Monday, February 25, 2013

হুমায়ূন আহমেদের মুক্তিযুদ্ধ ভাবনা প্রসঙ্গ


‘জোছনা ও জননীর গল্প’ শীর্ষক উপন্যাসের ‘পূর্বকথা’য় নন্দিত নরকের স্রষ্টা ড. হুমায়ূন আহমেদ লিখেছেন : ‘আমার সাজানো অতি পরিচিত ভুবন পুরোপুরি ভেঙ্গে পড়ল ১৯৭১ সনে। যে পরিস্থিতিতে আমি পড়লাম, তার জন্যে কোনো রকম প্রস্তুতি আমার ছিল না। ছায়াঘেরা শান্ত দিঘির একটা মাছকে হঠাৎ যেন নিয়ে যাওয়া হলো চৈত্রের দাবদাহে ঝলসে যাওয়া স্থলভূমিতে। কত বিচিত্র অভিজ্ঞতা! ভাইবোন নিয়ে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় পালাচ্ছি। জীবন বাঁচানোর জন্যে মাদ্রাসার ছাত্র হিসেবে ভর্তি হতে গেছি শর্ষিণার পীর সাহেবের মাদ্রাসায়। পাকিস্তান মিলিটারি মাথায় গুলির বাক্স তুলে দিয়েছে। অকল্পনীয় ওজনের গুলির বাক্স মাথায় নিয়ে সৈন্যদের সাথে বারহাট্টা থেকে হেঁটে হেঁটে এসেছি নেত্রকোনা পর্যন্ত। মিলিটারির বন্দিশিবিরে কাটল কিছু সময়। কী ভয়ঙ্কর অত্যাচার! এক সকালে মিলিটারিদের একজন এসে আমার হাতে বিশাল সাইজের একটা সাগরকলা ধরিয়ে দিয়ে বলল, তোমাকে কাল সকালে গুলি করে মারা হবে। এটা তোমার জন্যে ভালো। যদি তুমি নিরপরাধ হও, সরাসরি বেহেশতে চলে যাবে। আর যদি অপরাধী হও, তাহলে মৃত্যু তোমার প্রাপ্য শাস্তি।’ (ঢাকা: অন্য প্রকাশ, ২০১০)।
মুক্তিযুদ্ধের সময় পরিবারের অন্যদের নিয়ে ‘এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায়’ পালিয়ে চলার এবং ‘শর্ষিণার পীরের মাদ্রাসায়’ ভর্তি হতে যাওয়ার ঘটনা হুমায়ূন আহমেদ বিস্তারিতভাবে লিখেছেন অনন্ত অমরে  শীর্ষক স্মৃতিকথায় (ঢাকা : কাকলী প্রকাশনী, ২০১২) এবং সংক্ষেপে বলেছেন পাক্ষিক অন্যদিন পত্রিকায় (ঢাকা : ১-১৫ নভেম্বর ২০০১) এক সাক্ষাৎকারে। পিরোজপুরের গোয়ারেখা নামের এক অজপাড়া গাঁয়ের এক মাওলানা সাহেবের বাড়িতে তারা আশ্রয় পেয়েছিলেন।
মিলিটারির হাত থেকে রক্ষার জন্য সেই মাওলানা সাহেব বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া দুই ভাই ড. হুমায়ূন আহমেদ ও ড. জাফর ইকবালকে টুপি-পাঞ্জাবি পরিয়ে শর্ষিণা মাদরাসার ছাত্র হিসেবে ভর্তি করার জন্য তৎকালীন পীর সাহেব মাওলানা আবু জাফর মোহাম্মদ সালেহর বাড়ি নিয়ে গিয়েছিলেন। পীর সাহেব তাতে সেই মাওলানার ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে ভর্তি না করে তাদের ফেরৎ পাঠিয়েছিলেন।
নেত্রকোনায় মিলিটারির বন্দীশিবিরে হুমায়ূন আহমেদ এবং অন্য বাঙালি যুবকেরা মিলিটারির দ্বারা যে নির্যাতনের শিকার হন, সেটিকে তিনি এক কথায় ‘মেরে তক্তা বানানো’ বলেছেন (পাক্ষিক অন্যদিন, ১ নভেম্বর ২০০১)। মিলিটারির সেই বন্দীশিবির থেকে সম্ভাব্য মৃত্যুর কিছু আগে তার এক আত্মীয়ের হস্তক্ষেপে ছাড়া পান তিনি। তার পিতা তৎকালীন পুলিশের এসডিপিও ফয়জুর রহমান আহমেদ পিরোজপুরে মিলিটারির হাতে শহীদ হন।
১৯৯৪ সালে ‘রচিতব্য শ্রেষ্ঠ লেখা’ বিষয়ে বাংলা সাহিত্যের এক অধ্যাপক শাহজাহান মিয়াকে হুমায়ূন আহমেদ বলেছিলেন : “আমার সেই লেখার বিষয়বস্ত হইবে মহান স্বাধীনতাযুদ্ধ। আমি বড় ধরনের কাজ করিতে চাই। এই জন্য আরো সময় দরকার। এই তো মাত্র দেশ স্বাধীন হইল, রক্তের দাগ এখনো শুকায় নাই। এত বড় ঘটনার বিষয়ে মহৎ কিছু সৃষ্টির সময় এখনো আসে নাই। নেপোলিয়নের রুশদেশ আক্রমণের শতাধিক বছর পর ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’-এর মতো মহৎ সাহিত্য সৃষ্টি হইয়াছে। আমাদের অপেক্ষা করিতে হইবে। এখন এই বিষয়ে লেখার কিছু সমস্যাও আছে। যেমন আমার বাবা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করিয়া পাকবাহিনীর হাতে নির্মমভাবে শহীদ হইয়াছেন। আমার নানা পাকবাহিনীর দোসর হইয়া এলাকার বহু নিরীহ মানুষকে নির্যাতনের হাত হইতে বাঁচাইয়া দিয়াছেন। আমি কাহাকে খাটো করিয়া দেখিব? কাহাকে রাখিব, কাহাকে ফেলিব? ভাবিবার অনেক কিছু আছে।” (ঢাকা : দৈনিক কালের কণ্ঠর ম্যাগাজিন শিলালিপি, পৃ-১০, ১৬ নভেম্বর ২০১২)।
