‘জোছনা ও জননীর গল্প’ শীর্ষক উপন্যাসের ‘পূর্বকথা’য় নন্দিত নরকের স্রষ্টা ড. হুমায়ূন আহমেদ লিখেছেন : ‘আমার সাজানো অতি পরিচিত ভুবন পুরোপুরি ভেঙ্গে পড়ল ১৯৭১ সনে। যে পরিস্থিতিতে আমি পড়লাম, তার জন্যে কোনো রকম প্রস্তুতি আমার ছিল না। ছায়াঘেরা শান্ত দিঘির একটা মাছকে হঠাৎ যেন নিয়ে যাওয়া হলো চৈত্রের দাবদাহে ঝলসে যাওয়া স্থলভূমিতে। কত বিচিত্র অভিজ্ঞতা! ভাইবোন নিয়ে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় পালাচ্ছি। জীবন বাঁচানোর জন্যে মাদ্রাসার ছাত্র হিসেবে ভর্তি হতে গেছি শর্ষিণার পীর সাহেবের মাদ্রাসায়। পাকিস্তান মিলিটারি মাথায় গুলির বাক্স তুলে দিয়েছে। অকল্পনীয় ওজনের গুলির বাক্স মাথায় নিয়ে সৈন্যদের সাথে বারহাট্টা থেকে হেঁটে হেঁটে এসেছি নেত্রকোনা পর্যন্ত। মিলিটারির বন্দিশিবিরে কাটল কিছু সময়। কী ভয়ঙ্কর অত্যাচার! এক সকালে মিলিটারিদের একজন এসে আমার হাতে বিশাল সাইজের একটা সাগরকলা ধরিয়ে দিয়ে বলল, তোমাকে কাল সকালে গুলি করে মারা হবে। এটা তোমার জন্যে ভালো। যদি তুমি নিরপরাধ হও, সরাসরি বেহেশতে চলে যাবে। আর যদি অপরাধী হও, তাহলে মৃত্যু তোমার প্রাপ্য শাস্তি।’ (ঢাকা: অন্য প্রকাশ, ২০১০)।
মুক্তিযুদ্ধের সময় পরিবারের অন্যদের নিয়ে ‘এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায়’ পালিয়ে চলার এবং ‘শর্ষিণার পীরের মাদ্রাসায়’ ভর্তি হতে যাওয়ার ঘটনা হুমায়ূন আহমেদ বিস্তারিতভাবে লিখেছেন অনন্ত অমরে শীর্ষক স্মৃতিকথায় (ঢাকা : কাকলী প্রকাশনী, ২০১২) এবং সংক্ষেপে বলেছেন পাক্ষিক অন্যদিন পত্রিকায় (ঢাকা : ১-১৫ নভেম্বর ২০০১) এক সাক্ষাৎকারে। পিরোজপুরের গোয়ারেখা নামের এক অজপাড়া গাঁয়ের এক মাওলানা সাহেবের বাড়িতে তারা আশ্রয় পেয়েছিলেন।
মিলিটারির হাত থেকে রক্ষার জন্য সেই মাওলানা সাহেব বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া দুই ভাই ড. হুমায়ূন আহমেদ ও ড. জাফর ইকবালকে টুপি-পাঞ্জাবি পরিয়ে শর্ষিণা মাদরাসার ছাত্র হিসেবে ভর্তি করার জন্য তৎকালীন পীর সাহেব মাওলানা আবু জাফর মোহাম্মদ সালেহর বাড়ি নিয়ে গিয়েছিলেন। পীর সাহেব তাতে সেই মাওলানার ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে ভর্তি না করে তাদের ফেরৎ পাঠিয়েছিলেন।
নেত্রকোনায় মিলিটারির বন্দীশিবিরে হুমায়ূন আহমেদ এবং অন্য বাঙালি যুবকেরা মিলিটারির দ্বারা যে নির্যাতনের শিকার হন, সেটিকে তিনি এক কথায় ‘মেরে তক্তা বানানো’ বলেছেন (পাক্ষিক অন্যদিন, ১ নভেম্বর ২০০১)। মিলিটারির সেই বন্দীশিবির থেকে সম্ভাব্য মৃত্যুর কিছু আগে তার এক আত্মীয়ের হস্তক্ষেপে ছাড়া পান তিনি। তার পিতা তৎকালীন পুলিশের এসডিপিও ফয়জুর রহমান আহমেদ পিরোজপুরে মিলিটারির হাতে শহীদ হন।
