অস্ত্রের জোরে ব্যবসাই ছিল মূলমন্ত্র অস্ত্রের জোরে ব্যবসাই ছিল মূলমন্ত্র
সেকালে কার কত ক্রীতদাস আর রত্নরাজি ছিল, তা দিয়েই সম্পদের হিসাব হতো। এ যুগে ধনকুবেরদের ঐশ্বর্যের প্রকাশ ঘটে সুপারইয়ট, জেট ও অবকাশকেন্দ্রের ফিরিস্তিতে।
সম্পদ ও সম্পদশালীর সাদৃশ্য-বৈসাদৃশ্যের বয়ান— জন ক্যাম্পফনারের দ্য রিচ অবলম্বনে ধারাবাহিক আয়োজন ইয়ান হুইহেন ফ্যান লিনচোটেন পেশায় যাজক। জাতীয়তা ডাচ। গোয়ায় পর্তুগিজ আর্চবিশপের পক্ষে কাজ করতেন তিনি। ইতিনিনারিও নামে একটি বই লেখেন ইয়ান। মসলাজাতীয় বিভিন্ন উদ্ভিদের বর্ণনাসংবলিত বই। দূর দেশে নাবিকদের অভিযাত্রা ও মসলা বাণিজ্যের গল্প শুনে ডাচরা বিপুল সংখ্যায় উদ্দীপ্ত হতে থাকে। ইয়োহান ফ্যান ওলডেনবারনফেলট নামের এক ব্যবসায়ী এ হুজুগকে নিয়ন্ত্রণে আনতে উদ্যোগী হন।
১৬০২ খ্রিস্টাব্দে ইয়োহান ছয়টি প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানিকে একীভূত করে ফেরেনিগড ইস্ট ইন্ডিজ কোম্পানি (ভিওসি) গঠন করেন। এটাই ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। হিরেন সেভেনটিন বা সেভেনটিন জেন্টলম্যান নামে কোম্পানির একটি পরিচালনা পর্ষদ গঠন করা হয়। শেয়ারহোল্ডার অর্থনীতির পুরোধা এই কোম্পানি। যে কেউ ভিওসিতে বিনিয়োগ করতে পারতেন এবং লগ্নি অনুযায়ী মুনাফা পেতেন। ক্রমে ক্রমে বিদেশীদের জন্যও ভিওসির শেয়ার উন্মুক্ত হয়।
ভিওসি বা ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঠিকুজিতে মিশে ছিল একটি বিষয়: একচেটিয়াত্ব। কোম্পানি গঠনের উদ্দেশ্য হিসেবে ‘উত্তমাশা অন্তরীপ থেকে ম্যাজিলান প্রণালি পর্যন্ত এলাকায় সব ধরনের বাণিজ্যে প্রাথমিকভাবে ২১ বছরের জন্য একচেটিয়াত্ব প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়। পরবর্তী দুই দশকে এ কোম্পানি পৃথিবীর অর্ধেক জায়গাকে এক অর্থে নিজেদের করায়ত্ত করে ফেলে। স্বভাবতই সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী ও বেপরোয়া মানুষগুলো এ কোম্পানিতে চাকরি নেয়।
ভিওসিতে চাকরি নেয়া মানুষদের একজন ইয়ান পিটারসুন কোয়েন। ১৬০৭ খ্রিস্টাব্দে অ্যাসিস্ট্যান্ট মার্চেন্ট হিসেবে তিনি সমুদ্রযাত্রা করেন। তিন বছর তিনি ইস্ট ইন্ডিজে ছিলেন। ১৬১২ খ্রিস্টাব্দে ইয়ান যখন দ্বিতীয়বার যাত্রা করেন, তত দিনে তিনি সিনিয়র মার্চেন্ট পদে উন্নীত হন। সেবার তিনি দুটি জাহাজের কমান্ড পান।
এশিয়ায় থাকাকালে ইয়ান একটি ব্যবসায়িক পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন। হিরেন সেভেনটিনের কাছে তিনি ওই পরিকল্পনা পাঠান। ইয়ান কোম্পানিকে জায়ফল, লবঙ্গ ও দারচিনির ব্যবসায় একচেটিয়াত্ব প্রতিষ্ঠার পরামর্শ দেন। কারণ এ মসলাগুলো রান্নার জন্য অপরিহার্য, আবার ঔষধি গুণও রয়েছে। একচেটিয়াত্ব প্রতিষ্ঠায় ইয়ান প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ গ্রহণের পরামর্শ দেন। তিনি লেখেন, ‘কোনো স্থানীয় অথবা বিদেশী কোম্পানিকে এ পথে দাঁড়াতে দেয়া যাবে না।’ কোম্পানির পরিচালকদের উদ্দেশে ইয়ান লেখেন, ‘আপনারা নিশ্চয়ই জানেন যে এশিয়ায় নিজেদের অস্ত্রের জোরে ব্যবসা করতে ও ব্যবসাকে রক্ষা করতে হবে। ব্যবসায়ের মুনাফা থেকেই অস্ত্রের ব্যয় বহন করতে হবে। কারণ আমরা যুদ্ধ ছাড়া বাণিজ্য করতে পারব না, বাণিজ্যের উদ্দেশ্য ছাড়া যুদ্ধ করব না।’ইয়ানের এ বাক্যই ডাচ ইন্ডিয়া কোম্পানির মূলমন্ত্র হয়ে ওঠে।