কবি-ঔপন্যাসিক ডা: বুলবুল সরওয়ার লিখেছেন :“তার শেষের দিকের লেখায় তিনি হয়ে উঠেছিলেন ইতিহাসের ভাষ্যকার; বিদ্রƒপ হয়ে উঠেছিল কলমের আঁচড়। হয়তো চেয়েছিলেন, আমাদের হবুরাজা আর গবুমন্ত্রীরা চল্লিশ বছরেও যে ফুটোগুলো দেখতে পাননি (বন্ধ করতে যাওয়াতো পরের কথা), সেগুলো যেন সাধারণ মানুষের নজরে আসে। যেমনÑ তার একটা সিনেমার শেষ দৃশ্যে তিনি যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমা চাওয়া দেখিয়েছিলেন। অতি সহজ সমাধান। জাতিকে আবারো যুদ্ধে ঠেলে না দেয়ার এই স্বতঃস্ফূর্ত অভিনয় দেখে আমার ‘জুতা আবিষ্কার’ কবিতার কথা মনে পড়ে যায়। রবিঠাকুরের এসব কবিতা নিয়ে সমকালে প্রবল ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপ হয়েছে। হুমায়ূনের ক্ষেত্রে তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। কিন্তু এই সহজ সমাধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যেমন বুঝেছিলেন, হুমায়ূন আহমেদও বুঝেছেন এবং বোঝাতে পেরেছেন; যদিও বুঝতে পারেননি অপরাধীরা এবং রাজনীতির কুশীলবেরা। ফলে যা ঘটছে এবং ঘটবেÑ পাঠকরা তা দেখতে পাচ্ছেন।” (ঢাকা : দৈনিক নয়া দিগন্তের মাসিক ম্যাগাজিন ‘অন্য এক দিগন্ত’ পৃ:-৩৬-৩৭, আগস্ট-২০১২)।
স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ শক্তিবিষয়ক এক প্রশ্নের জবাবে হুমায়ূন আহমেদ ২০০১ সালেই বলেছিলেন : “আমি নিজেও মনে করি এতদিন পরেও কেন পক্ষশক্তি বিপক্ষশক্তির এই বিভাজন? তার পরেও কথা থাকে। মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা সরাসরি বিপক্ষ শক্তি হিসেবে কাজ করেছেন তারা কি বিভেদটা ভুলছেন? তারা কি কখনো তাদের কৃতকর্মের জন্যে দেশ এবং জাতির কাছে ক্ষমা চেয়েছেন?” (পাক্ষিক অন্যদিন, ঢাকা-১ নভেম্বর, ২০০১)।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালে হুমায়ূন আহমেদের অবস্থা, এ বিষয়ে তার মূল্যায়ন ও দৃষ্টিভঙ্গি বিষয়ে উল্লিখিত উদ্ধৃতিগুলো থেকে জানা যায়। এখানে কয়েকটি বিষয় বিবেচনার দাবি রাখে। এক. পাকিস্তানি মিলিটারি নির্বিচারে সীমাহীন নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে। দুই. বাংলাদেশের মানুষেরা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে যেমন অংশ নিয়ে নানামাত্রিক ত্যাগ স্বীকার করেছে, তেমনি অনেকে এ মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাও করেছেন। যারা এ যুদ্ধের বিরোধিতা করেছেন বা পাকবাহিনীর দোসর হিসেবে কাজ করেছেন, তারা সবাই একই দৃষ্টিভঙ্গির মানুষ ছিলেন না এবং সবাই নারী-শিশু-বৃদ্ধ হত্যাসহ অপরাধমূলক কার্যক্রমের অংশীদার ছিলেন না। দালাল-রাজাকারদের বেশির ভাগই পেটের দায়ে মিলিটারির দোসর হয়েছেন। আবার অনেকে শুধুই এলাকার মানুষকে পাকবাহিনীর নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষার জন্য প্রকাশ্যে মিলিটারির দোসর সেজেছেন। ড. হুমায়ূন আহমেদের নানা এবং মামা এ ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ উদাহরণ। তারা এলাকার নিরীহ মানুষকে মিলিটারির নির্যাতন থেকে রক্ষার জন্য শান্তি কমিটির নামে কাজ করেছেন। কিন্তু তাদের দু’জনকেই ১৬ ডিসেম্বরের (১৯৭১) পরে মুক্তিবাহিনী নির্মমভাবে হত্যা করে। এ সত্য ড. হুমায়ূন জানতেন এবং বুঝতেন বলেই বঙ্গবন্ধুর নীতির ভিত্তিতে তিনি খুন-ধর্ষণ-জ্বালাও কার্যক্রমের জন্য অভিযুক্তদের বাইরে সবাইকে ক্ষমা করার পক্ষে ছিলেন। যারা পেটের দায়ে দালাল হয়েছিলেন, যারা এলাকাবাসীকে রক্ষার জন্য দালাল হয়েছিলেন এবং যে দালালেরা খুন-ধর্ষণ-জ্বালাও কর্মের অপরাধী নন, তাদের বিষয়ে বঙ্গবন্ধু এক দূরদর্শী শাসকের মতোই ক্ষমা করে দিয়েছিলেন।
