরিয়ে শর্ষিণা মাদরাসার ছাত্র হিসেবে ভর্তি করার জন্য তৎকালীন পীর সাহেব মাওলানা আবু জাফর মোহাম্মদ সালেহর বাড়ি নিয়ে গিয়েছিলেন। পীর সাহেব তাতে সেই মাওলানার ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে ভর্তি না করে তাদের ফেরৎ পাঠিয়েছিলেন।
নেত্রকোনায় মিলিটারির বন্দীশিবিরে হুমায়ূন আহমেদ এবং অন্য বাঙালি যুবকেরা মিলিটারির দ্বারা যে নির্যাতনের শিকার হন, সেটিকে তিনি এক কথায় ‘মেরে তক্তা বানানো’ বলেছেন (পাক্ষিক অন্যদিন, ১ নভেম্বর ২০০১)। মিলিটারির সেই বন্দীশিবির থেকে সম্ভাব্য মৃত্যুর কিছু আগে তার এক আত্মীয়ের হস্তক্ষেপে ছাড়া পান তিনি। তার পিতা তৎকালীন পুলিশের এসডিপিও ফয়জুর রহমান আহমেদ পিরোজপুরে মিলিটারির হাতে শহীদ হন।
১৯৯৪ সালে ‘রচিতব্য শ্রেষ্ঠ লেখা’ বিষয়ে বাংলা সাহিত্যের এক অধ্যাপক শাহজাহান মিয়াকে হুমায়ূন আহমেদ বলেছিলেন : “আমার সেই লেখার বিষয়বস্ত হইবে মহান স্বাধীনতাযুদ্ধ। আমি বড় ধরনের কাজ করিতে চাই। এই জন্য আরো সময় দরকার। এই তো মাত্র দেশ স্বাধীন হইল, রক্তের দাগ এখনো শুকায় নাই। এত বড় ঘটনার বিষয়ে মহৎ কিছু সৃষ্টির সময় এখনো আসে নাই। নেপোলিয়নের রুশদেশ আক্রমণের শতাধিক বছর পর ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’-এর মতো মহৎ সাহিত্য সৃষ্টি হইয়াছে। আমাদের অপেক্ষা করিতে হইবে। এখন এই বিষয়ে লেখার কিছু সমস্যাও আছে। যেমন আমার বাবা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করিয়া পাকবাহিনীর হাতে নির্মমভাবে শহীদ হইয়াছেন। আমার নানা পাকবাহিনীর দোসর হইয়া এলাকার বহু নিরীহ মানুষকে নির্যাতনের হাত হইতে বাঁচাইয়া দিয়াছেন। আমি কাহাকে খাটো করিয়া দেখিব? কাহাকে রাখিব, কাহাকে ফেলিব? ভাবিবার অনেক কিছু আছে।” (ঢাকা : দৈনিক কালের কণ্ঠর ম্যাগাজিন শিলালিপি, পৃ-১০, ১৬ নভেম্বর ২০১২)।
কবি-ঔপন্যাসিক ডা: বুলবুল সরওয়ার লিখেছেন :“তার শেষের দিকের লেখায় তিনি হয়ে উঠেছিলেন ইতিহাসের ভাষ্যকার; বিদ্রƒপ হয়ে উঠেছিল কলমের আঁচড়। হয়তো চেয়েছিলেন, আমাদের হবুরাজা আর গবুমন্ত্রীরা চল্লিশ বছরেও যে ফুটোগুলো দেখতে পাননি (বন্ধ করতে যাওয়াতো পরের কথা), সেগুলো যেন সাধারণ মানুষের নজরে আসে। যেমনÑ তার একটা সিনেমার শেষ দৃশ্যে তিনি যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমা চাওয়া দেখিয়েছিলেন। অতি সহজ সমাধান। জাতিকে আবারো যুদ্ধে ঠেলে না দেয়ার এই স্বতঃস্ফূর্ত অভিনয় দেখে আমার ‘জুতা আবিষ্কার’ কবিতার কথা মনে পড়ে যায়। রবিঠাকুরের এসব কবিতা নিয়ে সমকালে প্রবল ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপ হয়েছে। হুমায়ূনের ক্ষেত্রে তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। কিন্তু এই সহজ সমাধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যেমন বুঝেছিলেন, হুমায়ূন আহমেদও বুঝেছেন এবং বোঝাতে পেরেছেন; যদিও বুঝতে পারেননি অপরাধীরা এবং রাজনীতির কুশীলবেরা। ফলে যা ঘটছে এবং ঘটবেÑ পাঠকরা তা দেখতে পাচ্ছেন।” (ঢাকা : দৈনিক নয়া দিগন্তের মাসিক ম্যাগাজিন ‘অন্য এক দিগন্ত’ পৃ:-৩৬-৩৭, আগস্ট-২০১২)।
স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ শক্তিবিষয়ক এক প্রশ্নের জবাবে হুমায়ূন আহমেদ ২০০১ সালেই বলেছিলেন : “আমি নিজেও মনে করি এতদিন পরেও কেন পক্ষশক্তি বিপক্ষশক্তির এই বিভাজন? তার পরেও কথা থাকে। মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা সরাসরি বিপক্ষ শক্তি হিসেবে কাজ করেছেন তারা কি বিভেদটা ভুলছেন? তারা কি কখনো তাদের কৃতকর্মের জন্যে দেশ এবং জাতির কাছে ক্ষমা চেয়েছেন?” (পাক্ষিক অন্যদিন, ঢাকা-১ নভেম্বর, ২০০১)।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালে হুমায়ূন আহমেদের অবস্থা, এ বিষয়ে তার মূল্যায়ন ও দৃষ্টিভঙ্গি বিষয়ে উল্লিখিত উদ্ধৃতিগুলো থেকে জানা যায়। এখানে কয়েকটি বিষয় বিবেচনার দাবি রাখে। এক. পাকিস্তানি মিলিটারি নির্বিচারে সীমাহীন নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে। দুই. বাংলাদেশের মানুষেরা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে যেমন অংশ নিয়ে নানামাত্রিক ত্যাগ স্বীকার করেছে, তেমনি অনেকে এ মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাও করেছেন। যারা এ যুদ্ধের বিরোধিতা করেছেন বা পাকবাহিনীর দোসর হিসেবে কাজ করেছেন, তারা সবাই একই দৃষ্টিভঙ্গির মানুষ ছিলেন না এবং সবাই নারী-শিশু-বৃদ্ধ হত্যাসহ অপরাধমূলক কার্যক্রমের অংশীদার ছিলেন