Sunday, October 30, 2016

কারা বাংলাকে দ্বিখণ্ডিত করলো:কার স্বার্থে

পরিস্থিতি এমন ছিল যে বাংলার ভাগ্য বাংলার জনগণের উপর নির্ভর করছিল না, নির্ভর করছিল সম্পূর্ণ বাইরের তিনটে শক্তি উপর- তাদের মধ্যে আপস ও চুক্তির উপর। আমরা দেখবো এই তিনটি শক্তির মধ্যে দুটি শক্তি- ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ও মুসলিম লীগ নেতৃত্ব প্রস্তুত ছিল বাংলাকে হিন্দুস্থান ও পাকিস্তানের বাইরে অবিভক্ত রাষ্ট্র হিসাবে স্বীকার করতে; কিন্তু স্বীকার করতে প্রস্তুত ছিল না অন্য শক্তিটি অর্থাৎ কংগ্রেসের শীর্ষস্থানীয় নেতারা। এবং তাঁদেরই চাপে বাংলাকে দ্বিখণ্ডিত করা হয়
ক্যাবিনেট মিশন পরিকল্পনা কংগ্রেস যখন কার্যত নাকচ করে দিল তখন নতুন ভাইসরয় মাউন্টব্যাটেন ও তাঁর ব্রিটিশ সহকর্মীরা একটি পরিকল্পনা রচনা করেছিলেন। এর বিস্তৃত আলোচনার এখানে অবকাশ নেই। শুধু উল্লেখ করবো যে, এই পরিকল্পনায় প্রত্যেক প্রদেশের প্রতিনিধিদের অধিকার দেওয়া হয়েছিল স্থির করার যে তাঁরা হিন্দুস্থানে যাবেন, না অন্য প্রদেশের সঙ্গে মিলে আলাদা গ্রুপ তৈরি করবেন অথবা স্বাধীন থাকবেন। বাংলা ও পাঞ্জাবের প্রতিনিধিদের অধিকার দেওয়া হয়েছিল তিনটি সম্ভাবনার মধ্যে একটি বাছাই করে নেওয়ার। এই তিনটি সম্ভাবনা ছিল:
(১) সমগ্র বাংলা (ও পাঞ্জাব) হিন্দুস্থানে অথবা পাকিস্তানে যোগদান করতে পারে;
(২) বাংলা (ও পাঞ্জাব) বিভক্ত হতে রাজি হয়ে এক অংশ হিন্দুস্থানে এবং অন্য অংশ পাকিস্তানে যেতে পারে; এবং
(৩) বাংলা (ও পাঞ্জাব) ঐক্যবদ্ধ থেকে পৃথক রাষ্ট্র হতে পারে।
তৃতীয় বিকল্পের বিরুদ্ধে নেহেরুর জোরালো আপত্তিতে এই পরিকল্পনাও নাকচ হয়ে যায়  । রিফর্মস কমিশনার ভি. পি. মেননকে ভার দেওয়া হয় নতুন পরিকল্পনা রচনা করার। এই পরিকল্পনার রূপরেখা আগের ডিসেম্বর অথবা জানুয়ারিতে প্যাটেলের সঙ্গে পরামর্শ করে মেনন তৈরি করেছিলেন।তাতে ঐ তৃতীয় সম্ভাবনাকে বাদ দেওয়া হয়।অর্থাৎ বাংলাকে (ও পাঞ্জাবকে) হয় সমগ্রভাবে হিন্দুস্থানে বা পাকিস্তানে যেতে হবে আর নয়তো দ্বিখণ্ডিত হতে হবে। হিন্দুস্থান ও পাকিস্তানের বাইরে ঐক্যবদ্ধ বাংলার (বা পাঞ্জাবের) অস্তিত্ব থাকবে না। অন্য প্রদেশগুলিকে হয় হিন্দস্থানে নয় পাকিস্তানে যেতে হবে। এই মেনন-প্যাটেল পরিকল্পনাই মাউন্টব্যাটেন পরিকল্পনা নামে খ্যাত।
এর আগে ১৯৪৭-এর ৪ঠা মার্চ ভারত সচিবের একটা স্মারকলিপিতে তিনটি রাষ্ট্রের উদ্ভবের সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছিল:  (১) উত্তর-পশ্চিম ভারতে পাকিস্তান; (২) আসাম-সহ হিন্দুস্থান; এবং (৩) বাংলা।ব্রিটিশ মন্ত্রিসভার ভারত ও বর্মা কমিটি প্রদেশগুলিকে, বিশেষ করে বাংলাকে, যদি তারা চায় তাহলে হিন্দুস্থান ও পাকিস্তান থেকে পৃথক থাকার অধিকার দিতে প্রস্তুত ছিল। ১৭ই মে ১৯৪৭ তারিখের একটি স্মারকলিপিতে ভারতসচিব লিস্টওয়েল বলেছিলেন যে, “ঐক্যবদ্ধ থাকার ও নিজের সংবিধান নিজে রচনা করার অধিকার নিশ্চয়ই বাংলাকে এবং সম্ভবত পাঞ্জাবকেও দেবার পক্ষে যুক্তি আছে।” ।
২৩ মে মন্ত্রিসভার বৈঠকে এটলী বলেছিলেন: “যুক্ত নির্বাচকমণ্ডলীর দ্বারা নির্বাচিত সংযুক্ত সরকারের ভিত্তিতে উত্তর-পূর্বে বাংলা ঐক্যবদ্ধ থাকার সিদ্ধান্ত নিতে পারে- তার উজ্জ্বল আশা আছে।” (ইতিমধ্যে শরৎ বোস-আবুল হাশিম কর্তৃক স্বাক্ষরিত বাংলার কংগ্রেস-লীগ নেতাদের চুক্তি প্রকাশিত হয়েছিল।) একই দিনে ডোমিনিয়ন প্রধানমন্ত্রীদের কাছে প্রেরিত টেলিগ্রামে এটলী “উপমহাদেশে দুটি বা সম্ভবত তিনটি রাষ্ট্রের উদ্ভবের” সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেছেন। ।