বাংলাদেশে ‘ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি’ নামে একটি সংগঠন রয়েছে। এর সাথে অনেক দায়িত্বশীল ব্যক্তি যুক্ত বলে দেখা যায়। একাত্তরে যারা ঘাতকের ভূমিকা পালন করেছেন, উপযুক্ত প্রমাণসাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার বিরোধিতা করার সুযোগ নেই। কিন্তু ঘাতকদের সাথে একই সারিতে দালালদের দাঁড় করানো গুরুতরভাবেই অগ্রহণযোগ্য এবং সেটি হবে জাতীয় স্বার্থবিরোধী একটি জঘন্য উদ্যোগ। কারণ ১৯৭২ সালে ‘দালাল আইনের’ আওতায় অসংখ্য মানুষকে চিহ্নিত করার সুযোগ ছিল; একটি গ্রন্থ আমাকে এ বিষয়ে নির্দিষ্টভাবে বুঝতে সাহায্য করেছে। ‘বাংলাদেশের রাজনীতিতে আলেমসমাজ : ভূমিকা ও প্রভাব (১৯৭২-২০০১)’ (ড. তারিক মুহম্মদ তওফীকুর রহমান, ঢাকা : অ্যাকাডেমিক প্রেস অ্যান্ড পাবলিশার্স লাইব্রেরি, দ্বিতীয় সংস্করণ, ২০০৮) শীর্ষক বইটির পরিশিষ্টে ৩টি সংশোধনীসহ দালাল আইনের পূর্ণ পাঠ দেয়া আছে। দালালের (কোলবরেটর) সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি কাজে লেখায়-বক্তৃতায় আচরণে মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তান, পাকবাহিনী ও তার দোসরদের সাহায্য ও সমর্থন করেছেন তিনিই দালাল। এই বহু-ব্যাপক সংজ্ঞার ফলে সেই দালাল আইনটি অনেকের জন্য ব্যক্তিগত গোষ্ঠীগত দলীয় প্রতিহিংসা পূরণের মোক্ষম হাতিয়ারে পরিণত হয় আর এ আইনের নানামাত্রিক অপব্যবহার করা হয়। এ বাস্তবতা অনুধাবন করেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ১৯৭৩ সালের ৩০ নভেম্বর খুন-ধর্ষণ-জ্বালাও অভিযোগে অভিযুক্ত না হলে সব দালালের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন।
বঙ্গবন্ধু যেখানে ‘সাধারণ সব দালালের’ জন্য সাধারণ ক্ষমার ব্যবস্থা করেছেন, বঙ্গবন্ধুর অনুসারী হিসেবে পরিচয় দানকারী কিছু লোক ‘দালালদের নির্মূল’ করার কমিটি করে আন্দোলন করছেনÑ এটা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। বরং তা প্রতিরোধযোগ্য একটি বিষয়। কারণ বঙ্গবন্ধু সেই সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছিলেন বাঙালি জাতির বৃহত্তর সংহতি, ঐক্য ও সমৃদ্ধির স্বার্থে। এখন সেই ঘোষণার বিরোধিতার সহজ অর্থ বঙ্গবন্ধুকে অবজ্ঞা করা, অপমানিত করা এবং বাঙালি জাতির বৃহত্তর সংহতি, ঐক্য ও সমৃদ্ধির বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। একাত্তরের ঘাতকের বিরুদ্ধে দাঁড়ান, আপত্তি নেই, একাত্তরের দালালদের বিরুদ্ধে নয়। কারণ তাদের অধিকাংশই প্রধানত পরিস্থিতির শিকার ও নিরপরাধ সাধারণ মানুষ।
তিন. ড. হুমায়ূন আহমেদ মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিকারীদের জন্যও একটি সহজ করণীয় দেখিয়েছেন। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করার জন্য তাদের যদি ন্যূনতম গ্রহণযোগ্য কোনো কারণ থাকে তা জনতার উদ্দেশ্যে ব্যাখ্যা করা ও মুক্তিযুদ্ধকালে পাকবাহিনী ও তাদের দোসরদের দ্বারা সাধারণ দেশবাসী যে দুঃখ ও হত্যার শিকার হয়েছে তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা। এ কাজটি তারা কত সহজ ভাষায় ও সহজ প্রক্রিয়ায় করতে পারেন, তা তাদের বিবেচ্য। বঙ্গবন্ধুর নীতির অনুকরণ করে সাধারণ মানুষও তাদের হৃদয় থেকে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী দালালদের ক্ষমা করে দেবেন আশা করা যায়। বঙ্গবন্ধু জাতির বৃহত্তর যে স্বার্থের কথা বিবেচনায় রেখেছিলেন জাতি তার প্রতি সম্মান দেখাবে, আশা করি।