না। দালাল-রাজাকারদের বেশির ভাগই পেটের দায়ে মিলিটারির দোসর হয়েছেন। আবার অনেকে শুধুই এলাকার মানুষকে পাকবাহিনীর নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষার জন্য প্রকাশ্যে মিলিটারির দোসর সেজেছেন। ড. হুমায়ূন আহমেদের নানা এবং মামা এ ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ উদাহরণ। তারা এলাকার নিরীহ মানুষকে মিলিটারির নির্যাতন থেকে রক্ষার জন্য শান্তি কমিটির নামে কাজ করেছেন। কিন্তু তাদের দু’জনকেই ১৬ ডিসেম্বরের (১৯৭১) পরে মুক্তিবাহিনী নির্মমভাবে হত্যা করে। এ সত্য ড. হুমায়ূন জানতেন এবং বুঝতেন বলেই বঙ্গবন্ধুর নীতির ভিত্তিতে তিনি খুন-ধর্ষণ-জ্বালাও কার্যক্রমের জন্য অভিযুক্তদের বাইরে সবাইকে ক্ষমা করার পক্ষে ছিলেন। যারা পেটের দায়ে দালাল হয়েছিলেন, যারা এলাকাবাসীকে রক্ষার জন্য দালাল হয়েছিলেন এবং যে দালালেরা খুন-ধর্ষণ-জ্বালাও কর্মের অপরাধী নন, তাদের বিষয়ে বঙ্গবন্ধু এক দূরদর্শী শাসকের মতোই ক্ষমা করে দিয়েছিলেন।
বাংলাদেশে ‘ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি’ নামে একটি সংগঠন রয়েছে। এর সাথে অনেক দায়িত্বশীল ব্যক্তি যুক্ত বলে দেখা যায়। একাত্তরে যারা ঘাতকের ভূমিকা পালন করেছেন, উপযুক্ত প্রমাণসাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার বিরোধিতা করার সুযোগ নেই। কিন্তু ঘাতকদের সাথে একই সারিতে দালালদের দাঁড় করানো গুরুতরভাবেই অগ্রহণযোগ্য এবং সেটি হবে জাতীয় স্বার্থবিরোধী একটি জঘন্য উদ্যোগ। কারণ ১৯৭২ সালে ‘দালাল আইনের’ আওতায় অসংখ্য মানুষকে চিহ্নিত করার সুযোগ ছিল; একটি গ্রন্থ আমাকে এ বিষয়ে নির্দিষ্টভাবে বুঝতে সাহায্য করেছে। ‘বাংলাদেশের রাজনীতিতে আলেমসমাজ : ভূমিকা ও প্রভাব (১৯৭২-২০০১)’ (ড. তারিক মুহম্মদ তওফীকুর রহমান, ঢাকা : অ্যাকাডেমিক প্রেস অ্যান্ড পাবলিশার্স লাইব্রেরি, দ্বিতীয় সংস্করণ, ২০০৮) শীর্ষক বইটির পরিশিষ্টে ৩টি সংশোধনীসহ দালাল আইনের পূর্ণ পাঠ দেয়া আছে। দালালের (কোলবরেটর) সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি কাজে লেখায়-বক্তৃতায় আচরণে মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তান, পাকবাহিনী ও তার দোসরদের সাহায্য ও সমর্থন করেছেন তিনিই দালাল। এই বহু-ব্যাপক সংজ্ঞার ফলে সেই দালাল আইনটি অনেকের জন্য ব্যক্তিগত গোষ্ঠীগত দলীয় প্রতিহিংসা পূরণের মোক্ষম হাতিয়ারে পরিণত হয় আর এ আইনের নানামাত্রিক অপব্যবহার করা হয়। এ বাস্তবতা অনুধাবন করেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ১৯৭৩ সালের ৩০ নভেম্বর খুন-ধর্ষণ-জ্বালাও অভিযোগে অভিযুক্ত না হলে সব দালালের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন।
বঙ্গবন্ধু যেখানে ‘সাধারণ সব দালালের’ জন্য সাধারণ ক্ষমার ব্যবস্থা করেছেন, বঙ্গবন্ধুর অনুসারী হিসেবে পরিচয় দানকারী কিছু লোক ‘দালালদের নির্মূল’ করার কমিটি করে আন্দোলন করছেনÑ এটা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। বরং তা প্রতিরোধযোগ্য একটি বিষয়। কারণ বঙ্গবন্ধু সেই সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছিলেন বাঙালি জাতির বৃহত্তর সংহতি, ঐক্য ও সমৃদ্ধির স্বার্থে। এখন সেই ঘোষণার বিরোধিতার সহজ অর্থ বঙ্গবন্ধুকে অবজ্ঞা করা, অপমানিত করা এবং বাঙালি জাতির বৃহত্তর সংহতি, ঐক্য ও সমৃদ্ধির বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। একাত্তরের ঘাতকের বিরুদ্ধে দাঁড়ান, আপত্তি নেই, একাত্তরের দালালদের বিরুদ্ধে নয়। কারণ তাদের অধিকাংশই প্রধানত পরিস্থিতির শিকার ও নিরপরাধ সাধারণ মানুষ।
তিন. ড. হুমায়ূন আহমেদ মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিকারীদের জন্যও একটি সহজ করণীয় দেখিয়েছেন। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করার জন্য তাদের যদি ন্যূনতম গ্রহণযোগ্য কোনো কারণ থাকে তা জনতার উদ্দেশ্যে ব্যাখ্যা করা ও মুক্তিযুদ্ধকালে পাকবাহিনী ও তাদের দোসরদের দ্বারা সাধারণ দেশবাসী যে দুঃখ ও হত্যার শিকার হয়েছে তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা। এ কাজটি তারা কত সহজ ভাষায় ও সহজ প্রক্রিয়ায় করতে পারেন, তা তাদের বিবেচ্য। বঙ্গবন্ধুর নীতির অনুকরণ করে সাধারণ মানুষও তাদের হৃদয় থেকে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী দালালদের ক্ষমা করে দেবেন আশা করা যায়। বঙ্গবন্ধু জাতির বৃহত্তর যে স্বার্থের কথা বিবেচনায় রেখেছিলেন জাতি তার প্রতি সম্মান দেখাবে, আশা করি।