১৯৯৪ সালে ‘রচিতব্য শ্রেষ্ঠ লেখা’ বিষয়ে বাংলা সাহিত্যের এক অধ্যাপক শাহজাহান মিয়াকে হুমায়ূন আহমেদ বলেছিলেন : “আমার সেই লেখার বিষয়বস্ত হইবে মহান স্বাধীনতাযুদ্ধ। আমি বড় ধরনের কাজ করিতে চাই। এই জন্য আরো সময় দরকার। এই তো মাত্র দেশ স্বাধীন হইল, রক্তের দাগ এখনো শুকায় নাই। এত বড় ঘটনার বিষয়ে মহৎ কিছু সৃষ্টির সময় এখনো আসে নাই। নেপোলিয়নের রুশদেশ আক্রমণের শতাধিক বছর পর ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’-এর মতো মহৎ সাহিত্য সৃষ্টি হইয়াছে। আমাদের অপেক্ষা করিতে হইবে। এখন এই বিষয়ে লেখার কিছু সমস্যাও আছে। যেমন আমার বাবা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করিয়া পাকবাহিনীর হাতে নির্মমভাবে শহীদ হইয়াছেন। আমার নানা পাকবাহিনীর দোসর হইয়া এলাকার বহু নিরীহ মানুষকে নির্যাতনের হাত হইতে বাঁচাইয়া দিয়াছেন। আমি কাহাকে খাটো করিয়া দেখিব? কাহাকে রাখিব, কাহাকে ফেলিব? ভাবিবার অনেক কিছু আছে।” (ঢাকা : দৈনিক কালের কণ্ঠর ম্যাগাজিন শিলালিপি, পৃ-১০, ১৬ নভেম্বর ২০১২)।
কবি-ঔপন্যাসিক ডা: বুলবুল সরওয়ার লিখেছেন :“তার শেষের দিকের লেখায় তিনি হয়ে উঠেছিলেন ইতিহাসের ভাষ্যকার; বিদ্রƒপ হয়ে উঠেছিল কলমের আঁচড়। হয়তো চেয়েছিলেন, আমাদের হবুরাজা আর গবুমন্ত্রীরা চল্লিশ বছরেও যে ফুটোগুলো দেখতে পাননি (বন্ধ করতে যাওয়াতো পরের কথা), সেগুলো যেন সাধারণ মানুষের নজরে আসে। যেমনÑ তার একটা সিনেমার শেষ দৃশ্যে তিনি যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমা চাওয়া দেখিয়েছিলেন। অতি সহজ সমাধান। জাতিকে আবারো যুদ্ধে ঠেলে না দেয়ার এই স্বতঃস্ফূর্ত অভিনয় দেখে আমার ‘জুতা আবিষ্কার’ কবিতার কথা মনে পড়ে যায়। রবিঠাকুরের এসব কবিতা নিয়ে সমকালে প্রবল ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপ হয়েছে। হুমায়ূনের ক্ষেত্রে তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। কিন্তু এই সহজ সমাধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যেমন বুঝেছিলেন, হুমায়ূন আহমেদও বুঝেছেন এবং বোঝাতে পেরেছেন; যদিও বুঝতে পারেননি অপরাধীরা এবং রাজনীতির কুশীলবেরা। ফলে যা ঘটছে এবং ঘটবেÑ পাঠকরা তা দেখতে পাচ্ছেন।” (ঢাকা : দৈনিক নয়া দিগন্তের মাসিক ম্যাগাজিন ‘অন্য এক দিগন্ত’ পৃ:-৩৬-৩৭, আগস্ট-২০১২)।
স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ শক্তিবিষয়ক এক প্রশ্নের জবাবে হুমায়ূন আহমেদ ২০০১ সালেই বলেছিলেন : “আমি নিজেও মনে করি এতদিন পরেও কেন পক্ষশক্তি বিপক্ষশক্তির এই বিভাজন? তার পরেও কথা থাকে। মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা সরাসরি বিপক্ষ শক্তি হিসেবে কাজ করেছেন তারা কি বিভেদটা ভুলছেন? তারা কি কখনো তাদের কৃতকর্মের জন্যে দেশ এবং জাতির কাছে ক্ষমা চেয়েছেন?” (পাক্ষিক অন্যদিন, ঢাকা-১ নভেম্বর, ২০০১)।