মাউন্টব্যাটেন নিজেও কিছুদিন ধরে হিন্দুস্থান ও পাকিস্তান থেকে পৃথক ঐক্যবদ্ধ বাংলার কথা চিন্তা করেছিলেন। ২৬শে এপ্রিল সুরাবর্দি (বাংলাদেশের জাতীয় নেতা সোহরাওয়ার্দীকে পশ্চিমবঙ্গের লোকেরা এই অপনামে ডাকে-সাম্প্রদায়িকতা থেকে বামরাও মুক্ত হতে পারলনা।অথচ ইংরেজিতে তাঁর নামের বানান হচ্ছে Suhrawardy-সম্পাদক) যখন মাউন্টব্যাটেনের কাছে ঐক্যবদ্ধ স্বাধীন বাংলার প্রস্তাব করেন এবং বলেন যে “যথেষ্ট সময় পেলে তিনি বাংলকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে সক্ষম হবেন বলে বিশ্বাস করেন”, তখন এই প্রস্তাবের পক্ষে মাউন্টব্যাটেনের সমর্থন ছিল  ।
ওই দিনেই তিনি জিন্নাকে সুরাবর্দির (সোহরাওয়ার্দী) কথা জানান এবং জিন্নার সম্মতি পেয়েছিলেন। ২৮শে এপ্রিল মাউন্টব্যাটেন বারোজকে জানালেন যে, তাঁর এবং তাঁর ব্রিটিশ সহকর্মীদের “পরিকল্পনা পাকিস্তান ও হিন্দুস্থান থেকে পৃথক অবিভক্ত স্বাধীন বাংলার সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত রেখেছে। জিন্না কোনো আপত্তি করবে না”।
পৃথক স্বাধীন দেশ হবার সম্ভাবনা যাতে বেশি হয় সেইজন্য ১লা মে মাউন্টব্যাটেন প্রস্তাব দিলেন যে, বাংলা থেকে নির্বাচিত সংবিধান সভার সদস্যরা প্রথমে ভোট দিয়ে ঠিক করবেন যে তাঁরা স্বাধীন বাংলার পক্ষে, না হিন্দুস্থান বা পাকিস্তানে যোগদান করতে চান। পরে তাঁরা বাংলা ভাগ হবে কিনা সে সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেবেন ।
২রা মে বারোজকে মাউন্টব্যাটেন জানালেন, বাংলাকে ঐক্যবদ্ধ রাখার জন্য আর একটা বিকল্প হিসাবে বাংলায় সাধারণ নির্বাচনের ব্যবস্থা করে সমস্ত ভোটদাতাদের মতামত গ্রহণ করার উপর জোর দেওয়া যেতে পারে । ৩রা মে কিরণশঙ্কর রায় যখন মাউন্টব্যাটেনের সঙ্গে দেখা করলেন তখন সংবিধান সভার সদস্যদের ভোটভুটির মাধ্যমে অথবা গণভোটের মাধ্যমে বাংলাকে ঐক্যবদ্ধ ও স্বাধীন থাকার অধিকার দেবার যে পরিকল্পনা মাউন্টব্যাটেন করেছিলেন তার কথা কিরণশঙ্করকে বললেন। মাউন্টব্যাটেনের কাছ থেকে কিরণশঙ্কর যখন শুনলেন যে সুরাবর্দি (সোহরাওয়ার্দী) যুক্ত নির্বাচকমণ্ডলী ও সংযুক্ত মন্ত্রিসভাতে সম্মত তখন তিনি উল্লসিত হলেন ।
৪ঠা মে বারোজ মাউন্টব্যাটেনকে চিঠির মাধ্যমে ও টেলিগ্রাম করে জানালেন যে, বাংলার জনগণের মতামত নেবার জন্য গণভোট হতে পারে, তার জন্য কমপক্ষে তিন মাস সময় লাগবে। তখন স্থির ছিল যে ব্রিটিশরা ক্ষমতা হস্তান্তর করবে ১৯৪৮-এর জুনের মধ্যে। অতএব বাংলায় গণভোট সম্পূর্ণ সম্ভব ছিল। বাংলা ঐক্যবদ্ধ থাকবে, না বিভক্ত হবে- এই প্রশ্নটি শুধু সেদিনের ৬ কোটির কিছু বেশি বাঙালীর কাছে নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পক্ষেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