ড. আহমদ হাসান
তারিখ: ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩

লেখক : গবেষক, সমাজকর্মী, লন্ডন

Monday, February 11, 2013

বাংলা-বসন্ত :আসছে ফাল্গুনের আগাম ইশতেহার


এ তো রীতিমতো অরাজকতা। খোদ রাজধানী থেকে রাজনীতি/রাজতন্ত্র উঠে গেল নাকি? রাজার অনুমতি ছাড়াই সমাবেশ হচ্ছে দিব্যি। তাও আবার রাস্তা বন্ধ করে সমাবেশ। মানুষের চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি করা। সর্বনাশের কথা। উপরন্তু শাহবাগের সমাবেশ সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজনীতিকেরা সেখানে বক্তৃতা করতে পারবেন না। সাহারা খাতুন, শেখ হানিফরা বক্তৃতা করতে গিয়ে অপদস্ত হয়েছেন এরই মধ্যে। এই সমাবেশ তার মানে রাজনীতিবিরোধী। অরাজকতা ছাড়া কী?

'অরাজকতা' মানে 'রাজা'বিহীন বন্দোবস্ত। রাজা-রাজনীতি-হুজুর-হোমরা চোমরা ছাড়াই নিজেরা নিজেদেরকে পরিচালনা করার স্বকৃত বিন্যাস। এরই তো নাম অরাজকতা। এই সমাবেশের রাজনীতিবিরোধিতার ভেতরে সুপ্তভাবে হলেও আছে 'অরাজ'-এর ধারণা: অরাজনীতি, অরাজতন্ত্র। অন্য ভাষায় একেই বলে নৈরাজ্য। নৈরাজ্য মানে স্বাধীনতা। নৈরাজ্য মানে স্বনিয়ন্ত্রণ, আত্মনিয়ন্ত্রণ, আত্মকর্তৃত্ব। নৈরাজ্য মানে 'আমরা সবাই রাজা'। সুপ্ত এই উপাদানগুলো ক্রমশ স্পষ্ট ভাষায় যতো বেশি প্রকাশিত হয়ে উঠবে, শাহবাগ-সমাবেশ ততো বেশি এগিয়ে যাবে তাহরির স্কয়ারের দিকে। আরবিতে 'তাহরির' মানে কিন্তু 'স্বাধীনতা'ই বটে। শাহবাগ-চত্বর ঠিকই এগিয়ে চলেছে স্বাধীনতা-চত্বরের দিকে। নব্বুইয়ের শুরুতে আরম্ভ হওয়া আইনের শাসনের অগোছালো বোলচাল ১/১১-তে আইনের সুসংগঠিত বিভীষিকাপন্থার দাঁত-নখ-পেশী দেখিয়েছিল। তারই অনুরাগে (কিছু পরে কিছু আগে) কর্তৃপক্ষীয়, চাপিয়ে-দেয়া, শাসন প্রতিষ্ঠার প্রচারণা মাধ্যমে এতদিন শুনে আসলাম: 'আইন তার নিজের গতিতে চলবে'! এখন দেখছি খোদ 'আন্তর্জাতিক ট্রাইবুনাল'-এর আদেশ লোকে মানছে না। আদালতের জন্য লজ্জার কথা। এ তো রীতিমতো আদালত অবমাননা। এই ক'দিন আগেও যে-হাইকোর্টের হাইথট-ওয়ালা সব রুলজারির কথা শুনছিলাম, রেডিওতে কীভাবে বাংলা বলা হবে, হুমায়ূন আহমেদ কীভাবে উপন্যাস লিখবেন ইত্যাদি প্রভৃতি কিছুই বাদ যাচ্ছিল না আইনের সুদীর্ঘ হাতের নাগাল থেকে, সেই হাইকোর্ট এখন চুপচাপ। তাজ্জব বটে।