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালে হুমায়ূন আহমেদের অবস্থা, এ বিষয়ে তার মূল্যায়ন ও দৃষ্টিভঙ্গি বিষয়ে উল্লিখিত উদ্ধৃতিগুলো থেকে জানা যায়। এখানে কয়েকটি বিষয় বিবেচনার দাবি রাখে। এক. পাকিস্তানি মিলিটারি নির্বিচারে সীমাহীন নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে। দুই. বাংলাদেশের মানুষেরা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে যেমন অংশ নিয়ে নানামাত্রিক ত্যাগ স্বীকার করেছে, তেমনি অনেকে এ মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাও করেছেন। যারা এ যুদ্ধের বিরোধিতা করেছেন বা পাকবাহিনীর দোসর হিসেবে কাজ করেছেন, তারা সবাই একই দৃষ্টিভঙ্গির মানুষ ছিলেন না এবং সবাই নারী-শিশু-বৃদ্ধ হত্যাসহ অপরাধমূলক কার্যক্রমের অংশীদার ছিলেন না। দালাল-রাজাকারদের বেশির ভাগই পেটের দায়ে মিলিটারির দোসর হয়েছেন। আবার অনেকে শুধুই এলাকার মানুষকে পাকবাহিনীর নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষার জন্য প্রকাশ্যে মিলিটারির দোসর সেজেছেন। ড. হুমায়ূন আহমেদের নানা এবং মামা এ ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ উদাহরণ। তারা এলাকার নিরীহ মানুষকে মিলিটারির নির্যাতন থেকে রক্ষার জন্য শান্তি কমিটির নামে কাজ করেছেন। কিন্তু তাদের দু’জনকেই ১৬ ডিসেম্বরের (১৯৭১) পরে মুক্তিবাহিনী নির্মমভাবে হত্যা করে। এ সত্য ড. হুমায়ূন জানতেন এবং বুঝতেন বলেই বঙ্গবন্ধুর নীতির ভিত্তিতে তিনি খুন-ধর্ষণ-জ্বালাও কার্যক্রমের জন্য অভিযুক্তদের বাইরে সবাইকে ক্ষমা করার পক্ষে ছিলেন। যারা পেটের দায়ে দালাল হয়েছিলেন, যারা এলাকাবাসীকে রক্ষার জন্য দালাল হয়েছিলেন এবং যে দালালেরা খুন-ধর্ষণ-জ্বালাও কর্মের অপরাধী নন, তাদের বিষয়ে বঙ্গবন্ধু এক দূরদর্শী শাসকের মতোই ক্ষমা করে দিয়েছিলেন।
বাংলাদেশে ‘ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি’ নামে একটি সংগঠন রয়েছে। এর সাথে অনেক দায়িত্বশীল ব্যক্তি যুক্ত বলে দেখা যায়। একাত্তরে যারা ঘাতকের ভূমিকা পালন করেছেন, উপযুক্ত প্রমাণসাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার বিরোধিতা করার সুযোগ নেই। কিন্তু ঘাতকদের সাথে একই সারিতে দালালদের দাঁড় করানো গুরুতরভাবেই অগ্রহণযোগ্য এবং সেটি হবে জাতীয় স্বার্থবিরোধী একটি জঘন্য উদ্যোগ। কারণ ১৯৭২ সালে ‘দালাল আইনের’ আওতায় অসংখ্য মানুষকে চিহ্নিত করার সুযোগ ছিল; একটি গ্রন্থ আমাকে এ বিষয়ে নির্দিষ্টভাবে বুঝতে সাহায্য করেছে। ‘বাংলাদেশের রাজনীতিতে আলেমসমাজ : ভূমিকা ও প্রভাব (১৯৭২-২০০১)’ (ড. তারিক মুহম্মদ তওফীকুর