ড. আহমদ হাসান
তারিখ: ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩

লেখক : গবেষক, সমাজকর্মী, লন্ডন

Monday, February 11, 2013

বাংলা-বসন্ত :আসছে ফাল্গুনের আগাম ইশতেহার


এ তো রীতিমতো অরাজকতা। খোদ রাজধানী থেকে রাজনীতি/রাজতন্ত্র উঠে গেল নাকি? রাজার অনুমতি ছাড়াই সমাবেশ হচ্ছে দিব্যি। তাও আবার রাস্তা বন্ধ করে সমাবেশ। মানুষের চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি করা। সর্বনাশের কথা। উপরন্তু শাহবাগের সমাবেশ সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজনীতিকেরা সেখানে বক্তৃতা করতে পারবেন না। সাহারা খাতুন, শেখ হানিফরা বক্তৃতা করতে গিয়ে অপদস্ত হয়েছেন এরই মধ্যে। এই সমাবেশ তার মানে রাজনীতিবিরোধী। অরাজকতা ছাড়া কী?

'অরাজকতা' মানে 'রাজা'বিহীন বন্দোবস্ত। রাজা-রাজনীতি-হুজুর-হোমরা চোমরা ছাড়াই নিজেরা নিজেদেরকে পরিচালনা করার স্বকৃত বিন্যাস। এরই তো নাম অরাজকতা। এই সমাবেশের রাজনীতিবিরোধিতার ভেতরে সুপ্তভাবে হলেও আছে 'অরাজ'-এর ধারণা: অরাজনীতি, অরাজতন্ত্র। অন্য ভাষায় একেই বলে নৈরাজ্য। নৈরাজ্য মানে স্বাধীনতা। নৈরাজ্য মানে স্বনিয়ন্ত্রণ, আত্মনিয়ন্ত্রণ, আত্মকর্তৃত্ব। নৈরাজ্য মানে 'আমরা সবাই রাজা'। সুপ্ত এই উপাদানগুলো ক্রমশ স্পষ্ট ভাষায় যতো বেশি প্রকাশিত হয়ে উঠবে, শাহবাগ-সমাবেশ ততো বেশি এগিয়ে যাবে তাহরির স্কয়ারের দিকে। আরবিতে 'তাহরির' মানে কিন্তু 'স্বাধীনতা'ই বটে। শাহবাগ-চত্বর ঠিকই এগিয়ে চলেছে স্বাধীনতা-চত্বরের দিকে। নব্বুইয়ের শুরুতে আরম্ভ হওয়া আইনের শাসনের অগোছালো বোলচাল ১/১১-তে আইনের সুসংগঠিত বিভীষিকাপন্থার দাঁত-নখ-পেশী দেখিয়েছিল। তারই অনুরাগে (কিছু পরে কিছু আগে) কর্তৃপক্ষীয়, চাপিয়ে-দেয়া, শাসন প্রতিষ্ঠার প্রচারণা মাধ্যমে এতদিন শুনে আসলাম: 'আইন তার নিজের গতিতে চলবে'! এখন দেখছি খোদ 'আন্তর্জাতিক ট্রাইবুনাল'-এর আদেশ লোকে মানছে না। আদালতের জন্য লজ্জার কথা। এ তো রীতিমতো আদালত অবমাননা। এই ক'দিন আগেও যে-হাইকোর্টের হাইথট-ওয়ালা সব রুলজারির কথা শুনছিলাম, রেডিওতে কীভাবে বাংলা বলা হবে, হুমায়ূন আহমেদ কীভাবে উপন্যাস লিখবেন ইত্যাদি প্রভৃতি কিছুই বাদ যাচ্ছিল না আইনের সুদীর্ঘ হাতের নাগাল থেকে, সেই হাইকোর্ট এখন চুপচাপ। তাজ্জব বটে।

রাস্তায় সমাবেশ নাকি অবৈধ! রাস্তায় সমাবেশ করলে গাড়ি চলতে অসুবিধা হয়, পণ্য-পরিবহনে বিঘ্ন ঘটে। সেই রাস্তা অধিকার করে সমাবেশ চলছে দিনরাত ২৪ ঘণ্টা, লাগাতার। আশ্চর্য ব্যাপার। অধিক আশ্চর্যের ব্যাপার: বেয়াদব জনসাধারণ এই রাস্তা-অধিকার-করা আন্দোলন নিয়ে বিরক্ত হচ্ছেন না, মিডিয়ার কাছে নালিশ করছেন না, উল্টো বাড়ি থেকে ভাত এনে ছেলেমেয়েদের খেতে দিচ্ছেন। বাবা এগিয়ে দিচ্ছেন তার মেয়েকে। মা দোয়া করছেন ছেলের জন্য। বান্ধবী বন্ধুকে ফেসবুকে মেসেজ পাঠাচ্ছে: 'বাড়ি ছেড়ে পালালাম; শাহবাগে যাচ্ছি।'

আইনের শাসন আপাতত উধাও তাহলে! যেকোনো সমাবেশ করার জন্য, মাইক ব্যবহার করার জন্য, মেট্রেপালিটন পুলিশ কমিশনারের কাছে লিখিত আবেদন পেশ করতে হবে। তারপর তারা দয়া করে অনুমতি দেবেন (আদৌ যদি দেন)। কোথায় গেল সেইসব কর্তৃপক্ষীয়, চাপানো আইন-কানুন? আওয়ামী লীগের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী না হয় এই আন্দোলনে লাভবান হবেন ভেবে সৌজন্যবশত এর ওপরে মরিচের গুঁড়া ছিটাচ্ছেন না। কিন্তু 'জনদুর্ভোগ'! কোথায় 'প্রথম আলো'? কোথায় গেল তাদের এতোদিনকার প্রিয় এজেন্ডা? মানুষ এতো নির্লজ্জ হয়! না, হয় না। আসলে মানুষ এতো নির্লজ্জ হয় না: কিন্তু পুঁজি হয়, ক্ষমতা হয়, সার্কুলেশন হয়। ওগুলো আসলে মানুষ না, মনুষ্যোচিত না, মনুষ্যবান্ধব না। শাহবাগের সমাবেশ যতোদিন এসবের দিকে মন না দেবে ততোদিন আমাদেরকে কর্মময় অপেক্ষার উপাসনা করে যেতে হবে বৈকি। আপাতত পুলিশ-র্যাবের পাহারা আর মিডিয়ার অতি-তেলে তৈলাক্ত হওয়ার বিপদ সম্পর্কে আমাদেরকে সতর্ক থাকতে হবে কিন্তু।