রাস্তায় সমাবেশ নাকি অবৈধ! রাস্তায় সমাবেশ করলে গাড়ি চলতে অসুবিধা হয়, পণ্য-পরিবহনে বিঘ্ন ঘটে। সেই রাস্তা অধিকার করে সমাবেশ চলছে দিনরাত ২৪ ঘণ্টা, লাগাতার। আশ্চর্য ব্যাপার। অধিক আশ্চর্যের ব্যাপার: বেয়াদব জনসাধারণ এই রাস্তা-অধিকার-করা আন্দোলন নিয়ে বিরক্ত হচ্ছেন না, মিডিয়ার কাছে নালিশ করছেন না, উল্টো বাড়ি থেকে ভাত এনে ছেলেমেয়েদের খেতে দিচ্ছেন। বাবা এগিয়ে দিচ্ছেন তার মেয়েকে। মা দোয়া করছেন ছেলের জন্য। বান্ধবী বন্ধুকে ফেসবুকে মেসেজ পাঠাচ্ছে: 'বাড়ি ছেড়ে পালালাম; শাহবাগে যাচ্ছি।'

আইনের শাসন আপাতত উধাও তাহলে! যেকোনো সমাবেশ করার জন্য, মাইক ব্যবহার করার জন্য, মেট্রেপালিটন পুলিশ কমিশনারের কাছে লিখিত আবেদন পেশ করতে হবে। তারপর তারা দয়া করে অনুমতি দেবেন (আদৌ যদি দেন)। কোথায় গেল সেইসব কর্তৃপক্ষীয়, চাপানো আইন-কানুন? আওয়ামী লীগের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী না হয় এই আন্দোলনে লাভবান হবেন ভেবে সৌজন্যবশত এর ওপরে মরিচের গুঁড়া ছিটাচ্ছেন না। কিন্তু 'জনদুর্ভোগ'! কোথায় 'প্রথম আলো'? কোথায় গেল তাদের এতোদিনকার প্রিয় এজেন্ডা? মানুষ এতো নির্লজ্জ হয়! না, হয় না। আসলে মানুষ এতো নির্লজ্জ হয় না: কিন্তু পুঁজি হয়, ক্ষমতা হয়, সার্কুলেশন হয়। ওগুলো আসলে মানুষ না, মনুষ্যোচিত না, মনুষ্যবান্ধব না। শাহবাগের সমাবেশ যতোদিন এসবের দিকে মন না দেবে ততোদিন আমাদেরকে কর্মময় অপেক্ষার উপাসনা করে যেতে হবে বৈকি। আপাতত পুলিশ-র্যাবের পাহারা আর মিডিয়ার অতি-তেলে তৈলাক্ত হওয়ার বিপদ সম্পর্কে আমাদেরকে সতর্ক থাকতে হবে কিন্তু।


আইনত এখনও মাঘ মাস, শীতের রাজত্ব। তবু বেআইনত যে ফাল্গুনের হাওয়া বইতে শুরু করেছে! বোঝা যাচ্ছে, মানুষ রাস্তায় নামলে সব কিছু বদলে যায়। বিচারবিভাগ দুশ্চিন্তায় পড়ে। পুলিশবিভাগ রুটিন দায়িত্বের বাইরে বেরুনোর আগে ভাবে। মিডিয়া একটা অরাজক আন্দোলনকে কাভার করার জন্য রাত জাগে। আর রাজনীতিবিদেরা ভাবতে থাকেন: আমাদের দিন কি ফুরিয়ে যাবে? এইসব বাচ্চা কাচ্চারা সময়মতো দুধভাত খেতে ঘরে ফিরবে তো? আসলে দশচক্রে ভগবান ভূত। দশ যেখানে, ভগবানও সেখানে। বহুমত আর বৈচিত্র্যই এই আন্দোলনের শক্তি। সেজন্যেই এর মধ্যে রাজনীতিকরা ঢোকার চেষ্টা করছেন। একটু-আধটু ঢুকেও পড়ছেন রাষ্ট্রক্ষমতার জোরে। তারা নিজেরা যদি এরকম সমাবেশ ডাকতেন, দলীয় কর্মীরা ছাড়া কেউই আসতেন না, সে কথা সবারই জানা। সেজন্যই তরুণদের প্রাণবন্ত সমাবেশে সরীসৃপের মতো ঢুকছে রাজনীতি। ঢুকছে ষড়যন্ত্রও। ষড়যন্ত্রকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যেতে হলে শাহবাগ-সমাবেশকে ইতোমধ্যে বিদ্যমান বহুমত-বৈচিত্র্য-রাজনীতিবিরোধিতা ধরে রাখার পাশাপাশি আনুভূমিক ও গণতান্ত্রিক নতুন সাংগঠনিক কাঠামো এবং নতুন ভাষা সৃজন করতে পারতে হবে। এটাই তাদের জন্য আসল চ্যালেঞ্জ। রাস্তায় এতদিন শুধু জামায়াত ছিল। তাদের পেট্রো-ডলারের দাপট ছিল। কালো টাকায় কেনা, কালো টাকায় ভাড়া করা অস্ত্র এবং অস্ত্রধারী ছিল। কাঁচের শিশির পেট্রোলবোমা ছিল। এখন নিরস্ত্র-কিন্তু-স্বপ্নসশস্ত্র মানুষও রাস্তায় নেমেছেন। আনন্দ সংবাদ।