রহমান, ঢাকা : অ্যাকাডেমিক প্রেস অ্যান্ড পাবলিশার্স লাইব্রেরি, দ্বিতীয় সংস্করণ, ২০০৮) শীর্ষক বইটির পরিশিষ্টে ৩টি সংশোধনীসহ দালাল আইনের পূর্ণ পাঠ দেয়া আছে। দালালের (কোলবরেটর) সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি কাজে লেখায়-বক্তৃতায় আচরণে মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তান, পাকবাহিনী ও তার দোসরদের সাহায্য ও সমর্থন করেছেন তিনিই দালাল। এই বহু-ব্যাপক সংজ্ঞার ফলে সেই দালাল আইনটি অনেকের জন্য ব্যক্তিগত গোষ্ঠীগত দলীয় প্রতিহিংসা পূরণের মোক্ষম হাতিয়ারে পরিণত হয় আর এ আইনের নানামাত্রিক অপব্যবহার করা হয়। এ বাস্তবতা অনুধাবন করেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ১৯৭৩ সালের ৩০ নভেম্বর খুন-ধর্ষণ-জ্বালাও অভিযোগে অভিযুক্ত না হলে সব দালালের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন।
বঙ্গবন্ধু যেখানে ‘সাধারণ সব দালালের’ জন্য সাধারণ ক্ষমার ব্যবস্থা করেছেন, বঙ্গবন্ধুর অনুসারী হিসেবে পরিচয় দানকারী কিছু লোক ‘দালালদের নির্মূল’ করার কমিটি করে আন্দোলন করছেনÑ এটা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। বরং তা প্রতিরোধযোগ্য একটি বিষয়। কারণ বঙ্গবন্ধু সেই সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছিলেন বাঙালি জাতির বৃহত্তর সংহতি, ঐক্য ও সমৃদ্ধির স্বার্থে। এখন সেই ঘোষণার বিরোধিতার সহজ অর্থ বঙ্গবন্ধুকে অবজ্ঞা করা, অপমানিত করা এবং বাঙালি জাতির বৃহত্তর সংহতি, ঐক্য ও সমৃদ্ধির বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। একাত্তরের ঘাতকের বিরুদ্ধে দাঁড়ান, আপত্তি নেই, একাত্তরের দালালদের বিরুদ্ধে নয়। কারণ তাদের অধিকাংশই প্রধানত পরিস্থিতির শিকার ও নিরপরাধ সাধারণ মানুষ।
তিন. ড. হুমায়ূন আহমেদ মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিকারীদের জন্যও একটি সহজ করণীয় দেখিয়েছেন। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করার জন্য তাদের যদি ন্যূনতম গ্রহণযোগ্য কোনো কারণ থাকে তা জনতার উদ্দেশ্যে ব্যাখ্যা করা ও মুক্তিযুদ্ধকালে পাকবাহিনী ও তাদের দোসরদের দ্বারা সাধারণ দেশবাসী যে দুঃখ ও হত্যার শিকার হয়েছে তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা। এ কাজটি তারা কত সহজ ভাষায় ও সহজ প্রক্রিয়ায় করতে পারেন, তা তাদের বিবেচ্য। বঙ্গবন্ধুর নীতির অনুকরণ করে সাধারণ মানুষও তাদের হৃদয় থেকে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী দালালদের ক্ষমা করে দেবেন আশা করা যায়। বঙ্গবন্ধু জাতির বৃহত্তর যে স্বার্থের কথা বিবেচনায় রেখেছিলেন জাতি তার প্রতি সম্মান দেখাবে, আশা করি।
ড. আহমদ হাসান
লেখক : গবেষক, সমাজকর্মী, লন্ডন