৭ই মে’তেও মাউন্টব্যাটেন বলেছেন যে, সুরাবর্দি (সোহরাওয়ার্দী) তাঁকে জানিয়েছেন যে জিন্না স্বাধীন বাংলাতে রাজি আছেন । মাউন্টব্যাটেন তখন ঐ প্রশ্নে গণভোট বা সাধারণ নির্বাচনের কথা ভাবছিলেন। কিন্তু তার পরেই মাউন্টব্যাটেনের মত সম্পূর্ণ বদলে গেলো। ৮ই মে’তে তিনি তাঁর চিফ অব স্টাফ লর্ড ইসমে (Lord Ismay)-কে লন্ডনে টেলিগ্রাম করে জানালেন, ভি. পি. মেননের মাধ্যমে প্যাটেল ও নেহরু জানিয়েছেন যে যতদিন না নতুন সংবিধান সম্পূর্ণ তৈরি হচ্ছে ততদিনের জন্য তাঁরা ডোমিনিয়ন স্টেটাস (ডোমিনিয়ন স্টেটাসের আর কোনো শোভন নাম নেই) নির্দিষ্ট সময়ের আগে চান। ক্ষমতা হস্তান্তরের তারিখ এগিয়ে দিতে হবে। মাউন্টব্যাটেন লিখলেন :“এ পর্যন্ত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পক্ষে যত সুযোগ এসেছে তার মধ্যে এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং [এই সুযোগের ব্যবহারে] আমরা অবশ্যই প্রশাসনিক বা অন্য কোনো বাধা মানবো না”।
৯ই মে এ্যাসোসিয়েটেড প্রেস অব আমেরিকার প্রতিনিধিকে প্যাটেল বললেন, তাঁরা চান শীঘ্র ডোমিনিয়ন স্টেটাস দেওয়া হোক । ১০ই মে মাউন্টব্যাটেন ও তাঁর সহকর্মীদের এক বৈঠকে নেহরু বললেন, ডোমিনিয়ন স্টেটাসের ভিত্তিতে যত শীঘ্র সম্ভব ক্ষমতা হস্তান্তর করা হোক ।
ভারত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মধ্যে একটি ডোমিনিয়ন (অবশ্য পরিবর্তিত নামে) থাকবে এই ইচ্ছা জানিয়ে নেহরু ও প্যাটেল যে বার্তা পাঠিয়েছিলেন তাতে মাউন্টব্যাটেনের উল্লাসের কারণ ছিল। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীরা দীর্ঘদিন ধরে চাইছিল যে ভারত ডোমিনিয়ন বা ‘কমনওয়েলথ’-এর সদস্য থাকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এক মারাত্মক পর্যায়ে, ১৩ই এপ্রিল ১৯৪৩-এ, ভারতসচিব লিওরপাল্ড এমেরি (Leopold Amery) প্রধানমন্ত্রী চার্চিলকে লিখেছিলেন : “আগামী দশ বছর ভারতবর্ষকে কমনওয়েলথের মধ্যে রাখা আমাদের সামনে সব থেকে বড় কাজ… (এবং) ব্রিটিশ কূটনীতির সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হওয়া উচিত”।
একই মর্মে এমরি ৯ই মে ১৯৪৩-এ ব্রিটিশ পররাষ্ট্র মন্ত্রী ইডেনকেও লিখেছিলেন। ওই বছরের সেপ্টেম্বর মাসে ওয়াভেল এবং ব্রিটিশ মন্ত্রিসভার ভারত-বর্মা কমিটির সিদ্ধান্ত ছিল- “ভারতকে কমনওয়েলথ-এর মধ্যে রাখা আমাদের প্রধান লক্ষ্য হবে”। এ থেকে কিছু আভাস পাওয়া যায়, ব্রিটিশ শাসকরা ভারতকে ব্রিটিশ কমনওয়েলথের মধ্যে রাখার উপর কী গুরুত্ব দিচ্ছিলেন। তাঁরা এবং তাঁদের সামরিক বাহিনীর প্রধানরা ‘কমনওয়েলথের কাঠামোর অপরিহার্য অঙ্গ’  বলেই ভারতকে গণ্য করেছিলেন। তাঁরা এ কথা বারবার বলেছেন ।
মাউন্টব্যাটেনকে ভারতের ভাইসরয় মনোনীত করে ব্রিটিশ মন্ত্রিসভার তরফ থেকে প্রধানমন্ত্রী এটলি তাঁকে নির্দেশ দিয়েছিলেন : সম্ভব হলে ব্রিটিশ কমনওয়েলেথের মধ্যে ব্রিটিশ ভারত ও দেশীয় রাজ্যগুলি নিয়ে এককেন্দ্রিক একটি সরকার (“a unitary Government”) হবে সেটাই ব্রিটিশ সরকারের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য।… প্রথমত ভারতীয় সেনাবাহিনীর মধ্যে ভাঙন যাতে না হয় তার এবং সমগ্র ভারতবর্ষের ভিত্তি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বজায় রাখার বিরাট গুরুত্বকে আপনি ভারতীয় নেতাদের উপলব্ধি করানোর চেষ্টা করবেন। দ্বিতীয়ত, ভারত মহাসমুদ্র অঞ্চলের নিরাপত্তার ব্যাপারে সহযোগিতার ক্রমাগত প্রয়োজন- যার জন্য দেশের মধ্যে একটা চুক্তি হতে পারে- তার কথাও আপনি বলবেন ।
অনেকে মনে করেন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীরা তাদের প্রত্যক্ষ শাসনের অবসানের আগে ভারতকে দ্বিখণ্ডিত করতে চেয়েছিল। এ নিছক অনুমান ও ভুল। এ প্রসঙ্গে আমরা কয়েকটি কথা পরে যোগ করবো।