রিকেইম দ্য স্ট্রিট!': ইঙ্গ-মার্কিন-ইউরোপীয় মুলুকে আমাদের লড়াকু তরুণদের বহুদিনের আদরের শ্লোগান। ষাট-সত্তর দশকের ইউরোপ-জোড়া প্যারিস-বসন্ত থেকে শুরু করে শ্রমচোষা-রক্তচোষা মালিকদের হাত থেকে শিক্ষার্থী-শ্রমিকদের কলকারখানা-পুনর্দখল-আন্দোলন আর প্রশাসক-প্রফেসরদের হাত থেকে ক্যাম্পাস কব্জা করার আন্দোলন; বর্ণবাদ-পুরুষতন্ত্র-শ্রেণিবৈষম্যবিরোধী আন্দোলন, প্রকৃতি পুনরুদ্ধারের আন্দোলন; আশির দশকের যুদ্ধবিরোধী-আগ্রাসনবিরোধী-পরমাণু অস্ত্রবিরোধী আন্দোলন; নব্বুইয়ে এবং তার পরের দশকে পুঁজির বিশ্বায়নের বিরুদ্ধে সিয়াটল-জেনোয়া-কানকুনের আন্দোলন আর আফগানিস্তান-ইরাক-যুদ্ধের বিরুদ্ধে আন্দোলন; এবং তারপর এই একুশ শতকে এসে লন্ডনে ছাত্রবেতনবিরোধী শিক্ষার্থী-আন্দোলন ও ইঙ্গ-মার্কিন-ইউরোপ-জোড়া পুঁজিবাদবিরোধী অকুপাই-মহাআন্দোলন: এই সমস্ত আন্দোলনের প্রধানতম আইডিয়া এবং শ্লোগান ছিল 'রিকেইম দ্য স্ট্রিট!'

না, রাজপথ দখল নয়: রাস্তার জনমালিকানা নতুন করে প্রতিষ্ঠা করা। রাজপথ তো রাজার। রাজা যায়, রানি যায়, বাঁশি বাজে, পথিক আটকে থাকে, পাজেরো ছোটে প্রাসাদের দিকে। আর রাস্তা মুসাফিরের। রাস্তা পথিকের। রাস্তা অনুসন্ধানের। সেই রাস্তার পুনঃমালিকানা দাবি করেছে শাহবাগের সমাবেশ।

বিগত কুড়ি বছর ধরে আমাদেরকে শেখানো হচ্ছে, মিডিয়া-মুখস্ত করানো হচ্ছে:পার্লামেন্টই সকল সমস্যার সমাধানের উত্স। পার্লামেন্টে যে নাই, আইনত সে নাই। সে অস্তিত্বহীন: নন-এগজিস্টেন্ট। পার্লামেন্টারি-রাজনীতির ঘেরাটোপে গড়া এই আইনের শাসনের যুগে শাহবাগ-মহাসমাবেশে আনুষ্ঠানিকভাবে পাঠ করা শপথ অনুযায়ী রাস্তায় আন্দোলন হবে 'গণমানুষের নেতৃত্বে'। হায়, হায়। পার্লামেন্টের কী হবে? বাংলাদেশের নিওলিবারাল পুঁজির উচ্ছিষ্টভোজীদের কী হবে? 'প্রথম আলো'র সুশীল সমাজের কী হবে?

হ্যাঁ,তারা চাইবেন এই সমাবেশ শুধু আওয়ামী-ক্যাম্পের সংকীর্ণ রাজনৈতিক এজেন্ডা পূরণ করে সুশীল বালক-বালিকার মতো ঘরে ফিরে যাক। তারা চাইবেন: এই সমাবেশ শুধু ফাঁসি ফাঁসি করেই চিল্লাক। তারা চাইবেন: এই সমাবেশ ১৯৭১-এর চেতনায় 'জনগণের / জনগণের-জন্য / জনগণের-দ্বারা' পরিচালিতব্য বাংলাদেশের রূপরেখা নিয়ে মনোনিবেশ না করুক। কিন্তু সেটুকু করতে না-পারলে স্রেফ গুটিকয় রাজাকারের ফাঁসি দিতে পারলেই কি একাত্তরের কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ পাবো আমরা, একাত্তরেরই ঘোষণা মোতাবেক যে বাংলাদেশের মালিক এদেশের জনসাধারণ? সুতরাং শাহবাগ-সমাবেশকে ভাবতে হবে নতুন ধারার, সত্যিকারের গণমুখি সংগঠন-সংস্থা-সংঘ-সমিতি-প্রতিষ্ঠান-সমাজ-বিন্যাস-কাঠামো নিয়ে। আজ শুধু এটুকু উচ্চারণ করে রাখি: মুখস্ত শ্লোগান, গতানুগতিক আইডিয়া আর সংকীর্ণ কথাবার্তার মধ্যে নিজেদেরকে পরিসীমিত করে রাখলে আমরা সরকার-স্পন্সরড, মিডিয়া-তেলে-তৈলাক্ত একটা অসার ফাঁসি-আন্দোলনে পর্যবসিত হবো মাত্র। তারপর ফাঁসি টাসি শেষ হয়ে গেলে ঘরে ফিরে দেখব আমাদেরই গলায় সেই চিরপুরাতন রাজনীতির ফাঁসটা লেগে আছে: নেতারা পার্লামেন্টের খোঁয়াড়ে চেঁচাচ্ছেন, পরস্পরকে খুন করছেন, সাগর-রুনির আত্মা হাহাকার করে চলেছে, ক্রসফায়ার-গুম-রিমান্ডের বিধান আরো বিকশিত হয়ে উঠছে। বাংলাদেশের গত ৪০ বছরের যে রাজনৈতিক অচলায়তন, সেটিকে ভেঙে দেশকে সত্যিকারের নতুন পথে এগিয়ে নিতে হলে, তরুণদেরকেই এগিয়ে আসতে হবে। কোনো পার্টি, কোনো মতাদর্শ-শাস্ত্র, কোনো সংসদ, কোনো আদালত, কোনো সশস্ত্রবাহিনী, কোনো রাজ-বুদ্ধিজীবীই এই সংকটের সমাধান ঘটাতে পারবে না। কেননা এঁরা সবাই মিলেই তো তিল তিল করে এই মহাসংকট, মহা-অচলাবস্থা তৈরি করেছেন।

