Sunday, October 9, 2016

চলুন রাশিয়ার #ওজারাস্ক থেকে ঘুরে আসি

এক.
রূপপুর প্রকল্পের পারমানবিক বর্জ্য ও পারমানবিক দুর্ঘটনা-- কোনটারই দায় নিচ্ছে না রাশিয়া, এটা এখন মোটামুটি নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে। দায়-দায়িত্ব নেয়ার কথাও ছিল না। কিন্তু তারপরও কিছু মানুষ কিছু সময়ের জন্য সবাইকে বোকা বানাতে চায়--এটাই স্বাভাবিক এবং এখনও এরকম বলা হচ্ছে, রাশিয়া বর্জ্যগুলো নেবেই। যারা এরূপ দাবি (যদিও অসত্য) করেন--তারা কি জানেন, রাশিয়া এই বর্জ্যগুলো নিয়ে কি করে?
দুই.
বাংলাদেশে আমরা পারমানবিক বর্জ্যের বিষক্রিয়া থেকে দূরে থাকতে চাই--তাই হয়তো রাশিয়া বর্জ্যগুলো নিলেই স্বস্তি পেতাম। কিন্তু বিশ্বের অন্য গোলার্ধেও মানুষ এইরূপ বর্জ্যরে ক্ষতির শিকার হোক সেটা কি আমরা চাইবো? এই চাওয়াটা কতটা যৌক্তিক? কতটা ন্যায়সঙ্গত?
এরকম প্রশ্ন নিয়েই চলুন রাশিয়ার শহর ওজারাস্ক থেকে ঘুরে আসি। যদিও সহজ নয় ব্যাপারটি।
ওজারাস্ক হলো রাশিয়ার সেসব গোপন অঞ্চলের একটি যেগুলো সোভিয়েত আমলে মানচিত্রেও উল্লেখ করা হতো না। ওজারাস্ককে তাই বলা হতো ‘গোস্ট সিটি’ বা ‘ক্লোজ সিটি’। এখন আগের মতো বিষয়টি আর গোপনীয়তায় মোড়া নেই। কিন্তু বিশেষ অনুমতি ছাড়া ইচ্ছা করলেই এখনো ওজারাস্কেও মতো শহরগুলোতে যাওয়া না। 
(ছবি: এক)
ওজারাস্কেও মতো ৪২টি শহর রয়েছে রাশিয়ার দূর-দূরান্তে। যাদের বলা হয় CDTA (Close Administration Territorial Entites). কাঁটাতার দিয়ে ঘেরা থাকে শহরগুলো। আছে কড়া পাহারাও। গোপন পরিচয়ে এসব পাহারা এড়িয়েই তৈরি হয়েছে বিশেষ প্রামাণ্যচিত্র ‘City-40’. https://www.youtube.com/watch?v=JdECNRkh01Q আর তখনি কেবল বহির্বিশ্ব পারমানবিক বর্জ্যরে অভিশাপ সম্পর্কে বিশ্বাসযোগ্য আরও বাস্তব তথ্যাদি পায়। 