কংগ্রেসের শীর্ষস্থানীয় নেতারা গোপনে আরও জানিয়েছিলেন যে, সাময়িক কিছু সময়ের জন্য ডোমিনিয়ন স্টেটাসের কথা বললেও তাঁদের ভারতবর্ষ কখনো ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বা কমনওয়েলথ ত্যাগ করবে না। তবে তাঁদের এই আশ্বাস গোপন রাখতে হবে, না হলে কংগ্রেস সংগঠনকে ডোমিনিয়ন স্টেটাসে রাজি করানোতে অসুবিধা হবে। মাউন্টব্যাটেনের মত এটলিও খুবই খুশি হয়ে ডোমিনিয়ন প্রধানমন্ত্রীদের সেই সংবাদ জানিয়েছিলেন ।
মাউন্টব্যাটেন ১১ই মে টেলিগ্রাম করে লন্ডনকে জানালেন, দীর্ঘদিন ধরে আমাদের যে লক্ষ্য সেই লক্ষ্য পূরণের জন্য আমাদের অবশ্যই ১৯৪৭ সালের মধ্যে ডোমিনিয়ন স্টেটাস দিতে হবে। তারপর তার ফলে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কি কি লাভ হবে তা তিনি উল্লেখ করেছেন ।
অতএব মাউন্টব্যাটেন ঠিক করলেন যে, বাংলার জনমত জানার জন্য গণভোট বা সাধারণ নির্বাচন হবে না, এমনকি বাংলার আইনসভার সদস্যরা বাংলা অবিভক্ত পৃথক রাষ্ট্র থাকবে তার পক্ষে ভোট দেবার অধিকার পাবে না। সমগ্র বাংলা যাবে হিন্দুস্থানে বা পাকিস্তানে, অথবা দু’টুকরো হবে এবং এক টুকরো যাবে হিন্দুস্থানে ও অন্য টুকরো যাবে পাকিস্তানে- শুধু এর উপরেই আইনসভার সদস্যরা ভোট দিতে পারবেন। সাম্রাজ্যের স্বার্থের যূপকাষ্ঠে বাংলার কোটি কোটি মানুষের স্বার্থকে বলি দিতে হবে।বাংলা ঐক্যবদ্ধ থাকবে এবং হিন্দুস্থান ও পাকিস্তান থেকে পৃথক রাষ্ট্র হবে তাতে মুসলিম লীগ নেতাদের সম্মতি ছিল। ২৬শে এপ্রিল মাউন্টব্যাটেন যখন জিন্নাকে সুরাবর্দির (সোহরওয়ার্দী) স্বাধীন ঐক্যবদ্ধ বাংলার প্রস্তাবের কথা বললেন তখন জিন্না  একটুও ইতস্তত না করে বলেছিলেন, “আমি আনন্দিত হবো… তারা ঐক্যবদ্ধ ও স্বাধীন থাকুক সেটাই ভালো হবে”।
২৮শে এপ্রিল মাউন্টব্যাটেনের প্রধান সচিব মিয়েভিল (Mieville)-এর সঙ্গে আলোচনার সময় লীগের সাধারণ সম্পাদক লিয়াকত আলী খাঁ বলেছিলেন,“বাংলা কখনও বিভক্ত হবে না এই তাঁর বিশ্বাস, তাই তিনি বাংলা নিয়ে উদ্বিগ্ন নন। তিনি মনে করেন যে, বাংলা হিন্দুস্থানে বা পাকিস্তানে যোগদান করবে না এবং পৃথক রাষ্ট্র থাকবে”। জিন্না ও লিয়াকত তাঁদের এই সম্মতি বারবার জানিয়েছেন
কংগ্রেসের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব বরাবর বাংলাকে দ্বিখণ্ডিত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিল। আমরা দেখেছি, পাকিস্তান হোক আর না হোক, তবু বাংলাকে ভাগ করতে হবে- এই ছিল তাঁদের অন্যতম দাবি। তাঁরা চেয়েছিলেন বাংলাকে রাজনৈতিক অর্থনৈতিক এবং অন্যান্য সমস্ত দিক থেকে পঙ্গু করতে। বিড়লা প্রমুখ মাড়োয়ারী বড় মুৎসুদ্দিদের ঘাঁটি কলকাতা এবং পশ্চিমবঙ্গকে তাঁরা কখনো হাতছাড়া করতে প্রস্তুত ছিলেন না।
উজ্জ্বল সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল যে, বাংলা বয়স্ক ভোটাধিকার, যুক্ত নির্বাচকমণ্ডলী, সম্মিলিত মন্ত্রিসভা, নিজস্ব সংবিধানসভা নিয়ে ঐক্যবদ্ধ থাকবে, তার সংহতি অটুট থাকবে এবং বাকি ভারতের সঙ্গে সে তার সম্পর্ক নির্ধারণ করবে। এই নতুন বাংলায় সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে লড়াইয়ের পরিবর্তে সাম্রাজ্যবাদ ও তার পদলেহীদের উৎখাতের জন্য ঐক্যবদ্ধ লড়াই শুরু হবে, অগ্রগতি ও বিকাশের নতুন দিগন্ত খুলে যাবে। কিন্তু এই সম্ভাবনা কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্ব বিনষ্ট করে দিল এবং অন্তহীন ট্রাজেডির শিকার হতে বাংলাকে বাধ্য করলো

