Sunday, March 13, 2016

চাই নতুন রেনেসাঁস

বাংলাদেশের জনগণ আজ যে রাজনৈতিক সংকটে নিমজ্জিত, তা থেকে বিনা-প্রস্তুতিতে, খুব সহজে স্বতঃস্ফূর্ত ধারায় উদ্ধার লাভের আশা করছেন প্রায় সবাই। সংকটের গভীরতাও উপলব্ধি করছেন না প্রায় কেউই। ইতিহাসের দিক দিয়েও সংকটকে কেউ বুঝতে চাইছেন না। বিশ্ববাস্তবতার মধ্যে নিজেদের স্বাতন্ত্র্যের কথাও কেউ ভাবছেন না।  সংকট গভীর থেকে গভীরতর হয়ে চলছে। জনগণ হতোদ্যম, মনোবলহারা, ঘুমন্ত! জনগণ গভীর নিদ্রায় মগ্ন! আমার মনে হয়, এই সংকট থেকে মুক্তিলাভের কোনো সহজ উপায় নেই। বাংলাদেশের জনগণের জন্য এ হবে সবচেয়ে কঠিন কাজ। 

কঠিন কাজের জন্য অবশ্যই কঠিন প্রস্তুতি দরকার হবে। যারা বিনা-প্রস্তুতিতে বিনা-প্রচেষ্টায়, স্বতঃস্ফূর্ত ধারায় সংকটের সমাধান আশা করছেন, তারা আহাম্মকের স্বর্গে বাস করছেন। হাজার বছরের ইতিহাসে বাঙালির রাজনৈতিক ঐতিহ্য গৌরবজনক নয়। গণজাগরণ আশা করা হয়। গণজাগরণ এত সহজ ব্যাপার নয়। সেই ১৯০৫ সাল থেকে ১৯৭০-এর দশক পর্যন্ত পৌনে এক শতাব্দী ছিল আমাদের গণজাগরণের কাল। তারপর আমরা ঘুমিয়ে পড়েছি। গণজাগরণে দেশব্যাপী জনগণের মধ্যকার মহৎ সব মানবিক গুণাবলির জাগরণ ঘটে। 

জনগণ মহান কিছু অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে সংগ্রামে লিপ্ত হয়। হুজুগ আর গণজাগরণ কখনো এক নয়। কোনো স্বার্থান্বেষী মহল হীনস্বার্থ হাসিলের জন্য হীন-উদ্দেশ্যমূলক প্রচার-প্রচারণা দিয়ে জনসাধারণকে আন্দোলনে মাতায় এবং কৌশলে স্বার্থ হাসিল করে নেয়। এ ধরনের গণআন্দোলনই হুজুগ। ১৯৮০-র দশক থেকে বাংলাদেশে তো হুজুগের পর হুজুগই দেখা গেছে। এই সময়ের ঘটনাবলিতে জনজীবনের মহৎ মানবিক গুণাবলির প্রকাশ কোথায়? মহান লক্ষ্য কোথায়? এই ধারার তত্পরতার মধ্য দিয়ে জনজীবনের অবস্থা ভালো হবে? সবই তো হুজুগ। গণজাগরণ অপরিহার্য। কিন্তু কিছু লোকে গণজাগরণ চাইলেই তো জনগণ ঘুম থেকে জেগে উঠবে না! জনগণের ঘুম ভাঙানো কঠিন চেষ্টা সাপেক্ষ ব্যাপার। কার ডাকে কেন সাড়া দেবে জনগণ? সমাজের স্তরে স্তরে জনগণ এখন আছে প্রবলের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে। দুর্বলের ডাকে সাড়া দিতে পারে এই জনগণ? গণজাগরণের পূর্বশর্ত হিসেবে প্রথমে দরকার রেনেসাঁসের সূচনা। 