আইনত এখনও মাঘ মাস, শীতের রাজত্ব। তবু বেআইনত যে ফাল্গুনের হাওয়া বইতে শুরু করেছে! বোঝা যাচ্ছে, মানুষ রাস্তায় নামলে সব কিছু বদলে যায়। বিচারবিভাগ দুশ্চিন্তায় পড়ে। পুলিশবিভাগ রুটিন দায়িত্বের বাইরে বেরুনোর আগে ভাবে। মিডিয়া একটা অরাজক আন্দোলনকে কাভার করার জন্য রাত জাগে। আর রাজনীতিবিদেরা ভাবতে থাকেন: আমাদের দিন কি ফুরিয়ে যাবে? এইসব বাচ্চা কাচ্চারা সময়মতো দুধভাত খেতে ঘরে ফিরবে তো? আসলে দশচক্রে ভগবান ভূত। দশ যেখানে, ভগবানও সেখানে। বহুমত আর বৈচিত্র্যই এই আন্দোলনের শক্তি। সেজন্যেই এর মধ্যে রাজনীতিকরা ঢোকার চেষ্টা করছেন। একটু-আধটু ঢুকেও পড়ছেন রাষ্ট্রক্ষমতার জোরে। তারা নিজেরা যদি এরকম সমাবেশ ডাকতেন, দলীয় কর্মীরা ছাড়া কেউই আসতেন না, সে কথা সবারই জানা। সেজন্যই তরুণদের প্রাণবন্ত সমাবেশে সরীসৃপের মতো ঢুকছে রাজনীতি। ঢুকছে ষড়যন্ত্রও। ষড়যন্ত্রকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যেতে হলে শাহবাগ-সমাবেশকে ইতোমধ্যে বিদ্যমান বহুমত-বৈচিত্র্য-রাজনীতিবিরোধিতা ধরে রাখার পাশাপাশি আনুভূমিক ও গণতান্ত্রিক নতুন সাংগঠনিক কাঠামো এবং নতুন ভাষা সৃজন করতে পারতে হবে। এটাই তাদের জন্য আসল চ্যালেঞ্জ। রাস্তায় এতদিন শুধু জামায়াত ছিল। তাদের পেট্রো-ডলারের দাপট ছিল। কালো টাকায় কেনা, কালো টাকায় ভাড়া করা অস্ত্র এবং অস্ত্রধারী ছিল। কাঁচের শিশির পেট্রোলবোমা ছিল। এখন নিরস্ত্র-কিন্তু-স্বপ্নসশস্ত্র মানুষও রাস্তায় নেমেছেন। আনন্দ সংবাদ।

রিকেইম দ্য স্ট্রিট!': ইঙ্গ-মার্কিন-ইউরোপীয় মুলুকে আমাদের লড়াকু তরুণদের বহুদিনের আদরের শ্লোগান। ষাট-সত্তর দশকের ইউরোপ-জোড়া প্যারিস-বসন্ত থেকে শুরু করে শ্রমচোষা-রক্তচোষা মালিকদের হাত থেকে শিক্ষার্থী-শ্রমিকদের কলকারখানা-পুনর্দখল-আন্দোলন আর প্রশাসক-প্রফেসরদের হাত থেকে ক্যাম্পাস কব্জা করার আন্দোলন; বর্ণবাদ-পুরুষতন্ত্র-শ্রেণিবৈষম্যবিরোধী আন্দোলন, প্রকৃতি পুনরুদ্ধারের আন্দোলন; আশির দশকের যুদ্ধবিরোধী-আগ্রাসনবিরোধী-পরমাণু অস্ত্রবিরোধী আন্দোলন; নব্বুইয়ে এবং তার পরের দশকে পুঁজির বিশ্বায়নের বিরুদ্ধে সিয়াটল-জেনোয়া-কানকুনের আন্দোলন আর আফগানিস্তান-ইরাক-যুদ্ধের বিরুদ্ধে আন্দোলন; এবং তারপর এই একুশ শতকে এসে লন্ডনে ছাত্রবেতনবিরোধী শিক্ষার্থী-আন্দোলন ও ইঙ্গ-মার্কিন-ইউরোপ-জোড়া পুঁজিবাদবিরোধী অকুপাই-মহাআন্দোলন: এই সমস্ত আন্দোলনের প্রধানতম আইডিয়া এবং শ্লোগান ছিল 'রিকেইম দ্য স্ট্রিট!'

না, রাজপথ দখল নয়: রাস্তার জনমালিকানা নতুন করে প্রতিষ্ঠা করা। রাজপথ তো রাজার। রাজা যায়, রানি যায়, বাঁশি বাজে, পথিক আটকে থাকে, পাজেরো ছোটে প্রাসাদের দিকে। আর রাস্তা মুসাফিরের। রাস্তা পথিকের। রাস্তা অনুসন্ধানের। সেই রাস্তার পুনঃমালিকানা দাবি করেছে শাহবাগের সমাবেশ।

বিগত কুড়ি বছর ধরে আমাদেরকে শেখানো হচ্ছে, মিডিয়া-মুখস্ত করানো হচ্ছে:পার্লামেন্টই সকল সমস্যার সমাধানের উত্স। পার্লামেন্টে যে নাই, আইনত সে নাই। সে অস্তিত্বহীন: নন-এগজিস্টেন্ট। পার্লামেন্টারি-রাজনীতির ঘেরাটোপে গড়া এই আইনের শাসনের যুগে শাহবাগ-মহাসমাবেশে আনুষ্ঠানিকভাবে পাঠ করা শপথ অনুযায়ী রাস্তায় আন্দোলন হবে 'গণমানুষের নেতৃত্বে'। হায়, হায়। পার্লামেন্টের কী হবে? বাংলাদেশের নিওলিবারাল পুঁজির উচ্ছিষ্টভোজীদের কী হবে? 'প্রথম আলো'র সুশীল সমাজের কী হবে?