Tuesday, October 11, 2016

পুরোনো দিনের অদ্ভুত কিছু পেশার কাহিনী

সময়ের সাথে সাথে বদলে যায় মানুষের আচার-আচরণ, সামাজিক প্রথা, খাদ্যাভাস ইত্যাদি সবই। জীবিকার্জনের পন্থাও এর ব্যতিক্রম নয়। আগেকার দিনে মানুষ যেসব কাজ করে অর্থোপার্জন করে পেট চালাতো, তার অনেকগুলোই আজকের দিনে অদ্ভুত লাগবে যে কারো কাছেই। কোনো কোনোটি পড়ে যেমন বিস্ময়ে মুখ হাঁ হয়ে যেতে পারে, তেমনি কোনোটি সম্পর্কে জানার পর হাসিও উঠতে পারে বিস্তর। 

নকার-আপ

old1
আজকের দিনে ঘুম থেকে সময়মতো ওঠার জন্য মোবাইলের অ্যালার্মের কোনো বিকল্প নেই। এককালে এ জায়গায় ছিলো এলার্ম ঘড়ি। কিন্তু এ এলার্ম ঘড়ি আসার আগে মানুষ তাহলে সময়মতো ঘুম থেকে ওঠার জন্য কী করতো? তখন আসলে অদ্ভুত এক পেশা ছিলো যার নাম ‘নকার-আপ’ কিংবা ‘নকার-আপার’। নারী-পুরুষ উভয়েই এ পদ্ধতিতে জীবিকা নির্বাহ করতো। যে ব্যক্তির বাড়িতে যেদিন তাদের ডিউটি, সেদিন সেই বাড়িতে গিয়ে তার বেডরুমের জানালায় বড় লাঠি দিয়ে আঘাত করতে থাকতো একজন নকার-আপার। গ্রাহক ঘুম থেকে উঠেছে নিশ্চিত করেই সে পরের গ্রাহকের দিকে ছুটতো।

লিঙ্ক বয়

old2
রাতের বেলায় ঘর থেকে বেরোলেই রাস্তায় জ্বলা বিদ্যুতবাতি আমাদের পথ আলোকিত করে দেয়। আর কোনো কারণে লোডশেডিং হলে টর্চ কিংবা স্মার্টফোনের টর্চলাইটের অপশন তো আছেই। তবে বিদ্যুতের এমন সহজলভ্যতার আগের জীবন কিন্তু অতটা সহজ ছিলো না। তখন রাতের বেলায় পথ চলতে গেলে অন্ধকার দূরীকরণে কাজ করতো কম বয়সী ছেলেরা যাদের বলা হতো লিঙ্ক বয়। হাতে একটি মশাল ধরে তারা পথচারীদের পথকে আলোকিত করে তুলতো, সাথে জুটতো সামান্য কিছু অর্থ। রাস্তায় বিদ্যুতবাতি আসার আগে ইংল্যান্ডে এ লিঙ্ক বয়দের দেখা মিলতো।

পিম্প মেকার

একসময় লন্ডন ও এর আশেপাশের এলাকায় পিম্প মেকার নামের এ পেশাটির চল ছিলো। পিম্প (Pimp) একটি ইংরেজি শব্দ যার অর্থ বেশ্যালয়ের দালাল। তাই প্রথমে যে কেউ ‘পিম্প মেকার’ দেখে ভাবতে পারে, অতীতে হয়তো ট্রেনিং দিয়ে পিম্পদের প্রস্তুত করা হতো! আসল ঘটনা এর ধারেকাছেও নেই। লন্ডন এবং তার আশেপাশের এলাকাগুলোতে ব্যবহৃত এক আঞ্চলিক শব্দ ছিলো পিম্প, যার অর্থ তাদের কাছে ছিলো জ্বালানী কাঠের স্তুপ। যে ব্যক্তি বিক্রির জন্য কাঠ সংগ্রহ করতো তাকেই তারা পিম্প মেকার বলতো।

টোশার

old3
টোশারদের তুলনা করা যায় আমাদের দেশের টোকাইদের সাথে। তবে টোকাইদের দেখা মেলে ডাস্টবিনগুলোর আশেপাশে। আর টোশারদের দেখা মিলতো লন্ডনের পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার কাছাকাছি জায়গায়। সব জায়গা থেকে আসা ময়লায় তারা অক্ষত কিন্তু দরকারী জিনিস খুঁজে বেড়াতো। তারপর কিছু পেলে সেটা পরিষ্কার করে বিক্রি করেই জীবিকা নির্বাহ করতো তারা।