পার্টিগুলো নিজেদের পেট-পকেট-প্রভুর দালালি করেছেন। মতাদর্শ-শাস্ত্রগুলো মানুষকে অন্ধ করেছে, বিভক্ত করেছে, মুক্ত ভাব বিনিময়ের অযোগ্য করে তুলেছে। সংসদ-সদস্যরা কোনোদিন নীতির পক্ষে, ন্যায়ের পক্ষে, বিবেকের পক্ষে দাঁড়াতে পারেননি; নমিনেশন কিনেছেন আর সরকারি তহবিল ও আপামর মানুষের কাছ থেকে মেরে-ধরে খাজনা আদায় করে নমিনেশনের টাকা পূরণ করার লুটপাট করেছেন। সংবিধান সমুন্নত রাখার শপথ গ্রহণ করা আদালত বারবার আমাদের মহাসংকটে ঠুঁটো জগন্নাথের মতো পাথর হয়ে থেকেছেন। বৈধতা দিয়েছেন একের পর এক স্বৈরতন্ত্রকে বন্দুকের ভয়ে। বিবেকের ভয় তাদের ছিল না। এই সেদিনের ১/১১-তেও তারা একই কাজ করেছেন নির্লজ্জের মতো। আর সশস্ত্রবাহিনী একের পর এক অভ্যুত্থান, রক্তপাত, মারামারি, হানাহানি, মিথ্যাবিচার, গণফায়ারিং স্কোয়াড, উপর্যুপরি সামরিক শাসন জারি করে গণতন্ত্রের সর্বনাশ করেছেন, মানুষের জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছেন স্রেফ ভয় দেখিয়ে, বন্দুকের জোরে। তো, আজকে বিপুলতম আকার ধারণ করা এই সর্পিল, পিচ্ছিল, প্যাঁচানো, কর্দমাক্ত মহাসংকটটা যারা নিজেদের হাতের বানিয়েছেন, আর যাই হোক সেই সব লোক-মত-ধারা এই সর্বগ্রাসী সংকটের সমাধান করতে পারবে না। এটা কমনসেন্স।

সংকট সমাধান করবেন কে তাহলে? করবেন তারাই যাঁরা এই সংকটের শিকার হয়ে খাঁচাবন্দী হয়ে আছেন যুগ যুগ ধরে। এই খাঁচাবন্দী মানুষ, বিশেষত তরুণ প্রজন্ম এবার, ছোট ছোট জানালা খুলে ফেলেছেন প্রযুক্তির কল্যাণে। ইন্টারনেট, ফেসবুক, টুইটার, ব্লগ, নানান ওয়েবসাইট, গান, কবিতা, ছোটকাগজ, হাজারটা মিডিয়া এবং সর্বোপরি প্রেম-ভালোবাসা-ভাববিনিময়ের ভেতর দিয়ে তারা পরস্পরকে চিনছেন-জানছেন কোনো শাস্ত্র-মতাদর্শ ছাড়াই, অন্ধবিশ্বাস ছাড়াই, খোলামনে। তারা তর্ক করছেন, বিতর্ক করছেন, একমত হচ্ছেন, লাখো ধারায় কাজে নেমে পড়ছেন: কিছু না কিছু কাজ। আত্মপ্রকাশের আনন্দে তারা বিভোর হয়ে আছেন। আত্মপ্রকাশের এই আনন্দই স্বাধীনতা। সরকারি আইন-কানুনের বাইরে, সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণের বাইরে তারা ক্রমাগতভাবে আত্মকর্তৃত্বের-আত্মমর্যাদার রূপকাঠামো-বিন্যাসের কল্পনা করতে শুরু করেছেন ইতোমধ্যেই। জেগে উঠতে শুরু করেছে বাংলাদেশ। স্বাধীনতার স্বাদ পেতে শুরু করেছে বাংলাদেশ। এই জাগরণেরই প্রথম, বৃহত্ ঝাপ্টা এসেছে আজ শাহবাগে ফাল্গুনের ঈষদুষ্ণ বাতাসের রঙ মনে মেখে। ফাল্গুন আমাদের চিরকালের দ্রোহ আর প্রেমের পয়গাম। নতুন এই বাংলাদেশের প্রায় সক্কলেই রাজনীতিবিরোধী। রাজনৈতিক দলকে তারা আর বিশ্বাস করেন না। পার্লামেন্টকে তারা বিশ্বাস করেন না। আদালতের স্বচ্ছতা নিয়ে তারা সদাসন্দিহান। পুলিশ-র্যাব-সেনাবাহিনীকে দেখলেই তারা ভয় পান: এই বুঝি কোনো অঘটন ঘটে। মিডিয়াকে তারা সংকীর্ণ স্বার্থের ভাণ্ডারি মনে করেন। মুখস্ত বুলি আওড়ানো বুদ্ধিজীবীদেরকে মনে করেন বাঁচাল, দালাল। পুরানো বাংলাদেশের দিন শেষ। একাত্তরের রক্তসূর্য যে নতুন বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতি নিয়ে উদিত হয়েছিল, সেই বাংলাদেশকে আগাগোড়া ঢেলে সাজিয়ে নতুন বাংলাদেশের বিন্যাসের ছবি আঁকার এটাই সময়।