রেনেসাঁস ছিল এদেশে। কিন্তু সবারই কর্মদোষে সেই রেনেসাঁস শেষ হয়ে গেছে। এ অবস্থায় পুরনো রেনেসাঁসকে ফিরিয়ে আনা কিংবা তার পুনরুজ্জীবন ঘটানো সম্ভব নয়। সৃষ্টি করতে হবে নতুন প্রয়োজনে নতুন কালের নতুন রেনেসাঁস। নতুন রেনেসাঁসের জন্য চিন্তাশক্তি ও কল্পনাশক্তি খাটিয়ে অতীতের রেনেসাঁস এবং ভবিষ্যতের সম্ভাব্য নতুন রেনেসাঁস দুটো সম্পর্কেই যথাসম্ভব পরিচ্ছন্ন ধারণা অর্জন করতে হবে। কী ছিল, কী আছে, কী হবে— অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে তার স্পষ্ট চিত্র সামনে রাখতে হবে। রেনেসাঁস বলতে বোঝায় নবজন্ম— সভ্যতা-সংস্কৃতির নবজন্ম। কোনো জাতির জীবনে রেনেসাঁস দেখা দিলে ক্রমে সেই জাতিরই নবজন্ম ঘটে— জাতি নতুন জীবন লাভ করে। কোনো জাতির সভ্যতা-সংস্কৃতির মধ্যেই নিহিত থাকে সেই জাতির মানবীয় গুণাবলি।  যে রেনেসাঁস চতুর্দশ শতাব্দীতে পশ্চিম-ইউরোপে সূচিত হয়েছিল তার মর্মে ছিল সত্য ও ন্যায়ের সন্ধানে অদম্য স্পৃহা এবং মিথ্যা, অন্যায় ও দুঃখ-দুর্দশা থেকে মুক্তির প্রবল আকাঙ্ক্ষা। রেনেসাঁসের মধ্যেই মানুষ মানবীয় মূল্যবোধ ও শাস্ত্রনিরপেক্ষ যুক্তি অবলম্বন করে এবং পরকালের দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে ইহকালের দিকে ভালো করে তাকায় আর ঈশ্বরকেন্দ্রিক গির্জাকেন্দ্রিক বাইবেলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির জায়গায় মানুষকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি অবলম্বন করে। ক্রমে মানব জাতির মধ্যে উপলব্ধি জাগে যে, মানুষের শক্তি ও সম্ভাবনা ক্রমবর্ধমান ও অফুরন্ত। তাতে মানুষের চিন্তা ও কর্মের প্রকৃতি বদলে যায়। মানুষ আত্মশক্তিতে আস্থাশীল ও আত্মনির্ভর হতে থাকে এবং ঈশ্বর ও ধর্মগ্রন্থের ওপর নির্ভরশীলতা ত্যাগ করতে করতে আত্মশক্তিতে আস্থাশীল হয়। রেনেসাঁস এক বিকাশশীল প্রত্যয়। তখনকার রেনেসাঁস ছিল মধ্যযুগের গর্ভ থেকে আধুনিক যুগকে মুক্ত করার এবং জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিল্প-সাহিত্যের ক্ষেত্রে জীবনবাদী নতুন নতুন সৃষ্টি ও আবিষ্কার-উদ্ভাবন দিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অবস্থাকে সমৃদ্ধ ও সুন্দর করার দীর্ঘস্থায়ী আন্দোলন। 