তিন. 
ওজরাস্কের মতো শহরগুলোকে তৈরি করা করা হয়েছিল পারমানবিক কার্যক্রম চালানোর জন্য। ১৯৪৫ সালে এখানেই গোড়াপত্তন হয় সোভিয়েত পারমানবিক কর্মসূচির।weapons-grade plutonium বানানোর জন্য এখানে ছয়টি রিএক্টর ছিল। পরে এলাকাটি পারমানবিক বর্জ্যরে ভাগাড় হয়ে ওঠে। আর এসব কর্মসূচির পূর্ণাঙ্গ তথ্য আশেপাশের নাগরিকরা কমই জানতেন। এসব নিয়ে কথা বলাও দেশদ্রোহীতা হিসিবে চিহ্নিত হতো। শুরুতে এখানাকর শ্রমজীবীদের বিরাট অংশ ছিল শ্রমশিবিরের বন্দিরা। ফলে স্থানীয়রা কিছুটা উদাসীন ছিল ঘটনাবলীর প্রতি। আবার, শহরগুলোকে এরকম কাজে লাগানোর সময় বাসিন্দাদের অসন্তোষ তাড়াতে এও ঘোষণা করা হয় যে, এখানকার নাগরিকরা বাড়তি ২০ শতাংশ বেতন-ভাতা পাবেন। খাদ্য সরবরাহের ক্ষেত্রেও তারা অগ্রাধিকার পাবেন। এরকম আরও কিছু প্রলোভন আর রাষ্ট্রীয় চাপ-- সবমিলে ওজরাস্কেও নাগরিকরা কালে কালে পারমানবিক বর্জ্যরে ডাম্পিং মেনে নেয়।
কিন্তু ১৯৯২ সালে অনেক সোভিয়েত দলিলদস্তাবেজ ডি-ক্লাসিফাইড হওয়ার পর জানা যায় যে, এখানে জন্ম নেয়া ৯০ ভাগ শিশুর মাঝে স্থানীয় শিশুবিশেষজ্ঞরা পারমানবিক দূষণজনিত শারীরিক জটিলতার সন্ধান পেয়েছিলেন।
চার.
৯০ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে গড়ে ওঠা ওজারাস্কে লোকসংখ্যা আছে এক লাখের মতো। এখানকার শহর দারুণ সাজানো গোছানো--এমনকি আন্ডার গ্রাউন্ড স্থাপনাও। প্রকৃতিও এখানে খুব সুন্দর। কিন্তু সমস্যা একটাই-- এটা বিশ্বের অন্যতম তেজষ্ক্রিয়তা কবলিত এলাকা। এখানে অনেক নবজাতকই ক্যানসারের আশঙ্কা নিয়েই জন্মায়। দূরবর্তী এলাকার তুলনায় ওজরাস্কের বাসিন্দাদের মাঝে ক্যানসারের মাত্রা পাঁচ গুণ বেশি।
পাঁচ. 
উল্লেখ্য, সোভিয়েত ইউনিয়ন মানচিত্র থেকে আড়ালে রাখলেও সিআইএ এই শহরটির কথা জানতো। তারা নিজস্ব ফাইলে একে নাম দিয়েছিল Kyshtym. কিন্তু কৌতূহল উদ্দীপক দিক হলো ১৯৫৭ সালে এখানকার ‘মায়াক প্লান্ট’-এ যখন দুর্ঘটনা ঘটে তখন সিআইএও (দু’বছর পরে তারা পূর্ণাঙ্গ তথ্য পায়) সেটা গোপন করে রেখেছিল এ কারণে যে, যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ এই দুর্ঘটনার ভয়াবহতা সম্পর্কে জেনে যদি নিজেদের দেশের প্লান্টের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে আসে!! 
এভাবে সারা দুনিয়াই কার্যত ওজারাস্কের ধারাবাহিক বিপর্যয় সম্পর্কে অজ্ঞ থেকে যায়।
পাঁচ. 
ওজারাস্কের মতো অবস্থা হতে পারে বিশ্বের যেকোন শহরেই-- যারা পারমানবিক বর্জ্যরে পারমানবিক দুর্ঘটনার ভয়াবহতাকে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক স্বার্থে আড়াল করতে চায়।
দক্ষিণ এশিয়ায় পারমানবিক যুদ্ধের ঝুঁকি তৈরির জন্য সম্প্রতি আমরা যখন ভারত-পাকিস্তানকে দোষারূপ করছি-- তখন আমাদের পারমানবিক বর্জ্যের জন্য যারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে তাদের অভিশাপের দায় আমরা কীভাবে মোকাবেলা করবো?
বাংলাদেশ থেকে যদি রাশিয়া পারমানবিক বর্জ্য নেয়ও (যার সম্ভাবনা ক্ষীণ) তাহলে এরকম স্থানেই সেগুলো প্রক্রিয়াজত করা হবে। আমরা কী তা চাইবো?
পুনশ্চ:১
অসাধারণ যে লেকটি ওজারাস্ককে মোহনীয় করে রেখেছে--তাতে তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা এত বেশি যে, একে এখন বলা হয় #প্লুটোনিয়াম #লেক (তৃতীয় ছবি)। হয়তো পাবনার নিকটবর্তী পদ্মাকেও একসময় এমন কোন নাম দেবে আমাদের সন্তানরা।
পুনশ্চ:২
যারা শেষ পর্যন্ত এই লেখা পড়ছেন তাদের শেষ ছবিটি বিশেষভাবে দেখতে অনুরোধ করবো। রাশিয়ার কর্তৃপক্ষ খুব যত্ন করে এরকম শহরগুলোতে বাচ্চাদের জন্য চিত্তাকর্ষক পার্কও তৈরি করেছিল। আজ ওই এলাকায় মানুষই নেই। তাই পার্কটি পড়ে আছে পতিত এলাকা হিসেবে। এ যেন আমাদের জন্যও গভীরতর বার্তা দিচ্ছে।https://www.theguardian.com/cities/2016/jul/20/graveyard-earth-inside-city-40-ozersk-russia-deadly-secret-nuclear

No comments:

Post a Comment