গং-ফার্মার

old4
আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে মানববর্জ্যের ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণ এখন অনেক সহজ হয়ে গেছে। তাই প্রাকৃতিক কর্মাদি সেরে টয়লেটের ফ্লাশ ব্যবহার করলেই হয়ে যায়। আর সেপটিক ট্যাঙ্কে জমা হওয়া ময়লার জন্যও আছে বিশেষ ট্রাক যা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই সেই ময়লাগুলো বের করে আনতে পারে মানুষের হাতের স্পর্শ ছাড়া। তবে আগেকার দিনে এ কাজের জন্য যখন যন্ত্র ছিলো না তখন কিন্তু মানুষই ছিলো একমাত্র ভরসা। টয়লেটের যাবতীয় আবর্জনা খালি হাতেই পরিষ্কার করা এ মানুষগুলো গং-ফার্মার বা নাইট সয়েল ম্যান হিসেবেই পরিচিত ছিলো। রাতের বেলায় মূলত তারা কাজ সারতেন বলেই তাদের নাইট সয়েল ম্যান বলা হতো। এমন অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে কাজ করতেন বলে তাদের অনেকেই মারা যেতেন শ্বাসরোধ হয়ে।

জিমনারসিয়াখ

old5
জিমনেশিয়াম বলতে আমরা চিনি ব্যায়ামাগারকে। আর এ জিমনেশিয়ামের সাথেই সম্পর্ক রয়েছে জিমনারসিয়াখের। প্রাচীন গ্রীসে প্রচলিত ছিলো এ পেশাটি। রেসলিং, ব্যায়ামাগারে ব্যায়াম সারা কিংবা অন্যান্য খেলাধুলার পর একজন অ্যাথলেটের গায়ে লেগে থাকা ঘাম পরিষ্কার করা, তার শরীর মুছে দেয়া এবং তেল মাখিয়ে দেয়াই ছিলো এ পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তির প্রধান কাজ। শুনতে কিছুটা অদ্ভুত আর গা ঘিনঘিনে হলেও তখনকার গ্রীসে কিন্তু পেশাটিকে বেশ সম্মানের চোখে দেখা হতো। আবেদনকারীর বয়স হওয়া লাগতো ৩০-৬০ এর ভেতর। একইসাথে সম্ভ্রান্ত বংশীয় হওয়াও ছিলো পেশাটিতে ঢুকতে পারার পূর্বশর্ত।

শেষকৃত্যানুষ্ঠানের ভাঁড়

old6
একজন মানুষের শেষকৃত্যানুষ্ঠান শোকের চাদরে মোড়া থাকবে এটাই স্বাভাবিক। তবে প্রাচীন রোম যেন এ স্বাভাবিক নিয়মটিও মানতে চায় নি। তাই কারো শেষকৃত্যানুষ্ঠানেও তারা নিয়োগ দিতো বিভিন্ন ভাঁড়কে। তারা রং-বেরঙয়ের পোষাক পরে এসে করতো নানা মজাদার অঙ্গভঙ্গি, অনুকরণের চেষ্টা করতো মৃতের নানা কথাবার্তা-চালচলন। এসবের উদ্দেশ্য ছিলো মৃতের আত্মাকে শান্তি দেয়া এবং জীবিত শোকার্ত আত্মীয় ও কাছের মানুষদেরকে মানসিকভাবে চাঙ্গা করে তোলা। এসব করে তাদের অর্থোপার্জনও বেশ ভালোই হতো।

ফুলার

old7
ফুলিং বলতে বোঝায় কাপড় পরিষ্কার করার প্রক্রিয়াকে। প্রাচীন রোমে এ কাজটি করতো ক্রীতদাসেরা। এজন্য গোড়ালি সমান মূত্রের মাঝে দাঁড়িয়ে কাপড় ধোয়া লাগতো তাদের! কিছুটা অদ্ভুত শোনালেও এর পেছনে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাও আছে। তখনকার দিনে তো আর এখনকার মতো কাপড় ধোয়ার জন্য এত সাবান কিংবা গুঁড়া সাবানের প্রচলন ছিলো না। মূত্রে থাকা অ্যামোনিয়াম লবণ পরিষ্কারক ক্ষমতাসম্পন্ন। এজন্যই মূলত মূত্রের দ্বারস্থ হয়েছিলো রোমের মানুষেরা। সেই মূত্রের মাঝে মূলত মানুষের মূত্রই থাকতো।

গ্রুম অব স্টুল

old8
আজ প্রাচীন পৃথিবীর যেসব অদ্ভুত পেশার কথা আলোচনা করলাম, তার মাঝে সবচেয়ে অদ্ভুত সম্ভবত এটিই। একজন ইংরেজ রাজার সভাসদদের মাঝে তার সবচেয়ে কাছের লোক থাকতেন এ গ্রুম অব স্টুল। তার কাজ ছিলো রাজার হাত-পা ধুইয়ে দেয়া এবং সেই সাথে প্রকৃতির বড় ডাকে সাড়া দেয়ার পর তার পশ্চাদ্দেশ পরিষ্কার করে দেয়া! শারীরিকভাবে রাজার এত কাছে আসার কারণেই রাজা তাকে এতটা বিশ্বাস করতেন, রাজ্যের নানা গোপনীয় কথাবার্তাও শেয়ার করতেন তার সাথে। বর্তমান দুনিয়ায় কাজটি যতই অদ্ভুত এবং অপমানজক মনে হোক না কেন, তখনকার দিনে কিন্তু একজন গ্রুম অব স্টুলকে বেশ সম্মানের চোখে দেখা হতো।

পিন সেটার

old9
১৯৩৬ সালে গটফ্রিড স্মিট যান্ত্রিক পিন সেটার উদ্ভাবনের আগপর্যন্ত বোলিং পিনগুলো সাজাতে, পড়ে যাওয়া পিনগুলো সরাতে এবং বলটি খেলোয়াড়ের হাতে দিয়ে আসতে এসব কমবয়সী ছেলেদের কাজে লাগানো হতো।

ফ্রেনোলজিস্ট

old10
বর্ণবাদ এবং অপবিজ্ঞানের দায় মাথায় নিয়ে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে এ পেশাটি। মানুষ এককালে ফ্রেনোলজিস্টের কাছে গেলে তিনি একজনের মাথার আকার দেখে তার বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কে ধারণা দিতে পারতেন!