রেনেসাঁস হলো এক দীর্ঘস্থায়ী সাংস্কৃতিক আন্দোলন যা দ্বারা মানুষের জীবনগত দৃষ্টিতে মৌলিক পরিবর্তন ঘটে চলে এবং সর্বক্ষেত্রে আঁকাবাঁকা উঁচুনিচু পথ ধরে সৃষ্টি ও প্রগতির ধারা বহমান থাকে। রেনেসাঁসে ক্লাসিকের চর্চা ছিল কিন্তু অতীতকে ফিরিয়ে আনার কিংবা অতীতে ফিরে যাওয়ার মনোভাব ছিল না— দৃষ্টি ছিল সামনে।   রেনেসাঁসে ভালোর সঙ্গে মন্দও ছিল— ভালো-মন্দ মিলিয়েই মানুষ ও তার সমাজ। মন্দবিহীন শুধু ভালো কিছুই পাওয়া যায় না। রেনেসাঁসের ভাবপ্রবাহের বিকাশের মধ্যেই পর্যায়ক্রমে দেখা দেয় উপনিবেশবাদ, ক্রুসেড ও সাম্রাজ্যবাদ। খ্রিস্টান ও ইহুদিদের মধ্যেও গিয়েছে বিরোধ। উপনিবেশবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামও চলে। মানুষের সমাজে ভালো মন্দকে পরাজিত রাখবে এবং প্রগতির বাধা দূর করে এগিয়ে চলবে— এটাই ছিল কাম্য। রেনেসাঁসের মধ্য দিয়ে বিকশিত শিল্প-সাহিত্য, জ্ঞান-বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও তার সম্পূরক আন্তর্জাতিকতাবাদের লক্ষ্য ছিল পৃথিবীকেই স্বর্গে উন্নীত করা। রেনেসাঁস ছিল পশ্চিম-ইউরোপভিত্তিক। ক্রমে তা ইউরোপে ও অন্যান্য মহাদেশে সব জাতির মধ্যে, বিভিন্ন ভাষায়, বিভিন্ন নামে ছড়িয়ে পড়ে। বাংলা ভাষার দেশে উনিশ শতকের প্রথম পাদে রামমোহনের (১৭৭২-১৮৩৩) চিন্তা ও কর্মের মধ্যদিয়ে সূচিত হয়েছিল রেনেসাঁস। তাতে প্রথমে হিন্দু সমাজ পরে মুসলিম সমাজ জাগ্রত হয়েছিল। 

একাত্তরের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত কালে ঢাকাকেন্দ্রিক জাতীয় সংস্কৃতিতেও জ্ঞাতসারে কিংবা অজ্ঞাতে বহমান ছিল রেনেসাঁসের স্পিরিট। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে সার্বিক বিশৃঙ্খলার মধ্যে সে ধারা ক্ষীয়মান হয়ে পড়ে। তবে বাংলাদেশে ও পশ্চিমবাংলায়, কিছু লেখকের চেতনায় রেনেসাঁসের স্পিরিট বহমান আছে। উঁচু-নিচু, আঁকাবাঁকা পথ ধরে চৌদ্দ শতক থেকে উনিশ শতক পর্যন্ত ইউরোপে রেনেসাঁসের স্পিরিট কার্যকর ছিল। উনিশ শতকের শেষে ইউরোপ-আমেরিকার বৃহৎ শক্তিবর্গ যখন কর্তৃত্ববিস্তারের ও উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতায় মত্ত হয়ে সংঘাতের দিকে এগিয়ে চলে তখন তাতে দেখা দেয় ভাটা এবং তা দ্রুত ক্ষয় পেয়ে যেতে থাকে। ক্রমে অপশক্তি শুভশক্তিকে স্থানচ্যুত করে। ওই সময়েই সংঘটিত হয় দুই বিশ্বযুদ্ধ ও আনুষঙ্গিক নানা ঘটনা। যুদ্ধের ও আনুষঙ্গিক ঘটনাবলির অভিঘাতে মানুষের জীবনোপলব্ধি ও চিন্তা-চেতনা বদলে যেতে থাকে। সে অবস্থায় কাউন্টার রেনেসাঁস রূপে প্রথমে শিল্প-সাহিত্যের ক্ষেত্রে প্রচারিত হয় আধুনিকতাবাদ ও পরে জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রায় সব শাখায় প্রচারিত হয় উত্তরাধুনিকতাবাদ, আধুনিকতাবাদ ও উত্তরাধুনিকতাবাদকে বুঝতে হবে এসব নিয়ে আন্দোলনকারীদের দেওয়া অর্থ দিয়ে। শব্দগত অর্থ আর মতবাদগত অর্থ এক নয়। আধুনিকতাবাদীরা ও উত্তরাধুনিকতাবাদীরা রেনেসাঁসের বিরুদ্ধে কোনো ঘোষণা না দিয়ে কাজ করে চলেন রেনেসাঁসকে শেষ করে দেওয়ার জন্য। 