হ্যাঁ,তারা চাইবেন এই সমাবেশ শুধু আওয়ামী-ক্যাম্পের সংকীর্ণ রাজনৈতিক এজেন্ডা পূরণ করে সুশীল বালক-বালিকার মতো ঘরে ফিরে যাক। তারা চাইবেন: এই সমাবেশ শুধু ফাঁসি ফাঁসি করেই চিল্লাক। তারা চাইবেন: এই সমাবেশ ১৯৭১-এর চেতনায় 'জনগণের / জনগণের-জন্য / জনগণের-দ্বারা' পরিচালিতব্য বাংলাদেশের রূপরেখা নিয়ে মনোনিবেশ না করুক। কিন্তু সেটুকু করতে না-পারলে স্রেফ গুটিকয় রাজাকারের ফাঁসি দিতে পারলেই কি একাত্তরের কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ পাবো আমরা, একাত্তরেরই ঘোষণা মোতাবেক যে বাংলাদেশের মালিক এদেশের জনসাধারণ? সুতরাং শাহবাগ-সমাবেশকে ভাবতে হবে নতুন ধারার, সত্যিকারের গণমুখি সংগঠন-সংস্থা-সংঘ-সমিতি-প্রতিষ্ঠান-সমাজ-বিন্যাস-কাঠামো নিয়ে। আজ শুধু এটুকু উচ্চারণ করে রাখি: মুখস্ত শ্লোগান, গতানুগতিক আইডিয়া আর সংকীর্ণ কথাবার্তার মধ্যে নিজেদেরকে পরিসীমিত করে রাখলে আমরা সরকার-স্পন্সরড, মিডিয়া-তেলে-তৈলাক্ত একটা অসার ফাঁসি-আন্দোলনে পর্যবসিত হবো মাত্র। তারপর ফাঁসি টাসি শেষ হয়ে গেলে ঘরে ফিরে দেখব আমাদেরই গলায় সেই চিরপুরাতন রাজনীতির ফাঁসটা লেগে আছে: নেতারা পার্লামেন্টের খোঁয়াড়ে চেঁচাচ্ছেন, পরস্পরকে খুন করছেন, সাগর-রুনির আত্মা হাহাকার করে চলেছে, ক্রসফায়ার-গুম-রিমান্ডের বিধান আরো বিকশিত হয়ে উঠছে। বাংলাদেশের গত ৪০ বছরের যে রাজনৈতিক অচলায়তন, সেটিকে ভেঙে দেশকে সত্যিকারের নতুন পথে এগিয়ে নিতে হলে, তরুণদেরকেই এগিয়ে আসতে হবে। কোনো পার্টি, কোনো মতাদর্শ-শাস্ত্র, কোনো সংসদ, কোনো আদালত, কোনো সশস্ত্রবাহিনী, কোনো রাজ-বুদ্ধিজীবীই এই সংকটের সমাধান ঘটাতে পারবে না। কেননা এঁরা সবাই মিলেই তো তিল তিল করে এই মহাসংকট, মহা-অচলাবস্থা তৈরি করেছেন।

পার্টিগুলো নিজেদের পেট-পকেট-প্রভুর দালালি করেছেন। মতাদর্শ-শাস্ত্রগুলো মানুষকে অন্ধ করেছে, বিভক্ত করেছে, মুক্ত ভাব বিনিময়ের অযোগ্য করে তুলেছে। সংসদ-সদস্যরা কোনোদিন নীতির পক্ষে, ন্যায়ের পক্ষে, বিবেকের পক্ষে দাঁড়াতে পারেননি; নমিনেশন কিনেছেন আর সরকারি তহবিল ও আপামর মানুষের কাছ থেকে মেরে-ধরে খাজনা আদায় করে নমিনেশনের টাকা পূরণ করার লুটপাট করেছেন। সংবিধান সমুন্নত রাখার শপথ গ্রহণ করা আদালত বারবার আমাদের মহাসংকটে ঠুঁটো জগন্নাথের মতো পাথর হয়ে থেকেছেন। বৈধতা দিয়েছেন একের পর এক স্বৈরতন্ত্রকে বন্দুকের ভয়ে। বিবেকের ভয় তাদের ছিল না। এই সেদিনের ১/১১-তেও তারা একই কাজ করেছেন নির্লজ্জের মতো। আর সশস্ত্রবাহিনী একের পর এক অভ্যুত্থান, রক্তপাত, মারামারি, হানাহানি, মিথ্যাবিচার, গণফায়ারিং স্কোয়াড, উপর্যুপরি সামরিক শাসন জারি করে গণতন্ত্রের সর্বনাশ করেছেন, মানুষের জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছেন স্রেফ ভয় দেখিয়ে, বন্দুকের জোরে। তো, আজকে বিপুলতম আকার ধারণ করা এই সর্পিল, পিচ্ছিল, প্যাঁচানো, কর্দমাক্ত মহাসংকটটা যারা নিজেদের হাতের বানিয়েছেন, আর যাই হোক সেই সব লোক-মত-ধারা এই সর্বগ্রাসী সংকটের সমাধান করতে পারবে না। এটা কমনসেন্স।