পাউডারমাঙ্কি

অতীতের নৌপথের যুদ্ধগুলোতে কমবয়সী যে ছেলেগুলো কামানে গানপাউডার ভরে দিতো তাদেরকে বলা হতো পাউডারমাঙ্কি।

লেক্টর

old11
ফ্যাক্টরিতে কাজ করতে করতে শ্রমিকদের মাঝে যাতে একঘেয়েমি জেঁকে না বসে সেজন্য নিয়োগ দেয়া হতো লেক্টরদের। তাদের কাজ ছিলো উচ্চস্বরে বিভিন্ন খবর এবং সাহিত্যকর্ম পড়ে যাওয়া।

র‍্যাট ক্যাচার

old12
এখন তো ইঁদুর মারার জন্য কত রকমের ওষুধের কথাই শোনা যায় রাস্তার বের হলে। কিন্তু এককালে যখন এসব ওষুধ ছিলো না, তখন এসব র‍্যাট ক্যাচাররাই ইঁদুর ধরার দায়িত্বটি নিষ্ঠার সাথে পালন করতেন।

Sunday, October 9, 2016

চলুন রাশিয়ার #ওজারাস্ক থেকে ঘুরে আসি

এক.
রূপপুর প্রকল্পের পারমানবিক বর্জ্য ও পারমানবিক দুর্ঘটনা-- কোনটারই দায় নিচ্ছে না রাশিয়া, এটা এখন মোটামুটি নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে। দায়-দায়িত্ব নেয়ার কথাও ছিল না। কিন্তু তারপরও কিছু মানুষ কিছু সময়ের জন্য সবাইকে বোকা বানাতে চায়--এটাই স্বাভাবিক এবং এখনও এরকম বলা হচ্ছে, রাশিয়া বর্জ্যগুলো নেবেই। যারা এরূপ দাবি (যদিও অসত্য) করেন--তারা কি জানেন, রাশিয়া এই বর্জ্যগুলো নিয়ে কি করে?
দুই.
বাংলাদেশে আমরা পারমানবিক বর্জ্যের বিষক্রিয়া থেকে দূরে থাকতে চাই--তাই হয়তো রাশিয়া বর্জ্যগুলো নিলেই স্বস্তি পেতাম। কিন্তু বিশ্বের অন্য গোলার্ধেও মানুষ এইরূপ বর্জ্যরে ক্ষতির শিকার হোক সেটা কি আমরা চাইবো? এই চাওয়াটা কতটা যৌক্তিক? কতটা ন্যায়সঙ্গত?
এরকম প্রশ্ন নিয়েই চলুন রাশিয়ার শহর ওজারাস্ক থেকে ঘুরে আসি। যদিও সহজ নয় ব্যাপারটি।
ওজারাস্ক হলো রাশিয়ার সেসব গোপন অঞ্চলের একটি যেগুলো সোভিয়েত আমলে মানচিত্রেও উল্লেখ করা হতো না। ওজারাস্ককে তাই বলা হতো ‘গোস্ট সিটি’ বা ‘ক্লোজ সিটি’। এখন আগের মতো বিষয়টি আর গোপনীয়তায় মোড়া নেই। কিন্তু বিশেষ অনুমতি ছাড়া ইচ্ছা করলেই এখনো ওজারাস্কেও মতো শহরগুলোতে যাওয়া না। 
(ছবি: এক)
ওজারাস্কেও মতো ৪২টি শহর রয়েছে রাশিয়ার দূর-দূরান্তে। যাদের বলা হয় CDTA (Close Administration Territorial Entites). কাঁটাতার দিয়ে ঘেরা থাকে শহরগুলো। আছে কড়া পাহারাও। গোপন পরিচয়ে এসব পাহারা এড়িয়েই তৈরি হয়েছে বিশেষ প্রামাণ্যচিত্র ‘City-40’. https://www.youtube.com/watch?v=JdECNRkh01Q আর তখনি কেবল বহির্বিশ্ব পারমানবিক বর্জ্যরে অভিশাপ সম্পর্কে বিশ্বাসযোগ্য আরও বাস্তব তথ্যাদি পায়। 