কোম্পানি মনে করত, সম্পদ অধিকার ও আহরণে অস্ত্রশক্তি একটি জরুরি হাতিয়ার। যেকোনো প্রয়োজনে কোম্পানি চূড়ান্ত সহিংসতার জন্য প্রস্তুত থাকত। এজন্য নিজস্ব সেনাবাহিনী গড়ে তোলা হয়। ডাচ কর্মীরা হল্যান্ডে কোম্পানির অফিস ও জাহাজঘাটে নিয়োগ পেত। সৈন্যদের নেয়া হতো জার্মানি ও ফ্রান্স থেকে। পুরোদস্তুর একটি রাষ্ট্রের মতো আচরণে অভ্যস্ত হয় এ কোম্পানি।
মসলা ব্যবসায় মুনাফা ছিল বিরাট। এশিয়ায় এক বিলেতি পেনির চেয়ে কম খরচে ১০ পাউন্ড জায়ফল কেনা যেত। ইউরোপে একই পরিমাণ জায়ফল ক্রয়মূল্যের ৮০০ গুণের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হতো। মসলা দ্বীপ তথা ইন্দোনেশিয়া থেকে আনা লবঙ্গ ভারতে পৌঁছালেই তার দাম ১০০ গুণ বেড়ে যেত। লিসবন যেতে যেতে ওই লবঙ্গের দাম বাড়ত ২৪০ গুণ। ১৬৩০-৭০ সময়কালে ভিওসি শেয়ারহোল্ডাররা বার্ষিক ১০ শতাংশ অথবা আরো বেশি হারে ডিভিডেন্ড ভোগ করতেন।
ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রসারের পাশাপাশি ইয়ানের ক্যারিয়ারও এগোতে থাকে। ১৬১৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি কোম্পানির মহাহিসাবরক্ষক, পরের বছর জাভার বান্টাম দ্বীপে বাগান ও ট্রেডিং কার্যক্রমের প্রধান, এর পর ভিওসির ট্রেড বিভাগের ডিজি এবং সবশেষে ১৬১৯ খ্রিস্টাব্দে ইস্ট ইন্ডিজের গভর্নর জেনারেল পদে নিয়োগ পান। গভর্নর জেনারেল হয়ে ইয়ান কোম্পানির নতুন সদর দপ্তর প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। এজন্য তিনি জাকার্তাকে বেছে নেন। জাকার্তার দখল পেতে কোম্পানির সৈন্যরা স্থানীয়দের বসতিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। জোরপূর্বক অন্যকে তাড়িয়ে তার জায়গা দখল ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রেওয়াজে পরিণত হয়েছিল।
ইয়ান দুবার গভর্নর জেনারেল পদে দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় তিনি অনেকগুলো নৌ-রুট উন্মোচন করেন। পরবর্তী দুই দশকে কোম্পানি এসব রুট অনুসরণ করে। কোম্পানির পুঁজি ভিত্তি শক্ত করতে ইয়ান কিছু পরিকল্পনা করেন। সে অনুযায়ী সুমাত্রায় ভারতীয় কাপড় বিক্রি করে কোম্পানি মরিচ কিনত। একইভাবে জাপানে চীনা পণ্য বিক্রি করে তারা রুপা সংগ্রহ করত। আবার শ্রীলংকা থেকে হাতি কিনে সেগুলো সিয়ামে বিক্রি করা হতো।
এভাবে একেকটি নতুন রুট উন্মোচনের পর কোম্পানি অর্থনৈতিক ও সামরিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় মরিয়া হতে থাকে। বিভিন্ন অঞ্চলে কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানগুলোয় কোম্পানি সশস্ত্র অগ্রবর্তী দল পাঠাত। নিত্যনতুন জায়গায় পতাকা ওড়ানো, দখল দাবি করা, সংঘর্ষ— এমনকি প্রকাশ্য যুদ্ধ ছিল কোম্পানির পরিচালন ধারার অংশ।
ষোলো শতকের শেষ দিকে ডাচদের এ ট্রেডিং চর্চা পৃথিবীকে সম্পূর্ণ নতুন এক অর্থনীতির সঙ্গে পরিচিত করায়। সময়টাকে বিশ্বায়নের সূচনাকাল বলা যায়। ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বা ভিওসিকে বলা যায় প্রথম বৈশ্বিক কনগ্লোমারেট। উত্পাদক, ভোক্তা, মধ্যস্থতাকারী, পণ্য পরিবহনকারী ও বিক্রেতা— বিভিন্ন পর্যায়ে ১৬২৫ সাল নাগাদ কোম্পানির কর্মিসংখ্যা ১৫ হাজারে উন্নীত হয়। এটা এমন সময়ের কথা, যখন কয়েকশ কর্মীকেই বড় জনবল ভাবা হতো। ইয়ানের পরিকল্পনায় কোম্পানি এ পর্যায়ে উন্নীত হয়। তাকে বলা যায়, হল্যান্ডের স্বর্ণযুগের কমোডিটি কিং।
জন ক্যাম্পফনারের দ্য রিচ অবলম্বনে

No comments:
Post a Comment