সংকট সমাধান করবেন কে তাহলে? করবেন তারাই যাঁরা এই সংকটের শিকার হয়ে খাঁচাবন্দী হয়ে আছেন যুগ যুগ ধরে। এই খাঁচাবন্দী মানুষ, বিশেষত তরুণ প্রজন্ম এবার, ছোট ছোট জানালা খুলে ফেলেছেন প্রযুক্তির কল্যাণে। ইন্টারনেট, ফেসবুক, টুইটার, ব্লগ, নানান ওয়েবসাইট, গান, কবিতা, ছোটকাগজ, হাজারটা মিডিয়া এবং সর্বোপরি প্রেম-ভালোবাসা-ভাববিনিময়ের ভেতর দিয়ে তারা পরস্পরকে চিনছেন-জানছেন কোনো শাস্ত্র-মতাদর্শ ছাড়াই, অন্ধবিশ্বাস ছাড়াই, খোলামনে। তারা তর্ক করছেন, বিতর্ক করছেন, একমত হচ্ছেন, লাখো ধারায় কাজে নেমে পড়ছেন: কিছু না কিছু কাজ। আত্মপ্রকাশের আনন্দে তারা বিভোর হয়ে আছেন। আত্মপ্রকাশের এই আনন্দই স্বাধীনতা। সরকারি আইন-কানুনের বাইরে, সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণের বাইরে তারা ক্রমাগতভাবে আত্মকর্তৃত্বের-আত্মমর্যাদার রূপকাঠামো-বিন্যাসের কল্পনা করতে শুরু করেছেন ইতোমধ্যেই। জেগে উঠতে শুরু করেছে বাংলাদেশ। স্বাধীনতার স্বাদ পেতে শুরু করেছে বাংলাদেশ। এই জাগরণেরই প্রথম, বৃহত্ ঝাপ্টা এসেছে আজ শাহবাগে ফাল্গুনের ঈষদুষ্ণ বাতাসের রঙ মনে মেখে। ফাল্গুন আমাদের চিরকালের দ্রোহ আর প্রেমের পয়গাম। নতুন এই বাংলাদেশের প্রায় সক্কলেই রাজনীতিবিরোধী। রাজনৈতিক দলকে তারা আর বিশ্বাস করেন না। পার্লামেন্টকে তারা বিশ্বাস করেন না। আদালতের স্বচ্ছতা নিয়ে তারা সদাসন্দিহান। পুলিশ-র্যাব-সেনাবাহিনীকে দেখলেই তারা ভয় পান: এই বুঝি কোনো অঘটন ঘটে। মিডিয়াকে তারা সংকীর্ণ স্বার্থের ভাণ্ডারি মনে করেন। মুখস্ত বুলি আওড়ানো বুদ্ধিজীবীদেরকে মনে করেন বাঁচাল, দালাল। পুরানো বাংলাদেশের দিন শেষ। একাত্তরের রক্তসূর্য যে নতুন বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতি নিয়ে উদিত হয়েছিল, সেই বাংলাদেশকে আগাগোড়া ঢেলে সাজিয়ে নতুন বাংলাদেশের বিন্যাসের ছবি আঁকার এটাই সময়।

বছরের পর বছর ধরে কবি-সাহিত্যিক লেখক শিল্পী চলচ্চিত্রকর্মী-নির্মাতা ছোটকাগজকর্মী প্রকাশনাকর্মী ব্লগার ইন্টারনেট-অ্যাকটিভিস্ট ওয়েবসাইট-ডিজাইনার স্থপতি ভাস্কর ফটোগ্রাফার সাংবাদিক কম্পিউটার-বিজ্ঞানী সফটওয়ার-প্রোগ্রামার নাট্যকর্মী মুক্তসফটওয়ার-অ্যাকটিভিস্ট শিক্ষক-শিক্ষার্থী ব্যবসা-উদ্যোক্তা ইত্যাদি প্রভৃতি শত ধরনের তরুণ-যুবারা ছবিরহাট চারুকলা জাদুঘর শাহবাগ সোহরাওয়ার্দী-উদ্যান চত্বরকে ঘিরে আড্ডা মেরে চলেছেন। অথচ ভদ্রলোক বুদ্ধিজীবীরা এই পুরো এলাকাটাকে গাঁজাখোরদের নোংরা একটা জায়গা বলে এতোকাল নাক সিঁটকিয়েছেন। ছেলেমেয়েদের 'বেলেল্লাপনা'র জায়গা বলে বাঁকা চোখে তাকিয়েছেন এর দিকে। আজ সব সমালোচনা-উপেক্ষা-উন্নাসিকতাকে ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিয়ে শাহবাগ জ্বেলেছে আমাদের আশার প্রদীপ । (উল্লেখ্য: ঢাকার বাইরের সমাবেশগুলোর পেছনে এই কমিউনিটি হয়ে ওঠার চর্চা এখনও ভালো করে দাঁড়ায়নি বলেই পরিবর্তনের এই মুহূর্তেও সেগুলো নেতাদের গতানুগতিক বক্তৃতাবাজিতে সরগরম হয়ে আছে।) পৃথিবীর সমস্ত বিষয় নিয়ে তর্ক-বিতর্ক-বাহাস-পড়াশোনা-হাসি-তামাশা-আনন্দ-মেলামেশা-প্রেম-ভালোবাসায় ভরপুর শাহবাগের দুর্দান্ত প্রাণবন্ত আড্ডা গত দুই দশকের বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মে শ্রেষ্ঠতম গণবিশ্বদ্যািলয়ে পরিণত হয়েছে। এটা হয়ে উঠেছে সৃজনবৈচিত্র্যে গমগম করা শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিক্ষেত্র। ফান্ড দিয়ে, আমলা দিয়ে, প্রজেক্ট দিয়ে, এনজিও দিয়ে এরকম অবাধ স্বাধীনতাপূর্ণ একটা শিল্প-সৃজন-বিকাশ-অভয়ারণ্য বানানো যায় না। স্বাধীনতাই তো সৃজনশীলতার ধাত্রী। এই ধাত্রীই শত সহস্র তরুণ-যুবককে মানসিকভাবে সাবালক করে তুলেছে, আন্তরিক একটা বিরাট নিবিড় কমিউনিটি গড়ে তুলেছে শাহবাগে। রাষ্ট্র মাস্তান মন্ত্রী ঠিকাদার এমপি দারোগা র্যাব প্রফেসর ক্যাডার জঙ্গি হুজুর গুরু পুরুত্ঠাকুর হোমরা চোমরা এলিট-মহাজনদের সার্বক্ষণিক অত্যাচারে তো খোদ আমাদের সমাজটাই আজ কারাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।