আধুনিকতাবাদের মর্মে ছিল নৈরাশ্যবাদ ও কলাকৈবল্যবাদ; আর উত্তরাধুনিকতাবাদ নেতিবাদী ও শূন্যবাদী। মানব জাতির উন্নত ভবিষ্যৎ সৃষ্টি নিয়ে আশাভঙ্গের প্রত্যক্ষকারী হয়েছে দুই বিশ্বযুদ্ধ। আর নৈরাশ্যবাদী ও শূন্যবাদী চিন্তার উদ্ভবের কারণ হয়েছে অন্যায়-অবিচারকে প্রতিকারহীন ভাবা এবং উন্নত ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাভঙ্গ-হতাশা। মানুষের প্রতি মানুষের বিশ্বাস কমে গেছে, সামাজিক সংহতি দুর্বল হয়ে পড়েছে, বেড়ে গেছে সামাজিক বিযুক্তি। রেনেসাঁসে নানা প্রবণতা ছিল বটে, তবে দার্শনিক-বৈজ্ঞানিক ও শিল্পী-সাহিত্যিকদের মধ্যে সৃষ্টিশীলতা ও সর্বজনীন কল্যাণের চিন্তা ছিল সব কিছুর মর্মমূলে। আর তাদের ছিল সুদৃঢ় বৌদ্ধিক চরিত্র। মাথাবেচা বুদ্ধিজীবী তারা ছিলেন না। জ্ঞানী লোক আর বৌদ্ধিক-চরিত্রসম্পন্ন জ্ঞানী লোকে পার্থক্য আছে। বৌদ্ধিক চরিত্র ছাড়া শুধু জ্ঞানী লোক দিয়ে রেনেসাঁস হয় না। আধুনিকতাবাদ ও উত্তরাধুনিকতাবাদ গণবিমুখ, প্রগতির পরিপন্থী; তবে শিল্পের জন্য শিল্পচর্চায় আর জ্ঞানের জন্য জ্ঞান চর্চায় তাদের উৎসাহ কম নয়। সেক্ষেত্রে কেউ কেউ অসাধারণ কৃতিত্বেরও পরিচয় দিয়েছেন; গভীর দুঃখবোধের ও নিরঙ্কুশ নেতিবাদী চেতনার সুন্দর নিশ্চিত প্রকাশ আছে কারও কারও কবিতায়, গল্পে, উপন্যাসে, চিত্রশালায়; কিন্তু সদর্থক দৃষ্টিভঙ্গি কিংবা গঠনমূলক প্রবণতা নেই। দেশান্তরযাত্রা, দুঃসাহসী অভিযান— আমেরিকা, উত্তরমেরু ও দক্ষিণমেরু অবিষ্কার অস্ট্রেলিয়ার ও অন্ধকারাচ্ছন্ন আফ্রিকার রহস্য সন্ধান, এভারেস্ট বিজয়, মহাকাশ অভিযান ইত্যাদির মর্মেও ছিল রেনেসাঁসের স্পিরিট। মানববাদ, উপযোগবাদ, ধনতন্ত্র, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও তার সম্পূরক আন্তর্জাতিকতাবাদের উদ্ভব ও বিকাশ ঘটেছে রেনেসাঁসেরই বিকাশের মধ্যে। রেনেসাঁসের ধারা ধরেই উদ্ভব ও বিকাশ ঘটেছে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, প্রাণিবিজ্ঞান, উদ্ভিদবিজ্ঞান, ভূতত্ত্ব, জ্যোতির্বিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান, ইতিহাস, দর্শন ও বিভিন্ন ধারার প্রযুক্তির। ইহলৌকিক-উপলব্ধিজাত, মানববাদী, শিল্প-সাহিত্য সৃষ্টির মর্মেও কাজ করেছে লেখকদের জ্ঞাত ও অজ্ঞাত রেনেসাঁসের স্পিরিট। মানব জাতির অগ্রগতি সরলরৈখিক কিংবা বাধা-বিপত্তিহীন ছিল না। মানুষের নৈতিক চেতনার অধোগতি ও প্রযুক্তির অপব্যবহারও নির্ধারক শক্তি রূপে কাজ করেছে। আরও অনেক ব্যাপার আছে। শিল্পবিপ্লব, বস্ত্রবিপ্লব, ফরাসি বিপ্লব, রুশ বিপ্লব, চীনবিপ্লব, উপনিবেশ দেশ সমূহের স্বাধীনতা-সংগ্রাম ও স্বাধীনতা লাভ ইত্যাদি অনেক ঘটনা এর মধ্যে আছে। 