তিন. 
ওজরাস্কের মতো শহরগুলোকে তৈরি করা করা হয়েছিল পারমানবিক কার্যক্রম চালানোর জন্য। ১৯৪৫ সালে এখানেই গোড়াপত্তন হয় সোভিয়েত পারমানবিক কর্মসূচির।weapons-grade plutonium বানানোর জন্য এখানে ছয়টি রিএক্টর ছিল। পরে এলাকাটি পারমানবিক বর্জ্যরে ভাগাড় হয়ে ওঠে। আর এসব কর্মসূচির পূর্ণাঙ্গ তথ্য আশেপাশের নাগরিকরা কমই জানতেন। এসব নিয়ে কথা বলাও দেশদ্রোহীতা হিসিবে চিহ্নিত হতো। শুরুতে এখানাকর শ্রমজীবীদের বিরাট অংশ ছিল শ্রমশিবিরের বন্দিরা। ফলে স্থানীয়রা কিছুটা উদাসীন ছিল ঘটনাবলীর প্রতি। আবার, শহরগুলোকে এরকম কাজে লাগানোর সময় বাসিন্দাদের অসন্তোষ তাড়াতে এও ঘোষণা করা হয় যে, এখানকার নাগরিকরা বাড়তি ২০ শতাংশ বেতন-ভাতা পাবেন। খাদ্য সরবরাহের ক্ষেত্রেও তারা অগ্রাধিকার পাবেন। এরকম আরও কিছু প্রলোভন আর রাষ্ট্রীয় চাপ-- সবমিলে ওজরাস্কেও নাগরিকরা কালে কালে পারমানবিক বর্জ্যরে ডাম্পিং মেনে নেয়।
কিন্তু ১৯৯২ সালে অনেক সোভিয়েত দলিলদস্তাবেজ ডি-ক্লাসিফাইড হওয়ার পর জানা যায় যে, এখানে জন্ম নেয়া ৯০ ভাগ শিশুর মাঝে স্থানীয় শিশুবিশেষজ্ঞরা পারমানবিক দূষণজনিত শারীরিক জটিলতার সন্ধান পেয়েছিলেন।
চার.
৯০ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে গড়ে ওঠা ওজারাস্কে লোকসংখ্যা আছে এক লাখের মতো। এখানকার শহর দারুণ সাজানো গোছানো--এমনকি আন্ডার গ্রাউন্ড স্থাপনাও। প্রকৃতিও এখানে খুব সুন্দর। কিন্তু সমস্যা একটাই-- এটা বিশ্বের অন্যতম তেজষ্ক্রিয়তা কবলিত এলাকা। এখানে অনেক নবজাতকই ক্যানসারের আশঙ্কা নিয়েই জন্মায়। দূরবর্তী এলাকার তুলনায় ওজরাস্কের বাসিন্দাদের মাঝে ক্যানসারের মাত্রা পাঁচ গুণ বেশি।
পাঁচ. 
উল্লেখ্য, সোভিয়েত ইউনিয়ন মানচিত্র থেকে আড়ালে রাখলেও সিআইএ এই শহরটির কথা জানতো। তারা নিজস্ব ফাইলে একে নাম দিয়েছিল Kyshtym. কিন্তু কৌতূহল উদ্দীপক দিক হলো ১৯৫৭ সালে এখানকার ‘মায়াক প্লান্ট’-এ যখন দুর্ঘটনা ঘটে তখন সিআইএও (দু’বছর পরে তারা পূর্ণাঙ্গ তথ্য পায়) সেটা গোপন করে রেখেছিল এ কারণে যে, যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ এই দুর্ঘটনার ভয়াবহতা সম্পর্কে জেনে যদি নিজেদের দেশের প্লান্টের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে আসে!! 
এভাবে সারা দুনিয়াই কার্যত ওজারাস্কের ধারাবাহিক বিপর্যয় সম্পর্কে অজ্ঞ থেকে যায়।
পাঁচ. 
ওজারাস্কের মতো অবস্থা হতে পারে বিশ্বের যেকোন শহরেই-- যারা পারমানবিক বর্জ্যরে পারমানবিক দুর্ঘটনার ভয়াবহতাকে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক স্বার্থে আড়াল করতে চায়।
দক্ষিণ এশিয়ায় পারমানবিক যুদ্ধের ঝুঁকি তৈরির জন্য সম্প্রতি আমরা যখন ভারত-পাকিস্তানকে দোষারূপ করছি-- তখন আমাদের পারমানবিক বর্জ্যের জন্য যারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে তাদের অভিশাপের দায় আমরা কীভাবে মোকাবেলা করবো?
বাংলাদেশ থেকে যদি রাশিয়া পারমানবিক বর্জ্য নেয়ও (যার সম্ভাবনা ক্ষীণ) তাহলে এরকম স্থানেই সেগুলো প্রক্রিয়াজত করা হবে। আমরা কী তা চাইবো?
পুনশ্চ:১
অসাধারণ যে লেকটি ওজারাস্ককে মোহনীয় করে রেখেছে--তাতে তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা এত বেশি যে, একে এখন বলা হয় #প্লুটোনিয়াম #লেক (তৃতীয় ছবি)। হয়তো পাবনার নিকটবর্তী পদ্মাকেও একসময় এমন কোন নাম দেবে আমাদের সন্তানরা।
পুনশ্চ:২
যারা শেষ পর্যন্ত এই লেখা পড়ছেন তাদের শেষ ছবিটি বিশেষভাবে দেখতে অনুরোধ করবো। রাশিয়ার কর্তৃপক্ষ খুব যত্ন করে এরকম শহরগুলোতে বাচ্চাদের জন্য চিত্তাকর্ষক পার্কও তৈরি করেছিল। আজ ওই এলাকায় মানুষই নেই। তাই পার্কটি পড়ে আছে পতিত এলাকা হিসেবে। এ যেন আমাদের জন্যও গভীরতর বার্তা দিচ্ছে।https://www.theguardian.com/cities/2016/jul/20/graveyard-earth-inside-city-40-ozersk-russia-deadly-secret-nuclear