বছরের পর বছর ধরে কবি-সাহিত্যিক লেখক শিল্পী চলচ্চিত্রকর্মী-নির্মাতা ছোটকাগজকর্মী প্রকাশনাকর্মী ব্লগার ইন্টারনেট-অ্যাকটিভিস্ট ওয়েবসাইট-ডিজাইনার স্থপতি ভাস্কর ফটোগ্রাফার সাংবাদিক কম্পিউটার-বিজ্ঞানী সফটওয়ার-প্রোগ্রামার নাট্যকর্মী মুক্তসফটওয়ার-অ্যাকটিভিস্ট শিক্ষক-শিক্ষার্থী ব্যবসা-উদ্যোক্তা ইত্যাদি প্রভৃতি শত ধরনের তরুণ-যুবারা ছবিরহাট চারুকলা জাদুঘর শাহবাগ সোহরাওয়ার্দী-উদ্যান চত্বরকে ঘিরে আড্ডা মেরে চলেছেন। অথচ ভদ্রলোক বুদ্ধিজীবীরা এই পুরো এলাকাটাকে গাঁজাখোরদের নোংরা একটা জায়গা বলে এতোকাল নাক সিঁটকিয়েছেন। ছেলেমেয়েদের 'বেলেল্লাপনা'র জায়গা বলে বাঁকা চোখে তাকিয়েছেন এর দিকে। আজ সব সমালোচনা-উপেক্ষা-উন্নাসিকতাকে ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিয়ে শাহবাগ জ্বেলেছে আমাদের আশার প্রদীপ । (উল্লেখ্য: ঢাকার বাইরের সমাবেশগুলোর পেছনে এই কমিউনিটি হয়ে ওঠার চর্চা এখনও ভালো করে দাঁড়ায়নি বলেই পরিবর্তনের এই মুহূর্তেও সেগুলো নেতাদের গতানুগতিক বক্তৃতাবাজিতে সরগরম হয়ে আছে।) পৃথিবীর সমস্ত বিষয় নিয়ে তর্ক-বিতর্ক-বাহাস-পড়াশোনা-হাসি-তামাশা-আনন্দ-মেলামেশা-প্রেম-ভালোবাসায় ভরপুর শাহবাগের দুর্দান্ত প্রাণবন্ত আড্ডা গত দুই দশকের বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মে শ্রেষ্ঠতম গণবিশ্বদ্যািলয়ে পরিণত হয়েছে। এটা হয়ে উঠেছে সৃজনবৈচিত্র্যে গমগম করা শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিক্ষেত্র। ফান্ড দিয়ে, আমলা দিয়ে, প্রজেক্ট দিয়ে, এনজিও দিয়ে এরকম অবাধ স্বাধীনতাপূর্ণ একটা শিল্প-সৃজন-বিকাশ-অভয়ারণ্য বানানো যায় না। স্বাধীনতাই তো সৃজনশীলতার ধাত্রী। এই ধাত্রীই শত সহস্র তরুণ-যুবককে মানসিকভাবে সাবালক করে তুলেছে, আন্তরিক একটা বিরাট নিবিড় কমিউনিটি গড়ে তুলেছে শাহবাগে। রাষ্ট্র মাস্তান মন্ত্রী ঠিকাদার এমপি দারোগা র্যাব প্রফেসর ক্যাডার জঙ্গি হুজুর গুরু পুরুত্ঠাকুর হোমরা চোমরা এলিট-মহাজনদের সার্বক্ষণিক অত্যাচারে তো খোদ আমাদের সমাজটাই আজ কারাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।