পাশাপাশি বিজ্ঞান-প্রযুক্তির অপব্যবহার ও মানুষের নৈতিক পতনশীলতা আছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ঠিক পর থেকেই ইউরোপে সভ্যতার সংকট নিয়ে আলোচনা আরম্ভ হয়। অনেক লেখালেখি হয়। আলোচনার সূচনা করেন : সভ্যতার সংকটের ধারণা ছড়িয়ে পড়ে গোটা পৃথিবীতে। রবীন্দ্রনাথ ‘সভ্যতার সংকট’ প্রবন্ধ লেখেন ১৯৪১ সালে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই ইউরোপে অনেক মনীষা নতুন রেনেসাঁস সৃষ্টি করে সভ্যতার সংকট কাটিয়ে ওঠার তাগিদ দিয়ে আসছেন। রবীন্দ্রনাথ প্রতীচ্য থেকে নয়— প্রাচ্য থেকে— নতুন সভ্যতার আত্মপ্রকাশ আশা করে গেছেন। উনিশ শতকে নতুন সভ্যতা সৃষ্টির জন্য দেখা দিয়েছিল সমাজতন্ত্রের ধারণা। তার প্রভাবে সৃষ্টি হয়েছিল কল্যাণরাষ্ট্রের ধারণাও। মার্কসবাদ প্রাধান্য বিস্তার করেছিল। কমিউনিস্ট ইশতেহার প্রকাশিত হয়েছিল ১৮৪৮ সালে, রুশ বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল ১৯১৭ সালে, চীন বিপ্লব ১৯৪৯ সালে, সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলোপ ঘটে ১৯৯১ সালে। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলোপের পর সংকট গভীরতর রূপ নিয়ে সামনে আসে। শ্রেণিসংগ্রাম ও শ্রমিক শ্রেণির একনায়কত্বের ধারণা এখন আর আবেদনশীল নেই। সমাজতন্ত্রের দুর্গতি ও গণতন্ত্রের ব্যর্থতার মধ্যে মৌলবাদবিরোধী আন্দোলন ও নারীবাদী আন্দোলনের প্রতিক্রিয়ায় দেখা দেয় পুরনো পরাজিত সব সংখ্যার বিশ্বাসের ও ধর্মের পুনরুজ্জীবন। মনে হচ্ছে ইতিহাসের চাকা পেছন দিকে ঘুরছে। এই বাস্তবতায় চাই নতুন রেনেসাঁস। নতুন রেনেসাঁস নিয়ে চিন্তা-ভাবনা দরকার। সংগঠিত প্রচেষ্টা দরকার। স্বতঃস্ফূর্তভাবে হবে না। আগেকার রেনেসাঁসের লক্ষ্য ছিল মধ্যযুগের সংস্কার-বিশ্বাস, ভ্রান্তি ও অন্ধকার অতিক্রম করে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিল্প-সাহিত্য অবলম্বন করে সভ্যতার ধারায় প্রগতির পথ ধরে এগিয়ে চলা ও উন্নততর নতুন ভবিষ্যৎ সৃষ্টি করে চলা। 