কোথায় আমাদের সেই ছোটবেলার পাড়া-মহল্লা? সেখানে সবাই সবার বন্ধু ছিল, আত্মীয় ছিল। মারামারি-ঝগড়াঝাটি-কান্নাকাটি শেষে আবার সবাই একসাথে হাসতে হাসতে খেলতে শুরু করার সমাজ-সম্প্রদায়-গ্রাম আজ কোথায়? রাষ্ট্র এবং নির্বাচিত-অনির্বাচিত আমলাতন্ত্র আজ একেবারে তলার পরিবার পর্যন্ত বিস্তৃত তার শূঁড় দিয়ে সব কিছু শুষে নিচ্ছে। এখন সব 'ওয়ার্ড', 'ইউনিয়ন', 'উপজেলা', 'নির্বাচনী এলাকা'। এখন সবাই গলায় কুকুরের বেল্টের মতো পরিচয়পত্র ঝুলিয়ে নাগরিক হয়ে উঠতে বাধ্য হচ্ছেন। এখন সবাই ভোটার মাত্র। এখন সবাই ক্রেতা মাত্র। এখন সবাই যেন 'কোকাকোলা-দল' না-হয় 'পেপসি-দল' হতে বাধ্য। সবাই এখন বিএনপি-আওয়ামী লীগ, কংগ্রেস-বিজেপি, ডেমোক্র্যাট-রিপাবলিকান। আর যেন পথ নাই, সমাজ নাই, সম্প্রদায় নাই, মা নাই, বাবা নাই, বয়োজ্যেষ্ঠর সম্মান নাই, ছোটদের আদরযত্ন নাই, বন্ধু-বান্ধব নাই। শুধু মারমার-কাটকাট প্রতিযোগিতার ছ্যাবলামি। আজকের শাহবাগ-সমাবেশ বিগত দুই-আড়াই দশক ধরে গড়ে ওঠা সমাজ-সম্প্রদায়-পাড়া-কমিউনিটি-বন্ধুত্ব-বোধেরই ফল। জ্ঞাতসারে হোক বা অজ্ঞাতেই হোক: আজকের শাহবাগ-স্বাধীনতা রাষ্ট্রের খপ্পর থেকে খোদ সমাজকে উদ্ধার করার, মুক্ত করার, সমাজের আত্মকর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার অজস্রমুখি প্রচেষ্টার ফল। তাই তো আজ ফিরে আসছে একাত্তরের নয় মাসের মতো সর্বব্যাপী, বহুবৈচিত্র্যপূর্ণ, প্রাণবন্ত সমাজ-সম্প্রদায়-আত্মীয়তা-বন্ধুত্ব।

শাহবাগ এখনকার মতো যদি ফুরিয়েও যায় আরো অনেক শাহবাগ আসবে। অকুপাই-আন্দোলনের শ্লোগান উচ্চারণ করে বলি: "দিজ ইজ জাস্ট দ্য বিগিনিং"। এই গণজাগরণ কোনো না কোনো ভাবে আবার আত্মপ্রকাশ করবে। শাহবাগের স্মৃতি কখনো হারিয়ে যাবে না। খুন-গুম-ক্রসফায়ার, রাষ্ট্রীয় মাস্তানি, দলীয়করণ, দালালি, চামচামির বাইরে তরুণ-জনসাধারণ এবার সুনির্দিষ্টভাবে ভাবতে শুরু করুক কেমন বাংলাদেশ তারা চান। কেমন পুলিশ চান, কেমন আদালত চান, কেমন জনপ্রতিনিধিত্ব চান। এগুলো নিয়ে সত্যিকার অর্থেই সর্বাত্মক-রূপান্তরধর্মী চিন্তা গড়ে তুলতে পারাই আজকের শাহবাগ-সমাবেশের প্রধানতম কাজ। এই কথাটা অল্পবয়েসী তরুণেরা এবং বৃদ্ধ-বয়স্ক তরুণেরা যদি মনে রাখেন এবং নিজেদের মাথা ও আত্মকর্তৃত্বের ওপর আস্থা রাখতে শুরু করেন, বদলে যেতে শুরু করবে বাংলাদেশ। আগামীর সেই বৃহত্তর বাংলা-বসন্ত আমাদের দরজায় টোকা দিচ্ছে।

এই ফাল্গুনেও পূর্ণাঙ্গ এখনও বসন্ত আসেনি বটে। এখনও প্রস্তুতি পর্ব চলছে শাহবাগে আর সারাদেশে। প্রস্তুতি এখনও সম্পন্ন হয়নি। কিন্তু হবে। অচিরেই হবে। যখন-তখনই হবে। হয়ত সামনের কোনো শীতকালেই হবে। বসন্ত তো শীতেই আসে, তাই না? ঠিক যে: আর্থ-রাজনৈতিক দল-শক্তিগুলো এবং তাদের মিডিয়া সংকীর্ণ একটা মেডিয়েটেড বসন্ত বানানোর চেষ্টা করছে নানা কারণে। তবু সেটা ঠিক তাদের মতো ইচ্ছানুযায়ী দাঁড়াচ্ছে না কিন্তু। আরব বসন্ত তো আর মিডিয়া দিয়ে বানানো যায় না: বাংলা-বসন্তও না। হ্যাঁ, যেকোনো প্রকৃত গণআন্দোলনকে ঘিরেই সব ধরনের ক্ষমতাশীলমহল প্যাঁচ কষতে থাকেন। তবু যে বালিকারা বালকদের সাথে ক্রোধের আনন্দে নাচছেন তাতে আমি আনন্দিতই বটে। এই সাক্ষাত্, নারীর সাথে পুরুষের, বড়দের সাথে ছোটদের, শিক্ষিতদের সাথে রিকশাওয়ালাদের, এ আমাদের সমাজের যাবতীয় অসামাজিক ব্যাধি-বালা-মুসিবত কমাবে, বাড়াবে সমাজের স্বাধীনতার সীমা: রাষ্ট্র-রাজনীতির একচ্ছত্র রাক্ষস-ক্ষমতার বিপরীতে। সুসমাচার বৈকি। বসন্ত যে এই বঙ্গে আসার জন্য মুখিয়ে আছে সেটা দিব্যি বোঝা যাচ্ছে: শাহবাগে, সারা বাংলাদেশে। আজকের শাহবাগ-সমাবেশ সেই বাংলা-বসন্তের আগাম ফাল্গুনী ইশতেহার।