কোথায় আমাদের সেই ছোটবেলার পাড়া-মহল্লা? সেখানে সবাই সবার বন্ধু ছিল, আত্মীয় ছিল। মারামারি-ঝগড়াঝাটি-কান্নাকাটি শেষে আবার সবাই একসাথে হাসতে হাসতে খেলতে শুরু করার সমাজ-সম্প্রদায়-গ্রাম আজ কোথায়? রাষ্ট্র এবং নির্বাচিত-অনির্বাচিত আমলাতন্ত্র আজ একেবারে তলার পরিবার পর্যন্ত বিস্তৃত তার শূঁড় দিয়ে সব কিছু শুষে নিচ্ছে। এখন সব 'ওয়ার্ড', 'ইউনিয়ন', 'উপজেলা', 'নির্বাচনী এলাকা'। এখন সবাই গলায় কুকুরের বেল্টের মতো পরিচয়পত্র ঝুলিয়ে নাগরিক হয়ে উঠতে বাধ্য হচ্ছেন। এখন সবাই ভোটার মাত্র। এখন সবাই ক্রেতা মাত্র। এখন সবাই যেন 'কোকাকোলা-দল' না-হয় 'পেপসি-দল' হতে বাধ্য। সবাই এখন বিএনপি-আওয়ামী লীগ, কংগ্রেস-বিজেপি, ডেমোক্র্যাট-রিপাবলিকান। আর যেন পথ নাই, সমাজ নাই, সম্প্রদায় নাই, মা নাই, বাবা নাই, বয়োজ্যেষ্ঠর সম্মান নাই, ছোটদের আদরযত্ন নাই, বন্ধু-বান্ধব নাই। শুধু মারমার-কাটকাট প্রতিযোগিতার ছ্যাবলামি। আজকের শাহবাগ-সমাবেশ বিগত দুই-আড়াই দশক ধরে গড়ে ওঠা সমাজ-সম্প্রদায়-পাড়া-কমিউনিটি-বন্ধুত্ব-বোধেরই ফল। জ্ঞাতসারে হোক বা অজ্ঞাতেই হোক: আজকের শাহবাগ-স্বাধীনতা রাষ্ট্রের খপ্পর থেকে খোদ সমাজকে উদ্ধার করার, মুক্ত করার, সমাজের আত্মকর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার অজস্রমুখি প্রচেষ্টার ফল। তাই তো আজ ফিরে আসছে একাত্তরের নয় মাসের মতো সর্বব্যাপী, বহুবৈচিত্র্যপূর্ণ, প্রাণবন্ত সমাজ-সম্প্রদায়-আত্মীয়তা-বন্ধুত্ব।

শাহবাগ এখনকার মতো যদি ফুরিয়েও যায় আরো অনেক শাহবাগ আসবে। অকুপাই-আন্দোলনের শ্লোগান উচ্চারণ করে বলি: "দিজ ইজ জাস্ট দ্য বিগিনিং"। এই গণজাগরণ কোনো না কোনো ভাবে আবার আত্মপ্রকাশ করবে। শাহবাগের স্মৃতি কখনো হারিয়ে যাবে না। খুন-গুম-ক্রসফায়ার, রাষ্ট্রীয় মাস্তানি, দলীয়করণ, দালালি, চামচামির বাইরে তরুণ-জনসাধারণ এবার সুনির্দিষ্টভাবে ভাবতে শুরু করুক কেমন বাংলাদেশ তারা চান। কেমন পুলিশ চান, কেমন আদালত চান, কেমন জনপ্রতিনিধিত্ব চান। এগুলো নিয়ে সত্যিকার অর্থেই সর্বাত্মক-রূপান্তরধর্মী চিন্তা গড়ে তুলতে পারাই আজকের শাহবাগ-সমাবেশের প্রধানতম কাজ। এই কথাটা অল্পবয়েসী তরুণেরা এবং বৃদ্ধ-বয়স্ক তরুণেরা যদি মনে রাখেন এবং নিজেদের মাথা ও আত্মকর্তৃত্বের ওপর আস্থা রাখতে শুরু করেন, বদলে যেতে শুরু করবে বাংলাদেশ। আগামীর সেই বৃহত্তর বাংলা-বসন্ত আমাদের দরজায় টোকা দিচ্ছে।

এই ফাল্গুনেও পূর্ণাঙ্গ এখনও বসন্ত আসেনি বটে। এখনও প্রস্তুতি পর্ব চলছে শাহবাগে আর সারাদেশে। প্রস্তুতি এখনও সম্পন্ন হয়নি। কিন্তু হবে। অচিরেই হবে। যখন-তখনই হবে। হয়ত সামনের কোনো শীতকালেই হবে। বসন্ত তো শীতেই আসে, তাই না? ঠিক যে: আর্থ-রাজনৈতিক দল-শক্তিগুলো এবং তাদের মিডিয়া সংকীর্ণ একটা মেডিয়েটেড বসন্ত বানানোর চেষ্টা করছে নানা কারণে। তবু সেটা ঠিক তাদের মতো ইচ্ছানুযায়ী দাঁড়াচ্ছে না কিন্তু। আরব বসন্ত তো আর মিডিয়া দিয়ে বানানো যায় না: বাংলা-বসন্তও না। হ্যাঁ, যেকোনো প্রকৃত গণআন্দোলনকে ঘিরেই সব ধরনের ক্ষমতাশীলমহল প্যাঁচ কষতে থাকেন। তবু যে বালিকারা বালকদের সাথে ক্রোধের আনন্দে নাচছেন তাতে আমি আনন্দিতই বটে। এই সাক্ষাত্, নারীর সাথে পুরুষের, বড়দের সাথে ছোটদের, শিক্ষিতদের সাথে রিকশাওয়ালাদের, এ আমাদের সমাজের যাবতীয় অসামাজিক ব্যাধি-বালা-মুসিবত কমাবে, বাড়াবে সমাজের স্বাধীনতার সীমা: রাষ্ট্র-রাজনীতির একচ্ছত্র রাক্ষস-ক্ষমতার বিপরীতে। সুসমাচার বৈকি। বসন্ত যে এই বঙ্গে আসার জন্য মুখিয়ে আছে সেটা দিব্যি বোঝা যাচ্ছে: শাহবাগে, সারা বাংলাদেশে। আজকের শাহবাগ-সমাবেশ সেই বাংলা-বসন্তের আগাম ফাল্গুনী ইশতেহার।