এখন নতুন রেনেসাঁসের লক্ষ্য হবে আধুনিক যুগের সংস্কার-বিশ্বাস, ভ্রান্তি ও অন্ধকার অতিক্রম করে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিল্প-সাহিত্য অবলম্বন করে প্রগতির পথ ধরে নতুন সভ্যতার ধারায় এগিয়ে চলা। এই অগ্রযাত্রার অভাবেই ইতিহাসের চাকা পেছনে ঘুরছে, মধ্যযুগের পরাজিত সংখ্যার বিশ্বাস ও ভাবধারা পুনরুজ্জীবিত হচ্ছে। গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের নামে সমাচার, যুদ্ধবিগ্রহ, নৈতিক পতন, অপব্যবস্থা, দুর্নীতি ইত্যাদি সমস্যার সমাধান করতে হবে একাংশের রেনেসাঁস-সাধকদের। প্রত্যেক জাতির বিবেকবান চিন্তাশীল ব্যক্তিদেরই বিবেচনার কেন্দ্রীয় বিষয় আজ হওয়া উচিত রেনেসাঁস, ইতিহাসের পশ্চাত্গতি ও তার কারণ এবং আগামীর অভীষ্ট নতুন রেনেসাঁসরা। মানব জাতিকে লাভ করতে হবে নতুন জীবন। পশ্চাত্বর্তী দুর্বল রাষ্ট্রগুলোকে অগ্রবর্তী শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো থেকে জ্ঞান-বিজ্ঞান প্রযুক্তি গ্রহণ করে শক্তিশালী হতে হবে। শক্তিশালী হওয়ার উপায় তাদের বের করতে হবে। দুর্বল জনগণের শক্তির অবলম্বন ঐক্য। দুর্বল থাকলে শোষণ-বঞ্চনা ভোগ করতেই হয়। দুর্বল থাকা অন্যায়। প্রকৃতির ন্যায় মাত্স্যন্যায়। বড় মাছ ছোট মাছকে ধরে খায়। বাঘ, সিংহ হরিণকে মেরে খায়। মানুষের সমাজে প্রবল দুর্বলের ওপর শোষণ, বঞ্চনা, প্রতারণা চালায়। 

ন্যায়-অন্যায় সম্পূর্ণই মানবীয় ব্যাপার। মানুষকে ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য এবং অন্যায়কে প্রতিরোধ করার জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়ে চেষ্টা চালাতে হয়। মানব প্রকৃতি এমন যে, কোনো জনসমষ্টি নৈতিক দিক দিয়ে একবার জয়ী হলে তা চিরকালের বিজয় হয় না। মানুষের সমাজে অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের সংগ্রাম ক্রমাগত চালিয়ে যেতে হয়। দুর্বল জাতিসমূহকে বুঝতে হবে যে, গ্রেকো-রোমান-ইউরোপ-আমেরিকান চিন্তাধারা ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মধারার সুস্পষ্ট দুটি শাখা আছে। এক শাখায় আছে সর্বজনীন কল্যাণ চিন্তা, মহান আবিষ্কার-উদ্ভাবন, প্রগতিশীল দর্শন, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, শিল্প-সাহিত্য ও আদর্শ। এ শাখা সৃষ্টিশীল, প্রগতিশীল, মানব জাতির জন্য কল্যাণকর সব জাতির জন্য গ্রহণীয়। অপর শাখায় আছে কায়েমি স্বার্থবাদ ও প্রতিক্রিয়াশীলতা— উপনিবেশবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কিছু আগে থেকে এই দ্বিতীয় ধারার চিন্তক ও কর্মীরা আঁকাবাঁকা উঁচুনিচু পথ ধরে পর্যায়ক্রমে শক্তিশালী হয়েছে এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ সব কেন্দ্রে কর্তৃত্ব দখল করে নিয়েছে। এই শক্তিকে বলা যায় অপশক্তি। আজকের নতুন প্রযুক্তির দুনিয়ায় কর্তৃত্বশীল আছে এই অপশক্তি। এই অপশক্তির বিরুদ্ধে সারা দুনিয়ার জনগণের ঐক্য দরকার। নতুন রেনেসাঁসের স্পিরিট এটা দাবি করে। বিশ্বায়নের নামে সাম্রাজ্যবাদের বিস্তার আর সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপ্লবের পর বাস্তবতা দেখা দিয়েছে, তাতে দুনিয়াব্যাপী সাধারণ মানুষ— যারা মোট জনসংখ্যার নব্বই শতাংশ মনোবলহারা। বিবেকবান চিন্তাশীল ব্যক্তিরা কোণঠাসা— প্রচারমাধ্যম তাদের অনুকূলে নেই। দুনিয়াব্যাপী প্রযুক্তির অনেক সদ্ব্যবহার হচ্ছে, অপব্যবহারও অনেক হচ্ছে। অপব্যবহারের কুফল সাধারণ মানুষ ভোগ করছে। 

