Monday, June 22, 2015

আমরা কতটা মানুষ? কতটা কীট ????

একদা এক কদাচারী কীট নিজেকে বলে- ‘আমি বড় হব’ । তখন সে একটি বরাহে রূপান্তরিত হল । কীট কিছুকাল বরাহজীবন যাপন করার পর বলল- ‘আমি বড় হব’ ।
তখন সে একটি অশ্বে রূপান্তরিত হল । কিছুকাল অশ্বের জীবন যাপন করার পর সে একদিন আবার বলল- ‘বড় হব’ । তখন সে একটি মানুষে রূপান্তরিত হল । বহুকাল মানবজীবন যাপন করার পর একদিন তার মৃত্যুর সময় উপস্থিত হল । কিন্তু দীর্ঘ মানবজীবনে একবারও তার মনে হয়নি- ‘বড় হব’ । হঠাৎ মৃত্যুর পূর্বে তার মনে হল – তার বড় হবার কথা ছিল ! সে তৎক্ষণাৎ ‘বড় হব, বড় হব’ বলতে বলতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল । কিন্তু সে আর বড় হতে পারল না । পুনরায় সে কীটের গর্ভে কীটরূপে জন্ম নিল 

(উপরোক্ত কথা গুলোপশ্চিম বঙ্গের গণমানুষের লেখক শাহাযাদ ফিরদাউসের 'ব্যাস' উপন্যাস থেকে নেয়া ।)

আমার কিছু কথা  

আমাদের দেশের কদাকারকীটের মত বেশির ভাগ শিক্ষিত অমানুষরা পেশাগত জীবনে প্রবেশ করে ভুলে যায় যে, তাদের মানুষ হবার কথা ছিল !! তারা যদি মানুষ হবার কথা ভুলে না যেত, তাহলে এই ক্ষুধার্ত শিশুটির ছবি আমাদের দেখতে হত না । এ লজ্জা রাখি কোথায় ??

আসুন আমরা বুকে হাত রেখে,চোখ বন্ধ করে ভাবি, আমরা কতটা মানুষ আর কতটা কীট???? আর মনে মনে গুরুসদয় দত্তের ‘মানুষ হ, মানুষ হ, আবার তোরা মানুষ হ’ এই গানটি এভাবে গাই – মানুষ হই, মানুষ হই আবার আমরা মানুষ হই ।

আসুন আমাদের দেশের প্রতিটি শিশুকে এমন মনুষ্যত্ববোধের শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলি, যাতে তারা বড় হয়ে ভুলে না যায় তাদের মানুষ হবার কথা ছিল ।  

মানব সমাজে সব অপরাধ, সব ঘৃণা, সব যুদ্ধের মূলে রয়েছে শৈশবের অসুখী সত্ত্বা ।

সবিনয় নিবেদন……………………………………….
আজ শিশুর মা-বাবা অভিভাবকদের উদ্দেশে কিছু কথা বলতে চাই । ভবিষ্যতের পিতা-মাতারাও লেখাটি পড়তে পারেন । আপনাদের মধ্যে যারা নিজের ইচ্ছা অনিচ্ছার নির্দিষ্ট ছাঁচে ফেলে গড়ে-পিটে নিজেই শিশুর ভবিষ্যত জীবনকে রুপদান করার স্বপ্ন দেখেন, তারা মহাভুল করছেন । এ সর্বনাশা স্বপ্নের জগত থেকে বাস্তবতায় নেমে আসুন । শিশুতো একটি মাটির ঢেলা নয় যে তাকে কেটে-ছেঁটে ইচ্ছামতন আকার দেবেন । প্রতিটি শিশুই মা-বাবা থেকে পৃথক একটি ছোট্ট মানব সত্তা । বিশাল সম্ভাবনা নিয়ে পরিপূর্ণ মানবিক সত্তা হিসেবে বিকশিত হওয়ার জন্য এ পৃথিবীর মাটিতে নেমে আসে । মা-বাবা, অভিভাবকদের প্রধান দায়িত্ব শিশুর স্বাধীন, নিরাপদ ও আনন্দময় শৈশব নিশ্চিত করা । শিশুর সুখকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়া । কারণ, অসুখী শিশুরাই অবাধ্য হয় । আর বড় হয়ে নানা রকম সামাজিক অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।

আসুন আমরা আমাদের দেশের প্রতিটি শিশুর মানবিক সত্তার সম্পূর্ণ বিকাশের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করি । ভবিষ্যতের অপরাধ মুক্ত সমাজ বিনির্মাণে এর বিকল্প নাই ।   

আপনাদের উদ্দেশে কহলিল জিবরানের একটি কবিতা নিবেদন করছি ।

তোমাদের সন্তানেরা তোমাদের সন্তান নয়,
তারা জীবনের নিজস্ব আকাঙ্ক্ষার ছেলে ও মেয়েরা
তারা আসে তোমাদের আশ্রয়ে কিন্তু তোমাদের থেকে নয়,
এবং যদিও তারা তোমাদেরই সঙ্গে তবুও তারা তোমাদের নয় ।

তোমরা তাদের দিতে পারো তোমাদের ভালোবাসা কিন্তু তোমাদের ভাবনা
নয়,  
কেননা, তাদের রয়েছে তাদের নিজস্ব ভাবনা ।
তোমরা তাদের শরীরকে আশ্রয় দিতে পার বটে কিন্তু আত্মাকে নয়,
কেননা তাদের আত্মা থাকে আগামী দিনের ঘরে,
যার দেখা পাওয়া সম্ভব নয় তোমাদের, এমনকি নয় তোমাদের স্বপ্নেও ।

তোমরা আপ্রাণ চেষ্টা চালাতে পারো ওদের মত হতে, কিন্তু চাও যাতে
ওরা তোমাদের মত না হয়,
কেননা জীবন যায় না পেছনের দিকে কিংবা গড়ায় না অতীত দিবসের
দিকে ।

তোমরা হলে ধনুকের ছিলা যেখানে থেকে জীবন্ত তীরের মত
ধেয়ে চলে তোমাদের সন্তানেরা ।
... … …
তীরন্দাজের হাতে তোমাদের বাঁক নেওয়া হোক সুখের অন্বেষণে ।