লাভবান হচ্ছে কায়েমি স্বার্থবাদীরা আর অপরাধীরা। রাষ্ট্রব্যবস্থা ও বিশ্বব্যবস্থাকে সর্বজনীন কল্যাণে পুনর্গঠিত করে সমাধানযোগ্য সব সমস্যার সমাধান করতে হবে। ফরাসি বিপ্লব (১৭৮৯) থেকে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপ্লব পর্যন্ত ২০০ বছর মানুষ ছিল পরিবর্তন-উন্মুখ-প্রগতিপ্রয়াসী, এখন মানুষ পরিবর্তনবিমুখ। জনমনে তখন উন্নত ভবিষ্যতের আশা ছিল, প্রগতির উপলব্ধি ছিল। সংকটের গভীর উপলব্ধি ও সংকট অতিক্রম করার প্রবল আকাঙ্ক্ষা— কোনোটাই মানুষের মধ্যে এখন খুঁজে পাওয়া যায় না। মানুষের ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট হয়ে গেছে। দুর্বল মানুষ চলছে প্রবলের জুলুম-জবরদস্তি মেনে নিয়ে। ঐক্যবদ্ধ হয়ে দুর্বল মানুষেরা প্রবল হওয়ার চেষ্টা করছে না। পারস্পরিক আস্থা অর্জনে মানুষ বিমুখ। নেতৃত্বের স্বতঃস্ফূর্ত আত্মপ্রকাশ আশা করছে, কিন্তু নেতৃত্ব তৈরি করার দায়িত্ব গ্রহণ করছে না। বাইবেলে আছে, গধহ ফড়বং হড়ঃ ষরাব নু নত্বধফ ধষড়হব. এখন তো মানুষকে বাইবেল বর্ণিত মানবীয় গুণাবলিতে আগ্রহী দেখা যায় না। মানুষ অন্যায়ের কাছে আত্মসমর্পণ করে চলছে। মানুষ কি কেবল খেয়ে-পরে সহায়-সম্পত্তি নিয়ে সব রকমের জুলুম-জবরদস্তি, অন্যায়-অবিচার, মিথ্যা ও প্রতারণা মেনে নিয়ে নীরবে জীবনযাপন করে চলবে? 

আগ্রাসী সশস্ত্র আক্রমণের ও যুদ্ধের ও ব্যাপক গণহত্যার প্রতিবাদ পর্যন্ত করছে না মানুুষ। নতুন প্রযুক্তির পরিমণ্ডলে মানুষ কি তার আচরণ ও প্রকৃতিকে উন্নত করতে— নৈতিক চেতনাকে শক্তিশালী করতে চেষ্টা করবে না? বিভিন্ন জাতির উত্থান-পতনের ইতিহাস স্মরণ করে বলা যায়, অবশ্য এ রকম থাকবে না, আবার মানুষ পরিবর্তনে প্রগতিতে আগ্রহী হবে— এক সময় পরিবর্তনের জন্য উন্মুখ হয়ে উঠবে। শোষণ-পীড়ন-প্রতারণা ও বঞ্চনা সহ্য করে কতকাল মানুষ প্রতিবাদহীন ও অসংগঠিত থাকবে? উন্নত অবস্থা সৃষ্টির সম্ভাবনা আছে। মানুষ চাইলে চেষ্টা করলে অবশ্যই অবস্থা উন্নত করতে পারবে।  প্রগতির সম্ভাবনা অফুরন্ত। পশ্চিমা অপশক্তি ও তার অনুসারীদের মোকাবিলা করে প্রগতিশীল ভাবধারাকে উচ্চে স্থান দিতে হবে। দরকার প্রগতিশীল সঙ্ঘশক্তি।  বিবেকবান চিন্তাশীল ব্যক্তিদের মধ্যে দরকার রেনেসাঁসের স্পিরিট ও সক্রিয়তা। লেখক : বিশিষ্ট চিন্তাবিদ, অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। 

No comments:

Post a Comment